ছবি: অ্যারিয়াডনি পাপাগাপিতোস, লাইটহাউস রিপোর্টস
যৌথ অনুসন্ধান—ভেস্তে যেতে পারে সামান্য একটি ইমেলের ভাষার কারণে এবং আরও যেসব শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে
সবচেয়ে সফল সহযোগিতাকে অনেক সময় মনে হয় সহজ কোনো প্রচেষ্টা। যেখানে প্রতিটি পক্ষের মতামত গুরুত্ব পায়। সবাই সমানভাবে দায়িত্ব পালন করে। আলোচনাকে সমৃদ্ধ করে তোলে ভিন্ন মত ও অভিজ্ঞতা। শেষ পর্যন্ত যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি হয়, তা সবার আলাদা আলাদা কাজের যোগফলের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।
তবে অভিজ্ঞ সম্পাদকরা জানেন, এমন সহযোগিতা সফল করতে কতটা পরিশ্রম লাগে। কেননা যৌথ অনুসন্ধানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসে। আর সেগুলো সামাল দিতে দরকার ধৈর্য, দৃঢ়তা ও শান্ত স্বভাব। অন্যায় উন্মোচন আর পরিবর্তন আনার লক্ষ্য সাংবাদিকদের একত্রিত করলেও, এই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে অনুসরণ করার মতো কোনো একক বা নির্দিষ্ট নিয়ম নেই।
নেদারল্যান্ডসে ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লাইটহাউস রিপোর্টস। বর্তমানে সংস্থাটি বছরে গড়ে প্রায় ১২টি অনুসন্ধান প্রকাশ করে। প্রতিটি অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর আমাদের ইমপ্যাক্ট টিম অংশীদারদের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহ করে। এই পর্যালোচনাগুলো আমাদেরকে সেইসব বিরোধ ও মতভেদ নথিবদ্ধ করতে সাহায্য করে, সাধারণত প্রকাশের পর যে সমস্যাগুলো নিয়ে আর কেউ খুব বেশি কথা বলে না, বা চাপা পড়ে যায়।
সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানের মাঝপথে আমাদের একজন অংশীদার প্রায় সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমার একজন সহকর্মীর পাঠানো ইমেইলের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিক ও “ব্যবসায়িক ধাঁচের” ভাষা তাকে বিরক্ত করে। সেই সময় অন্য একজন অংশীদার হস্তক্ষেপ না করলে তিনি প্রকল্প থেকে সরে যেতেন। পরবর্তীতে আলোচনার সময় তিনি এই অসন্তোষের কথা জানান, যা আমাদের নিজেদের যোগাযোগের ধরনকে আরও মনোযোগ দিয়ে বিবেচনা করতে বাধ্য করে।
কিন্তু এই ধরণের অভিজ্ঞতার কথা জানাটা বেশ কঠিন। ক্ষমতার প্রভাব, ক্রমাগত কমতে থাকা ফান্ডিং এবং অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে অনেক সাংবাদিকই তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে পারেন না। তাই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আমরা আমাদের কাজের মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি আরও বড় করার উদ্যোগ নিই। এর অংশ হিসেবে আমরা ১৯৮ জন ব্যক্তির ওপর বেনামী জরিপ চালাই—যারা সাম্প্রতিক অনুসন্ধানগুলোতে আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন। এই অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম কর্মী, নির্বাসিত সাংবাদিক এবং স্বাধীন ফ্রিল্যান্সাররা। আমাদের অংশীদাররা একটি যৌথ অনুসন্ধান থেকে ঠিক কী আশা করেন এবং আমাদের কাজের পদ্ধতি তাদের কীভাবে সাহায্য করেছে বা কোথায় ব্যর্থ হয়েছে—তা জানতে আমরা স্বাধীন পরামর্শক রোজ ম্যাগুইয়ার এবং অ্যানা ডেন্টের সঙ্গে কাজ করি। যদিও প্রশ্ন এবং উত্তরগুলো কেবল ‘লাইটহাউস’-এ আমাদের কাজের সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল, তবুও আমরা মনে করি এই উত্তরগুলো যৌথ অনুসন্ধান পরিচালনাকারী অন্যদের জন্যও বেশ সহায়ক হতে পারে।
মোট ৭৬ জন জরিপে সাড়া দেন, এবং তাদের স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া সত্যিই আমাদের মুগ্ধ করে। অংশগ্রহণকারীদের সামনে আমরা সাতটি বিকল্প রেখেছিলাম। যার মধ্য থেকে যৌথ অনুসন্ধান সম্পর্কিত তিনটি উদ্দেশ্য বেছে নিতে বলেছিলাম। পাশাপাশি নতুন পরামর্শ দেওয়ার সুযোগও রেখেছিলাম। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে লক্ষ্যগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

আমাদের অংশীদাররা জানিয়েছেন, বাস্তব জীবনে প্রভাব রয়েছে এমন কাজকে তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন । এমন সহযোগিতাকে মূল্য দেন যেখানে স্পষ্ট ও সাহসী লক্ষ্য থাকে। আর এমন প্রকল্পকে পছন্দ করেন যেখানে সৃজনশীলতার সুযোগ রয়েছে। তারা পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ওপর জোর দিয়েছেন। বাস্তব দিকগুলো বিবেচনা করে বলেছেন, তারা এমন সহযোগীদের চান যারা নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত সাড়া দেয় এবং যারা অনুসন্ধানকে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনার মাধ্যমে পরিচালনা করেন। একই সঙ্গে তারা এটিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন যে, প্রতিটি অংশীদারের ভূমিকা এবং একই অনুসন্ধানে অন্যদের ভূমিকা কী—তা যেন শুরু থেকেই পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত থাকে।
সামগ্রিকভাবে, আমাদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে অংশীজনরা মনে করেছেন তারা তাদের গুরুত্বপূর্ণ অনেক লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন। তবে আমরা আরও গভীরে গিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম—যেসব বিষয় তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, সেগুলোতে তাদের সন্তুষ্টির মাত্রা কেমন ছিল। যদিও এই চিত্রটি পুরোপুরি ইতিবাচক ছিল না।
অংশীদারদের মধ্যে যারা তাদের গণমাধ্যম কভারেজের ধরন বৃদ্ধিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন, তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও কম জানান আমাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তারা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন। এককভাবে অনুসন্ধান চালাতে পারতেন না বলে আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করার দিকটিকে যারা গুরুত্ব দিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। পাশাপাশি, যেসব অংশীদার মনে করেছেন সহযোগিতার মাধ্যমে লাইটহাউস রিপোর্টসের বাইরেও অন্যান্য গণমাধ্যম অংশীদারদের সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ, তাদের ক্ষেত্রেও ফলাফল ছিল প্রায় একই ধরনের।

এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যা নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সৌভাগ্যবশত, অংশগ্রহণকারীরা আমাদের সামনে কিছু সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও তুলে ধরেছেন। এর বড় একটি অংশ ছিল যোগাযোগ ও কাঙ্খিত ব্যবস্থাপনা নিয়ে। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেছেন, আমাদের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়াটি যেন শুরুতেই স্পষ্টভাবে জানানো হয় এবং আগে থেকেই তা নিয়ে সম্মত হওয়া, যাতে পরবর্তীতে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি না হয়। তারা এটিও চেয়েছেন যে, প্রভাব তৈরি করতে ঠিক কী প্রয়োজন—সে বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। পাশাপাশি, পরবর্তী অনুসন্ধানগুলো সহজতর করতে লাইটহাউস রিপোর্টসের ভূমিকা কী হবে, সেটিও যেন শুরুতেই স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয় বলে পরামর্শ দেন তারা।
ক্রেডিট দেওয়া এবং প্রকাশনার সময়সূচি নিয়ে অনেক সময় মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা লক্ষ্য করেছেন, বড় গণমাধ্যমগুলো প্রকাশনার সময় নির্ধারণে ছোট প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি প্রভাব খাটাতে পারে। একই সঙ্গে তারা এটিও উল্লেখ করেছেন যে, যারা অনুসন্ধানের একেবারে শুরু থেকে গভীরভাবে কাজ করেছেন—বিশেষ করে স্বাধীন ফ্রিল্যান্সাররা—তাদের সঙ্গে অনেক দেরিতে যুক্ত হওয়া স্টাফ সাংবাদিকরাও প্রায় একই ধরনের স্বীকৃতি পাচ্ছেন। অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যাশা ছিল, এসব বিষয় লাইটহাউস রিপোর্টস যেন আরও ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করে এবং সিদ্ধান্তগুলো যেন সবাইকে সমানভাবে বিবেচনায় রেখে নেওয়া হয়।
আমরা এই উদ্বেগগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবছি। কীভাবে আরও ভালো করা যায় তা বিবেচনার পাশাপাশি আমরা এটিও বুঝি যে কিছু বিষয় আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। লাইটহাউস রিপোর্টসের নেতৃত্বাধীন সহযোগিতাগুলোতে আমরা শুধু রেফারির ভূমিকা পালন করি না; বরং একটি দলের অধিনায়ক হিসেবে কাজ করি। আমরা অনুরোধ করি, মধ্যস্থতা করি এবং আরও ভালো আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করার চেষ্টা করি। যাতে অনুসন্ধানী সহযোগিতাগুলোকে যৌথভাবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়। আর এই প্রক্রিয়ায় আপস-সমঝোতা প্রায়ই একটি স্বাভাবিক বিষয়।
এর মানে এই নয় যে সবকিছুই অত্যন্ত জটিল। আমাদের জরিপের একটি অংশ ছিল যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম এবং পদ্ধতি নিয়ে। আমরা জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের অংশীদাররা তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখতে চান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা কি রিপোর্টিং মেমো, অনুসন্ধানের রোডম্যাপ বা সামারি টেবিল ব্যবহার করে সবাইকে নিয়মিত তথ্য দেই? কাজের সমন্বয়ের জন্য কি আমরা সিগনাল, স্ল্যাক বা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করি? এক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে ভালো কাজ করেছে?
শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, উত্তরটি ছিল—“যেকোনো কিছু।” অনুসন্ধানে যে পদ্ধতি বা প্ল্যাটফর্মই ব্যবহার করা হোক না কেন, প্রায় একই অনুপাতে অংশীদাররা বলেছেন যে তারা নিয়মিত ও বিস্তারিত হালনাগাদ তথ্য পেয়েছেন। আমরা কোন পদ্ধতিটি ব্যবহার করছি, সেটি নিয়ে তাদের খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। বরং গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আমরা যেন নিয়মিতভাবে তাদের তথ্য দেই।
সহযোগিতার আরও জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক দিকগুলো সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে আমরা এটা বলতে পারি—এটি এমন একটি বিষয়, যেখানে ভালো ফলাফল পাওয়াটা সহজ।
হুই ইয়ে তান লাইটহাউস রিপোর্টসের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক। এটি একটি অলাভজনক সংস্থা, যা বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে যৌথভাবে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থাটি জনস্বার্থভিত্তিক গভীর অনুসন্ধানে কাজ করে, যা দেশসীমা অতিক্রম করে। তারা তথ্য অধিকারের মতো প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে ডেটা সায়েন্স এবং ভিজ্যুয়াল ফরেনসিকসের সমন্বয় ঘটায়। লেখক লাইটহাউস রিপোর্টসে যোগদানের আগে দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের ব্যাংকক ব্যুরো প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। সেখানে তিনি থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামের প্রতিবেদন প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন।
