ব্রাজিলে একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি সরকারি স্কুলের কাছে অবস্থিত এই সুবিধাজনক দোকানটিতে তামাক ও ভ্যাপ পণ্যের পাশাপাশি শিশুদের জিনিসপত্রও বিক্রি করা হচ্ছিল। ছবি: লেখকের সৌজন্যে
বড় অনুসন্ধান চালাতে পারেন মানচিত্র ও ডেটা ব্যবহার করে: ব্রাজিলের এই উদাহরণটি হতে পারে শিক্ষনীয়
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
একটি শহরের প্রতিটি হাসপাতালের তালিকা করলেন। শহরের ঝুঁকিপূর্ণ বা দরিদ্র এলাকা থেকে হাসপাতালগুলো কতটা কাছে বা দূরে অবস্থিত, তা মানচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরলেন। কেমন দেখা যাবে? আপনি কি কখনও এটি ভেবে দেখেছেন? কিংবা গ্যাস স্টেশন, বার ও মদ বিক্রি করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না? তা যাচাই করা যায় কি? অথবা ধনী এলাকার তুলনায় দরিদ্র এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা, পুলিশ স্টেশন, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও স্কুলের অনুপাত কি একই রকম? এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর কোনো একক তালিকা থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে এমন একটি কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে, যার মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটাবেস ও মানচিত্র তৈরি করা যায়।
সাংবাদিকতার প্রতিটি অনুসন্ধানের শুরুটা হয় দারুণ একটি প্রশ্ন থেকে। তবে, খুব কম ক্ষেত্রেই উত্তরটি কোনো একক উৎস থেকে পাওয়া যায়। ব্রাজিলজুড়ে স্কুলের ১০০ মিটারের মধ্যে ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি তামাকপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করে ম্যাপ অব টোব্যাকো শপস প্রজেক্ট। ব্রাজিলের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্ল্যাটফর্ম ‘ও জোইও ই ও ত্রিগোর’ তৈরি এবং অ্যাক্ট হেলথ প্রমোশনের অর্থায়নে পরিচালিত এই অনুসন্ধানের শুরুটাও হয়েছিল ঠিক এমন একটি প্রশ্ন থেকে। কীভাবে প্রাথমিক প্রশ্ন দিয়ে শুরু করে শেষের উত্তরগুলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এই লেখাতে সেই প্রক্রিয়াটি তুলে ধরা হয়েছে।
ডেটা সাংবাদিকতার টানাপড়েন হচ্ছে; আমরা একদিকে পরিমাপযোগ্য ডেটার পেছনে ছুটি, আবার সেই ডেটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে, সেটিও তুলে ধরার চেষ্টা করি। এই ব্যবধান ঘোচানোর অন্যতম সেরা মাধ্যম হলো মানচিত্র। প্রতিটি মানচিত্রের পেছনে থাকে একটি ডেটাসেট। যেটিকে আমরা বলি জিওরেফারেন্সড ডেটা (ভৌগোলিক অবস্থানের তথ্য) । মূলত দুটি কলাম থাকে, অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ। যার সাহায্যে স্প্রেডশিটের প্রতিটি সারির তথ্যকে মানচিত্রে দৃশ্যমানভাবে উপস্থাপন করা যায়।
বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জিওরেফারেন্সড ডেটা সংগ্রহ
সরকারি বা উন্মুক্ত ডেটাবেসে থাকা স্কুল, হাসপাতাল ও লাইব্রেরির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকার সঙ্গে ঠিকানাও দেওয়া থাকে। কিন্তু যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সরকারি নিবন্ধন নেই, অথবা যেগুলোর কার্যক্রম নিয়ে আইনি নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট নয়, সেসব নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে জিওরেফারেন্সড ডেটা খুঁজে পাওয়া অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বেশিরভাগ সময় নিজেকেই নিজের ডেটাসেট তৈরি করতে হয়।
এখানে কাজে আসতে পারে গুগল প্লেসেস এপিআই। যা গুগল ম্যাপে তালিকাভুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে। পদ্ধতিটির মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের বিপরীত বৈশিষ্ট্য, যা সাংবাদিকতার জন্য সহায়ক। পরিদর্শন এড়াতে যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরকারি নিবন্ধন এড়িয়ে চলে তারা কিন্তু আবার এটিও আশা করে যে গ্রাহকেরা যেন তাদের সহজে খুঁজে পায়। তাই এ পদ্ধতিটি আপনি কাজে লাগাতে পারেন। কেননা এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো গুগল প্লেসেসে নিজেদের তথ্য দেয়। যা অনেকটা অনানুষ্ঠানিক তালিকার মতো কাজ করে।
ব্রাজিলে তামাকের দোকান ও স্কুল নিয়ে এই অনুসন্ধানের শুরুটা হয়েছিল একটি প্রশ্ন দিয়ে: “ব্রাজিলের বিভিন্ন স্কুলের পাশে ঠিক কতগুলো তামাকের দোকান রয়েছে?” আমি এমন অনেক তামাকের দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করেছিলাম তা স্কুলের ঠিক পাশে কিনা এবং কী পরিমান অপ্রাপ্তবয়স্করা সেখানে ক্রেতা হিসেবে আসছেন। কিন্তু দেশজুড়ে এই সমস্যার ব্যাপ্তি পরিমাপ করার কোনো পদ্ধতি আমার জানা ছিল না। তাই টুলটি কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য প্রথমে গুগল ম্যাপস খুলে নিজের বাড়ির আশপাশে তামাকের দোকান খোঁজা শুরু করি।
এভাবে খুঁজে দেখাটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে গুগল ম্যাপস খুলে বিভিন্ন অনুসন্ধান চালাতে হবে। কোন কোন শব্দ ব্যবহার করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়, তা খেয়াল করতে হবে। গুগল ম্যাপস এপিআইয়ে যেহেতু বিভিন্ন ধরনের মূল্য নির্ধারণী ব্যবস্থা রয়েছে এবং প্রতি মাসে বিনামূল্যে সীমিত পরিমাণ ডেটা সংগ্রহের সুযোগ পাওয়া যায়, তাই অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়াতে আপনার অনুসন্ধানগুলো সুনির্দিষ্ট হওয়া জরুরি। কোন ধরনের শব্দ সবচেয়ে ভালো কাজ করে, আগে থেকে তা জানা থাকলে অনুমানের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালিয়ে বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য বেধেঁ দেওয়া কোটা নষ্ট করা থেকে বাঁচা যায়।
এপিআই ব্যবহার করেই বড় পরিসরে এই ডেটা সংগ্রহ করা সম্ভব। কারণ স্ক্রিনে মানচিত্রটি যেখানে চিহ্নিত করা থাকে, গুগল ম্যাপস সাধারণত তার আশপাশেই অনুসন্ধান চালায়। অন্যদিকে, এপিআইয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একের পর এক শহর, রাজ্য বা পুরো দেশের তথ্য অনুসন্ধান করা যায়। আপনার ভৌগোলিক পরিসর যত সুনির্দিষ্ট হবে, অনুরোধ পাঠানোর সংখ্যাও ততটা কমে আসবে। এভাবে গুগল ক্লাউডের বিনামূল্যের মাসিক ক্রেডিট সীমার মধ্যে প্রকল্পের কাজ করে যাওয়া সম্ভব হয়। আগে সুবিধাটি প্রতি মাসে ২০০ মার্কিন ডলারের ক্রেডিট হিসেবে দেওয়া হতো। বর্তমানে প্রতিটি এপিআইয়ের জন্য প্রতিমাসে নির্ধারিত ফ্রি রিকোয়েস্ট কোটা চালু করা হয়েছে। বিনামূল্যে প্রতিটি বিভাগ ব্যবহারের সীমাও আলাদা। গুগল ডেভেলপার্স ওয়েবসাইটে ফ্রি ব্যবহারের সীমা দেখুন। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে আগে থেকেই কতসংখ্যক কল করতে হবে, তার একটি আনুমানিক হিসাব করে বাজেট পরিকল্পনা করা ভালো।
আপনার লক্ষ্য যদি স্কুল বা হাসপাতালের অবস্থানের মতো সরকারি তথ্য, কিংবা মহামারিবিষয়ক রেকর্ড বা অপরাধের পরিসংখ্যানের সঙ্গে গুগল ম্যাপস থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়, তাহলে সরকারি উন্মুক্ত ডেটাবেস, এনজিওগুলোর ডেটাসেট খুঁজুন। অথবা তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্যের জন্য আবেদন করুন। জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রেকর্ডের সঙ্গে আপনার সংগৃহীত ডেটা মিলিয়ে দেখলে অনুসন্ধানটি আরও শক্তিশালী হয়।
চরম পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে সরকারি তথ্যই নেই, সেখানেও এই পদ্ধতি তথ্যের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো ডেটাবেসে আপনার প্রবেশাধিকার না থাকলে, গুগল প্লেসেসেও একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। তবে এই ডেটা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা যাচাই করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এপিআই ব্যবহার, ডেটা সংগ্রহ এবং ডেটাবেসের তথ্য যাচাই ও সংশোধন
বিভিন্ন শব্দ দিয়ে পরীক্ষা করে কোনগুলো সবচেয়ে ভালো ফল দেয়, তা বের করে নেওয়ার পর ডেটা সংগ্রহের কাজটি স্বয়ংক্রিয় করা যায়। স্ক্রিপ্টটি প্রথমে বিভিন্ন স্থানের একটি তালিকা নেয়। এই তালিকায় শহর, রাজ্য বা দেশের নাম থাকতে পারে। এরপর অনুসন্ধানের সময় আগে থেকে ঠিক করে রাখা কিছু নির্দিষ্ট কীওয়ার্ড ব্যবহার করে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এপিআইতে তথ্যের জন্য অনুরোধ পাঠায়। যেমন—“তামাকের দোকান”, “ভেপের দোকান” বা “হুকাহর দোকান”। আমার ক্ষেত্রে, ব্রাজিলে ৫ হাজারের বেশি পৌরসভা থাকায় আমি ব্রাজিলের ভূগোল ও পরিসংখ্যান সংস্থা (আইবিজিই) থেকে শহরগুলোর একটি তালিকা ডাউনলোড করে সিএসভি ফাইল হিসেবে আপলোড করেছি। আপনার তালিকায় যদি কমসংখ্যক স্থান থাকে, তাহলে পাইথনে সরাসরি সেসব স্থানের নামের তালিকা তৈরি করলেই হবে।

ছবি: স্ক্রিনশট, লেখকের সৌজন্যে
উদাহরণ হিসেবে, আপনি ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলোর তালিকা তৈরি করে সেসব শহরের পাব ও স্টেডয়াম খুঁজতে পারেন। এরপর প্রতিটি স্টেডিয়ামের আশপাশে কতগুলো পাব রয়েছে, তা হিসাব করতে পারেন।
এখানে আমরা কোডের খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করব না। স্ক্রিপ্টটি উন্মুক্ত এবং এতে মন্তব্য যোগ করা রয়েছে, তাই যে কেউ এটি কপি করে প্রয়োজন অনুযায়ী প্যারামিটার পরিবর্তন করতে পারেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি আমি যখন ডেটা সংগ্রহ করেছিলাম, ততদিনে এপিআইয়ের যে সীমাবদ্ধতাগুলো ছিল, সেগুলো সামলানোর উপযোগী করেই স্ক্রিপ্টটি তৈরি করা হয়েছে। এরপর এপিআইয়ে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দেখে নেওয়া ভালো।

ছবি: স্ক্রিনশট লেখকের সৌজন্যে
স্ক্র্যাপিং শেষে কোডটি সব তথ্য একসঙ্গে করে একটি চূড়ান্ত ডেটাসেট তৈরি করে। এই টেবিলে প্রতিটি স্থানের ভৌগোলিক অবস্থানের তথ্য থাকে, যা পরের ধাপে স্থানগুলোর মধ্যে দূরত্ব হিসাব করতে ব্যবহার করা হয়। ছবি: লেখকের সৌজন্যে
ডেটা মিলিয়ে দেখতে এবং দূরত্ব হিসাব করতে পাইথনের ব্যবহার
মানচিত্র থেকে প্রতিটি জায়গার দূরত্ব আলাদাভাবে যাচাই করার দরকার নেই। কারণ এই কোডটি বড় পরিসরে কাজটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে। এটি পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি বিবেচনায় রেখে প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অবস্থানের তথ্য নিয়ে সবচেয়ে কাছের জায়গাটি কত মিটার দূরে তা হিসাব করে।
হাজার হাজার বিন্দুর সঙ্গে অন্য হাজার হাজার বিন্দুর তুলনা করতে গেলে সাধারণ কম্পিউটারের গতি কমে যেতে পারে। বার্তাকক্ষের বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে সমস্যাটি এড়াতে স্ক্রিপ্টটি (প্রোগ্রামের কোড) তৈরি করা হয়েছে। এটি ডেটাগুলো কয়েকটি ভাগে ভাগ করে এবং স্থানভিত্তিক তথ্য খোঁজার কিছু কৌশল ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দূরত্ব হিসাব করে। এই কাজে ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং টুলগুলো বিস্তারিতভাবে জানা জরুরি নয়। কীভাবে কাজটি করা হচ্ছে, সেটি বুঝে স্ক্রিপ্টের ফাইলটি চালালেই হবে।
শেষ পর্যন্ত এই স্ক্রিপ্টটি অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সাজিয়ে দেয়। এটি এমন একটি স্প্রেডশিট তৈরি করে, যেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থান অনুসারে ৫০, ১০০ ও ২০০ মিটারের মধ্যে সাজানো থাকে (চাইলে অবস্থানগত এই দূরত্ব পরিবর্তনও করা যায়) । ফলে আপনার হাতে এমন ডেটা আসে, যা আগে থেকেই প্রক্রিয়াজাত করা ও মানচিত্র তৈরির জন্য প্রস্তুত। অথবা অনুসন্ধানের নির্দিষ্ট গতিপথ নির্ধারণে ব্যবহার করা যায়।

লেখক তামাকের দোকান ও ওষুধের দোকানের জিপিএস অবস্থান এবং স্কুলের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সেগুলোর অবস্থান নিয়ে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এই ডেটাবেসটি তৈরি করেছেন। ছবি: স্ক্রিনশট, লেখকের সৌজন্যে
অন্যান্য ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ
এই পদ্ধতিটি পুনরায় প্রয়োগ করা যায়। এটি দুটি স্থানের মধ্যে ভৌগোলিক সম্পর্ক অনুসন্ধানের জন্য নমুনা হিসেবে কাজ করতে পারে। আবার সরকারি ডেটাবেসের তথ্যের সঙ্গে ম্যাপিং প্ল্যাটফর্ম থেকে সংগৃহীত ডেটা মিলিয়ে দেখার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে যেখানে সরকার কোনো কিছুর পর্যাপ্ত মানচিত্র তৈরি করেনি। অথবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হলেও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে অনলাইনে উপস্থিতির প্রয়োজন বোধ করে।
বাস্তবে, অনুসন্ধানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করতে একই কোড ব্যবহার করা যায়। যেমন, সরকারি স্কুলের আশপাশে বাজির দোকান ও লাইসেন্সবিহীন বিঙ্গো খেলার হলগুলো কোথায় কোথায় আছে, তা মানচিত্রে দেখানো যেতে পারে। আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবস্থানের সঙ্গে এলাকার মাথাপিছু আয়ের তথ্য মিলিয়েও দেখা যেতে পারে। পরিবেশবিষয়ক প্রতিবেদনে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির সীমানার মধ্যে অবৈধ খননকাজে সহায়তা করে এমন অবকাঠামোও এই পদ্ধতি অনুসরণ করে খুঁজে বের করা যায়। যেমন, খননকাজের যন্ত্রপাতির দোকান বা স্বর্ণ কেনাবেচার দোকান কোথায় রয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব। স্ক্রিপ্টের মূল পদ্ধতি একই থাকবে। কেবল অনুসন্ধানের জন্য এপিআইতে ব্যবহৃত শব্দ এবং যে সরকারি ডেটার সঙ্গে তুলনা করা হবে, সেটি পরিবর্তন করতে হবে।
নতুন কোনো অনুসন্ধানে এই পদ্ধতি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা। গুগল প্লেসেসের তথ্য বিভিন্ন উৎস থেকে আসে। তাই সেখানে এমন কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য থাকতে পারে, যেগুলো এরইমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বা ব্যবসার ধরন বদলে ফেলেছে। কিন্তু গুগল ম্যাপসে রয়েছে, অর্থাৎ ব্যবসাটির পুরোনো তথ্যই দেখা যাচ্ছে। এটাকেই “ফলস পজিটিভ” বলা হয়। তাই স্ক্রিপ্ট থেকে পাওয়া তথ্যকে চূড়ান্ত উত্তর হিসেবে না দেখে, সম্ভাব্য অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। প্রতিবেদন প্রকাশের আগে স্ক্রিপ্টে পাওয়া তথ্য গুগল স্ট্রিট ভিউয়ের ছবি দেখে এবং সম্ভব হলে সরেজমিনে গিয়ে যাচাই করা জরুরি।
ডেটাবেস খুঁটিয়ে দেখা এবং বড় গল্প খুঁজে বের করা
এই ধরনের প্রতিবেদনের কাজে হাতেকলমে যাচাই-বাছাইয়ের কোনো বিকল্প নেই। ডেটাবেস পরিষ্কার করার সময় আমি প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিজ হাতে যাচাই করেছি। এই কাজটি শুধু ডেটার নির্ভরযোগ্যতা বাড়ায়নি, বরং এমন কিছু গল্পও সামনে এনেছে, যা প্রতিবেদনটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। যেমন, একটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম একই সঙ্গে তামাকের দোকান ও স্টেশনারি হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল। ১০ বছর ধরে একই জায়গায় থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি একই দোকান থেকে শিশুদের কাছে স্কুলের প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক বিক্রি করছিল। আর দুই ধরনের ক্রেতাই ছিল একই মিশ্র গ্রাহকগোষ্ঠীর অংশ।

সরেজমিনে প্রতিবেদন তৈরির সময় লেখক দেখতে পান, একটি সরকারি স্কুলের কাছে থাকা এই স্টেশনারি দোকানটিতে তামাকজাত পণ্যও বিক্রি করা হতো। ছবি: স্ক্রিনশট, লেখকের সৌজন্যে
পথে আরও কিছু ঘটনাও আমার নজরে এসেছে: একটি দোকানে খেলনা ও ভেপ পড—দুটিই বিক্রি করা হতো, আর একটি কনভিনিয়েন্স স্টোর ধীরে ধীরে তামাকজাত পণ্যও বিক্রি শুরু করেছিল।
কোড ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ধরা পড়েনি এমন সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ধরতে চাইলে ডেটার প্রতিটি সারি ধরে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। আর একজন সাংবাদিকের নেতৃত্বে পরিচালিত ডেটানির্ভর সাংবাদিকতার অর্থ হলো, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে জুতার তলা ক্ষয় করা, অর্থাৎ আপনি যখন সরেজমিনে দেখতে যাবেন তখন শ্রম ও সময়কে ভালোভাবে কাজে লাগান। কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়া ঘুরে বেড়ানো কিংবা হঠাৎ কিছু খুঁজে পাওয়ার আশায় থাকার চেয়ে ডেটা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষে একটি নির্দিষ্ট গল্প হাতে নিয়ে মাঠে যাওয়া, সূত্রের সাক্ষাৎকার নেওয়া এবং ছবি তোলা অনেক বেশি কার্যকর।
ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন
এ ধরনের ডেটা উপস্থাপনের জন্য বেশ কিছু টুল রয়েছে। এই প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে আমরা গুগল ম্যাপস ব্যবহার করেছি। এতে ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশনের অভিজ্ঞতা কম থাকা সাংবাদিকেরাও তুলনামূলক সহজে গ্রাফিক উপাদান তৈরি করতে পারেন। ফ্লোরিশ (Flourish) ও কিউজিআইএসও (QGIS) ভালো বিকল্প। তবে এগুলো তুলনামূলক বেশি জটিল।

লেখক ব্রাজিলের জাতীয় মানচিত্র তৈরি করেছেন। যেসব পৌরসভায় তামাকের দোকান সরকারি স্কুলের কাছাকাছি অবস্থিত, সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ছবি: স্ক্রিনশট, লেখকের সৌজন্যে
সীমাবদ্ধতা ও নৈতিক বিবেচনা
সব ডেটাই বাস্তবতার প্রতিফলন। গুগল প্লেসেসের তথ্যের মধ্যেও পক্ষপাত বা বা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। আর তা সম্পর্কে সচেতন ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা জরুরি। মনে রাখবেন, এই তথ্য বিভিন্ন উৎসের সমন্বয়ে গঠিত। যেমন, বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ছবি তোলে এমন কোম্পানির গাড়ি, স্যাটেলাইট চিত্র এবং খোদ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের দেওয়া তথ্য।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রামীণ এলাকা বা যেসব অঞ্চলে অবকাঠামো কম, সেখানে সাধারণত ডেটার সংখ্যাও কম থাকে। প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দেওয়ার আগে সেটি আসলেই তালিকায় উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মেলে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। গুগল থেকে আমরা যে ডেটাসেট সংগ্রহ করেছিলাম, তাতে বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্প্রেডশিটে দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিলই ছিল না। বিষয়টি যাচাই করতে আমি গুগল স্ট্রিট ভিউ ব্যবহার করেছি। পাশাপাশি বিভিন্ন তারিখের ছবি দেখে নিশ্চিত হয়েছি যে আমি আসলে কী দেখছি। যেহেতু এটি সরকারি তথ্য নয়, তাই প্রকাশের আগে বাড়তি সম্পাদকীয় সতর্কতা অবলম্বন করা ভীষণ জরুরি।

ব্রুনো বোর্গেস একজন ডেটা সাংবাদিক। তিনি ব্যান্ড ও গুগলের অংশীদারত্বে পরিচালিত ডিজিটাল রুমে কাজ করেন। ২০২৬ সালে ইউকে অ্যাম্বাসি ইন ব্রাজিলের অংশীদারত্বে ওপেন নলেজ ব্রাজিলের (এস্কোলা দে ডাদোস) এবং ২০২৫ সালে অ্যাক্ট হেলথ প্রমোশনের ফেলো ছিলেন। তিনি ও জোইও ই ও ত্রিগো, নুক্লেও জর্নালিজমো এবং ইনফোআমাজোনিয়ার সঙ্গেও কাজ করেন।