মালাকি ব্রাউন নিউইয়র্ক টাইমসের সেই অনুসন্ধানী সাংবাদিক দলের সদস্য, যারা প্রমাণ পেয়েছিল, ইরানের মিনাব শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক মিসাইল। এতে ১২০ জন শিশুসহ ১৫০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হন। ছবি: স্ক্রিনশট, নিউইয়র্ক টাইমস
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ভিজ্যুয়াল অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কেমন হবে, জানালেন নিউইর্য়ক টাইমসের মালাকি ব্রাউন
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
২০১১ সালের শুরুর দিকে আরব বসন্তের বিভিন্ন ভিডিও সংগ্রহ করছিলেন মালাকি ব্রাউন। সাংবাদিকতার নতুন কোনো ধারা তৈরির কথা তখনও তার মাথায় আসেনি। বাস্তবে কী ঘটেছিল, তিনি কেবল তা বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের হট্টগোলের মধ্যে মোবাইল ফোনে ধারণ করা অস্পষ্ট বা কাঁপা কাঁপা ফুটেজ যাচাই-বাছাইয়ের যে কাজটি প্রথম দিকে কেবল একটি বিশেষায়িত চর্চা হিসেবে শুরু হয়েছিল, আজ তা আধুনিক সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
নিউইর্য়ক টাইমসের ভিজ্যুয়াল ইনভেস্টিগেশনস দলের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ব্রাউন সাংবাদিকতার এমন একটি ধারা তৈরিতে কাজ করেছেন, যেখানে প্রচলিত অনুসন্ধানী কৌশলের সঙ্গে যোগ করা হয় ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণ। তিনি স্যাটেলাইট চিত্র, ভৌগোলিক অবস্থান শনাক্তকরণ এবং ভিডিও বিশ্লেষণের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধের তথ্য উন্মোচন, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রকাশ এবং বিতর্কিত ঘটনার প্রকৃত তথ্য তুলে ধরেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আসে দল গঠনের ধারণা। ব্রাউন বলেন, এই বিষয়ে তাকে ভাবতে প্রাথমিকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল ফরেনসিক আর্কিটেকচার, সিচু রিসার্চ এবং বেলিংক্যাটের মতো সংগঠনগুলো। কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও প্রযুক্তিবিদদের এক সমাবেশে দারুণ একটি সুযোগও জুটে যায়। সেখানে গবেষকেরা যুদ্ধাপরাধের তথ্য নথিবদ্ধ করার নতুন কিছু পদ্ধতি তুলে ধরেন।
২০১৬ সালে যখন নিউইয়র্ক টাইমসে যোগ দেন, মূলত তিনি তখন মূলধারার বার্তাকক্ষগুলোতে ওপেন সোর্স ইনভেস্টিগেশন বা উন্মুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সম্ভাবনা দেখতে পান। তার ভাষায় যা “সংবাদ সংগ্রহের সক্ষমতা ও ব্যাপকতা” তৈরির সুযোগ। ব্রাউন তখন ভিডিও বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ন্যান্সি গসকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদকদের নিয়ে একটি দল গঠনের প্রস্তাব দেন, যারা মূলত ভিডিও ও গ্রাফিকস সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করবেন। ভিজ্যুয়াল অনুসন্ধানের সম্ভাবনাগুলো বোঝার জন্য সম্পাদক মার্ক শেফলার আর গসের সঙ্গে মিলে তিনি ধারাবাহিক কয়েকটি অনুসন্ধানও পরিচালনা করেন। তখন নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন ডিন বাকেট। তিনি একদিন প্রশ্ন ছুড়ে দেন: “এটিকে আমরা কিভাবে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে পারি?” যা দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
ব্রাউন বর্তমানে ভিজ্যুয়াল ইনভেস্টিগেশনস দলের সিনিয়র প্রডিউসার ও এন্টারপ্রাইজ ডিরেক্টর। উন্মুক্ত উৎস থেকে পাওয়া তথ্য যাচাইয়ের সীমিত চর্চাকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছে তার দল। এই সাক্ষাৎকারে তিনি ক্ষেত্রটির বিকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা এবং কেন ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষণ এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি স্পষ্টতা ও দৈর্ঘ্যের কথা বিবেচনা করে সামান্য সম্পাদনা করা হয়েছে।
প্রশ্ন: আপনি যখন সাংবাদিকতা শুরু করেন, বলতে গেলে তখন ভিজ্যুয়াল ইনভেস্টিগেশন নামে কোনো ক্ষেত্রের প্রায় অস্তিত্বই ছিল না। কীভাবে আপনি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হলেন?
মালাকি ব্রাউন: আমি যখন শুরু করি, তখন আমরা এটিকে ভিজ্যুয়াল ইনভেস্টিগেশন বলতাম না। এটিকে বলা হতো ওপেন সোর্স রিপোর্টিং। আমি ডাবলিনে স্টোরিফুল নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি। ২০১০ সালের শেষ ও ২০১১ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চলমান আলোচনাগুলো পর্যবেক্ষণ করত। যেন খবরের উপযোগী ঘটনাগুলো শনাক্ত করা যায়। সেগুলো নিয়ে রিপোর্ট করা যায়। পরে তা যেন ভিজ্যুয়াল অর্থাৎ ছবি, ভিডিও বা গ্রাফিকসের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়। প্রতিষ্ঠানটির কাজের পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমরা কনটেন্টের মালিকদের হয়ে তাদের বিষয়বস্তুর স্বত্ব ব্যবস্থাপনার কাজও করে দিতাম। এমনকি সংবাদমাধ্যমকে এসব কনটেন্ট ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিপরীতে তাদের হয়ে অর্থও উপার্জন করে দিতাম।
ওপেন সোর্স সাংবাদিকতা ও ভিজ্যুয়াল ইনভেস্টিগেশন ঘিরে সেটিই ছিল আমার প্রথম বড় পদক্ষেপ। ওই সময় আমরা মূলত তাৎক্ষণিক ঘটে যাওয়া খবরগুলো নিয়ে কাজ করতাম। ততদিনে আরব বসন্ত শুরু হয়ে গেছে। গণবিপ্লবের ঝড় যখন লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মিসর, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন এসব দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ভিডিও আসা শুরু করে। এরপর ফুকুশিমার সুনামি এবং নরওয়েতে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটে। সবই ছিল ব্যাপকভাবে আলোচিত ভিজ্যুয়াল সংবাদ। তথ্যের এই নতুন ও সমৃদ্ধ উৎসকে কীভাবে বিশ্বাস করা যায়? তা ছিল প্রচলিত বার্তাকক্ষের জন্য চ্যালেঞ্জ। এখানেই ভূমিকা রাখে স্টোরিফুল। ছড়িয়ে পড়া কনটেন্টের বিপরীতে আস্থা তৈরিতে আমরা ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলাম।
প্রশ্ন: সামান্য সূত্র থেকে একটি অনুসন্ধান কীভাবে প্রকাশযোগ্য প্রতিবেদনে রূপ নেয়?
মালাকি ব্রাউন: এটি মূলত দলগত প্রচেষ্টার ফল। আমরা সম্পাদকদের পাশাপাশি ভিডিও ও গ্রাফিকস বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কাজ করি। একটি প্রতিবেদন কীভাবে তৈরি হয়? এটি যে কোনো সংবাদ থেকে শুরু হতে পারে। যেমন, ইরানে একটি স্কুলে বোমা হামলা হলো। এটি কীভাবে ঘটতে পারে, তা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নানা প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রথম প্রশ্ন হলো: ঘটনাটি কি সত্যিই ঘটেছে? তা যাচাই করাটাই প্রথম চ্যালেঞ্জ। এরপর আপনি ওপেন সোর্স রিপোর্টিং, বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তথ্য খোঁজা এবং যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেন, সেগুলো ভিজ্যুয়াল হোক বা লিখিত।
এরপর আপনি ধাঁধার টুকরোগুলো একসঙ্গে মেলাতে বসেন। ঠিক কী ঘটেছে এবং কারা ঘটিয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। আর এসব প্রশ্ন করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কাছে করার মতো কিছু প্রশ্নও তৈরি হয়। কারণ এই ঘটনার জন্য সম্ভাব্য সবচেয়ে দায়ী পক্ষ তারাই ।
নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধানও হতে পারে। টুইটার স্ক্রল করার সময় [২০১৯ সাল] আমার মনে আছে, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একটি পোস্টে বলা হয়েছিল, গত পাঁচ সপ্তাহে সিরিয়ায় প্রতি ২৯ ঘণ্টায় কোনো না কোনো হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র বা অ্যাম্বুলেন্স বিমান হামলার শিকার হয়েছে। বারবার ভুল করে হামলা চালানোর বদলে এক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে এসব স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আর সেখান থেকেই সিরিয়ায় হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে বোমা হামলা নিয়ে একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানের শুরু।
আবার এমন কিছু প্রতিবেদন আছে, যেগুলো কোনো আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা সামাজিক সংকটের প্রতীক হয়ে ওঠে। যেমন, ২০২০ সালে ব্রেওনা টেলর, জর্জ ফ্লয়েড এবং আহমাদ আরবেরিকে হত্যার ঘটনা। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সময় তাদের মৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, এসব ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করা, উত্তর খোঁজা এবং সম্ভাব্য জবাবদিহি নিশ্চিতের চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি উদাহরণ ইউক্রেনের বুচা, যেখানে রাশিয়ার আগ্রাসনের সবচেয়ে গুরুতর নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটেছিল। ২০২২ সালের মার্চে রুশ বাহিনী শহর থেকে সরে যাওয়ার পর সেখানে শত শত বেসামরিক মানুষের মরদেহ পাওয়া যায়। এর জের ধরে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু হয়। কী ঘটেছিল, এর জন্য রাশিয়ার কোন ইউনিট দায়ী এবং হামলাগুলো পরিকল্পনা করে ধারাবাহিকভাবে চালানো হয়েছিল, নাকি বিক্ষিপ্তভাবে—তা খুঁজে বের করতে আমরা একটি জটিল অনুসন্ধানে নামি।

ইউক্রেনের বুচা শহরে রুশ সেনাদের সংঘটিত সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ নিয়ে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমসের ভিজ্যুয়াল ইনভেস্টিগেশনস দল । ছবি: স্ক্রিনশট, নিউইয়র্ক টাইমস
প্রশ্ন: নিউইয়র্ক টাইমসের ভিজ্যুয়াল অনুসন্ধানী দলের অনুসন্ধান পদ্ধতির স্বচ্ছতার বিষয়টি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। আপনারা নিজেদের কাজের প্রক্রিয়াগুলো কেন পাঠকের কাছে তুলে ধরেন?
মালাকি ব্রাউন: কোনো কিছুর প্রমাণ আর তা ঘিরে থাকা প্রশ্ন, সেই প্রমাণের মাধ্যমে কোন সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব এবং আমাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকা প্রমাণ, সবকিছুকে একসঙ্গে মিলিয়ে প্রতিবেদন তৈরির চেষ্টা করি। আমরা শুধু বলে দিতে নয়, দেখাতে চাই এবং অনুসন্ধানের সেই যাত্রায় দর্শককেও সঙ্গে রাখতে চাই।
আমি মনে করি, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা এমন এক সময়ে আছি, যখন মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা কমছে। একই সঙ্গে, জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে কোনটি সত্য, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। কারণ এখন ভুয়া ছবি তৈরি, কিংবা সত্যিকারের ছবিকে কিছুটা পরিবর্তন করে নতুনভাবে উপস্থাপন করা খুব সহজ। এই কারণেই আমাদের কাজের প্রক্রিয়াটি দেখানো গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, মানুষ যেন বুঝতে পারে কীভাবে আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে পৌঁছাই।
গল্প বলা এবং অতিরিক্ত তথ্য দেওয়ার মধ্যে সবসময়ই একটি ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। কখনো আমরা অনুসন্ধানের পদ্ধতি নিয়ে একটি আলাদা অংশ রাখি, এক্স বা ব্লুস্কাইয়ে একটি থ্রেড প্রকাশ করি, অথবা টাইমস ইনসাইডারে একটি নিবন্ধ লিখি।
এটি ওপেন সোর্স কমিউনিটিরও (এমন নেটওয়ার্ক, যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তি ও পেশাজীবীরা উন্মুক্ত উৎস থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন) একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। বলতে পারেন এটি প্রায় আমাদের মজ্জাগত। আমি দেখেছি, আমরা যখন খোলামেলাভাবে কাজ করি, তখন তা এমন ব্যক্তিদের কাছে সংকেত পাঠায়, যাদের কাছে হয়তো আরও তথ্য রয়েছে। এর ফলে নতুন সূত্র এবং আরও অনুসন্ধানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
প্রশ্ন: এই ধরনের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণ হিসেবে মর্মান্তিক বা ভয়াবহ দৃশ্যের ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করতে হয়। এই কাজের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবগুলো কীভাবে সামলান?
মালাকি ব্রাউন: পরোক্ষ মানসিক আঘাত (ভিকারিয়াস ট্রমা) একটি সুপরিচিত বিষয়। এটি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। মানবতার চরম ও নিষ্ঠুর দিকগুলোর সংস্পর্শে বারবার আসার ফলে মনের ওপর প্রভাব পড়ে। সংঘাতের একেবারে সম্মুখসারিতে হয়তো আপনি সবসময় থাকেন না, কিন্তু এর ভয়াবহ পরিণতির সাক্ষী হন। এই বিষয়টি অনুধাবন করা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবস্থাপক হিসেবে আমরা খেয়াল রাখি কারা এর সংস্পর্শে আসছেন এবং মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। পাশাপাশি আমরা কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করি।
গবেষণায় দেখা গেছে অত্যন্ত বীভৎস বা মর্মান্তিক বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে আসাটা বিশেষ করে তখনই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে যখন এর সঙ্গে কর্মক্ষেত্র বা ব্যক্তিগত জীবনের অন্যান্য চাপ যুক্ত থাকে। ঠিক তখনই মানসিক আঘাত বা ট্রমা আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে এবং বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের জন্য বিষয়টি কঠিন। কারণ তাদের তো জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতেই হয়। টাইমসে আমাদের জন্য পেশাদার সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ পাই। এছাড়া, আমাদের দলগত সেশন নেওয়া হয়। যেখানে মনোবিজ্ঞানীরা মানসিক চাপের সতর্কসংকেতগুলো সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন।
কখনো কখনো এ বিষয়ে কথা বলতে আমি অস্বস্তি বোধ করি। কারণ জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং দমকলকর্মীরা প্রতিদিনই ঝুঁকির সম্মুখসারিতে থাকেন। সাংবাদিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কাজের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা। তা যেন আমাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
আমাদের কিছু প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু অত্যন্ত পীড়াদায়ক মনে হয়েছে। তবে এটি অনুপ্রেরণাদায়কও হতে পারে। বিশেষ করে যখন আপনি এমন কোনো বিষয়কে সামনে নিয়ে আসেন, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার কারণে মানুষ প্রতিকূল বা অন্যায্য পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে।
প্রশ্ন: জানুয়ারির ৬ তারিখে মার্কিন ক্যাপিটল হামলা থেকে শুরু করে বুচার গণহত্যা, বিশ্বের অত্যন্ত বিতর্কিত ও সংবেদনশীল এমন সব ঘটনা নিয়ে আপনি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। যেসব ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী বা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন বয়ান প্রচলিত থাকে, সেখানে প্রকৃত সত্য উদঘাটন বা প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে এই অনুসন্ধানগুলো থেকে আপনি কী শিখেছেন?
মালাকি ব্রাউন: ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী বয়ান বা ব্যাখ্যার মূল কারণ হলো গণমাধ্যম পরিবেশ এবং রাজনৈতিক নেতাদের কোনো নির্দিষ্ট আখ্যান বা দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারের প্রবণতা। আমাদের কাজ এর ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রকৃত সত্যটি খুঁজে বের করা। বুচার ঘটনা সম্ভবত প্রথম আমাকে দেখিয়েছে, কোনো ঘটনা ঘটার কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা এমন সব পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি, যা ভবিষ্যতে যুদ্ধাপরাধের বিচারে ব্যবহার করা যেতে পারে। আমরা সরাসরি জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে কাজ করি না; তবে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে এবং তা থেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে আমরা সম্ভবত এটিই তুলে ধরার চেষ্টা করছি যে, এই তথ্য-উপাত্ত কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এই ধরনের কাজ করছে এমন দলগুলোর পেছনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ফরেনসিক আর্কিটেকচার এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংগঠনগুলো ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ফলে তারা অসাধারণ সব অনুসন্ধানও পরিচালনা করছে।
আমার মনে হয়, বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দক্ষতা ও পদ্ধতিগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তাদের আরও এগিয়ে আসতে হবে। আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, এটি আমাকে দেখিয়েছে যে ডিজিটাল জগতে বিপুল পরিমাণ তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। প্রতিবেদক হিসেবে আমরা এসব সংগ্রহ করতে পারি, একত্রিত ও বিশ্লেষণ করতে পারি এবং কী ঘটেছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যবহার করতে পারি। সংঘাতপূর্ণ এলাকা হোক কিংবা একই ঘটনা নিয়ে যখন পরস্পরবিরোধী বয়ান থাকে, উভয় ক্ষেত্রেই আমরা তা করতে পারি।
প্রশ্ন: ভিজ্যুয়াল অনুসন্ধানের দক্ষতা বাড়াতে আগ্রহী সাংবাদিকেরা কোন টুল বা কৌশল দিয়ে শুরু করতে পারেন?
মালাকি ব্রাউন: আমার কাছে এই প্রক্রিয়াটি মূলত তথ্য সংগ্রহ এবং স্থান ও সময়ের ভিত্তিতে সেগুলোকে সাজানোর বিষয়। কোথায় কী ঘটেছে, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, তথ্য-প্রমাণের বিভিন্ন অংশ, ভিডিও ও ছবি, এসব চিহ্নিত করতে আমি গুগল আর্থের মতো টুল ব্যবহার করি। এরপর তা ঘটনার সময়ক্রমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। এই দুটি বিষয় বারবার আমাকে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে বা ঘটনার অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু বুঝতে সাহায্য করে।
সাম্প্রতিক ইরান হামলার একটি উদাহরণ ধরা যাক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ৩০ মিনিটের ব্যবধানে ভিডিওগুলো প্রকাশ হয়। ভিডিওগুলো কোথায় ধারণ করা হয়েছিল, তা যাচাই করার পর আমি নিশ্চিত হতে পারি যে প্রথম দফায় একটি স্কুল এবং তার পাশের একটি ইরানি সামরিক স্থাপনা—দুটিই হামলার শিকার হয়েছিল।
হামলার নেপথ্যে কারা দায়ী হতে পারে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু সম্ভাবনার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। কারণ পক্ষগুলো ততদিনে ওই এলাকায় সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এরপর ভিডিওগুলোর সঙ্গে স্যাটেলাইটের ছবির তুলনা করে বোঝা যায়, হামলাগুলো ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। সম্ভবত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
মানচিত্রের মাধ্যমে সবকিছু তুলে ধরে ক্রমাগত প্রশ্ন করতে থাকলে, আরও অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও প্রশ্ন করার সুযোগ আসে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোলে নিজের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসও তৈরি হয়।
আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, যারা এই ধরনের সাংবাদিকতায় আসতে চান, তাদের জানা উচিত অনলাইনে কিন্তু অসংখ্য রিসোর্স রয়েছে। বেলিংক্যাট বিপুল পরিমাণ তথ্য ও উপকরণ প্রকাশ করে। এক্স ও ব্লুস্কাইয়ে বিভিন্ন কমিউনিটি রয়েছে। ডিসকর্ডেও বিভিন্ন গ্রুপ আছে। যেমন প্রজেক্ট আউল এবং বেলিংক্যাটের নিজস্ব ডিসকর্ড চ্যানেল। এসব আলোচনায় যুক্ত হতে পারেন। অবদান রাখতে পারেন। আর কাজ করতে করতেই শিখতে পারেন। এটাই আসলে শেখার সবচেয়ে ভালো উপায়।
প্রশ্ন: ওপেন সোর্স রিপোর্টিংয়ে নতুন সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ বা পরামর্শ প্রদানের সময় আপনি সবচেয়ে বেশি কোন ভুলগুলো দেখতে পান?
মালাকি ব্রাউন: আমি দেখেছি, মানুষ ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, কারণ তারা এই ধরনের বিশ্লেষণ কীভাবে করতে হয়, তা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। এমনকি আন্তর্জাতিক বড় বড় বার্তাকক্ষগুলোতেও এমনটা হয়। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে আপনি অনুমানের ভিত্তিতে কিছু করছেন না বা ধরে নিচ্ছেন না। অভিজ্ঞ সহকর্মীদের সঙ্গে নিজের কাজের তথ্য-প্রমাণ যাচাই করছেন। এই ধরনের সাংবাদিকতা ভীষণ সহযোগিতামূলক। দলগত পরিবেশে যা সবচেয়ে ভালোভাবে করা যায়। তবে এআইয়ের ফাঁদে পা দেবেন না।
গ্রাফিক কনটেন্ট নিয়ে আপনার আগের প্রশ্নের প্রসঙ্গে আমি আরও বলব, মর্মান্তিক দৃশ্যের ছবি/ভিডিও আপনার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেদিকেও খেয়াল রাখা উচিত। এটি বিভিন্ন মানুষের ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে। শুরুতেই যদি আপনি বুঝতে পারেন যে এটি আপনার ওপর প্রভাব ফেলছে, তাহলে বিষয়টি স্বীকার করুন। আপনার ব্যবস্থাপক বা সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলুন।
সবশেষে, যারা এই ধরনের কাজের প্রতি আগ্রহী, তাদের আমি উৎসাহ দেব। শুরু করুন। নিজে প্রতিবেদন প্রকাশ করুন। যৌথ অনুসন্ধানে অবদান রাখুন অথবা বেলিংক্যাটের মতো সমষ্টিগত উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করুন। এই ধরনের কাজের অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। অসংখ্য গল্প রয়েছে বলার অপেক্ষায়।
প্রশ্ন: ভিজ্যুয়াল অনুসন্ধান ও ওপেন সোর্স রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
মালাকি ব্রাউন: আমার মনে হয়, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের উত্থানই এক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে, বার্তাকক্ষের বাজেট ও জনবল হ্রাসও বড়ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে, বিশেষ করে যাদের ছোট বার্তাকক্ষ।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজের জন্য সময়, দক্ষতা ও ধৈর্য প্রয়োজন। বাজেটের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে থাকা সংবাদসংস্থাগুলোর জন্য এই ধরনের সাংবাদিকতাকে সমর্থন করা কঠিন হয়ে পড়বে। আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, সাংবাদিকতাও দিন দিন ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
আমরা কিন্তু এখন আর কেবল কারও বাড়ির দরজায় সংবাদপত্র পৌঁছে দিই না। আমাদের বরং ভিডিও, গ্রাফিকস এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও ভিন্ন ভিন্ন দর্শকের জন্য কনটেন্ট তৈরি করতে হয়। একাধারে যা নতুন সুযোগও। কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আমরা বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারি।
সবশেষে আমি বলব, বার্তাকক্ষগুলোর দায়িত্ব হলো তাদের প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়াগুলো ব্যাখ্যা করা। কীভাবে দর্শকের আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায় এবং তারা যেন আরও গভীরভাবে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন, তা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা।
প্রশ্ন: আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই ক্ষেত্রটিকে কতটা বদলে দিতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
মালাকি ব্রাউন: আমার মনে হয়, আগামী কয়েক বছরে ভিজ্যুয়াল যাচাই, বিশেষ করে অডিও যাচাই অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। আমরা হ্যানি ফরিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তিনি গণমাধ্যমে কারসাজি এবং এআইনির্ভর কনটেন্ট তৈরি বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ। কয়েক দশক ধরে তিনি এই ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট শনাক্ত করার টুলগুলো কনটেন্ট তৈরির টুলগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। এটি এখন অনেকটা অস্ত্র প্রতিযোগিতার মতো হয়ে উঠছে।
আগামী দিনে আমরা এই ধরনের কনটেন্ট আরও বেশি দেখতে পাব। এর ফলে মানুষের আস্থা আরও কমতে থাকবে। এদিকে রাজনৈতিক নেতারা যখন সত্য ঘটনাগুলো অস্বীকার করতে শুরু করেন, তখন কিন্তু মানুষের অবিশ্বাসের মাত্র আরও বেড়ে যায়।
তাই কঠোর পদ্ধতি, সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এবং নির্ধারিত মানদণ্ডের গুরুত্ব অনেক বেশি। আমাদের মতো দলগুলো তীব্র বিতর্ক ও বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতিতেও সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করে সত্য খোঁজার চেষ্টা করছে। আমার আশা, দর্শকেরা সময়ের সঙ্গে এই কাজের গুরুত্ব আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।
ইতিবাচক দিক হলো, এআই এমন একটি অসাধারণ টুল, যেটির সক্ষমতা আমরা এখন কিছুটা বুঝতে শুরু করেছি। যথাযথভাবে ব্যবহার করা হলে সাংবাদিকদের জন্য তা অত্যন্ত কার্যকর সহায়ক টুল হতে পারে। আমরা এরইমধ্যে বিপুল পরিমাণ ছবি একসঙ্গে বিশ্লেষণের কাজে এটি ব্যবহার করেছি। উদাহরণ হিসেবে গাজার যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিকের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। উত্তর গাজা থেকে পালিয়ে আসা বেসামরিক নাগরিকদের জন্য ইসরায়েল দক্ষিণ গাজার কিছু এলাকাকে নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু আমরা জানতাম, সেখানে বোমা ফেলা হচ্ছে। তবে কতগুলো বোমা পড়ছে, তা জানতাম না। এলাকাটি ছিল বালুময়। তাই বড় আকারের বোমা পড়লে সেখানকার মাটিতে বিশেষ ধরনের গর্ত তৈরি হয়। আমরা স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করি। এআইয়ের একটি মডেল দিয়ে ওই এলাকার আগে ও পরের ছবিগুলো স্ক্যান করাই। মডেলটি নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে নির্ধারিত এলাকাগুলোতে ২ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমার আঘাতে তৈরি গর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ৫০০টিরও বেশি গর্ত শনাক্ত করে। আমাদের একজন প্রতিবেদক ওই প্রতিটি হামলার তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করেন। তিনি নিশ্চিত করেন এগুলো পুরোনো কোনো গর্ত নয়। কিংবা কোনো পানির ট্যাংককে ভুল করে গর্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া আরও ১ হাজার ৬০০টির বেশি গর্ত পাওয়া গিয়েছিল, যা ওই এলাকায় বোমাবর্ষণের ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। আর এই হিসাবটি করা হয়েছিল সংঘাত শুরুর মাত্র এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে।

নিউইয়র্ক টাইমসের ভিজ্যুয়াল অনুসন্ধানী দল প্রমাণ পেয়েছে, গাজার বেসামরিক নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ করিডোরের ভেতরেও ইসরায়েল শত শত বড় আকারের বোমা ফেলেছে। ছবি: স্ক্রিনশট, নিউইয়র্ক টাইমস
জটিল আকৃতি বা যেসব বৈশিষ্ট্য সব জায়গায় একরকম নয়, সেগুলো শনাক্ত করতে এআই ব্যবহার করা কঠিন। তবে মেশিনগুলোও শিখছে। বিপুল পরিমাণ ভিডিও বা ছবিতে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু কিংবা কর্মকাণ্ড শনাক্ত করতেও এআই ব্যবহার করা যায়। যেমন, আপনার কাছে যদি এক সপ্তাহের সিসিটিভি ফুটেজ থাকে, তাহলে একজন প্রতিবেদককে ধরে ধরে প্রতিটি সেকেন্ড দেখতে হবে, এমন নয়। কোন কোন সময়ে নড়াচড়া করা হয়েছে বা ফ্রেমে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু দেখা গেছে, কিছু অ্যালগরিদম তা শনাক্ত করতে সক্ষম।
আরেকটি উদাহরণ হলো উত্তর আমেরিকার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া চীনা নজরদারি বেলুন। আমরা একটি কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে অসংখ্য স্যাটেলাইট ছবিতে ওই বেলুনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো খুঁজে বের করেছি। চীনে বেলুনটি উৎক্ষেপণের পরপরই সেটির গতিপথ অনুসরণ করতে পেরেছি। প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানো পর্যন্ত আমরা এর গতিবিধি শনাক্ত করেছি।
প্রশ্ন: অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা প্রায়ই আশা করেন, তাদের কাজের ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। কিন্তু সবসময় তা হয় না। যখন কোনো প্রতিষ্ঠান তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পরও পদক্ষেপ নেয় না, তখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্বকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মালাকি ব্রাউন: অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রভাব সবসময় একরকম হয় না। কখনো সরাসরি প্রভাব পড়ে, আবার কখনো পড়ে না। অনেক কিছুই নির্ভর করে সেই সময়ের ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের ওপর। তারা অনুসন্ধানের ফলাফলকে মেনে নিতে আগ্রহী নাকি তাৎক্ষণিকভাবে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যায়, তার ওপর। যখন কোনো সরকার বারবার মিথ্যা বলে ও তথ্য গোপন বা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন আপনার কাজের মাধ্যমে প্রভাব তৈরি করা কঠিন হয়ে ওঠে। আবার যখন ধারাবাহিক যুদ্ধাপরাধ বা অন্যান্য গুরুতর নির্যাতনের ঘটনার বিপরীতে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাগুলো খুবই দুর্বল থাকে, তখনও এমন হয়। এসব পরিস্থিতিতে কাজটির তাৎক্ষণিক গুরুত্ব বোঝা কখনো কখনো কঠিন হয়ে যায়। তবে আমি এখনও মনে করি, ঐতিহাসিক নথির জন্য সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার গুরুত্ব অপরিসীম। পরবর্তীতে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকারী বিভিন্ন ব্যবস্থা, সরকারি কৌঁসুলি, ইতিহাসবিদ কিংবা ঘটনার প্রকৃত বিবরণ জানতে আগ্রহী অন্য যে কেউ সেই নথিপত্র ব্যবহার করতে পারেন। তাই তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব দৃশ্যমান না হলেও, কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পাদকের নোট: মূল নিবন্ধটি প্রথমে প্রকাশ করে রয়টার্স ইনস্টিটিউট, তাদের অনুমতি নিয়ে এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে।
মরিস ওনিয়াঙ্গ’ও একজন মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক। তিনি সামাজিক ন্যায়বিচার, দুর্নীতি, প্রকৃতি সংরক্ষণ, গণমাধ্যমের পরিস্থিতি এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করেন। তার কাজ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য কনটিনেন্ট, হান্ড্রেডরিপোর্টার্স এবং রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি থমসন ফাউন্ডেশনের বর্ষসেরা তরুণ সাংবাদিক নির্বাচিত হয়েছেন এবং কেনিয়া মিডিয়া কাউন্সিলের একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। মরিস কলাম্বিয়া জার্নালিজম স্কুল থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
