ছবি: জিআইজেসি২৫, ইউটিউব
সহযোগিতা কর অথবা মরো : আন্তঃসীমান্ত রিপোর্টিং অংশীদারত্ব যেভাবে সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেয় এবং অনুসন্ধানকে জোরদার করে
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
২০২৫ সালের মার্চ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেনেজুয়েলার ২৩৮ জন পুরুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ট্রেন দে আরাগুয়া নামে ভেনেজুয়েলাভিত্তিক একটি আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধচক্রের সদস্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, তারা “পৃথিবীর সবচেয়ে সহিংস কিছু বর্বরদের মধ্যে পড়ে।”
ওই ব্যক্তিদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৪৬ বছরের মধ্যে। এরপর তাদের উড়োজাহাজে করে এল সালভাদরের সবচেয়ে কড়া নিরাপত্তাবেষ্ঠিত কারাগার টেররিজম কনফাইনমেন্ট সেন্টারে (সিইসিওটি) নেওয়া হয়। যেখানে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তাদের গ্রেপ্তার ও সীমান্ত অতিক্রম করে হস্তান্তরের এই ঘটনাটি এমন তিনটি সরকারের অধীনে ঘটেছে যাদের মানবাধিকার বিষয়ক রেকর্ড বেশ বিতর্কিত। আর ওই দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, এল সালভাদর এবং ভেনেজুয়েলা। এই ব্যক্তিরা কারা এবং কিসের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল—সেটি খুঁজে বের করা সাংবাদিকদের জন্য ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার দমনমূলক সংবাদমাধ্যম পরিস্থিতির কারণে এই কাজটি আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
ভেনেজুয়েলাতে বর্তমানে ১৬ জন সাংবাদিক কারাগারে। নির্বাসনে আছেন প্রায় ৫০০ জন। গত দুই দশক ধরে ৪০০‑এর বেশি সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে গেছে। এমন কঠিন পরিস্থিতির কারণে, সংবাদ সংস্থা এলিয়ানজা রেবেলদে ইনভেসটিগা (এআরআই)-এর অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোনা রিসকুয়েজ বলেন, “ভেনেজুয়েলায়, হয় সহযোগিতা করো, না হলে মৃত্যুকে বেছে নাও।”
মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ১৪তম গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৫ (জিআইজেসি২৫)-এ আন্তঃসীমান্ত অনুসন্ধান বিষয়ক একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন রিসকুয়েজ। তিনি ট্রেন দে আরাগুয়ার অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে একটি বইও লিখেছেন। প্যানেলে তার সঙ্গে ছিলেন প্ল্যাটফর্ম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম মালাউইয়ের সহকারী ব্যবস্থাপনা অংশীদার গোল্ডেন মাতোঙ্গা; কনটেক্সটের সহপ্রতিষ্ঠাতা আতিলা বিরো; এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের নির্বাহী সম্পাদক রিতু সারিন। প্যানেলটি সঞ্চালনা করেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক খাদিজা শরিফ।
আলোচকরা দ্য পানামা পেপারস এবং দ্য আজারবাইজানি লন্ড্রোম্যাট -এর মতো বিশ্বের অন্যতম আলোচিত কিছু আন্তঃসীমান্ত অনুসন্ধানে কাজ করেছেন। তাদের কাজ এটিই ফুটিয়ে তোলে, যেসব ঘটনা বিভিন্ন দেশজুড়ে চলমান, সেগুলো উন্মোচনের জন্য দেশজুড়ে বিস্তৃত রিপোর্টিং নেটওয়ার্কের প্রয়োজন। তারা বর্ণনা করেছেন কীভাবে এই ধরনের সহযোগিতা ঝুঁকি ভাগ করে নিতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যখন দুর্নীতি বা রাষ্ট্রীয় অপব্যবহার ফাঁস করাটা ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিপদের কারণ হতে পারে। একইসঙ্গে এটি জটিল আন্তঃদেশীয় তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ যাচাই করার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় ভিত্তিকেও শক্তিশালী করে।
“কোনো প্রতিবেদন যদি ১০ বা ২০টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়—যেকোনো সরকারের পক্ষেই এমন একটি শক্তিশালী প্রতিবেদন উপেক্ষা করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। দলবদ্ধভাবে কাজ করার মধ্যে একটি নিরাপত্তা ও স্বস্তির জায়গা থাকে যা সবাই অনুভব করে,” সারিন বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবেদন তৈরির সময় নিরাপত্তার জন্য সংহতি জরুরি।
আন্তঃসীমান্ত কাহিনী পুনর্নির্মান
এআরআই ও রিসকুয়েজের জন্য ২৩৮ জন ভেনেজুয়েলার নাগরিককে নিয়ে পরিচালিত এই যৌথ অনুসন্ধানটি ছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে তাদের জোটের প্রথম বড় কোনো আন্তঃসীমান্ত কাজ। এই প্রকল্পে প্রোপাবলিকা, দ্য টেক্সাস ট্রিবিউনসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। ভেনেজুয়েলা, চিলি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৬টি সংবাদ সংস্থার ২০ জনেরও বেশি সাংবাদিক টানা চার মাস কাজ করে প্রকৃত ঘটনাটি ধাপে ধাপে সাজিয়েছেন।
সাংবাদিকদের দলটি প্রতিটি বন্দির জীবনকাহিনী বা বর্ণনামূলক ইতিহাস তৈরির লক্ষ্যে তাদের পূর্ণ নাম, জন্ম তারিখ, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, অভিবাসনের ইতিহাস, আদালতের রেকর্ড এবং ছবির মতো তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে কাজ শুরু করেন। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, পেরু এবং চিলি—এই পাঁচটি দেশের আইনি নথি পর্যালোচনা করে দেখেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি ব্যক্তি কোথায় কোথায় বসবাস করেছিলেন তা খুঁজে বের করেন। তারা বিভিন্ন আইডেন্টিটি প্ল্যাটফর্ম, স্বাস্থ্য রেকর্ড এবং ইমিগ্রেশন ডেটাবেস যাচাই-বাছাই করেন। এরপর গ্যাং সদস্যদের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাদের ফাঁস হওয়া তথ্যের সঙ্গে বন্দিদের নাম মিলিয়ে দেখেন। এই প্রক্রিয়ায় আত্মীয়স্বজন, আইনজীবী, পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ এবং মার্কিন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ মোট ১৫০টিরও বেশি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়।
এর ফলে ৬৩টি কলাম ও ২৩৮ সারির একটি বিশাল ডেটাবেস তৈরি হয়। সংগৃহীত তথ্যের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। সংগৃহিত এই তথ্যগুলোকে একটি সারণীবদ্ধ বিন্যাসে সাজাতে দলটি এআই টুল ব্যবহার করে এবং নিজস্ব একটি চ্যাটবট তৈরি করে; যা পরবর্তীতে একাধিকবার হাতেকলমে যাচাই করা হয়েছিল।

এল সালভাদরের সিইসিওটি কারাগারে পাঠানো ২৩৮ জন ভেনেজুয়েলান নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করতে এআরআই, প্রোপাব্লিকা এবং দ্য টেক্সাস ট্রিবিউনসহ আরও বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম যৌথভাবে কাজ করে। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, এই ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই কুখ্যাত অপরাধী চক্র ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও, আটককৃতদের একটি বড় অংশেরই কোনো পূর্ব অপরাধের রেকর্ড ছিল না। ছবি: স্ক্রিনশট, প্রোপাব্লিকা
রিসকুয়েজ ব্যাখ্যা করে বলেন, “প্রতিটি গল্পই ছিল এক একটি পৃথক অনুসন্ধান। আমাদের প্রতিটি ঘটনা নতুন করে পুনর্গঠন করতে হয়েছে।”
তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন জানত এই পুরুষদের মধ্যে অন্তত ১৯৭ জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ধরনের অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হননি। প্রোপাবলিকার প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত জীবন কাহিনী বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে; সেখানে দেখা গেছে যে, প্রায় অর্ধেক ব্যক্তিকে তাদের অভিবাসন প্রক্রিয়া চলাকালীনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল—অথচ নিয়ম অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া চলাকালীন তাদের বহিষ্কারাদেশ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার কথা ছিল। এমনকি তাদের মধ্যে কারো কারো মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার, অভিবাসনের কাগজপত্র এবং আদালতের রেকর্ড থেকে দেখা গেছে এই ব্যক্তিদের ট্রেন দে আরাগুয়া গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য সরকার মূলত তাদের শরীরে থাকা ট্যাটু বা উল্কিগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের চার মাস পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্দী বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে তাদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং বিমানে করে ভেনেজুয়েলায় পাঠানো হয়।
গল্পের গভীরে পৌঁছাতে সাপ্তাহিক বৈঠকের আয়োজন করা হতো। যা এআরআইয়ের নিউজডেস্ককে বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন একটি আন্তর্জাতিক নিউজরুমে পরিণত করেছিল। প্রতিবেদন তৈরিতে যা বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। রিসকুয়েজ বলেন, “সহযোগিতা বা কোলাবোরেশন—যখন বেশ কয়েকটি সংস্থা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে—তখন তা কাজের মান ও গভীরতাকে অনেক বাড়িয়ে দেয়।”
অপতথ্যের কাঠামো ও প্রভাব
রোমানিয়ার সংবাদমাধ্যম কনটেক্সটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিরোর মতে, অপপ্রচার বা ভুল তথ্য কীভাবে ছড়ানো হচ্ছে এবং তার প্রভাব কতটা—সেটি খতিয়ে দেখা কেবল অনুসন্ধানের অংশই নয়, বরং এটি নিজেই একটি বড় সংবাদ হতে পারে।
সম্প্রতি ফায়ারহোস অব ফলসহুড প্রকল্পের জন্য মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ১৩টি সম্পাদকীয় দল একজোট হয়ে কাজ করেছে। তাদের লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট অপপ্রচারের জট খোলা এবং ইউরোপজুড়ে তা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে সেটি খতিয়ে দেখা। গভীর তথ্য বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় সংবাদিকতার সমন্বয়ে যৌথ এই দলটি ১৩টি দেশে ছড়িয়ে থাকা ক্রেমলিনপন্থী, ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক এবং কট্টর-ডানপন্থী ওয়েবসাইটগুলোর একটি মানচিত্র তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে তারা উন্মোচন করেছে নেটওয়ার্কগুলো কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং ছদ্মবেশী মাধ্যমগুলো (প্রক্সি) এই অপপ্রচারের কাঠামোকে টিকিয়ে রাখছে।
এই কাজের মধ্যে টিকটকের ৬ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা সুনির্দিষ্ট কিছু ‘ইনফরমেশন অপারেশন’ বা তথ্য প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর মধ্যে রোমানিয়াসহ অন্যান্য দেশের নির্বাচনে ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রচারণাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিশাল পরিমাণ তথ্যের চাপ সামলাতে সাংবাদিকরা সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং অ্যাকাডেমিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে জোট বাঁধেন। তারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজের ধরন অনুযায়ী একটি বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করেন। এর জন্য তারা তাদের পুরো কাজের প্রক্রিয়াটিকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে নেন এবং সেটিকে কোডিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল রূপ দেন।
এই যৌথ উদ্যোগটি পরে দ্য ফ্যাক্ট হাব-এ রূপ নেয়। এটি মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি উদ্যোগ—যাদের লক্ষ্য হলো বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং অপপ্রচার মোকাবিলা। বিশেষ করে রোমানিয়া, মলদোভা, ইউক্রেন এবং বাল্টিক দেশগুলোর মতো পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোতে।
আর এই কেন্দ্রটি (হাব) অনুসন্ধানী সাংবাদিক, এনজিও বিশেষজ্ঞ, ডেভেলপার এবং গবেষকদের এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে। ফলে সাংবাদিকতার সঙ্গে কারিগরি দক্ষতার প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে।
এই কাঠামোর মাধ্যমে দলগুলো মলদোভাতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী হস্তক্ষেপের ওপর নজর রেখেছে। পাশাপাশি এক দেশ থেকে অন্য দেশকে লক্ষ্য করে পরিচালিত প্রভাব বিস্তারমূলক প্রচারণাগুলোর মানচিত্র তৈরি করেছে। বিরোর মতে, অ্যালগরিদম পরীক্ষা করার জন্য তারা যে কাজের পদ্ধতি তৈরি করেছেন, তা মূলত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং প্রযুক্তির সংমিশ্রণ। এটি ঠিক সেভাবেই কাজ করে, যেভাবে আন্তর্জাতিক অপপ্রচার নেটওয়ার্কগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে থাকে।

এই অনুসন্ধানী প্রকল্পের মাধ্যমে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ১৩টি দল অনলাইনে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট এক বিশাল অপপ্রচার ব্যবস্থাকে উন্মোচন করেছে। ছবি: স্ক্রিনশট, ভি-স্কয়ার
মুখে মুখে কথা দেয়া নয়, কঠিন নিয়ম অনুসরণ
ক্রিপ্টোকারেন্সি, স্পাইওয়্যার, দুর্নীতি এবং সংগঠিত অপরাধের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আন্তঃদেশীয় বা আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাই শুরুর দিকের প্রকল্পগুলো কেবল মৌখিক বা “ভদ্রতার খাতিরে করা চুক্তির” (gentleman’s agreements) ওপর ভিত্তি করে চললেও, এখন আর তা যথেষ্ট নয়। এই ধরনের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ যৌথ কাজের জন্য এখন সুনির্দিষ্ট কাঠামো এবং আনুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা প্রয়োজন।
সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং প্রত্যাশা পরিষ্কার না থাকলে, এই যৌথ কাজগুলো অজান্তেই শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং ছোট স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে—আর এটাই সতর্ক করেছেন গোল্ডেন মাতোঙ্গা।
“আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তাই এই আইনি ঝামেলার ভার বা খরচ কে বহন করবে, তা আগেভাগেই সবার সম্মতিতে ঠিক করে রাখা উচিত,” সতর্ক করে দিয়ে বলেন তিনি।
যৌথভাবে কাজ করার চুক্তিতে যা যা থাকা উচিত, সে সম্পর্কিত কিছু সহজ পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো:
- বাজেট এবং পারিশ্রমিক: অর্থ কীভাবে ভাগ করা হবে, যাতায়াত এবং নিরাপত্তার খরচ কে দেবে এবং সবাইকে কীভাবে ন্যায্যভাবে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে—সেসব বিষয়ে সবকিছু পরিষ্কার রাখুন।
- দায়িত্ব এবং সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ: সংবাদ তৈরির প্রতিটি ধাপ সুনির্দিষ্ট করুন। প্রতিবেদন লেখা, সম্পাদনা, তথ্য বিশ্লেষণ, ছবি বা গ্রাফিক্স তৈরি এবং শেষ পর্যন্ত সেটি প্রকাশের অনুমতি কে দেবেন—সেই দায়িত্বগুলো আগেভাগেই ভাগ করে নিন।
- যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ: তথ্য আদান-প্রদানের জন্য নিরাপদ মাধ্যম ব্যবহার করুন এবং আলোচনার সময়সূচী ঠিক করে রাখুন। এছাড়া কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হলে তা কীভাবে সমাধান করা হবে, তার একটি প্রক্রিয়া ঠিক করুন।
- প্রকাশের সময় এবং কৃতিত্ব : প্রতিবেদনটি কবে প্রকাশিত হবে এবং কার নাম কীভাবে দেওয়া হবে তা শুরুতেই ঠিক করে নিন। সাংবাদিক সারানের মতে, “নাম দেওয়ার ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব উদার হোন, কারণ একটি প্রতিবেদনের পেছনে অনেক মানুষ কাজ করেন।”
- আইনি দায়বদ্ধতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা:যদি কোনো মামলা হয় তবে তা কে সামলাবে এবং প্রতিহিংসার শিকার হলে কীভাবে সহায়তা দেওয়া হবে, তা চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করুন।
- প্রকাশনার পরবর্তী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা: সাংবাদিক রিসকুয়েজ বলেন, ভেনেজুয়েলার মতো জায়গায় কাজ করতে হলে প্রতিটি অনুসন্ধানের জন্য আলাদা নিরাপত্তা নিয়ম তৈরি করতে হয়। “প্রতিটি এলাকা বা পরিস্থিতির ধরন আলাদা। তাই নিরাপত্তা পরিকল্পনায় মাঠে কাজ করার সময় এবং কাজ শেষে সাংবাদিকদের ঘরে ফেরার পর—উভয় সময়ের ঝুঁকিই বিবেচনায় রাখতে হবে।”
ভুল তথ্য বা অপপ্রচার নেটওয়ার্ক নিয়ে তৈরি অনুসন্ধানী কাজগুলো প্রমাণ করেছে যে, এটি এখন আর শুধু সাংবাদিকদের একার কাজ নয়। এর পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
“আমরা যদি একে অপরের সঙ্গে মিলে কাজ না করি, তবে সংবাদমাধ্যম হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব টিকে থাকবে না। আমাদের শুধু নিজেদের গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকলে চলবে না, বরং ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। হয়তো এখন এটি করতে আপনাদের ভয় লাগছে, কিন্তু যদি আমরা তা না করি, তবে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের ধ্বংস করে দেবে,”—এমনটিই সতর্ক করেছেন বিরো। বার্তাকক্ষগুলোর কাজ কেবল সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলে করলেই হবে না, বরং এর পাশাপাশি সফটওয়্যার ডেভেলপার, শিক্ষক-গবেষক এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
”এখন হয়তো এই পথে হাঁটতে আপনাদের ভয় লাগছে, কিন্তু আমরা যদি এই পরিবর্তন না আনি, তবে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের ধ্বংস করে দেবে”—এটা বলেই বিরো তার কথা শেষ করেন।
আপনি চাইলে নিচে দেওয়া লিঙ্কে জিআইজেসি২৫-এর সম্পূর্ণ আলোচনাটি দেখতে পারেন।
আনা পি. সান্তোস ১০ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিক। র্যাপলার, ডিডব্লিউ জার্মানি, দ্য আটলান্টিক এবং দ্য লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস-এর মতো সংবাদমাধ্যমে তার কাজ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি যৌন প্রজনন স্বাস্থ্য, এইচআইভি এবং যৌন সহিংসতা সংক্রান্ত লিঙ্গভিত্তিক বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করেন। এছাড়া পুলিৎজার সেন্টার ২০১৪ পারসেফোন মিল ফেলো হিসেবে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম অভিবাসন নিয়ে তিনি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।