ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
আসাদের পতনের পর সিরিয়ার চুরি যাওয়া শিশুদের নিয়ে অনুসন্ধান ও ঘটনা উন্মোচন
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
২০২৪ সালের শেষ দিকে বাশার আল-আসাদের পতন সিরিয়াজুড়ে তুমুল আলোড়ন তৈরি করে। কয়েক দশকের স্বৈরশাসন, দমন-পীড়ন ও গোপনীয়তার কাঠামো রাতারাতি ধ্বসে পড়ে। স্থানীয় ও বিদেশি—উভয় ধরনের সাংবাদিকদের জন্যই আসাদের পতন জবাবদিহিমূলক সাংবাদিকতার অনন্য সুযোগ এনে দেয়। এটি মূলত এমন সব অনিয়ম ও অপরাধের ঘটনা অনুসন্ধানের সুযোগ—আসাদ আমলে যা নিয়ে কাজ করাটা ছিল বেশ কঠিন, অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব।
আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা হতবাক করার মতো অভিযোগগুলোর একটি ছিল—সরকারী কর্মকর্তারা রাজনৈতিক বন্দিদের আটকের পাশাপাশি অপহরণ করেছিলেন তাদের শত শত শিশুসন্তানদেরও। শত শত সিরীয় শিশু অপহরণের ন্যাক্বারজনক এই কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল সে দেশে কর্মরত শিশু দাতব্য সংস্থাগুলোও।
বিবিসি, দ্য অবজারভার, ডার শ্পিগেল, ট্রাউ, লাইটহাউস রিপোর্টস, এসআইআরএজে এবং উইমেন হু ওন দ্য ওয়ার—এই সব প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা যৌথভাবে মাঠপর্যায়ে প্রতিবেদন করেন। শত শত নথি বিশ্লেষণ করেন। এইসব শিশুদের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল তা জানার চেষ্টা করেন। আমাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে, কীভাবে বৈশ্বিক শিশু দাতব্য সংস্থাকে ব্যবহার করে আসাদ প্রশাসন শিশুদের গুমে সহায়তা করেছিল। এই অনুসন্ধানী অংশীদারদের পাশাপাশি সিরিয়ার আরও কিছু গণমাধ্যম—সওত এবং আল-জুমহুরিয়া—এই যৌথ উদ্যোগে যুক্ত হয়ে দীর্ঘ লিখিত প্রতিবেদন ও অডিও প্রকাশ করে।
বড় পরিসরের চিত্র নথিভুক্ত করা
“গত বছরের [২০২৫] ফেব্রুয়ারিতে আমি এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো সিরিয়ায় যাই,” ব্যাখ্যা করেন ওপেন সোর্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক বাশার দীব। তিনি লাইটহাউস রিপোর্টসের হয়ে এই প্রকল্পে কাজ করেন। তিনি বলেন, “সিরিয়াতে আমি আমার পরিবারের সঙ্গে আবার দেখা করতে পারবো—এই আশা আমি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেখানে একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার কথা তো দূরের বিষয়।”
দীব আরো বলেন, “আল-আসাদের পতনের কয়েক দিনের মধ্যেই, আটকের শিকার পরিবার ও সেই শিশুদের স্বজনেরা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন—কীভাবে অনাথ আশ্রমগুলো তাদের শিশুদের নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল।” তিনি যোগ করেন, “অনেক সিরীয়ের মতো আমিও এই বাবা-মা ও তাদের শিশুদের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ি। রাষ্ট্রীয় নির্দয় ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব অল্পবয়সী শিশুকে বাবা-মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে নেওয়ার ভাবনা আমাকে বারবার তাড়া করতে থাকে।”
লাইটহাউস দলের সদস্যরা যতটা সম্ভব নিখোঁজ শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করে একটি ডেটাবেস তৈরি করা শুরু করেন। পরে, তাদের অনুসন্ধানী অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় দলটি সিরিয়ার বিমান বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা, সমাজকল্যাণ ও শ্রম মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় অনাথ আশ্রমগুলো থেকে হাজার হাজার সরকারি নথি সংগ্রহ করে। এসব নথির মধ্যে ছিল গোপন চিঠিপত্র, বন্দিদের তালিকা, রেফারেল ফাইল, লগবুক এবং বিস্তারিত কেস রেকর্ড। দীব জানান, “আমরা যে সব নথি সংগ্রহ করেছি, তার সঙ্গে ওপেন সোর্স তথ্য যুক্ত করে যাচাই করা শিশুদের একটি বিস্তৃত ডেটাবেস তৈরি করেছি। এতে এমন ৩২০টিরও বেশি শিশুর তথ্য রয়েছে, বাবা-মাকে গ্রেপ্তারের পর যাদের অনাথ আশ্রমে পাঠানো হয়েছিল।”

ছবি: স্ক্রিনশট, লাইটহাউস রিপোর্টস
কর্তৃপক্ষ ও ভুক্তভোগীদের অবস্থা অনুধাবন
এদিকে, কয়েক মাস ধরে সূত্র অনুসরণ করতে থাকা বিবিসির তথ্যচিত্র সংগ্রহকারী দলটি ২০২৫ সালের মে মাসে সিরিয়ায় চিত্রধারণের জন্য পৌঁছায়। বিবিসির লন্ডনভিত্তিক প্রযোজক হায়া আল বাদারনেহ ২০২৩ সালের গ্রীষ্মকাল থেকেই নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টগুলো অনুসন্ধান করা শুরু করেছিলেন। সিরিয়ায় গিয়ে বিবিসির দলটি অস্ট্রিয়ার বৈশ্বিক শিশু দাতব্য সংস্থার কর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে সক্ষম হয়। যারা রাষ্ট্রীয়ভাবে শিশুদের পরিকল্পিত গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল। সংস্থাটির নাম এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজেস ইন্টারন্যাশনাল।
আসাদের পতনের পর দামেস্কে অবস্থান করছিলেন লিনজি বিলিং। প্রতিবেদন তৈরি করছিলেন দ্য অবজারভারের জন্য। তিনি এসওএসের ভেতরের আরও কিছু সূত্রের সঙ্গে দলটিকে যুক্ত করে দেন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নথিপত্রও শেয়ার করেন।
আল বাদারনেহ বলেন, “তাদের আস্থা অর্জন করা সহজ ছিল না। আসাদের পতনের পরও অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন, অবশিষ্ট অংশীজনেরা প্রতিশোধ নিতে পারে। আবার আমাদের ধারণা ছিল, কেউ কেউ নিজেদের জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করতেও চাননি।” সব মিলিয়ে আল বাদারনেহ, বিবিসি প্রযোজক-পরিচালক জেস কেলি এবং দলটির অন্যান্য সাংবাদিকরা এসওএস-এর ৫৪ জন সাবেক ও বর্তমান কর্মীর সঙ্গে কথা বলেন।
এই সূত্রগুলো বিস্তারিতভাবে জানিয়েছে যে, কীভাবে শিশুদের সেইসব কারাগার থেকে নিয়ে আসা হতো যেখানে তাদের বাবা-মাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি করতো বিমান বাহিনী গোয়েন্দা বিভাগ (এয়ার ফোর্স ইন্টেলিজেন্স)। এরপর সমাজকল্যাণ ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তাদের এসওএস বা অন্যান্য এতিমখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। ওইসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া ছিল যেন তারা শিশুদের ছবি না তোলে বা তাদের পরিবারের বিষয়ে কোনো কথা না বলে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের নামও বদলে দেওয়া হতো যাতে তাদের আসল পরিবার আর খুঁজে না পায়।
“আল বদরনেহ্র সঙ্গে কয়েকমাস ধরে আলোচনার পর, এসওএসের একজন কর্মী আমাদের ছবি এবং খুঁটিনাটি তথ্য দিতে রাজি হন। বিশেষ করে সিরিয়া সরকার এবং এসওএস ওই শিশুদের আটক এবং লুকিয়ে রাখার জন্য যে সব পদ্ধতি ব্যবহার করতো, সে বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ দেন” বলেন কেলি। এরপর বিবিসি সেইসব পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে যাদের সন্তানদের তাদের কাছ থেকে একরকম ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

লায়ান, মুহাম্মদ এবং লায়লা ঘবেইস (বাম থেকে ডানে)—পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার তিন বছর পর মুক্তির সময় তোলা। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
“যে ঘটনাগুলো আমাদের সবচেয়ে বেশি তাড়া করে ফিরেছে, তার একটি ছিল ঘবেইস পরিবার,” স্মরণ করেন কেলি। “ঘৌতায় রেড ক্রিসেন্ট কর্মী আবদুলরহমান ঘবেইস কাঁদতে কাঁদতে আমাদের কাছে তার নবজাতক ছেলে মুহাম্মদের জন্মক্ষণ উদ্যাপনের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্টের কথা বলেন, ঘটনাটি ২০১৫ সালের। তার বিশ্বাস, এই পোস্টটি বিমান বাহিনীর গোয়েন্দাদের নজরে আসার পরই তার পরিবারের আটজন সদস্যকে গ্রেপ্তারের করা হয়। যাদের মধ্যে ছিলেন তার দুই ভাতিজি, আট বছর বয়সী লায়লা ও চার বছর বয়সী লায়ান, আর তাদের নবজাতক ছেলে সন্তান।” তিনি বলেন, “শাসকগোষ্ঠী কার্যত বাবা-মাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করার জন্য শিশুদের ব্যবহার করেছে। তিন বছর পর শাসক বাহিনীর সৈন্যদের সঙ্গে বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে অবশেষে যখন শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের কাছে ফেরে তখন লায়ান কিংবা মুহাম্মদ কেউই আর বাবা-মাকে চিনতে পারেনি। কারণ বাবা-মাকে নিয়ে তাদের কোনো স্মৃতি অবশিষ্ট ছিল না।”
যৌথ কাজের সুফল
কেলি উল্লেখ করেন, “লাইটহাউস রিপোর্টস সরকারের নথির একাধিক সেট সংগ্রহ করেছিল। নথিগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার ক্ষেত্রে তারা অসাধারণ কাজ করেছে এবং আন্তর্জাতিক ও সিরীয়—উভয় ধরনের অংশীদারদের সঙ্গে মিলে সব নিখোঁজ শিশুর একটি ডেটাবেস তৈরি করছিল।”
“অনলাইনে অনেক ভুল তথ্য ছড়িয়ে ছিল। এই সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা তথ্য যাচাই করার, ধরনগুলো খুঁজে বের করার এবং কতজন, কোন নাম ও কোন সংস্থা জড়িত তা ঠিকভাবে বোঝার সক্ষমতা বাড়াতে পেরেছি,” তিনি যোগ করেন। আরো বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল—অন্যান্য গণমাধ্যমের সঙ্গে একই দিনে এই অনুসন্ধানের ফলাফল প্রকাশ করা, যাতে অনলাইনে ছড়ানো কিছু মিথ কেটে যায়, প্রভাব সর্বাধিক হয়, এবং সেই বাবা-মা ও শিশুদের মানসিক যন্ত্রণাগুলো কমানো যায়, যারা এরইমধ্যে কষ্ট ভোগ করেছে।”
দীবও মনে করেন, সহযোগিতার কারণে সবার প্রতিবেদনের মান বেড়েছে। তিনি বলেন, “সিরীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের এই অংশীদারত্ব ছাড়া এর কোনোটাই সম্ভব হতো না। আমাদের আন্তর্জাতিক সহকর্মীরা নতুন ধারণা এবং সূত্র নিয়ে এসেছেন। আমরা যখন সিরিয়ার নথিগুলো বিশ্লেষণ করছি, বিবিসি আইয়ের দলটি তখন দামেস্ক, বৈরুত, অস্ট্রিয়া এবং বোস্টনে গিয়ে শিশুদের সন্ধানে থাকা পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করেছে। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
“আমাদের মধ্যে কেউ একজন যখন মনে করতো যে অনুসন্ধানী কাজের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে, অন্যজন তখন প্রায়ই নতুন কোনো পথ বা সংশ্লিষ্ট সূত্র খুঁজে পেত। আমরা একে অপরের অন্ধ বিন্দুগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতাম। আমাদের সমস্ত তথ্যের প্রতিটিকে বিস্তারিতভাবে যাচাই-বাছাই করতাম,” তিনি ব্যাখ্যা করেন। “সহযোগিতা আমাদেরকে সৃজনশীল এবং নমনীয় হতে সাহায্য করেছে। যাতে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠক ও শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানো যায়। পাশাপাশি সাংবাদিকতার মাধ্যমে আমরা কিভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারি—তা বিবেচনা করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে এখনও পালিয়ে থাকা আল-আসাদ শাসনামলের কর্মকর্তা। নতুন সিরীয় সরকার যারা পরিবারগুলোর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর বৃহৎ আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা এসওএস চিলড্রেন ভিলেজেস ইন্টারন্যাশনাল—যারা নীরবে-নিভৃতে বহু বছর ধরে আল-আসাদ সরকারের শিশু অপহরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আমাদের ডেটাবেস অনুসারে সবচেয়ে বেশি শিশুকে অপহরণ করেছিল,” যোগ করেন দীব।

রিম আল-তুরজমানের নিখোঁজ স্বামী ওসামা এবং ছেলে করিমের পোস্টার। ছবি: বিবিসি
জবাবদিহি ও প্রভাব
কেলি বলেন, “একজন মা এখনও তার শিশু সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন—এই গল্পটি বলা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল, যাতে আমরা দেখাতে পারি আসাদের পর সিরিয়ায় নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে নেমে পরিবারগুলো বর্তমানে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে। রিম আল-তুরজমানের ঘটনাটি ভয়াবহ। ২০১৩ সালে তার স্বামী তাদের দুই বছর বয়সী ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এক বন্ধুকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে যায়। এরপর আর ফিরে আসেন না। বারো বছর পর আমরা তার স্বামী সন্তানকে খুঁজে বেড়ানোর চলমান দৃশ্যগুলোকে চিত্রধারণ করি—যা আমার পেশাজীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক যাত্রাগুলোর একটি।”
“যখন আমরা সিরিয়ায় পৌঁছাই, ততদিনে তিনটি ভিন্ন সরকারি তদন্ত শুরু হয়েছে,” কেলি বলেন। “নতুন গঠিত সিরীয় সরকারও নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে। যদিও তা পুরোপুরি স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল এবং অর্থায়নও প্রায় ছিল না। কয়েক মাস পার হলেও তারা একজন শিশুকেও পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। রিম নিঃসঙ্গ ও অসহায় বোধ করছিলেন এবং জানতেন না ঠিক কার কাছে সাহায্যের জন্য যেতে হবে।”
তিনি আরও জানান, দুটি পৃথক অনুসন্ধান চালাচ্ছিল এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজেস ইন্টারন্যাশনাল। যদিও অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছিল খুবই সীমিত। যা পরিচালনা করছিল নরওয়েজিয়ান আইন সংস্থা। তারা সিরিয়ায় মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করার কোনো পরিকল্পনা করছিল বলে মনে হচ্ছিল না। আল-তুরজমান নিজে যখন সিরিয়ার এসওএস শাখায় যান এবং শিশুদের ছবি দেখার জন্য অনুরোধ করেন, এসওএসের পক্ষ থেকে তখন গোপনীয়তা ও সুরক্ষা সম্পর্কিত কারণে তা অস্বীকার করা হয়। জানানো হয়, ছয় মাস পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের অনুসারি ও দর্শকদের কথা বিবেচনা করে সিরিয়ার চুরি হয়ে যাওয়া শিশুদের নিয়ে করা এই অনুসন্ধানী প্রকল্পটি পডকাস্ট, প্রবন্ধ, ভিডিও প্রতিবেদন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য তৈরি ভিডিও ক্লিপ এবং তথ্যচিত্র আকারে একই দিনে প্রকাশিত হয়। যা বিবিসি ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সম্প্রচার নিশ্চিত করে। আর অবজারভারে প্রকাশিত একটি বিশেষ অনুসন্ধান যুক্তরাজ্যের পাঠকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। ডার শ্পিগেল এবং ট্রাউ-তে প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসওএস সিরিয়ার প্রধান অনুদানদাতা দেশগুলোর মূল তহবিলদাতাদের কাছে সরাসরি পৌঁছানো হয়।
সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য, আল-জুমহুরিয়া সিরীয়দের জন্য দীর্ঘ ও গভীর অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর সঙ্গে সওত নেটওয়ার্কে আরবিতে একটি পডকাস্টও প্রকাশিত হয়, যেখানে অডিওর গভীরতা ও আবেদনকে অটুট রাখার জন্য ব্যবহার করা হয় মা ও শিশুদের কণ্ঠ। পডকাস্টটি সম্পাদনা ও প্রযোজনা করেছেন মেইস ক্যাট (উইমেন হু ওন দ্য ওয়ার-এর সম্পাদক) এবং সালিম সালামেহ। নিজেদের ভাষ্য দিয়ে শুরু করে জোরপূর্বক বিচ্ছিন্নতার মানসিক পীড়ন তুলে ধরেন তারা এবং নিশ্চিত করেন যে পরিবারগুলো পুরো প্রতিবেদনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এই অনুসন্ধানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এসওএস-এর পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন শাখা সিরীয় গ্রামে যা ঘটেছে সে বিষয়ে “আশঙ্কা প্রকাশ” এবং “নিন্দা” জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করে। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, অস্ট্রিয়ায় অবস্থিত এসওএস নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। পাশাপাশি এটাও বলা হয় যে তারা পদ্ধতিগত সংস্কার কাজ শুরু করবে। এসওএস ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রিয়ার বোর্ড চেয়ারম্যান সব কর্মীদের ইমেল করে জানান যে, সংস্থাটি শিশুদের অনুসন্ধান এবং পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার কাজে সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি তাদের কাছে সংরক্ষিত তথ্য যুক্তিসঙ্গত পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে।
সংস্থাটি আরও ঘোষণা করে যে, তিন বছরের মধ্যে এসওএস সিরিয়ার কার্যক্রম বন্ধ করা হবে। বিশ্বব্যাপী এসওএস সদস্য সংস্থার বর্তমান পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ কর্মীদের “রাজনৈতিক সংযোগ যা নিরপেক্ষতা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে” তা যাচাই করা হবে। এছাড়া পরিবারগুলোর যেকোনো প্রশ্নের উত্তরের জন্য রিপোর্টিং দলের পক্ষ থেকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও তৈরি করা হয়।
যৌথ প্রকাশনার কয়েক সপ্তাহ পর দামেস্কে সিরীয় সিভিল সোসাইটি সংগঠনের সঙ্গে লাইটহাউস রিপোর্টস এবং উইমেন হু ওন দ্য ওয়ার যৌথভাবে বিবিসি আইয়ের তথ্যচিত্র “সিরিয়া’স স্টোলেন চিলড্রেন”-এর একটি প্রদর্শনী আয়োজন করে। যেখানে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও অংশগ্রহণ করেন। এরপর প্যানেল আলোচনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে হওয়া ঘটনা এবং সত্য উদঘাটনের দায়িত্বে থাকা সিরিয়ার অস্থায়ী কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করেন ক্যাট। যা ব্যাপকভাবে মিডিয়ার নজর কাড়ে এবং একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে কভারেজ পায়। অনুষ্ঠানের প্রভাব নিয়ে ক্যাট মন্তব্য করেন, “মনে হচ্ছিলো, নিখোঁজ শিশুদের পরিবার এবং ভুক্তভোগীদের কথা সত্যিই প্রথমবারের মতো শোনা হচ্ছে। প্যানেলের পাশাপাশি অনেক সাংবাদিক ও বার্তাকক্ষের প্রতিনিধিরা তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। যা তদন্ত চালানোর জন্য কর্তৃপক্ষের ওপর জোরালো চাপ তৈরি করেছে।”
বিবিসির তথ্যচিত্রটি সিরিয়ায় প্রদর্শনের পর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নিখোঁজ শিশুদের পরিবারদের সঙ্গে কথা বলে—যার মধ্যে আল-তুরজমানও ছিলেন। মন্ত্রণালয় তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ন্যায়বিচার ও অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করা হবে।
প্রকল্পটি ভুক্তভোগী— শিশু ও তাদের বাবা-মা—উভয়ের যন্ত্রণাগুলো আরও ভালোভাবে অনুধাবনের সুযোগ দেয়। কেলি বলেন, “ঘবেইস পরিবারের জন্য যা ছিল প্রথম, যে তারা একে অপরের সঙ্গে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাগুলো শুনতে পেল। যা তাদের যন্ত্রণা কমাতে এবং সম্পর্ক মজবুত করতে সাহায্য করেছে। পরিবারগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী আত্মীয়রা এখন সিরিয়ার এসওএস-এর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছেন।”
নীচে বিবিসির সম্পূর্ণ তথ্যচিত্রটি দেখতে পারেন।
জেস কেলি ব্যাফটা মনোনয়ন প্রাপ্ত তথ্যচিত্র নির্মাতা। ২০২১ সালে “দ্য স্কুলস দ্যাট চেইন বয়েজ” ছবিতে কাজ করেছেন। যেটি রয়েল টেলিভিশন সোসাইটি অ্যাওয়ার্ড, অ্যামনেস্টি অ্যাওয়ার্ড, এআরআইজে গোল্ড অ্যাওয়ার্ডসহ অন্যান্য বড় পুরস্কার জয়ের পাশাপাশি পীবডি মনোনয়ন লাভ করে। ২০১৯ সালে বিবিসির জন্য নির্মিত তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “সিলিকন ভ্যালি’স অনলাইন স্লেভ মার্কেট” গৃহকর্মীদের অবৈধ অনলাইন পাচারের ওপর আলোকপাত করে। এটি পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি বার দেখা হয়েছে এবং জাতিসংঘ ও ব্রিটিশ সংসদে প্রদর্শিত হয়েছে।

হায়া আল বাদারনেহ একজন ব্রিটিশ-জর্ডানীয় সাংবাদিক, প্রযোজক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি লন্ডনে থাকেন এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তার কাজের জন্য পরিচিত। ২০২৪ সালে তার তথ্যচিত্র “লাইফ অ্যান্ড ডেথ ইন গাজা” ব্যাফটা জয় করে। মনোনীত হয় আরও চারটি পুরস্কারের জন্য। ২০২৩ সালে “গাজা ডায়েরিস” এবং “সিরিয়া ক্যাপ্টাগন”নামক ছবিগুলো বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করে।
বাশার দীব লাইটহাউস রিপোর্টসের ওপেন সোর্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক, যিনি মানবাধিকার, সংঘাত এবং ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলোতে মনোনিবেশ করেন। ২০১৮ সাল থেকে তিনি এই ক্ষেত্রে কাজ করছেন। বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ও সংস্থার সঙ্গে একাধিক প্রতিবেদন ও যৌথ কাজ করেছেন। তার দক্ষতার মধ্যে রয়েছে ওপেন সোর্স ইনটেলিজেন্স, ডেটা বিশ্লেষণ, জিওলোকেশন, ক্রোনোলোকেশন, সামাজিক মাধ্যম অনুসন্ধান এবং বিমান ও জাহাজের ট্র্যাকিং।