প্রবেশগম্যতা সেটিংস

সুদানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংস কার্মকাণ্ড নিয়ে নরওয়ের সংবাদমাধ্যম ভিজি (VG)-র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে খতিয়ে দেখা হয়েছে টিকটকে ওই গোষ্ঠীর পোস্ট করা বিভিন্ন ভিডিও। আবার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটির প্রচার বাড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মকেই। ছবি: স্ক্রিনশট, ভিজি।

লেখাপত্র

বিষয়

মোবাইল বা স্যোশাল মিডিয়ায় দ্রুত স্ক্রল করা পাঠকদের জন্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন উপস্থাপন কৌশল

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সময়সাপেক্ষ। প্রকাশের জন্য একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে মাসের পর মাস নথিপত্র পর্যালোচনা, সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং তথ্য যাচাই করতে হয়। কিন্তু মানুষ যেভাবে সংবাদ খুঁজে পায় এবং পড়ে, তা অধিকাংশ সংবাদকক্ষের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুত বদলে গেছে। এখন সংবাদ মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডে, মোবাইল ফোনে, খণ্ড খণ্ডভাবে এবং অন্যান্য ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকেই পড়া হয়।

এতে করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকরাও একটি বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন। মাসের পর মাস সময় নিয়ে তারা যে জটিল অনুসন্ধানের পেছনে লেগে থেকেছেন, সেই প্রতিবেদনকে কীভাবে এমন একটি পদ্ধতিতে (ফরম্যাটে) উপস্থাপন করা যায়, যা দ্রুত স্ক্রল করে সংবাদ পড়ার অভ্যাস থাকা পাঠকদের জন্য উপযোগী? আর কাজটি করতে গিয়ে কীভাবে প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতাও অক্ষুণ্ণ রাখবেন?

এখন আরও বেশি সংখ্যক সংবাদকক্ষ এটিকে শুধু সংবাদ বিতরণের কাজ হিসেবে নয়, বরং সম্পাদকীয় প্রশ্ন হিসেবেই বিবেচনা করছে। অর্থাৎ, উপস্থাপনার পদ্ধতি নিজেই এখন গল্প বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক উদাহরণগুলো অবশ্য তুলে ধরে, এটি আর কেবল পরীক্ষামূলক পর্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো কীভাবে উপস্থাপন করবেন—তা নিয়ে নতুন করে ভাবা

এই ক্ষেত্রে বাস্তব উদাহরণগুলোর মধ্যে অন্যতম নরওয়ের ভিজিভারডেন্স গ্যাং। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রভাবশালী ট্যাবলয়েড। সংবাদকক্ষটি তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোকে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের জন্য সংক্ষিপ্ত ’ভার্টিক্যাল ভিডিও’ আকারে তুলে ধরেছে। যার লক্ষ্য, এমন তরুণ পাঠকদের কাছে পৌঁছানো, যারা এখন আর প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে গিয়ে সংবাদ পড়তে আগ্রহী না।

কাছাকাছি সময়ের উল্লেখযোগ্য একটি উদাহরণ হলো, ভিজির টিকটক-বোদেলেন (TikTok-bøddelen) অনুসন্ধান। ২০২৫ সালে সুদানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সহিংসতা নিয়ে কাজটি করা। এই অনুসন্ধানে টিকটকের ভিডিওগুলো শুধু গল্পটি প্রচারের মাধ্যম ছিল না; বরং সেগুলোই ছিল তথ্য প্রমাণের একটি অংশও। এই কাজটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে: প্ল্যাটফর্ম-উপযোগী সাংবাদিকতা (প্ল্যাটফর্ম-নেটিভ জার্নালিজম) কেবল বিদ্যমান প্রতিবেদনকে নতুন ফরম্যাটে উপস্থাপনের বিষয় নয়। অনেক সময় যে প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট প্রকাশিত হয়, সেটিই অনুসন্ধানের বিষয়বস্তুর অংশ হয়ে ওঠে।

ইন্টারন্যাশনাল নিউজ মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন (আইএনএমএ)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভিজির স্বল্পদৈর্ঘ্যের সংবাদভিডিওগুলো কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে। এসব ভিডিওর দর্শকের মধ্যে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীর সংখ্যা ছিল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। শুধু এই পরিসংখ্যানটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, ভিজিতে দর্শকদের মন্তব্যকে সম্পাদকীয় প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দর্শকদের প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে পরবর্তী কনটেন্ট তৈরি হয় এবং প্রকাশ হওয়ার পর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের স্থায়ীত্ব আরও দীর্ঘায়িত হয়। অর্থাৎ, একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরই দর্শকের এটির প্রতি আগ্রহ ফুরিয়ে যায় না।

তবে এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। ভিজির এই কৌশল সফল হওয়ার পেছনে শুধু ভালো কনটেন্টই কাজ করেনি। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট অনুযায়ী, নরওয়েতে প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলো ঘিরে জনসাধারণের আস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি। টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মেও আস্থার সেই ধারাবাহিকতা অটুট রয়েছে। টিকটকে নরওয়েজীয় দর্শকেরা এখনো ভিজির মতো ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমের কনটেন্টের প্রতিই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেন। এটি সেইসব দেশের চিত্র থেকে ভিন্ন, যেখানে একই প্ল্যাটফর্মে মূল প্রভাব বিস্তার করেন কনটেন্ট নির্মাতা, ইনফ্লুয়েন্সার বা রাজনীতিকেরা। কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত নর্ডিক এআই ইন মিডিয়া সামিটে ভিজির প্রধান সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গার্ড স্টেইরো বলেন, গল্প বলার মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রেখে পুরোনো উপস্থাপনার ধরন নতুনভাবে ভাবতে হবে। ভিজির জন্য এর অর্থ হলো, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাংবাদিকতাকে নতুনভাবে উপস্থাপন ও বিতরণের উপায় খুঁজে বের করা। এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মের জন্য উপস্থাপনার ধরনগুলো সহজেই গ্রহণ করা যায়। কিন্তু দর্শকের কাছে সেগুলোকে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার যে আস্থা, তা কিন্তু সবসময় সহজেই অর্জন করা যায় না।

আরও বৃহৎ পরিসরে এই পদ্ধতি কীভাবে কার্যকর হতে পারে— ওসিসিআরপির স্ক্যাম এম্পায়ার এবং ব্যাড প্র্যাকটিস প্রকল্পগুলো তা তুলে ধরে। দুটি অনুসন্ধানই একাধিক দেশের অংশীদারদের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছে। এগুলো কোনো একক ধরন (ফরম্যাট) আকারে প্রকাশ না করে, বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন—দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ভিজ্যুয়াল এক্সপ্লেইনার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য সংক্ষিপ্ত টিজার এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপট অনুসারে কাটছাঁট করে উপস্থাপন।

প্রায় দুই টেরাবাইট ফাঁস হওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ২০২৫ সালের স্ক্যাম এম্পায়ার অনুসন্ধানটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক ভিডিও ও ইনফোগ্রাফিকের মাধ্যমেও পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে যারা কখনোই মূল প্রতিবেদনটি পড়তেন না, তারাও এই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। অর্থাৎ, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম সাংবাদিকতাকে ছড়িয়ে দেওয়ার বাড়তি সুযোগ তৈরি করেছে; সাংবাদিকতাকে প্রতিস্থাপন করেনি।

প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব যুক্তি বৈশিষ্ট্য রয়েছে

প্রতিটি প্ল্যাটফর্মই সংবাদকক্ষকে ভিন্ন ধরনের গল্প বলার পদ্ধতির দিকে নিয়ে যায়। আর এই পার্থক্যগুলো শুধু প্রযুক্তিগত নয়।

অন্যদিকে, ইনস্টাগ্রাম কাঠামোবদ্ধ ও ভিজ্যুয়ালনির্ভর গল্প বলার জন্য বেশ কার্যকর। ক্যারোসেল (একটি পোস্টের মধ্যে একাধিক ছবি, গ্রাফিক, স্লাইড বা তথ্য ধারাবাহিকভাবে সাজানো থাকে এবং ব্যবহারকারীরা আঙুল দিয়ে স্ক্রিনের একপাশ থেকে অন্যপাশে বা ওপর-নিচ করা বা সোয়াইপ করে একটির পর একটি দেখতে পারেন) পোস্ট ও রিলসের মাধ্যমে সাংবাদিকেরা একটি জটিল অনুসন্ধানকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে উপস্থাপন করতে পারেন। যেখানে প্রতিটি অংশ আগেরটির ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যায়। এই পদ্ধতিতে পরিবেশ বা আবহ তৈরির চেয়ে স্পষ্টতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর্থিক নেটওয়ার্ক, টাইমলাইন বা বহুস্তরবিশিষ্ট তথ্য নিয়ে করা প্রতিবেদনগুলো এভাবে তুলে ধরলে পাঠকের জন্য বুঝতে পারাটা সহজ হয়।

টিকটকের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হয়। আর এই প্ল্যাটফর্মের গতি ও উপস্থাপনার ধরন প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট বা সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের জন্য খুব বেশি সুযোগ রাখে না। তাই কোনো প্রতিবেদনকে টিকটকের জন্য উপযোগী করতে হলে শুধু দৈর্ঘ্য কমালেই হয় না; গল্প বলার ভঙ্গি, ভাষা এবং গতিকেও বদলে নিতে হয়। তবে কিছু সংবাদকক্ষ মনে করে, এইভাবে মানিয়ে নেওয়ার মূল্য খুব বেশি। তাই তারা এই পথে এগোয়নি। এই অনীহা শুধু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে নয়; বরং এটি প্ল্যাটফর্মের সংস্কৃতি এবং সংবাদকক্ষের সম্পাদকীয় পরিচয়ের মধ্যকার একটি বাস্তব টানাপোড়েনের প্রতিফলন।

গভীরতাপূর্ণ দীর্ঘ সাক্ষাৎকার, তথ্যচিত্র এবং ব্যাখ্যামূলক ভিডিও উপস্থাপনের জন্য এখনো ইউটিউবই সবচেয়ে উপযোগী প্ল্যাটফর্ম। এটি সাংবাদিকদের কোনো বিষয়ের প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে তুলে ধরার পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়। অনেক স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য ইউটিউব এখন শুধু অতিরিক্ত কনটেন্ট প্রকাশের জায়গা নয়; বরং তাদের প্রধান সম্পাদকীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, টেলিগ্রামের ভূমিকা ভিন্ন। রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ পরিবেশে এটি দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর চ্যানেলের চেয়ে ধারাবাহিকভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছানোর একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে রাশিয়ায় বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হওয়ার পর, অন্যান্য অনেক মাধ্যম অকার্যকর হয়ে গেলেও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য টেলিগ্রাম কার্যকর ছিল। ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো এটি কনটেন্টকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে না পারলেও, অন্য প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ হয়ে গেলে টেলিগ্রাম তখনও সচল থাকে।

তুরস্ক: যখন প্ল্যাটফর্ম কৌশলই টিকে থাকার কৌশলে পরিণত হয়

২০২৪ সালের আগস্টে ইনস্টাগ্রাম নয় দিনের জন্য বন্ধ ছিল। এরপর ২০২৫ সালে ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামওলুকে গ্রেপ্তারের পর যে বিক্ষোভ শুরু হয়, সে সময় এক্স, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেটের গতি ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেওয়া হয় (থ্রটল করা হয়)। যেসব স্বাধীন সংবাদমাধ্যম একটি মাত্র প্ল্যাটফর্মের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল ছিল, তারা এক রাতের মধ্যেই তাদের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ হারিয়ে ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে, একাধিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি নিশ্চিত করা (প্ল্যাটফর্ম ডাইভার্সিফিকেশন) দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর কৌশল নয়; বরং এটি একটি বিকল্প প্রস্তুতি বা জরুরি পরিস্থিতির পরিকল্পনা (কনটিনজেন্সি প্ল্যান)।

ইস্তাম্বুলভিত্তিক স্বাধীন ডিজিটালনির্ভর সংবাদমাধ্যম মেদিয়াস্কোপ প্রথম দিকেই এই বাস্তবতা বুঝতে পেরেছিল, যদিও এটি তাদের পরিকল্পনার মধ্যে ছিল না। মূলধারার সংবাদমাধ্যম ছাড়ার পর সাংবাদিক রুশেন চাকির ২০১৫ সালে মেদিয়াস্কোপ প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু থেকেই সংবাদমাধ্যমটি তাদের কার্যক্রম ইউটিউব এবং লাইভ সম্প্রচারকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলে। যদিও এটি কোনো সৃজনশীল সিদ্ধান্ত ছিল না। কারণ স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য তুরস্কের সম্প্রচারব্যবস্থা তখন কাঠামোগতভাবেই ক্রমশ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। দেশটির গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা আরটিইউকে–এর কাছ থেকে সম্প্রচারের লাইসেন্স নেওয়া ছিল ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে নানা বিধিনিষেধে আবদ্ধ। অন্যদিকে বিজ্ঞাপনের আয়ের বড় অংশই যেত সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলোর ঝুলিতে। অর্থাৎ, রাজনৈতিকভাবে সরকারসমর্থক নয়—এমন সাংবাদিকতাকে কোনো জায়গা তৈরি করতে দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ইউটিউব এমন একটি সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে সামনে আসে, যেখানে আলাদা কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন ছিল না। পাশাপাশি প্রচলিত সম্প্রচারমাধ্যমের তুলনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য প্ল্যাটফর্মটিকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করাটাও ছিল অনেক বেশি কঠিন।

বিষয়টি মাথায় রেখে এমন একটি আউটলেট তৈরি হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্লাটফর্মের চেয়ে অনেক বেশি টেলিভিশন সংবাদকক্ষের মতোই কাজ করে। দীর্ঘ আলোচনা, সরাসরি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বিস্তৃত সাক্ষাৎকার—এসবই মেদিয়াস্কোপের কনটেন্টের বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ, মেদিয়াস্কোপ তাদের গল্প বলার ধরন বদলায়নি; বরং বদলেছে তাদের সম্প্রচার অবকাঠামো। প্ল্যাটফর্মউপযোগী সাংবাদিকতা বলতে আসলে কী বোঝায়, তা নিয়ে ভাবার সময় এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরী।

ভিন্ন একটি পথ অনুসরণ করেছিল টি২৪ (T24)। তবে শেষ পর্যন্ত তারা প্রায় একই অবস্থানে পৌঁছায়। সংবাদমাধ্যমটি শুরু হয়েছিল ওয়েবসাইটনির্ভর নিউজসাইট হিসেবে। ইউটিউবে তাদের উপস্থিতিও আগাম কোনো কৌশলের মাধ্যমে নয় বরং ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বর্তমানে টি২৪-এর ইউটিউব চ্যানেলে ২ লাখ ৫২ হাজারের বেশি সাবস্ক্রাইবার এবং ১৪ হাজারেরও বেশি ভিডিও রয়েছে। এই অবস্থান মূলত ধারাবাহিকভাবে সাক্ষাৎকারভিত্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠান প্রকাশের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রবৃদ্ধিটি সচেতনভাবে প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তনের কৌশলের (প্ল্যাটফর্ম পিভট) ফলাফল ছিল না। তখন বরং ইউটিউবে দীর্ঘ সময় নিয়ে করা রাজনৈতিক আলোচনাগুলোই দর্শকেরা খুঁজছিল। আর টি২৪ ঠিক সেই চাহিদাটাই পূরণ করতে সমর্থ হয়। অর্থাৎ, এখানে সম্পাদকীয় পরিচয়কে প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয়নি; বরং প্ল্যাটফর্মই সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় পরিচয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।

অনলাইন সংবাদমাধ্যম দিকেন একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকলেও, তাদের মূল ভিত্তি এখনো লিখিত প্রতিবেদন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মূলত তাদের কনটেন্টের প্রসার বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে কাজ করে—যার উদ্দেশ্য পাঠকদের আবার ওয়েবসাইটে ফিরিয়ে আনা। তবে এই মডেলের অনিশ্চয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন ভূমিকম্প-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনকে ঘিরে আদালতের আদেশের পর দিকেনের কনটেন্ট ব্লক করে দেয় এক্স। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, একটি মাত্র প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা পাঠক বা দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা খুব দ্রুত এবং প্রায় কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই হারিয়ে যেতে পারে।

বিয়ানেত ধীরে ধীরে ইনস্টাগ্রামে আরও বেশি ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট প্রকাশের দিকে এগোচ্ছে, তবে তাদের এই উদ্যোগ এখনো সতর্ক ও সংযত। তুরস্কের অনেক স্বাধীন সংবাদমাধ্যমই দীর্ঘ বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আর এই সম্পাদকীয় পরিচয়কে এমন প্ল্যাটফর্মে সহজে মানিয়ে নেওয়া যায় না, যেখানে দ্রুততা এবং আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে তেয়িত–এর ক্ষেত্রে চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। আঙ্কারাভিত্তিক এই ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাটি তুরস্কের স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে টিকটক ব্যবহারে সবচেয়ে সক্রিয়দের একটি। ফ্যাক্ট চেকিংয়ের কাজের ধরন বিবেচনা করলে বিষয়টি স্বাভাবিকই মনে হয়। ২০২৩ সালে তেয়িত টিকটকে ১৫৭টি ভিডিও প্রকাশ করে। যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বার দেখা হয় এবং প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার প্রতিক্রিয়া আসে। যদিও তখন অতীতের অন্যান্য সময়ের তুলনায় তুরস্ক বেশ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। যেমন—৬ ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্প, ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং চলমান আঞ্চলিক সংঘাত।

বিশেষ করে ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে, তেয়িতের তথ্যযাচাইভিত্তিক সংক্ষিপ্ত ভিডিওগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তখন চারদিকে যখন বিভ্রান্তি ও গুজব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল, সেই ভিডিওগুলো ভাইরাল হওয়া ভুল তথ্যে দ্রুত যাচাই করে মানুষের সামনে তুলে ধরে। ওই সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে এই ফরম্যাটের দ্রুততা এবং ছোট ছোট স্বতন্ত্র অংশে তথ্য উপস্থাপনের সক্ষমতা (মডুলারিটি) খুব ভালোভাবে মানিয়ে যায়।

২০২৪ সালে পয়েন্টারে প্রকাশিত ইয়েস ইউ ক্যান ফ্যাক্ট চেক অন টিকটক শিরোনামের একটি ব্যাখ্যামূলক নিবন্ধে তেয়িতের ফ্যাক্ট চেকার ওইকুম হুমা কেস্কিন সংস্থাটির এই কৌশল সম্পর্কে লিখেছিলেন। তিনি বলেন, যখন পরিস্থিতি উপযুক্ত ছিল, আমরা তা লুফে নিয়েছি; মজার ফিল্টার ব্যবহার করেছি; আবার কখনো আমাদের দীর্ঘ বিশ্লেষণকে কয়েক সেকেন্ডের জনপ্রিয় ছোট ভিডিওতে সংক্ষিপ্ত করে উপস্থাপন করেছি। ফ্যাক্ট-চেকিং কনটেন্টের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে, যা সংক্ষিপ্ত ভিডিওর জন্য খুবই উপযোগী: প্রথমে দাবি তুলে ধরা হয়, এরপর যাচাইয়ে কী পাওয়া গেছে তা দেখানো হয়, এবং শেষে জানিয়ে দেওয়া হয় দাবিটি সত্য না মিথ্যা। তাই ছয় মাস ধরে করা একটি দুর্নীতিবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তুলনায় এই ধরনের কনটেন্ট টিকটকের জন্য উপযোগী করে তোলা অনেক সহজ।

টিকটকে তেয়িতের সাফল্য শুধু ফরম্যাট নিয়ে সৃজনশীল হওয়ার ফলাফল নয়; বরং এটি দেখায় ফ্যাক্টচেকিংয়ের কাজের ধরন এবং টিকটক যে ধরনের কনটেন্টকে গুরুত্ব দেয়, তাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে একটি স্বাভাবিক সামঞ্জস্য রয়েছে। অন্যদিকে, ডয়চে ভেলের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত নতুন সংবাদমাধ্যম +9০ আরও একটি ভিন্ন পথের ইঙ্গিত দেয়। তাদের কনটেন্টকে এমন মনে হয় না যে, প্রচলিত সাংবাদিকতাকে ইনস্টাগ্রামের উপযোগী করে করা হয়ছে। বরং শুরু থেকেই মনে হয় এই প্ল্যাটফর্মের জন্য তৈরি করা। এই দুটি বিষয় কিন্তু এক নয়। আর গণমাধ্যমের পরিবেশ যত বদলাবে, এই পার্থক্য ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ভিন্ন ভিন্ন চাপ, কিন্তু সমস্যাগুলো একই

নরওয়ে ও তুরস্কের সংবাদকক্ষগুলো যে কারণে প্ল্যাটফর্ম উপযোগী গল্প বলার কৌশলে বিনিয়োগ করছে—তাদের কারণগুলো কিন্তু এক নয়।

ভিজির ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ সরল। তরুণ পাঠকেরা আর নিজ থেকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কনটেন্ট খুঁজে নিচ্ছেন না। তাই যে প্ল্যাটফর্মে তারা রয়েছেন, সেখানে যদি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়ে পৌঁছানো না হয়, তবে কার্যত খবরগুলো তাদের কাছেই পৌঁছায় না। অন্যদিকে তুরস্কের পরিস্থিতি ভিন্ন। নিউজল্যাব তুরস্ক–এর ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশটিতে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলা নয়; বরং চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও কীভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়, সেই পথ খুঁজে বের করা। এই বাস্তবতায় প্ল্যাটফর্ম বৈচিত্র্যকরণের লক্ষ্য শুধু প্রাসঙ্গিক থাকা নয়, পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা ধরে রাখা।

তবে এই দুই ভিন্ন ধরনের চাপ শেষ পর্যন্ত একই সম্পাদকীয় বাস্তবতা তৈরি করে। সাংবাদিকতাকে এখন একাধিক পদ্ধতিতে (ফরম্যাটে), একাধিক প্ল্যাটফর্মে এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সংবাদ গ্রহণকারী পাঠকের জন্য উপস্থাপন করতে হয়। টিকটকের দর্শক কিংবা টেলিগ্রামের সাবস্ক্রাইবারের জন্য একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা নিছক প্রযুক্তিগত কাজ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সম্পাদকীয় কাজ। এর জন্য শুধু নকশা বা ডিজাইনের দক্ষতা নয়, প্রয়োজন সম্পাদকীয় বিচক্ষণতা।

প্রতিবেদনকে নতুন প্ল্যাটফর্মের উপযোগী করে রূপান্তর করা হবে কি না—অধিকাংশ সংবাদকক্ষ কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে না। বরং তাদের প্রশ্ন হচ্ছে, ওই রূপান্তরের পর মূল সাংবাদিকতার কতটা অক্ষুণ্ণ থাকে।


Merve Arisoyমেরভে আরিসয় গ্রিনপিস মেডিটেরেনিয়ান এবং অক্সফাম কেডিভির মতো অলাভজনক বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) ডিজিটাল যোগাযোগ নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। সেখানে তিনি জটিল বিষয়গুলোকে বৃহত্তর পাঠকের জন্য সহজবোধ্য, আকর্ষণীয় এবং সহজে গ্রহণযোগ্য উপস্থাপনায় রূপান্তর করার কাজে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেছেন।

 

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

পরামর্শ ও টুল

অনুসন্ধানী পডকাস্ট সম্পাদনা করবেন কীভাবে- বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন সেই পরামর্শ

যেসব ঘটনা লিখিত প্রতিবেদনের জন্য ‘পুরোনো’ বা ‘সময়োত্তীর্ণ’ বলে মনে হতে পারে, সেগুলো পডকাস্টের জন্য বরং বাড়তি সুবিধা। প্রচলিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, অতীতের কোনো ঘটনা বা একটি ঘটনার শুরু নিয়ে করা অনুসন্ধানগুলো পডকাস্টের জন্য বেশ উপযোগী।

পরামর্শ ও টুল

কীটনাশকের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধান করতে ইচ্ছুক সাংবাদিকদের জন্য কিছু পরামর্শ

রোগ এবং কীটনাশকের সংস্পর্শের মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করা কঠিন হলেও, স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে চারপাশের শক্তিশালী প্রমাণ পাঠকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। পশ্চিমের অনেক দেশে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করার জন্য অনলাইনে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব তথ্য পেতে সরকারি নথি চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করারও প্রয়োজন হয় না।

কেস স্টাডি

জীবন নাকি মৃত্যু: ক্যানসার চিকিৎসার জটিল হিসাব-নিকাশ নিয়ে আইসিআইজের অনুসন্ধান

এক বছর ধরে পরিচালিত এই অনুসন্ধানে ৩৭টি দেশের ১২৪ জন সাংবাদিক অংশ নেন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কের কিট্রুডার মূল্য নির্ধারণ ও পেটেন্ট কৌশল ওষুধটির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে জীবনরক্ষাকারী এই চিকিৎসা অনেক রোগীর নাগালের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

সংবাদ লেখা হয়, কিন্তু ক্ষত রয়ে যায়: সংঘাত-সহিংসতা নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকরা নীরবে ভোগেন মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে

২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের শুরুর দিনগুলোতে, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রেদওয়ান আহমেদ একদল শরণার্থীর জানাজায় অংশ নেন। যারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় বঙ্গোপসাগরে ডুবে মারা যায়। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী ও শিশু। দাফনের সময় তিনি এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন, মিয়ানমারের সহিংসতায় এক ছেলেকে হারানোর পর যার পরিবারের বাকি সদস্যরাও গভীর সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছেন।