প্যাট্রিক র্যাডেন কিফ লন্ডনে অনুষ্ঠিত ট্রুথ টেলার্স সামিট-এ বক্তা হিসেবে অংশ নেন। ছবি: ট্রুথ টেলার্স, স্যার হ্যারি ইভান্স ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম সামিট।
প্যাট্রিক র্যাডেন কিফের নতুন বই ‘লন্ডন ফলিং’ থেকে সাংবাদিকদের জন্য চারটি শিক্ষা
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
মে মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ট্রুথ টেলার্স সামিটেও বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্যাট্রিক র্যাডেন কিফে। ছবি: ট্রুথ টেলার্স, স্যার হ্যারি ইভান্স ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম সামিট
প্যাট্রিক র্যাডেন কিফে যখন কোনো গল্পের খোঁজ পান, তখন তিনি সেটির পেছনে লেগে থাকেন, সহজে ছেড়ে দেন না। একের পর এক মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। ততক্ষণ বলতে থাকেন, যতক্ষণ না কথা বলার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকে। তিনি দাবি যাচাই করার জন্য নথিপত্র ও প্রমাণ খোঁজেন। গল্পের কাঠামো তৈরিতে প্রচুর সময় দেন।
তবে তিনি স্বীকার করেন, তিনি কিছুটা “ডিলেট্যান্ট” স্বভাবের। অর্থাৎ, কোনো বিষয় সম্পর্কে যতটা সম্ভব সবকিছু জানতে চান, কিন্তু কাজ শেষ হয়ে গেলে সেই বিষয় থেকে সরে আসতেও পারেন।
“সবচেয়ে ভালো লাগে তখন, যখন আপনি আপনার ১০ হাজার শব্দের লেখা শেষ করে ভাবতে পারেন, ‘এই বিষয় নিয়ে আমার আর কখনও কিছু বলার প্রয়োজন হবে না,’” মার্চে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওয়ার অব ন্যারেটিভ সম্মেলনে বলেন কিফে। “তবে ২০ বছরে চারবার এমন হয়েছে, যখন কোনো লেখা শেষ করার পর আমার মনে হয়েছে, ‘এই পর্যন্ত এসেও আমি এই বিষয়টি বাদ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নই।’”
চতুর্থ ঘটনাটি ছিল ১৯ বছর বয়সী জ্যাক ব্রেটলারের গল্প। লন্ডনে তিনি গোপনে দ্বৈত জীবন যাপন করতেন। ২০১৯ সালে টেমস নদী সংলগ্ন একটি অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন।
ব্রেটলারের রহস্যময় মৃত্যু এবং কী ঘটেছিল তা জানার জন্য তার পরিবার নিয়ে অনুসন্ধানের পর কিফে ২০২৪ সালে দ্য নিউ ইয়র্কার-এ একটি প্রতিবেদন লেখেন। পরে লেখাটিকে আরও বিস্তারিত আকারে লন্ডন ফলিং নামে একটি বইয়ে রূপ দেন। যা প্রকাশিত হয়েছে ৭ এপ্রিল।
“রৌগস”, “এম্পায়ার অব পেইন” এবং “সে নাথিং”সহ বহুল বিক্রিত বইয়ের লেখক কিফে। সম্মেলনে নিম্যান স্টোরিবোর্ডের সম্পাদক মার্ক আর্মস্ট্রংয়ের সঙ্গে তার কাজের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন। যার ওপর ভিত্তি করে সাংবাদিকদের জন্য এখানে চারটি মূল শিক্ষা তুলে ধরা হলো:
১. কোনো শর্ত ছাড়াই সোর্সের সঙ্গে দেখা করা
এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনের সময় ব্রেটলার সম্পর্কে জানতে পারেন কিফে। এই পদ্ধতিটি তিনি প্রায়ই অনুসরণ করেন। সে সময় লন্ডনে তার বেস্টসেলার “সে নাথিং”–এর টিভি সিরিজ বানানোর কাজ করছিলেন। ঠিক তখন একজন ব্যক্তি (যিনি এক পরিচালককের বন্ধুর পরিচিত) তাকে ব্রেটলারের পরিবার সম্পর্কে জানান।
সেই সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে লোকটি যা বলেছিলেন, তা তিনি গুগলে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। কিন্তু কোনো তথ্যই খুঁজে পাননি। পরে জানতে পারেন, অনুসন্ধান চলাকালে পরিবারটি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের গোপনীয়তা বজায় রাখছিল এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা থেকে বিরত ছিল।

জ্যাক ব্রেটলার। ছবি: ক্রাইসা দা কস্তার সৌজন্যে, ডাবলডে
কিফে যখন জ্যাকের বাবা-মা ম্যাথিউ এবং র্যাচেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন তিনি স্থানীয় একটি ক্যাফেতে দেখা করার প্রস্তাব দেন। যেখানে “কোনো পক্ষ থেকেই কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না।” এভাবে তারা আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার চাপ ছাড়াই দেখা করতে সক্ষম হন। আর কিফে নিজেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পান যে, তিনি এই গল্পটি আরও এগিয়ে নেবেন কি না।
“আমাদের প্রাথমিক কথোপকথনে… আমি এমনকি নোটবুকও বের করিনি। আমি সেটি রেকর্ডও করছিলাম না,” তিনি বলেন। “এটি পুরোপুরি শুধু কথোপকথনই ছিল।”
পরবর্তী দুই ঘণ্টা ব্রেটলার পরিবার তাদের ঘটনাগুলো তাকে বলে। সেই আলাপের পর তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি। তবে তারা ধীরে ধীরে একটি চুক্তির দিকে এগোচ্ছিল এবং এক সপ্তাহ পর আবারও দেখা করে।
কিফের মনে করেন, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি আর ট্রমার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা অনেক সময়ই তাদের গল্পগুলো ভাগ করে নিতে আগ্রহী হন। তিনি বলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর কথা তার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন। এটি তার জন্য এক ধরনের সৌভাগ্য ও দায়িত্বের অনুভূতি।
তিনি যোগ করেন, “আমি মনে করি, কথা বলার পর তারা ভালো বোধ করেছেন। আমি আরও মনে করি, নিজের গল্প বলাটা যে কারো কাছেই ভালো লাগে, বিশেষ করে এমন গল্প, যা কোনো না কোনো কারণে তারা কিছুটা নিজেদের মনের মধ্যে রেখেছিলেন।”
২. গল্পের খাতিরে সবার সঙ্গে দেখা করাটা জরুরি নয়
এই গল্পের জন্য ব্রেটলার পরিবারের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন কিফে। তিনি স্বীকার করেন, বইটি লেখার ক্ষেত্রে তারাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে গল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তার মতে, কোনো গল্পের ক্ষেত্রে মূল ব্যক্তিদের কাছ থেকে সরাসরি তথ্য পাওয়ার সুযোগ না থাকলেও তা কিন্তু গল্পের মান নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়।
“মানুষ যদি সহযোগিতা করতে না চায়, তার মানে এই নয় যে আপনি আর গল্পটি লিখবেন না,” তিনি বলেন। “কখনো কখনো আপনাকে অবশ্যই গল্পটি লিখতে হয়।”
কিফে তার ২০১৮ সালের দ্য নিউ ইয়র্কারের প্রোফাইলের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি ‘অ্যাপ্রেন্টিস’ প্রযোজক মার্ক বার্নেটকে নিয়ে লিখেছিলেন। বার্নেট তখন তার সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। (তবে বার্নেটের সাবেক স্ত্রীদের কয়েকজন তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন।)
আকবর শামজি—যিনি জ্যাক ব্রেটলারের মৃত্যুর রাতে তার সঙ্গে ছিলেন—তিনি কিফের সঙ্গে সাক্ষাৎকার বা সরাসরি দেখা করতে রাজি হননি। তবে ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছিলেন। পরে কিফে এবং দ্য নিউ ইয়র্কার থেকে ২৩০টিরও বেশি তথ্য যাচাইয়ের প্রশ্ন পাঠানোর পর তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
এই কারণে কিফেকে ব্রেটলার পরিবারের দেওয়া তথ্য এবং তাদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন জিনিসপত্রের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হয়। তবে তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে তারা পুরো প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণভাবে যুক্ত আছে। দ্বিতীয় সাক্ষাতে তিনি আগে থেকেই জানিয়ে দেন, তারা যদি রেকর্ডে যেতে চান, তাহলে পরে আর পিছিয়ে আসার সুযোগ থাকবে না। তিনি বলেন, “ট্রেন কিন্তু স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে।”
“এটা এমন একটা বিষয়, যেটা আমি বছরের পর বছর ধরে আরও ভালোভাবে করার চেষ্টা করছি। এবং প্রতি বছরই বিষয়টিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। যে কোনো রিপোর্টিং শুরু করার সময়ই মানুষের সঙ্গে খুব পরিষ্কার থাকতে হয়। কারণ আমি দেখেছি, কোথায় কোথায় বিষয়গুলো ভুল পথে যেতে পারে।” তিনি বলেন।
৩. গল্পটি লেখা নাকি বই আকারে প্রকাশ হবে—নাকি দুটোই
কিফে বলেন, ব্রেটলার পরিবারের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি অনেক তথ্য জানতে পারেন, কিন্তু দ্য নিউ ইয়র্কার–এর প্রায় ১৫ হাজার শব্দের একটি প্রতিবেদনে সবকিছু রাখা সম্ভব হয় না।
তিনি জ্যাক ব্রেটলারের দাদা হুগো গ্রিনের উদাহরণ দেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আউশউইটজ থেকে বেঁচে লন্ডনে এসে বিবিসির একজন পরিচিত সম্প্রচারক এবং একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত হন। কিফে জানান, গ্রিন লন্ডনে একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব হলেও নিউ ইয়র্কারের প্রথম প্রতিবেদনে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।
“এটাই আমাকে বুঝতে সাহায্য করে, এখানে সম্ভবত একটি বই হতে পারে। এখানে আরও গভীর ইতিহাস আছে। আমি সবসময়ই এ ধরনের বিষয় নিয়ে আগ্রহী, অর্থাৎ পরিবার থেকে আমরা কীভাবে বেড়ে উঠি, আর পরিবারগুলো কীভাবে নতুন জায়গায় গিয়ে নিজেদের গড়ে তোলে,” তিনি বলেন।

সেই কাজের ভিত্তিতে তৈরি বই। ছবি: ট্রুথ টেলার্স, স্যার হ্যারি ইভান্স ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম সামিটের সৌজন্যে
তিনি মনে করেন, প্রতিটি কাজের আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য থাকে। কেননা প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত লেখাতে জ্যাক ব্রেটলারের গল্প বলা হয়। আর বইতে তুলে ধরা হয় কয়েক দশক ধরে চলা পারিবারিক ইতিহাস—যা জ্যাককে আজকের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
কিফে আরও বলেন, তিনি প্রায়ই সঠিক সময়ে প্রকাশ করা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। দ্য নিউ ইয়র্কার শিগগিরই তার একটি নতুন লেখা প্রকাশ করতে যাচ্ছে, যেটির ওপর তিনি ২০২০ সাল থেকে কাজ করছেন এবং এখন তিনি মনে করছেন সেটি প্রকাশের জন্য উপযুক্ত সময় এসেছে।
লেখক বলেন, “আমি এমন পদ্ধতি পছন্দ করি। যেখানে আমি বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানি না। তারপর ধীরে ধীরে বেশ ভালোভাবে বুঝতে শুরু করি। আর শেষে মনে হয় আমি এ নিয়ে কথা বলার মতো যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছি। আর তখন আমি লেখার জন্য আত্মবিশ্বাস অনুভব করি—যা কিনা একটি ভালো সংকেত। এটা এক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, এবং আমি সেই পর্যায়ে না পৌঁছে কখনোই বইটি প্রকাশ করতাম না।”
৪. গল্পটি প্রকাশের আগে সোর্সদের সঙ্গে কতটা তথ্য ভাগ করা উচিত?
অনেক বার্তাকক্ষের সাধারণ নিয়ম হলো—প্রকাশের আগে সোর্সদের লেখাটি পড়তে দেওয়া হয় না। কিফেও সাধারণভাবে এই নিয়মই অনুসরণ করেন। তবে ব্রেটলার পরিবার ছিল ব্যতিক্রম।
কারণ ঘটনাটি ছিল ভীষণ ব্যক্তিগত। ইতিহাস, গোপন তথ্য এবং ভেতরের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। তাই কিফের কাছে মনে হয়েছিল পরিবারের সদস্যদের আগে সমালোচকদের দিয়ে বইটি পড়ানো ঠিক হবে না। এজন্য তিনি জ্যাক ব্রেটলারের মা, বাবা এবং ভাইকে বইটির তিনটি প্রাথমিক কপি পাঠান।
“সেই দিনগুলো ছিল আমার জন্য বেশ চাপের,” তিনি বলেন।
তিনি মনে করেছিলেন, ব্রেটলার পরিবারকে আগে থেকেই বইটির একটি কপি দেওয়া দরকার, যাতে তারা সামনে আসা “অদ্ভুত” অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারেন। শুরুতেই স্বচ্ছ থাকার পাশাপাশি, তিনি এটাও স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন যে পরে তারা যখন দেখবেন মানুষজন তাদের পারিবারিক ঘনিষ্ঠ বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে পড়ছে, তখন তাদের কেমন অনুভূতি হতে পারে।
“আমি কিছুটা ভ্যাম্পায়ারের মতো,” কিফে বলেন। তিনি যোগ করেন, “কারণ আপনি যদি আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেন, আমি আমার কাজটাই করব। কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো তারা শুরুতে কল্পনাও করেননি যে বইতে থাকবে, কিন্তু পরে তা-ই হয়েছে। কারণ আপনি যদি আমাকে আপনার পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করতে দেন, আমি গভীরে যাবোই।”
এই লেখাটি প্রথমে নিম্যান স্টোরিবোর্ডে প্রকাশিত হয়। ক্রিয়েটিভ কমন্স চুক্তির মাধ্যমে এখানে পুনঃপ্রকাশিত হলো।
এমিলিয়া উইশনিয়েভস্কি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের কনকর্ড মনিটর পত্রিকায় জেনারেল অ্যাসাইনমেন্ট রিপোর্টার এবং এনগেজমেন্ট এডিটর হিসেবে কাজ করেন। তিনি এর আগে বোস্টন ডটকম এবং দ্য বোস্টন গ্লোবে সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে তিনি স্থানীয় রাজনীতি, ব্যবসা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ বিষয়ে প্রতিবেদন করেছেন।