প্রবেশগম্যতা সেটিংস

ছবি: “স্টোরি-বেসড ইনকোয়ারি: এ ম্যানুয়াল ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস” বই থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট।

লেখাপত্র

বিষয়

লুকানো ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য সাংবাদিকদের ‘টাইমলাইন’ বানানো কেন প্রয়োজন, কীভাবে বানাবেন 

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

শার্লক হোমস চরিত্রের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েল ছিলেন একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক। তিনি তার সময়ের অন্যতম সেরা রোগ নির্ণয় বিশেষজ্ঞের অধীনে পড়াশোনা করেছিলেন। সত্যি বলতে, সঠিক রোগ নির্ণয়ের শুরুটা হয় মূলত একটি অনুমান থেকে। যা পরে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা ও রোগীর অতীত ইতিহাসের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। সম্ভবত এখান থেকেই শার্লকের অনুসন্ধানী পদ্ধতির চিন্তাটা মাথায় আসে ডয়েলের: “একজন আদর্শ যুক্তিবিদ, যখন কোনো একটি তথ্যকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সমর্থ হবেন, তখন তিনি শুধু সেই তথ্যের পেছনের পুরো ঘটনাপ্রবাহই নয়, বরং পরবর্তী সব ফলাফলও অনুমান করতে পারবেন।”

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে আমাদের কাজগুলো অবশ্য কল্পকাহিনি নির্মাণের মতো নয়। তবে কিছু কল্পকাহিনি আছে, যেগুলো থেকে আমরা শিখতে পারি। কোনো অনুসন্ধানের শুরুটা যদি হাইপোথিসিস বা অনুমান ‍দিয়ে হয়— অর্থাৎ “আমাদের ধারণা কী ঘটেছে?” এই প্রশ্নের সাময়িক উত্তর — তাহলে একটি টাইমলাইন ও সোর্স ম্যাপ সেই উত্তরের সত্যতা যাচাইয়ের ধাপগুলো নির্ধারণ করে। ঘটনাটি কখন ঘটেছে, কোথায় ঘটেছে এবং কারা জড়িত ছিল, তা খুঁজে বের করার মধ্য দিয়েই আমরা বুঝতে পারি ঘটনাগুলো কীভাবে ঘটেছিল।

অনুমান থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে আমরা একটি ঘটনাচক্র তৈরি করতে পারি। যার শুরুটা হবে নেপথ্যের কারণগুলো দিয়ে এবং ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে, যতক্ষণ না ঘটনার প্রভাবগুলো চিহ্নিত করা যায় এবং সমাধান হয়।

এভাবে আমরা কখন কী ঘটেছে তা বিশ্লেষণ করে তথ্য উদঘাটন করতে পারি। আমরা যদি জানতে পারি যে কিছু একটা ঘটেছিল, তাহলে আমরা সেই ঘটনার নেপথ্যের কারণ বা পরিস্থিতি অনুমান করতে পারি। একইভাবে আমরা পরিণতিগুলোও অনুমান করতে পারি। একবার যখন আমরা এই কারণ ও পরিণতিকে হাইপোথিসিস হিসেবে উপস্থাপন করি, তখন আমরা সেগুলো যাচাই করতে পারি।

সাধারণ ঘটনা হিসেবে সরকারি বিবৃতির কথা ধরা যাক। প্রকাশিত হওয়ার আগে বিবৃতিটি লেখার জন্য কাউকে নির্দেশ দিতে হয়েছে। কেউ লিখেছে, কেউ অনুমোদন করেছে, আর কেউ তা সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছে। এরপর নিশ্চিত করেছে যে বার্তাটি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। আমরা যদি জানি যে তারা কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কেও অনুমান করতে পারি। আমরা কল্পনা করতে পারি যে এই মানুষগুলো একটি সভায় একত্রিত হয়েছিল, যেখানে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে। আর ভাগ্য ভালো হলে, সেই সভার কোনো নথি থাকতে পারে, যা আমরা সংগ্রহও করতে পারি।

এটি ঘটেছিল ওয়াটারগেট অনুসন্ধানে। এখান থেকে আধুনিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যুগের সূচনা। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি নিয়ে যারা অনুসন্ধান করছিলেন তারা রিচার্ড নিক্সনের হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ কৌশলে পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন এবং সেখান থেকে তারা অনুমান করেন যে এর আগে একটি বৈঠক হয়েছিল। এরপর তারা সেই বৈঠকের নথি খুঁজতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত তা পেয়ে যান। সেই নথিগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার একটি ষড়যন্ত্র উন্মোচন করে, এবং অভিশংসনের মুখোমুখি হওয়ার আগেই নিক্সন পদত্যাগ করেন।

আমরা টাইমলাইন ব্যবহার করে গল্পের মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিও দেখাতে পারি। কোনো কিছু ঘটলেই বোঝা যায়, সেই ঘটানোর পেছনে কেউ না কেউ ছিল। আমরা অনুমান করতে পারি সেই “কেউ” কে হতে পারে। কোনো দপ্তরের কর্মচারী, একজন আইনজীবী, না কি একজন বিজ্ঞানী?—তারপর অনুমানটি যাচাই করতে পারি।

সাধারণত কোনো গল্পে প্রথমে যেসব ব্যক্তিরা সামনে আসে, তারা হলেন ভুক্তভোগী। তারা আমাদের জানান কখন কোনো অপরাধ বা ভুলের প্রভাব প্রকাশ পেয়েছে—বিশ্বের অনেক সমস্যাই আসলে একটি ভুল থেকে শুরু। আর তখনই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যখন সত্যিকারের দায়ী ব্যক্তি তা স্বীকার করতে বা সংশোধন করতে অস্বীকার করে। এই ভুক্তভোগীরাই আমাদের সেই সম্ভাব্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে সাহায্য করে, যারা এই পরিবর্তনের নেপথ্যে থাকতে পারে।

কীভাবে একটি টাইমলাইন তৈরি বজায় রাখা যায়

টাইমলাইন তৈরি করা খুবই সহজ একটি প্রক্রিয়া। এটি প্রিন্ট গবেষণা, দীর্ঘ ফিচার লেখা, কিংবা প্রামাণ্যচিত্র বা অনুসন্ধানী চলচ্চিত্র নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে কার্যকর। তবে এটি কার্যকর করতে হলে আপনাকে নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে এবং নিয়মিত তথ্য যোগ করতে হবে।

আপনি যদি তা করেন, তাহলে ধীরে ধীরে আপনি পুরো গল্পটি নিজের ভেতরে ধারণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে আপনি মূল্যবান তথ্য ভান্ডারও তৈরি করবেন, যা শুধু বর্তমান গল্পের জন্যই নয়, ভবিষ্যতের গল্পগুলোর জন্যও কাজে লাগবে। এছাড়া আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাও অর্জন করবেন—আর তা হচ্ছে তথ্য সংগ্রহের সময় তা সংগঠিত করে রাখার ক্ষমতা।

অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্টের পল রাডু বলেন, “আমি সবসময় প্রথমেই কাগজে সবকিছু লিখে রাখি—বিভিন্ন সূত্র, ধারণা আর টাইমলাইনের কিছু অংশ। এরপর সেগুলো স্প্রেডশিটে স্থানান্তর করি।” তিনি বলেন, সেই সময় “আমি মূলত নথিগুলো গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করি, অনুসন্ধানের একটি কাঠামো তৈরি করি।”

নেতৃস্থানীয় অনেক অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাছে টাইমলাইন তৈরির সবচেয়ে পছন্দের মাধ্যম স্প্রেডশিট। ডেবরা নেলসন বলেন, “আমি ওয়ার্ড প্রসেসরের চেয়ে স্প্রেডশিট বেশি পছন্দ করি। কারণ আপনি এটিকে প্রশ্ন করতে পারেন, আর এটি উত্তর দেয়। আপনি নতুন তথ্য বা ঘটনা খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুব দ্রুত সেগুলো যোগ করতে পারেন এবং তারিখ অনুযায়ী সাজিয়ে নতুন ঘটনাগুলোকে সঠিক জায়গায় বসাতে পারেন। ফিল্টার ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি, বিষয়, স্থান বা ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনাগুলো আলাদা করা যায়। আবার ফিল্টার সরিয়ে দেখাও যায়, সেগুলো পুরো ঘটনার বড় কাঠামোর মধ্যে কোথায় মিলে যায়। আর যদি আপনি কোনো কিছু গণনা করে থাকেন, যেমন অর্থ, তাহলে ‘সাম ফাংশন’ ব্যবহার করে খুব দ্রুত পুরো হিসাব যোগ করা যায়।”

আমি টাইমলাইন তৈরির জন্য ওয়ার্ড প্রসেসর ব্যবহার করতে পছন্দ করি। প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে লেখা, ছবি, অডিও অংশ, ভিডিও ক্লিপ, টেবিল বা স্প্রেডশিটের অংশ যোগ করা যায়। স্প্রেডশিটের ছোট ছোট ঘরের তুলনায় একটি পাতাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লেখা বা ছবি আমার কাছে বেশি স্বাভাবিক মনে হয়। এছাড়া টাইমলাইন যদি টেক্সট আকারে থাকে, তাহলে গল্প লেখার আগে সেটি সম্পাদনা বা সংক্ষিপ্ত করা আরও সহজ হয়।

তবে ফরম্যাট যাই হোক না কেন, মূল বিষয়গুলো সবসময় একই থাকে: কী ঘটেছে? কখন ঘটেছে? কোথায় ঘটেছে? কারা জড়িত ছিল? তারা কী বলেছে ও কী করেছে? এর কোনো প্রভাব পড়েছে কি?

এখানে ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াগুলো তুলে ধরা হলো:

১. এমন ঘটনাগুলো সংগ্রহ করুন যেগুলোর দৃশ্যমান প্রমাণ আছে—যেমন কোনো তথ্য, নথি, মন্তব্য বা পর্যবেক্ষণ। প্রতিটি ঘটনা কখন ঘটেছে, সেই সময় দিয়ে শুরু করুন; আপনি কখন তা জানতে পেরেছেন, সেটা দিয়ে নয়। সম্ভব হলে বছর, মাস ও দিন অন্তর্ভুক্ত করুন। (যদি কোনো অপরাধ বা দুর্যোগ বিশ্লেষণ করেন, তাহলে ঘণ্টা, মিনিটও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।) যদি নির্দিষ্ট মাস বা দিন জানা না থাকে, তাহলে টাইমলাইনে আনুমানিক অবস্থান ধরে রাখার জন্য বছরের প্রথম মাস এবং/অথবা মাসের প্রথম দিন ব্যবহার করুন। তথ্যের এই অনিশ্চয়তা বোঝাতে প্রয়োজনে রঙ ব্যবহার করে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারেন।

২. এরপর ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে, কারা এতে জড়িত বলে মনে হচ্ছে, এবং কী ঘটেছে—এই তথ্যগুলো যোগ করুন। প্রতিটি এন্ট্রি কম বা বেশি বিস্তারিত হতে পারে। আপনি চাইলে একটি সারাংশ দিতে পারেন, অথবা কোনো সাক্ষাৎকার বা নথি থেকে উদ্ধৃতি, ছবি, কিংবা মূল রেকর্ডিংয়ের লিংকও যোগ করতে পারেন। যদি আপনি ভিডিও নিয়ে কাজ করেন, তাহলে উদ্ধৃত অংশগুলোর টাইমকোডও নোট করে রাখুন, যেন পরে সেগুলো খুঁজে পেতে সময় কম লাগে। আর যদি নথি নিয়ে কাজ করেন, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো আলাদা করে বোঝাতে রঙ ব্যবহার করতে পারেন।

৩. এখন আপনার তথ্যের উৎস যুক্ত করুন। কেউ কি আপনাকে এটি জানিয়েছে? তাহলে তার নাম লিখুন (তবে উৎস যদি গোপনীয় হয়, তাহলে তা অবশ্যই নথিভুক্ত করবেন না)। তথ্য বা ডেটা কি কোনো সংবাদ ক্লিপ বা নথিতে আছে? এই তথ্য কি অন্য উৎস দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে? তথ্যটি আবার খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব বিবরণ দিন—যেমন একটি ইউআরএল (এবং প্রয়োজনে মূল নথিটি ডাউনলোড করুন)। তথ্য যেখান থেকেই আসুক না কেন, টাইমলাইন তৈরি করার সময়ই তথ্যের সঙ্গে তার উৎস একসঙ্গে রাখাটা অনেক বেশি কার্যকর। এতে পরে আলাদা করে খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট হয় না।

৪. দ্য ভ্যানিশিং ডায়াস্পোরা অব সিরিয়া’স ডক্টর্স নামে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সাধারণ টাইমলাইন এন্ট্রির একটি উদাহরণ। এই গল্পে দেখানো হয়েছে কীভাবে ভয় ও দারিদ্র্যের কারণে হাজার হাজার চিকিৎসক সিরিয়া থেকে পালিয়ে যান এবং বিদেশে পুনরায় স্বীকৃতি (রি-অ্যাক্রেডিটেশন) না পাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে চিকিৎসা পেশা থেকে হারিয়ে যান। এই এন্ট্রিতে তারিখ (যা আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি বা কম সময়সীমা তুলে ধরতে পারে), সারাংশ, উৎস সম্পর্কিত শনাক্তকারী তথ্য, সাক্ষাৎকারের অংশ এবং আর্কাইভ সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে।

০১/০১/২০১৫: [ড. এক্স] মিলিশিয়ারা তার ছেলেকে অপহরণের চেষ্টা করার পর পরিবারের সঙ্গে কানাডায় বসবাস শুরু করেন। [বর্তমান পদবী, প্রতিষ্ঠান, অবস্থান]

“তারা আমার ছেলেকে অপহরণের চেষ্টা করেছিল। তারা শহরের চিকিৎসক, প্রকৌশলী—এমন পরিচিত ও সম্ভাব্য অর্থশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের টার্গেট করত… অনেক ক্ষেত্রে আমরা জানি, তারা শিশুদের অপহরণ করে, অর্থ আদায় করে এবং পরে তাদের হত্যা করে পরিবারের কাছে মৃতদেহ পাঠিয়ে দিত। ব্যক্তিগতভাবে আমি এমন দুইটি পরিবারের কথা জানি।”

উৎস: সাক্ষাৎকার, ২৪/০৮/২০২২ (রেকর্ডিং: ফাইলের নাম)

 ৫. গল্পটি আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য কোনো পার্শ্বঘটনার উল্লেখ করাটা যদি সহায়ক হয়, তাহলে সেগুলো টাইমলাইনে যুক্ত করা ভালো। তবে চূড়ান্ত লেখায় এগুলো রাখতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই।

৬. সব ঘটনা একইভাবে বিস্তারিত নথিভুক্ত করার প্রয়োজন নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো—যেমন কোনো বৈঠকের পুনর্গঠন, সরকারি বা অপরাধমূলক প্রক্রিয়া, কিংবা নাটকীয় দৃশ্য—এগুলোর ক্ষেত্রে বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। এসব তথ্য সাধারণত অনুসন্ধানের সময় সাক্ষাৎকার থেকে সংগ্রহ করতে হয় এবং টাইমলাইনে দীর্ঘ উদ্ধৃতি আকারে সংরক্ষণ করা উচিত।

৭. এখন আপনি এমন ঘটনাগুলো অনুমান করুন, যেগুলো আপনার নিশ্চিত করা ঘটনার আগে বা সেই ঘটনার সময় ঘটতে বাধ্য ছিল। সেই ঘটনা ঘটার জন্য কে কী করেছে, কখন করেছে—এগুলো ভাবুন। এই সম্ভাব্য ঘটনাগুলো বোঝাতে একটি নির্দিষ্ট কীওয়ার্ড টার্ম (যেমন “অনুমান”) ব্যবহার করুন, যাতে আপনার অনুমান আর নিশ্চিত প্রমাণ তালগোল পাকিয়ে না যায়।

৮. এছাড়াও ভাবার চেষ্টা করুন, এই ঘটনাটি কোথায় কী ধরনের প্রমাণ বা চিহ্ন রেখে যেতে পারে—কোনো সরকারি নথি, সংবাদ প্রতিবেদন, দৃশ্যমান ক্ষতি, বা এমন কোনো সংঘর্ষ যা কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর মনে থাকতে পারে। এই ধরনের ধারণাগুলোও টাইমলাইনে যোগ করুন এবং পরে সেগুলো যাচাই করার চেষ্টা করুন।

৯. যদি একাধিক সাক্ষাৎকার বা নথি একই ঘটনার কথা বলে, তাহলে প্রতিটি উদ্ধৃতি আলাদাভাবে টাইমলাইনে রাখুন—যেন আপনি সেই ঘটনার চারপাশে একটি কথোপকথন সংগ্রহ করছেন। পরে এই উপাদানগুলো ব্যবহার করে গল্পে নাটকীয় প্রভাব তৈরি করা যায়, যখন আপনি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পাশাপাশি উপস্থাপন করবেন।

১০. তথ্য সংগ্রহের সময় চাইলে আপনি হাইপারলিংক বা কীওয়ার্ড ব্যবহার করে টাইমলাইনের আগের বা পরের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারেন। এতে সম্পর্কিত ঘটনাগুলোর মধ্যে সহজে যোগসূত্র তৈরি করা যায়।

১১. যে জায়গায় ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেই স্থানগুলোর বর্ণনা বা ছবি গল্প তৈরির সময় খুব কাজে লাগে। এগুলোও টাইমলাইনে ছবি বা লিংক আকারে যুক্ত করা যেতে পারে।

১২. বিভিন্ন চরিত্রের ওপর এসব ঘটনার কী প্রভাব পড়েছে, সেটাও কল্পনা করুন।

১৩. আপনার টাইমলাইন যতটা বিস্তারিত হবে, এমন কিছু মুহূর্ত আসবে যখন তথ্যগুলো যেন আপনাকে “কিছু বলছে” বলে মনে হবে এবং আপনার মন আরও সৃজনশীল হয়ে উঠবে। এই সময় আপনি নানা ধারণা পেতে পারেন—যেমন কোনো ঘটনার অর্থ কী, বা সেটি অন্য কোনো ঘটনার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত। এসব চিন্তা আপনি টাইমলাইনে লিখে রাখুন। এগুলোকে “নোট” দিয়ে চিহ্নিত করুন, যাতে পরে সার্চ করলে ভুলভাবে এগুলো ফলাফলে না আসে এবং এগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ভুল না বোঝা হয়। যদি আপনার টাইমলাইন স্প্রেডশিটে থাকে, তাহলে একটি আলাদা “নোট ফিল্ড” বা কলাম যোগ করে সেখানে রাখুন।

১৪. শেষ ধাপে ভাবুন, আপনি গল্পটি কীভাবে শেষ হতে দেখতে চান। কোনো সম্পাদনার প্রয়োজন আছে কি? সেই পরিবর্তন কী হতে পারে? বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আপনি জানতে চাইবেন প্রধান চরিত্রগুলো কী বলছে? অবশ্যই, আপনি তাদের হয়ে কথা বলতে পারবেন না। তবে আপনি এই ধারণাটি তাদের কাছ থেকে বা কোনো নথি থেকে যাচাই করতে পারেন। যদি আপনার ধারণা সঠিক না হয়, সেক্ষেত্রে আপনি আসল সত্যটি খুঁজে বের করতে পারবেন।

ছবি: বুক জ্যাকেট

টাইমলাইন ছাড়াই আমরা অনেক গল্প লিখেছি, সাধারণত খুব তাড়াহুড়োর কারণে—এবং শেষ পর্যন্ত সবসময়ই তা নিয়ে আফসোস করেছি। একটি ভালোভাবে তৈরি করা টাইমলাইন, সেটি তৈরি ও ধরে রাখতে যে পরিমাণ সময় লাগে (অভ্যাস হয়ে গেলে দিনে প্রায় আধা ঘণ্টা), তার তুলনায় অনেক বেশি সময় ও শ্রম বাঁচায়। কারণ এটি তথ্যের বিশৃঙ্খল ভিড়কে একটি শৃঙ্খলা ও স্পষ্টতা দেয়।

এছাড়াও এর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে:

  • হাইপোথিসিসের মতোই, টাইমলাইনও অনুসন্ধান শুরু করার আগে গল্পটিকে সংজ্ঞায়িত করতে এবং কল্পনা করতে সাহায্য করে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক কাজ হলো কোনো গল্প বাস্তবসম্মত কি না তা বোঝা। যেমন: কোনো সরকারি প্রক্রিয়ায় কি অনিয়ম ঘটেছিল? তা কি ফলাফলকে প্রভাবিত করেছিল?
  • টাইমলাইন আপনাকে আগেই বুঝতে সাহায্য করে কোন বিষয়গুলো সহজে পাওয়া যাবে এবং কোনগুলো খুঁজে বের করা বা নথিভুক্ত করা কঠিন হবে। গোপন বৈঠক সাধারণত প্রকাশ্য বৈঠকের তুলনায় অনেক বেশি কঠিনভাবে নথিভুক্ত করা যায়। সাধারণত, সূত্রগুলো তখনই এসব ঘটনা নিয়ে কথা বলে যখন তারা বুঝতে পারে যে আপনি ইতিমধ্যে এমন একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন খুঁজে পেয়েছেন যা একটি সিদ্ধান্তের দিকে ইঙ্গিত করে। তখন আপনি “কি ঘটেছিল?” না জিজ্ঞেস করে বরং “এটাই কি ঘটেছিল?”—এইভাবে প্রশ্ন করতে পারেন।

    • অনুসন্ধান চলাকালে পাওয়া নতুন তথ্যগুলো সংরক্ষণ ও অনুসরণ করার ক্ষেত্রেও টাইমলাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিটি নতুন তথ্য পাওয়া মাত্র সেটি টাইমলাইনের সঠিক স্থানে যুক্ত করা হয় এবং নথিভুক্ত করা হয়। এর ফলে তথ্য যাচাই ও লেখা—দুটোই সহজ হয়, কারণ কোথা থেকে তথ্য পেয়েছেন তা মনে রাখার জন্য আলাদা করে সংগ্রাম করতে হয় না।

  • শেষ পর্যন্ত, টাইমলাইন পুরো অনুসন্ধানকে ধাপে ধাপে গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে একটি ধারাবাহিক গল্পের কাঠামোয় সাজাতে সাহায্য করে। টাইমলাইন তৈরি করার মাধ্যমেই আপনি এরই মধ্যে গল্পটি নির্মাণ করা শুরু করে দেন।

সম্পাদকের নোট: লেখাটিস্টোরিবেইজড ইনকোয়ারি: ম্যানুয়াল ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস” (ইউনেস্কো ২০২৬)-এর দ্বিতীয় সংস্করণ থেকে সম্পাদিত একটি অধ্যায় সম্পূর্ণ সংস্করণটি এখানে বিনামূল্যে পড়া ডাউনলোড করা যাবে লেখক লুক সেনজার্সের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, যিনি এই প্রবন্ধের বহু ধারণা কৌশল উন্নতি করতে সহযোগিতা করেছেন।


মার্ক লি হান্টার “স্টোরি-বেইজড ইনকোয়ারি: আ ম্যানুয়াল ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস” গ্রন্থের প্রধান লেখক এবং গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক (জিআইজেএন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি হাজারো সাংবাদিককে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পরিচালনা ও লেখার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার লেখা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে হারপার’স, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন, ওয়াশিংটন পোস্ট, লে মঁদ দিপ্লোমাতিকসহ আরও বিভিন্ন মাধ্যমে।

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

প্যাট্রিক র‍্যাডেন কিফের নতুন বই ‘লন্ডন ফলিং’ থেকে সাংবাদিকদের জন্য চারটি শিক্ষা

প্যাট্রিক র‍্যাডেন কিফে যখন কোনো গল্পের খোঁজ পান, তখন তিনি সেটির পেছনে লেগে থাকেন, সহজে ছেড়ে দেন না। একের পর এক মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। ততক্ষণ বলতে থাকেন, যতক্ষণ না কথা বলার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকে। তিনি দাবি যাচাই করার জন্য নথিপত্র ও প্রমাণ খোঁজেন। গল্পের কাঠামো তৈরিতে প্রচুর সময় দেন।  

জলবায়ু

জলবায়ু অভিযোজন সম্পর্কিত ১০টি মিথ: সাংবাদিকদের যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে যায়, তবে অভিযোজনের অনেক সীমাবদ্ধতা বা সীমা অতিক্রম হয়ে যাবে। এর সমাধানগুলো আরও ব্যয়বহুল, কম কার্যকর অথবা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে।

অনুসন্ধান পদ্ধতি

যৌথ অনুসন্ধান—ভেস্তে যেতে পারে সামান্য একটি ইমেলের ভাষার কারণে এবং আরও যেসব শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে

সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানের মাঝপথে একজন অংশীদার প্রায় সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একজন সহকর্মীর পাঠানো ইমেইলের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিক ও “ব্যবসায়িক ধাঁচের” ভাষা তাকে বিরক্ত করে। সেই সময় অন্য একজন অংশীদার হস্তক্ষেপ না করলে তিনি প্রকল্প থেকে সরে যেতেন।

ডেটা সাংবাদিকতা

এআই খাতে ট্রিলিয়ন ডলার: রয়টার্স যেভাবে ভিজ্যুয়াল গল্পে এতো বড় ডেটা তুলে ধরেছে

সাংবাদিকরা যখন অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন লেখেন, তখন কিন্তু তারা ডেটার ঘাটতি নয় বরং বর্ণনার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। আর তা হচ্ছে, যে মানুষটি কখনও এক ট্রিলিয়ন ডলার চোখে দেখেননি, তাকে কীভাবে বিপুল এই অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যায়?