ইমেজ: শাটারস্টেক
কীটনাশকের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধান করতে ইচ্ছুক সাংবাদিকদের জন্য কিছু পরামর্শ
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
বিশ্বজুড়ে যেসব সাংবাদিক কীটনাশক ও ক্যানসারের উচ্চ হারের মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করতে যান, তারা প্রায়ই একটি পরিচিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। সহসম্পর্ক (কোরিলেশন) ও কার্যকারণ (কজেশন) বিষয়ক সমস্যা— অর্থাৎ দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক থাকলেই যে একটির কারণে অন্যটি ঘটছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
যদিও গবেষণায় নিশ্চিতভাবেই দেখা গেছে, কিছু আগাছানাশক ও কীটনাশক ক্যানসার সৃষ্টিকারী। তবে এই বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন এমন অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট কৃষি কীটনাশকের সঙ্গে ক্যানসার, স্নায়বিক রোগ বা জন্মগত ত্রুটির মতো নির্দিষ্ট বিষয়ের শতভাগ নিশ্চিত যোগসূত্র স্থাপন করাটা অত্যন্ত কঠিন। এদিকে, কৃষি-রাসায়নিক কোম্পানি এবং তাদের লবিস্টরা প্রায়ই নিজেদের পণ্যকে রক্ষা করতে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। তারা এমন সব দাবি তোলে, যা শুনতে বৈজ্ঞানিক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
এদিকে, সম্প্রতি পেরুতে পরিচালিত এক গবেষণায় পরিবেশগত তথ্যের সঙ্গে ক্যানসারে আক্রান্ত দেড় লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভিন্ন ধরনের কীটনাশকের সম্মিলিত প্রভাব মানবদেহের কোষে তাদের ক্ষতিকর প্রভাব আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
তবুও, গত মাসে অনুষ্ঠিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদক ও সম্পাদকদের সম্মেলনে (আইআরই ২০২৬) কীটনাশকের সংস্পর্শ নিয়ে ডেটাভিত্তিক অনুসন্ধান বিষয়ক এক আলোচনায় বিশেষজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি প্যানেল আরও বেশি এই ধরনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কারণ আর সম্পর্ক নির্ধারণের জটিলতা এবং টক্সিকোলজি বা বিষবিজ্ঞানের জটিল পরিভাষা মোকাবিলার বিষয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেন। প্যানেল আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন ইনভেস্টিগেট মিডওয়েস্টের প্রধান সম্পাদক বেন ফেল্ডার, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক নাতাশা গিলবার্ট, মিসৌরি স্কুল অব জার্নালিজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক হরভিট এবং ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক প্রতিবেদন উদ্যোগের পরিচালক সিনথিয়া বারনেট।
“ক্যানসার একটি জটিল রোগ। এটি নানা ধরনের পরিবেশগত ও জিনগত কারণে হতে পারে,” বলেন ফেল্ডার। “ক্যানসারের সঙ্গে কৃষি-রাসায়নিকের প্রমাণযোগ্য সম্পর্ক খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। তবুও এ ধরনের অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
গিলবার্ট যোগ করেন, “আপনি কোনো সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে না পারলেও, তার মানে এই নয় যে সেখানে কোনো প্রতিবেদন নেই। মানুষের যৌক্তিক উদ্বেগ, কারা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছে এবং এই ধরনের আরও অনেক বিষয়ও তুলে ধরা যায়।”
ফেল্ডার বলেন, এই ধরনের অনুসন্ধানের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কৃষকদের মুখ খুলতে রাজি করানো। “এর প্রধান কারণ এক ধরনের অপরাধবোধ। বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদনে এসব পণ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক কৃষক মনে করেন, ‘আমার ব্যবহারের কারণেই কি এসব রোগ হয়েছে?’”
রোগ এবং কীটনাশকের সংস্পর্শের মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করা কঠিন হলেও, স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে চারপাশের শক্তিশালী প্রমাণ পাঠকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। এছাড়া, পশ্চিমের অনেক দেশে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করার জন্য অনলাইনে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব তথ্য পেতে সরকারি নথি চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করারও প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া, মহামারী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা-ভূগোলবিদ এবং বিষবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মতো বিজ্ঞানীরা সাধারণত সাংবাদিকদের তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণাদি বুঝিয়ে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
গিলবার্ট বলেন, এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রায়ই ফাঁস হওয়া নথি এবং বিভিন্ন আর্কাইভ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তিনি টক্সিক ডকস ডেটাবেসের কথা উল্লেখ করেন। এটি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউইয়র্ক সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি একটি বিশাল সংগ্রহশালা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাসায়নিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আগে গোপন থাকা বা অভ্যন্তরীণ লাখ লাখ নথি, লবিস্টদের চিঠিপত্র এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান প্রকাশ করা হয়। মার্ক হরভিটের শিক্ষার্থী দলের সঙ্গে যৌথভাবে অনসন্ধানটি পরিচালনা করে ইনভেস্টিগেট মিডওয়েস্ট। প্রতি বর্গমাইলে সবচেয়ে বেশি কীটনাশক ব্যবহার করা হয়—এমন ৫০০টি কাউন্টিতে জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, কাউন্টিগুলোর ৬০ শতাংশেরই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের এমন সব এলাকায়, সেখানে ক্যানসারের হার সর্বোচ্চ। অনুসন্ধানে বলা হয়, এই জনস্বাস্থ্য সংকটকে শুধু অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা উপেক্ষাই করেননি, বরং বিভিন্নভাবে তা টিকিয়ে রাখতেও ভূমিকা রেখেছেন।

ছবি: আইআরই সম্মেলনের উপস্থাপনায় ব্যবহৃত ইনভেস্টিগেট মিডওয়েস্টের একটি স্ক্রিনশট
কীটনাশক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং ‘পেস্টিসাইড ড্রিফট’—অর্থাৎ বাতাস বা অন্য মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কীটনাশকের রাসায়নিক পদার্থের কারণে স্কুল, হ্রদ ও আশপাশের জনবসতিতে যে প্রভাব পড়ে, সে সব প্রতিবেদন ছাড়াও, প্যানেলিস্টরা বলেন, এ ধরনের সম্পর্কভিত্তিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাঠকদের সামনে ধারাবাহিকভাবে তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা। যে বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না সে সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকা এবং শক্তিশালী মানবিক গল্প খুঁজে বের করা।
গিলবার্ট বলেন, পশ্চিমা দেশের বাইরে যেসব দেশে কৃষিখাত বড়—যেমন ভারত ও ব্রাজিল—সেসব দেশে কীটনাশক নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তার মতে, এ ধরনের অনুসন্ধানে কার্যকর প্রতিবেদনের কৌশল বিশ্বের যেকোনো দেশেই কাজে লাগানো সম্ভব।
প্যানেলে অংশ নেওয়া বক্তাদের পরামর্শ
যেসব এলাকায় মানুষের তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সুস্থ থাকার কথা, সেসব জায়গায় ক্যানসারের হার বেশি কি না, তা খুঁজে দেখুন। বক্তারা পরামর্শ দেন, সাংবাদিকদের উচিত আশপাশের শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় ক্যানসারের হার বেশি কি না, তা খতিয়ে দেখা। কারণ, এমন চিত্র সাংবাদিকদের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটি ধারণা রয়েছে যে ধোঁয়া-দূষণে ভরা শহরের তুলনায় গ্রামে বসবাস বেশি স্বাস্থ্যকর। তাই এ ধরনের বৈপরীত্য তারা সহজেই বুঝতে পারেন।
ক্যানসারের সম্ভাব্য কারণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে হরভিট বলেন, “বিষয়টি আমাকে সত্যিই অবাক করেছে। মিসৌরির গ্রামীণ কাউন্টিগুলোতে শহুরে কাউন্টিগুলোর তুলনায় ক্যানসারের হার বেশি। অথচ এমনটা হওয়ার কথা নয়।”
পরামর্শ: বারনেট জানান, স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ট্রুভেটার বিশাল ডেটাবেসে ১৩ কোটি মার্কিন নাগরিকের পরিচয়-গোপন রাখা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বিভাগের মিডিয়া দলের কাছে অনুরোধ করলে তারা সাংবাদিকদের সক্রিয়ভাবে সহায়তা করে।
যেসব দেশ নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষা দেয় কিন্তু তাদের নিষিদ্ধ রাসায়নিক অন্য দেশে রপ্তানি করে, সেসব দেশের দিকে নজর দিন। বারনেট বলেন, ইমপোর্টজিনিয়াস-এর মতো বাণিজ্যিক ডেটাবেস ব্যবহার করে নীতিগত দ্বিমুখিতার চমকে দেওয়ার মতো উদাহরণ পাওয়া যেতে পারে। যেমন, কিছু কিছু দেশ জানে যে নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক আছে যা তাদের নিজেদের দেশে ব্যবহারের জন্য অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ, তবুও তারা সেগুলো অন্য দেশে রপ্তানি করে।
তিনি বলেন, “যেসব দেশ নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় প্যারাকোয়াট (৭৪টি দেশে নিষিদ্ধ একটি আগাছানাশক) নিষিদ্ধ করেছে—যেমন চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু একই সঙ্গে বিশ্বের যেসব দেশে এখনো এটি নিষিদ্ধ হয়নি, সেখানে তারা এটি রপ্তানি করেছে। তাই এইসব দেশের দিকে নজর দিন। সম্ভাব্য ক্ষতির প্রভাব খুঁজে দেখার জন্য আফ্রিকার অনেক দেশও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।”
কীটনাশকের সংস্পর্শের মাত্রা নিরূপণে সিলিকন রিস্টব্যান্ড ব্যবহারের কথা বিবেচনা করুন। গত বছর একটি গবেষণার অংশ হিসেবে নেদারল্যান্ডসে শত শত স্বেচ্ছাসেবী এক সপ্তাহ ধরে খামারের বিভিন্ন দূরত্বে অবস্থান করে স্প্রে করার সময় সাধারণ সিলিকন রাসায়নিক-শনাক্তকারী রিস্টব্যান্ড পরেছিলেন। এর মাধ্যমে তারা কী পরিমাণ রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসেছেন, তা পরিমাপ করা হয়।
এ নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবীর রিস্টব্যান্ডে গড়ে ২০ ধরনের কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আর অজৈব পদ্ধতিতে চাষ করা কৃষকদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা গড়ে ৩৬টি। খামার থেকে অনেক দূরে বসবাসকারী মানুষের রিস্টব্যান্ডেও বিভিন্ন ধরনের কৃষি-রাসায়নিক শনাক্ত হয়েছে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ডিডিটি ও ডিলড্রিনের মতো নিষিদ্ধ রাসায়নিকের উপস্থিতিও ছিল।
একইভাবে, ২০২৪ সালে ইউনিভিশন নোতিসিয়াস পাঁচ দিন ধরে আপেল, কুমড়া ও ব্লুবেরি সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ১০ জন খামারশ্রমিকের হাতে রাসায়নিক-শনাক্তকারী রিস্টব্যান্ড পরিয়ে একটি অনুসন্ধান চালায়। এতে ১৮ ধরনের কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এর মধ্যে ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে পরিচিত কয়েকটি আগাছানাশক এবং দুটি নিষিদ্ধ রাসায়নিকও ছিল। বারনেট বলেন, “এটি আমার সবচেয়ে পছন্দের অনুসন্ধানগুলোর একটি।”
তিনি আরও পরামর্শ দেন, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করার পর সাহসী সাংবাদিকেরা চাইলে অনুসন্ধানের নির্দিষ্ট এলাকায় নিজেরাও এমন রিস্টব্যান্ড পরে দেখতে পারেন। এতে খামারের সীমানার বাইরেও কৃষি-রাসায়নিক কতটা বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরা সম্ভব।

ইমেজ: স্ক্রিনশট, ইউনিভিশন
অনুসন্ধান শুরুর আগে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করুন এবং পাঠকদের মতামত বা অভিজ্ঞতা জানতে একটি প্রশ্নপত্র যুক্ত করুন। ফেল্ডার বলেন, কীটনাশকের সংস্পর্শের সঙ্গে নিজেদের ক্যানসারের সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন—এমন মানুষের খোঁজ পাওয়ার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো অনুসন্ধান শুরুর আগেই বিষয়টি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা। ডেটার্যাপার বা ফ্লারিশ-এর মতো টুল ব্যবহার করে সহজ ইন্টারঅ্যাকটিভ ভিজ্যুয়াল তৈরি করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে পাঠকদের জন্য একটি অনলাইন প্রশ্নপত্রের লিংক যুক্ত করলে তাদের অভিজ্ঞতা জানা ও তথ্য সংগ্রহ করা সহজ হয়।
ইনভেস্টিগেট মিডওয়েস্টের ওই প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে ফেল্ডার বলেন, “প্রথমে আমরা ক্যানসার ও কৃষি-রাসায়নিকের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে কয়েকটি ছোট প্রতিবেদন প্রকাশ করি। পাশাপাশি, পাঠকদের নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাতে অনলাইনে গুগল ফর্মও প্রকাশ করি।” তিনি আরও বলেন, “আমরা ফেসবুকেও চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু প্রতিবেদনের সঙ্গে ফর্ম যুক্ত করলে সম্ভাব্য তথ্যসূত্র খুঁজে পেতে সেটি প্রায় ১০ গুণ বেশি কার্যকর হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “অনুসন্ধান শুরুর আগে পাঠকদের উদ্দেশে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করুন। যেমন, ‘আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ কি এমন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন, যা আপনার মতে কীটনাশকের ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত?’”
জিনগত কারণের সম্ভাবনা কম—এমন তথ্য খুঁজে দেখুন। ফেল্ডার বলেন, ক্যানসারে আক্রান্ত অনেকেরই জিনগত ঝুঁকি আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। তিনি এমন একজন সোর্সের উদাহরণ দেন, যিনি কীটনাশকের সংস্পর্শে এসেছিলেন এবং ক্যানসারে আক্রান্ত হন। পরে তার ৮১টি ক্যানসার-সম্পর্কিত জিন পরীক্ষা করে কোনো উল্লেখযোগ্য জিনগত ঝুঁকি পাওয়া যায়নি।
বারনেট বলেন, “মহামারিবিদ্যার গবেষণায় কীটনাশকের সঙ্গে পারকিনসন রোগের শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অথচ পারকিনসন রোগের মাত্র ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে জিনগত কারণের ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু গবেষণার অর্থায়নের বেশির ভাগই এখনো জিনগত বিষয় নিয়েই হচ্ছে।”
এ ধরনের প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ—এর মধ্যে আপনার সোর্স চিকিৎসকরাও রয়েছেন। তথ্যভিত্তিক বিশেষজ্ঞ মতামত “পিয়ার-রিভিউড” এর সমান গুরুত্ব বহন না করলেও, ফেল্ডার বলেন, রোগী এবং তাদের চিকিৎসকদের কাছ থেকে রোগের সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে মতামত নেওয়াটা মূল্যবান হতে পারে। তবে সেগুলো যে মতামত, তা পাঠকদের কাছে স্পষ্ট করে তুলে ধরতে হবে।
ফেল্ডার বলেন, “সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল খুবই সহজ: ‘আপনি কেন মনে করেন আপনার ক্যানসারের কারণ কীটনাশক?’ এরপর আমরা তাদের কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, রোগীর অনুমতি থাকলে তার চিকিৎসক বা ক্যানসার বিশেষজ্ঞের সঙ্গে হওয়া কথোপকথনও প্রতিবেদনের জন্য সহায়ক হতে পারে। অন্তত এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরা সম্ভব।
একজন সোর্স ফেল্ডারকে বলেন, “আমার ক্যানসার বিশেষজ্ঞ আমাকে সরাসরি বলেছেন, কৃষি-রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার কারণেই আমার ক্যানসার হয়েছে।”
বিজ্ঞানী ও একাডেমিক সূত্রের ওপর নির্ভর করুন। গিলবার্টের পরামর্শ, “বৈজ্ঞানিক গবেষণা কীভাবে পড়তে হয় এবং সেখান থেকে তথ্য কীভাবে বুঝতে হয়, সে বিষয়ে নিজেকে দক্ষ করে তুলুন।”
তিনি বলেন, অনেক সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজেদের পণ্য রক্ষার জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্যকে বিকৃত বা ভুলভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। “তাই বিজ্ঞান আসলে কী বলছে, তা যদি আপনি না বোঝেন, তাহলে এই অপব্যবহার ধরতে পারবেন না। বিজ্ঞানীরা সাধারণত সাংবাদিকদের সময় দিতে এবং গবেষণার বিষয়গুলো ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দিতে খুবই আগ্রহী থাকেন।”
গবেষণাসংক্রান্ত বিষয় বোঝার দক্ষতা বাড়াতে সাংবাদিকদের জন্য গিলবার্ট কয়েকটি উপযোগী সূত্রের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- দ্য ওপেন নোটবুক-এর স্পটিং শেডি স্ট্যাটিসটিকস
• গবেষণাসংক্রান্ত পরিভাষা বোঝার জন্য দ্য জার্নালিস্টস রিসোর্স-এর মিডিয়া প্রাইমার
• রিসার্চগেট-এর গবেষণাপত্র অনুসন্ধান ড্যাশবোর্ড
• এসেনশিয়াল স্ট্যাটিসটিকস ফর সায়েন্স রাইটার্স
যা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না, সেটিও পাঠকদের স্পষ্ট করে জানান। ফেল্ডার জোর দিয়ে বলেন, “আপনি যা জানেন, তা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পাঠকদের বলুন। আবার যেটুকু এখনো জানা যায়নি বা শতভাগ প্রমাণ করা সম্ভব নয়, সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে দ্বিধা করবেন না।”
হরভিটও বলেন, সাংবাদিকদের এমন সোর্সদের বাদ দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে, যাদের ক্যানসারের ধরন অনুসন্ধানের বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, “আপনার সোর্সরা কী ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন, আশপাশে কী ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে, এবং এ দুটির মধ্যে সত্যিই কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা যাচাই করুন। কারণ, অনেকেই আমাদের কাছে এসেছিলেন, কিন্তু আমরা তাদের তথ্য ব্যবহার করতে পারিনি। কারণ, তারা যে পরিবেশে বসবাস করতেন, তার সঙ্গে তাদের দাবির মিল পাওয়া যায়নি।”
মামলা-সংক্রান্ত নথি ও জবানবন্দির খোঁজ করুন। গিলবার্ট বলেন, “বিচার শুরুর আগে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের (প্রিট্রায়াল ডিসকভারি) নথিগুলো যেন গুপ্তধনের মতো।” হরভিট যোগ করেন, “আইনসভার শুনানির প্রতিলিপি খুবই মূল্যবান। এ ছাড়া মামলা-সংক্রান্ত নথি এবং সাক্ষীদের জবানবন্দিও (ডিপোজিশন) গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হতে পারে।”
শিরোনামে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নাম ব্যবহার করুন। ফেল্ডার বলেন, “আমাদের মূল প্রতিবেদনটি ছিল জাতীয় পর্যায়ের ডেটার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছে নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রতিবেদনগুলো। শুধু সেই এলাকার নাম উল্লেখ করাই দারুণ কাজ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “শিরোনামে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার নাম যোগ করতে পারলে—যেমন, ‘পূর্ব নর্থ ডাকোটায় ক্যানসার ও কীটনাশক ব্যবহারের উচ্চ হার’—তা পাঠকের দৃষ্টি সহজেই আকর্ষণ করে এবং মানুষ বেশি সাড়া দেয়।”
তথ্যসূত্র খুঁজতে ভিন্ন উপায় ব্যবহার করুন—যেমন, অনলাইন ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম গোফান্ডমি বা বা ক্যানসার রোগীদের সহায়তাকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। হরভিট বলেন, তার প্রকল্পে রোগীদের খুঁজে পেতে গোফান্ডমি কার্যকর হয়নি। তবে আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েকজনের মত ছিল, অন্য পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে।
তিনি বলেন, “তথ্যসূত্র খুঁজতে গোফান্ডমি ব্যবহার করার একটি দারুণ ধারণা আমার ছিল। কিন্তু সেটি একেবারেই কাজ করেনি। ক্যানসার রোগীদের সহায়তা করে এমন স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আমরা যেভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে খুঁজে পেয়েছি। আমরা এমন দুটি ছোট অলাভজনক প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাই, যারা শুধু ক্যানসার রোগীদের কেমোথেরাপির জন্য যাতায়াতের খরচ জোগাতে অর্থ সংগ্রহ করে। এসব প্রতিষ্ঠান রোগীদের চেনে, তাদের গল্পও জানে।”
রিসোর্স
যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা সাংবাদিকদের জন্য প্যানেলের সদস্যরা নিচের ডেটাবেস ও তথ্যসূত্রগুলো ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
- কীটনাশক–সংক্রান্ত তথ্য: ইউএসজিএস-এর এস্টিমেটেড অ্যানুয়াল অ্যাগ্রিকালচারাল পেস্টিসাইড ইউজ ডেটাবেস, যেখানে নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগ অনুযায়ী তথ্য খোঁজা যায়।
• হালনাগাদ স্বাস্থ্য–পরিসংখ্যান: সিডিসির স্ট্যাটিসটিকস রিলিজ ক্যালেন্ডার।
• কাউন্টিভিত্তিক ক্যানসারের হার: যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্টি অনুযায়ী ক্যানসারের হারসংক্রান্ত ডেটাবেস।
• কাউন্টিভিত্তিক ফসলের তথ্য: ইউএসডিএ ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস সার্ভিসের ক্রপস বাই কাউন্টি।
• টক্সিক ডকস: করপোরেট নথির ডেটাবেস।
• ইন্ডাস্ট্রি ডকুমেন্টস লাইব্রেরি: সান ফ্রান্সিসকোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত শিল্প-সংক্রান্ত নথির সংগ্রহশালা।

রোয়ান ফিলিপ জিআইজেএনের গ্লোবাল রিপোর্টার এবং ইমপ্যাক্ট এডিটর। তিনি আগে দক্ষিণ আফ্রিকার সানডে টাইমসের প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন। বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে তিনি বিশ্বের দুই ডজনেরও বেশি দেশ থেকে সংবাদ, রাজনীতি, দুর্নীতি এবং সংঘাত নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন।