জার্মানির এক নারী ডানপন্থী উগ্রবাদী গোষ্ঠী নিয়ে অনুসন্ধান। ছবি: স্ক্রিনশট, এআরডি, ইউটিউব
সীমান্ত পেরিয়ে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক উন্মোচন : জার্মানির নারী উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর অন্তরালের গল্প
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
কখনও কখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ বোলানো থেকে একটি অনুসন্ধানের সূত্রপাত হয় । এক্ষেত্রে যেমন হয়েছে একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে। তরুণীরা যেখানে—সাধারণত সোনালী চুল এবং নীল চোখের—চুল বেনী করার নিয়মাবলী, ফ্যাশনবিষয়ক অনুপ্রেরণা এবং চমৎকার সব প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি পোস্ট করে।
কিন্তু দেখতে নিরীহ এইসব কনটেন্টের মধ্যেই রয়েছে রাজনৈতিক বার্তা। এই তরুণীরা “লুক্রেটা” নামক একটি সংগঠনের সদস্য। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া বৃত্তান্ত মাফিক, এটি একটি স্বাধীন নারী গোষ্ঠী। যারা “নারীর নিরাপত্তার জন্য ক্ষমতায়ন” এবং “প্রচলিত লিঙ্গভূমিকা” প্রচার করে, যেখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় মাতৃত্বকে।
কিন্তু #frauenfürfrauen (‘নারী থেকে নারীর জন্য’) হ্যাশট্যাগের আড়ালে তারা “রিমাইগ্রেশন”–এর আহ্বান জানায়। রিমাইগ্রেশন অর্থ ব্যাপক হারে সংখ্যালঘু বা অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বহিষ্কার। যা কিনা উগ্র ডানপন্থীদের একটি বহুল প্রচারিত ধারণা। কিছু নেতা ও রাজনীতিবিদ এটিকে মূলধারার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
আরও খুটিয়ে দেখলে বার্তাটি অনেক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ছবিতে কুয়াশাচ্ছন্ন কৃষিজমির পটভূমিতে হাতে বোনা সোয়েটার পরা একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছেন। ছবিটির ওপর বড় করে লেখা, “তাদের ফেরত পাঠাও”। অন্য একটি ভিডিওতে একজন বক্তা বিভিন্ন অভিবাসী গোষ্ঠী সম্পর্কে কথিত অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরছেন। কিন্তু লুক্রেটা আসলে কী করে? আর সংগঠনটির প্রভাবই বা কতটা?
লুক্রেটার সঙ্গে ইউরোপ এবং বাইরের দেশের উগ্র ডানপন্থী নেটওয়ার্কগুলোর সম্পর্ক এবং এসব নেটওয়ার্কে নারীদের ভূমিকা আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে আমি তিনজন নারী প্রতিবেদকের সঙ্গে কাজ শুরু করি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এআরডির অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম টিম.রেশের্শে আমাদের প্রামাণ্যচিত্র “হোমল্যান্ড, ক্রোশে, হেট স্পিচ: আন্ডারকাভার অ্যামং ফার-রাইট উইমেন” প্রচারিত হয়। একই সঙ্গে বিষয়টির ওপর একটি নিবন্ধও প্রকাশিত হয় এআরডির ওয়েবসাইটে ।
আমরা অনলাইনে থাকা বিভিন্ন কনটেন্ট গভীরভাবে পর্যালোচনা করি। গোপন সোর্সদের সঙ্গে দেখা করি। বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সহযোগীদের সঙ্গে কথা বলি। জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস কংগ্রেস আর পর্তুগালে গোপন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী সম্মেলনে ছদ্মবেশে যোগ দেই।
এই অনুসন্ধানে আমরা ইউরোপজুড়ে থাকা তরুণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী ডানপন্থী কর্মীদের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের সন্ধান পাই। যাদের যোগাযোগ রয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নব্য-নাৎসি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের পোস্ট, ভিডিও আর ইতিবাচক উপস্থাপনাকে ব্যবহার করে অভিবাসীবিরোধী ঘৃণামূলক বক্তব্যকে স্বাভাবিক করে তোলে লুক্রেটা। যেখানে “রিমাইগ্রেশন”–কে নারীর অধিকারের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জার্মানির উগ্র ডানপন্থী দল “অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি” (এএফডি)–এর সদস্যরা নীতিগত এজেন্ডার অংশ হিসেবে রিমাইগ্রেশন বা অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মনোভাব ধারণ করে। এই বিষয়টি ২০২৩ সালে একটি গোপন বৈঠকে আলোচনা করেন এএফডি কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী সমর্থকরা—যা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।
লুক্রেটা নিজেদের স্বাধীন সংগঠন হিসেবে দাবি করলেও এটি মূলত এএফডির প্রভাব বলয়ের একটি অংশ বলে মনে করেন গিসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জুলিয়ানে ল্যাং। তিনি মূলত চরমপন্থা নিয়ে গবেষণা করেন। আমরা তার সঙ্গে কথা বলেছি। ল্যাং এই গোষ্ঠীকে মুখোশধারী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের সুপরিকল্পিত উপস্থিতি এএফডি দলের নিয়োগ কৌশল হিসেবে কাজ করে। এর উদ্দেশ্য দলের এজেন্ডাকে তুলনামূলকভাবে কোমল বা গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা। আমরা আরও দেখতে পাই, ইউরোপ ও ইউরোপের বাইরে এই ধরনের অনুরূপ গোষ্ঠীগুলো বিস্তার লাভ করছে এবং কৌশলগতভাবে একে অপরের সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।
অবশ্যই, উগ্র ডানপন্থী নেটওয়ার্ক নিয়ে অনুসন্ধানে নামলে বড় ধরনের ঝুঁকি ও নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়। “উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করাটা তাই সব সময়ই বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং। এক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়,” বলেন এই প্রকল্পের সম্পাদক এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান লাবো এমের প্রধান সম্পাদক লুইজে হারমান। তিনি যোগ করেন, “সাংবাদিকদের এমন এক পরিবেশে কাজ করতে হয়, যেখানে তাদেরকে বেশিরভাগ সময়ই শত্রু হিসেবেই দেখা হয়।” তাই ছদ্মবেশে বা আন্ডারকাভার হিসেবে কাজ করার সময়সহ পুরো অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পরিকল্পনা ও দলগত কাজ থেকে শুরু করে ছদ্মবেশে প্রতিবেদন তৈরির নিরাপত্তা কৌশল—এই অনুসন্ধানটি পরিচালনার সময় আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো পেয়েছি তা নিচে তুলে ধরা হলো।
দলের সদস্যদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করুন
একটি যৌথ অনুসন্ধানী প্রকল্পের জন্য দলের ভেতর কার কী ভূমিকা তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের ক্ষেত্রে দলে ছিলেন চারজন প্রতিবেদক—আমি ও লিসা গেনৎসকেন, দুজনই ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; আর আলিসা কুস্টার্স ও কিম স্টোপার্ট। যারা সম্প্রচারমাধ্যম সারল্যান্ডিশার রুন্ডফুঙ্ক (এসআর)-এ কর্মরত।
আমাদের প্রত্যেকের দক্ষতার ক্ষেত্রগুলো ছিল আলাদা। কাজের সময় তাই সবাই ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি। আমরা লাবো এম এবং এসআরের সম্পাদকদের সঙ্গেও কাজ করেছি।
বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা এবং টিম-রেশের্শের নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণের জন্য দলের প্রত্যেকের জন্য নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ সূত্র খুঁজেছেন, কেউ অনলাইনে তথ্য অনুসন্ধান করেছেন, কেউ চিত্রনাট্য ও গল্প বলার দিকটি দেখেছেন, আবার কেউ পুরো অনুসন্ধানের মূল ধারাটি ধরে রাখার কাজ করেছেন। সবাই যখন নিজের ভূমিকা অনুযায়ী কাজ করে, তখন পুরো প্রকল্প পরিচালনা করা অনেকটাই সহজ হয়।
“নির্দিষ্ট কিছু বিষয় ঘিরে সবসময় মনোযোগ ধরে রাখাটা সহজ ছিল না,” বলেন এসআরের প্রতিবেদক কিম স্টোপার্ট। তবে শেষ পর্যন্ত, গল্পটি উপস্থাপনের জন্য একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ বা ধরনের ওপর মনোযোগ দিতে পারা সফল অনুসন্ধানী প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছদ্মবেশে অনুসন্ধান: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও পরিকল্পনা
গোষ্ঠীটির আদর্শ, কার্যক্রম এবং নেটওয়ার্ককে গভীরভাবে বোঝার জন্য আমাদের ভেতর থেকে অনুসন্ধান চালাতে হয়েছে। তাই দলের কিছু সদস্য ছদ্মবেশ ধারণ করে কাজ করেন। এটি করতে হলে আগে থেকেই বিস্তারিত পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
“দলের সবার সঙ্গে পরিষ্কার বোঝাপড়া এবং আইনগত দিকনির্দেশনা একেবারে শুরু থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন টিম.রেশের্শের লাবো এম-এর প্রধান সম্পাদক হারমান। তিনি এই প্রযোজনার সমন্বয়ক ছিলেন। তিনি আরও বলেন, “বিশেষ করে ছদ্মবেশ এবং সরেজমিন অনুসন্ধান পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকিগুলো খুব সতর্কভাবে বিবেচনা করা জরুরি।” যেহেতু এসব নেটওয়ার্ক সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষভাবে বৈরী মনোভাব পোষণ করে, তাই অনুসন্ধানের কিছু অংশে ছদ্মবেশ ধারন ছাড়া অন্য কোনো উপায় আছে কি না, তা আমরা সতর্কভাবে বিবেচনা করেছি।
ছদ্মবেশের আশ্রয় নিয়ে আমাদের প্রথম অনুসন্ধানটি করা হয় ২০২৫ সালের জুনে পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত “ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস কংগ্রেস”–এ। এই সম্মেলনটি লুক্রেটা তাদের সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলে প্রচার করেছিল।
এটি যৌথভাবে আয়োজন করে ইউরোপীয় সার্বভৌম জাতিগোষ্ঠী (ইউরোপিয়ান সোভারেন নেশনস বা ইএসএন)—যা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের একটি অংশ। সঙ্গে ছিলেন ইরমহিল্ড বোসডর্ফ, যিনি এএফডি দলের ইএসএন–এর সদস্য। তার মেয়ে রাইনহিল্ড বোসডর্ফ লুক্রেটার প্রতিষ্ঠাতা। আমরা আরও জানতে পারি, এই ধরনের সম্মেলনের আংশিক অর্থায়ন আসে করদাতাদের টাকায়। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নতুন উগ্র ডানপন্থী নারী গোষ্ঠীগুলোও সেখানে উপস্থিত ছিল।
ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস কংগ্রেসে ছদ্মবেশে রিপোর্টিং করার সময় সবার সঙ্গে মিশে যেতে আমরা রক্ষণশীল ধাঁচের, হাঁটু ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরেছিলাম। তুলনামূলকভাবে এটি ততটা কঠিন মনে হয়নি। বিশেষ করে পর্তুগালের পোর্তোতে লিসা গেনৎসকেনের মিশনটা যেমনটা কঠিন ছিল। সেখানে তিনি পর্তুগিজ শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী “রিকনকুইস্তা”–র একটি গোপন সম্মেলনে অংশ নেন। লক্ষ্য করেন, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কেউ কেউ নাৎসিদের মতো করে স্যালুট দিচ্ছেন।
“সেখানে উগ্র ডানপন্থী চরমপন্থীদের এই কট্টোর মনোভাব সত্যিই আমাকে আতঙ্কিত করে তোলে,” বলেন গেনৎসকেন। “আমরা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়েই ভীষণ তটস্ত ছিলাম।”
ছদ্মবেশের আশ্রয় নিয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনটি আমাদের লুক্রেটার নেত্রী রাইনহিল্ড বোসডর্ফের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চরম ডানপন্থী ব্যক্তিত্বদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্মোচন করতে সাহায্য করে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এএফডি সদস্যের সহকারী হিসেবে কাজ করেন বোসডর্ফ। পর্তুগালের রিকনকুইস্তা সম্মেলনে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এমন সব ব্যক্তিরা যারা উগ্র ডানপন্থী মনোভাব পোষণ করেন। যাদের তিনি “ভিআইপি” হিসেবে উল্লেখ করেন—যেমন অস্ট্রিয়ার আইডেনটেরিয়ান আন্দোলনের নেতা মার্টিন সেলনার এবং আইরিশ নাগরিক কিথ উডস, যিনি নিজেকে “চরম ইহুদিবিদ্বেষী” বলে পরিচয় দেন।
আমরা আরও লক্ষ্য করি যে ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস কংগ্রেসে নাৎসি মতাদর্শ এবং প্রতীকগুলো কোনো ধরনের বাধা বা চ্যালেঞ্জ ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ছিল।
কারণ জানতে চাইলে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেস অফিস থেকে আমরা গৎবাঁধা উত্তর পাই। যেখানে করদাতাদের অর্থে এমন অনুষ্ঠানের অর্থায়ন নিয়ে আমাদের নির্দিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেওয়া হয়নি। বোসডর্ফও রিকনকুইস্তাও সম্মেলনে তার উপস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করার অনুরোধে সাড়া দেননি।
এই পরিবেশ সাংবাদিকদের জন্য—বিশেষ করে যারা ছদ্মবেশে কাজ করছেন তাদের জন্য বৈরী হতে পারে। “প্রতিবেদকদের কখনোই একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়, বরং তাদের নিবিড়ভাবে সহায়তা করা এবং ভালোভাবে প্রস্তুত রাখা উচিত,” বলেন হারমান।
ছদ্মবেশী অভিযান পরিচালনার আগে আমরা বিস্তারিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং পরিকল্পনা করেছিলাম। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল:
- অবস্থান, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য বের হওয়ার পথগুলো মূল্যায়ন করা
• স্থানীয় সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা, যারা প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ভালো ধারণা দিতে পারেন
• উপযুক্ত পোশাক নির্বাচন, গোপন ক্যামেরা ব্যবহার, বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া পরিচয় তৈরি এবং ছদ্মনাম ব্যবহার (আলিনা এবং ফেলিক্স—লিসবনে ছুটিতে থাকা এক জার্মান দম্পতি, যারা লুক্রেটার ভীষণ ভক্ত)
• অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে লিসা গেনৎসকেনের সঙ্গে ছিলেন পুরুষ সহকর্মী ক্যাসপার ডুডেক— যা তাকে পুরুষ-প্রধান রিকনকুইস্তা সম্মেলনে সহজে মিশে যেতে সাহায্য করে
• একটি ব্যাক অফিস স্থাপন এবং প্রতি মুহূর্তে প্রতিবেদকদের অবস্থানের তথ্য দেওয়া। এর সঙ্গে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা
“ছদ্মবেশে কাজ করার সময় বোকা বোকা ভাব করা বা আনাড়ির মতো আচরণ করা একটি ভালো কৌশল,” বলেন গেনৎসকেন। তিনি আরো যোগ করেন, মানুষ অন্যকে বোঝাতে বেশ আগ্রহবোধ করে পছন্দ করে—আর অন্যের সামনে তারা যখন নিজেদেরকে বেশি ক্ষমতাবান মনে করে, তখন তারা তাদের আসল চিন্তা, পরিকল্পনা এবং উদ্দেশ্য আরও সহজে প্রকাশ করে।”
অনলাইনে অনুসন্ধান: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার
বিষয়টি শুরু থেকেই বেশ পরিষ্কার ছিল যে, লুক্রেটা এবং তাদের মতো অন্যান্য উগ্র ডানপন্থী নারী গোষ্ঠীগুলো অনলাইনে অত্যন্ত সক্রিয়। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করে এবং এএফডি–এর মতো দলের জন্য নতুন নারী ভোটার সংগ্রহে প্রচারণা চালায়।
বর্তমানে এএফডি–র সদস্যদের মধ্যে নারীদের উপস্থিতির হার প্রতি পাঁচজনে একজন। আমরা এএফডির অভ্যন্তরীণ যে কৌশলগত নথি দেখেছি, সেখানে “গৃহিণী ও মায়েদের” সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জার্মানি ও পর্তুগালের উগ্র ডানপন্থী সম্মেলনে ছদ্মবেশের আশ্রয় নিয়ে কাজ করা প্রতিবেদক লিসা গেনৎসকেনকে নিয়ে তথ্যচিত্রের একটি দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছে। ছবি: গেনৎসকেনের সৌজন্যে
“চরমপন্থী থেকে শুরু করে কট্টর ডানপন্থী টেলিগ্রাম গ্রুপগুলোর রোজকার বার্তা পড়াটা ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। যারা তাদের বিশ্বদর্শনের সঙ্গে খাপ খায় না তাদের সম্পর্কে কীভাবে বৈষম্যমূলক এমনকি সহিংসতার ঘটনাগুলোকে মহিমান্বিত করে দেখানোর মতো ভাষায় কথা বলা হয়,” বলেন এসআরের প্রতিবেদক আলিসা কুস্টার্স। যিনি এই অনুসন্ধানের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কার্যক্রমগুলোর ওপর নজর রাখছিলেন। তিনি আরও জানান “কট্টর ডানপন্থী কর্মীরা কতটা কৌশলগতভাবে কাজ করে তা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।”
এই কৌশলগুলো বুঝতে ও পর্যবেক্ষণ করতে অনুসন্ধানের শুরুতেই ডানপন্থী বিষয়বস্তু লক্ষ্য করে একটি শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম তৈরির পরামর্শ দেন কুস্টার্স । এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইনফ্লুয়েন্সারদের অ্যাকাউন্ট অনুসরণ এবং সঠিক কীওয়ার্ড খোঁজা (যেমন #rechtefrauen / #frauenrechte বা “right women” / “women right”) এবং তাদের কনটেন্টে লাইক দেওয়া প্রয়োজন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “এভাবে আপনি খুব দ্রুত বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পেতে সক্ষম হবেন এবং তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পাবেন।”
তবে মাঝে মাঝে বিরতি নিন। অফলাইন বা বাস্তব জীবনে কিছুটা সময় কাটান। যদিও প্রকৃত তথ্যগুলো মনে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। স্টোপার্ট বলেন, “এই গোষ্ঠীগুলো খুব দ্রুততার সঙ্গে পোস্ট করে। আর যেহেতু তারা প্রতিদিন পোস্ট করে, তাই সহজেই এমন একটা ধারণা তৈরি হতে পারে যে আক্রান্ত হওয়া ছাড়া আপনি রাস্তায় বের হতেই পারবেন না।” যদিও আমাদের এই গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কাজ করার বিপদ এবং তাদের থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরী , তবুও আপনি যে দলটি নিয়ে অনুসন্ধান করছেন তাদের কার্যক্রম ও বিপদ সম্পর্কে সবসময় একটি বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরা উচিত।
সোর্স থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করুন
একটি পরামর্শ, যা প্রায় সব অনুসন্ধানী সাংবাদিকই জানেন, তবে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন: আপনার সোর্স থেকে পাওয়া তথ্য অবশ্যই যাচাই করুন—এবং সেই যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা পাঠকের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন।
আমাদের অনুসন্ধানের সময় আমরা অনলাইনে একটি সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করি, যিনি আমাদের কাছে কিছুটা সন্দেহজনক মনে হয়েছিলেন। আমরা সেই সূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করি।
সোর্সদের দেওয়া তথ্য কার্যকরভাবে ব্যবহার করার একমাত্র উপায় ছিল সরাসরি সাক্ষাৎ করা, তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং তাদের দাবি অন্যান্য প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
আমরা এটি করেছি ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (ওএসআইএনটি) পদ্ধতি ব্যবহার করে—যেমন ছবির মেটাডেটা বিশ্লেষণ, অভিযোগকৃত ঠিকানার জিওলোকেশন নির্ধারণ, এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠন, তাদের কথিত কার্যক্রম, কোম্পানি ও সম্পদ সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা।
তবুও সবকিছু সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে পাঠকের সঙ্গে স্বচ্ছ থাকা জরুরি: আপনি যা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন এবং যা এখনো প্রমাণিত নয়—এই দুটির মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য তুলে ধরতে হবে।
সংগঠিত থাকুন, আর বিভ্রান্ত হবেন না
আমাদের অনুসন্ধান থেকে দেখা যায়, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি এবং সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে লুক্রেটার মতো নতুন উগ্র ডানপন্থী নারী গোষ্ঠীগুলো গড়ে উঠছে। তারা নিজেদের মধ্যে ধারণা বিনিময় করছে এবং একই ধরনের বয়ান ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এটি বিচ্ছিন্ন কিছু গোষ্ঠীর বিষয় নয়, বরং ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্ক, যা পরিকল্পিত ও কৌশলগতভাবে কাজ করছে— আমরা তা দেখাতে সক্ষম হয়েছি। মনে রাখতে হবে, এই গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বয়ানের পক্ষে তথ্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে পারদর্শী।
(লুক্রেটা এবং এ ধরনের অন্যান্য গোষ্ঠী যখন নারীর অধিকারের বিষয়টি নিজেদের বক্তব্যে ব্যবহার করে, তখন তারা সাধারণভাবে নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি নিয়ে খুব একটা আলোচনা করে না। এমনকি উগ্র ডানপন্থার ভেতরে কিছু ব্যক্তি প্রকাশ্যে নারীদের ভোটাধিকার থাকা উচিত নয় বলেও মত দেন—যা গণতন্ত্রবিরোধী ও নারীবিদ্বেষী অবস্থান হিসেবে বিবেচিত।)

লুক্রেটা—জার্মানির উগ্র ডানপন্থী দল এএফডি–এর “প্রভাব বলয়ের” অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বিবেচিত, ইউরোপজুড়ে একই ধরনের মতাদর্শে বিশ্বাসী অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনে ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশ। ছবি: টিআর-এর সৌজন্যে
তারা শুধু অভিবাসীদের পক্ষ থেকে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলোর কথাই উল্লেখ করে। “তারা বড় বড় কিছু ঘটনা তুলে ধরে, সেগুলোকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করে, অথবা সামান্য পরিবর্তন করে দেয়,” বলেন স্টোপার্ট। “এই গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই বাস্তব ঘটনার কথাই বলে, কিন্তু কিছু তথ্য বাদ দেওয়া বা নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে বিষয়টিকে এমনভাবে দেখায় যেন এটি অনেক বড়, এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সমস্যা।”
যদিও এই গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক আমাদের অনুসন্ধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবুও দর্শকের কাছে এই বিষয়টি উপস্থাপন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। বিশেষ করে তথ্যচিত্র আকারে, যেখানে জটিল বিষয়গুলোকে স্পষ্ট, আকর্ষণীয় এবং সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরা জরুরি।
মানুষ, সংগঠন এবং ঘটনার মধ্যে বিস্তৃত সম্পর্কের জালে যদি হারিয়ে না যেতে চান, তাহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো—সংগঠিত থাকুন। কেউ মাইন্ড ম্যাপ ব্যবহার করতে পছন্দ করেন, আবার কেউ স্প্রেডশিট বা ডসিয়ার ব্যবহার করেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনুসন্ধানী দলে যুক্ত সবাই যেন সব তথ্য ও উপাত্তে প্রবেশাধিকার পান।
বিষয়টি আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকাটাও জরুরি। স্টোপার্ট যেমনটা উল্লেখ করেছেন, “সবকিছুর ওপর নজর রাখা বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং ছিল। লুক্রেটার সংযোগ এতটাই বিস্তৃত যে এর সম্পূর্ণ ব্যাপ্তি তুলে ধরা অনেক বড় পরিশ্রমসাধ্য কাজ হতো।”
স্টোপার্ট সাংবাদিকদের এই নেটওয়ার্কগুলো আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান এবং যেসব বিষয় আমরা পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারিনি, সেগুলো খুঁজে বের করার আহ্বান জানান।
ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানকারীদের জন্য লিসা গেনৎসকেনের পরামর্শ হলো: “এই গোষ্ঠীগুলোর নিরীহ ভাবমূর্তি, বিকৃত পরিসংখ্যান এবং ভিত্তিহীন যুক্তিতে বিভ্রান্ত হবেন না। তারা যে আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে তা উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শ—এবং তারা সেটিকে বেশ দক্ষতার সঙ্গে মসৃণভাবে উপস্থাপন করতে পারে।”
সারা উলরিখ (শী/হার) একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদক। তার কাজের মূল বিষয় ক্ষমতার অপব্যবহার, ডানপন্থী (এবং উগ্র ডানপন্থী) নেটওয়ার্ক এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা। তিনি তার প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রান্তিক ও উপেক্ষিত বিষয় এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরতে চান।
উলরিখ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে প্রতিবেদন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন, গুয়াতেমালা, এল সালভাদর এবং আলবেনিয়া। তিনি ইন্টারন্যাশনাল উইমেন্স মিডিয়া ফাউন্ডেশন (আইডব্লিউএমএফ), জার্নালিজমফান্ড এবং ইন্টারন্যাশনাল জার্নালিস্টস প্রোগ্রামস (আইজেপি) সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফেলো।
তিনি জার্মান ব্রিজ সাংবাদিকতা স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন এবং জার্মানির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ সাংবাদিকদের একজন হিসেবে “টপ থার্টি জার্নালিস্ট আন্ডার থার্টি” তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তার অনুসন্ধানী কাজ “দ্য ইনভিজিবল ফ্রন্ট”, যা ইউক্রেনের যৌন সহিংসতার বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে করা। কাজটি সম্প্রতি দাফনে কারুয়ানা গালিজিয়া পুরস্কারের চূড়ান্ত পর্বের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।
