সাংবাদিকতার মাধ্যমেও করা যায় জনসেবা: খোঁজ করুন আনন্দ-আত্মতৃপ্তির গল্পগুলো
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম কেবিআরে ২৪ বছর ধরে কাজ করছেন চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি। তার জীবনের অর্ধেক সময়ই কেটেছে এই প্রতিষ্ঠানে। নিজেকে তিনি ‘কেবিআরের মানুষ’ বলেই পরিচয় দেন।
প্রাসতুতি কেবিআরে যোগ দেন ২০০২ সালে । কেবিআরের পূর্ণরূপ রেডিও নিউজ এজেন্সি। শুরুতে তিনি রাজনীতি ও জাতীয় বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করতেন। ২০০৩ সালে সামরিক আইন জারি করা হয়। ওই বছরই তিনি আচেহ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযান নিয়ে প্রতিবেদন করেন। এ সময় তিনি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে অবস্থান করে সংবাদ সংগ্রহ করেন। পূর্ব তিমুর দখলের পর আচেহতে এটিই ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান।
যুক্তরাজ্যে চিভনিং স্কলার হিসেবে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করার জন্য কিছুদিনের বিরতি নেওয়ার পর প্রাসতুতি আবার কেবিআরে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির পাশাপাশি ইন্দোনেশার পুরস্কারজয়ী রেডিও ফিচার অনুষ্ঠান ‘সাগা’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ‘এশিয়া কলিং’ অনুষ্ঠানটিরও সম্পাদক ছিলেন। ইংরেজি ভাষার এই অনুষ্ঠানটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় সম্প্রচার করা হতো।
তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই পদোন্নতি পেয়ে ২০১৪ সালে কেবিআরের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক হন। এই পদে তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল অডিও মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে গল্প উপস্থাপন। যাতে সারা দেশে কেবিআরের শত শত রেডিও স্টেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শোনেন এমন শ্রোতাদের আরও কাছাকাছি পৌঁছানো যায়।
তার নেতৃত্বে কেবিআর একাধিক পুরস্কার অর্জন করে। এর মধ্যে রয়েছে ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজ পাবলিশার্স (ওয়ান-ইফরা) আয়োজিত ২০২৪ সালের ডিজিটাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস এশিয়ায় ‘সেরা উদ্ভাবনী ডিজিটাল পণ্য’ পুরস্কার। এ ছাড়া, ইন্দোনেশিয়ায় বাল্যবিবাহের সংকট নিয়ে অনুসন্ধানী পডকাস্ট সিরিজ ‘দিপাকসা কাওয়িন’ (জোরপূর্বক বিয়ে) তৈরি করে রেডিও বিভাগে ‘শিশুদের নিয়ে সেরা সাংবাদিকতামূলক কাজ’-এর পুরস্কার পায় কেবিআর। ইউনিসেফ ও অ্যালায়েন্স অব ইন্ডিপেনডেন্ট জার্নালিস্টস—ইন্দোনেশিয়া যৌথভাবে এই পুরস্কার দেয়। ২০১৮ সালে গণতন্ত্র, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবাধিকার নিয়ে প্রতিবেদন করার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পান পান্তাউ ফাউন্ডেশনের কারেজ ইন জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড।
সাংবাদিকতায় নানা পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি, প্রাসতুতি বার্তাকক্ষকে সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করেছেন। লিঙ্গসমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি লিঙ্গ সহিংসতা প্রতিরোধ ও এই ধরনের ঘটনা ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলেন। পাশাপাশি, এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য একটি টাস্কফোর্সও গঠন করেন। ২০২৪ সালে কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার জন্য ইউএন উইমেন ইন্দোনেশিয়া কেবিআরকে দ্বিতীয় রানার-আপ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ইন্দোনেশিয়া নেটওয়ার্ক ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের (জারিং) নির্বাহী পরিচালক এনি মুলিয়া ২০০২ সাল থেকে কেবিআরে প্রাসতুতির সঙ্গে কাজ করেছেন। কাজের সূত্রে তাদের একসঙ্গে অনেক জায়গায় ভ্রমণ করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জিআইজেএন সম্মেলনে অংশগ্রহণ। চিত্রাকে নিজের ‘ভ্রমণের সেরা সঙ্গী’ বলে মনে করেন এনি। তিনি বলেন, “ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও চিত্রা সব সময় শান্ত থাকতে পারেন। আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে আমি তাকে কোনো পরিস্থিতিতেই হাল ছেড়ে দিতে দেখিনি।”
প্রাসতুতির লিংকডইন প্রোফাইলের পরিচিতির অংশে ‘আ বান্ডিল অব জয়’ কথাটিও রয়েছে। নিজের জীবনযাপনের ধরনকে তুলে ধরতেই তিনি এই পরিচয় বেছে নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি সাধারণত যেকোনো পরিস্থিতির ইতিবাচক ও আনন্দময় দিকটি খুঁজে দেখার চেষ্টা করি—এমনকি যেসব পরিস্থিতিকে দুঃখজনক বলে মনে করার কথা, সেক্ষেত্রেও।”
তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। ২০২৬ সালে স্তন ক্যানসারের সঙ্গে তার লড়াইয়ের এক দশক পূর্ণ হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন চিকিৎসা নিয়েছেন এবং নিজের এই যাত্রার অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছেন ‘ভার্গো মিটস ক্যানসার’ নামের ব্লগে। তার রাশিচক্রের নামের সঙ্গে মিল রেখেই ব্লগটির এই নাম রাখা হয়েছে।
শিগগিরই তিনি একটি ইনজেকশন নেবেন, যার মাধ্যমে নির্ধারিত চিকিৎসা সম্পন্ন হবে। আঙুল ক্রস করে তিনি বলেন, “চলো, ক্যানসারের সব কোষকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানাই!”
তিনি বর্তমানে ‘ইনফো লানসিয়া’ নামে একটি জনসেবামূলক প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার কাজ করছেন। ইন্দোনেশীয় ভাষায় ‘লানসিয়া’ শব্দের অর্থ প্রবীণ। পরিবার, সমাজ ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে বার্ধক্যের সম্পর্ককে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বুঝতে মানুষকে সহায়তা করাই এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য।
পাশাপাশি, তিনি ইন্দোনেশিয়ার অ্যাসোসিয়েশন ফর সাইবার মিডিয়ার ভাইস চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানে তিনি ভুয়া খবর, গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলায় গণমাধ্যম-সাক্ষরতা বাড়ানোর পক্ষে কাজ করছেন।
প্রাসতুতির কাছে ইনফো লানসিয়া অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি উদ্যোগ। তিনি নিজেও নিজেকে ‘স্যান্ডউইচ জেনারেশন’-এর একজন মনে করেন। ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী এই প্রজন্মের মানুষ একই সঙ্গে বয়স্ক মা-বাবার যত্ন নেন, সন্তানদের বড় করেন এবং নিজেদের কর্মজীবন গড়ে তোলেন।
তিনি বলেন, “নিজের বার্ধক্য ও অবসরের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হলো ভবিষ্যতের নিজের প্রতি এবং পরিবারের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম সেরা উপায়। এ কারণেই আমি মনে করি, প্রতিটি প্রজন্মের উচিত এ বিষয়ে আগেভাগেই কথা বলা শুরু করা এবং শুধু মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে নয়, বরং মর্যাদা, খোলামেলা মনোভাব ও আনন্দের সঙ্গে এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া!”
জিআইজেএন: আপনি যেসব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করেছেন, সেগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার সবচেয়ে প্রিয় এবং কেন?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি : আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো ‘ডিসক্লোজ’। এটি ইন্দোনেশিয়ায় বাল্যবিবাহ নিয়ে কেবিআরের প্রথম অনুসন্ধানী পডকাস্ট সিরিজ।
জিআইজেএনের মাধ্যমে আমরা সুজান রেবারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ভাবনাচিন্তা ও চিত্রনাট্য তৈরির কাজ থেকে শুরু করে প্রযোজনা, বিপণন ও প্রচার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আমাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
(সম্পাদকের নোট: জিআইজেএনের অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস কীভাবে কেবিআরকে সহায়তা করেছে, সে সম্পর্কে আরও পড়ুন।)
নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ থাকার জন্য ‘ডিসক্লোজ’ আমার কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছিল । গল্প বলার কৌশল, গল্পের ধারাবাহিকতা ও বিন্যাস এবং শব্দ পরিকল্পনা নিয়ে আমরা নিজেদের সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। একই সঙ্গে, পডকাস্টের বাইরেও এই সিরিজ কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে সতর্কভাবে ভেবেছি।
শ্রোতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া ছিল আনন্দদায়ক। তবে আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে শেখার প্রক্রিয়াটি। ‘ডিসক্লোজ’ আমাকে দেখিয়েছে, কীভাবে গভীর ও কঠোর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং শক্তিশালী গল্প বলার কৌশল একে অপরকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। আর এই দুইয়ের যথাযথ সমন্বয় হলে ইন্দোনেশিয়ায় বাল্যবিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কীভাবে নতুন করে জনসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে

‘দিপাকসা কাওয়িন’ বা ‘জোরপূর্বক বিয়ে’ পডকাস্টের প্রচ্ছদচিত্র। ছবি: স্ক্রিনশট, ডিসক্লোজ, কেবিআর।
জিআইজেএন: আপনার দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি: বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমছে। সাংবাদিকদের ওপর হুমকি ও সহিংসতা বাড়ছে। পাশাপাশি, সাম্প্রতিক সময়ে গণহারে ছাঁটাইয়ের ঘটনায় হাজার হাজার সংবাদমাধ্যমকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কেবিআরও এই পরিস্থিতির অংশ ছিল।
প্রকাশক হিসেবে নতুন দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় আমি দেখতে পাচ্ছি, ইন্দোনেশিয়ার গণমাধ্যমব্যবস্থাই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। টিকে থাকার জন্য অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সরকারি বিজ্ঞাপন বাজেটের পাশাপাশি স্থানীয় বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরকারের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। কারণ, সরকারি কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও অন্যায় উন্মোচন করে—এমন মানসম্মত সাংবাদিকতার সুযোগ তাদের সীমিত।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ইন্দোনেশিয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার আরেকটি চ্যালেঞ্জের কথা উঠে এসেছে, তা হচ্ছে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ বা সেলফ-সেন্সরশিপ। ২০২৫ সালের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সূচক অনুযায়ী, মোট ৮০ শতাংশ সাংবাদিক স্বীকার করেছেন যে তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেছেন। অন্যদিকে, ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা সেন্সরশিপের শিকার হয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার জন্য এটি যেন ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং’ অর্থাৎ, কেউ সব সময় নজর রাখছে—এমন এক পরিস্থিতি। আর যা সত্যিই ভীতিকর।
জিআইজেএন: অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে আপনার কর্মজীবনে ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে কোন ক্ষেত্রে?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি: একটি ছোট নিউজরুমের নেতৃত্ব দেওয়ার অর্থ ছিল, আমাদের সীমিত সময়, জনবল ও সম্পদ কোথায় কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমাদের সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে কাজ করতে হতো। তবে আমি মনে করতাম, মানসম্মত সাংবাদিকতা যেন সম্ভব হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করা আমার দায়িত্ব। এর মধ্যে ছিল সম্পাদকীয় স্বাধীনতার পরিসর রক্ষা করা, সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানো এবং আমরা ছোট একটি দল বলে যেন কাজের মানের সঙ্গে কোনো আপস করতে না হয়, তা নিশ্চিত করা।
সরকারি দুর্নীতি উন্মোচনকারী যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ইন্দোনেশিয়ালিকস’ ছিল এমন একটি ঘটনা, যা আমার নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল। প্রধান সম্পাদক হিসেবে আমাকে শুধু প্রতিবেদনটির পক্ষেই নয়, বরং এর পেছনের অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত এবং নৈতিকতার পক্ষেও দাঁড়াতে হয়েছিল। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা কেন জরুরি, তা নিয়ে আমার বসের সঙ্গে গুরুতর আলোচনা হয়েছিল—সেই কথা আমার মনে আছে। সম্ভাব্য ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কায় অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো চাপের মুখে পড়েছিল; কিন্তু কেবিআর প্রতিবেদনটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি।
জ্যেষ্ঠ সম্পাদকীয় নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব হলো কঠিন সিদ্ধান্তের দায় নেওয়া এবং ঝুঁকি যখন অনেক বেশি, তখন নিজের সাংবাদিকদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো।
জিআইজেএন: সাক্ষাৎকার নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে ভালো পরামর্শ কী?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি: সাক্ষাৎকার মূলত একটি কথোপকথন। কেন এই কথোপকথন করতে চান, কী নিয়ে কথা বলবেন এবং যার সঙ্গে কথা বলছেন, সেই মানুষটি সম্পর্কে আপনার জানা থাকা প্রয়োজন। আপনি যার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, তিনি রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী কিংবা রাস্তায় দেখা কোনো সাধারণ মানুষও হতে পারেন—প্রতিটি পরিচয় বা পদবির আড়ালেই একজন মানুষ রয়েছেন। সাক্ষাৎকারকে যখন কথোপকথন হিসেবে দেখবেন, তখন অপর ব্যক্তির সঙ্গে সমান মর্যাদা নিয়ে আচরণ করবেন।
আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন একটি বিষয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিখতে হয়। আপনি যার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, তাকে আপনার বিশ্বাস করতে হবে, একইভাবে আপনাকেও তাকে বিশ্বাস করতে হবে। আস্থা গড়ে তোলার একটি উপায় হলো, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গবেষণা করা। এতে সাক্ষাৎকারজুড়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলার ভিত্তি তৈরি হয়।
জিআইজেএন: অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কাজে আপনি কোন রিপোর্টিং টুল, ডেটাবেস বা অ্যাপটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি: ছোট বার্তাকক্ষ হিসেবে আমরা রিপোর্টিংয়ের মৌলিক পদ্ধতিগুলোর ওপরই নির্ভর করতাম। যেমন, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংকলন করা ইত্যাদি। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের সুযোগ থাকলে বলব, এআই টুলগুলো মূলত প্রি-প্রোডাকশন বা প্রতিবেদন তৈরির প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজে আমাদের সহায়তা করত।
যদি সময়কে পেছনে ফিরিয়ে নিতে পারতাম, তাহলে বার্তাকক্ষকে ডেটা সাংবাদিকতা নিয়ে আরও বেশি কাজ করতে উৎসাহিত করতাম। পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমাদের প্রতিবেদনকে আরও শক্তিশালী করা, গভীরতর প্রবণতা ও যোগসূত্র উন্মোচন করা এবং জটিল বিষয়গুলো আরও বেশি প্রভাবশালীভাবে তুলে ধরতে সাংবাদিকদের হাতে বাড়তি কিছু সরঞ্জাম তুলে দেওয়ার একটি সুযোগ আমরা হারিয়েছি।
জিআইজেএন: আপনার সাংবাদিকতা জীবনে পাওয়া সবচেয়ে ভালো পরামর্শ কী? আর যারা অনুসন্ধানী সাংবাদিক হতে চান, তাদের কী পরামর্শ দেবেন?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি: ধৈর্য ধরুন। সোর্সের সঙ্গে গভীরভাবে কাজ করা, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা এবং একটি শক্তিশালী প্রতিবেদন তৈরি করার চেষ্টা করতে গিয়ে সহজেই ক্লান্তি চলে আসতে পারে। এমন সময় তাড়াহুড়ো করে প্রতিবেদনটি শেষ করে অন্য কাজে মন দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। কিন্তু মানসম্মত সাংবাদিকতার জন্য সময় প্রয়োজন। সোর্সের আস্থা অর্জন করতে, প্রতিবেদনের কাহিনির ধারাবাহিকতা গড়ে তুলতে, প্রতিটি তথ্য যাচাই করতে এবং সাংবাদিকতার প্রক্রিয়া যেন কঠোর ও অক্ষুণ্ন থাকে, তা নিশ্চিত করতে সময় লাগে। ধৈর্য ধরার অর্থ শুধু অপেক্ষা করা নয়; তা অর্থবহ সাংবাদিকতা তৈরির শৃঙ্খলারও একটি অংশ।
আমি আরও একটি পরামর্শ যোগ করতে চাই: সাঁতরে চলুন, থেমে যাবেন না—‘ফাইন্ডিং নিমো’ সিনেমার ডোরির মতো। সাংবাদিকতা সহজ কোনো পেশা নয়। সব সময়ই কঠিন কিছু প্রতিবেদন থাকবে, এমন কিছু দক্ষতা থাকবে যা আপনাকে এখনও আয়ত্ত করতে হবে, এমন সূত্র থাকবে যেগুলো থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো তথ্যই পাওয়া যাবে না, আর এমন কিছু প্রশ্ন থাকবে, যেগুলোর উত্তর আপনি সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে পাবেন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনি আপনার চলা থামাবেন না।
আমার কাছে ‘সাঁতরে চলা’র অর্থ হলো, শেখা চালিয়ে যাওয়া। এর অর্থ, আপনি কোথায় পৌঁছাতে চান, তা জানা; একই সঙ্গে পথ চলতে চলতে জ্ঞানের যে ঘাটতিগুলো রয়েছে, সেগুলো পূরণ করার মতো কৌতূহল ধরে রাখা। সাংবাদিকতার জগৎ যত পরিবর্তিত হচ্ছে, এই মানসিকতা ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। টুল, প্ল্যাটফর্ম ও চ্যালেঞ্জের ধরন বদলাতে পারে, কিন্তু শেখার আগ্রহ ধরে রাখা, হাল না ছাড়া এবং আরও ভালো প্রশ্ন করে যাওয়া—এই গুণগুলোই সাংবাদিকদের এবং সাংবাদিকতাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
জিআইজেএন: কোন সাংবাদিককে আপনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন এবং কেন?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুত: আমাকে সুজান রেবারের নাম বলতেই হবে। শুধু এই কারণে নয় যে, ‘ডিসক্লোজ’ পডকাস্ট সিরিজ তৈরির সময় তিনি আমাদের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছিলেন, বরং তার সঙ্গে কাজ করার সুবাদে আমি এমন একটি বিরল সুযোগ পেয়েছিলাম, যার মাধ্যমে একটি প্রতিবেদনের পেছনের কারিগরি দিক এবং তৈরি হয়ে যাওয়ার পর সেটির প্রভাব—দুটিই বোঝার সুযোগ হয়।
মনে হয়েছিল, গল্প বলার পুরো প্রক্রিয়াটি যেন ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি। কীভাবে একটি গল্পের ভাবনা আসে, কীভাবে সেটিকে গড়ে তোলা ও তৈরি করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত পাঠক-শ্রোতারা কীভাবে তা গ্রহণ করেন। আমি শুধু দূর থেকে কারও কাজের প্রশংসা করিনি; বরং তিনি কীভাবে চিন্তা করেন, কীভাবে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে চূড়ান্ত কাজের রূপ পায়, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
সুজানের কাছ থেকে যত বেশি শিখেছি, ততই তার অন্য পডকাস্টগুলোতে ফিরে যেতে শুরু করেছি। সেগুলো নতুনভাবে মনোযোগ দিয়ে শুনেছি এবং শোনার বিষয়গুলোর সঙ্গে পরামর্শদানের সময় তার কাছ থেকে যা শিখেছি, সেগুলোর যোগসূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। এই অভিজ্ঞতা শুধু পডকাস্টে গল্প বলার বিষয়ে আমার উপলব্ধিই গভীর করেনি, বরং সামগ্রিকভাবে সম্পাদকীয় কাজের কারিগরি দিকগুলো নিয়েও আমার চিন্তাভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
জিআইজেএন: আপনার করা সবচেয়ে বড় ভুল কী এবং তা থেকে কী শিক্ষা পেয়েছেন?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি: প্রস্তুতি গ্রহণকে কখনোই হালকাভাবে নেবেন না। আমার সাবেক এক সম্পাদক প্রায়ই বলতেন, ভালো প্রস্তুতি মানেই কাজের অর্ধেক সম্পন্ন হয়ে যাওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো কাজ বারবার করতে করতে প্রস্তুতির গুরুত্বকে স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া সহজ হয়ে যায়।
আমি শিখেছি, ঠিক এই সময়েই ভুলগুলো ঘটে। সাক্ষাৎকার যতটা গভীর হতে পারত, ততটা হয় না; গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য বাদ পড়ে যায়; রেকর্ডার চালু করতে ভুলে যাই; কিংবা চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি করতে পারে না। অভিজ্ঞতা আপনাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে, কিন্তু কখনোই যেন প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে কম যত্নশীল না করে তোলে।
আমার কাছে প্রস্তুতি নেওয়া আত্মবিশ্বাসের অভাবের লক্ষণ নয়। বরং এটি কাজের প্রতি, এর সঙ্গে যুক্ত মানুষদের প্রতি এবং সঠিকভাবে প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ।
জিআইজেএন: আপনার পেশাগত জীবনে কাজের চাপে অবসাদ বা বার্নআউট এড়ান কীভাবে?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি: বছরের পর বছর কাজ করতে করতে আমি শিখেছি, মনকে কিছুক্ষণের জন্য থামার সুযোগ দিতে হয় এবং নিজেকেও বিরতি নেওয়ার অনুমতি দিতে হয়। এটি সবার ক্ষেত্রে কার্যকর না-ও হতে পারে, তবে আমি দেখেছি, ঘর পরিষ্কার করা আশ্চর্যজনকভাবে মানসিক প্রশান্তি দেয়। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘর পরিষ্কার করতে পারি, কারণ এতে কিছুক্ষণের জন্য চিন্তাভাবনা বন্ধ রাখতে পারি।
কাজের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখতে আমাকে আরেকটি বিষয় সাহায্য করেছে। তা হচ্ছে কাজের মধ্যে নতুন কিছু খুঁজে পাওয়া এবং সেটিকে সাদরে গ্রহণ করা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, বহু বছর একই পেশায় থাকা মানে পরিচিত ও স্বস্তিদায়ক গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকা। কিন্তু সাংবাদিকতাকে আমি কখনো এভাবে দেখিনি। এই পেশায় স্বস্তিদায়ক মনে হওয়ার মতো বিষয় খুব কমই আছে। প্রশ্ন বদলায়, মানুষ বদলায়, চ্যালেঞ্জ বদলায়—আর সব সময়ই নতুন কিছু শেখার সুযোগ থাকে। কৌতূহল ও নতুন কিছু আবিষ্কারের এই নিরন্তর অনুভূতিই এত বছর ধরে সাংবাদিকতাকে আমার কাছে রোমাঞ্চকর করে রেখেছে।
জিআইজেএন: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কোন বিষয়টি আপনাকে হতাশ করে? ভবিষ্যতে কোন বিষয়টির পরিবর্তন দেখতে চান?
চিত্রা দিয়াহ প্রাসতুতি: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সময় লাগে—এটা আমাকে হতাশ করে না, কারণ ভালো প্রতিবেদন তৈরিতে সময় লাগাই স্বাভাবিক। বরং হতাশার বিষয় হলো, নিউজরুমগুলোর জন্য সেই সময়টুকু নিশ্চিত করা দিন দিন কতটা কঠিন হয়ে উঠছে।
কেবিআরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ প্রায়ই রেডিও, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য প্রতিদিনের কনটেন্ট তৈরির পাশাপাশি করা হতো। সাংবাদিকদের গভীর অঙ্গীকার ও নিষ্ঠার কারণে আমরা কাজগুলো সামলে নিতে পেরেছিলাম। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে আমি বুঝেছি, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কতটা নাজুক হয়ে পড়তে পারে, যখন তা ব্যক্তিগত ত্যাগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।
আমি আশা করি, ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও টেকসই বার্তাকক্ষ গড়ে উঠবে, বাড়বে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সাংবাদিকদের দক্ষতা, নিরাপত্তা ও সুস্থতার পেছনে বিনিয়োগ। শুধু একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য সাংবাদিকেরা নিজেদের সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকেন বলেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকে থাকবে—এমনটা হওয়া উচিত নয়। বরং যেসব প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মানুষ, সময় ও স্বাধীনতা রক্ষায় প্রস্তুত থাকবে, তাদের কারণেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটবে।
আনা পি. সান্তোস ১০ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিক। র্যাপলার, ডিডব্লিউ জার্মানি, দ্য আটলান্টিক এবং দ্য লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস–এর মতো সংবাদমাধ্যমে তার কাজ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি যৌন প্রজনন স্বাস্থ্য, এইচআইভি এবং যৌন সহিংসতা সংক্রান্ত লিঙ্গভিত্তিক বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করেন। এছাড়া পুলিৎজার সেন্টার ২০১৪ পারসেফোন মিল ফেলো হিসেবে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম অভিবাসন নিয়ে তিনি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।