ঘূর্ণিঝড়ের পর মধ্য ফ্লোরিডার একটি এলাকা জুড়ে বন্যা। ছবি: শাটারস্টক
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রতিবেদন করার জন্য বিষয় বাছাই করবেন যেভাবে
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
আবাসন বীমা থেকে শুরু করে খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা বৈশ্বিক অর্থায়ন—সবকিছুর ওপরই প্রভাব ফেলে জলবায়ু পরিবর্তন। দক্ষিণ আমেরিকার ছোট প্রকাশনা কনসেনসো। এখানকার সাংবাদিকরা গত বছর প্যারাগুয়েতে যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে রিপোর্ট করছিলেন, তখন তারা যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই বিষয়টি তুলে ধরতে পারতেন।
কিন্তু তারা প্যারাগুয়ের প্রধান শহরগুলোর সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সমস্যার দিকে নজর দেন। এমন একটি জরুরি বিষয় অনুসন্ধানের জন্য তারা বেছে নেন, যা পাঠকদের আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে পারে। আর তা হলো, স্কুলে শিশুদের অহেতুক যন্ত্রণা বা ভোগান্তির দিকটি।
তাদের প্রতিবেদনটি—একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ মানচিত্রসহ তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখানো হয়, এক লাখ পনের হাজারেরও বেশি শিশু এমন স্কুলে পড়ে, যা তীব্র গরমে আক্রান্ত শহরের হিট আইল্যান্ড এলাকায় অবস্থিত। সেখানে পানীয় জলের কল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং শৌচাগারের তীব্র সংকট রয়েছে। যা তাদের পানিশূন্যতা থেকে শুরু করে শ্বাসকষ্ট ও স্কুলে অনুপস্থিতি বৃদ্ধির মতো নানা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
দ্য সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (সিআইজে) আয়োজিত হাউ ক্লাইমেট ইনভেস্টিগেশনস গেট রেজাল্টস শীর্ষক সাম্প্রতিক এক ওয়েবিনারে কনসেনসোর প্রতিবেদক ম্যাক্সিমিলিয়ানো মানজোনি বলেন, হিট আইল্যান্ড নিয়ে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনটি দ্রুতই দেশের কংগ্রেসে জনশুনানি আয়োজনের চাপ তৈরি করে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অনুসন্ধানের ফলাফল ভাগ করে নিতে একটি কমিশনও গঠন করা হয়।

কনসেনসোর মোবাইলবান্ধব ইন্টারঅ্যাকটিভ মানচিত্রের মাধ্যমে প্যারাগুয়ের আসুনসিওনে স্কুলগুলোর অবস্থান এবং রঙ দিয়ে চিহ্নিত “হিট আইল্যান্ড” দেখানো হচ্ছে। ছবি: স্ক্রিনশট
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভুল তথ্য, জলবায়ু নিয়ে সংশয় এবং বাড়তে থাকা স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার প্রেক্ষাপটের কথা উল্লেখ করেন মানজোনি ও তার সঙ্গে থাকা আরও তিনজন পরিবেশ সাংবাদিক। ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে তারা আহ্বান জানান, জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে হলে প্রতিবেদন বাছাইয়ের সময় সম্ভাব্য প্রভাব বা যারা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, তাদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি প্রতিবেদকরা পাঠকদের অভিভাবক হিসেবে ভাবেন, তাহলে শক্তিশালী প্রতিবেদন তৈরির ধারণা শুরু হতে পারে এমন প্রশ্ন দিয়ে—‘বড় তেল বা কৃষি কোম্পানিগুলো কি নীরবে স্কুলের পাঠ্যক্রমে প্রভাব ফেলছে?’
ওয়েবিনারে সিআইজের ওপেন ক্লাইমেট রিপোর্টিং ইনিশিয়েটিভ (ওসিআরআই)-এর সফলতার দিকগুলো তুলে ধরা হয়। আলোচনায় অংশ নেন ড্রিল্ড মিডিয়ার জলবায়ু ও পরিবেশ ন্যায় বিষয়ক প্রতিবেদক নিনা লাখানি, ওসিআরআইয়ের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আদেওলু আদেকোলা, এবং ভারতের ডেটালিডসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ নাজাকাত।
পরিবেশবিষয়ক অনুসন্ধানের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ওসিআরআই নামে একটি উদ্যোগ নিয়েছে সিআইজে। এর অধীনে গত তিন বছরে ৫৮টি দেশের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ওসিআরআইর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে আফ্রিকার পরিবেশ বিষয়ক অনুসন্ধানী বার্তাকক্ষ অক্সপেকার্স। দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলে নবায়নযোগ্য শক্তি অনুসন্ধান প্রকল্পের মাধ্যমে কীভাবে ডেটা সংগ্রহ করা যায় এবং নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পের অর্থায়ন অনুসন্ধান করা যায়—এ বিষয়ে সম্প্রতি তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে। (ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ইন্টারন্যাশনালের ফলো দ্য মানি টুলকিটে পুন:ব্যবহারযোগ্য শক্তি প্রকল্প সম্পর্কিত তথ্য ও উপকরণের বিশদ তালিকা রয়েছে।) উল্লেখ্য, ওসিআরআইর টুলস অ্যান্ড রিসোর্সেস পেইজে জলবায়ু সম্পর্কিত ডেটাবেস এবং বিশ্বের প্রভাবশালী অনুসন্ধানের চমৎকার তালিকা পাওয়া যায়।
প্যানেলিস্টরা একমত হন এখন থেকে প্রতিবেদকদের জলবায়ু পরিবর্তন সংকটকে শুধুমাত্র একটি “বিষয়” হিসেবে নয়, বরং সংবাদকক্ষ জুড়ে প্রযোজ্য “থিম” বা “দৃষ্টিকোণ” হিসেবে দেখার প্রয়োজন।
প্যানেলিস্টরা আরও কয়েকটি কার্যকর উপায়ের কথাও বলেন, যা জলবায়ু ও পরিবেশ সম্পর্কিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ব্যবহার করা যায়। পাশাপাশি দর্শক ও পাঠকের সঙ্গে গভীরভাবে সংযোগ স্থাপন করে।
বার্তাকক্ষের সব বিভাগ বা বিটের মাধ্যমে নতুন প্রভাব খুঁজে বের করুন। লাখানি উল্লেখ করেছেন, “জলবায়ু সংকট এমন একটি বিষয় যা প্রতিটি মানুষ এবং প্রতিটি বিটকে প্রভাবিত করছে। মায়ামি হেরাল্ডে আবাসন বিটের জন্য বেশ কয়েকজন রিপোর্টার রয়েছেন। তাদের মধ্যে মাত্র একজন মায়ামিতে আবাসন খাতের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। আমরা যদি জলবায়ুকে অর্থনীতি বা রাজনীতির মতো গোটা বার্তাকক্ষের একটি সাধারণ ইস্যু হিসেবে না দেখি, তবে আমরা কখনোই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না।” মানজোনি আরও যোগ করেন: “আমাদের এমন আরও সাংবাদিক প্রয়োজন যারা রোজকার প্রতিবেদনে জলবায়ু বিষয়টি যুক্ত করবেন। আমাদের আরও বেশি স্থানীয় রিপোর্টার প্রয়োজন যারা জলবায়ু পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংবাদ সংগ্রহ করবেন। আরও বেশি অর্থনীতি, খেলাধুলা এবং ফ্যাশন সাংবাদিক প্রয়োজন, কারণ জলবায়ু পরিবর্তন কেবল বৈষম্যই বাড়িয়ে তোলে।”
জলবায়ু সংক্রান্ত অনুসন্ধানের জন্য একটি আবেগঘন বা জনপ্রিয় বিষয় বেছে নিন, যেমন—শিশু, খেলাধুলা বা বিনোদনের ওপর এর প্রভাব। প্যারাগুয়ের হিট আইল্যান্ড গল্পটি বর্ণনা করতে গিয়ে মানজোনি বলেন: “এই প্রভাবটি তৈরি হয়েছে কারণ আমরা এটিই চেয়েছিলাম। অনুসন্ধান শুরু করার আগে আমরা দলের সঙ্গে কথা বলেছি। কারণ আমরা জলবায়ুকে কেবল একটি ‘বিষয়’ হিসেবে নয় বরং একটি ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসেবে দেখতে চেয়েছি। আমরা শিশু, দাবদাহ ও শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে চেয়েছি। আমরা স্কুলগুলোতে অবকাঠামোর অভাব—যেমন পানি, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, এমনকি শৌচাগার নিয়ে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলেছি। একই সঙ্গে আমরা ভেবেছি কীভাবে এই খবরটি সহজ ও কম খরচে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। যাতে আপনি আপনার প্রতিবেশীর সঙ্গেও এটি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।”
জিআইজেএনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘বিজ্ঞান অস্বীকারের যুগে জলবায়ু প্রভাব অনুসন্ধানের কৌশল‘। সেখানে সিবিএস নিউজের পরিবেশ বিষয়ক প্রযোজক ট্রেসি ওল্ফ একটি সফল গ্রিনওয়াশিং (পরিবেশ রক্ষার নামে প্রতারণামূলক প্রচার) অনুসন্ধানের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সেই অনুসন্ধানে দেখা গেছে কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো আমেরিকার জনপ্রিয় বাস্কেটবল টুর্নামেন্ট মার্চ ম্যাডনেস-এর মতো বড় বড় খেলার আসরে বিজ্ঞাপন দেয়। তিনি আরও বলেন, “এমনকি আপনি চাইলে বড়দিনের গাছ (ক্রিসমাস ট্রি) নিয়েও কাজ করতে পারেন। কারণ এই গাছগুলোর সঙ্গেও জলবায়ু বিষয়ক অনেক গভীর সমস্যা জড়িয়ে আছে।”
আপনার কাজের পদ্ধতিগুলো সরকারি পরিবেশ সংস্থাগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করুন। বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্য থেকেই মানজোনি বলেন, বার্তাকক্ষগুলো চাইলে তাদের অনুসন্ধানী কাজের ধরন বা পদ্ধতি সরকারি সংস্থাগুলোকে জানাতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বড় কোনো পরিবেশগত ভুল এড়িয়ে চলা সহজ হয়।
তিনি একটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেন যেখানে লাতিন আমেরিকার একটি দেশের সরকার জানতোই না যে, তাদের দেওয়া একটি লিথিয়াম খনির লাইসেন্সের সীমানা সংরক্ষিত আদিবাসী এলাকার ভেতরে পড়ে গেছে। তিনি ওপেন সোর্স (সবার জন্য উন্মুক্ত তথ্য) ব্যবহার করে এটি খুঁজে বের করেছিলেন। এরপর তিনি যখন সেই দপ্তরের সঙ্গে তার এই খুঁজে বের করার পদ্ধতিটি তুলে ধরেন, তখন থেকে তারা নিয়মিতভাবে এমন ভুলগুলো যাচাই করা শুরু করল।
তিনি বলেন, “আমরা কঠোর সমালোচনা করেছিলাম যে, মন্ত্রণালয় কেন এটা দেখতে পেল না যে খনির জায়গাটি সংরক্ষিত এলাকায় পড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা তাদের দেখিয়েও দিয়েছিলাম: ‘দেখুন, আমরা এভাবেই এটি শনাক্ত করেছি এবং আপনারা চাইলে অন্য ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহার করতে পারেন।’ নিজের অবস্থানে অনড় থাকা, কিন্তু একসঙ্গে স্বচ্ছ ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া—এভাবেও স্থায়ী প্রভাব ফেলা সম্ভব।”
জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে মানুষের প্রাত্যহিক জীবন ব্যয় বা “সংসারের টানাপোড়েনের” সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করুন। নাজাকাত বলেন, “জলবায়ু সাংবাদিকতায় সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো খবরের আইডিয়া খুঁজে বের করা। যতক্ষণ না আপনি জলবায়ু পরিবর্তনকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাতে পারছেন, ততক্ষণ এটি মানুষের মনে সেভাবে নাড়া দেবে না।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা আইপিসিসি বা জাতিসংঘের আলোচনাগুলোতে পলিসি ফ্রেমওয়ার্কের (নীতি কাঠামো) মতো কঠিন কঠিন শব্দ শুনি। সাধারণ দর্শকরা আসলে এই ভাষা বোঝে না। কিন্তু আমরা যদি মানুষকে এভাবে দেখাই: ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আপনার খাবারের জোগানে সমস্যা হচ্ছে;’ অথবা ‘আগামী দুই বছরের মধ্যে আপনি হয়তো এই সবজিটি আর পাবেন না, বা এই ফলটি নির্দিষ্ট ঋতুতে মিলবে না;’ কিংবা ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী বছর আপনার বিদ্যুৎ বিল আসলে বেড়ে যেতে পারে’—তবেই তারা বিষয়টি বুঝবে। এরপর এর কারণ ও প্রতিকার তাদের বুঝিয়ে বলুন।”
তিনি আরও যোগ করেন: “আপনার দেশে গরমে প্রতি বছর এক হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে—এভাবে না বলে বরং এভাবে বলা ভালো যে, প্রতিদিন [নির্দিষ্ট] সংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছে।”
নতুন সব দৃশ্যমান (ভিজুয়ালাইজেশন) টুল ব্যবহার করে সংবাদের প্রভাব আরও বাড়ানো যায়। মানজোনি বলেন, ইন্টারঅ্যাক্টিভ ম্যাপ তৈরির জন্য লিফলেট একটি দারুণ দৃষ্টান্ত। সবার জন্য উন্মুক্ত এই সংগ্রহশালাটি ব্যবহার করতে খুব বেশি কোডিং জানার প্রয়োজন হয় না। এই টুলের মাধ্যমে ম্যাপের ওপর ক্লিক করলে তথ্য ভেসে ওঠা (পপ-আপ) বা মোবাইলে জুম করার সুবিধা ব্যবহার করে জলবায়ুর সমস্যাগুলো মানুষের কাছে সহজে তুলে ধরা যায়। তিনি আরও জানান, ডেটার্যাপার, গুগল ম্যাপস, গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ এবং সেন্টিনেল স্যাটেলাইট ইমেজের (যেমন- কোপারনিকাস ব্রাউজার) মতো ইন্টারনেটভিত্তিক টুলগুলো ব্যবহার করলে পাঠকরা বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন এবং সংবাদের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততাও বাড়ে।
দৈনন্দিন খবরের বাইরের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিলে কাজ করার চেষ্টা করুন। প্যানেলিস্টরা জানান, বিজ্ঞানীদের বা গবেষকদের করা জলবায়ুর এমন অনেক প্রভাব নিয়ে কাজ করার সুযোগ সাংবাদিকদের আছে, বার্তাকক্ষে যা সাধারণত ভাবা হয় না। লাখানি পরামর্শ দেন: “আমি সাংবাদিকদের বলব সাংবাদিকতার বাইরের মানুষদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে; যেমন—অর্থনীতিবিদ, জলবায়ু বিজ্ঞানী, মেডিকেল পরীক্ষক বা এনজিও গবেষক।” তিনি আরও যোগ করেন: “এমন অনেক বিষয় আছে যা খুঁজে বের করার মতো সময় বা তথ্য-উপাত্ত সাংবাদিকদের কাছে থাকে না।”
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রচলিত ধারণা বা গল্পটি বদলে দেওয়াও এক ধরণের বড় প্রভাব। লাখানি ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা যখন প্রভাবের কথা ভাবি, তার বড় একটা অংশ হলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়া। আমরা কীভাবে এই গল্পগুলো বলছি, তার ওপর ভিত্তি করে অনেকগুলো ধাপে প্রভাব ফেলা সম্ভব। হতে পারে একজন পাঠককে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করা। অথবা দেশের কোনো নীতি বদলে দেওয়া। এমনকি কোনো দুর্নীতিবাজ মেয়রকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত।” মানজোনি বলেন, হয়তো কোনো আকর্ষণীয় চরিত্রের মাধ্যমে, কিংবা ঘটনাচক্রে প্রকাশের সময়েই বড় কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ায় কিছু প্রতিবেদন অপ্রত্যাশিতভাবে সবার নজরে চলে আসে। তবে এই সুবিধাগুলো পেতে হলে জলবায়ুর খবরগুলো নিয়মিতভাবে করে যেতে হবে। মানজোনির মতে, “কখনও কখনও প্রভাব বলতে শুধু কোনো একটি বিষয়ে মানুষের চিন্তাভাবনার ধারাকে বদলে দেওয়া বোঝায়। আবার কখনও এটি কেবল একটি পতাকা গেঁথে দেওয়ার মতো। যা দিয়ে বোঝানো হয়—‘এমনটা ঘটছে’। এরপর অন্য কেউ সেই পতাকা বা নিশানকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রভাব সব সময় সরাসরি বা একই ভাবে কাজ করে না।”
তিনি আরও যোগ করেন: “এটি পরিবেশ রক্ষার নামে মিথ্যা প্রচার বা গ্রিনওয়াশিং উন্মোচন করার বিষয়ও হতে পারে। অনেক সময় কোনো বিষয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেওয়া জরুরি, যাতে তা মানুষের মনে গেঁথে থাকে। আপনি হয়তো সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পারেন, কিন্তু অনেক সময় এটি ভাগ্যের ওপরও নির্ভর করে—যেমন কোনো নির্বাচনের বছরে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা।”
লাখানি আরও যোগ করেন: “জলবায়ু সংক্রান্ত ভুল তথ্য এখন খুব সুনির্দিষ্ট এলাকা এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ছড়ানো হচ্ছে। তাই আমাদের কাজের ধরনও হওয়া উচিত দেশ ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন। গত বছর আমি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালাচিয়া অঞ্চলে হারিকেন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছি। সেখানে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন ছিল, যে জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি ‘ধাপ্পাবাজি’ বা ভুয়া বলে মনে করে না। অন্যদিকে, আমি যখন মেক্সিকোর আকাপুলকোতে গিয়েছি, এখানের বাসিন্দারা দু’টি হারিকেন ঝড়ের কবলে পড়েছিল—সেখানকার সবাই জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলছিল।”
প্যানেলটি উল্লেখ করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে লোভ, ভুল তথ্য, সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষতি এবং বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো জড়িয়ে আছে। আর এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসংখ্য খবর এবং বড় প্রভাব ফেলার সুযোগ।
লাখানি ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা সবাই এই সংকটের জন্য সমানভাবে দায়ী নই। জলবায়ু সংকটে সবার অবদান এক নয়; সবাই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না; এবং সবার কাছে সমানভাবে সমাধানের সুযোগও নেই। তাছাড়া,অনেক বড় বড় কোম্পানি এবং প্রভাবশালী মহল আছে যারা বর্তমান ব্যবস্থাকে এভাবেই টিকিয়ে রাখতে চায়। কারণ এতে তাদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে।”

রোয়ান ফিলিপ জিআইজেএনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। তিনি আগে দক্ষিণ আফ্রিকার সানডে টাইমসের প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন। বিদেশি প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বজুড়ে দুই ডজনের বেশি দেশে সংবাদ, রাজনীতি, দুর্নীতি এবং সংঘর্ষ সম্পর্কিত প্রতিবেদন করেছেন।