অলংকরণ: এমিল হাসনাইন
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা অনুসন্ধান গাইড ও ক্ষুধা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির কিছু পরামর্শ
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
২০২৫ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসেস অনুযায়ী, গত দশকে তীব্র ক্ষুধার শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৩টি দেশে ২৯৫ মিলিয়ন হয়েছে। এর প্রধান কারণ ছিল সংঘাত, এরপর অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি।
দীর্ঘমেয়াদী বা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা আরও বেশি ভয়াবহ। এটি তীব্র ক্ষুধার মতো তাৎক্ষণিক জীবনহানির কারণ না হলেও মানুষের স্বাস্থ্য এবং বিকাশের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ৬৭৩ মিলিয়ন মানুষ বা মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ২ শতাংশ এখনও পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে ভুগছে। এর মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, ত্রুটিপূর্ণ খাদ্য ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য।
জাতিসংঘ প্রতি বছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মানবিক সহায়তা তহবিল সংগ্রহ ও বিতরণ করে। দশ বছর আগে সংস্থাটি ২০৩০ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষুধা দূর করার একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। তবে তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এই লক্ষ্য অর্জনের বাইরে থেকে যাবে।
এত বড় ব্যর্থতার কারণ আজকের অধিকাংশ ক্ষুধা সংকট মানুষের তৈরি। সঙ্গে রয়েছে মানবিক দুর্ভোগের ব্যাপকতা। চলমান বাস্তবতা দায়ি ব্যক্তিদের শনাক্ত করা ও তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতি জোর দেয়। তবে এটি করা অনেক সময়ই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র সংঘাত ও চরম আবহাওয়া। যা খাবারের সন্ধানে বের হওয়া মানুষ, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে যাওয়া কর্মী, এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা সাংবাদিকদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় সড়কপথকে বিপজ্জনক করে তোলে—কখনও কখনও একেবারেই অচল করে দেয়।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধ ও সেখানে চলমান মানবিক সংকট নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে প্রায় ২০০ জন সাংবাদিক মারা গেছেন। একই সময়ে সুদানে নয়জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে।
সহিংসতা থেকে পালিয়ে যাওয়া বা খাবারের সন্ধানে জায়গা বদলও আক্রান্ত মানুষের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণকে কঠিন করে তোলে। একই সঙ্গে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়লে স্বাস্থ্য ও মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়াও কমে যায়। যা অনাহার পরিস্থিতি নথিবদ্ধ করাকে আরও কঠিন করে তোলে। সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমের কাজের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধও ক্ষুধার প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আরেকটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তবে সাংবাদিকরা দৃঢ়তা, কৌশল এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে এসব বাধা অতিক্রম করে মানুষের দুর্ভোগের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছেন:
- ফেমিন বাই ডিজাইন: হাউ ইসরায়েল ইগনোরড ওয়ার্নিংস ওভার হাঙ্গার অ্যান্ড স্টার্ভড গাজা—২০২৫ সালে প্রকাশিত হারেটজের প্রতিবেদন। এতে দেড় বছরের বিভিন্ন তথ্য একত্র করা হয়েছে। এতে ইসরায়েল সরকারের প্রকাশ্য বক্তব্য, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ক্রমশ বাড়তে থাকা ক্ষুধাসংক্রান্ত সতর্কবার্তা, এবং গাজার ভেতর থেকে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টগুলোকে একটি টাইমলাইনে সাজানো হয়। এর মাধ্যমে সেখানে দুর্ভিক্ষ নিয়ে জবাবদিহিমূলক সাংবাদিকতার একটি শক্তিশালী প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
- দ্য স্টার্ভিং ওয়ার্ল্ড, ২০২৪ সালে প্রকাশিত রয়টার্সের একটি সিরিজ প্রতিবেদন। যেখানে উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে নির্জন এলাকার সমাধিক্ষেত্র সম্প্রসারণের তথ্য নথিবদ্ধ করা হয়। সহিংসতা থেকে বাঁচতে লাখ লাখ সুদানি এই এলাকাতে পালিয়ে এসেছিলেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রের সাহায্যে সেখানে থাকা মানুষের সঙ্গে সেলফোনে সাক্ষাৎকার নেয়ার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ তৈরি করে। জামজাম অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ চলছে কিনা তা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষকরা উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করেন। এরপর সাংবাদিকরা রিলিফওয়েব থেকে জাতিসংঘের খাদ্য নিরাপত্তা সমন্বয় দলের বৈঠকের সংক্ষিপ্ত নথি ডাউনলোড করেন। মানবিক সহায়তার বিপরীতে সাড়া প্রদানে ব্যর্থ হওয়ার প্রমাণ তুলে ধরতে জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম থেকে খাদ্য সরবরাহের তথ্য চেয়ে অনুরোধ জানান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোর লিঙ্ক নিচে দেওয়া হয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাজার দুর্ভিক্ষের হার পর্যবেক্ষণ। ছবি: স্ক্রিনশট, হারেটজ
কখনও কখনও কারণ আর প্রভাব একেবারেই ভিন্ন হয়ে থাকে। এরপর করা হয় আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান। যা মহাদেশ জুড়ে অর্থ এবং খাদ্য সম্পর্কিত অদৃশ্য সংযোগগুলো তুলে ধরে:
- দ্য ব্ল্যাক সি ব্লকেড: ম্যাপিং দ্য ইমপ্যাক্ট অব ওয়ার ইন ইউক্রেন অন দ্য ওয়ার্ল্ড’স ফুড সাপ্লাই। যা ২০২২ সালে প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ানের একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন। যেটি বিশ্বব্যাপী খাদ্য অনিরাপত্তার ওপর ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবের মাত্রা খুঁজে বের করতে বিস্তারিত তথ্যসূত্র ব্যবহার করেছে। তথ্যসূত্রের মধ্যে ছিল মারিট্রেস নামের সামুদ্রিক গোয়েন্দা কোম্পানির ব্যক্তিগত শিপিং ডেটা; আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট ক্রিটিকাল থ্রেটস প্রজেক্ট থেকে রাশিয়ার সামরিক তথ্য; ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইন কাউন্সিল থেকে গম আমদানি সংক্রান্ত তথ্য; এবং জাতিসংঘের ডেটাবেস, যেখানে গম উৎপাদন, মূল্য এবং ক্ষুধা সংক্রান্ত তথ্য ছিল। তাদের প্রতিবেদনে দেওয়া সোর্স বক্স (তথ্যসূত্রের তালিকা) দুর্ভিক্ষের ভূরাজনৈতিক কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি পথনির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে।
- দ্য হাঙ্গার প্রফিটিয়ার্স। ২০২২ সালে প্রকাশিত লাইটহাউস রিপোর্টসের একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন। প্রকাশ্যে লেনদেন হওয়া কৃষি তহবিলের অর্থের প্রবাহ অনুসরণ করে এটি দেখায় ইউক্রেইনের যুদ্ধের সময় গমের দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে কীভাবে মুনাফাখোর বিনিয়োগকারীরা ফায়দা লুটেছে। এরপর জনস্বার্থে তথ্য পাওয়ার আইনের মাধ্যমে তারা দেখায়, কীভাবে এই মুনাফাখোর বিনিয়োগকারীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে বিষয়টি উপেক্ষা করতে চাপ দিয়েছিল। এই প্রতিবেদনটি পরবর্তীতে ধারাবাহিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের সূচনা করে, যেখানে দেখানো হয় কীভাবে পেনশন তহবিল বৈশ্বিক খাদ্য সংকটকে উসকে দিয়েছে এবং হেজ ফান্ডগুলো (এমন বড় বিনিয়োগ তহবিল যেখানে ধনী বিনিয়োগকারী বা প্রতিষ্ঠান অর্থ বিনিয়োগ করে) সেখান থেকে মুনাফা করেছে। প্রতিটি প্রতিবেদনে ব্যবহৃত উৎস এবং ক্ষুধাসংক্রান্ত অর্থনীতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে একটি পদ্ধতিবিষয়ক অংশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এই যৌথ অনুসন্ধানটি ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে গমের দাম বৃদ্ধির সুযোগে মুনাফা করা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম খতিয়ে দেখেছে। ছবি: স্ক্রিনশট, লাইটহাউস রিপোর্টস।
অনুসন্ধানের আরেকটি নতুন বিষয় হলো—খাদ্য ব্যবস্থা পরিবেশ ও সমাজের জন্য টেকসই কিনা তা খতিয়ে দেখা।
- পয়জন পিআর, ২০২৪ সালে প্রকাশিত লাইটহাউস রিপোর্টস–এর একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন। এতে যুক্ত হয় পাঁচটি মহাদেশের সহযোগী সংস্থা। তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সংক্রান্ত অনুরোধ, অর্থের গতিপথ বিশ্লেষণ, আদালতের নথি এবং প্রচলিত সূত্র ব্যবহার করে একটি গুপ্ত জনসংযোগ বিষয়ক প্রচারণা উন্মোচন করা হয়। এই প্রচারণার আংশিক অর্থদাতা ছিলেন মার্কিন করদাতারা। উদ্দেশ্য ছিল কীটনাশকের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি কম দেখানো এবং আফ্রিকা, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার পরিবেশবিদ এবং বিজ্ঞানীদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
- দ্য ক্রাইমস বিহাইন্ড দ্য সি ফুড ইউ ইট, ২০২৩ সালে প্রকাশিত আউটল ওশেন প্রজেক্ট–এর মাল্টিমিডিয়া সিরিজের প্রথম পর্ব। এটি দ্য নিউ ইয়র্কারসহ কয়েক ডজন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সিরিজটি বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক খাদ্য বাণিজ্যে চীনের ভূমিকা অনুসন্ধান করেছে। প্রথম পর্বে চীনের দূর সমুদ্রে স্কুইড মাছ ধরার জাহাজে কাজ করা মানুষের অধিকার লঙ্ঘন এবং পরিবেশগত অপরাধ তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী পর্বগুলো চীনের সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় রাষ্ট্রসমর্থিত জোরপূর্বক শ্রম, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ান ও উইঘুর শ্রমিকদের কীভাবে কারখানার কাজে ব্যবহার করা হয় তার ওপর আলো ফেলেছে।
আরেকটি বিষয় যা অনুসন্ধান করা জরুরী তা হলো— যেসব খাবার বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য দেওয়া হয়, সেগুলোর পুষ্টি কতটা ভালো তা খতিয়ে দেখা উচিত।
- হাউ নেসলে গেটস চিলড্রেন হুকড অন সুগার ইন লোয়ার-ইনকাম কান্ট্রিজ। ২০২৪ সালে পাবলিক আই নামক সুইস অলাভজনক সংস্থার একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন। যা প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে একটি সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি—ল্যাবরেটরি পরীক্ষা—ব্যবহার করে দেখানো হয়েছে কীভাবে এই খাদ্য সংস্থা দরিদ্র দেশে বিক্রি হওয়া শিশুর খাবারে চিনি বা মধু মেশাচ্ছে। যেখানে আগে থেকেই স্থূলতা সমস্যা বিদ্যমান। এটি কেবল আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকার বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ডও প্রকাশ করে: ধনী দেশে যে একই পণ্য বিক্রি হয়, তাতে চিনি মেশানো থাকে না।
- ম্যাকডোনাল্ডস ট্রায়াম্ফস ওভার কাউন্সিলস’ রিজেকশন্স অব নিউ ব্রাঞ্চেস—বাই ক্লেইমিং ইট প্রোমোটস ‘হেলথিয়ার লাইফস্টাইলস’। ২০২৫ সালে প্রকাশিত দ্য বিএমজে (ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল)–এর একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন। এতে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার আইনের আওতায় করা অনুরোধ ব্যবহার করে ইংল্যান্ডের কয়েকটি অঞ্চলে ফাস্টফুড জায়ান্টটির কৌশল উন্মোচিত করা হয়। যেখানে স্থানীয় সরকারগুলো তাদের উপস্থিতি সীমিত করার পরিকল্পনা করছিল। প্রতিষ্ঠানটি আইনি পদক্ষেপের হুমকি দেয়। দাবি করে তাদের শাখাগুলো নাকি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে উৎসাহিত করে। এমনকি এক স্থূলতা বিশেষজ্ঞের মতামতও উপস্থাপন করে, যিনি বলেন ম্যাকডোনাল্ডসের খাবার স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর।
দ্য গ্রিন রেভল্যুশন
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের গ্রিন রেভল্যুশন বা সবুজ বিপ্লব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার কৃষিকে বদলে দেয়। শস্য, মাংস, শাকসবজি ও ফলের ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে এই পরিবর্তন ঘটে।
উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত, কৃত্রিম সার, কীটনাশক এবং সেচব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে এটি দুর্ভিক্ষ এড়াতে সাহায্য করে। বিশ্বের ওইসব অঞ্চলে লাখো মানুষকে ক্ষুধা থেকে রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সাফল্যের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত। মার্কিন কৃষিবিজ্ঞানী নরম্যান বোরলগ। যাকে প্রায়ই গ্রিন রেভল্যুশনের জনক বলা হয়। গ্রিন রেভল্যুশনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহ বাড়াতে অবদান রাখার জন্য তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
তবে এই সাফল্যের একটি মূল্যও রয়েছে। রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানির মজুত কমেছে, এবং এক ধরনের ফসলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। যা জীববৈচিত্র্য ও কৃষকদের স্থিতিস্থাপকতা দুর্বল করে। তুলনামূলকভাবে ধনী কৃষকেরাই বেশি সুবিধা পেয়েছেন। ফলে বৈষম্য আরও বেড়েছে। এ ছাড়া নতুন প্রযুক্তি ফসলের উৎপাদন বাড়ালেও এমন চর্চা বাড়িয়েছে যা কৃষি খাতের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি ঘটিয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। এর ফলে ভবিষ্যতের খাদ্য উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়তে পারে। এখন গ্রিন রেভল্যুশনের প্রভাব নিয়ে ক্রমেই বেশি বিতর্ক হচ্ছে। একদিকে এটি দেখায়, প্রযুক্তি কীভাবে বিশ্বের মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে এটিও বোঝায় যে সমতা ও টেকসইতার বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে শুধু উৎপাদন বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
- হাঙ্গরি পিপল অ্যাট মেরাউকে ফুড এস্টেট, ২০২২ সালে পুলিৎজার সেন্টারের অর্থায়নে করা একটি অনুসন্ধান। যা ইন্দোনেশিয়ায় কমপাসে প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে ‘গ্যাস্ট্রোকলোনিয়ালিজম’–এর সাংস্কৃতিক, স্বাস্থ্যগত এবং পরিবেশগত প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের দেশব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় খাদ্য ব্যবস্থার বিপরীতে নিম্নমানের ও একফসলী খাদ্য আমদানি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই সিরিজে নিজ নিজ দেশ বা সম্প্রদায়ে একই বিষয় নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী সাংবাদিকদের জন্য কিছু পরামর্শও রয়েছে।
ফিডিং দ্য কঙ্গো বেসিন, প্রতিবেদনটি পুলিৎজার সেন্টারের অর্থায়নে তৈরি এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইনফোনাইল, মংগাবে ও অন্যান্য মাধ্যমে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন। এটি খুঁজে দেখেছে, কেন কঙ্গো বেসিনে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মধ্যে একটি দেখা দিচ্ছে। যদিও সেখানে উর্বর মাটি, পর্যাপ্ত জল এবং বৃহৎসংখ্যক কৃষক জনসংখ্যা রয়েছে।
নিচে ক্ষুধা নিয়ে অনুসন্ধান করতে কিছু মৌলিক পরামর্শ এবং উৎস দেওয়া হলো। যুদ্ধের অংশ হিসেবে মানুষের ক্ষুধা সৃষ্টি করা বা অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টি আলাদাভাবে জিআইজেএনের ওয়ার ক্রাইমস রিপোর্টিং গাইডের একটি অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
পরিভাষা
সরকার, জাতিসংঘ এবং সহায়তা সংস্থার প্রতিবেদনে ক্ষুধাকে খাবারের নিরাপত্তাহীনতা বা খাদ্য সংকট হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
১৯৯৬ সালে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে গৃহীত হয় বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক রোম ঘোষণা। এতে বলা হয়: “খাদ্য নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হয়, যখন সব মানুষ, সব সময়, তাদের খাদ্যচাহিদা ও খাদ্য পছন্দ পূরণের জন্য যথেষ্ট, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের কাছে পৌঁছানোর বাস্তবিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা রাখে, যাতে তারা সক্রিয় ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে।”
এই সংজ্ঞা থেকে বিশেষজ্ঞরা খাদ্য নিরাপত্তাকে চারটি প্রধান মাত্রায় ভাগ করেছেন:
১. প্রাপ্যতা : পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে কি না?
২. প্রাপ্তি বা সহজলভ্যতা : যাদের প্রয়োজন, তাদের কাছে খাবারটি পৌঁছাচ্ছে কি না এবং তা কেনার সামর্থ্য তাদের আছে কি না?
৩. ব্যবহার : মানুষ কি খাবারের পুষ্টিগুণ সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে? এটি কেবল পর্যাপ্ত খাবারের ওপর নয়, বরং বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা এবং সঠিক উপায়ে খাবার প্রস্তুত করার ওপরও নির্ভর করে।
৪. স্থায়িত্ব : উপরের তিনটি বিষয় কি সব সময়ের জন্য ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকছে?
“দীর্ঘস্থায়ী” এবং “তীব্র” ক্ষুধার মধ্যকর পার্থক্যগুলোকে আমলে নেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।
- দীর্ঘমেয়াদী ক্ষুধা: যখন একজন ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবন যাপনের জন্য পর্যাপ্ত খাবার পায় না। এটি মূলত পুষ্টিকর খাবারের স্থায়ী অভাব, যা সাধারণত দারিদ্র্য, অসমতা, দুর্বল খাদ্য ব্যবস্থা বা ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসের মতো কাঠামোগত সমস্যার কারণে ঘটে।
- তীব্র ক্ষুধা : বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি অনুসারে, যখন পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তির জীবন বা জীবিকা তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মুখে পড়ে। যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক সংকটের মতো আকস্মিক ধাক্কার কারণে সাধারণত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
- দুর্ভিক্ষ : যখন কোনো এলাকার প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে অন্তত একটি চরম খাদ্যসংকটে পড়ে এবং অনাহার ও নিঃস্ব হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। জাতিসংঘের স্বীকৃত ক্ষুধা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য দ্য আইপিসি ফ্যামিন ফ্যাক্টশিট দেখুন।
ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) এবং এর সহযোগী সংস্থা কাদ্রে হারমোনাইজ আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর খাদ্য নিরাপত্তার অভাব ও এর ভয়াবহতা পরিমাপ করে। এই ব্যবস্থায় দেশগুলোকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার ভিত্তিতে ১ থেকে ৫ পর্যন্ত রেটিং দেওয়া হয়। একইভাবে দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য অনিরাপত্তা এবং তীব্র অপুষ্টির জন্যও আলাদা স্কেল ব্যবহার করা হয়। এই স্কেলগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা তাদের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
বিভিন্ন দাতা সংস্থা এবং আয়োজক দেশের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের একটি দল নিয়মিত বিরতিতে এই দেশের রিপোর্টগুলো অনলাইনে আপডেট করে থাকে। এই রিপোর্টগুলো জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বড় আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে—কখন, কোথায় এবং কী ধরনের সহায়তা (যেমন: খাবার, ওষুধ, বীজ বা নগদ অর্থ) পাঠানো প্রয়োজন।
মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় আইপিসি স্কেলের (একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো অঞ্চলে খাদ্য সংকট বা ক্ষুধার মাত্রা কতটা গুরুতর তা নির্ধারণ করা হয়) প্রতিটি ধাপে খাদ্য সংকট বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত মৃত্যুর হারও বাড়তে থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেশি হলে এই ধাপগুলো হাজার হাজার ক্ষুধাজনিত মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, এই মৃত্যুর অনেকগুলো সরাসরি অনাহারে নয়। খাবারের অভাব মানুষের শরীরকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে এবং রোগের তীব্রতাও বাড়ায়। ডাচ থিংক ট্যাংক ক্লিঙ্গেনডেলের প্রতিবেদন ফ্রম হাঙ্গার টু ডেথ–এর চার নম্বর চার্টে কিলোক্যালোরির ঘাটতি এবং কতদিন তা থাকে, তার ভিত্তিতে অপুষ্টি মানুষের শরীরে কী প্রভাব ফেলে তা দেখানো হয়েছে।

২০২৪ সালের ফ্রম হাঙ্গার টু ডেথ প্রতিবেদনে প্রকাশিত চার্টে বিভিন্ন মাত্রার শক্তি (এনার্জি) ঘাটতির ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিএমআইয়ের পরিবর্তন দেখানো হয়েছে। ছবি: স্ক্রিনশট, নেদারল্যান্ডস ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস।
ক্ষুধা নিয়ে অনুসন্ধানের পরামর্শ
আইপিসির সংখ্যা কেবল শুরুর দিকনির্দেশনা
আইপিসি একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হলেও একমাত্র উৎস হওয়া উচিত নয়। তীব্র খাদ্য সংকটের মূল্যায়ন মূলত খাবার, পুষ্টি এবং মৃত্যুর তথ্যের ওপর নির্ভর করে করা হয়। কেউ কেউ এটিকে এই ব্যবস্থার শক্তি হিসেবে দেখেন। কিন্তু অন্যদের মতে এটি বড় একটি দুর্বলতা। কারণ বর্তমানে অনেক সংকটপূর্ণ এলাকা সংঘাতের মধ্যে রয়েছে—যেমন গাজা ও সুদান—যেখানে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। কখনও কখনও অসম্ভব। রয়টার্স–এর প্রতিবেদন অনুসারে, গাজায় “ইসরায়েলি বোমা হামলা এবং চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ অপুষ্টি, আঘাতজনিত নয় এমন মৃত্যু এবং অন্যান্য জরুরি তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।” সুদানে সহিংসতা, সামরিক চেকপোস্ট, প্রশাসনিক বাধা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় অপুষ্টি পরীক্ষা করা, মৃত্যুর সংখ্যা গণনা করা এবং মানুষের খাদ্যে প্রবেশাধিকার সম্পর্কে জরিপ চালানোর কাজও ব্যাহত হয়েছে। রয়টার্সের এই সিরিজে একটি গ্রাফিক রয়েছে। যেখানে দেখানো হয়েছে এই ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং সুদানে কোথায় এটি ব্যর্থ হয়েছে। অতিরিক্ত তথ্য ও ডেটার উৎসের লিঙ্ক নিচে দেওয়া হয়েছে।
খাবারের ঘাটতি হলেই যে সবাই অনাহারে পড়বে, এমন নয়
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন সংহাত শুরুর পর বিশ্বের দুইটি বড় সরবরাহকারী দেশ থেকে শস্য ও সার রপ্তানি ব্যাহত হয়। মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব ছিল গুরুতর। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর। যারা তাদের আয়ের বড় অংশ খাবারের পেছনে খরচ করে।
তবে অনেক সংবাদ প্রতিবেদন খাবারের ‘উপলব্ধতা’ এবং ‘প্রবেশাধিকার’—এই দুটি ভিন্ন বিষয়কে একসঙ্গে দেখিয়েছে। সত্যি বলতে বিশ্ব গম রপ্তানির প্রায় এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশ উৎপাদিত হয় রাশিয়া এবং ইউক্রেনে। কিন্তু বিশ্ববাজারে যা পাওয়া যায়, তা মোট উৎপাদনের একটি অল্প অংশ মাত্র। বিশ্বের অনেক দেশে উৎপাদিত খাবারের, বিশেষ করে গমের, বড় অংশ স্থানীয়ভাবে খাওয়া হয়।
মূল সমস্যা ছিল, খাবারের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের আয় কমে যাওয়া। যার ফলে খাবার অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। বহু বছর ধরে কৃষিনীতিতে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বেশি জোর দেওয়ায় যেসব দেশ প্রধান খাদ্যপণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জনগণের খাবারের খরচ জোগানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া যুদ্ধের আগে থেকেই কভিড-১৯ মহামারি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনিশ্চিত উৎপাদনের কারণে প্রায় প্রতি বছর খাদ্যের দাম বাড়ছিল।
আরেকটি উদাহরণ গাজা, যেখানে ক্ষুধার প্রধান কারণ ফসলের অভাব নয়, বরং মানুষের কাছে খাবারের প্রবেশাধিকার না থাকা। সেখানে খাবার আছে কিন্তু ফসল কমে যাওয়া, ইসরায়েলের সহায়তাসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে খাদ্য সহায়তা ঢুকতে না পারা, এবং খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো মিলিয়ে মানুষ কাছে সেই খাবার পৌঁছাচ্ছে না।
আধুনিক সময়ে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুধা খাবারের অনুপস্থিতির কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফল।
“হাঙ্গার ওয়াশিং” (ক্ষুধাকে পুঁজি করা) এবং “বিশ্বকে খাওয়ানো”র বয়ান থেকে সাবধান
“হাঙ্গার ওয়াশিং” হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে রাজনীতিবিদ এবং মুনাফাখোররা খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষের ভয় দেখিয়ে নিজেদের বিশেষ কিছু নীতি বা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। তারা প্রায়ই খাদ্য অনিরাপত্তার আসল কারণগুলোকে আড়াল করে বিষয়টিকে খুব সাধারণ বা ভুলভাবে উপস্থাপন করে।
উদাহরণস্বরূপ, এর প্রবক্তারা প্রায়ই “বিশ্বের ক্ষুধা মেটানোর” অজুহাতে শিল্পনির্ভর কৃষির বিস্তার, জেনেটিক মডিফিকেশনের মতো বিতর্কিত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত নিয়মকানুন ও নীতিগুলো বাতিলের দাবি জানান। যেন এগুলোই “বিশ্বকে খাওয়ানোর” উপায়। কিন্তু এতে দারিদ্র্য, বৈষম্য, সংঘাত বা সুশাসনের অভাবের মতো গভীর সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থাকে। যা মূলত ক্ষুধার আসল কারণ। একইভাবে, রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের দায় এড়াতে কিংবা এমন সব বাণিজ্যিক চুক্তি, ভর্তুকি বা হস্তক্ষেপের পক্ষে জনমত গড়তে ক্ষুধার এই বয়ানকে ব্যবহার করেন, যা আসলে বড় বড় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে।
এটি ‘চিপার ফুড প্যারাডাইম বা সস্তা খাবারের ধারণা নামেও পরিচিত। এর মূল ভাবনা হলো কম দামে বেশি খাবার উৎপাদন করা। কিন্তু এতে পরিবেশ ধ্বংস, দূষণ এবং পুষ্টিহীন খাবারের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নৈতিক জরুরি অবস্থাকে সামনে এনে এসব বয়ান ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ক্ষুধা দূর করতে যে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়।
মাংস শিল্প কীভাবে তাদের পরিবেশ দূষণকারী ব্যবসার প্রভাব লুকাতে ক্লাইমেট-ওয়াশিং বা পরিবেশ-বান্ধব সাজার প্রচারণা চালাচ্ছে—২০২১ সালে ডিসমগের প্রতিবেদনে মাংস শিল্পের জনসংযোগ কার্যক্রম ও লবিং কৌশল নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে বিভিন্ন কোম্পানি ও বাণিজ্য সংগঠনের শত শত নথি ও বিবৃতি পর্যালোচনা করা হয়। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, মুষ্টিমেয় কিছু কোম্পানি মাংসকে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হিসেবে প্রচার করে জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর তাদের ক্ষতিকর প্রভাবকে আড়াল করছে। একই সঙ্গে তারা গবাদিপশু পালনের কারণে কৃষি খাতে যে বিপুল গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি হয়, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি মাংস উৎপাদনের জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাবকে কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

ছবি: স্ক্রিনশট, ডি-স্মগ
প্রশ্ন করুন—“উপকৃত হচ্ছে কে?”
বিশ্বের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোতে মাত্র কয়েকটি বড় কর্পোরেশনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। ক্ষমতার এই সংহতি এবং কেন্দ্রীকরণ মানুষের দৈনন্দিন খাবার কেনার সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বড় বড় কোম্পানিগুলো এখন খাবারের ব্যবসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত—সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। বিষয়টিকে একটি ‘বালুঘড়ি’র সঙ্গে তুলনা করা যায়। বালুঘড়ির ওপরের দিকে আছে অসংখ্য ক্ষুদ্র উৎপাদক আর নিচের দিকে আছে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ বা ভোক্তা। কিন্তু মাঝখানের সরু অংশটি দখল করে আছে মাত্র গুটিকতক কর্পোরেট মধ্যস্বত্বভোগী। এর ফলে উৎপাদকরা অন্যায্য চুক্তিতে বাধ্য হন, খামারের শ্রমিকরা শোষণমূলক পরিস্থিতির শিকার হন, ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম বেড়ে যায় ও তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চ্যাথাম হাউস এবং ইউএনইপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বড় কৃষিভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারে শক্তিশালী অবস্থান এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর সরকারি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল বা অনুপস্থিত নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবে কিছু কৃষি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার সুযোগ পেয়েছে।”
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দেখার চেষ্টা
খাদ্য ব্যবস্থা (ফুড সিস্টেমস) বলতে এমন একটি বিস্তৃত ধারণাকে বোঝায়, যা খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিতরণ, ভোগ এবং বর্জনের সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের অংশীজন, প্রক্রিয়া ও অবকাঠামোর নেটওয়ার্ককে অন্তর্ভুক্ত করে। এসবের মধ্যে রয়েছে নীতিমালা, অর্থনীতি এবং পরিবেশ—যেগুলো এই পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে প্রভাবিত করে।
বিশ্বব্যাপী খাদ্য ব্যবস্থাপনা মানুষের তৈরি মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। যা পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়াচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, আরও তীব্র ও ঘন ঘন ঝড় ও বন্যা, এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেখা দিচ্ছে। এসব দুর্যোগ কৃষকদের জন্য বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। কৃষিশ্রমিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। বিজ্ঞানীরাও সতর্ক করেছেন যে, বায়ুমণ্ডলে কার্বনের মাত্রা বেড়ে গেলে ফসলের পুষ্টিমান কমে যেতে পারে।
এর মানে হলো, জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ এবং মান—উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলেছে।
প্রস্তাবিত প্রতিবেদন সম্পর্কে ধারণা
তবে ক্ষুধার মাত্রা বৃদ্ধির জন্য এককভাবে জলবায়ুর অভিঘাতই দায়ী নয়। বর্তমানে, বিভিন্ন দেশের সরকার বছরে ৪৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি খরচ করছে এমন নীতিমালার জন্য, যা “অকার্যকর, অন্যায়, খাদ্যের মূল্যকে বিকৃত করে, মানুষের স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং পরিবেশকে নষ্ট করে।”
- আপনার দেশ বা সম্প্রদায় কীভাবে ক্ষুধার মাত্রা পরিমাপ করছে? কোন মানদণ্ড ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কোন বিষয়গুলো উপেক্ষিত হচ্ছে?
- আপনার সমাজে বা সম্প্রদায়ে ক্ষুধার মূল কারণ কী? সত্যিই খাদ্যের অভাব, নাকি অন্য কোনো কারণ। যেমন স্বাস্থ্যকর খাবারের অপ্রাপ্যতা বা দাম বেশি থাকা? যদি তা হয়, তাহলে কেন এমন পরিস্থিতি এবং কে উপকৃত হচ্ছে?
- বেশিরভাগ সরকার কৃষিকে ভর্তুকি দেয়। দেখা জরুরি ঠিক কী ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, কেন, এবং তা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করতে সাহায্য করছে কি না।
- এই ভর্তুকি নিয়ে একটি সাধারণ সমালোচনা হলো যে এগুলো সম্পদ-নির্ভর ফসল এবং পশুপালনের অতিরিক্ত উৎপাদন উৎসাহিত করে। আর স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য খুব কম সহায়তা থাকে। আপনার চারপাশেও কি এমন পরিস্থিতি বিদ্যমান?
- আপনি যদি কোনো কৃষিভিত্তিক এলাকার ভেতরে বা আশেপাশে বসবাস করেন, তাহলে সেখানে কী চাষ হচ্ছে এবং কার জন্য হচ্ছে তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। সব কৃষিপণ্য মানুষের জন্য, এমনকি প্রাণীর জন্যও নয়—কিছু পণ্য শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহৃত হয়।
- খাদ্যাভ্যাসের স্বাস্থ্য প্রভাব এবং সরকারের নীতি (অথবা নীতিহীনতা) কীভাবে ক্ষুধা ও অপুষ্টির পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, এ বিষয়ে আগ্রহ বেড়েছে। সর্বশেষ ইএটি-ল্যানসেট রিপোর্টে নগর এলাকায় তিন ধরনের খাদ্য পরিবেশ চিহ্নিত করা হয়েছে: ফুড ভয়েড (যেখানে খাদ্যের অভাব), ফুড ডেজার্ট (যেখানে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর খাবার প্রাপ্য নয়), এবং ফুড সোয়াম্প (যেখানে অস্বাস্থ্যকর ও প্রক্রিয়াজত খাবার প্রচুর, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী)। আপনার এলাকায় এর কোনটি প্রযোজ্য?
- ইমার্জিং হাঙ্গার হটস্পটস সিরিজে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বাড়তে থাকা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিকে আলোকপাত করা হয়েছে। যেখানে পূর্বে মানবিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল না, এবং প্রশ্ন করা হয়েছে তারা কীভাবে এই অবস্থায় পৌঁছালো। এটি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করা যায়। আর এটি করতে খুব বেশি অর্থ খরচের প্রয়োজন হয় না।
- ক্ষুধার বিভিন্ন দিক বোঝার আরেকটি উপায় হলো খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার বিস্তারিত পরীক্ষা। তিনটি প্রধান ও পারস্পরিক চ্যালেঞ্জ হলো: খাদ্য ব্যবস্থাকে স্বাস্থ্যকর, পরিবেশবান্ধব এবং ন্যায়সঙ্গত করা। এই দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে ফাঁকফোকর, প্রবণতা, এবং রাজনৈতিক কথাবার্তার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক চিহ্নিত করা সহজ হয়।
- একটি সম্প্রদায়ের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি না, তার পেছনে কাঠামোগত বৈষম্যএবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা প্রধান ভূমিকা পালন করে। ক্ষুধা সংক্রান্ত গল্প ও সংখ্যার বিশ্লেষণে ২০২১ সালের জাতিসংঘ খাদ্য ব্যবস্থা শীর্ষ সম্মেলনের এই উদ্ধৃতি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য নিরাপত্তা এবং ক্ষুধার নেপথ্যের প্রকৃত কারণগুলো বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: “বাজার, পরিবার এবং নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ার অসম সম্পর্ক ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতাই নির্ধারণ করে দেয় কার সম্পদের অধিকার থাকবে আর কার থাকবে না; যা শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দেয় কারা ক্ষুধার্ত ও অপুষ্টিতে ভুগবে আর কারা ভুগবে না।”
ক্ষুধা সংক্রান্ত সংবাদ তৈরির জন্য টুলস
প্রধান প্রতিবেদনসমূহ
- জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং আরও চারটি সহযোগী সংস্থা মিলে প্রতি বছর দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (এসওএফআই) শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এতে পূর্ববর্তী বছরের বৈশ্বিক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধার তথ্য তুলে ধরা হয়। এই মূল প্রতিবেদনটি প্রকাশের কয়েক মাস পর, তথ্যগুলোকে অঞ্চলভেদে ভাগ করে আলাদা আঞ্চলিক প্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশ করা হয়।
- হাঙ্গার হটস্পটস হলো বৈশ্বিক খাদ্য সংকট বিরোধী নেটওয়ার্ক—যা মানবিক ও উন্নয়নমূলক সংস্থাগুলোর একটি জোট—থেকে প্রকাশিত একটি দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদন। এটি মূলত তীব্র ক্ষুধার ওপর আলোকপাত করে।
- আরও সমসাময়িক বা হালনাগাদ তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো বা অফিসগুলোরতথ্য যাচাই করাও প্রয়োজন। এফএও তাদের বার্ষিক এসওএফআই প্রতিবেদনে তথ্যগুলো সংকলিত করার আগেই, এই জাতীয় সংস্থাগুলো প্রায়ই দ্রুত জরিপ বা সাময়িক পরিস্থিতি প্রতিবেদনে তুলে ধরে।
তথ্য সংগ্রহ
- ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম (আইপিসি): আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা ও তীব্রতা মূল্যায়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত প্রমাণভিত্তিক সংস্থা।
-
-
- আইপিসি কান্ট্রি অ্যানালাইসিস অব কারেন্ট ফুড ক্রাইসিস
- আইপিসি টেকনিকাল ম্যানুয়াল ভার্সন ৩.১
- সিএইচ ক্যাড্রে হারমনিসে (ওয়েস্ট আফ্রিকা)
-
জাতিসংঘ
-
- ওসিএইচএ বা মানবিক সহায়তা সমন্বয় বিষয়ক কার্যালয়: এটি জাতিসংঘের প্রধান সংস্থা যা মানবিক ত্রাণ তহবিলের সংগ্রহ এবং খাদ্য সহায়তা বিতরণ কার্যক্রম তদারকি করে।
- রিলিফওয়েব: মানবিক সংকটের জন্য ডকুমেন্ট ও তথ্য সংরক্ষণাগার
- ডব্লিউএফপি ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম: বিশ্বের প্রধান খাদ্য সহায়তা বিতরণকারী
- অ্যানুয়াল কান্ট্রি রিপোর্টস ২০২৪ | ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম
- বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) ভালনারেবিলিটি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ম্যাপিং: এর ইমার্জেন্সি ড্যাশবোর্ড থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষুধার হটস্পটগুলোতে ডব্লিউএফপির কার্যক্রমের একটি মাসিক চিত্র পাওয়া যায়। আর এর ইকোনমিক এক্সপ্লোরার অংশে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কিছু দেশের বাজারদরের বুলেটিন, দামের তুলনা এবং বিনিময় হারের তথ্য পাওয়া যায়
- এফএও খাদ্য ও কৃষি সংস্থা: এর অধীনে রয়েছে ‘গ্লোবাল ইনফরমেশন অ্যান্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম অন ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার (জিআইইডব্লিউএস):বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা পর্যালোচনার জন্য খাদ্যের সরবরাহ, চাহিদা এবং অন্যান্য প্রধান সূচকগুলো পর্যবেক্ষণ করে। এই সংস্থাটি বছরে দুইবার ফুড আউটলুক প্রতিবেদন, নির্দিষ্ট অঞ্চল-ভিত্তিক প্রতিবেদন এবং আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে সতর্কবার্তা প্রদান করে।
- এফএওএসটিএটি ফুড সিকিউরিটি ইন্ডিকেটরস: এটি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) একটি তথ্য পোর্টাল; যেখানে ২০০০ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বৈশ্বিক, আঞ্চলিক এবং দেশীয় পর্যায়ের খাদ্য অনিরাপত্তা, অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা এবং খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার মতো বিভিন্ন সূচকের তালিকা ও তথ্য পাওয়া যায়।
-
-
- আইআরএইচআইএস | ইন্টিগ্রেটেড রেফিউজি হেলথ ইনফরমেশন সিস্টেম: ইউএনএইচসিআরের শরণার্থী শিবিরের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ইত্যাদির তথ্য ও পরিসংখ্যান।
-
-
-
- জয়েন্ট চাইল্ড ম্যালনিউট্রিশন এস্টিমেটস (জেএমই) ২০২৫ ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচও এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রতি বছর শিশুদের স্টান্টিং, ওভারওয়েট, আন্ডারওয়েট, ওয়েস্টিং এবং সিভিয়ার ওয়েস্টিংয়ের অনুমান তৈরি করে। অতীতের প্রতিবেদন, তথ্য এবং ইন্টারেক্টিভ টুলস ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
-
-
- ইউরোপিয়ান কমিশন নলেজ সেন্টার ফর গ্লোবাল ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন সিকিউরিটি: খাদ্য নিরাপত্তা, সংকট এবং প্রধান চালক—যেমন সশস্ত্র সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, ফসলের অস্বাভাবিকতা এবং দুর্যোগ—ট্র্যাক করার জন্য টুলস এবং ডেটাসেটের লিঙ্ক প্রদান করে।
- স্মার্ট: ইন্টারএজেন্সি সংস্থা যা মানবিক সংস্থাগুলোর জন্য পুষ্টি ও মৃত্যুহার সম্পর্কিত জরিপ পরিচালনা করে।
- ফুড সিস্টেমস ড্যাশবোর্ড: বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরের অবস্থা সম্পর্কিত পাঁচটি বিষয় এবং ৫০টি সূচক ট্র্যাক করে।
- ইউএসএআইডি কান্ট্রি “কমপ্লেক্স এমার্জেন্সি রিপোর্টস”: সংঘাত অঞ্চলে উদীয়মান খাদ্য সংকটের বিশ্লেষণ এবং ট্র্যাকিং প্রদান করে। এই লেখার সময় পর্যন্ত বিদ্যমান প্রতিবেদনগুলো ফরেনঅ্যাসিস্ট্যান্সডটগভ (foreignassistance.gov)-এ পাওয়া যাচ্ছিল।
খাদ্যের মূল্য পর্যবেক্ষণের উৎসসমূহ
- এগ্রিকালচারাল মার্কেট ইনফরমেশন সিস্টেম (এএমআইএস): জি২০ সদস্য দেশ, স্পেন এবং আটটি প্রধান কৃষি পণ্যের রপ্তানি ও আমদানি দেশ। এটি গম, ভুট্টা, চাল এবং সোয়াবিনের বিশ্বব্যাপী উৎপাদন, ব্যবহার এবং বাণিজ্যের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ হিসাব করে। মার্কেট মনিটর আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, ফিউচার মার্কেটের মূল্য এবং সার ও উদ্ভিদ তেলের দাম পর্যবেক্ষণ করে।
- এফএও ফুড প্রাইস ইনডেক্স (এফএফপিআই): খাদ্যপণ্যের একটি নির্দিষ্ট সমষ্টির (শস্য, ভোজ্য তেল, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য এবং চিনি) আন্তর্জাতিক দামের মাসভিত্তিক পরিবর্তন অনুসরণ করে। মাসের শুরুতে প্রকাশিত হয়।
- আইএফপিআরআই-এর ফুড সিকিউরিটি পোর্টাল: খাদ্য পণ্য, সার এবং জ্বালানির দামের অস্থিরতা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী তথ্য প্রদান করে, এবং ভুট্টা, চাল, সোয়াবিন, হার্ড ও সফট গমের দাম দেখায়। সাব-সাহারান আফ্রিকার জন্য ফসলের বিস্তৃত তালিকা আছে, আর এশিয়া-প্যাসিফিকের জন্য সীমিত তালিকা। কখনও কখনও ওয়েবসাইটটি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে।
- ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কমোডিটি মার্কেট ডেটা: খাদ্য ও কৃষি পণ্যের দাম মাসিকভাবে আপডেট করে, এবং সহজ তুলনার জন্য বার্ষিক, ত্রৈমাসিক ও মাসিক গড় দেখায়। এতে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত।
- আফ্রিকান মার্কেট অবজারভেটরি (এএমও) প্রাইস ট্র্যাকার: পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় নির্বাচিত প্রধান খাদ্যপণ্যের মূল্যের মূল প্রবণতা সংক্ষেপে দেখানোর জন্য মাসিক মূল্য ট্র্যাকার। আপডেট পাওয়ার জন্য এখানে নিবন্ধন করতে পারেন।
-
- এজিআরএ ফুড সিকিউরিটি মনিটর (আফ্রিকা)
- আছিয়ান ফুড সিকিউরিটি ইনফরমেশন সিস্টেম (এএফএসআইএস): দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে—অ্যাগ্রিকালচারাল কমোডিটিজ আউটলুক (স্টক, উৎপাদন স্তর, আমদানি ইত্যাদি) এবং আরলি ওয়ার্নিং ইনফরমেশন (প্রধান খাদ্যপণ্যের ওপর)। দেশভিত্তিক উৎপাদন তথ্যও আছে। তবে ওয়েবসাইটটি মাঝেমাঝে ঠিকমতো কাজ নাও করতে পারে।
- ইউরোস্ট্যাট ফুড প্রাইস মনিটরিং টুল: মাসিকভাবে ভোক্তা ও উৎপাদক মূল্য সূচকের তথ্য প্রদান করে, যা সাধারণ “খাদ্য” বা আপনার পছন্দের ২৬টি খাদ্যশ্রেণির মধ্যে থেকে দেখা যায়। লক্ষ্য করুন: এটি মূল্যের পরিবর্তন নয়, বরং সম্পদের সামগ্রিক কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করে এমন সূচক দেখায়।
- ইউএসডিএ ডেটা প্রোডাক্টস | ইকোনমিক রিসার্চ সার্ভিস: খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কিত ডেটাসেটসমূহ
মানবিক তহবিল ও ব্যয় পর্যবেক্ষণের উৎসসমূহ
- ফাইন্যান্সিং ফ্লোস অ্যান্ড ফুড ক্রাইসিস: একটি বার্ষিক প্রকাশনা যা দেখায় কত অর্থ এবং কোথায় পাঠানো হচ্ছে খাদ্য সংকট মোকাবেলার জন্য, যা ভৌগোলিক অঞ্চল, প্রাপক দেশ এবং খাত অনুযায়ী সাজানো হয়।
- রিলিফওয়েব হলো জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী অফিস (ওসিএইচএ) পরিচালিত একটি তথ্য সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্ম। এটি বিশ্বজুড়ে চলমান বিভিন্ন মানবিক সংকট সম্পর্কে প্রতিবেদন, প্রেস বিজ্ঞপ্তি, মানচিত্র এবং ইনফোগ্রাফিক প্রদান করে।
- ওসিএইচএ ফিনান্সিয়াল ট্র্যাকিং সার্ভিস বিশ্বব্যাপী মানবিক সংকটের তহবিল প্রবাহের তথ্য প্রদান করে। এটি যে প্রতিটি দেশ পর্যবেক্ষণ করছে, সেখানে তহবিলের অগ্রগতি, অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং কোথায় খরচ হচ্ছে তা ট্র্যাক করে।
নির্বাচিত আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা
- অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার
- এগ্রা (পূর্বে আলায়েন্স ফর আ গ্রিন রেভোলিউশন ইন আফ্রিকা)
- ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল
- ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ড
- কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল
- ড্যানিশ রেফিউজি কাউন্সিল
- গ্লোবাল অ্যালায়েন্স এগেইনস্ট হাঙ্গার অ্যান্ড পোভার্টি
- হিফার ইন্টারন্যাশনাল
- হাঙ্গার প্রজেক্ট
- ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস
- ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট, সিজিআইএআর-এর ১৪টি বিশ্ব কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের নেটওয়ার্কের অংশ
- মেডিসিন সঁ ফ্রন্টিয়ারেস
- মার্সি কোরপস
- নরওয়েজিয়ান রেফিউজি কাউন্সিল
- অক্সফ্যাম ইন্টারন্যাশনাল
- পার্টনারস ইন হেলথ
- রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল
- সেভ দ্য চিলড্রেন
- হাই হাঙ্গার
- ওয়ার্ল্ড ভিশন
গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের উৎসসমূহ
- ইনভেস্টিগেটিং ওয়ার ক্রাইমস: স্টারভেশন
- রিসোর্স অন ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার
- ইনভেস্টিগেটিং ফুড সাপ্লাই অ্যান্ড এগ্রিকালচার অ্যামিড ক্লাইমেট চেঞ্জ
- রিসোর্সেস ফর ফাইন্ডিং অ্যান্ড ইউজিং স্যাটেলাইট ইমেজেস
থিন লেই উইন হলেন লাইটহাউস রিপোর্টসের ফুড সিস্টেমস নিউজরুমের প্রধান রিপোর্টার এবং তার ফুড সিস্টেমস নিউজলেটার থিন ইনক পরিচালনা করেন। তিনি মিয়ানমার নাউ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা, একটি দ্বিভাষিক সংবাদ সংস্থা, এবং দ্য কাইট টেলস-এরও, যা মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে অলাভজনক গল্প বলার প্রকল্প।
ডেবোরাহনেলসন একজন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক এবং ফিলিপ মেরিল কলেজ অব জার্নালিজম, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড-এর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অধ্যাপক। তিনি রয়টার্স-এর একটি আন্তর্জাতিক দলের অংশ ছিলেন, যারা ২০২৪ সালে প্রকাশিত দ্য স্টারভিং ওয়ার্ল্ড শিরোনামের একটি সিরিজ তৈরি করে, যেখানে বৈশ্বিক ক্ষুধা নিরসন সংকট নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।