ছবি: শাটারস্টক
ব্যর্থতা অনুসন্ধানে ‘পজিটিভ ডেভিয়েন্ট’ কী, ব্যবহার কীভাবে করবেন, সংবাদের প্রভাব বাড়াতে এর ভূমিকা কতটা
গুরুতর সমস্যা সমাধান প্রসঙ্গে প্রায়ই কোনো শহর বা বিভাগীয় সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের শুনতে হয়, “আমাদের তো পর্যাপ্ত বাজেট নেই”। কিংবা অস্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুললে হাসপাতালের পক্ষ থেকে এর কারণ অতিরিক্ত মুনাফা করা নয়; বরং ক্লিনিকাল প্রয়োজন বা রোগীরা এমনটাই পছন্দ করেন বলে দাবি করা হয়।
এসব পক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে স্পষ্ট পার্থক্য দেখানো বা জোরালোভাবে বিপরীত চিত্রগুলো (পজিটিভ ডেভিয়েন্ট) বা ওই সম্পর্কিত ইতিবাচক ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলো সংবাদে তুলে ধরা। অর্থাৎ, একই ধরনের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অন্য যে সব প্রতিষ্ঠান এসব সমস্যা এড়াতে সক্ষম হয়েছে, তাদের নীতি ও ফলাফলগুলো পাশাপাশি তুলে ধরা। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দুর্বলতা দেখিয়ে কোনো অজুহাত দিতে গেলে তা আর ধোপে টিকবে না। ফলে আপনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি অনেক বেশি প্রভাবশালী হবে এবং ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে।
আর্জেন্টিনার দৈনিক লা নাসিওন (দ্য নেশন) । পত্রিকাটি দেশের অধিকাংশ এলাকায় বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সাধারণ স্কুল থেকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যাপক হারে বাদ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনে। এই জন্য তারা দেশটির লা পাম্পার প্রদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মডেল বিশ্লেষণ করে। দেখা যায়, প্রদেশটির সাধারণ স্কুলগুলোতেই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ ভর্তি রয়েছে ।

ছবি: স্ক্রিনশট, লা নাসিওন
আরেকটি পদ্ধতি হলো, অন্যান্য শহরের সৃজনশীল উদ্যোগগুলো খতিয়ে দেখা। বিশেষ করে যারা একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। এক্ষেত্রে দুর্দান্ত উদাহরণ হিসেবে আসে ক্লিভল্যান্ড প্লেইন ডিলারের ধ্রুপদী এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। যেখানে তুলে ধরা হয়, একই ধরনের শহর বাল্টিমোর কীভাবে শিশুমৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের পর ক্লিভল্যান্ডে নতুন একটি টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর সেখানেও শিশুমৃত্যুর হার একইভাবে কমে আসে।
কিছু বার্তাকক্ষ ব্যর্থতা বা সমস্যার দিকগুলো তুলে ধরার পর সমাধানভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেমন, জার্নালিজমফান্ড ইউরোপের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনটি। যেখানে পিএফএএসের কারণে পানিদূষণ মোকাবিলায় তৃণমূল পর্যায়ের তিনটি উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও চেক প্রজাতন্ত্রে তথাকথিত ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ হিসেবে পরিচিত এসব রাসায়নিকের বেপরোয়া ব্যবহারের বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এদিকে, জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিবিদেরা যখন সংখ্যালঘুদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বদনাম করার চেষ্টা করেন, তখন কিছু বার্তাকক্ষ গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে সেই অপতথ্য ছড়ানোর বিষয়টি উন্মোচন করে। তারা খতিয়ে দেখে, ওইসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও অর্জিত ফলাফলগুলো মূলত রাজনীতিবিদদের কথিত দাবির ঠিক বিপরীত।

ছবি: স্ক্রিনশর্ট, ক্লিভল্যান্ড প্লেইন ডিলার
উৎস: ক্লিভল্যান্ড প্লেইন ডিলার। গ্রাফিক: টিনা রোজেনবার্গ, আইআরইর প্রেজেন্টেশন
এই ধরনের ব্যতিক্রমধর্মী অনুসন্ধানগুলো ভঙ্গুর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি কাঠামো তৈরি করে। যেমন, কোনো পুলিশ বিভাগ কীভাবে নিজেদের দুর্নীতি দূর করেছে, তা দেখিয়ে অন্য কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ বিভাগের অনিয়মগুলোও সামনে আনা সম্ভব।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আইআরই ২০২৬ সম্মেলনে এই বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক অধিবেশনে আলোচকেরা জোর দিয়ে বলেন, পদ্ধতিগত ব্যর্থতা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় এই ধরনের অনুসন্ধানকে আরও বেশি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এর কারণ শুধু এই নয় যে, এসব অনুসন্ধান বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারে; বরং এর মাধ্যমে সাংবাদিকেরা প্রচলিত জবাবদিহিমূলক অনুসন্ধানের জন্য নতুন উৎসের সঙ্গেও যোগাযোগের সুযোগ পান। তারা এমন গবেষণার কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে দেখা গেছে, এসব অনুসন্ধানে উঠে আসা ইতিবাচক ফলাফল সংবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা দর্শক-শ্রোতাদের আবারও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত করতে পারে।
আইআরই২৬-এর প্যানেলে ছিলেন সলিউশনস জার্নালিজম নেটওয়ার্কের সহপ্রতিষ্ঠাতা টিনা রোজেনবার্গ; নিউজডে-এর পরিবহনবিষয়ক প্রতিবেদক পিটার গিল এবং গার্ডিয়ানের গণতন্ত্র ও রাজনীতিবিষয়ক প্রতিবেদক জর্জ চিডি।
রোজেনবার্গ বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ের অনিয়মের ঘটনা নিয়ে কাজ করার সময় এই পদ্ধতি কার্যকর নয়—যেমন বিচ্ছিন্ন কোনো নির্যাতনের ঘটনা, কিংবা কোনো নির্বাহী কর্মকর্তার বিলাসবহুল বাড়ি কেনার জন্য অর্থ আত্মসাতের ঘটনা। এই পদ্ধতি বরং কার্যকর হয় এমন ক্ষেত্রে, যেখানে বহুল বিস্তৃত কোনো সমস্যার সঙ্গে ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা জড়িয়ে থাকে। যেমন খামারের শ্রমিকেরা নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত তাপের মধ্যে কাজের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, ঘুষ বা অবৈধ কমিশনের সুযোগ তৈরি করে এমন দুর্বল ব্যবস্থাপনা, কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের পড়তে না শেখা।
“এসব প্রতিবেদন তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ হলো অজুহাত দেখানোর সুযোগটা কেড়ে নেওয়া,” বলেন রোজেনবার্গ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “অনেক সময় কর্মকর্তারা বলতে পারেন, ‘আমি জানি, বিষয়টি ভয়াবহ; আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।’ কিন্তু একই ধরনের অবস্থা ও সমর্থ নিয়ে আমাদের পাশের প্রতিষ্ঠানটি যদি আরও ভালো করতে পারে, তার মানে আপনি আপনার সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন না। আর আপনার কাজটি মূলত সমস্যার মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে কঠোর ও তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন। এটি কোনো পক্ষের হয়ে প্রচারণা নয়, দায়সারা কোনো লেখা নয়, কিংবা জনসংযোগও নয়।”
তিনি আরো বলেন, এই ধরনের অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করার আরেকটি কারণ হলো পাঠকদের রোজকার উদ্বেগের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা।
“অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয় কী হওয়া উচিত—সে সম্পর্কে আপনার ধারণাকে সম্প্রসারিত করতে সাহায্য করে এটি,” বলে উল্লেখ করেন রোজেনবার্গ। তিনি যোগ করেন, “মানুষের জীবনে যেসব বিষয় সত্যিই প্রভাব ফেলে, তার পরিসর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি বড়। পাঠকেরা হয়তো বলবেন, ‘হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তার অর্থ চুরি নিয়ে আমি যতটা আগ্রহী, তার চেয়ে হাসপাতালে ওষুধ ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমার ও আমার পরিবারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’”
রোজেনবার্গ বলেন, সমাধানভিত্তিক প্রতিবেদনের শুরুটা যদি এমন হয় যে, কোনো সূত্রের কাছ থেকে “আমি এই চমৎকার কর্মসূচির কথাটি শুনেছি…”— তাহলে তা মানবিক আগ্রহের ফিচার (হিউম্যান ইন্টারেস্ট ফিচার) হয়ে ওঠে। সেগুলো আর ব্যতিক্রমধর্মী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দিকে এগোয় না।
“তবে আপনি কিন্তু আপনার অনুসন্ধানের জন্য এমনটি চান না। তাই বড় কোনো প্রতিবেদন তৈরির সময় শুরু করুন এই প্রশ্ন দিয়ে, ‘সমস্যাটা কী? আর একই ধরনের সমর্থ নিয়ে কে বা কারা ভালো করছে?’ আমরা এটিকে বলি ‘পজিটিভ ডেভিয়েন্ট’ বা ‘ইতিবাচক ব্যতিক্রম।”—বলেন তিনি।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় একই প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের সম্পদ পরিবর্তনের আগে ও পরে পাওয়া ফলাফল তুলনার ক্ষেত্রেও। যেমন, গত বছর উগান্ডার মেট্রোএফএম ৯০ দশমিক ৮ তুলে ধরে, কীভাবে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ভূস্থানিক কনট্যাক্ট-ট্রেসিং টুল ব্যবহার করে উগান্ডার স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষ ইবোলার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় রেকর্ড সাফল্য অর্জন করে। অথচ একই মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের ইউএসএআইডি তহবিল হ্রাসের ফলে দেশটির প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে প্রচলিত অর্থায়নের পরিমাণ সংকুচিত হয়।

ছবি: স্ক্রিনশট, মেট্রোএফএম ৯০ দশমিক ৮
রোজেনবার্গ আরও বলেন, “এখানে পুরো ঘটনাটি তুলে ধরার ব্যাপারও রয়েছে: আপনি যদি কেবল অপরাধ বৃদ্ধি নিয়ে লেখেন, কিন্তু অপরাধ কমার প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান, তাহলে আপনি পাঠকদের বিভ্রান্ত করছেন।”
প্যানেলের আলোচকেরা একমত হন যে, এই পদ্ধতিতে প্রমাণের ক্ষেত্রে কঠোরতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, ইতিবাচক ব্যতিক্রমের উদাহরণগুলো তুলে ধরার সময় যথেষ্ট সন্দেহপ্রবণতা এবং সমালোচকদের মতামতও বিবেচনায় রাখতে হবে।
লং আইল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বেশি। বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে ‘ভিশন জিরো’ নামে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগের কথা জানতে পারেন গিল। এটি একটি বহুমুখী কৌশল, যেখানে গাড়িচালকদের ভুল করার সম্ভাবনাকে স্বীকার করে এমন ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা শুধু দুর্ঘটনা বা দ্রুত যান চলাচলের দিকে নজর না দিয়ে গুরুতর দুর্ঘটনাকে অগ্রাধিকার দেয়। তিনি দেখতে পান, এই কর্মসূচির মাধ্যমে মৃত্যুর হার কমানোর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ পাওয়া যায় স্টকহোম ও হেলসিঙ্কির মতো উত্তর ইউরোপের শহরগুলোতে। তবে তিনি বুঝতে পারেন, সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে লং আইল্যান্ডের পাঠকদের কাছে এসব শহরের উদাহরণ ভালো তুলনা হিসেবে বিবেচিত হবে না।
এর পরিবর্তে, গিল মেরিল্যান্ডের মন্টগোমারি কাউন্টির একই ধরনের ঘটনার উদাহরণ টানেন। যেখানে তিনি দেখান ভিশন জিরো উদ্যোগের কিছু পদক্ষেপ ব্যবহার করে কীভাবে গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনার পরিমান উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছিল।
গিল ব্যাখ্যা করেন, “লং আইল্যান্ডের সঙ্গে মন্টগোমারি কাউন্টির তুলনা করার নেপথ্যে কয়েকটি কারণ ছিল: সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে চলমান উদ্যোগ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অগ্রগতি; উভয় এলাকাতেই মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম গাড়ি; উভয় এলাকাই তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ, তবে কিছু এলাকায় দারিদ্র্যও রয়েছে; জনঘনত্বও প্রায় একই রকম—ঘনবসতিপূর্ণ শহরতলি থেকে কৃষিপ্রধান অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর ঘটনাগুলো পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি, তবে অগ্রগতি করেছেন।”
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
তুলনা করার আগে আপনার হাতে আসা উদাহরণটি নিয়ে ভাবুন, বারবার ভাবুন এবং যাচাই করুন। গিল পরামর্শ দেন, “আপনার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সম্প্রদায় নির্বাচন করুন। সমাধানটিকে পুরোপুরি নিখুঁত হতে হবে না, তবে তা যেন কোনো একটি লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয়।” নিজেকে প্রশ্ন করুন, “প্রাসঙ্গিক সব বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় নেওয়ার পর, আপনি যে সম্প্রদায়কে উদাহরণ হিসেবে দেখাতে চাচ্ছেন, তাদের সঙ্গে যথেষ্ট মিল রয়েছে কিনা?”
সমস্যাটি হতে হবে পদ্ধতিগত ও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। রোজেনবার্গ বলেন, “যদি কোনো সমস্যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে অনেক মানুষই তা সমাধানের চেষ্টা করবেন। এবং এর মধ্যে কিছু উদ্যোগ অন্যগুলোর তুলনায় সংবাদ হিসেবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দ্বিতীয়ত, যা কোনো একক ব্যক্তির খারাপ আচরণের ফলাফল নয় বরং অবশ্যই ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হতে হবে।”
তুলনার জন্য সম্ভাব্য উদাহরণ খুঁজতে তথ্য–উপাত্ত ব্যবহার করুন। তথ্য নিয়ে কাজ করেন এমন সাংবাদিকেরা সাধারণত তথ্য-উপাত্তে নেতিবাচক ব্যতিক্রমগুলো খুঁজে বের করতে অভ্যস্ত। তবে রোজেনবার্গ বলেন, অনেক সময় আরও এক ধাপ এগিয়ে তথ্য-উপাত্তে এর বিপরীত উদাহরণ খুঁজে দেখা এবং তা অন্য তথ্যের সঙ্গে তুলনীয় কি না, তা যাচাই করাটা গুরুত্বপূর্ণ।
“তথ্য-উপাত্তে কোনো ব্যতিক্রম দেখলেই আমরা সাধারণত খারাপ লোকদের ধরতে ছুটে যাই। কিন্তু আরও আকর্ষণীয় প্রতিবেদন হতে পারে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যে, ‘এই প্রতিষ্ঠান বা এলাকাটি এমন কী করেছিল, যা অন্যরা করেনি?’” বলেন তিনি।

২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, বাল্টিমোর শহরে অপরাধের মাত্রা “যুদ্ধক্ষেত্রের” পর্যায়ে চলে গেছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে বাল্টিমোরে সহিংস অপরাধের মাত্রা ধারাবাহিকভাবে কমে আসার তথ্য-উপাত্তগুলো তার এই দাবিকে সুস্পষ্টভাবেই মিথ্যা প্রমাণ করে। ছবি: জর্জ চিড, আইইআরের প্রেজেন্টেশন।
তুলনার জন্য নির্বাচিত জায়গার স্থানীয় সাংবাদিক ও তাদের প্রতিবেদনকে কাজে লাগান। গিল বলেন, “বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পড়া গুরুত্বপূর্ণ। আমি যোগাযোগের সূত্র খুঁজে বের করতে, বিষয়টি সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পেতে এবং হাঁটতে হাঁটতে সাক্ষাৎকার নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংবাদপত্রের ওপর অনেকটাই নির্ভর করেছি।”
তুলনায় এগিয়ে থাকা পদ্ধতিকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করবেন না। যেহেতু তুলনামূলক তথ্য-উপাত্তই মূল বক্তব্য তুলে ধরবে, তাই গিল বলেন, প্রমাণগুলো সরাসরি তুলে ধরা, প্রতিষ্ঠান ও তাদের পরিবেশের মধ্যে যেসব ক্ষেত্রে সামান্য পার্থক্য রয়েছে, সেগুলো পাঠকদের কাছে স্পষ্ট করা এবং সমালোচকদের মতামত যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “কোনো সমাধানই নিখুঁত নয়, আর সব গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়গুলোও পুরোপুরি একই রকম নয়। তাই বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করবেন না। তবে আপনার নিজের এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, আপনি যা খুঁজে পেয়েছেন তা নিয়ে তাদের মতামত জানুন। অনেক সময় তারা বলবেন, ‘আমরা এখানে এটা করতে পারি না কেন?’”
চিডি আরও বলেন, “সমালোচকদের বক্তব্যের উত্তর যেন আপনার প্রতিবেদনের মধ্যেই থাকে, অন্য কোথাও নয়।”
অনুসন্ধানের দৃষ্টিকোণ নির্ধারণে বিশেষণ ব্যবহার করুন। রোজেনবার্গ জানান, “শুধু একটি বিশেষণ বেছে নেওয়াও” বড় কোনো সমস্যা নিয়ে অনুসন্ধানের নির্দিষ্ট দিকগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “প্রতিটি সমস্যা আসলে অনেক ছোট ছোট সমস্যা নিয়ে গঠিত। আপনি যা করবেন, তা হলো সাফল্যের পথে মূল বাধাগুলো কী কী, তার ভিত্তিতে সমস্যাটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করবেন। এটি কি ধীরগতির? তাহলে খুঁজে দেখুন, কারা দ্রুততার সঙ্গে কাজ করেছে। এটি কি খুব ব্যয়বহুল? তাহলে দেখুন, কে কম খরচে করছে। এটি কি অসমতাপূর্ণ? তাহলে দেখুন, কে বেশি ন্যায়সংগতভাবে কাজটি করছে?”
তিনি বলেন, সাফল্যের পথে গুরুত্বপূর্ণ বাধাগুলো চিহ্নিত করাও আরেকটি পদ্ধতি হতে পারে। যেমন, অনুসন্ধানের বিষয় যদি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করেও পড়তে না পারা শিক্ষার্থীরা, তাহলে এই সম্ভাব্য বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা যেতে পারে: “শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি”, “শিক্ষকেরা যথেষ্ট প্রশিক্ষিত নন” এবং “শিশুরা এতটাই ক্ষুধার্ত যে মনোযোগ দিতে পারে না।”
প্রতিদ্বন্দ্বী সংবাদমাধ্যমের বিশেষ প্রতিবেদনের জবাব দিতে ‘পজিটিভ ডেভিয়েন্ট’ প্রতিবেদন তৈরি করুন। পদ্ধতিগত ব্যর্থতার তথ্য উন্মোচন করে প্রতিদ্বন্দ্বী সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিপরীতে নতুন প্রতিবেদন সময়মতো করতে না পারলে সম্পাদকরা যখন সাংবাদিকদের ভর্ৎসনা করেন, তখন ওই সাংবাদিক একই ধরনের এমন সরকারি প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করতে পারেন, যেগুলো এসব ব্যর্থতা এড়িয়ে যেতে পেরেছে। এর মাধ্যমে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানটির জবাবদিহিও আরও গভীরভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
রোজেনবার্গ বলেন, “আমি এটিকেও বিশেষ প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনা করব।”
প্রমাণের ক্ষেত্রে কঠোর থাকুন। চিডি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন বা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিকেরা যে সমস্যাগুলো সামনে আনেন, সেগুলোর ক্ষেত্রে কঠোরভাবে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করাই হলো সলিউশনস জার্নালিজমের মূল কথা। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে: ‘আমরা কি কোনো দাবির পক্ষে ও বিপক্ষে থাকা তথ্য-প্রমাণকে সমান সন্দেহের চোখে দেখছি?’ “আর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা সমাধানটি কতটা কার্যকর, সেটিই এই ধরনের সাংবাদিকতাকে অন্য সংবাদ থেকে আলাদা করে।”
তিনি আরও বলেন, “তথ্য-প্রমাণ যাচাই করাই হলো ‘আপনি তো কোনো পক্ষের হয়ে সাংবাদিকতা করছেন’—এমন অভিযোগের বিরুদ্ধে আপনার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।”
অপপ্রচার খণ্ডনে সাফল্য অনুসন্ধান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করেন, বাল্টিমোর শহর “একটি নরককুণ্ড” এবং সেখানে সহিংস অপরাধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন চিডি শুধু এই অপপ্রচারের বিপরীতে সত্য যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেননি; বরং এর বিপরীতে শহরটি কীভাবে দুই বছরে সহিংস অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে, তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করেন।
চিডি বলেন, “কোনো মিথ্যা তথ্য যদি নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তাহলে এই ধরনের প্রতিবেদনে সেটিই প্রথমে অনুসরণ করা উচিত। আমি প্রভাবের বিষয়টি দেখি। ট্রাম্প যখন এমন কোনো বিষয় নিয়ে মিথ্যা বলেন, যে বিষয়ে আমি আসলে কিছু জানি, তখন বিষয়টি খতিয়ে না দেখা পর্যন্ত আমার স্বস্তি হয় না।”
চিডি জানতে পারেন, শহরটি অপরাধ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত “কিচেন সিঙ্ক” পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল। যেমন, একটি দল গুলিতে নিহত ব্যক্তির বন্ধুদের চিহ্নিত করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করত এবং প্রতিশোধমূলক অপরাধের সম্ভাবনা কমাতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিত।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “বাল্টিমোরে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ যেমন, জেলা অ্যাটর্নি, গভর্নর, মেয়র, সমাজসেবা সংস্থা, হাসপাতাল, পুলিশ এবং সাধারণ মানুষ সবাই মনে করেছিল হত্যার পরিমান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে, এর সমাধানের পথে যেসব রাজনৈতিক সমস্যা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেগুলোকেও তারা মেনে নিতে পারেনি। তারা একটি পরিকল্পনার আওতায় একসঙ্গে কাজ শুরু করে। মেয়র এই পরিকল্পনাটি তৈরি করেছিলেন। কারণ তিনি দেখেছিলেন, অন্য শহরগুলোতেও পদ্ধতিটি কাজ করেছে। এছাড়া অবকাঠামো আইন থেকে পাওয়া কিছু অর্থও তার হাতে ছিল। যা তিনি এই কাজে ব্যয় করতে পারতেন।”

ছবি: গার্ডিয়ানের স্ক্রিনশট
চিডি বাল্টিমোর শহরের নেতাদের অতীতের ব্যর্থতার তথ্য-উপাত্তও খতিয়ে দেখেন এবং নতুন কৌশলটির বিরুদ্ধে যারা জোরালো সমালোচনা করেছেন, তাদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের প্রতিবেদন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থাও বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, “এটি একটি সমস্যা যে, কোনো ভয়াবহ ঘটনা না ঘটলে সাংবাদিকরা সাধারণত দরিদ্র সম্প্রদায়গুলোর কাছে যান না।”
রোজেনবার্গ বলেন, সফলভাবে সমস্যা মোকাবিলার উদ্যোগগুলো খতিয়ে দেখলে সামগ্রিকভাবে পাঠকদের সংবাদে আগ্রহও বাড়তে পারে। “সংবাদ এড়িয়ে চলার প্রধান কারণ হলো, এটি মানুষের মেজাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ২০২৩ সালে রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্টে সংবাদ এড়িয়ে চলা মানুষদের কাছ জানতে চাওয়া হয়, কী ধরনের প্রতিবেদন তাদের আবার সংবাদ পড়ায় ফিরিয়ে আনতে পারে। তাদের উত্তর ছিল, ‘আমরা আরও ইতিবাচক বা সমাধানভিত্তিক প্রতিবেদন চাই।’ তারা এমন প্রতিবেদন পছন্দ করেন, যা চরম হতাশাজনক নয়।”
তিনি আরও বলেন, “আরেকটি কারণ হলো আশার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা—তবে এমন আশা, যার ভিত্তি আছে; মিথ্যা আশা নয়।”
রোয়ান ফিলিপ জিআইজেএনের গ্লোবাল রিপোর্টার এবং ইমপ্যাক্ট এডিটর। তিনি আগে দক্ষিণ আফ্রিকার সানডে টাইমসের প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন। বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে তিনি বিশ্বের দুই ডজনেরও বেশি দেশ থেকে সংবাদ, রাজনীতি, দুর্নীতি এবং সংঘাত নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন।