ছবি: শাটারস্টক
২০২৫ সালের বিশ্ব সেরা ১০ অনুসন্ধানী পডকাস্ট তালিকায় আছে বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে অনুসন্ধান
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
এখনও আমি ঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি যে অনুসন্ধানী কোনো পডকাস্টে মগ্ন হয়ে থাকাটা কি কয়েক ঘণ্টার জন্য চারপাশের সবকিছু ভুলে থাকার উপায়? যা শুনতে শুনতে কোনো কিছুর গভীরে চলে যাওয়া যায়, যা আপনার মনকে পুরোপুরি দখল করে নেয়। আবার কখনও কখনও আপনার স্বপ্নের মধ্যেও হানা দেয়। নাকি একজন সাংবাদিকের জন্য এটি পানীয় গ্রহণের মাধ্যমে চাপমুক্তির উপায়?
বর্ণনাধর্মী অনুসন্ধানী পডকাস্টগুলো এমনভাবে দর্শককে আকৃষ্ট করে, যা অন্য অনেক মাধ্যমের পক্ষে অনুকরণ করাটা কঠিন। যেখানে আপনি ছয়, সাত ঘণ্টা ধরে একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা প্রসঙ্গে ডুবে থাকতে পারেন। উপস্থাপক প্রায়ই আপনাকে অনুসন্ধানের যাত্রাপথে নিয়ে যান—সাফল্য, ব্যর্থতা, তারা কী পেয়েছেন এবং কী পাননি। এখানে থাকে সংযোগসূত্র, গল্পের অলিগলি। লিখিত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে যা কোনো সাংবাদিকের পক্ষে কল্পনা করাটাই হয়তো কঠিন। পাশাপাশি থাকে দার্শনিক প্রশ্ন—খারাপ ব্যবস্থা কেন টিকে থাকে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কীভাবে পার পেয়ে যায়। যা অনেক সময় ঐতিহ্যগত অনুসন্ধানের চেয়ে উপন্যাস বা মতামত পাতার লেখার সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।
উত্তর যাই হোক না কেন, পডকাস্ট যে দারুণভাবে আকর্ষণীয়—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রতি বছর জিআইজেএনের বৈশ্বিক দলের সদস্যরা তাদের কাছে আসা বর্ণনাধর্মী অনুসন্ধানী পডকাস্টগুলো পর্যালোচনা করেন। একে সেরা তালিকা হিসেবে না দেখে, বরং একটি বৈশ্বিক ভ্রমণ হিসেবে ভাবা ভালো। আমরা এল সালভাদর থেকে বাংলাদেশ, জার্মানি থেকে তুরস্ক হয়ে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত নানা দেশের গল্প পর্যালোচনা করেছি। বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল রাষ্ট্র অনুমোদিত সহিংসতা, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশিং, উগ্র ডানপন্থা থেকে পরিবেশগত অপরাধ পর্যন্ত নানা প্রসঙ্গ। বেশিরভাগই ২০২৫ সালে সম্প্রচারিত হয়েছে। তবে লাতিন আমেরিকার পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি পডকাস্ট ব্যতিক্রম—এটির বেশিরভাগ পর্ব ২০২৪ সালে প্রচারিত হয়। অধিকাংশই ছিল ধারাবাহিক সিরিজ। তবে কয়েকটি ছিল নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর অনুসন্ধানভিত্তিক অডিও ফিচার।
শিগগিরই আমরা ভিন্ন ধরনের একটি পডকাস্ট গল্প প্রকাশ করব। যেখানে তুলে ধরা হবে সেসব পডকাস্ট, যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের নেপথ্যের গল্প জানায় অথবা প্রতিবেদকদের পেশাগত কৌশল শেখায়। আপনি যদি এসবের মধ্যে কোনো একটি শুনেন—অথবা কোনো একটি তৈরিতে যুক্ত থাকেন—আমরা আপনার অভিজ্ঞতা জানতে আগ্রহী।
ডিপ স্টেট: ফ্রম এলিট সোলজার টু রাইখসবুর্গার — এআরডি
ভাষা: জার্মান

ছবি: স্ক্রিনশট, এআরডি
২০২২ সালে প্রায় ৫ হাজার জার্মান পুলিশ প্যাট্রিওটিশে ইউনিয়ন নামে একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে। যা উগ্র-ডানপন্থী রাইখসবুর্গার আন্দোলনের অংশ। তারা জার্মান সরকার উচ্ছেদের পরিকল্পনা করেছিল এবং তাদের দৃষ্টিতে জার্মান সাম্রাজ্যের (রাইখ) জন্য একটি বৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এক পর্যায়ে, জার্মানিজুড়ে চলমান সন্ত্রাসবাদবিষয়ক বিভিন্ন বিচারে মোট ৬৯ জনকে আসামি করা হয়।
আদালতে বিচার কার্যক্রম চলার সময়েই ডিপ স্টেট–এর সাতটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তবে এআরডির সাংবাদিকরা আদালতের কার্যক্রমের বাইরেও আরও গভীরে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। তারা এই ষড়যন্ত্রের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র, রুডিগার ফন পেসকাতোর নামক সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্যারাশুট বাহিনীর একজন সাবেক সদস্যর ভূমিকা খতিয়ে দেখেছেন। যেখানে তার সঙ্গে সোভিয়েত আমলের নিখোঁজ অস্ত্রভাণ্ডারের সংযোগ, ব্রাজিলের জার্মানভাষী অঞ্চলে তার অতিবাহিত কয়েক বছর এবং কেন এত মানুষ তার এই অন্ধকার ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো অনুসরণ করেছিল, সেই বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
আদালতের নথি ও নিজেদের অনুসন্ধানের মাধ্যমে সাংবাদিকরা টেক্সট মেসেজ, ফোনে আড়ি পেতে পাওয়া রেকর্ডিং, ভিডিও ফুটেজ, টেলিগ্রাম চ্যাট এবং ডজনখানেক সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেন। দুই বছরের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারা শ্রোতাদের এমন এক জগতে নিয়ে যান, যেটিকে এআরডির অনুসন্ধানী সাংবাদিক মার্টিন কৌল “অন্ধ বিশ্বাস এবং চরমপন্থার মাঝামাঝি এক বিকৃত জগৎ” বলে বর্ণনা করেন। এ সময় তিনি ফ্রাঙ্কফুর্টে আদালতের শুনানি, ন্যুরেমবার্গে অস্ত্র মেলা এবং বার্লিনের টিয়ারগার্টেনে এক গোপন এজেন্টের সঙ্গেও দেখা করেন।
টেলিগ্রাম চ্যাটের কথোপকথন থেকে জানা গেছে যে, ষড়যন্ত্রকারীরা অলৌকিক বিশ্বাস যেমন— আত্মা ও নক্ষত্রের সংযোগ কিংবা গ্রহের অবস্থানগত সামঞ্জস্যের মতো নানা অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে ভীষণ মনোযোগী ছিলেন। অভিযুক্তদের একজন—যিনি আগে উচ্চপদস্থ সৈনিক ছিলেন। সাংবাদিক কৌলকে তিনি বলেন যে তিনি বিশ্বাস করেন মাটির নিচে গোপন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে শিশুদের ওপর নির্যাতন করা হয় এবং ক্ষমতাধর অভিজাতরা তাদের রক্ত পান করে তরুণ থাকার এক ধরনের পানীয় হিসেবে। এই ষড়যন্ত্রকারীদের দলে কিউঅ্যানন মতবাদে (কিউঅ্যানন গোষ্ঠীর সদস্যরা মনে করে, বিশ্বের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ক্ষমতাধারীরা গোপনে শিশু নিপীড়ন, পাচার ও নৈতিকভাবে নিন্দনীয় কাজ করছে—এই সব ব্যক্তি ও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যুদ্ধ করতেই আবির্ভাব হয়েছে ট্রাম্পের) বিশ্বাসী এবং কোভিড-১৯ অস্বীকারকারীরাও (যারা করোনা মহামারীর অস্তিত্ব বা এর ভয়াবহতাকে সরাসরি অস্বীকার করে এবং বিশ্বাস করে যে এই পুরো বিষয়টি একটি সাজানো নাটক বা ষড়যন্ত্র) ছিল। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মাধ্যমে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষের এক অদ্ভুত জোট তৈরি হয়েছিল। যাদের মূল লক্ষ্য ছিল কথিত ‘ডিপ স্টেট’ বা ছায়া সরকারকে হটিয়ে দেওয়া।
এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি—যেমন, এই দলটি আসলে কতটা বিপজ্জনক? বর্তমানে বিচারপ্রক্রিয়াধীন থাকা ফন পেসকাতোর এই বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। তবে তার জীবনের গল্পটি কোনো উপন্যাসের মতোই অবাক করে, যা আমাদের কিছু জরুরি প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে: কেন এবং কীভাবে জার্মানির রাইখসবুর্গার এর মতো একটি ছোট ও স্থানীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অস্পষ্ট কিন্তু ভয়াবহ সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত হলো? এবং এই দুইয়ের সংমিশ্রণ কীভাবে বাস্তবে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে?—আলেক্সা ফন সিকল, জিআইজেএন সহযোগী সম্পাদক
হুমো: মার্ডার অ্যান্ড সাইলেন্স ইন এল সালভাদর— সোনোরো এবং রিভিস্টা ফ্যাক্টুম (বেশিরভাগ পর্ব ২০২৪ সালে সম্প্রচারিত, ২০২৫ সালে এক ঘণ্টার বিশেষ পর্ব এবং ২০২৫ সালের পুরস্কারজয়ী)
ভাষা: স্প্যানিশ এবং ইংরেজি উভয় সংস্করণই রয়েছে

ছবি: স্ক্রিনশট, সোনোরো এবং রিভিস্টা এল ফ্যাকটুম
২০২১ সালে এল সালভাদরের চালচুয়াপাতে একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে একটি গোপন গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথমে মনে হয়েছিল এটি কোনো সিরিয়াল কিলারের কাজ, কিন্তু তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই এক ভয়ঙ্কর সত্য বেরিয়ে আসে। এই ঘটনাটি রূপ নেয় চরম সহিংসতা আর দুর্নীতির এক গল্পে—যেখানে উঠে আসে জোরপূর্বক নিখোঁজ করে দেওয়া, অপরাধী চক্রের সঙ্গে গোপন আঁতাত এবং প্রেসিডেন্ট নায়েব বুকেলের সরকারের প্রচার করা শান্তি ও অগ্রগতির গল্পের আড়ালে নিরাপত্তার ভ্রান্ত ধারণার বিষয়গুলো।
এই অনুসন্ধানী সিরিজটি অডিও বিভাগে ২০২৫ সালের গাবো অ্যাওয়ার্ড এবং সেরা নন-ফিকশন ন্যারেটিভ পডকাস্ট হিসেবে ওনদাস গ্লোবালস পুরস্কার জয় করে। এটি এমন একটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যা উন্মোচন করেছে সরকারি নীরবতার আড়ালে দেশটির হাজার হাজার মানুষ কীভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে। এটি রাষ্ট্র, অপরাধী চক্র এবং ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে কথিত যোগসূত্র নিয়ে অনুসন্ধান করেছে। পাশাপাশি, ভুক্তভোগীদের বাস্তব পরিস্থিতি এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সেন্সরশিপের প্রেক্ষাপটে সরকারের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই প্রযোজনায় সরকারি ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিং, পুলিশের গোপন নথিপত্র এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের মর্মস্পর্শী সাক্ষ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যারা রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তার মুখে প্রিয়জনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। দর্শকের শোনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংবাদিকদের কণ্ঠস্বর। বিশেষ করে ব্রায়ান আভেলার—যিনি স্প্যানিশ ভার্সনটি বর্ণনা করেছেন। এই পদ্ধতি দর্শককে সাংবাদিকদের কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে। বিশেষ করে এমন জায়গায় যেখানে মিডিয়া হয়রানির শিকার হয়। আসলে, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দলের কয়েকজন সদস্যকে নির্বাসনে যেতে হয়েছে। — লুসেরো হার্নান্দেজ গার্সিয়া, জিআইজেএন এঁ স্পানিওল সহকারী।
হাসিনা: ৩৬ ডেজ ইন জুলাই — আল জাজিরার অনুসন্ধান

ছবি: স্ক্রিনশট, আল জাজিরা
আল জাজিরার এই পডকাস্টটি শক্তিশালী ও চিন্তাজাগানো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে তুলে ধরে, যেখানে সুক্ষ্ম রিপোর্টিংকে আকর্ষণীয় অডিও গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল জাজিরা ইনভেস্টিগেটস পডকাস্ট সিরিজের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের জুলাই ২০২৪ এর অভ্যুত্থানের নাটকীয় সমাপ্তি নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। যেখানে গোপনে সংগৃহীত প্রমাণ এবং গভীর প্রাসঙ্গিক বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।
পডকাস্টটির মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা গোপনে রেকর্ড করা কিছু অডিও ক্লিপ, যেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ছাত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে “প্রাণঘাতী অস্ত্র” ব্যবহারের নির্দেশ দিতে শোনা যায়। ফরেনসিক অডিও বিশ্লেষণ এবং ভয়েস ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে যাচাইকৃত এই রেকর্ডিংগুলো দেশজুড়ে দমন-পীড়নের নেপথ্যে থাকা উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীয় প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ক্লিপগুলোর মাধ্যমে শ্রোতারা ২০২৪ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত চলা সেই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে ফিরে যান। যা সরকারি চাকরিতে কোটা এবং সুশাসনের অভাবে শুরু হলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন এবং আবেগপূর্ণ অনুভূতির পাশাপাশি সাংবাদিকদের বর্ণনার সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যও তুলে ধরা হয়েছে। প্রোডাকশন দল বর্ণনা করেছে যে, কীভাবে এই আন্দোলন একটি ভয়াবহ সংকটে রূপ নেয়। যেখানে ১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন। এছাড়া ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গণজমায়েত পর্যবেক্ষণ ও দমনে রাষ্ট্রের নেওয়া বিভিন্ন কৌশলও এখানে উঠে এসেছে। আবু সাঈদের গল্প—যে শিক্ষার্থীর মৃত্যু ব্যাপক সহিংসতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল—তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি তার ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন কীভাবে বারবার পরিবর্তন করে গুলির চিহ্ন আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই অভিযোগও এখানে স্থান পেয়েছে।
অনুসন্ধানী পডকাস্ট হিসেবে এটি বেশ আকর্ষণীয় ও নিখুঁত। এটি ফাঁস হওয়া তথ্যগুলোকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছে এবং ভুক্তভোগী ও বিশ্লেষক—উভয় পক্ষের বক্তব্যই উপস্থাপন করেছে। সেই ৩৬ দিনের উত্তাল সময়ে নেওয়া রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলোর জরুরি অবস্থা এবং তার ভয়াবহতা শ্রোতাদের সামনে ফুটিয়ে তুলতে সফল হয়েছে। তবে পডকাস্টের গল্প আকর্ষণীয় হলেও তা প্রকাশিত হয়েছে বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। কিছু সমালোচক আল জাজিরার উপস্থাপনাকে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন যে কিছু উৎসের ওপর নির্ভরতা ও তথ্য নির্বাচনের কারণে এর নিরপেক্ষতা প্রভাবিত হতে পারে। — তানভীর মাহমুদ, জিআইজিএনের বাংলা সম্পাদক
স্নিচ সিটি — দ্য বোস্টন গ্লোব

ছবি: স্ক্রিনশট, দ্য বোস্টন গ্লোব
মার্কিন সরকারের দশকের পর দশক ধরে চলা মাদকবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে পুলিশের “গোপন তথ্যদাতা” নিয়োগের এমন এক অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থা লুকিয়ে আছে, যা দুর্নীতি আর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দেয়। ক্যাথলিক চার্চের শিশু যৌন নির্যাতন কেলেঙ্কারির যুগান্তকারী অনুসন্ধানের জন্য পরিচিত বোস্টন গ্লোবের বিখ্যাত ‘স্পটলাইট’ দলের রিপোর্টার ডুগান আর্নেট এক বছর সময় ব্যয় করেছেন এই প্রতিবেদনটির পেছনে। যাতে ম্যাসাচুসেটসের একটি শহরের প্রেক্ষাপটে তথ্যদাতাদের (যাদের “স্নিচ” বা “খবরদাতা” হিসেবেও ডাকা হয়) প্রথমবারের মতো বিশদভাবে তুলে ধরা যায়। দেখা গেছে, স্থানীয় পুলিশ বিভাগের টহল পুলিশ থেকে শুরু করে প্রধান কর্মকর্তা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরেই দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে।
পাঁচ পর্বের এই চমৎকার সিরিজে আর্নেট নথিভুক্ত করেছেন ড্রাগ রিপের অসংখ্য ঘটনা —যেখানে আগাম তথ্য পেয়ে পুলিশ নিজেরাই অবৈধ মাদক বা নগদ অর্থ ছিনতাই করে। এর পাশাপাশি তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে তথ্যদাতাদের শোষণ করা হয় এবং বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। যাদের অনেককেই মূলত জোরপূর্বক বা ভয় দেখিয়ে সহযোগিতা করতে বাধ্য করা হয়। আরও গভীরে গিয়ে আর্নেট পুলিশ কর্মকর্তা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যকার কথিত আঁতাতের বিষয়টিও খতিয়ে দেখেছেন। এজন্য তিনি উভয় পক্ষের এমন ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যারা এই দুর্নীতি সরাসরি দেখার দাবি করেছেন। এছাড়া যেসব পুলিশ সদস্য শেষ পর্যন্ত তদন্তের মুখে পড়েছিলেন, তাদের বাঁচাতে প্রাতিষ্ঠানিক ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আসা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকারের বিষয়গুলোও তিনি পরীক্ষা করে দেখেছেন। মোটের ওপর, এটি মার্কিন মাদক নীতির বিরুদ্ধে একটি কঠোর অভিযোগ—যা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিপজ্জনক সুযোগ তৈরি করছে এবং যে সরকারি সংস্থাগুলোর কাজ ছিল জনগণকে রক্ষা করা, তাদের মধ্যেই একটি অবৈধ বাজারকে গেড়ে বসতে সাহায্য করছে। — রিড রিচার্ডসন, জিআইজেএন ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
এক্সপোজড: লিসেনিং ইন অন আ ৩৫ মিলিয়ন ডলার ফোন স্ক্যাম— দ্য গার্ডিয়ান

ছবি: স্ক্রিনশট, দ্য গার্ডিয়ান
গর্ডিয়ানের এই পডকাস্টটি এতোটা শক্তিশালী এবং আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার মূলে রয়েছে স্ক্যাম সেন্টারের এজেন্ট এবং ছদ্মনামধারী ব্রিটিশ ব্যক্তি ‘মার্ক’-এর মধ্যকার ফোনালাপের অডিও রেকর্ডিং। এর ধরন এবং বিষয়বস্তু যেমন বাস্তবসম্মত তেমনি আবেগপ্রবণ। যা শোনার সময় আপনার মনে হবে আপনি নিজেই যেন মার্কের জায়গায় আছেন। পডকাস্টটি যত সামনে আগাতে থাকে, আপনি জানতে পারেন কীভাবে একজন ব্যক্তিকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং জালিয়াতির জাল ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীরা কত সহজে সেখানে আটকে পড়েন।
এই পডকাস্টটি মূলত স্ক্যাম এম্পায়ার অনুসন্ধানের একটি অংশ—যা ওসিসিআরপি, সুইডিশ ব্রডকাস্টার এসভিটি এবং আরও ৩০টি মিডিয়া অংশীদারদের একটি যৌথ প্রচেষ্টা। ইসরায়েল, পূর্ব ইউরোপ এবং জর্জিয়াভিত্তিক দুটি কল সেন্টার গ্রুপ থেকে ফাঁস হওয়া ১ দশমিক ৯ টেরাবাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে এই অনুসন্ধানটি করা হয়। এসব কল সেন্টারের কর্মীরা বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩২ হাজার মানুষকে প্রলুব্ধ করে ভুয়া “বিনিয়োগের” নামে লাখ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।
এই নির্দিষ্ট পডকাস্টে শ্রোতারা জর্জিয়ার তিবিলিসিতে অবস্থিত ফোন-স্ক্যামিং সেন্টারের একজন ভুক্তভোগীর গল্প শুনতে পান। সাংবাদিক সাইমন গুডলি একজন সাধারণ ইংরেজ যুবক হিসেবে মার্ককে পরিচয় করিয়ে দেন, ”যার বয়স ৩০-এর কোঠায়; তিনি একজন ব্লু-কলার শ্রমিক (অফিস বা প্রশাসনিক কাজ না করে যে শ্রমিকরা হাতে-কলমে বা কারিগরি কাজ করেন) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ধাপে ধাপে জুনিয়র ম্যানেজমেন্ট পদে উন্নীত হয়েছেন… এবং নিজের অবস্থার আরও উন্নতি করতে চান।” মার্কের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আরও অনেক ভুক্তভোগীর প্রোফাইলের সঙ্গেই মিলে যায়। যারা মূলত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ এবং নিজেদের জমানো অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে গিয়ে এই প্রতারণার শিকার হন।
স্ক্যাম এম্পায়ার থেকে ফাঁস হওয়া ফাইলগুলোতে ২০ হাজার ঘণ্টারও বেশি রেকর্ড করা কল এবং হাজার হাজার স্ক্রিনশট রয়েছে। যা থেকে উন্মোচিত হয়েছে কীভাবে কল সেন্টারের কর্মীরা তাদের টার্গেট করা ব্যক্তিদের বোঝায় যে তারা আর্থিক সাফল্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে, এই তথাকথিত বিনিয়োগকারীরা যখন তাদের অর্থ তুলে নিতে (ক্যাশ আউট) চায়, তখন প্রতারকরা সাধারণত অর্থ তোলা কেন অসম্ভব তার জন্য বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করে এবং উল্টো আরও অতিরিক্ত অর্থ পাঠানোর জন্য তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। – জোয়ানা ডেমার্কো, জিআইজেএনের ভিজ্যুয়াল এবং নিউজলেটার সম্পাদক
ব্লাড রিলেটিভস — দ্য নিউ ইয়র্কার

ছবি: স্ক্রিনশট, দ্য নিউ ইয়র্কার
নিউ ইয়র্কারের পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী ইন দ্য ডার্ক নামের অনুসন্ধানী পডকাস্টটি ছয় পর্বের একটি সিরিজ নিয়ে ফিরে এসেছে। যেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—যুক্তরাজ্যের অন্যতম বিখ্যাত একটি হত্যা মামলার রায় ভুল ছিল কি না।
এই অনুসন্ধানটি শুরু হয়েছিল একটি উস্কানিমূলক প্রশ্ন দিয়ে: যদি যুক্তরাজ্যের অন্যতম কুখ্যাত একটি হত্যা মামলার বিচার পুরোপুরি ভুল হয়ে থাকে এবং গত চার দশক ধরে একজন নির্দোষ ব্যক্তি কারাগারে বন্দি থাকেন, তবে কী হবে? একজন বিশেষজ্ঞের দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নিউ ইয়র্কারের হেইডি ব্লেক ১৯৮৬ সালের কুখ্যাত হোয়াইট হাউস ফার্ম হত্যাকাণ্ড নিয়ে দুই বছর ধরে গভীর অনুসন্ধান চালিয়েছেন। সেই নৃশংস গণ হত্যাকাণ্ডে একজন যুবককে তার দত্তক নেওয়া বাবা-মা, যমজ ভাগ্নে এবং বোনকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল—যদিও প্রাথমিক সব আলামত ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে তার বোনই সবাইকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছিলেন।
অনুসন্ধান চলাকালীন সাংবাদিক হেইডি ব্লেক আইনি নথিপত্রের এক বিশাল ভাণ্ডার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেছেন, যেখানে তদন্তের প্রায় প্রতিটি ধাপে পুলিশের অসদাচরণ এবং অযোগ্যতার প্রমাণ উন্মোচিত হয়েছে। মূল তথ্যের মধ্যে ছিল একজন পুলিশ তদন্তকারী কর্তৃক অপরাধস্থলের আলামত নষ্ট বা কলুষিত করার স্বীকারোক্তি (যার ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল “ব্যাম্বলিং রন” বা আনাড়ি রন)। আর একটি জরুরি ফোন কল যা দণ্ডিত ব্যক্তিকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারত। কিন্তু পুলিশ কয়েক দশক ধরে সেটি উপেক্ষা করেছিল (যদিও যে পুলিশ কর্মকর্তা কলটি রিসিভ করেছিলেন, তিনি অদ্ভুতভাবে পরে নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন)। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ব্লেকের এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনটি তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে, যা ব্রিটিশ জনগণকে মামলাটি নিয়ে পুনরায় ব্যাপকভাবে ভাবতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত এটি দেশের চূড়ান্ত অপরাধ পর্যালোচনা সংস্থাকে দ্বিতীয়বারের মতো মামলাটি গ্রহণ করতে প্ররোচিত করে। তবে, নতুন করে আইনি শুনানির বিষয়ে ওই সংস্থার সিদ্ধান্ত এখন এই প্রশ্নই তুলছে যে—যুক্তরাজ্যের বিচার ব্যবস্থা নিজের ভুলগুলো সংশোধনের ক্ষেত্রে আসলে কতটা সক্ষম। — রিড রিচার্ডসন, জিআইজেএনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
বয় ওয়েস্টেড — এন্ডস রিপোর্ট এবং দে গ্রোনে আমস্টারডামার
সতর্কবার্তা: এই পডকাস্টটিতে একজন শ্রমিকের মৃত্যু এবং শিশুশ্রমের কারণে ঘটা মৃত্যুর বিস্তারিত ও সচিত্র বর্ণনা রয়েছে।

ছবি: স্ক্রিনশট, এন্ডস রিপোর্ট এবং দে গ্রোনে আমস্টারডামার
তিন পর্বের এই পরিবেশবিষয়ক অপরাধমূলক পডকাস্টটি শুরু হয় তুরস্কের একটি রিসাইক্লিং সেন্টারে এক যুবকের মরদেহ পাওয়ার ঘটনা দিয়ে। এরপর এটি প্লাস্টিক বর্জ্য বাণিজ্যের মানবিক বিপর্যয়ের এক বৈশ্বিক অনুসন্ধানে রূপ নেয়। উপস্থাপক ড্যান অ্যাশবি ও লুসি টেইলর, আদনান আর. খান এবং ‘এন্ডস রিপোর্ট’-এর টেস কলি ও পিপা নিলসহ একদল অনুসন্ধানী সাংবাদিক এখানে কাজ করেছেন। তারা আন্তঃসীমান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন কীভাবে ব্রিটিশ পরিবারগুলোর ফেলে দেওয়া বর্জ্যের সঙ্গে ইস্তাম্বুলের শিল্পাঞ্চলগুলোতে ঘটে যাওয়া ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে।
এই পডকাস্টটি শুরু হয় আরিফুল্লাহ ফজলির মৃত্যু দিয়ে। তিনি ছিলেন একজন আফগান শরণার্থী, যিনি ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে তুরস্কে কাজ করতে এসেছিলেন। কিন্তু রিসাইক্লিং যন্ত্রপাতির এক মর্মান্তিক শিল্প দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এই ঘটনাকে সূত্র ধরে সাংবাদিকরা অনুসন্ধান শুরু করেন—কীভাবে এবং কেন এটি ঘটল। তারা শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন, শিল্প এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন এবং সরকারি নথিপত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেন। প্রতিবেদন তৈরির কাজ যত এগোতে থাকে, উত্তেজনাও তত বাড়তে থাকে; এমনকি এক পর্যায়ে রিপোর্টিং দলের একজন সদস্যকে আটকও করা হয়।
সাংবাদিকরা পুলিশ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্যের জন্য আবেদন জানান। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানই হয় কোনো উত্তর দেয়নি, নয়তো অসম্পূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে, যা স্বচ্ছতা ও তদারকির অভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। আইনজীবী এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার পর এই খাতের নিরাপত্তার ব্যর্থতা এবং শরণার্থী শ্রমিকদের অনিশ্চিত ও অনথিভুক্ত অবস্থার বিষয়টি বারবার উঠে আসে। ফজলির মৃত্যুকে এখানে একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যার কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই সিরিজটি যুক্তরাজ্যের প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানির বিশাল ব্যাপ্তি এবং সেই বর্জ্য তুরস্কে পৌঁছানোর পর কী ঘটে, তা-ও খতিয়ে দেখেছে। সাংবাদিকরা উভয় দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ন্ত্রণ, পরিদর্শন এবং জবাবদিহিতা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন—কিন্তু বারবার অস্পষ্ট উত্তর দেওয়া হয়। যা বিশ্বব্যাপী বর্জ্য বাণিজ্যের প্রয়োগ এবং দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
পডকাস্ট হিসেবে বয় ওয়েস্টেড ভীষণ যত্ন নিয় তৈরি দুর্দান্ত একটি প্রতিবেদন। যেখানে সরাসরি মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং অনুসন্ধানী বিশ্লেষণের সমন্বয়ে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে আমাদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র, বর্জ্য এবং শ্রম শোষণের সঙ্গে যুক্ত। যারা পরিবেশ সংরক্ষণ, অভিবাসন, শ্রম অধিকার বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় আগ্রহী, তাদের জন্য এটি পুরোপুরি শোনার মতো একটি সিরিজ। এটি শ্রোতাদের ভাবতে বাধ্য করে, তাদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক কোথায় গিয়ে পৌঁছায় এবং মানুষের ওপর কি প্রভাব পড়ে। — পিনার দাগ, জিআইজিএনের তুর্কি সম্পাদক
স্ক্যাম ইনক — দ্য ইকোনোমিস্ট

ছবি: স্ক্রিনশট, দ্য ইকোনোমিস্ট
গল্পের সূত্রপাত কানসাসের একজন ব্যাংক ম্যানেজারকে দিয়ে, যিনি স্থানীয় ফুটবল দলের কোচও। কিন্তু তার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানবপাচারকারীদের কী সম্পর্ক? আবার দক্ষিণ আমেরিকার পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন সফল অথচ নিঃসঙ্গ কর্মজীবী নারীর সঙ্গেই বা চীনা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের যোগসূত্র কী? দ্য ইকোনমিস্টের সু-লিন ওংয়ের উপস্থাপনায় আটপর্বের এই পডকাস্টটি এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়। শ্রোতারা জানতে পারেন, মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা প্রতারকদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে। ভুক্তভোগীদের প্রতারিত করার ক্ষেত্রে তারা এতটাই দক্ষ যে বছরে ৫০০ বিলিয়নেরও বেশি অর্থ তারা চুরি করছে।
অনলাইন প্রতারণার জগত নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানের অংশ এই পডকাস্টটি কানসাস থেকে শুরু হয়ে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও ফিলিপাইনের ঘটনাগুলো তুলে ধরে। কানসাসের সেই ব্যাংকার তার গ্রামীণ জনপদের সঞ্চয় নিয়ে বাজি ধরেছিলেন এবং ৪৭ মিলিয়ন ডলার লোকসান করেন। অনুসন্ধানী দলটি এমন সব মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে যাদের পাচার করে প্রতারণা চক্রের আস্তানায় আটকে রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কিন্ডারগার্টেনের একজন প্রাক্তন শিক্ষিকাও ছিলেন, যিনি ভয় পাচ্ছিলেন, তিনি হয়তো আর কোনোদিন তার সন্তানের দেখা পাবেন না। সু-লিন ওং এই খাতের বিশেষজ্ঞ, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তাকারীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। প্রতারণার শিকার ব্যক্তি, অপরাধী ও তদন্তকারীদের নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বিস্তারিত দেখিয়েছেন কীভাবে ‘পিগ বুচারিং’ (ধনী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার আগে বিশ্বাস অর্জনের প্রক্রিয়া) এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। যার ফলে চীনের শিক্ষক থেকে শুরু করে আমেরিকার মধ্যবিত্ত কর্মজীবীরাও শোষণের শিকার হচ্ছেন।
ওং উল্লেখ করেন, “যখন থেকে মানুষেরা একে অপরের সঙ্গে লেনদেন শুরু করেছে, প্রতারণার শুরুটাও তখন থেকে।” তবে তিনি উল্লেখ করেন, অপরাধীদের জন্য বিষয়টিকে সহজ করে তুলেছে তথ্যের এই ইকোসিস্টেম। এর কারণ হলো—অসতর্ক হয়ে অনলাইনে আমরা আমাদের প্রচুর তথ্য শেয়ার করি। যা দিয়ে ভার্চুয়াল জগতে খুব সহজেই আমাদের ফাঁদে ফেলা যায়। অথচ এই সমস্যার ব্যাপকতার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে আমাদের বিচার ব্যবস্থা।
”এই অর্থে পিগ বুচারিং নতুন কিছু নয়। এটি পুরোনো সেই প্রতারণা পদ্ধতি, যা এখন ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিপফেক এবং মেসেজিং অ্যাপের কারণে আরও শক্তিশালী হয়েছে। নতুন বিষয় হলো—এই প্রতারণা এখন একটি সংগঠিত শিল্পে পরিণত হয়েছে, যেন ‘স্ক্যাম.ইনক’ নামে কোনো কোম্পানি,” উপসংহারে বলেন ওয়াং। এই ধরনের অনেক প্রতারণা নেটওয়ার্ক এখন ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে চলছে—যাকে তিনি বলেন “ফাস্ট ফুড চেইনের আন্ডারওয়ার্ল্ড সংস্করণ।” অর্থাৎ প্রতারণার পুরো ব্যবস্থাটি একটি নির্দিষ্ট ছকে সাজানো। স্ক্রিপ্ট, প্রযুক্তি, এমনকি মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত ক্রিপ্টো বিনিয়োগের কৌশল। “সবকিছুই একইভাবে তৈরি এবং সহজে বিভিন্ন জায়গায় চালু করা যায়। সারা বিশ্বেই পুরো ব্যবস্থাটি একই ছকে সাজানো।”— লরা ডিক্সন, জিআইজেএনের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক
আরাকনিড: হান্টিং দ্য ওয়েব’স ডার্কেস্ট সিক্রেটস— ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম ব্যুরো (আইজেবি), টিভিও, পিজ গ্লোরিয়া প্রোডাকশন্স, এবং টরন্টো স্টার (মে ২০২৫)
সতর্কবার্তা: এই পডকাস্টটিতে শিশু যৌন নির্যাতনের গ্রাফিক বা সচিত্র বর্ণনা রয়েছে।

ছবি: স্ত্রিনশট, আইজেবি
বিশ্বজুড়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিদিন শিশু যৌন নির্যাতনের কোটি কোটি ছবি দেখা যায়। এই ধরনের কনটেন্টের পরিমাণ কেবলই বাড়ছে। ভুক্তভোগী ও বেঁচে থাকা মানুষদের জন্য যে ভয়াবহতা এটি তৈরি করে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবু শিশু যৌন নির্যাতনের কনটেন্টের (সিএসএএম) এই বিশাল “বাজার” নিয়ে সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় খুব কম প্রতিবেদনই উঠে আসে। এমনকি এটি সাধারণ আলাপ–আলোচনাতেও খুব একটা জায়গা পায় না, বলেন আইজেবির পরিচালক ও আরাকনিডের উপস্থাপক রব ক্রিব। ফরেনসিক শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শ্যারন কুপার এই বিষয়ে ক্রিবকে বলেন, “আমার অনেক মেধাবী সহকর্মী আছেন, কিন্তু নির্যাতনের এই ছবিগুলো তাদের খুব ভীত করে তোলে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এগুলো তাদের জন্য এতটাই নেতিবাচক যে তারা এর মুখোমুখি হতে চান না।”
ছয় পর্বের এই সিরিজে রব ক্রিব এবং তার দল ইন্টারনেটের অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছেন। কেন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো শিশু যৌন নির্যাতনের কনটেন্ট (সিএসএএম) বারবার শেয়ার হওয়া প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না—অনুসন্ধান করেছেন তা। তারা এমন সব ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, যারা তাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের ভিডিও বা ছবি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাতে পারছেন না। এমনকি ওই কনটেন্টগুলো যারা দেখছেন, বা এই ধরনের বিষয়বস্তুর ”ভক্ত” যারা, তারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করছে ও তাদের অবস্থান জানতে চাচ্ছে। এছাড়াও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, পরামর্শদাতা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে আরাকনিডের প্রতিবেদকরা। বিশেষ করে যারা সিএসএএমের সম্প্রচার রোধের প্রযুক্তিগত উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। যেমন প্রজেক্ট আরাকনিড—এটি একটি উদ্ভাবনী টুল যা শিশু যৌন নির্যাতনের ছবিগুলো চিহ্নিত করে এবং সরবরাহকারীদের কাছে অপসারণের নোটিশ পাঠায়।
অ্যারাকনিড শোনাটা বেশ কষ্টসাধ্য। কারণ এটি এমন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করে যা আমাদের মধ্যে অনেকেই ভাবতে চাই না—অথবা পারি না। এটি দর্শকদের নিয়ে যায় সেই সব মানুষের দুর্বিষহ জীবনের গভীরে, যারা প্রতিদিন বেঁচে ফেরা, বর্তমান ভুক্তভোগী এবং ভবিষ্যতে শোষণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য লড়াই করছেন। তা সত্ত্বেও, ক্রিব অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিষয়টি পরিচালনা করেছেন এবং সরকার ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অতীত ব্যর্থতাগুলোকে অতি নিবিড়ভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি শ্রোতাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছেন: ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের সঠিক পদক্ষেপ নিতে মূলত কীসের প্রয়োজন পড়ে? – এমিলি ও’স্যুলিভান, জিআইজেএন রিসোর্স সেন্টার গবেষক।
হোয়েন চাইল্ড্রেন ওয়্যার আরেস্টেড— সোউট

ছবি: স্ক্রিনশট, সোউট
সোউটের শারাইত প্রোগ্রামের শক্তিশালী তিন পর্বের এই সিরিজে প্রকাশ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা এসওএস এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সিরিয়ার আসাদ সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে গৃহযুদ্ধের শীর্ষ মুহূর্তে শিশুদের তাদের পরিবারের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল।
পডকাস্টটি সেই সব সিরীয় মা-বাবার অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও তিক্ততার কথা বর্ণনা করেছে, যারা আজও তাদের সন্তানদের খুঁজে ফিরছেন। আসাদ সরকারের পতনের পরও অনেক শিশু নিখোঁজ রয়ে গেছে। এই সিরিজটি একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ— যেখানে ছিল লাইটহাউস রিপোর্টস, বিবিসি আই, দ্য পিবিডার, উইমেন ওয়ন দ্য ওয়ার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
কেবল প্রকাশ করা অপরাধের গুরুত্বের জন্যই নয়, বরং সম্পূর্ণ অনুসন্ধান এবং প্রমাণের কারণে পডকাস্টটি বিশেষ মাত্রা পায়। হাজার হাজার নথি, স্প্রেডশীট, ডিজিটাল ফাইল এবং ছবির ভিত্তিতে অনুসন্ধানটি উন্মোচন করেছে কীভাবে একটি বিশ্বব্যাপী শিশু কল্যাণ সংস্থা সিরীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জড়িত হয়েছিল। পডকাস্ট দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মেইস ক্যাট ব্যাখ্যা করেন:
“আমাদের হাতে আসা নথিগুলো থেকে পাওয়া তথ্যগুলো কীভাবে উপস্থাপন করা যায়—এটি ছিল এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে হাজার হাজার স্প্রেডশিট, ডিজিটাল ফাইল এবং ছবি সংগ্রহ করেছিলাম। যার প্রতিটিই অপরাধের প্রমাণ হাজির করে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করাই ছিল আমাদের মূল কাজ। আর পডকাস্টের বিষয়বস্তু ছিল এমনিতেই বেশ জটিল। তাই তথ্যগুলো ঢালাওভাবে বলতে গেলে গল্পের ছন্দ বা প্রবাহ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও ছিল। এজন্য আমরা আমাদের সহকর্মী লাইটহাউস রিপোর্টসের ডিজিটাল অনুসন্ধানকারী বাশার দিবকে দুই পর্বের আলোচনায় আমন্ত্রণ জানাই। আমি আর সেলিম সালামা তার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে অনুসন্ধানের ফলাফলগুলো সহজভাবে তুলে ধরি। সাংবাদিকদের মধ্যে নিজেদের কাজ ও অনুসন্ধান নিয়ে যে ধরনের প্রাণবন্ত আলোচনা হয়, আমাদের আলাপচারিতাতেও ঠিক সেই আবহ ফুটে উঠেছে।”
মাইস কাত এবং বাশার দিবের সম্পাদনা ও অনুসন্ধানে, সেলিম সালামা ও মাইস কাতের রচনা ও উপস্থাপনায় এবং সেলিম সালামার প্রযোজনা ও নির্দেশনায় নির্মিত এই সিরিজটি ব্যক্তিগত গল্প এবং দালিলিক প্রমাণের মধ্যে এক অত্যন্ত সতর্ক ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়েছে। এটি তথ্যবহুল, গম্ভীর এবং বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই পডকাস্টটি সস্তা উত্তেজনা এড়িয়ে অপরাধীদের জবাবদিহিতার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। — মাজদোলিন হাসান, জিআইজেএনের আরবি সম্পাদক।
লরা ডিক্সন জিআইজেএনের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক এবং যুক্তরাজ্যের একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি কলাম্বিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোতে কাজ করেছেন। তার কাজ দ্য টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং দ্য অ্যাটলান্টিকে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইডব্লিউএমএফ এবং পুলিৎজার সেন্টার থেকে ফেলোশিপ পেয়েছেন।