অলংকরণ: এমিল হাসনাইন
সম্পাদকের নোট: এই লেখাটি জিআইজেএনের “দ্য ইনভেস্টিগেটিভ এজেন্ডা ফর টেকনোলজি অ্যান্ড এআই জার্নালিজম”বিষয়ক বিস্তারিত প্রতিবেদনের প্রথম অংশ। এটি তৈরি হয়েছে জিআইজেসি২৫ উপলক্ষে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত একদিনের প্রি–কনফারেন্স আয়োজনকে ঘিরে। সেখানে প্রায় ৫০টি দেশ ও অঞ্চলের ১০০ জন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও গবেষক অংশ নেন। তারা একসঙ্গে বসে বর্তমান সময়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সামনে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি–সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ বা ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য। বর্তমানে এই ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। যাদের অর্থনৈতিক এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
অনেক পরিসংখ্যনের মধ্যে মাত্র কয়েকটি উদাহরণই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের ব্যাপকতাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এনভিডিয়া প্রথম কোম্পানি হিসেবে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বাজারমূল্য অতিক্রম করে (যদিও পরে তা কিছুটা কমে যায়)। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড, যা জাপানের মতো দেশের জিডিপিকেও ছাড়িয়ে যায়।
বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর লবিং কার্যক্রম ইউরোপে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে করপোরেট ইউরোপ অবজারভেটরি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রাসেলসে এখন বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর লবিস্টের সংখ্যা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। (প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় ৭২০ জন নির্বাচিত সদস্যের বিপরীতে পূর্ণকালীন লবিস্টের সংখ্যা ছিল ৮৯০ জন)।
২০১৮ সালের শুরুতে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কী পরিমাণ ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে এবং কীভাবে সেই ক্ষমতাকে কোনো গণতান্ত্রিক নজরদারি ছাড়াই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে—তা বোঝার ক্ষেত্রে একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছিল ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি।
২০২২ সাল থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত সম্প্রসারণ, বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির সূচনার পর, বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির বিশাল ও অস্বচ্ছ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। যা গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যক্তিগত ডেটার বিশাল সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করে। তারা এখনও কোনো কঠোর চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক মালয়েশিয়ায় কুয়ালালামপুরে ১৪তম গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সের (জিআইজেসি) আগে দিনব্যাপী প্রি-কনফারেন্স কর্মশালা আয়োজন করে। যেটির শিরোনাম ছিল “দ্য ইনভেস্টিগেটিভ এজেন্ডা ফর টেকনোলজি জার্নালিজম” বা প্রযুক্তি সাংবাদিকতার অনুসন্ধানী এজেন্ডা।
এই সেশনে প্রায় ৫০টি দেশ ও অঞ্চলের ১০০ জন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক একত্রিত হয়েছিলেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বর্তমানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সামনে প্রযুক্তি-সংক্রান্ত সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগগুলো খতিয়ে দেখা। যেমনটি এই অনুষ্ঠানে লাইটহাউস রিপোর্টসের গ্যাব্রিয়েল গেইগার উল্লেখ করেছেন: “এটি কেবল প্রযুক্তি-বিষয়ক সাংবাদিকদের জন্য রিপোর্টিং নয়; বরং এটি সেইসব সাংবাদিকদের জন্য যারা রাজনীতি, স্বাস্থ্য এবং ফৌজদারি বিচার নিয়ে কাজ করেন। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আমাদের সমাজের প্রতিটি মৌলিক স্তরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।”
সমষ্টিগত উদ্যোগ হিসেবে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। সবাই যেখানে বিষয়গুলো নিয়ে “একসঙ্গে ভাবতে” পারে। আলোচনায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের মূল উদ্বেগ বা চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে : “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির পরস্পরবিরোধী প্রকৃতি।” একদিকে, প্রযুক্তি আমাদের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যা এর রাজনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলো গভীরভাবে অনুসন্ধান করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। এই সম্মেলনে অংশ নেন “এম্পায়ার অব এআই” বইয়ের লেখিকা ক্যারেন হাও। তিনি
যেমনটি যুক্তি দিয়েছেন: “এই শিল্পকে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘ক্ষমতা’ বা ‘পাওয়ার’। আমরা আসলে কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছি না।”
অন্যদিকে, ঠিক এই একই প্রযুক্তিগুলো (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ) বর্তমানে এমন এক অপরিহার্য হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে যা সাংবাদিকদের অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। যাতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারগুলোর ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়। ‘অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (ওসিসিআরপি)-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং উদ্ভাবন বিষয়ক পরিচালক পল রাদু ব্যাখ্যা করেছেন, যখন “সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তখন এআই অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের এমন সব প্যাটার্ন, সংযোগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে, তা না হলে যা আড়ালেই থেকে যেত।”
আলোচ্যসূচি বেশ কয়েকটি মূল বিষয় এবং প্যানেলের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছিল:
- অনুসন্ধানের অগ্রাধিকার: বিশ্বজুড়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে একটি আন্তঃআঞ্চলিক প্যানেল গঠন।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: এআইয়ের ইতিহাস, প্রযুক্তিগত ধারণা এবং এর অতিরঞ্জিত প্রচার বা ‘হাইপ’ থেকে প্রকৃত সত্য বের করার কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে গভীর আলোচনা।
- প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার:বার্তাকক্ষের ভেতরে প্রযুক্তি এবং এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার নিয়ে ব্যবহারিক আলোচনা।
- বিষয়ভিত্তিক চ্যালেঞ্জসমূহ : অ্যালগরিদমিক দায়বদ্ধতা, সরকারি নজরদারি, অনলাইনে ঘৃণা ও ভুল তথ্য ছড়ানো এবং শ্রম, জলবায়ু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে বিশেষ সেশন।
- মস্তিষ্কপ্রসূত ধারণা বা ব্রেইনস্টর্মিং: দিনের কর্মসূচি শেষ হয় ছোট ছোট দলীয় আলোচনার মাধ্যমে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং কৌশল নিয়ে মতবিনিময় করেন।
এই আলোচনাগুলোর মাধ্যমে চিহ্নিত মূল অগ্রাধিকারসমূহ, চ্যালেঞ্জ এবং সমাধানগুলো নিচে তুলে ধরা হলো। যা মূলত জবাবদিহি এবং এআই ও প্রযুক্তির বিষয়ে দায়িত্বশীল রিপোর্টিংয়ের জন্য একটি যৌথ অনুসন্ধানী রূপরেখা প্রদান করে।
প্রি-কনফারেন্স দিনের সেশনের পাশাপাশি উপস্থিত কয়েকজন বিশেষজ্ঞের ভিডিও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একটি জরিপ চালানো হয়। সম্মেলন শেষে জিআইজেএন দলের সদস্যরা ফলো-আপ আলোচনার ব্যবস্থা করেন। (দ্রষ্টব্য: সম্মেলন শুরুর আগের দিনের (প্রি-কনফারেন্স ডে) আলোচনাগুলো ‘চ্যাথাম হাউস রুল’ অনুযায়ী পরিচালিত হয়; এখানে দেওয়া সব উদ্ধৃতি প্রকাশ্য অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।)
চিহ্নিত করা মূল অগ্রাধিকারমূলক বিষয়গুলো হলো:
- এআই জবাবদিহিতা এবং অ্যালগরিদমিক ক্ষমতা (সরকারি ও বেসরকারি)
- সরকারি নজরদারি, অপতথ্য এবং ডিজিটাল দমননীতি
- এআই সাপ্লাই চেইন জুড়ে কর্পোরেট দায়বদ্ধতা (ডেটা, শ্রম, অবকাঠামো)
- সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, শ্রম এবং পরিবেশের ওপর প্রযুক্তির প্রভাব
- অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এআই ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল এবং নৈতিক ব্যবহার
প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ:
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ব্যবস্থা ও অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতার অভাব
• সাংবাদিকতার সক্ষমতার তুলনায় দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন
• বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথে (উন্নয়নশীল দেশগুলোতে) টুল, ডেটা ও দক্ষতারসমান সুযোগের অভাব - সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে নজরদারি ও ডিজিটাল হুমকি
• আর্থিকভাবে শক্তিশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের আইনগত ঝুঁকি
• সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের উপর নির্ভরশীলতা
• এআই ব্যবহারের নৈতিক ঝুঁকি
• এআইয়ের সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য ত্রুটি
উদীয়মান সমাধান এবং সুপারিশসমূহ:
- এআই জবাবদিহিতার জন্য যৌথ অনুসন্ধানী কাঠামো ও পদ্ধতি
• অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এআইয়ের নৈতিক ব্যবহারের সম্পর্কিত সামষ্টিক মানদণ্ড
• প্রশিক্ষণ, পরামর্শদান এবং সমপর্যায়ের সাংবাদিকদের মধ্যে শেখার সুযোগ বৃদ্ধি
• বার্তাকক্ষে আরও ডিজিটাল এবং কম্পিউটারভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন
• সাংবাদিকদের মধ্যে এবং অন্যান্য অংশীদার (বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি ব্যবহারকারী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ) সঙ্গে সহযোগিতা
• এআই ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত সরঞ্জাম, নির্দেশনা এবং সভা আয়োজনের জন্য জিআইজেএনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা
এই প্রতিবেদনটি প্রি-কনফারেন্সের একটি নথি হিসেবে আমাদের সাংবাদিক সমাজে জ্ঞান এবং মতবিনিময়ের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। এটি জিআইজেএনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি, প্রশিক্ষণ এবং অংশীদারিত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি, এটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তাভাবনা এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার স্পষ্ট লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে সাংবাদিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়তা করবে।
সান্দ্রিন রিগাড জিআইজেএনের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর। তিনি একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, পরিচালক এবং অ্যামি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রযোজক। ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তিনি ফরবিডেন স্টোরিজের প্রধান সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। সেই পদে থাকাকালীন তিনি এমন সব আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেগুলো মূলত হত্যাকাণ্ডের শিকার বা হুমকির মুখে থাকা সাংবাদিকদের অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যেত। তিনি ১০০ জন সাংবাদিক এবং ৩০টি মিডিয়া আউটলেটের সঙ্গে যৌথ অনুসন্ধান সমন্বয় করেছেন। যার মধ্যে আছে লে মন্ড, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, ডের স্পিগেল, হারেৎজ এবং এল পাইস। তিনি প্যারিসের সায়েন্সেস পো জার্নালিজম স্কুলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পড়ান। পাশাপাশি “পেগাসাস: হাউ অ্যা স্পাই ইন ইয়োর পকেট থ্রেটেনস দ্য এন্ড অব প্রাইভেসি, ডিগনিটি, অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (২০২৩)”-এর সহ-লেখক। বইটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ২০২৪/২০২৫ সালে হার্ভার্ডে নিম্যান ফেলো হিসেবে তিনি বৈশ্বিক অনুসন্ধানী সহযোগিতা, লিকড ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করেছেন।