ছবি: জিআইজেএন, ইউটিউব
এআই’র দ্বিচারিতা: অপব্যবহার ও ভুয়া তথ্যের ঝুঁকি নাকি বার্তাকক্ষ ও রিপোর্টারদের জন্য শক্তিশালী হাতিয়ার
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ডিউন। যেখানে দেখা যায় পল আট্রিডেস ‘স্পাইস’ নামের এক বিশেষ উপাদানের শক্তি ব্যবহার করে একটি সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ জানান। যে সাম্রাজ্যের আধিপত্য টিকে আছে ‘স্পাইস’ নামের এক মূল্যবান সম্পদের ওপর। ওই সাম্রাজ্য স্পাইসকে কেবল নিজেদের ক্ষমতা আর রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। তার মানে যে স্পাইস সাম্রাজ্যটিকে টিকিয়ে রেখেছিল গল্পের নায়ক পল সেই স্পাইসকে ব্যবহার করেই শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে ভেঙে দিয়েছিলেন। মূলত যাদের বিরুদ্ধে পলের লড়াই তারা এই স্পাইস নিয়ে ব্যবসা করেছিল।
এমনই একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা এখন আধুনিক বার্তাকক্ষগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) এবং এই ধরনের প্রযুক্তি—যা দৈনন্দিন জীবনে অনেকটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো খুব দ্রুত সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। বার্তাকক্ষগুলো প্রায়ই অসংখ্য ডেটা বিশ্লেষণ এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিবেদনকে আরও শক্তিশালী করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও এলএলএম ব্যবহার করছে। মজার ব্যাপার হলো, অনেক সময় এই অনুসন্ধানের লক্ষ্যই থাকে ওই কোম্পানিগুলো, যারা নিজেরাই এআই তৈরি করছে, আর তা থেকে মুনাফা লুটছে।
কোড ফর আফ্রিকার এআই নিউজরুম ইনিশিয়েটিভের প্রধান আথান্দিওয়ে সাবা, লাতিন আমেরিকান সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (এল ক্লিপ)-এর সম্পাদক ও ডিজিটাল গবেষক হোসে লুইস পেন্যারেডন্ডা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও “এম্পায়ার অব এআই”–এর লেখিকা ক্যারেন হাও—এই বৈপরীত্য নিয়ে আলোচনা করতে জিআইজেসি২৫–এর একটি সেশনে অংশ নেন। সেশনটি সঞ্চালনা করেন পুলিৎজার সেন্টারের এআই অ্যাকাউন্টেবিলিটি নেটওয়ার্কসের প্রধান জোয়ানা কাও।
এআই–এর অর্থ স্পষ্ট করা
আলোচকরা শুরুতেই এআইয়ের একটি গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা করেন। “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” শব্দটি ১৯৫০–এর দশকের শেষের বছরগুলো থেকেই বেশ প্রচলিত। তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলতে এমন যন্ত্রকে বোঝাত, যা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে এবং ডেটার ভিত্তিতে প্যাটার্ন চিনে মানুষের চিন্তাভাবনাকে অনুকরণ করতে পারে। তবে সাম্প্রতিক এর অর্থ খানিকটা বদলে গেছে। এদিকে, জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় ২০২০-এর দশকে। এটি বিপুল পরিমাণ প্রশিক্ষণ ডেটা থেকে পরিসংখ্যানগত প্যাটার্ন শিখে মানুষের সৃজনশীলতার মতো করে নতুন লেখা, ছবি বা কোড তৈরি করতে পারে। তবে এখন জেনারেটিভ এআইকেই মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে বোঝানো হচ্ছে।
তবে হাও সাংবাদিকদের এই অর্থগত পরিবর্তনের পেছনের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে গভীর ভাবে ভাবতে বলেন। কারণ, এই পরিবর্তনটি “বিগ টেক” বা বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্বার্থকে সুরক্ষিত করে। বিশেষ করে যাদের ব্যবসায়িক মডেল গড়ে উঠেছে দ্রুত প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ওপর। যা পরিবেশের ক্ষতি ও গভীর সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, এআই মানেই “বৃহৎ পরিসরের জেনারেটিভ এআই” হতে হবে—এমনটা নয়।
হাও ব্যাখ্যা করেন, “আমি ‘এআই’ শব্দটিকে ‘পরিবহন’ শব্দটির মতো করে ভাবতে পছন্দ করি। আমার মনে হয় এটিই সবচেয়ে কার্যকর তুলনা। পরিবহন বলতে সাইকেল থেকে শুরু করে রকেট—যেকোনো কিছু বোঝানো যায়। এগুলো সবই আলাদা আলাদা প্রযুক্তি যা আমাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। কিন্তু এগুলোর গঠন আলাদা। খরচ ও সুবিধার মধ্যেও অনেক পার্থক্য আছে।” তিনি আরও বলেন, “এআই-ও ঠিক একই রকম। আমি জেনারেটিভ এআইকে (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন একটি ধরন, যা ব্যবহারকারীর নির্দেশ অনুযায়ী নতুন কিছু তৈরি করতে পারে। এটি শুধু তথ্য বিশ্লেষণ করে না, বরং মানুষের মতো করে নতুন কন্টেন্ট তৈরি করে) এআই জগতের ‘রকেট’ মনে করি, কারণ এটি তৈরি করা সবচেয়ে ব্যয়বহুল। আমরা নিশ্চয়ই চাইব না যে রকেট সবার হাতে হাতে থাকুক এবং তারা যা খুশি তাই করতে এটি ব্যবহার করুক।”
হাও যোগ করেন, এমন কিছু ছোট এবং সুনির্দিষ্ট এআই টুল আছে যেগুলোকে এআই-এর ‘সাইকেল‘ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের হাতে যেসব বিনামূল্যের জেনারেটিভ এআই তুলে দিচ্ছে, তার তুলনায় এই টুলগুলো অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। প্রশিক্ষণের জন্যও এতে অনেক কম ডেটা প্রয়োজন এবং এগুলোর সামাজিক ঝুঁকিও কম। উদাহরণ হিসেবে তিনি ছবিতে বস্তু শনাক্ত করার নির্দিষ্ট কিছু টুল অথবা ডিপমাইন্ডের প্রোটিন ফোল্ডিং এআই সিস্টেমের কথা উল্লেখ করেন, যার জন্য গবেষকরা রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
তবে আমাদের সমাজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিধি কমিয়ে এনে একে নিজেদের প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজছে—কিংবা আদৌ ব্যবহার করতে চায় কি না সেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—তখন বার্তাকক্ষগুলোর দায়িত্ব হলো এই তথাকথিত ‘রকেট’ এবং ‘রকেট নির্মাতাদের’ জবাবদিহিতার আওতায় আনা। তাই বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যখন এআইয়ের এই ‘রকেট পদ্ধতি’কে আরও বেগবান করছে, তখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের মূলত কী ধরনের প্রশ্ন করা উচিত?
এআইয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা
‘কোড ফর আফ্রিকা’-র সাবা জোর দিয়ে বলেছেন সাংবাদিকদের এখন থেকেই কিছু মৌলিক প্রশ্ন করা শুরু করতে হবে: এআই ব্যবহার করার সময় আপনি যে তথ্যগুলো নিয়ে কাজ করছেন, সেগুলো কোথায় থাকছে? সেই তথ্যগুলো আসলে আসছে কোথা থেকে? এই প্রযুক্তিটি কীভাবে তৈরি করা হয়েছে? আর এই টুলের পেছনে থাকা অ্যালগরিদমগুলোই বা কী?
এই প্রশ্নগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো এমন একটি প্রযুক্তিকে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা, যেটিকে আমরা খুব সহজেই স্বাভাবিক বা সাধারণ মনে করে গ্রহণ করে ফেলি। সাবা ব্যাখ্যা করেন, তার দেখা সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো সাধারণ মানুষ, এমনকি সাংবাদিকদেরও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেপথ্যের সমস্যাগুলো বুঝতে সাহায্য করার দিকটি। এআই যখন মানুষের লেখা সম্পাদনা করে দেয় বা মজার মিম তৈরি করে জীবনকে কিছুটা সহজ বা আনন্দদায়ক করে তোলে, তখন এর বাইরের ঝুঁকিগুলো দেখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আসল চ্যালেঞ্জ হলো, উপরে তোলা প্রশ্নগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ—সেটি সবাইকে বুঝিয়ে বলা। এবং কেন সেই প্রশ্নগুলোর কিছু উত্তর আমাদের থামতে বাধ্য করবে এবং হাওয়ের দেওয়া সেই ‘রকেট’-গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাবে।
এআই যে তথ্য নিয়ে কাজ করে তা বিশাল ডেটা সেন্টারে সংগ্রহ বা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এটি করতে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি। এআইয়ের এই তথ্য আসে বড় পরিসরে সংগ্রহ করা প্রশিক্ষণ ডেটা থেকে। যেখানে অনেক সময় কপিরাইট ও গোপনীয়তা আইন মানা হয়নি। উন্নয়নশীল দেশের কম মজুরির শ্রমের ওপর নির্ভর করার ঘটনাও দেখা গেছে। এআই তৈরি হয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী ও উন্নত গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট জমা করে। এ কারণেই গ্রাফিক্স প্রসেসিং চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া এআই প্রযুক্তির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আর এসব কিছুর জন্য নিয়মিত বিরল খনিজের সরবরাহেরও প্রয়োজন হয়। এআই তৈরিতে যে অর্থ ও সম্পদ দরকার, সেগুলো আসে বড় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেই। ওপেনএআইয়ের ক্ষেত্রে যেমন মাইক্রোসফট। এআইকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন পড়ে। এই চাপের কারণেই আংশিকভাবে মাইক্রোসফটের বিনিয়োগ পাওয়ার জন্য একসময় নিরাপদ ওপেন সোর্স প্রযুক্তি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে শুরু করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই পরে মুনাফাভিত্তিক বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। এআইয়ের পেছনের অ্যালগরিদম শুরুতে কিছুটা বোঝা গেলেও, শেষ পর্যন্ত এটি কীভাবে কাজ করে তা পুরোপুরি পরিষ্কার থাকে না। প্রোগ্রামাররা এর কাঠামো ও শেখার লক্ষ্য ঠিক করেন। কিন্তু বিপুল ডেটা থেকে শেখার ফলে এমন জটিল ফল তৈরি হয়, যা সহজভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাই জেনারেটিভ এআই এখন মূলত একটি “ব্ল্যাক বক্স”—অর্থাৎ, ভেতরে কীভাবে কাজ হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না।
যা সাবার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার একটি উপায় মাত্র। সাংবাদিকরা এর আরও অনেক দিক খুঁজে পাবেন। কারণ, এই বিষয়গুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলেই বড় বড় কোম্পানির আইনি বাধ্যবাধকতা, বিনিয়োগকারীদের নানা পরিকল্পনা, পরিবেশের ক্ষতি এবং নৈতিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বেরিয়ে আসবে। বিশেষ করে, যে প্রযুক্তি খোদ নির্মাতারাও পুরোপুরি বোঝেন না। সেটি শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করতে দেওয়া কতটা নৈতিক—তা নিয়ে বড় ধরনের অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে।
সাবা তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কিভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের বোঝার আগেই ভ্রান্ত তথ্য ও ঘৃণা ছড়াচ্ছে। যেমন আফ্রিকার সেই দেশগুলো—যেখানে ভ্রান্ত তথ্যের কারণে সরকার অস্থিতিশীল হয়ে গেছে। আর ঠিক ওই দেশগুলোতেই পাওয়া যায় এআই তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ।
সাবা সতর্ক করে বলেন, “এভাবেই আপনারা বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এসব অতিপ্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদের একটি গভীর সংযোগ দেখতে পাবেন। বর্তমানে বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তী নেতা ইব্রাহিম ত্রাউরেকে নিয়ে একটি বিশাল প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সেখানে এমন অনেক ছবি এবং ভিডিও আছে—যেগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি। যেখানে তাকে একজন অসাধারণ নেতা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু এই ভিডিওগুলোতে কোনো প্রকার সতর্কবার্তা বা ওয়াটারমার্ক নেই যা দেখে বোঝা যাবে যে এগুলো কৃত্রিম। আর এই তথ্যগুলো আমাদের দেখা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।”
হোসে লুইস পেন্যারেডন্ডা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও দেখেছেন। তার মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিতর্কগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো এখানেই ঠিক হয়। তাই তিনি সাংবাদিকদের নিজের কাছে এই প্রশ্নগুলো করতে বলেছেন: প্রযুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হচ্ছে? এসব আলোচনায় কারা কথা বলছে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—কারা কথা বলছে না (অর্থাৎ কাদের মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে)?
এআইয়ের প্রভাব নিয়ে আরও ব্যাপক অর্থে পেন্যারেডন্ডা কিছু বড় প্রশ্ন তোলার পরামর্শ দিয়েছেন: কর্মসংস্থানের ওপর এআইয়ের প্রভাব কী? এটি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে? যারা এসব সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ কেন কথা বলছেন না? তারা কি ভীত? নাকি এআই তাদের কীভাবে প্রভাবিত করছে সে সম্পর্কে তাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য নেই? এআই নিয়ে কী ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে? এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার হাতে? যদি কিছু ভুল হয়ে যায়, তবে তার ঝুঁকি কে বইবে? আর এই সিদ্ধান্তগুলো থেকে শেষ পর্যন্ত লাভবানই বা হচ্ছে কে?
পেন্যারেডন্ডা উল্লেখ করেছেন যে, কলম্বিয়ার কিছু সংবাদমাধ্যম এআই নিয়ে বেশ চমকপ্রদ ও সস্তা প্রচারণামূলক খবর প্রকাশ করছে। তিনি বলেন, “সেখানে এমন সব লেখা দেখা যায় যেখানে দাবি করা হয়—‘এআই বলছে কে সেরা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী’ অথবা ‘এআই বলছে কলম্বিয়া জাতীয় ফুটবল দলের পরবর্তী কোচ কার হওয়া উচিত’।”
কিন্তু পেন্যারেডন্ডা মনে করেন, একজন নিষ্ঠাবান সাংবাদিকের জন্য এখানেই গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, “এআই এই কথাগুলো ‘বলছে’—এর আসল মানে কী এবং কেন বলছে, নিজেকে তা নিয়ে প্রশ্ন করাটাও খুবই জরুরি।” এআই কেন এই ধরনের ফলাফল দিচ্ছে তার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ আছে। আর অবশ্যই, কিছু সংবাদমাধ্যম কেন এই ফলাফলের আড়ালে সত্য বা গুরুত্বের একটি মিথ্যা আবহ তৈরি করতে চাইছে, তার পেছনেও কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অনুসন্ধানের সময় সাংবাদিকরা কীভাবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এআই ব্যবহার করবেন?
কীভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন? যারা এই ‘রকেট’ (এআই) তৈরি করছে, সেই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবেন, যাতে নতুন করে ক্ষতিগ্রস্থ না হতে হয়?

ছবি: স্ক্রিনশট, ক্যারেন হাও
এই বিষয়ে ক্যারেন হাওয়ের উত্তরটিও বেশ কাঠখোট্টা: “আমি আমার কাজে বা ব্যক্তিগত জীবনে কোনোভাবেই জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করি না।” ‘এম্পায়ার অব এআই’ এর এই লেখিকা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কারণ তিনি দেখেছেন এআই ব্যবহার করলে তার কাজের মান আসলে খুব একটা বাড়ে না; যেহেতু তার কাজ মূলত মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং লেখার ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি, এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিয়ে দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান করার পর তিনি নৈতিক অবস্থান থেকেই তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সবশেষে, তিনি একটি বড় গোপনীয়তা ভঙ্গের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন। তার অনুসন্ধানের মাধ্যমে জমানো বিপুল পরিমাণ তথ্য যদি তিনি এই কোম্পানিগুলোরই ডেটা প্রসেসিং টুলের হাতে তুলে দেন, তবে তা হতে পারে চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
সাংবাদিকদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত স্পষ্ট সতর্কবার্তা বা ‘রেড লাইন’ হতে পারে: আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির অনিয়ম বা দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেন, তবে সেই কোম্পানির তৈরি করা কোনো জেনারেটিভ এআই আপনার কাজে ব্যবহার করবেন না।
সাবা শুরু থেকেই জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের নিজেকে প্রশ্ন করতে বলেছেন—এআই ঠিক কোন কাজে আপনাকে সাহায্য করবে এবং কীভাবে এটি আপনার সময় বাঁচাবে? অনেক প্রতিষ্ঠান খসড়া তৈরি, সারসংক্ষেপ করা, অনুবাদ, ট্যাগিং এবং প্রকাশের প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য এআই টুল ব্যবহার করে। কিন্তু মাঝেমধ্যে জেনারেটিভ এআই আপনার কাজকে আরও অদক্ষ বা ধীরগতির করে তুলতে পারে। এর মূল কারণ হলো, এআই আপনাকে যে তথ্যই দিক না কেন, তা পুনরায় যাচাই করতে আপনি বাধ্য। এআই প্রায়ই কাল্পনিক তথ্য দেয় বা ভুল তথ্য তৈরি করে (যাকে বলা হয় হ্যালুসিনেশন)।
সাবা বিভিন্ন বার্তাকক্ষ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যে বিষয়ে সাহায্য করেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো—তারা কেন এবং কী কাজে এআই ব্যবহার করবে তা নির্ধারণ করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনো দলের সঙ্গে কাজ করার সময় তিনি সবসময় প্রথম যে প্রশ্নটি করেন তা হলো: এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আপনাদের নীতিমালাগুলো কী?
পেন্যারেডন্ডা পরামর্শ দিয়েছেন যে, মেসেজিং অ্যাপ বা ক্লাউড সার্ভিসের মতো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা যেমন সতর্কতা অবলম্বন করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বেলাতেও যেন ঠিক তেমনটাই করেন। এই মাধ্যমগুলো কি আদৌ ব্যক্তিগত? তারা আপনার সংবেদনশীল তথ্যগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে? যেসব তথ্য আপনার সংবাদের উৎস বা সোর্সকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, সেগুলো কি এসব প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করাটা দায়িত্বশীল কাজ?
তাই আপনি যদি ক্যারেন হাওয়ের মতো এআইকে সম্পূর্ণ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত না-ও হন, তবুও সতর্ক এবং সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। আপনি শুধু নিজের ঝুঁকি নিয়েই এই তথাকথিত ‘রকেটে’ চড়ছেন না, বরং আপনার কিন্তু আপনার পাঠক এবং সোর্সদের প্রতিও দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করুন।
পুলিৎজার সেন্টারের ক্যারেন হাও এবং জোয়ানা কাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সাংবাদিকদের সহায়তার জন্য বিভিন্ন কোর্স এবং টুলের তথ্য তুলে ধরে অধিবেশনটি শেষ করেন। আপনি হাওয়ের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স স্পটলাইট সিরিজটি এখানে দেখতে পারেন।
সান্তিয়াগো ভিয়া একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, যিনি গত দশকেরও বেশি সময় ধরে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের জন্য লেখালিখি করেছেন। তিনি বর্তমানে কলম্বিয়ায় বসবাস করেন এবং এল এসপেকটাডর–এর জন্য মতামত কলাম লিখছেন। এর আগেও তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, ভেনেজুয়েলা ও ইকুয়েডর থেকে বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন।