প্রবেশগম্যতা সেটিংস

ছবি: মারিয়ানা কোরেইয়া পিন্টো

লেখাপত্র

বিষয়

পুরস্কারজয়ী মিগেল মনে করেন প্রভাবশালী প্রতিবেদনের জন্য দরকার সাংবাদিকের স্বাধীনতা, তাই চাকরি ছেড়ে শুরু করেন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

মিগেল কারভালহো যে টুলগুলোকে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান মনে করেন, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত নয়। বরং সেগুলো হচ্ছে কাগজের নথিতে সাজানো তাক, বহু ব্যবহারে জীর্ণ নোটবুক, হাজারো ঘণ্টার পড়াশোনা, আর মুখোমুখি বসে করা আলোচনা। বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতাকে যখন ক্রমেই গতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তখন এই পুরস্কারজয়ী পর্তুগিজ অনুসন্ধানী সাংবাদিক এখনো আস্থা রাখেন ধৈর্যের ওপরই।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে কারভালহো নিজের কর্মজীবন গড়ে তুলেছেন। যেখানে তাড়াহুড়োর চেয়ে সময় এবং তাৎক্ষণিকতার চেয়ে গভীরতাকে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। পর্তুগালের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সাময়িকী ভিসাঁও। প্রায় ২৪ বছর সেখানে কাজ করার পর স্থায়ী বার্তাকক্ষের নিরাপত্তা ছেড়ে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা ও দীর্ঘ আকারের লেখালেখির পথ বেছে নেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করেন, অর্থবহ সাংবাদিকতার জন্য অধ্যবসায়ের পাশাপাশি সমানভাবে প্রয়োজন স্বাধীনতাও।

তার সর্বশেষ বই “ইনসাইড শেগা: দ্য হিডেন ফেস অব পর্তুগাল’স ফার রাইট” সেই দর্শনেরই প্রতিফলন। হাজার হাজার অভ্যন্তরীণ নথি এবং শত শত সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি এই অনুসন্ধান পর্তুগালের কট্টর ডানপন্থী আন্দোলনের ভেতরের নজিরবিহীন চিত্র তুলে ধরেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যা পর্তুগালের সবচেয়ে আলোচিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

জিআইজেএনের সঙ্গে এই আলাপচারিতায় কারভালহো কথা বলেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ, তাড়াহুড়োর এই যুগে ধীরস্থির হওয়ার গুরুত্ব, তার চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছেন এমন সব সাংবাদিক, যাদের ভুল তাকে আরও দক্ষ সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তুলেছে। আরো বলেছেন কেন তিনি এখনো বিশ্বাস করেন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু মানুষকে তথ্য জানানো নয়, বরং মানুষের বিশ্বকে বোঝার অধিকারগুলো সুরক্ষিত করা।

মিগুয়েল কারভালহোর বই “ইনসাইড শেগা: দ্য হিডেন ফেস অব পর্তুগাল’স ফার রাইট” তার দীর্ঘ পাঁচ বছরের অনুসন্ধানের ফসল। ছবি: পেঙ্গুইন পাবলিশিংয়ের সৌজন্যে

জিআইজেএন: আপনার অনুসন্ধানগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়? কেন?

মিগেল কারভালহো: আমার সর্বশেষ বই “ইনসাইড শেগা: দ্য হিডেন ফেস অব পর্তুগাল’স ফার রাইট”-এর ভিত্তি যে অনুসন্ধান, সেটিই আমার সবচেয়ে প্রিয়। পর্তুগালের প্রথম কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল, যারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতা অর্জন করে এবং বর্তমানে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি। সেই দলের ওপর আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান চালাই। দলটির নেতা আন্দ্রে ভেন্তুরা তার বিদেশি-বিদ্বেষী ও অভিবাসন-বিরোধী বক্তব্যের কারণে ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমের নজর কাড়লেও দলটির উত্থান, নির্বাচনী ভিত্তি এবং অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের বড় অংশই সাধারণ মানুষের কাছে  ছিল অজানা। আমি দলটির হাজার হাজার পৃষ্ঠার অভ্যন্তরীণ নথি সংগ্রহ করেছি এবং বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের সঙ্গে শত শত সাক্ষাৎকার নিয়েছি। এই অনুসন্ধানের জন্য প্রায় একধরনের আবেগপ্রবণ নিষ্ঠা ও অবিচল অধ্যবসায়ের প্রয়োজন হয়েছিল। কারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা এবং তাদের খোলামেলা কথা বলতে রাজি করানো মোটেও সহজ ছিল না। বছরের পর বছর এই অনুসন্ধান আমার পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কাজটি স্বীকৃতি পাওয়ায় মনে হয়েছে, এর জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছি, তার সবটুকুই সার্থক।

জিআইজেএন: আপনার দেশে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

মিগেল কারভালহো: দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার টিকে থাকা। পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাংবাদিকতার মতোই। ‘বিগ টেক’ ও ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের ‘স্বৈরতন্ত্রের’ মধ্যে সাংবাদিকতা যে সংকটের মুখোমুখি, পর্তুগালও তার ব্যতিক্রম নয়। এই পরিস্থিতি গণতন্ত্রের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে, জনগণের নজরদারিকে দূর্বল করেছে এবং অন্যদের প্রতি ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতার মাধ্যমে সমাজে বিভাজন আরও বাড়িয়ে তুলেছে। [ভৌগোলিকভাবে] প্রান্তিক অবস্থানে থাকার কারণে পর্তুগাল বৈশ্বিক পরিসরে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। গণতন্ত্রে ফিরে আসার পর থেকে এখন দেশটির সাংবাদিকতা সবচেয়ে নাজুক সময় পার করছে। একই সঙ্গে বার্তাকক্ষের কাজের পরিবেশ ক্রমেই আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে এবং সম্পদও কমে যাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাঠক বা দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা সম্পাদকীয় বিচক্ষণতার জায়গা দখল করে নিয়েছে। সারা দেশে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গণমাধ্যমের উপস্থিতি ও প্রাসঙ্গিকতা কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আজ এমন এক বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে, যার জন্য প্রয়োজনীয় সময়, পরিসর বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য অনেক সংবাদমাধ্যমেরই নেই। তাই এখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করা মানে শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালন নয়; এটি হয়ে উঠেছে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক প্রচেষ্টা এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ। এটি আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ভঙ্গুরতা এবং শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের ভঙ্গুর বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।

জিআইজেএন: একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে আপনার ব্যক্তিগত জীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

মিগেল কারভালহো: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হয়ে ওঠা। পর্তুগালের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সাময়িকী ভিসাঁও-এ প্রায় ২৪ বছর জ্যেষ্ঠ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করার পর আমি কাজ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমরা যেন এক অন্তহীন সংকটের সময়ের দিকে এগোচ্ছি। আজকের অবিরাম সংবাদচক্রের সঙ্গে নিজেকে আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ভিসাঁও ছিল আমার কর্মজীবনের সেরা নিউজরুম। শেষ দিন পর্যন্ত আমি এমন একটি বিশেষ অবস্থানে ছিলাম, যেখানে একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য এক মাস, এমনকি দুই মাস সময় ব্যয় করার সুযোগ পেতাম। কিন্তু সত্য হলো, তারও আগে থেকেই আমি নীরবে সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছি। আমার প্রায় পুরো পেশাগত জীবনই কেটেছে একটি সংবাদমাধ্যমের স্থায়ী কর্মী হিসেবে। নিয়মিত বেতন এবং আগে থেকে মোটামুটি অনুমান করা যায় এমন একটি কর্মজীবনের নিরাপত্তা ছাড়ার ঝুঁকি আমি আগে কখনো নিইনি। আমাকে পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনার একটি অংশ নতুন করে সাজাতে হয়েছিল। একই সঙ্গে আমার অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছি বইটির গবেষণা ও লেখার কাজে। অবশ্য সাংবাদিকতায় ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি বিশ্বাসযোগ্য সুনাম গড়ে তোলার সুফল আমি পেয়েছি। এর ফলে বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় কাজের সুযোগও এসেছে। কিন্তু অধিকাংশ সাংবাদিকের বাস্তবতা এমন নয়। অসাধারণ মেধাবী অনেক প্রতিবেদকই শেষ পর্যন্ত অন্য পেশার খোঁজে সাংবাদিকতা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।

জিআইজেএন: সাক্ষাৎকার নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?

মিগেল কারভালহো: সত্যি বলতে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। আর সেটাই আসলে সমস্যার একটি অংশ। সংবাদমাধ্যম, এর মালিকানা, সম্পাদক, প্রতিদিনের কাজের ধরন এবং হাতে থাকা সম্পদ—সবকিছুই এত গভীরভাবে বদলে গেছে যে, আজ এই পেশায় আসতে চাওয়া একজন তরুণ সাংবাদিকের জন্য কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং নিরবচ্ছিন্ন কাজের চাপ ছাড়া অন্য কিছু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়াটা রীতিমতো কঠিন। সম্প্রতি সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করা তরুণদের কাছে আমি যে সব অভিজ্ঞতার কথা শুনি, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। তারা এক চাকরির সাক্ষাৎকার থেকে আরেকটিতে ছুটে যাচ্ছেন। কীভাবে নিজেকে সবচেয়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে বা সাক্ষাৎকারে ঠিক কী বলা উচিত, সেটিও যেন কেউ জানেন না। এমনকি যাদের পেশাগত অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু বর্তমানে বেকার, তারাও আমাকে বলেন যে তাদের জীবনবৃত্তান্তের যেন কোনো মূল্যই নেই।

জিআইজেএন: অনুসন্ধানের কাজে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কোনো রিপোর্টিং টুল, ডেটাবেজ বা অ্যাপ আছে?

মিগেল কারভালহো: স্বীকার করতেই হবে, কাজের ক্ষেত্রে আমি কিছুটা পুরোনো ধারার মানুষ। কিছু ডিজিটাল রিসোর্স ব্যবহার করি ঠিকই, তবে এমন কোনো নির্দিষ্ট টুল নেই, যেটিকে আলাদা করে উল্লেখ করব। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও আমি তা খুব সীমিতভাবে এবং যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করি। আমার কাছে এটি স্রেফ এমন একটি উপকরণ, যা কিছু কাজ দ্রুত শেষ করতে সাহায্য করে—এর বেশি কিছু নয়। আমি এখনো কাগজ জমিয়ে রাখি। সংবাদপত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখা দেখলে সেটি কেটে রাখি, আর ডিজিটাল সংস্করণে কিছু পছন্দ হলে তার প্রিন্ট কপি করে সংরক্ষণ করি। আমার বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় এসব নথি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এর পাশাপাশি দুটি আলাদা সংরক্ষণাগারও আছে আমার। যার একটি আমার বাসার বাইরে অন্য জায়গায়। রেলপথ থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতি পর্যন্ত নানা বিষয় ধরে ধরে সাজানো অসংখ্য ফাইলের বাক্স রয়েছে আমার কাছে। এগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই এখন সংবাদমাধ্যমের ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা আর্কাইভে আর পাওয়াও যায় না। বার্তাকক্ষগুলোর সম্মিলিত সংগ্রহশালার পাশাপাশি অনেক দিক থেকেই দেশের তথ্যভান্ডারও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকতার কিছু ক্ষেত্রে এমন মানুষও আছেন, যারা মনে করেন জানার মতো সবকিছুই গুগলে পাওয়া যায়। কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা সম্ভব। সৌভাগ্যবশত অথবা দুর্ভাগ্যবশত, যা কখনোই আমার কাজ করার পদ্ধতি ছিল না। আমার কাজ এখনো এমন দুটি চর্চার ওপর নির্ভর করে, যা ক্রমেই অপ্রচলিত হয়ে যাচ্ছে: সব ধরনের বিষয় নিয়ে ব্যাপকভাবে পড়াশোনা করা আর মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি বসে কথা বলা।

“আমি এখনো কাগজ জমিয়ে রাখি। সংবাদপত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখা দেখলে সেটি কেটে রাখি, আর ডিজিটাল সংস্করণে কিছু সংরক্ষণ করতে চাইলে তার প্রিন্ট কপি করে রাখি। আমার বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় এসব নথি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে,” বলেন কারভালহো। ছবি: মারিয়ানা কোরেইয়া পিন্টোর সৌজন্যে

জিআইজেএন: কর্মজীবনে পাওয়া সবচেয়ে মূল্যবান পরামর্শ কী? আর অনুসন্ধানী সাংবাদিক হতে আগ্রহীদের আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

মিগেল কারভালহো: সাংবাদিক জর্জ স্টিয়ারের কথা আমি প্রায়ই ভাবি। গুয়ের্নিকায় বোমা হামলার ওপর লেখা তার প্রতিবেদন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর একটির অনুপ্রেরণা হয়েছিল। অনেক সময় কেউ কেউ, কখনো বিদ্রূপের হাসি নিয়ে, কখনো বা সংশয় প্রকাশ করে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি কি এখনো বিশ্বাস করি যে সাংবাদিকতা পৃথিবী বদলে দিতে পারে? তখন আমি সব সময় একই উত্তর দিই: “আমি জানি না। কিন্তু আমাকে এমনভাবে লিখতে হবে, যেন আমি তা পারি।” এই অস্থির সময়ে সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও গভীরতার সঙ্গে যদি কেউ বিশ্বকে যাচাই-বাছাই করতে এবং প্রতিদিনের ভুল তথ্য ও মিথ্যার স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রতিবেদন তৈরিতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে সাংবাদিকরাই কেবল এর শিকার হবেন না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নাগরিকেরা এবং জনস্বার্থভিত্তিক জবাবদিহির ব্যবস্থাও—যার ওপর আমাদের গণতন্ত্র নির্ভর করে। কারণ এর অর্থ হবে এমন একটি পৃথিবী মেনে নেওয়া, যেখানে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকবে না।

জিআইজেএন: এমন কোনো সাংবাদিক আছেন, যাকে আপনি বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করেন? কেন?

মিগেল কারভালহো: এমন অনেকেই আছেন। আর তারা আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করেন। আমি নিয়মিত তাদের লেখা বই ও প্রতিবেদনগুলো বারবার পড়ি। প্রতিবারই নতুন কিছু খুঁজে পাই। মার্তিন কাপাররোস, লেইলা গেরেইরো, গে ট্যালিস, সেমুর হার্শ, রবার্ট এ. ক্যারো এবং ক্যাথরিন বু—তারা প্রত্যেকেই পৃথিবী, মানুষ আর চারপাশের জটিলতাকে দেখার ক্ষেত্রে আমার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তারা আমাকে শিখিয়েছেন, কোনো ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে কখনো স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়া যাবে না। প্রতিটি ধারণাকেই প্রশ্ন করতে হবে। তারা আমাকে মনে করিয়ে দেন, বাস্তবতা প্রথম দেখায় যতটা সরল মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে অনেক বেশি স্তরযুক্ত। আর তাই সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কাজ হলো নিজেদের উপলব্ধিকেও বারবার প্রশ্ন করা। একটা সময় ক্যাথরিন রীতিমতো আমার অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়েছিলেন। কারণ, আমার মতো তারও ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই! শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কিন্তু আমার পক্ষেই কাজ করে। নানা অসুবিধা সত্ত্বেও এর ফলে মাঠে নেমে প্রতিবেদন করতে গিয়ে আমাকে আরও বেশি হাঁটতে হয়েছে। আরও বেশি বেশি জুতার তলা ক্ষয় করতে হয়েছে। আর সেই পথচলাই আমাকে এমনভাবে পৃথিবীকে দেখার সুযোগ দিয়েছে, অন্যথায় যা হয়তো কখনোই সম্ভব হতো না। ক্যাথরিন আর আমি যেন একই গোত্রের মানুষ—দুর্ভাগ্যজনকভাবে যারা হয়তো ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।

জিআইজেএন: আপনার সবচেয়ে বড় ভুল কী ছিল? আর তা থেকে কী শিক্ষা পেয়েছেন?

মিগেল কারভালহো: ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা এবং এর পরবর্তী বড় আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলোর সময় আমি বিচার-বিশ্লেষণে কয়েকটি ভুল করেছিলাম। বিশেষ করে অনলাইন প্রকাশনার জন্য লেখা কিছু প্রতিবেদনে। কখনো কখনো নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিবেদনের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল। যা আমাকে গভীরভাবে অস্বস্তিতে ফেলে। তবে একই সঙ্গে এটি আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটিতে পরিণত হয়। সাংবাদিকতায় সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠতা একটি মিথ। তবে আমি অনেক বেশি পরিণত হয়েছি, যখন উপলব্ধি করেছি প্রতিটি তথ্য ও প্রতিটি উপাত্ত কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা কতটা অপরিহার্য। একই সঙ্গে সময়ের তাড়নায় ভেসে যাওয়ার প্রলোভনও প্রতিরোধ করতে হয়। সৌভাগ্যবশত, এমন ধরনের ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। তবে যতটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে তা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, সত্য বলে মনে হয় এমন কিছু তুলে ধরাটাই যথেষ্ট নয়। আমাদের দায়িত্ব হলো নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করা, যতক্ষণ না আমরা সর্ব্বোচ্চ নিশ্চিত হতে পারি যে তথ্যটি আসলেই সত্য।

জিআইজেএন: আপনার পেশায় বার্নআউট এড়িয়ে চলেন কীভাবে?

মিগেল কারভালহো: সব সময়ই দ্রুতগতির সাংবাদিকতার চেয়ে ধীরস্থির সাংবাদিকতা আমাকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। বর্তমানে সংবাদ তৈরির অবিরাম, কারখানার মতো ব্যবস্থার সঙ্গে আমি নিজেকে কখনোই খুব বেশি মানিয়ে নিতে পারিনি। যদিও সাংবাদিকদের একটি পুরো প্রজন্মের সামনে এই বিকল্পটি নেই। তারা যতই মেধাবী বা নিবেদিতপ্রাণ হোন না কেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনেকেই টিকে থাকার জন্য এমন এক কর্মগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে বাধ্য হন, যা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব নয়। আমার ক্ষেত্রে আমি সচেতনভাবেই সারাক্ষণের সংবাদপ্রবাহ এবং টেলিভিশনের রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখেছি। আমি কোনো নিউজ-অ্যালার্ট চালু রাখি না। প্রতি মিনিটে বা প্রতি ঘণ্টায় সবকিছু জানার প্রয়োজনও আর অনুভব করি না। এভাবেই আমি একদিকে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছি, অন্যদিকে স্বচ্ছভাবে চিন্তা করার জন্য প্রয়োজনীয় দূরত্বও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। এর ফলে জটিল বিষয়গুলো গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পাই আমি। আর বিভিন্ন বই, নিবন্ধ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পেছনে সময় দিতে পারি। যা আমাদের পৃথিবীকে বদলে দেওয়া ঘটনাগুলোর গভীর তাৎপর্য বুঝতে সাহায্য করে।

জিআইজেএন: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করে? ভবিষ্যতে কোন পরিবর্তন দেখতে চান?

মিগেল কারভালহো: যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করে তা হলো অনেক সংবাদমাধ্যমের নির্বাহী কর্মকর্তা ও সম্পাদক, বিশেষ করে আমার নিজের দেশের, যারা এখনো উপলব্ধি করতে পারেন না, ক্রমবর্ধমান বিভাজন, উন্মত্ত গতি এবং অস্থিরতায় ভরা এই পৃথিবীতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই হবে সচেতন নাগরিক গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান শক্তি। শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম ভিত্তি। আমি বহু বছর ধরে সংবাদশিল্পে এমন মানসিকতার সম্মিলিত জাগরণের প্রহর গুনছি, যা এমন সব অভ্যাস ও প্রণোদনাকে নতুন করে দেখতে শিখবে, যেগুলো সাংবাদিকতাকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে । কিন্তু যতবারই মনে হয় সুড়ঙ্গের শেষে আলোর দেখা পাচ্ছি, ততবারই বুঝতে পারি সেটি আসলে আমাদের দিকেই ধেয়ে আসা পরবর্তী ট্রেনের আলো। যা সামনে যা-ই আছে, সবকিছু উড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।


মারিয়া মোরেইরা রাতো পর্তুগালের লিসবনভিত্তিক একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, লিঙ্গসমতা এবং সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেন। তিনি তার প্রতিবেদনের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর জোর দেন। তার লেখা পুবলিকু, এসওএল, আই, কোমুনিদাদে কুলতুরা আর্তে এবং সিদাদাঁওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি এপিএভি জার্নালিজম প্রাইজসহ একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন।

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

সংবাদ ও বিশ্লেষণ সাক্ষাৎকার

গুপ্তচরবৃত্তি, মিথ্যা ও ‘ডার্টি ওয়াটার’: অস্ট্রিয়ার নতুন অনুসন্ধানী দলের সঙ্গে আলাপচারিতা

অস্ট্রিয়ার রেডিও সম্প্রচার খাতের উদ্যোক্তা ফ্লোরিয়ান নোভাক “গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার” লক্ষ্য নিয়ে ইয়েৎস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এর শুরুর লক্ষ্য ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট, কিন্তু স্থানীয় বাজারের তুলনায় উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। প্রতি মাসে ১৭ দশমিক ৫০ ইউরো (২০ মার্কিন ডলার) করে দিবেন এমন ৫ হাজার সদস্য সংগ্রহ করা।

ডেটা সাংবাদিকতা

ডেটা স্টোরিটেলারদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ: যেভাবে ভিজ্যুয়ালাইজেশনে একে অন্যকে সহায়তা করছে

বার্তাকক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে—তারা ডেটা রিপোর্টিং বা ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশনের কাজ করতেন। পরস্পরের মতামত বিনিময়, প্রশ্ন করা, কিংবা কাজ করতে গিয়ে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন—এমন সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতো কোনো নিদিষ্ট প্লাটফর্ম তাদের ছিল না। সাদামাঠা সেই আলাপ থেকেই শুরু।

বণ্টন ও প্রচার

মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত স্ক্রল করা পাঠকদের জন্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন উপস্থাপন কৌশল

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সময়সাপেক্ষ। প্রকাশের জন্য একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে মাসের পর মাস নথিপত্র পর্যালোচনা, সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং তথ্য যাচাই করতে হয়। কিন্তু মানুষ যেভাবে সংবাদ খুঁজে পায় এবং পড়ে, তা অধিকাংশ সংবাদকক্ষের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুত বদলে গেছে। এখন সংবাদ মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডে, মোবাইল ফোনে, খণ্ড খণ্ডভাবে এবং অন্যান্য ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকেই পড়া হয়।

পরামর্শ ও টুল

অনুসন্ধানী পডকাস্ট সম্পাদনা করবেন কীভাবে- বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন সেই পরামর্শ

যেসব ঘটনা লিখিত প্রতিবেদনের জন্য ‘পুরোনো’ বা ‘সময়োত্তীর্ণ’ বলে মনে হতে পারে, সেগুলো পডকাস্টের জন্য বরং বাড়তি সুবিধা। প্রচলিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, অতীতের কোনো ঘটনা বা একটি ঘটনার শুরু নিয়ে করা অনুসন্ধানগুলো পডকাস্টের জন্য বেশ উপযোগী।