৫০০ ইউরোর নোট (যা ২০১৯ সালে বন্ধ হয়ে গেছে) এবং মার্কিন ১০০ ডলারের নোট অর্থ পাচারকারীরা বিপুল পরিমাণ অবৈধ মুদ্রা স্থানান্তরের জন্য নিয়মিত ব্যবহার করে থাকে। ছবি: শাটারস্টক
বছরে অর্থপাচার হয় প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, সাংবাদিকরা যেভাবে প্রতিরোধ গড়তে পারে
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
অর্থ পাচার এমন একটি অপরাধ, যা অন্য অপরাধকে লাভজনক করে তোলে—সাংবাদিক অলিভার বুলো তার সাম্প্রতিক বইয়ে এমনটাই বলেছেন। মোবাইল ফোন চুরি, প্রতারণা, মাদক পাচার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড—সবই অর্থ পাচারের মাধ্যমে টিকে থাকে। তাই তিনি সতর্ক করে বলেন, অবৈধ অর্থ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে।
ওয়েলসে জন্মগ্রহণকারী বুলো ২০১৪ সাল থেকে আর্থিক অপরাধ নিয়ে লিখছেন। এই বিষয়ে তার অনুসন্ধানী বই “এভরিবডি লাভস আওয়ার ডলারস”-এর মূল বার্তাটি কিন্তু বেশ উদ্বেগের: ‘কীভাবে অর্থ পাচারের জয় হয়েছে।’
ফ্যাক্ট কোয়ালিশনের নির্বাহী পরিচালক ইয়ান গ্যারি আয়োজিত বই নিয়ে আলোচনায় বুলো উল্লেখ করেন, প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ২ থেকে ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অর্থের পরিমাণকে যদি একটি দেশের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে সেটি বিশ্বের তৃতীয় থেকে ১১তম ধনী দেশের মধ্যে থাকতো। দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন চুক্তি, কূটনৈতিক উদ্যোগ, আইন এবং টাস্কফোর্স গঠনের পরও এই আনুমানিক পরিমাণ প্রায় একই রয়ে গেছে।
বুলো জানান, তার নতুন বইয়ে তিনি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন, আমাদের অর্থ পাচারবিরোধী ব্যবস্থার ঠিক কোথায় ত্রুটিটি গেঁথে আছে এবং সেটি কীভাবে ঠিক করা যায়।
তিনি জিআইজেএনকে দেওয়া এক পৃথক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি যা খুঁজে পেয়েছি তা মূলত একদিকে আইনজীবী, প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর অন্যদিকে অর্থপাচারকারীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতার গল্প।” অর্থ পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে যেকোনো চেষ্টা করা হলে, সঙ্গে সঙ্গেই তারা নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে। খুবই চৌকস এই অপরাধীরা সব সময় তাদের অর্থ সরানোর নতুন উপায় খুঁজে বের করে।”
তিনি আরও বলেন, “এই নতুন নতুন কৌশলগুলো একটির ওপর আরেকটি ধাপে ধাপে যোগ হতে থাকে, ফলে বিষয়টি ক্রমেই আরও জটিল ও বোঝা কঠিন হয়ে ওঠে… সবকিছু একসঙ্গে যোগ হলে, এটি প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।”
বুলো তার সাংবাদিকতা জীবন যখন শুরু করেন রাশিয়ায় ঠিক তখনই পুতিন ক্ষমতা কুক্ষিগত করছিলেন।। তিনি মস্কোতে রয়টার্সের হয়ে কাজ করেছেন এবং চেচনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। তার পুরস্কারজয়ী বইগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অবৈধ অর্থনীতি নিয়ে অনুসন্ধান করেছে (“মানিল্যান্ড”), এবং পশ্চিমা সহায়ক পক্ষগুলো নিয়ে অনুসন্ধান করেছে—যেমন সেই সব আইনি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং পিআর কোম্পানি যারা অবৈধ অর্থ ও ভাবমূর্তি বৈধ করতে সাহায্য করে (“বাটলার টু দ্য ওয়ার্ল্ড”)। তিনি আন্তর্জাতিক মিডিয়া সংস্থা কোডা স্টোরির জন্য ‘অলিগার্কি’ নামক নিউজলেটার লেখেন। পাশাপাশি লন্ডনের বিলাসবহুল সম্পত্তিগুলো ঘিরে ক্লেপ্টোক্রেসি ট্যুর (বিলাসবহুল সম্পত্তিগুলো কীভাবে ধনী ও ক্ষমতাবানদের অবৈধ সম্পদের উৎস বা দুর্নীতির সঙ্গে সম্পর্ক তা তুলে ধরা) পরিচালনা করেন।
‘ড্রাগস ফর গুচি’
“অর্থপাচার অত্যন্ত উদ্যোক্তাসুলভ কর্মকাণ্ড… এবং ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে আরও বেশি পরিশীলিত হয়ে উঠেছে।” ওয়েবিনারে বিস্তারিতভাবে এটি নিয়ে বলেন বুলো।
বুলোর লেখা এই বইটিতে বিশ্বব্যাপী অর্থপাচারের রহস্যময় জগতের কিছু চমৎকার দিক তুলে ধরা হয়েছে। অপরাধকে লাভজনক করে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে বলেই যন্ত্রাংশ আমদানিতে নানাবিধ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া ইউক্রেনজুড়ে ড্রোন ব্যবহার করতে পারছে। ঠিক একই কারণে অপরাধী চক্রগুলোর কাছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে নারী পাচার করা একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

অলিভার বুলোর সর্বশেষ অনুসন্ধানী বই “এভরিওয়ান লাভস আওয়ার ডলারস” বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা অর্থ পাচারের সমস্যাটি নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেছে। ছবি: বুলোর সৌজন্যে
প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ সাইপান ও তিনিয়ানে বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ক্যাসিনোগুলো থেকে চীনা অর্থ পাচার সংক্রান্ত নথিপত্রের এক বিশাল ভাণ্ডার খুঁজে পেয়েছেন বুলো। আর ইংল্যান্ডের শহরতলির একটি আউটলেট মল যেখান থেকে আন্তর্জাতিক পর্যটকরা দামী হ্যান্ডব্যাগ কেনেন—এগুলো এই বিশ্বব্যাপী অর্থপাচারের গোলকধাঁধার আরও দুটি অংশ। এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করার সময় এই বইটি লেখার ধারণা পান তিনি। সেদিন তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডশায়ারের ডিজাইনার আউটলেট শপিং সেন্টার বিসেস্টার ভিলেজ নিয়ে কথা উঠেছিল। তিনি মন্তব্য করেন, এই মলটি চীনা ক্রেতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয় বলে মনে হয়—যা যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমেও প্রায়ই উল্লেখ করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেন, লুই ভুইতোঁ ব্রান্ডের হ্যান্ডব্যাগ কেনার উম্মাদনার পেছনে আমরা যা চোখে দেখি তার চেয়েও গভীর কিছু লুকিয়ে আছে: “অনেকেই স্পষ্টতই কেনাকাটা করতে পছন্দ করে, কিন্তু বাকি অংশটা হলো অর্থ পাচার,” বলেন তিনি।
তিনি আরো জানান, চীনের কারখানাগুলো থেকে ব্রিটিশ অপরাধী চক্রের কাছে মাদক পাঠানো হয়, আর এর বিনিময়ে সেই অর্থ নগদে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চীনা শিক্ষার্থীদের কাছে দেওয়া হয়। “শিক্ষার্থীরা সেই টাকা নিয়ে হয় বিসেস্টার ভিলেজে যায়, অথবা কেনাকাটা করতে যাওয়ার আগে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে তারপর যায়; এরপর তারা গুচির হ্যান্ডব্যাগ বা এ ধরনের পণ্য কিনে সেগুলো চীনে পাঠায়, যেখানে অপরাধীরা সেগুলো ফ্যাশনপণ্যের ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে… পুরো প্রক্রিয়াটি উইচ্যাটের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়, আর আমরা তাদের গতিবিধি ধরতে হিমশিম খাই।”
তাহলে, যদি অর্থ পাচারই জিতে গিয়ে থাকে, সাংবাদিকরা কী করতে পারেন? বুলোর কিছু প্রাথমিক ধারণা আছে, যেগুলো তিনি বই আলোচনা এবং জিআইজেএনকে দেওয়া এক পৃথক সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন।
১: অর্থ পাচারবিরোধী নিয়ন্ত্রক কাঠামো বুঝে নিন
অর্থ পাচার প্রতিরোধের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে বুলো উত্তর-পূর্ব টেক্সাসে যান। অর্থ পাচার সংক্রান্ত সকল আইনের ‘জনক’ হিসেবে পরিচিত কংগ্রেস সদস্য রাইট প্যাটম্যানের নির্বাচনী এলাকায় পৌঁছান। যিনি ১৯২৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্যাটম্যানের প্রচেষ্টার ফলে স্বর্ণযুগ (গিল্ডেড এজ) পরবর্তী সময়ের গৃহযুদ্ধের ঋণ পরিশোধের প্রেক্ষাপটে একটি অধিকতর ন্যায়সঙ্গত আর্থিক ব্যবস্থা গড়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন কংগ্রেস ১৯৭০ সালে ‘ব্যাংকিং সিক্রেসি অ্যাক্ট’ পাস করে। এই আইনের আওতায় মার্কিন ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারি সংস্থাকে অর্থ পাচার শনাক্ত ও প্রতিরোধে নজরদারি এবং তথ্য প্রদানের মাধ্যমে সহায়তা করা বাধ্যতামূলক করা হয়।
ব্যাংকিং সিক্রেসি অ্যাক্ট-এর আওতায় ব্যাংকগুলোকে ১০,০০০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি পরিমাণের লেনদেনের তথ্য রিপোর্ট করতে হয়। ওয়েবিনারে বুলো ব্যাখ্যা করেন, এটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমাজের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে তারা যে অর্থ লেনদেন করছে তার উৎস যেন যাচাই করে দেখে।
তবে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল ১৯৮৯ সালে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) গঠন। এটি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ দেওয়াকে প্রতিরোধে কাজ করে। সংস্থাটি মূলত বিভিন্ন সুপারিশ প্রদান, নিয়ম নির্ধারণ, বিভিন্ন দেশের অর্থ পাচারবিরোধী মানদণ্ড মূল্যায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করার মাধ্যমে এই কাজ করে থাকে।
সাইপান ও তিনিয়ানে তার অভিজ্ঞতা—এবং সেখানে অর্থ পাচারসংক্রান্ত যে নথিপত্র তিনি পেয়েছিলেন—সেগুলো ব্যবহার করে বুলো একটি বড় বিষয় তুলে ধরেন। যাকে তিনি এফএটিএফের ভেতরের “স্বার্থের সংঘাত” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ কমনওয়েলথ (সিএনএমআই)—যা গুয়ামের ঠিক উত্তর-পূর্বে অবস্থিত একটি মার্কিন কমনওয়েলথ এলাকা—সেখানকার ক্যাসিনোগুলোর মাধ্যমে “বিশাল অংকের” অর্থ পাচার করা হয়েছে। অথচ একই সময়ে মার্শাল আইল্যান্ডসের মতো অন্যান্য অঞ্চলকে অফশোর অর্থায়ন ও ব্যাংকিং গোপনীয়তার কারণে এফএটিএফের কড়া নজরদারি ও জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সিএনএমআই ভিত্তিক ক্যাসিনোগুলোকে মার্কিন ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (FinCEN) বিশাল অংকের জরিমানা করেছে। স্থানীয়ভাবেও কিছু কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে বুলো বলেন, “সিএনএমআই একটি বিশাল সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে; এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা, বিশেষ করে চীন থেকে আসা অর্থ পাচার ঠেকানোর ক্ষেত্রে।”
এই বছর এফএটিএফের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে এফএটিএফের পর্যায়ক্রমিক সভাপতিত্ব গ্রহণ করবে যুক্তরাজ্য। পাশাপাশি, এই বছরই মূল্যায়নকারীরা ওয়াশিংটনে যাবেন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তার অর্থ পাচার বিরোধী মানদণ্ড নিয়ে পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন এক সময়ে এই পর্যালোচনা হচ্ছে যখন অবৈধ অর্থায়ন রোধে মার্কিন নেতৃত্ব কিছুটা শিথিল হয়েছে। অথচ ঐতিহাসিকভাবেই অবৈধ অর্থায়ন মোকাবিলা এবং এর জন্য দায়ীদের কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে।
তবুও, ট্রাম্প প্রশাসনের করপোরেট ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টকে দুর্বল করে ফেলার সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে স্পষ্টভাবে পেছনের দিকে যাওয়া হিসেবে বুলো উল্লেখ করেছেন। একইভাবে, সম্প্রতি হন্ডুরাসের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমা করে দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতি সহনশীলতা, এবং সন্দেহজনক কোম্পানিগুলোর নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাওয়া—এসবই ইঙ্গিত দেয় যে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অবস্থান ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে।
“আর্থিক অপরাধ দমনের হাতিয়ার হিসেবে আমি যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি জিনিস যুক্ত করার সুযোগ পেতাম, তবে তা হতো বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নিবন্ধিত করপোরেট কাঠামোর মালিকানা সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অন্তত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য হলেও,” বুলো বলেন। তিনি আরও যোগ করেন, এফএটিএফ গঠনের সময় প্রণীত তাদের ৪০টি সুপারিশমালাও এখন আধুনিকায়ন বা হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
২. বড় মূল্যমানের নোট কেন অপরাধকে সহজ করে তোলে
“নগদ ডলার—বা কিছুটা কম মাত্রায় নগদ ইউরো ও পাউন্ড—হলো… অপরাধের আন্তর্জাতিক মুদ্রা,” লিখেছেন বুলো। “ব্যাংকনোট হলো যেকোনো অর্থ পাচারকারীর জন্য সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।”
তিনি বলেন, বিশেষ করে বড় মূল্যমানের নোটের ক্ষেত্রে এটি আরও সত্য, কারণ একই পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করতে কম নোট লাগে। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার ডেভিড ভেনেসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লেখেন, যিনি একসময় বলেছিলেন: “মেডেলিন এবং মস্কোর মধ্যে সংযোগ হলো ১০০ ডলারের নোট।”
“মুদ্রিত ডলারের মোট মূল্যের প্রায় ৮০ শতাংশই ১০০ ডলারের নোটে থাকে, যা সত্যিই বিস্ময়কর—কারণ আপনি এগুলো খুব একটা দেখেন না,” বুলো উল্লেখ করেন।
এবং এই ১০০ ডলারের নোটগুলোর প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ বিদেশে চলে যায়—ফলে এগুলো ওষুধের চেয়েও বেশি মূল্যবান একটি রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়—যেখানে এগুলো মূলত অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়।
অপরাধের সঙ্গে কাগুজে মুদ্রার চাহিদাও জড়িত। তার অধ্যায় ‘দ্য বাক স্টার্টস হিয়ার’-এ বুলো আবারও টেক্সাসে ফিরে যান, এবার ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকায়, সেখানে ‘ওয়েস্টার্ন কারেন্সি ফ্যাসিলিটি’ ফেডারেল রিজার্ভের জন্য বেশিরভাগ নতুন ডলার ছাপায়—দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ অর্থের ব্যবহার কমলেও এই নোটগুলোর বিশাল চাহিদা মেটাতে তারা কাজ করে যাচ্ছে।
তাহলে দেশগুলো কেন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাংকনোট ছাপছে—যুক্তরাষ্ট্রে তো বটেই, ইউরোপ, নিউজিল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরেও? বুলো লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ব্যক্তির জন্য ৭,৩৫৭ মার্কিন ডলার পরিমাণ নগদ অর্থ বাজারে বিদ্যমান।” ইউরোজোনে প্রতি বাসিন্দার বিপরীতে এই পরিমাণ ৪,৫০০ ইউরো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের এই ‘হারিয়ে যাওয়া’ মুদ্রা নিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে খুব কমই বলতে শোনা যায়—বুলো এমনটাই পর্যবেক্ষণ করেন। একইভাবে, বড় অঙ্কের নোট কেন সবচেয়ে জনপ্রিয়, যদিও বেশিরভাগ মানুষ সাধারণত ছোট নোট বেশি ব্যবহার করে, সেটিও একটি প্রশ্ন।
১৯৭০-এর দশকে ম্যাককিনসের একজন পরামর্শক উল্লেখ করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে কেবল দুটি ক্ষেত্রে বড় অংকের, অশনাক্তযোগ্য এবং ক্রেডিট-বিহীন (নগদ) লেনদেনের প্রয়োজন পড়ে: “প্রথমটি হলো মুনাফা-ভিত্তিক অপরাধ… আর দ্বিতীয়টি হলো কর ফাঁকি।”
৩. স্টেবলকয়েনের উত্থান
ক্রিপ্টোকারেন্সি এখনো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবৈধ অর্থ সরানোর পুরোনো পদ্ধতিগুলোকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করেনি বলে উল্লেখ করেন বুলো, তবে অর্থ পাচারের গল্পে এটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ: “এটি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কম খরচে, দ্রুতগতিতে আর্থিক মূল্য স্থানান্তরের একটি খুবই কার্যকর উপায়।”
অর্থ পাচারকারীদের জন্য ক্রিপ্টো এক ধরনের আশীর্বাদ, কারণ ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং স্টেবলকয়েন প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে কাজ করে। বিশেষ করে স্টেবলকয়েন এখন ক্রমবর্ধমান কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত কিন্তু বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
“অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু নয়, বরং দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়েও যে বিষয়টি ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, তা হলো ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যের মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ,” ওয়েবিনারে বুলো বলেন।
তিনি আরও বলেন, “যেহেতু কোনো লেনদেন সম্পন্ন করতে হলে তা নিউইয়র্কের মাধ্যমেই হতে হয়, তাই এটি যুক্তরাষ্ট্রকে রুশ শাসনব্যবস্থা বা অনুরূপ অন্যদের কার্যক্রমের ওপর এক ধরনের আইনি কর্তৃত্ব প্রদান করে। যা একদিকে শক্তির উৎস, আবার অন্যদিকে পুতিন ও তার সহযোগীদের জন্য বড় দুর্বলতার জায়গাও তৈরি করেছে।”
স্টেবলকয়েন যেমন টেথার (ইউএসডিটি) এবং ইউএসডিসি অপরাধীদের যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের বাইরে থেকে মার্কিন ডলারে লেনদেন করার সুযোগ দেয়, তিনি যোগ করেন।
“এখন আমরা দেখছি, স্টেবলকয়েন ব্যবহার করছে—উদাহরণ হিসেবে কলম্বিয়ার মাদক কার্টেল, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড, এবং কম্বোডিয়ায় থাকা স্ক্যাম কারখানাগুলো, যেগুলো চীনা সংগঠিত অপরাধচক্র দ্বারা পরিচালিত—এদের অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক এখন অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে,” বুলো বলেন।
৪. গল্প খুঁজে বের করা
বইয়ের শেষ অংশে বুলো লিখেছেন, অন্য সব চ্যালেঞ্জের পেছনে থাকা মূল প্রশ্নটি হলো—কীভাবে আমরা অর্থ পাচার ও দুর্নীতি উন্মোচন করতে পারি, যাতে অপরাধীরা দায়বদ্ধ হয়?
“আমি যেটা জানি, সেটাই হলো গল্প বলা,” তিনি লিখেছেন। “নিষ্ক্রিয়তার কারণে যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটিকে সামনে আনা এবং সরকার যদি অবশেষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি কতটা ভালো হতে পারে—তা জোর দিয়ে তুলে ধরা।”
জিআইজেএনের প্রশ্নের উত্তরে এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুলো বলেন, “আমাদের যে সমস্যাগুলো আছে, তার একটি হলো—রাজনীতিবিদদের এই সমস্যার গুরুত্ব বোঝানো… এটি শুধু আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে যুক্ত।”
বুলো পরামর্শ দেন সাংবাদিক ও গবেষকদের উচিত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কীভাবে অপরাধমূলক সম্পদ স্থানান্তরিত হয়, তা বোঝার চেষ্টা করা এবং এই “হারিয়ে যাওয়া” ব্যাংকনোটগুলো কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে—তা অনুসন্ধান করা।
তিনি আরও যোগ করেন, “আমি মনে করি না সাংবাদিকদের জন্য তথ্যের ঘাটতি আছে। আমার মনে হয় কোনো কারণে এই ধরনের গল্পগুলো যতটা প্রভাব ফেলতে পারত, ততটা প্রভাব ফেলতে পারছে না।”
“আমি মনে করি, যেভাবে আমরা গল্পগুলো বলি… আমাদের আরও সৃজনশীল হতে হবে,” তিনি ইতি টেনে বলেন। “এমনভাবে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে, যেখানে রাজনীতিবিদদের সামনে সঠিক কাজ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।”
অ্যালেক্সা ভ্যান সিকল জিআইজেএনের সহযোগী সম্পাদক ও সাংবাদিক। তিনি ডিজিটাল ও প্রিন্ট সাংবাদিকতা, প্রকাশনা, এবং আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাঙ্ক ও অলাভজনক সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। জিআইজেএনে যোগ দেওয়ার আগে তিনি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিদেশি সংবাদ ও ভ্রমণ ম্যাগাজিন রোডস অ্যান্ড কিংডমস-এর জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ও পডকাস্ট প্রযোজকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া অ্যান্থনি বোরডেইনের জনপ্রিয় টিভি শো পার্টস আননাউন এর সম্পূরক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এক্সপ্লোর পার্টস আননাউন-এ লেখালেখি করতেন।