জিআইজেএনের প্রতিবেদন, প্রশিক্ষণ ও রিসোর্স গাইড যেভাবে দেশে দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় প্রভাব ফেলছে
আমাদের দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে, জিআইজেএন অনুসন্ধান করেছে বিশ্বজুড়ে কীভাবে সংস্থাটির সম্পাদকীয় প্রতিবেদন ও প্রকাশনা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ওয়েবিনার এবং রিসোর্স সেন্টারের গাইড, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে।
(আমাদের এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে জিআইজেএনের বৈশ্বিক সম্মেলনগুলোর প্রভাব তুলে ধরা হয়েছিল।)
এখানে আমরা ছয়জন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি। তারা জানিয়েছেন, দুই বছর পরপর অনুষ্ঠিত আমাদের বৈশ্বিক সম্মেলনের মধ্যবর্তী সময়ে জিআইজেএনের বিভিন্ন কার্যক্রম কীভাবে তাদের চলমান অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করে তুলেছে।
প্রকৃতপক্ষে, কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত জিআইজেসি২৫ সম্মেলনে জিআইজেএনের সাম্প্রতিক এক জরিপে সংস্থাটির প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ৩৪৭ জন উত্তরদাতার মধ্যে ২৮০ জন, অর্থাৎ প্রায় ৮১ শতাংশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক জানান, জিআইজেএন তাদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
রাশিয়ার স্বাধীন সাংবাদিক ভ্যালেরিয়া চেগে। তিনি জানিয়েছেন, বিনা মূল্যে উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহের বিষয়ে জিআইজেএনের টিপশিটগুলো তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান করার প্রয়োজনীয় সহায়তা যুগিয়েছে। বিশেষ করে, যেকোনো সাংবাদিকই পৃথিবীর প্রায় যেকোনো স্থানের মানসম্মত স্যাটেলাইট ছবি এখন বিনা মূল্যে সংগ্রহ করতে পারেন শীর্ষক প্রতিবেদনটি তাকে ২০২৫ সালে রাশিয়ার ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থিত তেল সংরক্ষণাগারসংক্রান্ত নীতি নিয়ে অনুসন্ধান করতে উৎসাহ যোগায়। এভাবেই তিনি তৈরি করেন ‘রাশিয়া কীভাবে তেলের ডিপোগুলোকে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে ফেলেছে’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
অন্য সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন, চলমান অনুসন্ধানী কাজকে এগিয়ে নিতে তারা তাৎক্ষণিকভাবেই জিআইজেএনের বিভিন্ন রিসোর্স ব্যবহার করেন। যেমন, বাংলাদেশের সাংবাদিক সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম। তিনি কীটনাশক ও ক্যানসারের মধ্যে সম্পর্ক অনুসন্ধানের বিষয়ে জিআইজেএনের সদ্য প্রকাশিত একটি টিপশিটে বর্ণিত অনুসন্ধানপদ্ধতি কাজে লাগান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে নারী কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেন।
সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম — সহকারী সম্পাদক, সমকাল (বাংলাদেশ)
“জুলাই মাসে মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ করার পর এবং কীটনাশকের সংস্পর্শে আসা বাংলাদেশের নারী কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির প্রস্তুতি গ্রহনের সময় আমি জিআইজেএনের বুলেটিনে প্রকাশিত কীটনাশক ও ক্যানসারের মধ্যে সম্পর্ক অনুসন্ধানের পরামর্শ শীর্ষক লেখাটি পড়ি। [জিআইজেএন বুলেটিন মাসে দুবার প্রকাশিত হয়।]
“নিবন্ধটিতে কীটনাশক ও ক্যানসারের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জটিল দিকগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এটি আমাকে বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে উৎসাহিত করে। [নিবন্ধটিতে ‘পারস্পরিক সম্পর্ক ও কার্যকারণ’-এর পার্থক্যজনিত জটিলতা এড়িয়ে অনুসন্ধান চালানোর পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি কীটনাশক ও বিভিন্ন রোগের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।] আমি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক ও কীটনাশকবিষয়ক গবেষকদের সঙ্গে কথা বলি। নারী কৃষকদের সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি তাদের মতামত ও বিশ্লেষণও প্রতিবেদনে যুক্ত করি। অনুসন্ধানের ফলাফল আরও জোরালো করতে পরবর্তী সময়ে আরও কিছু সাক্ষাৎকার নিই।”
“জিআইজেএনের নিবন্ধে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ে কৃষকদের খোলামেলাভাবে কথা বলানো বেশ কঠিন। আমিও একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। বাণিজ্যিকভাবে সবজি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নারী কৃষকেরা প্রায়ই কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করতে চাইতেন না।”

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সমকালের সহকারী সম্পাদক সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম। ছবি: সাদিয়া মাহজাবিন ইমামের সৌজন্যে।
আমার প্রায় ২ হাজার শব্দের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি সমকালের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়। এতে আরও ১০ জন প্রতিবেদক অবদান রাখেন। প্রতিবেদনটি তৈরিতে সাক্ষাৎকার, জরিপ এবং দেশি-বিদেশি গবেষণা ও প্রকাশনা পর্যালোচনার সমন্বয় করা হয়েছিল।
আমার জানা মতে, বাংলাদেশের নারী কৃষকদের মধ্যে কীটনাশকের ব্যবহার এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এটিই ছিল প্রথম বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর অন্যান্য গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়।
মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুঁজে পাই, যেগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
“ওই টিপশিটে মার্ক হরভিটের শিক্ষার্থীদের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। যেখানে দেখা যায়, যেসব এলাকায় কীটনাশকের ব্যবহার বেশি, সেসব এলাকায় ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বেশি। এই গবেষণা আমাকে বাংলাদেশেও একই ধরনের অনুসন্ধান করার কথা ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি ব্যবহার করা যেতে পারে। যদিও এসব নথিতে প্রবেশাধিকার পাওয়া কঠিন হবে। তবে এ ধরনের অনুসন্ধানের মাধ্যমে কীটনাশকের ব্যবহার বেশি—এমন এলাকাগুলোতে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খতিয়ে দেখা সম্ভব। পাশাপাশি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও আরও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।”
“জিআইজেএনের রিসোর্সগুলো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো বিষয়কে দেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। পাশাপাশি, এর ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।”
সামেহ এল–লাবুদি — অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও শিক্ষক (মিসর)

মিসরের অনুসন্ধানী সাংবাদিক সামেহ এল-লাবুদি। ছবি: এল-লাবুদির সৌজন্যে।
“জিআইজেএনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাওয়া অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন টুল ও সংযোগ অভিবাসনের বিভিন্ন পথ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিপরীতে জবাবদিহি বিষয়ক প্রতিবেদন তৈরিতে সরাসরি সহায়তা করেছে। পাশাপাশি, আমাদের অনুসন্ধানী প্রক্রিয়ায় তথ্যের নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”
“আন্তঃসীমান্ত অভিবাসন, সমুদ্রপথ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কাজ করা একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে ভূমধ্যসাগরে জাহাজডুবি ও সীমান্তের বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে আমার অনুসন্ধানগুলোতে জিআইজেএনের সহায়তায় পাওয়া ব্যবহারিক কৌশল ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক প্রতিবেদন তৈরিতে আমাকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। বিশেষ করে, জিআইজেএনের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শেখা ও আলোচিত ওপেন সোর্স ইনটেলিজেন্স (ওএসআইএনটি) টুল এবং স্থানিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি আমার সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রকল্পগুলোর গবেষণাপদ্ধতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে। এর মধ্যে এআরআইজেতে প্রকাশিত ‘দ্য কালামাটা ট্র্যাপ’ শীর্ষক প্রতিবেদন এবং পরিবেশ ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমার চলমান কাজও রয়েছে।”
“এ ছাড়া, কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্স (জিআইজেসি২৫)-এ অংশ নেওয়া এবং অভিবাসনবিষয়ক সাংবাদিকতা নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্যানেল আলোচনা ছাড়াও, ওপেন সোর্স ইনটেলিজেন্স (ওএসআইএনটি), স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ডিজিটাল তথ্য যাচাই নিয়ে বিভিন্ন সেশন থেকে আমি উন্নত ও আধুনিক অনুসন্ধানপদ্ধতি সম্পর্কে জেনেছি। এসব পদ্ধতি সরাসরি আমার অনুসন্ধানী কাজের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে তুলেছে।”
মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ — নির্বাহী সম্পাদক, দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ (বাংলাদেশ)
“আমি জিআইজেসি২১-এর ফেলো ছিলাম। সেই থেকে জিআইজেএন আমার জন্য ব্যবহারিক তথ্য ও দিকনির্দেশনার একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে আছে। জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের নির্বাহী সম্পাদক এবং বাংলাদেশের পরিবেশবিষয়ক সংবাদ পোর্টাল রিনিউ আর্থ নিউজের স্বেচ্ছাসেবী ‘ক্লাইমেট এডিটর’ হিসেবে কাজ করতে গিয়ে অনুসন্ধানী পদ্ধতি, তথ্য নিয়ে কাজ, অর্থের প্রবাহ অনুসরণ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার বিষয়ে নতুন ধারণা পেতে আমি এখনো জিআইজেএনের বিভিন্ন রিসোর্সের সাহায্য নিই। যা আমার প্রতিবেদন পরিকল্পনা, সম্পাদনা এবং সাংবাদিকদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায় ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনেছে।
“জিআইজেএনের কাছ থেকে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় কেবল সরকারি ঘোষণা বা বাজেট বরাদ্দের তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না। প্রকৃত অর্থের পরিমাণ খুঁজে বের করতে হবে, মূল নথিপত্র খতিয়ে দেখতে হবে, কোথায় কী তথ্য নেই তা শনাক্ত করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত কারা এর সুবিধা পাচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।”
“এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায় রিনিউ আর্থ নিউজে প্রকাশিত আমার সাম্প্রতিক দুটি ইন্টারঅ্যাকটিভ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। যার শিরোনাম ডাজ ক্লাইমেট মানি ফলো রিস্ক? এবং ফলো দ্য গ্রিন মানি।

রিনিউ আর্থ নিউজের ‘জলবায়ু অর্থায়ন কি ঝুঁকির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়?’ শীর্ষক প্রতিবেদন। ছবি: রিনিউ আর্থ নিউজের স্ক্রিনশট।
প্রথম প্রতিবেদনে আমরা বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জলবায়ু খাতের জন্য চিহ্নিত ৫২১টি উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনা করেছি। যতটুকু সম্ভব, এসব প্রকল্পের ভৌগোলিক অঞ্চলের তথ্য মানচিত্রে তুলে ধরেছি। পাশাপাশি, প্রকল্পগুলোর বরাদ্দের তথ্যের সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা, দারিদ্র্য ও জনসংখ্যাসংক্রান্ত উপাত্তের তুলনা করেছি।
প্রতিবেদনটিতে স্বচ্ছতা নিয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে, সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে প্রকৃতপক্ষে এই অর্থ পৌঁছাচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রতিবেদনে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফাইন্যান্সসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করেছি, যাতে টেকসই বিনিয়োগ কোন কোন খাতে এবং কোথায় যাচ্ছে, তা জানা যায়। জটিল আর্থিক উপাত্তগুলোকে ইন্টারঅ্যাকটিভ চার্টের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছি, যাতে পাঠকেরা নিজেরাই সেগুলো বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানের ফলাফল বুঝতে পারেন।
জিআইজেএন যে ধরনের অনুসন্ধানী চর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে, “দুটি প্রতিবেদনেই সেগুলো অনুসরণ করা হয়েছে। যেমন, মূল উপাত্ত নিয়ে কাজ করা, প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সরকারি দাবিগুলো যাচাই করা এবং সংখ্যাভিত্তিক তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনকে যুক্ত করা।”
এই প্রতিবেদনগুলো তৈরিতে আমি জিআইজেএনের যেসব রিসোর্স সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছি:
১. সম্পাদকদের জন্য ডেটা সাংবাদিকতার প্রাথমিক পরামর্শ
২. সরকারের জলবায়ু অঙ্গীকার নিয়ে যেভাবে জবাবদিহি আদায় করবেন
৩. অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: ডেটা জার্নালিজম
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ১৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের বন পুনরুদ্ধার কর্মসূচি নিয়ে তৈরি ‘ফরেস্টস অন পেপার, গ্যাপস অন গ্রাউন্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও আমরা একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছি। দুর্নীতি দমন কমিশনের নথি, প্রকল্পের মূল্যায়ন, বনায়নের দাবি করা পরিসংখ্যান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করে কাগজে-কলমে বরাদ্দ করা বনভূমির পরিমাণ এবং অনুসন্ধানকারীরা মাঠপর্যায়ে যতটুকু পেয়েছেন, তার মধ্যে প্রায় ৩৫০ হেক্টর পরিমাণ ঘাটতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তথ্য-প্রমাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই একই পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা বাংলাদেশের বন্ধ হয়ে থাকা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকার যেসব নারী শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে, তাদের নীরবে বয়ে চলা ক্ষতি নিয়েও প্রতিবেদন তৈরি করেছি।
ভালেরিয়া চেগে — স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং মোঝেম অবিয়াসনি (রাশিয়া/ক্রোয়েশিয়া)-এর সংবাদদাতা

স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও মোঝেম অবইয়াসনি-এর সংবাদদাতা ভ্যালেরিয়া চেগে। ছবি: ভ্যালেরিয়া চেগের সৌজন্যে।
স্বাধীন রাশিয়ান সাংবাদিক ভ্যালেরিয়া চেগে জানিয়েছেন, বিনা মূল্যে উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহের বিষয়ে জিআইজেএনের প্রকাশিত গাইডগুলো তার কাজে লেগেছে। ২০২৫ সালে রাশিয়ার ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থিত তেল সংরক্ষণাগারবিষয়ক নীতি নিয়ে একটি অনুসন্ধান চালাতে অনুপ্রাণিত করেছে এবং এ কাজে সহায়তা করেছে।
বিশেষ করে, এখন যেকোনো সাংবাদিক বিশ্বের প্রায় যেকোনো স্থানের উন্নত মানের স্যাটেলাইট ছবি বিনা মূল্যে সংগ্রহ করতে পারবেন শীর্ষক জিআইজেএনের এই লেখাটি তাকে এই অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এর ভিত্তিতেই তিনি রাশিয়া কীভাবে তেলের ডিপোগুলোকে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে ফেলেছে শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন।
চেগে বলেন, “আমি নিয়মিত জিআইজেএনের নতুন প্রকাশনাগুলো অনুসরণ করি, বিভিন্ন নিবন্ধ পড়ি, ওয়েবিনার দেখি এবং বিভিন্ন টুল ব্যবহার করে দেখার চেষ্টা করি। এসব উৎস থেকে পাওয়া বিভিন্ন টুল আমি কাজে লাগিয়েছি। কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও এগুলো আমাকে সহায়তা করেছে।”
“একটি প্রতিবেদনে আমি এমন কিছু ছবি ব্যবহার করেছি, যেগুলোর কয়েকটি জিআইজেএনের এসব গাইডের সহায়তায় খুঁজে পেয়েছিলাম। যেমন—নাসা ওয়ার্ল্ডভিউ, কোপারনিকাস, ইও ব্রাউজার ইত্যাদি। তবে বিশ্লেষণ করা সব উপকরণই প্রকাশিত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ভবিষ্যতে এসব টুলের সহায়তায় আরও জটিল বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করতে চাই। জিআইজেএনের নতুন কোনো টুল বা উপকরণ থাকলেও তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করব।”
ভিক্টর লুইস রদ্রিগেস–ভেলাসকেস—পুয়ের্তো রিকোর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কেন্দ্রের (সিপিআই) অনুসন্ধানী প্রতিবেদক
“জিআইজেএনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ২০২৫ সালে সম্মেলনের ফেলো হওয়ারও অনেক আগে থেকে। বেশ কয়েক বছর ধরেই আমি প্রতিষ্ঠানটির কাজ গভীরভাবে অনুসরণ করছি। বিশেষ করে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য তারা যেসব নির্দেশিকা, টুল ও কর্মশালার আয়োজন করে, সেগুলোর প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।
এসব উপকরণের অনেকগুলোই স্প্যানিশ ভাষায় পাওয়া যায়। এগুলো পুয়ের্তো রিকোর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কেন্দ্রে (সিপিআই) আমার কাজের নিয়মিত তথ্যসূত্র হিসেবে কাজ করেছে।
এর একটি উদাহরণ হলো, মঙ্গাবে লাতামের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত পরিবেশগত অপরাধ অনুসন্ধানে স্যাটেলাইট মানচিত্র ব্যবহার শীর্ষক কর্মশালা। এ ছাড়া পরিবেশগত অপরাধ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কীভাবে অনুসন্ধান করতে হয়, সে বিষয়েও জিআইজেএনের বেশ কিছু সহায়ক উপকরণ রয়েছে।”
অনুসন্ধানী সাংবাদিক ভিক্টর লুইস রদ্রিগেস-ভেলাসকেস পুয়ের্তো রিকোতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর একটি কর্মশালা পরিচালনা করছেন। কর্মশালাটির বিষয়বস্তু তৈরিতে জিআইজেএনের বিভিন্ন উপকরণও ব্যবহার করা হয়েছে।

ছবি: ভিক্টর লুইস রদ্রিগেস-ভেলাসকেসের সৌজন্যে।
“এ ধরনের টুল আমাদের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে সহায়তা করেছে। প্রতিবেদনটি নিয়ে আমি ও ওমায়া সোসা পাসকুয়াল একসঙ্গে কাজ করেছি। এতে আমরা পুয়ের্তো রিকোর দক্ষিণ উপকূলের সালিনাস শহরে অবস্থিত জোবোস বে ন্যাশনাল এসচুয়ারিন রিসার্চ রিজার্ভে সংঘটিত একটি পরিবেশগত অপরাধের চিত্র তুলে ধরি।
আকাশ থেকে তোলা ছবি, বিভিন্ন নথি এবং স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আমরা তুলে ধরি, কীভাবে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নির্মাণকাজের ফলে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত বেড়েছে এবং কীভাবে স্থানীয় ও ফেডারেল সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ধরে বিষয়টি সম্পর্কে জানলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর পুয়ের্তো রিকো সরকার হস্তক্ষেপ করে। সরকার সেখানে নির্মিত অবকাঠামোগুলো সরিয়ে ফেলা ও ভেঙে দেওয়ার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেয়।”
“এ ছাড়া জলবায়ু সংকট ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির বিষয়ে জিআইজেএনের প্রশিক্ষণমূলক উদ্যোগগুলো আমাদের প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু ও বিভিন্ন টুলের সন্ধান দিয়েছে। এর ফলে সিপিআইয়ের সাম্প্রতিক কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যেসব তথ্যের ঘাটতি ছিল, সেগুলো পূরণ করতে পেরেছি।
এ ধরনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মধ্যে রয়েছে—যেমন— ইসলাস সিন প্লায়াস, ইসলাস আ লা দেরিভা, সে সেকা এল কারিবে এবং পারাইসো পেরদিদো শীর্ষক ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলো।
“জিআইজেএনের সহযোগিতার মানসিকতা এবং তাদের প্রকাশিত উপকরণ সবার জন্য সহজলভ্য করে তোলার উদ্যোগ আমাদের কাজের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করেছে। একই সঙ্গে এটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, জ্ঞান ভাগাভাগি করা হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।”
চার্লস মাফা—জাম্বিয়ার মাকানডে–এর সম্পাদক
মাফা বলেন, “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কীভাবে পরিচালনা করি, সে ক্ষেত্রে জিআইজেএনের বাস্তব প্রভাব রয়েছে। জিআইজেএনের গুরুত্ব শুধু তাদের সম্মেলনে অংশ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির সময় কিংবা জটিল কোনো বিষয় নিয়ে কীভাবে অনুসন্ধান শুরু করা যায়, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের নির্দেশিকা, ওয়েবিনার, নিউজলেটার, তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন এবং নেটওয়ার্ক আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে কাজ করে।
এসব উপকরণ উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক গবেষণা, অর্থের লেনদেন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানার কাঠামো অনুসরণ, সরকারি নথি ও উপাত্ত খতিয়ে দেখা, সূত্র তৈরি এবং কোনো প্রতিবেদন আপাতদৃষ্টিতে শুধু স্থানীয় বিষয় বলে মনে হলেও তার আন্তসীমান্ত প্রভাব আরও গভীরভাবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে।”
“সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জিআইজেএন আমাদের বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। জাম্বিয়ার মতো দেশে তুলনামূলক ছোট একটি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমের জন্য দেশের বাইরেও বিশেষজ্ঞ, অনুসন্ধান পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের খুঁজে পাওয়ার সুযোগ থাকা অনেক বড় বিষয়। উচ্চাভিলাষী কোনো অনুসন্ধান শুরু করা সম্ভব কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
“জাম্বিয়ার খনি শিল্প নিয়ে আমাদের প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমাদের অনুসন্ধানগুলোতে এখন ক্রমবর্ধমানভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাক্ষ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য, পরিবেশবিষয়ক নথি, আদালতের দলিল, আর্থিক তথ্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বক্তব্য যুক্ত করা হচ্ছে।
যেমন, সিনো মেটালস দূষণ মামলা নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলোর কথা বলা যায়। তাৎক্ষণিক পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি আমরা এই অনুসন্ধানে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, আইনি লড়াই এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখেছি।”

জাম্বিয়ার সংবাদমাধ্যম মাকানডের সম্পাদক চার্লস মাফা। ছবি: মাফার সৌজন্যে।
“এ ধরনের প্রতিবেদন জিআইজেএনের কাছ থেকে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার প্রতিফলন। কোনো ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, তা নথিভুক্ত করেই অনুসন্ধান শেষ করা উচিত নয়। বরং সাংবাদিকদের উচিত তথ্য-প্রমাণের সূত্র ধরে আরও এগিয়ে যাওয়া এবং খুঁজে বের করা যে এর জন্য কারা দায়ী, কোন ব্যবস্থার কোথায় ব্যর্থতা ছিল, কারা লাভবান হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঘটনার পর আদৌ কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না।”
“আমাদের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো, কেবলমাত্র জিআইজেএনের কোনো সম্মেলন বা ওয়েবিনারে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেই অর্জিত জ্ঞান সীমাবদ্ধ থাকে না। মাকানডে-তে আমরা সেই জ্ঞান অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।
আমরা শত শত সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়েছি। জিআইজেএনের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা, বিভিন্ন টুল ও কাজের পদ্ধতি আমাদের সম্পাদকীয় আলোচনা, প্রতিবেদন তৈরির পরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হয়।
ফলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বহুগুণে। একজন সাংবাদিক হয়তো জিআইজেএনের কোনো আয়োজনে অংশ নেন কিংবা তাদের কোনো নির্দেশিকা ব্যবহার করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই জ্ঞান আরও অনেক সাংবাদিকের কাজকে প্রভাবিত করতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাদের তৈরি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও এর প্রতিফলন ঘটে।”
রোয়ান ফিলিপ জিআইজেএনের বৈশ্বিক প্রতিবেদক ও প্রভাববিষয়ক সম্পাদক। তিনি এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘সানডে টাইমস’-এর প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে তিনি বিশ্বের দুই ডজনেরও বেশি দেশ থেকে সংবাদ, রাজনীতি, দুর্নীতি ও সংঘাতের বিষয়ে প্রতিবেদন করেছেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন।