জিআইজেএনের জন্য অলঙ্করণটি করেছেন স্মারান্দা তোলোসানো
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: ডেটা জার্নালিজম
সাংবাদিকতায় ডেটার ব্যবহার নতুন নয়। তবে গত কয়েক দশকে এর ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। ষাটের দশকে দৈনিক পত্রিকা ডেট্রয়েট ফ্রি প্রেসের বিভিন্ন কাজের জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করে ডেটা বিশ্লেষণ এবং তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন ফিলিপ মেয়ার। সাংবাদিকতায় সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োগও তার হাত ধরে। ১৯৭৩ সালে প্রকাশ করেন “প্রিসিশন জার্নালিজম: আ রিপোর্টার্স ইন্ট্রোডাকশন টু সোশ্যাল সায়েন্স মেথডস।“ বইটিতে তিনি বিস্তারিতভাবে এসব পদ্ধতি তুলে ধরেছেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক সাংবাদিক মেয়ারকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি স্কুল অব জার্নালিজমের সহায়তায় ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার্স অ্যান্ড এডিটরস (আইআরই) ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কম্পিউটার-অ্যাসিস্টেড রিপোর্টিং কর্মসূচি চালু করে। এরপর থেকে সাংবাদিকেরা তাদের অনুসন্ধানে ডেটা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, এমনকি ডেটা থেকে কীভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেতে শুরু করেন।
পরবর্তী কয়েক দশকে ইন্টারনেটের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডেটা তৈরি হতে থাকে। সাংবাদিকেরা তখন এমন সাংবাদিকতাকে বোঝাতে “ডেটা জার্নালিজম” শব্দটির ব্যবহার শুরু করেন, যেখানে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ছিল পুরো প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে জনস্বার্থ বিষয়ক প্রতিবেদন তৈরির সময় পদ্ধতিগত বা কাঠামোগত সমস্যাগুলো উন্মোচন, বিভিন্ন প্রবণতা ও ব্যতিক্রমী বিষয় শনাক্ত করা সম্ভব হতো।
এর ফলে, কম্পিউটার-অ্যাসিস্টেড রিপোর্টিং বিশ্বজুড়ে একটি চর্চায় পরিণত হয়। আইআরইর সাবেক নির্বাহী পরিচালক ব্র্যান্ট হিউস্টন যেমনটা উল্লেখ করেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাংবাদিকেরা ব্যক্তিগতভাবে কিংবা আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে অনুসন্ধান পরিচালনায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে শুরু করেন। একই সময়ে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান, যেমন গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক, ডেটা জার্নালিজমের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে।
কম্পিউটার নিয়ে মেয়ারের পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরুর ৬০ বছর পর, বর্তমানে অনেক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনই তৈরি হচ্ছে কম্পিউটার-চালিত বিশাল পরিমাণ রেকর্ডের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রথাগত সাংবাদিকতা পদ্ধতি। যেমন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা, সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্যে সরকারি নথিপত্র ও তথ্যের ব্যবহার।
ডেটা কোথায় পাওয়া যাবে
আপনার চারপাশেই ডেটা ছড়িয়ে আছে। গত কয়েক দশকে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারছে। ডেটা সমষ্টিগত বা বিস্তারিত দুই ধরনেরই হতে পারে। অবশ্য সাংবাদিকেরা প্রায়ই বিস্তারিত ডেটা সংগ্রহ করতে চান। যাতে সেটি বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়। তবে সব সময় তা সম্ভব হয় না।
তা সত্ত্বেও, অনেক সরকারই তথ্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করছে। শুরু করার জন্য এখানে কিছু উৎসের উল্লেখ করা হলো:
- ব্যবসায়িক নিবন্ধনের তালিকা
- আদালতের নথি
- সম্পত্তির নিবন্ধন (স্থাবর ও মেধাসম্পদ)
- সরকারি গেজেট। বেশিরভাগ দেশের এখতিয়ারেই এগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।
- সরকারি বা এনজিওর ওয়েবসাইট থেকে স্ক্র্যাপ করা উন্মুক্ত ডেটাবেস। (তবে স্ক্র্যাপিংয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং যে প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ডেটা সংরক্ষণ করে, তাদের নীতিমালা সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন। কারণ কিছু ক্ষেত্রে স্ক্র্যাপিংয়ের ওপর বিধিনিষেধ বা বিশেষ শর্ত থাকতে পারে।)
- খনিজ উত্তোলনের অনুমোদন বা কনসেশন। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ডিআরসি এবং বুরকিনা ফাসোর মতো তথ্যের দিক থেকে স্বচ্ছ নয় এমন দেশও ভূমির অধিকার ও বিধিনিষেধ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খনিজসম্পদ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে।
- সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট ও সরকারি চ্যানেলে দেওয়া হালনাগাদ তথ্য। এই লিঙ্কের উদাহরণটি দেখুন।
- জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা
কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থা যদি কোনো সংখ্যা (যেমন কোনো পরিসংখ্যান) প্রকাশ করে, তাহলে সেই সংখ্যার পেছনে থাকা ডেটা চাওয়াও একটি ডেটাসেট পাওয়ার উপায় হতে পারে।
জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ডেটাসেটের কয়েকটি উদাহরণ হলো:
- যুক্তরাজ্যের ল্যান্ড রেজিস্ট্রি
- কার্বন অফসেট ও ক্রেডিট ডেটাবেস
- সিআইটিইএস ট্রেড ডেটাবেস
- কঙ্গো মাইনিং ক্যাডাস্ট্র (রেজিস্ট্রি)

কার্বনপ্ল্যানের অফসেটস ডেটাবেস তৈরি করা হয়েছে কার্বন অফসেট ও ক্রেডিট নিয়ে অনুসন্ধান আরও সহজ করার জন্য। এতে সবচেয়ে বড় পাঁচটি অফসেট রেজিস্ট্রি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ছবি: স্ক্রিনশট, অফসেটসডিবি
প্রক্রিয়া
ডেটা জার্নালিজম শুধু চার্ট ও ইনফোগ্রাফিক তৈরি করার বিষয় নয়। কিংবা স্প্রেডশিটে থাকা কাঠামোবদ্ধ ডেটা নিয়ে কাজ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডেটা ব্যবহার করে লুকিয়ে থাকা বিষয়গুলো উন্মোচন করা এবং গভীর প্রভাব ফেলা যায় এমন প্রতিবেদন তৈরি করাই ডেটা জার্নালিজমের মূল লক্ষ্য।
প্রতিবেদনে ডেটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করুন:
১. ডেটার উৎসের ধরন কী: ডেটা কোথায় এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়?
২. ডেটা কি কাঠামোবদ্ধ, নাকি অসংগঠিত?
৩. প্রতিবেদনের মূল বিষয় কী এবং কোন মাধ্যমে বা কীভাবে তা উপস্থাপন করা হবে?
৪. আপনার দলের সক্ষমতা কতটুকু?
৫. কী ধরনের ডেটা পাওয়া যাচ্ছে? কোনো ডেটা না থাকলে, তা কি তৈরি করা সম্ভব?
এরপর কাজে নেমে পড়ুন:
১. ডেটা সংগ্রহ করুন। প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নিশ্চিত হওয়ার পর পরবর্তী ধাপ হলো ডেটা সংগ্রহ করা। ফাঁস হওয়া ডেটাসেট বা নথি, তথ্য অধিকার আইনের (ফোয়া) আওতায় তথ্য চেয়ে আবেদন, মানব উৎস, নথি বা ওয়েবপেজ থেকে ডেটা স্ক্র্যাপ করার জন্য প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে, অথবা পিডিএফ ও অন্যান্য ইমেজভিত্তিক নথি থেকে সাংবাদিকেরা ডেটা সংগ্রহ করেন। এরপর সব ডেটাকে এমন কাঠামোবদ্ধ ডেটায় রূপান্তর করতে হয়, যা সহজে বিশ্লেষণ করা যায়।
আগে থেকে যদি কাঠামোবদ্ধ আকারে না থাকে, তাহলে বিভিন্ন নথি বা অন্যান্য উৎস থেকে সাংবাদিকরা তাদের নিজস্ব ডেটাসেট তৈরি করতে পারেন।
২. ডেটার ধরন ও বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝা। ডেটা কে তৈরি করেছে, অর্থাৎ ডেটার উৎস কী, তা খুঁজে বের করুন। উৎসটির সত্যতা যাচাই করুন এবং বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়ন করুন। ডেটার উৎস সম্পর্কে দেওয়া নথিপত্র পড়ুন, যাতে ডেটা কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে তা বোঝা যায়। ডেটাটি প্রাথমিক ডেটাসেট, নাকি অন্য উৎসের ডেটা ব্যবহার করে তৈরি করা একটি গৌণ ডেটাসেট, তা যাচাই করুন। ডেটাতে কী তথ্য আছে (এর চলকগুলো কী, সেগুলো কী নির্দেশ করে এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে), তা বুঝতে চেষ্টা করুন। আপনার কাছে থাকা ডেটাগুলো পুরো ডেটাসেট, নাকি এর একটি অংশ, তা দেখুন।
এরপর, আপনার কাছে থাকা ডেটা কোন কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করুন। ডেটায় কী কী তথ্য নেই, সেদিকে খেয়াল রাখুন। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ডেটার উৎস থেকে সেসব তথ্য সংগ্রহ করে ঘাটতি পূরণ করতে হতে পারে। মূল ডেটাসেটকে আরও সমৃদ্ধ করতে বা এর সঙ্গে তুলনা করার জন্য অন্য কোনো ডেটাসেট সংগ্রহ করা দরকার কি না, সেটিও খুঁজে দেখুন।
৩. ডেটা যাচাই করুন। আপনার সংগ্রহ করা ডেটা যে আসল এবং তা যাচাই করা সম্ভব, সেটা নিশ্চিত করুন। অন্য ডেটাসেটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা, অন্যান্য নথি পরীক্ষা করা এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে ডেটা যাচাই করা যায়। রিপোর্টিংয়ের পরবর্তী পর্যায়ে সাংবাদিকদের ডেটাসেটে সরাসরি উল্লেখ করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বক্তব্য নেওয়া এবং তথ্য যাচাই করা উচিত।
ডেটা নিয়ে কাজ করার সময় ডেটার নির্ভুলতা, পূর্ণতা এবং অসামঞ্জস্যের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারেন। ডেটায় কোনো সমস্যা আছে কি না, তথ্যগুলো আসল, হালনাগাদ ও সম্পূর্ণ কি না—তা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে আপনার প্রতিবেদন এমন একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে, যা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
৪. ডেটা নথিবদ্ধ ও সুরক্ষিত রাখুন। ডেটার কাঠামো পরিবর্তন করে থাকলে, ডেটা এবং আপনার পদ্ধতি সম্পর্কে একটি রিডমি (README) ফাইল তৈরি করতে ভুলবেন না। এটিকে নির্দেশনামূলক নথি হিসেবেও বলা হয়। ডেটা নিয়ে কাজ করার সময় আপনি কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করছেন, তার নোট রাখুন। এতে ভুলের পরিমাণ কমবে। মূল ডেটার একটি কপি সংরক্ষণ করুন—কোনো ভুল হলে সেটি কোথা থেকে হয়েছে, তা খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া, ডেটা নিয়ে কারা কাজ করছেন, সেটিও নির্ধারণ করুন। ডেটার সংবেদনশীলতার ওপর নির্ভর করে কারা ডেটা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন এবং কীভাবে তা অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হবে, তা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ডেটা ফোল্ডারে, গুগল ড্রাইভে, ফ্ল্যাশ ডিস্কে (ইন্টারনেটে সংরক্ষণ করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ হলে), ডেটাবেসে—যেমন শেয়ার করা যায় এমন এসকিউএল ডেটাবেসে অথবা আলেফ, ডেটাশেয়ার, নিনা ইত্যাদি উন্নত টুল ব্যবহার করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

লাতিন আমেরিকান সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের (এল ক্লিপ) ডেটা প্ল্যাটফর্ম নিনা। এটি বিভিন্ন উন্মুক্ত ডেটাবেসের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে, যাতে লাতিন আমেরিকার সরকারগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কোম্পানি ও ব্যক্তিদের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা সহজ হয়। ছবি: স্ক্রিনশট, নিনা
অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (ওসিসিআরপি) এবং ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) সাধারণত কোনো প্রকল্পে কাজ করা সব সাংবাদিকের সঙ্গে ডেটা ভাগাভাগি করে, যাতে তারা কার্যকরভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কঠোর নীতিমালা রয়েছে, যেখানে নির্ধারণ করা হয় কারা কোন ডেটাসেট ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এর উদ্দেশ্য হলো উৎস বা সাংবাদিকদের ঝুঁকির মধ্যে না ফেলা এবং একই সঙ্গে ডেটাসেটে প্রবেশাধিকার পাওয়া প্রত্যেকের কাছে ডেটাসেটটি পুরোপুরি বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও উপাত্ত রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা। অন্য কথায়, ডেটায় যাদের প্রবেশাধিকার থাকাটা জরুরি, শুধু তাদের সঙ্গেই ডেটা ভাগাভাগি করুন।
৫. গল্পের ধারণা পেতে ডেটা বিশ্লেষণ করুন। ডেটা বোঝার পর এবং অন্য সহযোগীদের সঙ্গে তা ভাগাভাগি করার পর এবার গভীরভাবে খোঁজাখুঁজির পালা। সব সময় ডেটার সঙ্গে সেভাবে আচরণ করুন। ডেটার সঙ্গে কথা বলুন। যেভাবে আপনি মানব উৎসের সঙ্গে কথা বলেন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনার সামনে থাকা ডেটাগুলো কোন কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে। আপনি কীভাবে সেই উত্তরগুলোতে পৌঁছালেন, তা নথিবদ্ধ করুন:
- কোনো নির্দিষ্ট মান বা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কিত একটি ডেটা ডায়েরি রাখুন। তথ্য যাচাইয়ের সময়, কিংবা সম্পাদক বা আইনজীবীরা কোনো প্রশ্ন করলে, এটি কাজে আসবে।
- পরবর্তী সময়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য নিজের কাজের তথ্য-সূত্র সংরক্ষণ এবং পুনরুৎপাদনযোগ্য প্রক্রিয়া ব্যবহার করুন। এর মধ্যে ডেটা কপি-পেস্ট করার পরিবর্তে এক্সেলের ফর্মুলা ব্যবহার, প্রোগ্রামিং কোড ব্যবহার, কাজের হিসাব ও অগ্রগতি সংরক্ষণ করতে গিটহাব রিপোজিটরি বা অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
- আপনার অনুসন্ধানের ফলাফল এমনভাবে নথিবদ্ধ করুন, যাতে আপনি এবং দলের অন্য সদস্যরা সহজেই তা অনুসরণ করতে পারেন। আপনার হিসাব-নিকাশ সংরক্ষণের জন্য পদ্ধতিগত ব্যবস্থা তৈরি করুন। যেমন, স্প্রেডশিট, ড্যাশবোর্ড, পাইথন কোড বা উইকি পেজ ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে, তথ্যগুলো অন্য কোনো ডেটাসেটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্যান্ডোরা পেপার্সে উঠে আসা অফশোর এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় নিবন্ধিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের (ক্যালিফোর্নিয়া, মিয়ামি ও অন্যান্য অঙ্গরাজ্য) ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছিল। আইসিআইজে এবং ১৫০টির বেশি গণমাধ্যম সহযোগীর যৌথ অনুসন্ধানের সময় এই পদ্ধতি ব্যবহার করে রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মালিকানাধীন অনেক গোপন সম্পত্তির তথ্য বেরিয়ে আসে।
৬. অতিরিক্ত রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে আপনার অনুসন্ধানের ফলাফল যাচাই করুন। ডেটা বিশ্লেষণের ফলাফল যৌক্তিক কি না, তা নিশ্চিত করতে যাচাই করা জরুরি। এজন্য বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান, এমনকি আগের গবেষণা ও প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গেও ফলাফল মিলিয়ে দেখুন। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলুন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে আপনার বিশ্লেষণ যাচাই করে নিন।
এরপর নিজেকে প্রশ্ন করুন:
- ডেটা কি কোনো অনিয়ম বা অপরাধের তথ্য প্রকাশ করছে—যেমন অর্থপাচার, দুর্নীতি, কর ফাঁকি, পরিবেশগত আইন লঙ্ঘন বা অন্য কোনো অপরাধ?
- ডেটার বৈধতা নিয়ে কোনো সমস্যা আছে কি?
- ডেটায় কি নতুন কোনো তথ্য রয়েছে?
- ডেটা কি কোনো কাঠামোগত সমস্যা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দিতে সাহায্য করছে?
- ডেটায় কি এমন কোনো অপ্রত্যাশিত ব্যতিক্রমী তথ্য রয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের বিষয় হয়ে উঠতে পারে?
একটি কথা প্রচলিত আছে, “ডেটাকে যথেষ্ট সময় ধরে তথ্যের জন্য চাপ দিতে থাকলে, এটি যেকোনো কিছু স্বীকার করবে।” তবে যেকোনো সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার জন্য পরিসংখ্যানকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার বা বিকৃত করা সম্ভব। এটি এড়িয়ে চলুন।
৭. আপনার প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরিকল্পনা করুন: ডেটা বিশ্লেষণের কাজ শেষ হলে ফলাফলগুলো আবার যাচাই করার জন্য সময় রাখুন। এরপর প্রতিবেদন লিখুন এবং ডেটাগুলো সঠিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা দেখে নিন। অন্যান্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মতো এই ক্ষেত্রেও আইনি পর্যালোচনার জন্য সময় রাখুন এবং প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় নির্ধারণ করুন। আপনি কি প্রতিবেদনের সঙ্গে কোনো ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন বা ইন্টার্যাকটিভ কনটেন্ট প্রকাশ করবেন? সেটিও আপনার পরিকল্পনার মধ্যে রাখুন।
ডেটা থেকে প্রতিবেদন
আপনার ডেটানির্ভর প্রতিবেদনটিও অন্য যেকোনো প্রতিবেদনের মতোই শুরু হতে পারে। যেমন, অন্য কোনো প্রতিবেদন তৈরির সময় নতুন ধারণা থেকে, কোনো ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে, এমনকি কোনো বিষয় পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েও। আবার জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ও ডেটা তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে, যা পরে প্রতিবেদনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এই ধরনের ক্ষেত্রে, ডেটাই প্রায়ই প্রতিবেদনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
তবে ডেটাভিত্তিক রিপোর্টিংয়ের সঙ্গে প্রচলিত রিপোর্টিং পদ্ধতি মিলিয়ে কাজ করলে খুব কার্যকর ফল পাওয়া যেতে পারে। তারপরও মানুষ এবং জনস্বার্থের বিষয়টি মাথায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দর্শক বা পাঠক কেন এই প্রতিবেদনে আগ্রহী হবেন? এটি কোন কাঠামোগত সমস্যা উন্মোচন করছে? ওই সমস্যার কারণে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন?
ডেটা থেকে প্রতিবেদন: একটি চেকলিস্ট
১. ‘স্টোরি অ্যাঙ্গেল’ ঠিক করুন। ডেটা বিশ্লেষণ করার পর অনেক তথ্য ও ফলাফল সামনে আসতে পারে। তখন কোন বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন করবেন, তা ঠিক করতে গিয়ে আপনি বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন। সম্ভাব্য প্রতিবেদন বা পিচের কথা ভাবলে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা বেছে নেওয়া সহজ হতে পারে।
তারপরও যদি বুঝতে না পারেন কোন ‘স্টোরি অ্যাঙ্গেল’ নিয়ে এগোবেন, সহকর্মী বা সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন ধারণা পেতে পারেন। এভাবে সবচেয়ে ভালো দিকটি বেছে নেওয়া, নতুন কোনো দৃষ্টিকোণ খুঁজে পাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ মতামত পাওয়া সহজ হবে।
২. স্টোরিবোর্ড তৈরি ও গল্পের পরিকল্পনা
স্টোরিবোর্ডে অনুসন্ধানের ফলাফলগুলো সাজালে একটি ভালো প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক, যেমন চরিত্র, দ্বন্দ্ব, কাহিনির গতিপ্রকৃতি, কাঠামো ইত্যাদি গুছিয়ে নেওয়া ও নির্ধারণ করা সহজ হয়। আপনার গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের ফলাফল থেকে পাঠকের আগ্রহ তৈরি করবে, এমন গল্পটি কী? তা স্টোরিবোর্ডে সাজিয়ে নিন।
৩. পিচ লিখুন। ডেটা আপনাকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরুন। যাতে সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যরা বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং সবাই একই ধারণা ও অবস্থানে আসতে পারেন।
৪. ডেটা নিয়ে রিপোর্ট করুন। মনে রাখবেন, ভালো ডেটাভিত্তিক প্রতিবেদনের সঙ্গে ভালো রিপোর্টিংও থাকতে হয়। ডেটা থেকে পাওয়া তথ্য কীভাবে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে মূল গল্প হয়ে উঠতে পারে, তার একটি উদাহরণ: ধরুন, আপনি আপনার দেশের আবাসন প্রকল্পগুলো নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। সেখানে সরকারের বিনিয়োগ এবং আবাসন নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া কোম্পানিগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য খুঁজছেন। ডেটার ভিত্তিতে আবাসন প্রকল্পগুলোর নির্মাণস্থলে গিয়ে দেখলেন, সেখানে কোনো ভবনই নেই। এ ক্ষেত্রে ডেটায় থাকা তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে যা ঘটছে, সেই অসামঞ্জস্যই হয়ে উঠবে আপনার প্রতিবেদনের মূল গল্প।
৫. প্রতিবেদনটি লিখুন। ডেটাভিত্তিক প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনুসন্ধানের ফলাফলকে একটি গঠনমূলক ও আকর্ষণীয় গল্পের মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরা। লেখা শুরু করার আগে প্রতিবেদনের একটি খসড়া কাঠামো তৈরি করা বা ডায়াগ্রামের মাধ্যমে গল্পের বিন্যাস সাজিয়ে নেওয়া।
৬. ডেটা ডাউনলোড, ব্যাখ্যা ও ভিজ্যুয়ালাইজেশন: প্রকাশের পরিকল্পনার সময় বিবেচনা করুন, বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য এমন কোনো ডেটা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বা পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া যায় কি না, যা একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ গ্রাফিকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যেতে পারে। সম্ভব হলে এমন ব্যবস্থা রাখুন, যাতে পাঠকেরা ডেটা ডাউনলোডও করতে পারেন। পাশাপাশি, ডেটার ধরন এবং কীভাবে ডেটা নিয়ে কাজ করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করে একটি পদ্ধতিগত সহায়ক প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়টিও বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখবেন, শুধু ডেটা বা পরিসংখ্যান সবসময় পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় নাও হতে পারে। তাই ডেটাকে অর্থবহ করে তুলতে সৃজনশীলভাবে গল্প বলা এবং উপযুক্ত ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ডেটাভিত্তিক প্রতিবেদনের বড় ধরনের সুবিধা হলো ডেটা পাঠকের কাছে তুলে ধরতে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ থাকে। যেমন, অনুসন্ধানের ফলাফল টুইট বা টিকটক পোস্টের আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে। আবার ইনফোগ্রাফিক বা ভিডিওর মাধ্যমেও তা তুলে ধরা যায়। বার্তাকক্ষগুলো এখন প্রিন্ট বা ভিডিও প্রতিবেদনের সঙ্গে একাধিক অন্য কনটেন্টও যুক্ত করছে।
ডেটার ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন প্রতিবেদন তৈরির কাজে সহায়তা করতে পারে, আবার চূড়ান্ত প্রতিবেদনও হতে পারে।
সবশেষে, কাজের শুরু থেকেই গ্রাফিকস ও অন্যান্য দলকে যুক্ত করুন। যদি তাদের কাজের শেষ পর্যায়ে যুক্ত করা হয়, তাহলে ডেটাকে দৃশ্যমানভাবে উপস্থাপনের জন্য তাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকবে না।
অন্যান্য বিবেচনা
তথ্য যাচাই
ডেটা নিয়ে কাজের সময় তথ্য যাচাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখুন:
- কোনো স্প্রেডশিটে হাতে হাতে তথ্য এন্ট্রি করা হয়ে থাকলে, সেগুলো সঠিকভাবে এন্ট্রি করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের পরিকল্পনা করুন। সুযোগ থাকলে ডেটা নিয়ে কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, এমন অন্য কাউকে দিয়ে তথ্যগুলো যাচাই করান। ডেটার জটিলতার ওপর নির্ভর করে দুই থেকে তিন দফা যাচাইয়ের পরিকল্পনা করতে পারেন।
- অন্য কেউ যদি ডেটা বিশ্লেষণ করে থাকেন, তাহলে একই বিশ্লেষণ পুনরায় করে দেখুন। এতে একই ফলাফল পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করা যায়। এ ক্ষেত্রে, অন্য একজনের মাধ্যমে বিশ্লেষণটি পুনরায় করানো এবং তথ্য যাচাইয়ে তার সহায়তা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ডেটা বিশ্লেষণের ফলাফল প্রতিবেদনে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে কি না, তা যাচাই করার জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখুন। ভিজ্যুয়ালাইজেশন ও ইন্টারঅ্যাকটিভ উপাদানগুলোও পরীক্ষা করে দেখুন, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সেগুলো ডেটা বিশ্লেষণের তথ্য ও ফলাফল সঠিকভাবে তুলে ধরছে।
মনে রাখুন: ডেটাকে ভালোভাবে যাচাই করলে প্রকাশিত প্রতিবেদনও ভুলত্রুটিমুক্ত করার সম্ভাবনা বাড়ে।
ডেটা নিয়ে সহযোগিতামূলক কাজ
ডেটা নিয়ে কাজ করতে একজন ডেটা সাংবাদিক বা একটি ডেটা বিষয়ক দল যুক্ত থাকতে পারে। অনেক সময় ডেটার পরিমাণ এবং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে একটি ডেটাসেট নিয়ে কাজ করতে একাধিক ব্যক্তির প্রয়োজন হতে পারে।
একই সময়ে, ডেটা দলে বিভিন্ন দক্ষতার মানুষ থাকতে পারেন। একই দলে গবেষণা ও ডেটা বিশ্লেষণের বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি ডেভেলপারও থাকতে পারেন। ডেটার পরিমাণ, কাঠামো ও ধরন জটিল হয়ে উঠলে দক্ষ অভ্যন্তরীণ দলকে যুক্ত করা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। যারা কাজকে আরও এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।
ফলে, বিপুল পরিমাণ ডেটাসেট ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত অনুসন্ধানী প্রকল্পগুলোতে রিপোর্টার, ডেটা সাংবাদিক, গবেষক, তথ্য যাচাইকারী, অনলাইন প্রযোজক, সম্পাদক এবং সাংবাদিকতার বাইরের বিভিন্ন পেশাজীবী, সবাই মিলে একটি দল হিসেবে কাজ করতে পারেন।
যেমন, সাংবাদিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন টুল তৈরি করতে পারেন প্রকৌশলীরা। লাখ লাখ নথি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মেশিন লার্নিং মডেল তৈরি করতে পারেন। সাংবাদিকদের কাজে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন এবং লাখ লাখ নথি প্রক্রিয়াজাত করতে সহায়তা করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ডেটা খুব শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকেরা একসঙ্গে কাজ করার সময় ডেটা তাদের মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি করে।
তবে এমন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে, যাদের ডেটা বিষয়ক একটি বড় দল রয়েছে। সাংবাদিক বা সাংবাদিকদের দলগুলো আইসিআইজে, ওসিসিআরপি, পুলিৎজার সেন্টার বা লাইটহাউস রিপোর্টসের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার কথা বিবেচনা করতে পারেন। কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ রয়েছে, এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও অংশীদারত্ব করা যেতে পারে। কারণ বেশিরভাগ বার্তাকক্ষের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানে বড় ও আলাদাভাবে কাজ করে ডেটার এমন দল রয়েছে। অন্যদিকে, অনেক বার্তাকক্ষে ডেটা নিয়ে কাজ করেন এমন কর্মীর সংখ্যা হয়তো মাত্র এক বা দুজন।
অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা এমনকি নিজের প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীদের সঙ্গে ডেটা ভাগাভাগির সময় ডেটাটি কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, কীভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং ডেটাটির কী কী সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা নিয়ে সতর্ক থাকুন।
সবশেষে, অভ্যন্তরীণ দলের সঙ্গে কাজ করার সময় পুরো প্রক্রিয়াজুড়েই বিভিন্ন দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকা জরুরি। এতে প্রকল্পের লক্ষ্য কী এবং তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, এসব বিষয়ে সবাই একই ধারণা ও অবস্থানে আছেন কি না, তা নিশ্চিত করা যায়।
টুলবক্স
ডেটা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আপনি যদি একেবারেই নতুন হন, তাহলে নিচের কোর্স ও টুলগুলো বিবেচনা করতে পারেন:
- স্প্রেডশিট বিষয়ক দক্ষতা বাড়াতে মার্ক হরভিটের ‘বেসিকস অব গুগল শিটস’ দেখুন। এদিকে, কোরসেরা বা এডএক্স ও এক্সেল শেখার জন্য বিনামূল্যের ভিডিও কোর্স রয়েছে। পাশাপাশি ব্র্যান্ট হিউস্টনের ‘লেট দ্য শিট ডু দ্য ম্যাথ সো ইউ ক্যান ফোকাস অন দ্য স্টোরি’ লেখাটিও দেখতে পারেন।
- ইউরোপিয়ান জার্নালিজম সেন্টারের ‘দ্য ডেটা জার্নালিজম হ্যান্ডবুক’-এর প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণ।
- পাইথন
- আর
- এসকিউএল
- ওপেন রিফাইন
- পিডিএফ প্রক্রিয়াজাত করার টুল, যেমন:
- কমান্ড লাইন ব্যবহার। কমান্ড লাইনের প্রাথমিক বিষয়গুলো বুঝতে এমআইটির মিসিং সেমিস্টার-এর এই শিক্ষা উপকরণগুলো দেখতে পারেন। ওসিসিআরপিতে কমান্ড লাইন শেখা শুরু করা সহকর্মীদের সঙ্গে এরিক ব্যারেট এই রিসোর্সটি ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।
- Columbia University also makes available a summary of data journalism resources. The Knight Center for Journalism in the Americas, Datajournalism.com, and IRE offer courses and resources that help understand how to use some of the tools and programming languages.
- ডেটা জার্নালিজমের বিভিন্ন উপকরণের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেছে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি। নাইট সেন্টার ফর জার্নালিজম ইন দ্য আমেরিকাস, ডেটাজার্নালিজম ডটকম এবং আইআরই বিভিন্ন টুল ও প্রোগ্রামিং ভাষা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা বোঝার জন্য বিভিন্ন কোর্স ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সম্মেলনগুলোতেও প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জিআইজেএনের জিআইজেসি, ডেটাহারভেস্ট, আফ্রিকান ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্স (এআইজেসি), লাতিন আমেরিকার সম্মেলন কলপিন, এআরআইজের বার্ষিক ফোরাম এবং আইআরই আয়োজিত নিকারসহ আরও অনেক সম্মেলন।
কেস স্টাডি
ক্যাপচার্ড — আফ্রিকা আনসেন্সর্ড
এই সিরিজে কেনিয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাগুলোর “ক্রয়প্রক্রিয়া এবং অনিয়মপূর্ণ দরপত্র-সংক্রান্ত প্রতারণা” নিয়ে দুর্নীতির বিভিন্ন ঘটনা অনুসন্ধান করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্ন কোম্পানির যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হয়। এসব কোম্পানি দরপত্র প্রক্রিয়ায় সুবিধা পেয়েছিল।
এজেন্টস অব সিক্রেসি — ফাইন্যান্স আনকভার্ড, বিবিসি, সেশেলস ব্রডকাস্টিং করপোরেশন
এটি ছিল সাংবাদিকদের একটি যৌথ অনুসন্ধান। তারা যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন কোম্পানির উন্মুক্ত তথ্য বিশ্লেষণ এবং ফাঁস হওয়া হাজার হাজার নথি ব্যবহার করে “রাশিয়াকে ঘিরে কাজ করা সবচেয়ে সক্রিয় করপোরেট গোপনীয়তা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নেপথ্যের মূল হোতা ও সহযোগীদের” খুঁজে বের করেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশের অর্থপাচারকারীরা যুক্তরাজ্যে কীভাবে বেনামি কোম্পানি ব্যবহার করছে, অনুসন্ধানটিতে তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।
ইনসাইড দ্য সাসপিশন মেশিন — লাইটহাউস রিপোর্টস, ওয়্যার্ড, ভার্স বেটন, ওপেন রটারডাম
“দুই বছর ধরে অ্যালগরিদমিক জবাবদিহির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান: প্রশিক্ষণ ডেটা, মডেল ফাইল এবং কোড সংগ্রহের চেষ্টা করেছে লাইটহাউস রিপোর্টস। এগুলো এমন একটি ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়, যা সরকারি সেবা নিতে আগ্রহী নাগরিকদের ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে।” এসব সংগ্রহের পর দলটি ঝুঁকি নির্ধারণের অ্যালগরিদম বিশ্লেষণ করে দেখতে পায়, এটি মানুষের মাতৃভাষা, লিঙ্গ এবং তারা কী ধরনের পোশাক পরেন, এসব বিষয় বিবেচনা করে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।
প্যান্ডোরা পেপারস — আইসিআইজে ও ১৫০টি গণমাধ্যম অংশীদার
প্রায় দুই বছর ধরে সাংবাদিকেরা ১৪টি ভিন্ন অফশোর সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন আকারে থাকা ১ কোটি ১৫ লাখেরও বেশি নথি খুঁটিয়ে দেখেছেন। এর মাধ্যমে এমন একটি “ছায়া আর্থিক ব্যবস্থা” উন্মোচনকারী প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে, যা “বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সুবিধা দেয়” এবং এসব প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামও প্রকাশ করা হয়েছে। এই কাজ করতে দলটি প্রচলিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কৌশলের সঙ্গে উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ পদ্ধতির সমন্বয় করেছে। সারা বিশ্বের ৬০০-এর বেশি সাংবাদিকের সঙ্গে নিরাপদে ফাইল তৈরি ও ভাগাভাগির জন্য দলটি ব্যবহার করেছে ডেটাশেয়ার। ডেটা বিশ্লেষণে তারা বিভিন্ন টুল ও পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে রয়েছে মেশিন লার্নিং, পাইথনের মতো প্রোগ্রামিং ভাষা, হাতে হাতে ডেটা নিয়ে কাজ করা এবং গ্রাফ ডেটাবেস—যেমন নিও৪জে (neo4j) ও লিঙ্কুরিয়াস (Linkurious)।
পুরিটি মুকামি একজন পরিসংখ্যানবিদ। পরবর্তীতে ডেটা সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। গত সাত বছর ধরে তিনি তার ডেটা বিশ্লেষণের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ফিনসেন ফাইলস, প্যান্ডোরা পেপারস, এজেন্টস অব সিক্রেসি ও ক্যাপচার্ডসহ বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও প্রকল্পে অবদান রেখেছেন। তিনি আফ্রিকা আনসেন্সর্ড, বিবিসি আফ্রিকা আই এবং ফাইন্যান্স আনকভার্ডে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি ওসিসিআরপিতে আফ্রিকা অঞ্চলের ডেটা সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। দুর্নীতি অনুসন্ধান, অর্থের গতিপথ অনুসরণ এবং নির্বাচনের সময় অপতথ্য শনাক্ত করার মতো বিভিন্ন কাজে তিনি আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন।
এমিলিয়া ডিয়াজ–স্ট্রাক গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক। এর আগে ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে)-এর ডেটা ও গবেষণা সম্পাদক এবং লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন। ডিয়াজ-স্ট্রাক এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আইসিআইজের ২০টিরও বেশি পুরস্কারপ্রাপ্ত অনুসন্ধানী সহযোগিতামূলক প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে অফশোর লিকস, ইমপ্ল্যান্ট ফাইলস, ফিনসেন ফাইলস, প্যান্ডোরা পেপারস এবং পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী পানামা পেপারস। নিজ দেশ ভেনেজুয়েলায় তিনি ডেটা সাংবাদিকতা ও আন্তঃদেশীয় অনুসন্ধানী সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। লাতিন আমেরিকার শত শত সাংবাদিককে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন। তিনি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেটা সাংবাদিকতা এবং আন্তঃসীমান্ত অনুসন্ধানী সহযোগিতা নিয়ে গ্রীষ্মকালীন সেমিনারে পড়িয়েছেন। অধ্যাপনা করেছেন ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে। পাশাপাশি ওয়াশিংটন পোস্ট, ‘পোদের ই নেগোসিওস’ ম্যাগাজিন এবং ভেনেজুয়েলার সংবাদমাধ্যম এল ইউনিভার্সাল, এল মুন্দো ও আরমান্দোডটইনফোতে কাজ করেছেন। তিনি আরমান্দোডটইনফো’র সহপ্রতিষ্ঠাতা।
