ছবি: নাসা ইমেজ ও ভিডিও লাইব্র্রেরি।
ইরানের স্কুলে বোমা হামলা, যুক্তরাষ্ট্র কেন স্যাটেলাইট ছবিতে গণমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত করেছিল
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
[সম্পাদকের মন্তব্য: এই প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল হালনাগাদ করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কিন সরকারের অনুরোধে প্ল্যানেট ল্যাবস (Planet Labs) এখন তাদের মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত স্যাটেলাইট চিত্র অনির্দিষ্টকালের জন্য জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রাখছে। এছাড়া একাধিক সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে টমাহক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী।]
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাব শহরে মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর প্রায় ১৭৫ জন নিহত হয়—যাদের বেশিরভাগই শিশু। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পরবর্তী দিনগুলোতে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার ওপেন সোর্স অনুসন্ধানী দলগুলো হামলার উৎস খুঁজে বের করতে স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে। কিন্তু এখন, স্যাটেলাইট চিত্রের অন্যতম বৃহৎ দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবস এবং ভ্যান্টর সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে স্যাটেলাইট চিত্র বা ইমেজ দেখার সুযোগ সীমিত করেছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুরোধে প্ল্যানেট ওই অঞ্চলের সব ছবি বন্ধ করে দিয়েছে। যেসব ছবি সাংবাদিকরা ব্যবহার করেছিলেন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে যে, স্কুলে প্রাণঘাতী হামলার জন্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের ছোড়া টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দায়ী। এর আগে প্ল্যানেট তাদের আর্কাইভে থাকা ছবিগুলোর প্রবেশাধিকার দুই সপ্তাহের জন্য সীমিত করেছিল। নতুন নীতির ফলে এখন সম্পূর্ণভাবে ছবি ব্লক করা হয়েছে। ভ্যান্টরও সংঘাতসংক্রান্ত ছবিতে কারা প্রবেশাধিকার পাবে, তা সীমিত করতে যাচ্ছে।
এখন থেকে প্ল্যানেট ওই অঞ্চলের সব ছবির ক্ষেত্রে কোম্পানির ইমেজ আর্কাইভে দুই সপ্তাহের একটি স্থগিত নীতি প্রয়োগ করবে—যে ধরনের ছবিই সাংবাদিকরা ব্যবহার করেছিলেন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে যে স্কুলে প্রাণঘাতী হামলার জন্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের ছোড়া টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দায়ী ছিল। ভ্যান্টরও সংঘাতসংক্রান্ত ছবিতে কারা প্রবেশাধিকার পাবে, তা সীমিত করবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন। তবে তিনি যোগ করেন: “ওপেন সোর্স কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জায়গা নয়, যা দিয়ে কী ঘটেছে বা ঘটেনি তা নির্ধারণ করা যায়।”
প্ল্যানেট ল্যাবস এবং ভ্যান্টর—উভয়েরই ফেডারেল সরকারের সঙ্গে অসংখ্য চুক্তি রয়েছে। যেখানে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও অন্তর্ভুক্ত। এক বিবৃতিতে প্ল্যানেট জানায়, এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে “সরকারের ভেতরে ও বাইরে থাকা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শের পর… যাতে ছবিগুলোর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সীমিত করা যায় এবং প্রতিপক্ষ শক্তির হাতে সেগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে পৌঁছে যাওয়া ও কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি এড়ানো যায়।”
ভ্যান্টর দাবি করেছে স্যাটেলাইট ছবি সম্পর্কিত এই সীমাবদ্ধতা সরকারের অনুরোধে করা হয়নি। এক বিবৃতিতে তারা আরও জানিয়েছে, “ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সময় ভ্যান্টর সংবেদনশীল ভূ-স্থানিক গোয়েন্দা তথ্যের অপব্যবহার রোধে উন্নত প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে পারে।”
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য বড় ঝুঁকি
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, বেলিংক্যাট, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি এবং অন্যান্য সংবাদ সংস্থার ওপেন সোর্স পদ্ধতি ব্যবহারকারী অনুসন্ধানী দলগুলো স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে দেখিয়েছে, মিনাবের স্কুলে একটি নির্ভুল অস্ত্র আঘাত হেনেছিল। ভিডিও ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রের ধরনও শনাক্ত করা হয়েছে।
ইউক্রেনে যুদ্ধের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করা থেকে শুরু করে মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টদের হাতে অ্যালেক্স প্রেটির গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে সরকারি ব্যাখ্যার বিরোধিতা করা পর্যন্ত—স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ওপেন সোর্স সাংবাদিকতার পদ্ধতি কীভাবে যুদ্ধের বয়ান বদলে দিচ্ছে এটি তারই সাম্প্রতিক আরেকটি উদাহরণ। (যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল ইমিগ্রেশন—আইসিই, আইস নামে পরিচিত—এজেন্টদের গুলিতে অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হন। ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারিতে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় এই ঘটনা ঘটে।)
“এ ধরনের ঘটনা অনুসন্ধানে প্ল্যানেটের ছবির মান দারুণ কার্যকর। বিবিসি ভেরিফাইয়ের অনুসন্ধানী দলের মের্লিন থমাস ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘প্ল্যানেটের উচ্চ রেজল্যুশনের ইমেজ আমাদেরকে [পাশের] সামরিক ঘাঁটি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একাধিক হামলা বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করেছে।’”

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবে হওয়া বিমান হামলার একটি ভিডিওর (বামে) সঙ্গে এই সংঘাতের শুরুর দিকে ইরানের রাজধানী তেহরানের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি টমাহক মিসাইলের ফুটেজের তুলনা করেছে বেলিংক্যাট। ছবি: স্ক্রিনশট, বেলিংক্যাট
“মিনাব ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে, সময়মতো পাওয়া স্যাটেলাইট ছবি ক্ষয়ক্ষতি যাচাই, আঘাতের স্থান চিহ্নিত এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও অন্যান্য ওপেন সোর্স প্রমাণ যাচাই করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,” বলেছেন বেলিংক্যাটের গবেষণা প্রধান কার্লোস গনসালেস। “দুই সপ্তাহের সময়ক্ষেপণ যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং ঘটনা প্রবাহ চলমান থাকা অবস্থায় প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠা করা আরও কঠিন করে তোলে।”
তিনি আরও বলেন, “এই সময়ক্ষেপণের মূল প্রভাব পড়ে আমাদের অর্জিত তথ্যের নিশ্চয়তার মাত্রার ওপর, যা দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। কাছাকাছি সময়ে তোলা স্যাটেলাইট ছবি ছাড়া, সরাসরি দৃশ্যমান প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রাপ্ত তথ্যগুলোকে আরও সাবধানতার সঙ্গে যাচাই বা বিচার বিশ্লেষণ করতে হয়।”
গনসালেস বলেন, প্রতিবন্ধকতা থাকলেও বেলিংক্যাট নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করে যাবে। “সবচেয়ে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবি না পাওয়া গেলেও পুরোনো স্যাটেলাইট ডেটা এখনো জিওলোকেশন, ভূখণ্ডের মানচিত্র তৈরি, অবকাঠামো বিশ্লেষণ এবং মাটির স্তরের ভিডিও বা ছবির প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে… যখন কোনো একটি উৎসে প্রবেশাধিকার সীমিত হয়, তখন আমরা বিকল্প উৎস একত্র করে ঘটনাগুলো যাচাই করি এবং প্রমাণের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করি।”
সম্পাদকের নোট: এই লেখাটি প্রথমে স্টোরিবেঞ্চ-এ প্রকাশিত হয়। তাদের অনুমতি নিয়ে এখানে পুনর্মুদ্রিত হলো। প্রকাশের পর লেখাটি হালনাগাদ করা হয়েছে, যেখানে প্ল্যানেট ল্যাবস-এর পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে তাদের ছবি বন্টনের নীতিমালা সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা যুক্ত করা হয়েছে।
ড্যান জেডেক নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব জার্নালিজমের প্র্যাকটিস প্রফেসর এবং স্টোরিবেঞ্চের ফ্যাকাল্টি অ্যাডভাইজর।