ছবি: আনাস মোহাম্মেদ, শাটারস্টক
সংবাদ লেখা হয়, কিন্তু ক্ষত রয়ে যায়: সংঘাত-সহিংসতা নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকরা নীরবে ভোগেন মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে
২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের শুরুর দিনগুলোতে, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রেদওয়ান আহমেদ একদল শরণার্থীর জানাজায় অংশ নেন। যারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় বঙ্গোপসাগরে ডুবে মারা যায়। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী ও শিশু। দাফনের সময় তিনি এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন, মিয়ানমারের সহিংসতায় এক ছেলেকে হারানোর পর যার পরিবারের বাকি সদস্যরাও গভীর সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছেন।
তার মনে আছে, লোকটি কাঁদছিলেন না। “তিনি শুধু সেখানে প্রায় নির্বিকারভাবে বসে ছিলেন, একই কথা বারবার বলে যাচ্ছিলেন। যেন বুঝতে পারছিলেন না, এই ঘটনাগুলো তাকে কী বদলে দিয়েছে, না তিনি আগের মতো আছেন।”
সংকট নিয়ে প্রতিবেদন করতে আহমেদ ওই সম্প্রদায়ের কাছে যান। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে আসার পরও অভিজ্ঞতাটি তাকে তাড়া করে চলেছে। “এক ধরনের জমে থাকা অনুভূতি তৈরি হয়,” তিনি বলেন। “প্রতিটি গল্প শুধু নোটবুকেই থেকে যায় না, সেগুলো আপনাকে তাড়া করে। কখনও সেগুলো ঘুমের মধ্যে ফিরে আসে, আপনার আচরণকে প্রভাবিত করে। কিংবা এমনভাবে ফিরে আসে যে, যেসব ঘটনাগুলো আপনাকে নাড়িয়ে দেওয়ার কথা, সেখানে আপনি প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভুলে যান, ধীরে ধীরে ভাবলেশহীন হয়ে পড়েন।”
বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও মানবিক সংকট নিয়ে কাজ করা স্বাধীন সাংবাদিকরাই প্রথম সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মানবিক মূল্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন। আফ্রিকার বিদ্রোহকবলিত জনপদ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্র, লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলের সংগঠিত অপরাধচক্রগুলোর সহিংসতা থেকে শুরু করে এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি—ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকরা নিয়মিতই সামনের সারিতে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা খুবই সীমিত।
যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা স্বাধীন সাংবাদিকদের শারীরিক ঝুঁকি নিয়ে অনেক আলাপ হয়। কিন্তু এই ধরনের প্রতিবেদনের মানসিক প্রভাব নিয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক কম কথা বলা হয়েছে। এই বিটে কাজ করা অধিকাংশ স্বাধীন প্রতিবেদকের পেছনে বড় কোনো নিউজরুমের সহায়তা থাকে না। ফলে তারা কাউন্সেলিং, বীমা বা ধারাবাহিক সম্পাদকীয় সহায়তা ছাড়াই নিয়মিতভাবে সম্ভাব্য ট্রমাটিক বা মানসিকভাবে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
“ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের জন্য প্রায় সবকিছুরই অভাব রয়েছে—কাঠামোগত সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, এমনকি মৌলিক নিরাপত্তা সুরক্ষাও,” বলেন আহমেদ। “আর প্রায় ক্ষেত্রেই, আমরা সাহায্য চাইতে ভয় পাই।”
গবেষণায় দেখা গেছে, সংঘাত নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস (ঘটনার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না), বিষণ্নতা এবং উদ্বেগের লক্ষণ বহন করে। এই পেশা এখনো শারীরিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টসের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৫শতরও বেশি সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মী নিহত হয়েছেন। এরপরও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার অংশ হিসেবে মানসিক স্বাস্থ্যকে খুব কমই গুরুত্ব দেওয়া হয়, বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রে। অনেক বার্তাকক্ষে এমন প্রত্যাশা থাকে, প্রতিবেদকরা, বিশেষ করে স্থানীয় সাংবাদিকরা, কাজের সঙ্গে যুক্ত শারীরিক ও মানসিক—উভয় ধরনের ঝুঁকি নিজেরাই বহন করবেন।
এই সমস্যা মোকাবিলার লক্ষ্যে কাজ করে শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকতা সংগঠন গ্লোবাল সেন্টার ফর জার্নালিজম অ্যান্ড ট্রমা। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ব্রুস শ্যাপিরো বলেন, সাংবাদিকতায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বাড়লেও সহায়তা ব্যবস্থা এখনো অস্থির এবং অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে আসে।
তিনি উল্লেখ করেন, “সাংবাদিকতার সংস্কৃতি এখন পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরও বেশি আলোচনা যুক্ত হচ্ছে।” কিছু বড় নিউজরুমে প্রশিক্ষণ ও থেরাপি যুক্ত করার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। তবে তিনি যোগ করেন, এসব পদক্ষেপ এখনো যথেষ্ট নয়।
“বেশিরভাগ নিউজরুম পর্যাপ্ত সহায়তা দিচ্ছে না—প্রায়ই যেমনটা হয়, কোনো সংঘাত নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে সাংবাদিক যখন গুরুতর মানসিক ভাঙনের মধ্যে পড়ে বা মনস্তাত্ত্বিক সংকটে চলে যায়, কেবল তখনই সহায়তা আসে।”
স্বল্প সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এমন পরিবেশে কাজ করা ফ্রিল্যান্সার এবং সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই সহায়তা পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত। যদিও জরুরি তহবিল ও নিরাপত্তা উদ্যোগ রয়েছে, অনেকেই এসব সম্পর্কে জানেন না বা সময়মতো সেগুলোর সুবিধা নিতে পারেন না।
সুযোগ-সুবিধা ও সমর্থনের অভাবের কারণে অনেক সাংবাদিক তাদের কাজের মানসিক প্রভাব একা একাই সামলাতে বাধ্য হন।
নির্দিষ্ট সময় পর পর বারবার ট্রমার মুখোমুখি হওয়া তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে—তারা যাদের নিয়ে কাজ করছেন, তাদের কাজ এবং নিজেদের সম্পর্কেও তারা ভিন্ন ধারণা পোষণ করতে পারেন।। অনেক সময় এই পরিবর্তনগুলো এত ধীরে ঘটে যে মাঠে কাজ করার সময় তা সহজে বোঝাও যায় না।
যুদ্ধ, বন্দিত্ব এবং ইরাকে থেকে প্রতিবেদন তৈরির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
২০০৪ সালে বাগদাদে সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন আসাদ জালজালি। তখন ইরাক থেকে সংবাদ পরিবেশনের অর্থ ছিল এমন সব অঞ্চলে যাতায়াত করা, যেখান থেকে সহিংসতার ঘটনাগুলো খুব বেশি দূরে না। ২০১৩ সাল নাগাদ তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা শুরু করেন। তখন তার ঝুঁকিগুলো আর অস্বাভাবিক কিছু ছিল না বরং তা দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়।
বাগদাদের আল-মনসুরে একটি গাড়ি বোমা হামলার ঘটনা এখনো তাকে তাড়া করে। তিনি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কাজে বাইরে ছিলেন। বিস্ফোরণের পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছান, আর তখনো রাস্তা জুড়ে মানুষের মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। নিজের আবেগ ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতেই তিনি সেখান থেকে সরাসরি সংবাদ সম্প্রচার শুরু করেন।
পরবর্তী সময়ে অন্য একটি ঘটনায়, সংবাদ সংগ্রহের সময় একদল সশস্ত্র ব্যক্তি তাকে অপহরণ করে। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে তার মনে হচ্ছিল তিনি আর জীবিত ফিরতে পারবেন না। এক পর্যায়ে তিনি নিজের মৃত্যুর সংবাদটি নিজেই লিখছেন বলেও স্বপ্ন দেখেন। পরবর্তীতে মুক্তি পেলেও, এই অভিজ্ঞতা তার পেশাগত ঝুঁকি উপলব্ধি করার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দেয়।
জালজালি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “প্রতিটি ঘটনাই চিহ্ন রেখে যায়। আমার প্রতিবেদনে জায়গা করে নেওয়া প্রতিটি গল্প, প্রতিটি ঘটনা আমার ওপর ভয়াবহ মানসিক প্রভাব ফেলে গেছে। একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক—তিনি যতই কঠিন মনের হোন না কেন, কাজের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন বলে আমি মনে করি না।”
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানের সময় জালজালির জন্য মানসিক চাপের বিষয়টি অনেক বেশি ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। অনুসন্ধানটি ছিল তথাকথিত “অনার কিলিং” বা “পারিবারিক সম্মান রক্ষা”-র নামে হত্যার শিকার হওয়া নারীদের নিয়ে। তাদের মধ্যে কয়েকজন মৃত্যুর আগে জালজালিকে নিজেদের ছবি পাঠিয়েছিলেন। তিনি জানান, প্রতিবেদন শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন এই গল্পগুলো তার মনে গেঁথে ছিল, যা দিনের পর দিন তার ঘুম এবং মানসিক অবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।
আমার এই অভিজ্ঞতাগুলো কাটিয়ে ওঠার কোনো সুনির্দিষ্ট বা নিয়মতান্ত্রিক উপায় নেই,” জালজালি বলেন। “সাধারণত নতুন কোনো গল্প নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার মাধ্যমেই আমি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করি।”
এই মানসিক চাপ শুধু নিউজরুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছাড়িয়েছিল তার পরিবার পর্যন্ত। তার পরিবার, বিশেষ করে তার মায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কষ্টের কথা স্মরণ করেন জালজালি। সংবাদ সংগ্রহের সময় তিনি যখন আহত বা অপহরণের শিকার হয়েছিলেন—তখন তার মা প্রতিনিয়ত চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতেন। তিনি জানান, এই অভিজ্ঞতাগুলো তাকে পুনর্বার ভাবতে বাধ্য করেছিল যে, এই পেশা তার আদৌ চালিয়ে যাওয়া উচিত হবে কি না।
মানসিক আঘাত বা ট্রমার মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য কিছু বিষয়ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনাকে নেতিবাচক বা বাঁকা চোখে দেখা হয়। বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে, কিছু অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি মানসিক কষ্ট বা দুর্দশা প্রকাশ করাকে নিরুৎসাহিত করে।
ফিলিস্তিনের ভেতরে জীবনযাপন ও সাংবাদিকতা
গাজায় সবকিছু একা সামাল দেওয়ার বিষয়টি সংবাদ পরিবেশনের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোলাইমান হিজ্জি তার দৈনন্দিন কাজের শুরুটা কোনো অফিস বা নিউজরুমে করেন না। বরং তার কাজের শুরুটা হয় হাসপাতালের মর্গ থেকে। শোকার্ত পরিবারগুলো যেখানে মৃতদেহের চারপাশে ভিড় করে থাকে। আর ঠিক তখনই বিমান হামলা, হতাহত এবং ধ্বংসযজ্ঞের ব্রেকিং নিউজগুলো তাৎক্ষণিকভাবে আসতে থাকে।
গল্পের প্রয়োজনে তিনি মাঠ পর্যায়ে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন। জ্বালানির ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে এবং গোলাবর্ষণে রাস্তা বন্ধ না থাকলে তিনি হামলার শিকার হওয়া অঞ্চগুলোতে যান। ধ্বংসস্তূপে ভরা এলাকাগুলো ঘুরে দেখেন, আহত বেসামরিক মানুষদের বিষয়ে রিপোর্ট করেন এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির চিত্র নথিবদ্ধ করেন। একই সঙ্গে, তথ্য পাঠাতে তাকে প্রায়ই বিদ্যুৎ, মোবাইল সিগন্যাল বা ইন্টারনেট সংযোগ খুঁজে বের করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
গল্পটি মর্গ থেকে শুরু হয় এবং আমরা যা ভিডিও করেছি তা পাঠানোর চেষ্টার মাধ্যমে শেষ হয়। মাঝের পুরো সময়টা কেবলই বিপদের মধ্যে ছুটে চলা।” তিনি ব্যাখ্যা করেন।
হিজ্জি শুধু যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহই করছেন না; তিনি যুদ্ধেরই অংশ হয়ে উঠেছেন। যুদ্ধের এত কাছাকাছি থাকা তার কাজের ধরনকেই বদলে দিয়েছে। প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্টে যেমন পেশাগত দায়িত্ব থাকে, তেমনি থাকে ব্যক্তিগত ভয়ও। কারণ তিনি যাদের সঙ্গে দেখা করেন, তারা অনেক সময় তার প্রতিবেশী, বন্ধু বা পরিচিত পরিবার। আবার অনেক সময় তিনি বলেছেন, ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করতে গিয়ে তিনি ভুক্তভোগীদের নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবে কল্পনা করেন।
তার সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলো কোনো একক প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং নিজের পেশার মধ্যেই ঘটে যাওয়া একের পর এক হারানোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
“যুদ্ধে আমার সহকর্মী সাংবাদিক ও বন্ধুদের হারানোর ঘটনাগুলো সবচেয়ে কষ্টের ছিল,” তিনি বলেন। “আমরা যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করতাম, আমাদের লক্ষ্য ছিল এক, আমরা খাবার ভাগ করে নিতাম, ধৈর্য ভাগাভাগি করতাম, এমনকি কখনো কখনো একই কম্বল ভাগ করে রাস্তায় ঘুমাতাম—যুদ্ধে আমি আমার এই বন্ধুদেরই হারিয়েছি।”
পশ্চিম তীরের সাংবাদিক আইমান আবু রামুজ। তিনি কাজ করেন সংঘাত নিয়ে। তার কাজের শর্তগুলো নির্ভর করে সেই আউটলেটের ওপর, যেখানে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হবে। তিনি বলেন, কিছু সংস্থা ফ্রিল্যান্সার এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের বেশ ভালো সহায়তা দিয়ে থাকে।
আবু রামুজ জানান, ব্যক্তিগত ঝুঁকির কারণে তিনি কিছু অ্যাসাইনমেন্ট বাদ দিয়েছেন। তবে মনে করেন, সেগুলো কাভার করা উচিৎ। তিনি হেবরনের একটি চেকপয়েন্টে আটক ও আটকে থাকার সময়ের কথাও মনে করেন।
“কখনো কখনো আমারও বিরতি নেওয়ার তাগিদ অনুভব হয়,” তিনি স্বীকার করেন। “আমি যা দেখেছি, তারপর আর সেখানে ফিরতে চাই না। কিন্তু কিছু সময় পর আবার ফিরে যাই।”
প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে মাঠপর্যায়ের কাজ এবং একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মানসিক চাপ
দুই বছর আগে আন্তর্জাতিক একটি অ্যাসাইনমেন্টের অংশ হিসেবে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর ইতুরির জুগু অঞ্চলে যান ক্লদ সেঙ্গেনিয়া। তিনি জনশূন্য স্থানীয় এলাকা এবং সশস্ত্র বিদ্রোহীদের অবস্থান ঘুরে দেখেন, এবং বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র নথিবদ্ধ করেন। এলাকা ছাড়ার মাত্র কয়েক দিন পর, তিনি যে আশ্রয় শিবিরটি পরিদর্শন করেছিলেন এক হামলায় সেখানে প্রায় ৫০ জন বাস্তুচ্যুত মানুষ নিহত হন। “আমি শুধু এটাই ভাবি যে, আমি সেখানে থাকাকালীন যদি এই হামলাটি হতো, তবে আমার কী পরিণত হতো,” তিনি বলেন।
কোথাও প্রতিবেদন করতে গেছেন, মূহুর্তেই জায়গাটি গণহত্যার ভূমিতে পরিণত হতে পারে—প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার আগে তিনি এমন সম্ভাবনার কথা ভাবেন। কাজ করতে গিয়ে বারবার সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা তার দেখার ভঙ্গিকে বদলে দিয়েছে।
“অনবরত ভয়াবহ সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করার ফলে আমরা ছোটখাটো বিষয়গুলোকে অবহেলা করি, অথচ সেগুলোর প্রতিটিই মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে,” তিনি উল্লেখ করেন। “এগুলো কেবল কোনো সংখ্যা নয়। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত জীবন, একেকটি দৃশ্যমান ক্ষত।”
তিনি আরও বলেন, “এমন সময় আসে, যখন কোনো প্রতিবেদন শেষ করার পর আমার মনে হয় আমি যেন কাঁদছি। আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একই ধরনের গল্প বারবার ফিরে আসে—একটি সংকটের পর আরেকটি সংকট।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই মানসিক চাপ শুধু সহিংস ঘটনা নিয়ে কাজের কারণে তৈরি হয় না; বরং তা আরও গভীর হয়ে ওঠে, যখন একের পর এক এইসব অভিজ্ঞতাগুলো জমতে থাকে। আর ধীরে ধীরে একে অন্যের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করে।
চেনা, মোকাবিলা এবং মানসিক পুনরুদ্ধার
গ্লোবাল সেন্টার ফর জার্নালিজম অ্যান্ড ট্রমার নির্বাহী পরিচালক ব্রুস শ্যাপিরো মনে করেন, সংঘাত সাংবাদিকতা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া উচিত এমন একটি বাস্তবতা দিয়ে, যা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।
“সবার আগে বুঝতে হবে, সাংবাদিকরা সাধারণত সহনশীল ও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম পেশাজীবী,” তিনি বলেন। তার মতে, সাংবাদিকতার পেশাগত নীতি, কাজের অভিজ্ঞতা এবং সহকর্মীদের পারস্পরিক সমর্থন অনেক সময় মানসিক চাপ সামলাতে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। তবে এই সহনশীলতারও সীমা রয়েছে। শ্যাপিরোর ভাষায়, অনেক সাংবাদিক ট্রমাজনিত প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হন, যার মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) অন্যতম। এ অবস্থায় শরীর ও মস্তিষ্ক বারবার ভয়াবহ বা জীবনহানিকর অভিজ্ঞতাগুলো পুনরায় অনুভব করতে থাকে। তিনি বার্নআউটের ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করতে করতে একজন মানুষ মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা ও সংকটপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা সাংবাদিকদের মধ্যে বিষণ্নতাও একটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তায় সীমিত প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি, সহিংসতা কাভারের বাস্তবতা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন শ্যাপিরো। “অনেক দায়িত্বশীল সংবাদ সংস্থা এখন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পাঠানো প্রতিবেদকদের জন্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্থানীয় স্ট্রিংগার ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়,” তিনি বলেন। প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করা সাংবাদিকদের জন্য পেশাগত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেয় এমন কয়েকটি সংস্থার মধ্যে রয়েছে এসিওএস অ্যালায়েন্স, ইন্টারন্যাশনাল উইমেন’স মিডিয়া ফাউন্ডেশন এবং দ্য ররি পেক ট্রাস্ট। এর মধ্যে শেষের সংস্থাটি বিশেষভাবে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের সহায়তায় কাজ করে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সম্পাদক ও নিউজরুমের কর্মীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য প্রস্তুতি বা ঝুঁকি কমানোর মতো প্রশিক্ষণ খুবই সীমিত। যদিও তারা শারীরিকভাবে সহিংসতার স্থান থেকে দূরে থাকেন, তবুও ট্রমাজনিত কনটেন্ট—যেমন ভয়াবহ ছবি ও গ্রাফিক দৃশ্য—সম্পাদনার মাধ্যমে তারা মানসিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
এই ঘাটতিগুলো মোকাবিলা করতে হলে নিউজরুমের অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, সম্পাদক ও নিউজ এক্সিকিউটিভদের স্পষ্টভাবে এই বার্তা দিতে হবে, কোনো সাংবাদিক সাহায্য চাইলে তাকে অ্যাসাইনমেন্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া বা কাজ থেকে বঞ্চিত করা হবে না—আর এটা স্বাভাবিক ও প্রতিষ্ঠিত চর্চা হয়ে উঠতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত কৌশলের গুরুত্বের কথাও বলেন। সাংবাদিকদের নিজের প্রতি যত্ন নেওয়াকে (সেল্ফ-কেয়ার) পেশাগত দক্ষতার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। যেমন তথ্য যাচাই বা গঠনমূলক মন্তব্য সংগ্রহ করার মতোই এটি তাদের টুলকিটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সম্পর্কিত আরো কিছু উৎসের তথ্য:
- গ্লোবাল সেন্টার ফর জার্নালিজম অ্যান্ড ট্রমা (জিসিজেটি) — সাংবাদিকদের জন্য রিসোর্স, প্রশিক্ষণ, ট্রমা-সচেতনতা বিষয়ক রিপোর্টিং গাইড এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দেয়
• জার্নালিস্ট ট্রমা সাপোর্ট নেটওয়ার্ক (জেটিএসএন) — সাংবাদিকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি থেরাপি সহায়তা নেটওয়ার্ক—বিশেষভাবে যারা ট্রমা ও পেশাগত মানসিক চাপের মুখোমুখি হন
• এসিওএস অ্যালায়েন্স — ফ্রিল্যান্স ও সংঘাত বিটের সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তা ও ট্রমা সংক্রান্ত রিসোর্স
• ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস মিডিয়া ফাউন্ডেশন (আইডব্লিউএমএফ) — জরুরি তহবিল, নিরাপত্তা রিসোর্স এবং সাংবাদিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দিয়ে থাকে
• কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) — সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং জরুরি সহায়তা দেয়
• দ্য ররি পেক ট্রাস্ট — সংকটপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের জন্য সহায়তা, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করে।
• ডার্ট সেন্টার আর্কাইভ — সহিংসতা ও ট্র্যাজেডি কাভার করা সাংবাদিকদের জন্য রিপোর্টিং গাইড ও ট্রমা সংক্রান্ত রিসোর্স
আবদুলওয়াহিদ সোফিউল্লাহি একজন সাংবাদিক ও গবেষক, যিনি জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ বিষয়ক প্রতিবেদন করেন।