প্রবেশগম্যতা সেটিংস

ছবি: শাটারস্টক

রিসোর্স

» টিপশীট

বিষয়

বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ ফল জার্নালে প্রকাশ হওয়া মানেই কী তা নির্ভুল, তথ্য যাচাইয়ে সাংবাদিকদের জন্য ১০ পরামর্শ

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুসন্ধানের সম্ভাবনাময় সূত্র হতে পারে। অথচ পিয়ার রিভিউ বা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পর্যালোচনার সময় প্রতিটি পরীক্ষা পুনরায় করা কিংবা প্রতিটি তথ্য যাচাই করা হয় না। তাই গবেষণায় পদ্ধতিগত ত্রুটি বা অনিচ্ছাকৃত ভুল থাকতে পারে। আবার কখনও কখনও তথ্য বিকৃত বা বানোয়াটও হতে পারে।

২০২৫ সালে সাংবাদিক ফ্রেডেরিক জোয়েলভিং এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানী সিরিল লাবে ও গিয়োম কাবানাক তথাকথিত সায়েন্টিফিক পেপার মিল-এর ওপর ছয় মাস ধরে চালানো একটি অনুসন্ধানের ফলাফল প্রকাশ করেন। এই পেপার মিলগুলো হলো এমন এক ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যারা প্রায়শই বানোয়াট বা কারচুপি করা তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণামূলক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র তৈরি ও বিক্রি করে থাকে।

তারা যেসব গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে একটি নিয়ে প্রথমে প্রশ্ন তুলেছিলেন ক্যানসার গবেষক সোরেন জিলস্কে ও ড্যানি ওয়েলচ। এই দুই বিজ্ঞানী ওই গবেষণাপত্রের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একই গবেষণা করে তারা ওই ফলাফল আর পাননি। নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে তারা এমন সব গ্রাফে হুবহু একই ধরনের ডেটা দেখতে পান, যেগুলোর মাধ্যমে মূলত ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরার কথা ছিল। জিলস্কে ২০২০ সালে পাবপিয়ারে (PubPeer) এই বিষয়ে তার উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট জার্নালের সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতে ” বিকৃত তথ্য এবং/অথবা উপাত্ত” দেওয়ার অভিযোগে গবেষণাপত্রটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

সাংবাদিকরা কিন্তু প্রতিটি পরীক্ষা পুনরায় করে দেখতে পারেন না, তবে এমন অনেক কিছুই আছে যা তারা যাচাই করতে পারেন। কোনো বৈজ্ঞানিক দাবিকে সংবাদে রূপান্তর বা এই বিষয়ে অনুসন্ধান শুরুর আগে কীভাবে তা যাচাই করা যায়, নিচে তা নিয়ে ১০টি সেরা উপায় তুলে ধরা হলো।

. নিজের মতো আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন

পাবমেড এবং গুগল স্কলার আপনাকে নতুন গবেষণা খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে। তাছাড়া বিষয়বস্তু, কীওয়ার্ড এবং গবেষকদের নিয়ে আপনি গুগল স্কলার অ্যালার্ট সেট আপ করতে পারেন। সায়েন্সপিএনএএসের মতো জার্নালের ইমেল অ্যালার্টের জন্য সাবস্ক্রাইব করতে পারেন। অনুমতিপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের ইউরেকঅ্যালার্ট প্রকাশের আগে গবেষণার তথ্য দেখার সুযোগ দেয়। অন্যদিকে, সাইলাইন সাংবাদিকদের স্বাধীন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

পাবমেড এবং গুগল স্কলার আপনাকে নতুন গবেষণা খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারে। আপনি বিষয়, কীওয়ার্ড ও গবেষকদের জন্য গুগল স্কলারে অ্যালার্টও চালু করতে পারেন। এছাড়া সায়েন্স এবং পিএনএএসের মতো জার্নালে ইমেইল অ্যালার্টের জন্য সাবস্ক্রাইব করতে পারেন। অনুমতি প্রাপ্ত সাংবাদিকদের প্রকাশের আগে গবেষণা দেখার সুযোগ দেয় ইউরেকঅ্যালার্ট। অন্যদিকে সাংবাদিকদের স্বাধীন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয় সাইলাইন।

ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব সায়েন্স রাইটার্সের (এনএএসডব্লিউ) সভাপতি এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে বিজ্ঞান বিট নিয়ে কাজ করেন সন্দীপ রবীন্দ্রন। জিআইজেএনকে বলেন, সাংবাদিকদের একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা উচিত। দিনি আরো উল্লেখ করেন, “সায়েন্স, নেচার, পিএনএএস, সেল বা নিউরন-এর মতো নামকরা জার্নালগুলোতে সাধারণত তাদের স্টাফ সাংবাদিকেরাই প্রতিবেদন করেন। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নতুন ধরনের গল্পের ধারণা খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে এগুলো খুব একটা ভালো জায়গা নয়, তবে পিএলওএস এবং রয়্যাল সোসাইটির জার্নালগুলোর মতো আরও অনেক বিকল্প রয়েছে।”

. প্রেস রিলিজ দেখে নয়, তথ্যটির ‘নিউজ ভ্যালু’ মূল্যায়ন করুন

আপনার ইনবক্সে কোনো প্রেস রিলিজ ( সংবাদ বিজ্ঞপ্তি) আসা মানেই তা নিয়ে প্রতিবেদন লেখার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে—বিষয়টি কিন্তু এমন নয়।

জটিল কোনো গবেষণাপত্র বুঝতে বা গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য খুঁজে পেতে প্রেস রিলিজ আপনাকে সহায়তা করতে পারে। তবে এগুলো কখনোই মূল গবেষণাপত্রটি পড়ার বিকল্প নয়। গবেষণার ফলাফল প্রকৃতপক্ষে যতটা গুরুত্বপূর্ণ বা নির্ভুল, প্রেস রিলিজে এর চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বা চূড়ান্ত বলে তুলে ধরা হতে পারে।

২০২৪ সালের একটি গবেষণায় সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে প্রকাশিত ৮৪টি প্রেস রিলিজ এবং সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত ৪৯৫টি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, অর্ধেকেরও বেশি প্রতিবেদনে প্রেস রিলিজের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং অধিকাংশ প্রতিবেদনে গবেষণার অর্থায়নের উৎস ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে।

তাই প্রেস রিলিজের পাশাপাশি মূল গবেষণাপত্রটিও পড়ুন এবং নিজেকে নীচের এই প্রশ্নগুলো করুন:

  • গবেষণায় শুধু সম্পর্ক বা যোগসূত্র পাওয়া গেছে, কিন্তু প্রেস রিলিজে কি তা কার্যকারণ সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে?
  • গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা সীমাবদ্ধতাগুলো কি প্রেস রিলিজে বাদ দেওয়া হয়েছে?
  • প্রাথমিক ফলাফল ব্যর্থ হওয়ার পর, পরবর্তী ধাপে পাওয়া সামান্য কোনো ইতিবাচক ফলাফলকে কি বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে?

নিউ সায়েন্টিস্টের বার্তা সম্পাদক আলেকজান্দ্রা থম্পসন জিআইজেএনকে বলেন, “জটিল কোনো গবেষণাপত্র বুঝতে সাহায্য করার প্রয়োজন না হলে আমি প্রেস রিলিজকে খুব একটা গুরুত্ব দিই না। যদি সেখানে থাকা নতুন কোনো বিষয় আপনাকে ‘বাহ!’ বলতে বাধ্য না করে, অথবা নতুন কোনো অগ্রগতি হিসেবে মনে না হয়, কিংবা ‘ব্যবহারিকভাবে কাজে লাগবে এমন খবর না হয়।’”

.  বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনাকে নিশ্চয়তার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করবেন না

গবেষণাপত্রের মান নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা বা পিয়ার রিভিউ। কিন্তু এর মাধ্যমে কোনো গবেষণাপত্র যে সঠিক, তা প্রমাণিত হয় না। গবেষণার বিশ্লেষণে থাকা ভুল, কারসাজি করা ছবি, প্রকাশ না করা স্বার্থের সংঘাত, কিংবা প্রকাশের পরই কেবল ধরা পড়া কোনো সমস্যাও পর্যালোচকদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি মর্যাদাপূর্ণ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রও পরবর্তী সময়ে সংশোধন, প্রশ্নবিদ্ধ বা প্রত্যাহার করা হতে পারে।

ইভান ওরানস্কি একজন চিকিৎসক ও বিজ্ঞান সাংবাদিক এবং রিট্র্যাকশন ওয়াচের সহপ্রতিষ্ঠাতা। প্ল্যাটফর্মটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার, সংশোধন এবং গবেষণার সততা-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর নজর রাখে। পাশাপাশি তিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির আর্থার এল. কার্টার জার্নালিজম ইনস্টিটিউটে একজন সম্মানিত আবাসিক সাংবাদিক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। জিআইজেএনকে তিনি বলেন, “অনেক প্রকাশক, বিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকদের বিশ্বাস করাতে চান যে, কোনো গবেষণা পিয়ার রিভিউয়ের মধ্য দিয়ে গেছে মানেই সেটি সঠিক। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে, বিজ্ঞানীরা জানেন যে তা নয়।”

Retraction Watch

ছবি: রিট্র্যাকশন ওয়াচের স্ক্রিনশট

তাছাড়া, প্রি-প্রিন্ট বা গবেষণাপত্রের প্রাথমিক সংস্করণের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ সেটির এখনও পিয়ার রিভিউ বা বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়নি।

সাংবাদিকদের ঠিক কোন কোন বিষয় যাচাই করা উচিত, সায়েন্সের সম্পাদক জন ট্রাভিস সে সম্পর্কে জিআইজেএনকে বলেন, “প্রি-প্রিন্ট বা গবেষণাপত্রের প্রাথমিক সংস্করণ নিয়ে প্রতিবেদন করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়ে নিজেদের একটা পিয়ার রিভিউ করে নেওয়া উচিত। কোনো সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন করার চেয়ে প্রি-প্রিন্ট নিয়ে কাজ করা ভালো। কারণ এক্ষেত্রে পর্যালোচনার জন্য কাউকে পুরো গবেষণাপত্রটিই পাঠানো সম্ভব। প্রি-প্রিন্টের ক্ষেত্রে কিছুটা সংশয় বা সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে তা নিয়ে প্রতিবেদন করা থেকে বিরত থাকা ঠিক হবে না। কারণ বর্তমানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণালব্ধ তথ্যই সবার আগে এভাবেই প্রকাশিত হচ্ছে।

. একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গবেষণাপত্র পড়ুন

শুধুমাত্র সারাংশ (অ্যাবস্ট্রাক্ট) পড়ে কখনোই প্রতিবেদন লিখবেন না। গবেষণাপত্রটির মূল দাবি কী, তা চিহ্নিত করুন। এরপর গবেষণার পদ্ধতি, ফলাফল এবং সীমাবদ্ধতাগুলো খতিয়ে দেখুন। নমুনার আকার ও নমুনা বাছাইয়ের পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রণকারী দল, গবেষণার সময়কাল, পরিমাপ করা ফলাফল, প্রভাবের মাত্রা, নির্ভরযোগ্যতা, গবেষণা থেকে অংশগ্রহণকারীদের বাদ পড়ার হার এবং বিরূপ প্রভাব—সবকিছু যাচাই করুন।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ক্ষেত্রে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা প্রাথমিক ফলাফলকে ট্রায়ালটির নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করুন। কোন ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে বা বাদ দেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা প্রাথমিক ফলাফল ব্যর্থ হওয়ার পর ইতিবাচক কোনো গৌণ ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখুন।

সবশেষে, গবেষণাটির অর্থায়ন ও স্বার্থের সংঘাত সংক্রান্ত বিবৃতি, সারণি, চিত্র এবং সম্পূরক ফাইলগুলো পড়ে দেখুন। গবেষণার প্রধান ফলাফলের পাশাপাশি এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাটিও উল্লেখ করুন—প্রতিবেদনের একেবারে শেষে নয়।

. স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে গবেষণাটি যাচাই করুন

কোনো গবেষণার ফলাফল নিয়ে প্রতিবেদন করার আগে একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে তা মূল্যায়ন করান। এমন কাউকে খুঁজুন, যিনি গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। সম্ভব হলে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এবং বিষয়টি বা গবেষণার পদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন, তেমন কাউকে বেছে নিন।

নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন করুন:

  • গবেষণার পদ্ধতিগুলো কি গবেষণার প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেয়?
  • গবেষণার ফলাফল কি গবেষকদের উপসংহারকে সমর্থন করে?
  • গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা কী?
  • সাংবাদিকদের কোন ধরনের দাবি করার বিষয়টি এড়িয়ে চলা উচিত?

উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ খুঁজে পেতে গবেষণাপত্রটির তথ্যসূত্র, অনুরূপ গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট লেখকদের পূর্ববর্তী কাজ, যাদের নাম রয়েছে—এমন গবেষকদের খোঁজ নিন।

পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী বিজ্ঞান সাংবাদিক ও লেখক ডেবোরাহ ব্লাম জিআইজেএনকে বলেন, “আমি গবেষণাটি ভালোভাবে পড়ে ও বুঝে নেওয়ার পর এর লেখকদের সাক্ষাৎকার নেব। এরপর এই ক্ষেত্র সম্পর্কে জানেন এমন অন্য গবেষকদেরও সাক্ষাৎকার নেব। আমি সহকর্মী এবং সমালোচক—উভয়ের মতামতই খুঁজব।”

তিনি আরও বলেন, “কোনো বিশেষজ্ঞ গুরুতর কোনো সমস্যা চিহ্নিত করলে সেটি গবেষণাটির লেখকদের কাছে তুলে ধরুন এবং তাদের বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দিন। যতক্ষণ না আপনি বুঝতে পারছেন, প্রমাণের পাল্লা কোন দিকে ভারী, ততক্ষণ অনুসন্ধান চালিয়ে যান।”

. প্রমাণের জোর বা গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাষা ব্যবহার করুন

কোনো ফলাফলকেযুগান্তকারী”, “নজিরবিহীনবাবৈপ্লবিক সাফল্যহিসেবে বর্ণনা করা হলে, কেন এমনটি বলা হচ্ছে, তার যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করুন।

আপনার বক্তব্য প্রমাণের চেয়ে বেশি নিশ্চিত শোনানো উচিত নয়। গবেষণার ধরন যদি সতর্কতা অবলম্বনের দাবি করে, তাহলে “প্রমাণ করে”-এর বদলে “ইঙ্গিত করে”, “কারণ”-এর বদলে “সম্পর্কিত” এবং “ঝুঁকি প্রতিরোধ করে”-এর বদলে “ঝুঁকি কমাতে পারে”—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করুন।

তিনটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করুন:

  • তথ্য-উপাত্ত কী দেখাচ্ছে।
  • গবেষণার ফলাফলকে গবেষকেরা কীভাবে ব্যাখ্যা করছেন।
  • ভবিষ্যতে কী নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।

ভাষার মতো সংখ্যাগুলোও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করুন। আপেক্ষিক ঝুঁকি ও পরম ঝুঁকির মধ্যে পার্থক্য করুন। একইভাবে, শতাংশের পরিবর্তন এবং শতাংশ-পয়েন্টের পরিবর্তনের মধ্যেও পার্থক্য করুন।

বৈজ্ঞানিক লেখাতেও ইতিবাচক শব্দের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। পাবমেডের অ্যাবস্ট্রাক্ট নিয়ে বিএমজের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৭৪–৮০ সময়কালের তুলনায় ইতিবাচক শব্দের ব্যবহার ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৪ সালে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ আপেক্ষিকভাবে ৮৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো ফলাফলকে “যুগান্তকারী”, “নজিরবিহীন” বা “বৈপ্লবিক সাফল্য” হিসেবে বর্ণনা করলে, কেন এমনটি বলা হচ্ছে, তার যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করুন।

অনিশ্চয়তার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন। পাঠকদের জানান যদি গবেষণায় নমুনার আকার ছোট হয়, ফলোআপ বা পর্যবেক্ষণের সময়কাল সংক্ষিপ্ত হয়, গবেষণাটি এখনও পুনরায় যাচাই করা না হয়ে থাকে কিংবা এতে কেবল কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। এই বিষয়গুলো পাঠকদের বুঝতে সাহায্য করে যে, গবেষণাটি থেকে আমরা কী জানতে পারি—আর কী পারি না।

. অর্থায়ন এবং স্বার্থের সংঘাত খতিয়ে দেখুন

শিল্পখাত থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে মানেই কোনো গবেষণা নির্ভরযোগ্য নয়—বিষয়টি তা নয়। মূল প্রশ্নটি কেবল এটিই নয় যে গবেষণার জন্য কারা অর্থায়ন করেছে। বরং এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে গবেষণার ওপর অর্থায়নকারীর কতটা প্রভাব ছিল।

অর্থায়ন, স্বার্থের সংঘাত, লেখকদের প্রকাশিত তথ্য, কৃতজ্ঞতা স্বীকার এবং অর্থদাতার ভূমিকা সম্পর্কিত বিবৃতিগুলো পড়ুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন:

  • অর্থদাতা বা স্পন্সর কি গবেষণার রূপরেখা তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন?
  • তারা কি তথ্য সংগ্রহ বা বিশ্লেষণ করেছিলেন?
  • গবেষণাপত্রটি লেখার কাজে কি তাদের কোনো ভূমিকা ছিল?
  • তারা কি প্রকাশনা আটকে দিতে বা বিলম্বিত করতে পারতেন?
  • গবেষণাধীন পণ্য বা কোম্পানির সঙ্গে লেখকদের কি কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে?

কোক্রেনের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অন্যান্য উৎসের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার তুলনায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বিষয়ক গবেষণায় অর্থদাতার অনুকূলে ফলাফল ও সিদ্ধান্ত তুলে ধরার প্রবণতা বেশি থাকে।

আপনার বাছাই করা স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের বিষয়েও খোঁজ নিন। সংশ্লিষ্ট লেখক, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তাদের আর্থিক, পেশাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো যোগসূত্রতা থাকতে পারে। তাদের সরাসরি এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করুন এবং সম্ভব হলে তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, সেগুলোও যাচাই করুন।

সংশ্লিষ্ট স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন, তবে সেগুলোকে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করবেন না। কারা এই গবেষণায় অর্থায়ন করেছে, গবেষণাটিতে অর্থদাতা প্রতিষ্ঠানের কী ভূমিকা ছিল এবং এসব সংযোগগুলো কীভাবে গবেষণা পদ্ধতি, বিশ্লেষণ বা ফলাফলের ব্যাখ্যায় প্রভাব ফেলতে পারে—পাঠকদের তা জানান।

. গবেষণাপত্রটির বর্তমান অবস্থা যাচাই করুন

প্রকাশ হওয়ার পরও কোনো গবেষণাপত্র নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে গবেষণাপত্রটির শিরোনাম এবং ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেন্টিফায়ার (ডিওআই) দিয়ে খুঁজে দেখুন, তা সংশোধন, প্রশ্নবিদ্ধ বা প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না। যাচাই করুন:

পুরোনো কোনো পিডিএফের ওপর নির্ভর করবেন না। হালনাগাদ তথ্য শুধু প্রকাশকের ওয়েবপেজেই থাকতে পারে। যদি গবেষণাপত্রটির একাধিক সংস্করণ থাকে, তাহলে সর্বশেষ প্রকাশিত সংস্করণটি ব্যবহার করুন।

এই প্রসঙ্গে রিট্র্যাকশন ওয়াচের ওরানস্কি সাংবাদিকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন: “প্রত্যাহার বা সংশোধনের সঙ্গে যে মূল বিজ্ঞপ্তিটি থাকে, সেটি পড়ুন। সেখানে এমন একটি বিজ্ঞপ্তি থাকবে যা ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়—অথবা অন্তত থাকা উচিত।”

এই নোটিশগুলো সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করুন। কারণ নোটিশের ধরন এক হলেও ভেতরের অর্থ এক নয়। মূল ফলাফলের কোনো পরিবর্তন না করেই কোনো সংশোধনে একটি ভুল ঠিক করা হতে পারে। ‘এক্সপ্রেশন অব কনসার্ন’ এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের ইঙ্গিত দেয়, যেগুলোর সমাধান এখনো হয়নি। আর গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করার অর্থ হলো, ওই গবেষণার ফলাফলকে আর নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করা উচিত নয়।

. আগের গবেষণার সঙ্গে ফলাফল তুলনা করুন

খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো গবেষণা বহু বছরের গবেষণালব্ধ প্রমাণকে উল্টে দিতে পারে। তাই নতুন ফলাফলকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখতে পদ্ধতিগত পর্যালোচনা, মেটা-বিশ্লেষণ এবং একই ধরনের গবেষণা খুঁজে দেখুন। মনে রাখবেন কোনো পর্যালোচনার নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে এতে অন্তর্ভুক্ত গবেষণাগুলো কতটা নির্ভরযোগ্য তার ওপর।

জিজ্ঞাসা করুন:

  • কতগুলো গবেষণায় একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে?
  • পরস্পরবিরোধী কোনো প্রমাণ আছে কি?
  • স্বাধীন গবেষক দলগুলো কি এই ধরনের ফলাফল খুঁজে পাচ্ছে?
  • আগের গবেষণা থেকে পাওয়া ফলাফলের সঙ্গে নতুন ফলাফল ভিন্ন হলে, গবেষণার পদ্ধতি, নমুনা বা গবেষণায় অংশ নেওয়া জনগোষ্ঠীর পার্থক্য কি এর কারণ হতে পারে?

দরকারি কিছু উৎস:

ব্লাম বলেন, “কারা এসব গবেষণাকে উদ্ধৃত করছেন, তা আপনি দেখতে পারেন। এর মাধ্যমে গবেষণার ফলাফলকে ওই ক্ষেত্রের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা সম্ভব।”

১০. প্রকাশের আগে শেষবার যাচাই করুন

সাংবাদিকদের প্রতি ওরানস্কির সাদামাটা পরামর্শ: “আপনি অবিশ্বাস করতে পারেন, তবে যাচাই করুন।”

জিজ্ঞাসা করুন:

  • শিরোনামটি কি গবেষণায় অংশ নেওয়া জনগোষ্ঠী এবং মূল ফলাফলকে সঠিকভাবে তুলে ধরছে?
  • আমি কি গবেষণাপত্রটির বর্তমান অবস্থা যাচাই করেছি?
  • প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে তথ্য-উপাত্ত, উদ্ধৃতি এবং গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো কি যাচাই করেছি?
  • গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তাগুলো কি আমি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছি?

সবশেষে নিজেকে প্রশ্ন করুন: আগামী বছর এই গবেষণাটি যদি গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় বা সংশোধন করা হয়, তাহলে আমার প্রতিবেদনটি কি তখনও প্রাসঙ্গিক থাকবে?


Esra Özএসরা ওজ একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি সায়েন্স ম্যাগাজিন, নিউ সায়েন্টিস্ট, সায়েন্সঅ্যালার্ট, সিএনএন তুর্ক এবং দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট তুর্কিশের মতো খ্যাতনামা প্রকাশনায় লেখালেখি করেন। এসকিশেহির ওসমানগাজি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান এবং আনাদোলু বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিও টিভি প্রোগ্রামিং বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া বিজ্ঞান যোগাযোগ বিষয়ের প্রতি আলাদা গুরুত্ব দিয়ে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর করেছেন আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব কমিউনিকেশন থেকে।

 

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

পরামর্শ ও টুল

ব্যর্থতা অনুসন্ধানে ‘পজিটিভ ডেভিয়েন্ট’ কী, ব্যবহার কীভাবে করবেন, সংবাদের প্রভাব বাড়াতে এর ভূমিকা কতটা

এসব পক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে স্পষ্ট পার্থক্য দেখানো বা জোরালোভাবে বিপরীত চিত্রগুলো (পজিটিভ ডেভিয়েন্ট) বা ওই সম্পর্কিত ইতিবাচক ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলো সংবাদে তুলে ধরা। অর্থাৎ, একই ধরনের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অন্য যে সব প্রতিষ্ঠান এসব সমস্যা এড়াতে সক্ষম হয়েছে, তাদের নীতি ও ফলাফলগুলো পাশাপাশি তুলে ধরা।

ডেটাবেস পরামর্শ ও টুল

আলেফ প্রো টিউটোরিয়াল: ওসিসিআরপির নাম তো শুনেছেন, এবার জানুন এর অনুসন্ধানী ডেটা প্লাটফর্ম থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার উপায়

বিপুল ডেটার মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজারো গল্প। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি খুঁজে বের করতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ ডেটা এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা। এসব তথ্য এমনভাবে সহজলভ্য করে তোলা দরকার যেন ডেটা বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ না হলেও সাংবাদিক ও অনুসন্ধানকারীরা তা ব্যবহার করতে পারেন। আলেফ প্রো ঠিক এই কাজটি করে। 

পরামর্শ ও টুল

অনুসন্ধানী পডকাস্ট সম্পাদনা করবেন কীভাবে- বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন সেই পরামর্শ

যেসব ঘটনা লিখিত প্রতিবেদনের জন্য ‘পুরোনো’ বা ‘সময়োত্তীর্ণ’ বলে মনে হতে পারে, সেগুলো পডকাস্টের জন্য বরং বাড়তি সুবিধা। প্রচলিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, অতীতের কোনো ঘটনা বা একটি ঘটনার শুরু নিয়ে করা অনুসন্ধানগুলো পডকাস্টের জন্য বেশ উপযোগী।

পরামর্শ ও টুল

কীটনাশকের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধান করতে ইচ্ছুক সাংবাদিকদের জন্য কিছু পরামর্শ

রোগ এবং কীটনাশকের সংস্পর্শের মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করা কঠিন হলেও, স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে চারপাশের শক্তিশালী প্রমাণ পাঠকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। পশ্চিমের অনেক দেশে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করার জন্য অনলাইনে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব তথ্য পেতে সরকারি নথি চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করারও প্রয়োজন হয় না।