প্রবেশগম্যতা সেটিংস

রিভলভারের নল থেকে বেরিয়ে আসছে একটি ফাউন্টেন পেন; রিকার্দো কালদেরনের ডেস্কের পেছনে বহুবছর ধরে এমন একটি পোস্টার রাখা ছিল। পোস্টারটি ফরাসি সাময়িকী ল্য নুভেল অবজারভাতরের একটি পুরোনো প্রচ্ছদ। ওপরে লেখা: “সাংবাদিকদের ক্ষমতা” ।

লেখাপত্র

বিষয়

কেউ একবার দরজা খুললেই আমার সামনে একটা সুযোগ আসে: ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে রিকার্দো কালদেরন

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

প্যারিসের একটি পুরোনো জিনিসপত্র কেনাবেচার বাজার থেকে পোস্টারটি বোগোটায় সেমানা সাময়িকীর বার্তাকক্ষে নিয়ে এসেছিলেন তার সহকর্মী। কালদেরন সেখানে দুই দশকেরও বেশি সময় অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন। পোস্টারটি তার এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে, তিনি এটির একটি কপি তৈরি করে নেন। যেন প্রতিদিন সকালে অফিসে ঢোকার সময় এটি দেখতে পারেন।

আমি তখন ওই একই সাময়িকীতে কাজ করি। বলতে পারেন একজন অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক প্রতিবেদক। তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সম্পর্কে জানার প্রবল আগ্রহ ছিল আমার। সেই সময়ই প্রথম রিকার্দোর সঙ্গে আমার পরিচয়। পরে আমি তাকে ডাকতাম রিচি বলে। ততদিনে তিনি রীতিমতো অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিক। এরইমধ্যে যিনি কিনা ক্ষমতায় থাকা কিংবা ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ব্যক্তিদের নানা ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম উন্মোচন করেছিলেন। তার অনুসন্ধানের আওতায় এসেছিলেন সেনাবাহিনী ও পুলিশের জেনারেল, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার গুপ্তচর, বিভিন্ন দলের রাজনীতিক ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। পাশাপাশি মাদক সম্রাট, গেরিলা দলের যোদ্ধা এবং স্বেচ্ছাবিচারকারী বাহিনীর কমান্ডাররাও। তিনি তার অনুসন্ধান নিয়ে কখনো খুব বেশি কথা বলতেন না। এমনকি শুক্রবার রাতে একসঙ্গে বসে পানীয় পান করার সময়ও ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা করতেন না। ফলে তিনি আসলে কী নিয়ে কাজ করছেন, তা আমরা কখনোই ঠিকভাবে জানতাম না। তবে আমরা জানতাম, তিনি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছেন। আমার এখনো মনে আছে, সতর্কবার্তা হিসেবে আমাদের বার্তাকক্ষে পাঠানো সেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ফুলের মালাগুলোর কথা। আর মনে আছে, তাকে যে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, তার একটির কথাও।

মারিয়া মুরস ক্যাবট, হাভিয়ের ভালদেস লাতিন আমেরিকান অ্যাওয়ার্ডস ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম এবং কিং অব স্পেন প্রাইজের মতো নামকরা সাংবাদিকতা পুরস্কার পেয়েছেন কালদেরন। এর কয়েকটি তিনি একাধিকবারও পেয়েছেন। তবে তিনি সাধারণত প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেন। ২০২০ সালে সেমানা সাময়িকীর মালিকানা বদলে যায়। একই সঙ্গে চালু হয় নতুন সম্পাদকীয় নীতি। কালদেরন মনে করেন, এতে তার স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই তিনি সাময়িকীটি ছেড়ে দেন। ক্যামেরার সামনে থাকতে তার ভালো লাগত না। তারপরও তিনি দেশের প্রধান টেলিভিশন সংবাদ চ্যানেল নোতিসিয়াস কারাকোলের অনুসন্ধানী ইউনিটে যোগ দেন। সেখানে তিনি ও তার দল একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকেন। এর মধ্যে ছিল হাইতির প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইজ হত্যাকাণ্ডে কলম্বিয়ার ভাড়াটে সেনাদের ভূমিকা এবং ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকার কীভাবে অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশে আশ্রয় নেওয়া ভিন্নমতাবলম্বীদের খুঁজে বেড়াত, সে বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

নিজের কথা বলতে তিনি যে খুব একটা পছন্দ করেন না, তা সবারই জানা। তারপরও বছরের পর বছর ধরে করা কিছু অনুসন্ধান,  নিজের অভিজ্ঞতা আর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার নিয়ে কথা বলতে রাজি হন। এক শীতল বিকেলে বোগোটায় আমরা কফি খেতে বসি। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেন, যে পোস্টারটির কথা আমি কখনো ভুলতে পারিনি, সেটি এখন তার বাড়িতে ঝুলছে। কাজের মাধ্যমে তিনি কতটা ভালো কিছু করতে পারেন, আবার কতটা ক্ষতিও করতে পারেন—পোস্টারটি তাকে সব সময় তা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের সেই কথোপকথনের সম্পাদিত রূপ এখানে তুলে ধরা হলো।

জিআইজেএন: আপনি স্পোর্টস ডেস্কে কাজ শুরু করেছিলেন। একজন ক্রীড়া বিষয়ক প্রতিবেদক কীভাবে সশস্ত্র সংঘাত এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নিয়ে অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হয়ে উঠলেন?

রিকার্দো কালদেরন: সাংবাদিকতায় শুরু করার এটাই একমাত্র পথ ছিল। আমি জানতাম, ফুটবলে ১১ জন খেলোয়াড়ের বিপক্ষে ১১ জন খেলোয়াড় মাঠে নামে এবং একটি বল থাকে, যেটা নিয়ে খেলতে হয়। কিন্তু খেলাধুলা সম্পর্কে এর বাইরে আমার তেমন কিছু জানা ছিল না। আমি বিশ্বকাপ বা এই ধরনের বড় আয়োজন কভার করতে যেতে পারতাম। কিন্তু সেটা আমি চাইনি। তাই ক্রীড়া সাংবাদিকতার বদলে গণহত্যার ঘটনাগুলো কভার করার পথ বেছে নিই।

জিআইজেএন: গণহত্যার ঘটনা?

আরসি: সেমানা সাময়িকীর সম্পাদকীয় দল ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট। আর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষ দিকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল কলম্বিয়া। একই সময়ে দুটি বড় ঘটনা ঘটছিল। একটি ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরনেস্তো সামপারের নির্বাচনী প্রচারে ক্যালি কার্টেলের অর্থায়ন নিয়ে রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি। অন্যটি ছিল আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গণহত্যা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিস্তার। রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির কারণে অনেক সময় গণহত্যার ঘটনাগুলো কভার করার সুযোগ থাকত না। বার্তাকক্ষেও পর্যাপ্ত সাংবাদিক ছিলেন না। তাই আমি স্পোর্টস প্রতিবেদক হলেও স্বেচ্ছায় এসব ঘটনা কভার করতে যেতাম।

জিআইজেএন: আপনি কি সব সময়ই সশস্ত্র সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতি নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন?

আরসি: হ্যাঁ। কারণ অন্য সাংবাদিকেরা যেভাবে “খারাপ লোকদের”—গেরিলা, আধাসামরিক বাহিনী ও মাদক পাচারকারীদের—নিয়ে প্রতিবেদন করতেন, তা আমি দেখেছি। তাদের নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে অনেক সময় আসলে তাদের কাজগুলো আড়ালই করা হতো। তাই আমি অন্য ধরনের সাংবাদিকতা করার প্রয়োজন অনুভব করতাম। রাষ্ট্রবহির্ভূত এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী আসলে কী করছে, তা তুলে ধরতে চেয়েছি। আমি মনে করতাম, তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে লিখলে মানুষের উপকার হবে। একজন মাদক পাচারকারীকে শনাক্ত করে তার কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আনতে পারলে একটি সম্প্রদায় উপকৃত হতে পারে।

রিকার্দো কালদেরন কয়েক দশক ধরে কলম্বিয়ার সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত সব পক্ষ নিয়ে অনুসন্ধান করে আসছেন। এই ছবিতে সান হোসে দেল গুয়াভিয়ারে নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের জন্য আয়োজিত এক সমাবেশে অংশ নেওয়া এক শিশু লিখছে, “আমি খুব দুঃখিত।” ছবিটি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আইসিআরসি আয়োজিত এক সভায় তোলা। ছবি: এদগার আলফোনসো, আইসিআরসি কলম্বিয়া / ক্রিয়েটিভ কমন্স BY-NC-ND ২.০

জিআইজেএন: সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে কীভাবে প্রতিবেদন করতে হয়, সে বিষয়ে সম্পাদকদের কাছ থেকে কোনো দিকনির্দেশনা বা বিশেষ প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন?

আরসি: আমি জেরার্দো রেয়েসের সঙ্গে কয়েকটি প্রতিবেদনে কাজ করেছি। তিনি সংবাদপত্র এল তিয়েমপোর প্রথম অনুসন্ধানী ইউনিট থেকে এসেছিলেন। এর মধ্যে একটি ছিল নেগ্রো আকাসিওকে নিয়ে প্রতিবেদন। তিনি কলম্বিয়ার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী বা ফার্কের দশম ফ্রন্টের সাবেক গেরিলা নেতা ছিলেন। তখন প্রায় কেউই তাকে চিনত না। সেই প্রতিবেদন থেকে আমি শিখেছিলাম, জননিরাপত্তা নিয়ে অন্যভাবেও প্রতিবেদন করা যায়। শুধু কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে আরও গভীরে যেতে হয় এবং নিজেকেই অনুসন্ধান করতে হয়। ওই কয়েকটি প্রতিবেদনের বাইরে, আমার শেখার প্রক্রিয়াটা মূলত করতে করতে শেখার মতোই ছিল। এ পথে আমি অনেক ভুল করেছি। যেমন, শুরুতে আমি সবাইকে একইভাবে দেখতাম—মাদক পাচারকারী, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও। সময়ের সঙ্গে বুঝতে পারি, প্রতিটি গোষ্ঠী আলাদা। আর তাদের সঙ্গে কাজ করার সময় বুঝতে হবে, তারা কোন জায়গায় আপনাকে কৌশলে হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

জিআইজেএন: ওই প্রোফাইল বা শুরুর দিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো লেখার পর কি আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে ধরনের সাংবাদিকতাই করবেন?

আরসি: অনুসন্ধানী সাংবাদিক হব—এমন কোনো সচেতন সিদ্ধান্ত আমি কখনো নিইনি। ভাগ্যই আমাকে সেদিকে নিয়ে গেছে। কাজ করতে করতে আমি আরও একটি অনাবিষ্কৃত ক্ষেত্রের সন্ধান পাই। সেটি হলো নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংক্রান্ত বিষয়। কলম্বিয়ায় এবং অন্যান্য দেশেও এসব বিষয়ে প্রতিবেদন করা অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। আমি এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে শুরু করি শুধু এ কারণে যে, আর কেউ তখন ক্ষেত্রটিতে কাজ করছিল না।

জিআইজেএন: নিরাপত্তা বাহিনী গোয়েন্দাদের নিয়ে অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে কী ধরনের বিশেষ চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

আরসি: এটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। সাংবাদিকতার কিছু কিছু ক্ষেত্র একসময় একঘেয়ে হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রটি তেমন নয়। আমাদের কাজ করতে হয় এমন সব মানুষের সঙ্গে, যারা গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন এবং তথ্য ও সূত্রকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। কাজটি বেশি জটিল, কিন্তু কখনো একঘেয়ে নয়। এটি ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। এই ধরনের প্রতিবেদন করতে গিয়ে আমি ভয় পাই না, তা বলছি না। কিন্তু আমি কাজটি করি, কারণ এটি প্রয়োজনীয়। তাদের গোয়েন্দা সংস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হলে তা সমাজের জানা দরকার। অথবা সেটি মাদক পাচারকারী, আধাসামরিক বাহিনী ও ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের স্বার্থে কাজ করলে সেটিও সমাজের জানা দরকার।

সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কলম্বিয়ায় সামরিক বাহিনীর প্রতি মানুষের সমর্থন খুব বেশি। “ফলস পজিটিভস” কেলেঙ্কারির পরও দেশটির মানুষ নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে প্রায় উন্মাদনার মতো গর্ব করে। [এই কেলেঙ্কারিতে ২০০২ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে সেনাবাহিনী ৬ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছিল]। সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুতর একটি অপরাধ, একটি বিচ্যুতিকে দেশটি ক্ষমা করে দিয়েছে। তারপরও সেনাবাহিনী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের নিয়েও অনুসন্ধান করাটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে জাতীয় বীরের সেই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা যায়। একজন দেশপ্রেমিক সৈনিকও খলনায়ক হতে পারেন।

“রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির কারণে অনেক সময় গণহত্যার ঘটনাগুলো কভার করার সুযোগ থাকত না। বার্তাকক্ষেও পর্যাপ্ত লোক ছিল না। তাই আমি স্পোর্টস প্রতিবেদক হলেও স্বেচ্ছায় সেসব ঘটনা কভার করতে যেতাম,” কলম্বিয়ার সশস্ত্র সংঘাত নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করার কথা এভাবেই বলেন কালদেরন। ২০১১ সালে দক্ষিণ কলম্বিয়ার নারিনিও প্রদেশের বোকাস দে সাতিংগা থেকে তোলা এই ছবিতে অজ্ঞাতপরিচয় নিহতদের কবর চিহ্নিত করা হয়েছে “এনএন” দিয়ে। এর অর্থ “কোনো নাম নেই” । ছবি: আইসিআরসি কলম্বিয়া / ক্রিয়েটিভ কমন্স BY-NC-ND ২.০

জিআইজেএন: গুপ্তচরদের, বিশেষ করে তারা যদি অন্য দেশের হয়ে থাকে, কীভাবে আপনার ওপর আস্থা রাখতে রাজি করান? তারা আপনার সঙ্গে কথা বলবে কেন?

আরসি: আপনি কি ‘পে ইট ফরওয়ার্ড’ সিনেমাটি দেখেছেন? সিনেমাটি কিছুটা আবেগঘন ও সাদামাটা ধরনের। কিন্তু এই ধরনের সূত্রের (সোর্স) ক্ষেত্রে গল্পটির মূল ধারণাটি বেশ ভালোভাবে কাজে দেয়। একজন ব্যক্তি তার পরিচিত আরেকজনকে এমন কারও সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, যার কাছে ওই ব্যক্তির একটি উপকারের ঋণ রয়েছে। এরপর সেই ব্যক্তি আবার এমন আরেকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, যে একইভাবে অন্য কারও উপকার করতে পারে। এভাবেই বিষয়টি চলতে থাকে। এভাবেই আমি এমন কিছু মানুষের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছি, যারা আমাকে বিশ্বাস করেন এবং অন্যদের কাছে আমার কথা বলেন। ফলে তারা আমার জন্য দরজা খুলে দেন। এতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও লেগে যায়। আর আমি প্রায়ই ব্যর্থ হই, শুধু এই কারণে যে আমি একজন সাংবাদিক। কিন্তু যদি কেউ একবার রাজি হয়, আর তার সঙ্গে আলাপের সুযোগ পাই, আমি তা কাজে লাগাই।

এই প্রক্রিয়ায় আমি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছি। প্রথমত, তাদের ভাষায় কথা বলতে হবে। এফবিআইয়ের একজন এজেন্টের সঙ্গে যেভাবে কথা বলবেন, ডিইএর কারও সঙ্গে সেভাবে কথা বলবেন না। আবার স্পেনের সিএনআইয়ের কারও সঙ্গেও একইভাবে কথা বলা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। তারা যদি বুঝতে পারেন যে আপনি বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না, তাহলে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন না।

জিআইজেএন: নজরদারি বা সম্ভাব্য ফোনে আড়িপাতা থেকে নিজেকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখেন?

আরসি: আমি ধরে নিই, সবাই আমার কথা রেকর্ড করছে। আমি তাদের যা কিছু বলছি, সবই পরদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত হতে পারে। শুরুতে এটা কঠিন ছিল। এখনো আমার জন্য কঠিন। এর মানে হলো, প্রতিটি বৈঠকে আমি যা বলি, তার প্রতিটি শব্দ ভেবে বলতে হয়। শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নয়, মাদক পাচারকারী, গেরিলা—সবার সঙ্গেই।

জিআইজেএন: এই কাজের ক্ষেত্রে আপনাকে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবেএটা কীভাবে বুঝতে পারলেন?

আরসি: আমার সোর্সদের যখন হত্যা করা শুরু করল, তখন বুঝতে পারলাম। ডিএএসের ঘটনায় [ ডিএএস বা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিপার্টমেন্ট অব সিকিউরিটি ছিল কলম্বিয়ার প্রধান রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালে। কালদেরনের অনুসন্ধানের পর ২০১১ সালে সংস্থাটি বিলুপ্ত করা হয়।] আমি দুজন সোর্স হারিয়েছি। আর সেনাবাহিনীর দুর্নীতি নিয়ে একটি অনুসন্ধানে হারিয়েছি আরও একজনকে। আপনি জানেন, এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সোর্সদের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলতে হয়। কারণ এসব অনুসন্ধান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আপনার কোনো একজন সোর্স প্রথমবার নিহত হওয়ার ঘটনা আপনাকে বাস্তবতা বুঝিয়ে দেয়। তখন নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে সবকিছু নতুন করে ভাবতে হয়।

জিআইজেএন: আপনি কৌশলগত কী পরিবর্তন করেছিলেন?

আরসি: আগে আমি বৈঠকের জন্য নির্জন জায়গা এবং আমার কাছে নিরাপদ মনে হতো এমন হোটেল খুঁজতাম। কিন্তু তারপরও আমার দুজন সোর্স নিহত হন। এরপর আমি ভোররাতে, রাত ১টা থেকে ৪টার মধ্যে সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু করি। ওই সময় কেউ আপনাকে অনুসরণ করছে কি না, তা বোঝা সহজ। আমি বৈঠকের জন্য গাড়ি চালিয়ে অন্য শহরেও যেতে শুরু করি। যোগাযোগের নিরাপত্তার পেছনেও অনেক অর্থ ঢেলেছি। একসময় আমার কাছে ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া যায় এমন ১০টি ফোন ছিল। প্রতিজন সোর্সের জন্য একটি করে। সেটা ছিল সিগন্যাল চালুর আগের সময়। তখন নকিয়া ১১০১-এর যুগ।

আমি আরও শিখেছি, সূত্র যদি সাধারণ কোনো নাগরিক হন, তাহলে তার মনে ‘অতিরঞ্জিত নয়, প্রয়োজনীয় মাত্রায় সন্দেহপ্রবণতা’ তৈরি করতে হয়। বলতে হয়, এটা ব্যবহার না করি, ওই জায়গায় না যাই—এটা আপনার নিজের ভালোর জন্য। দেখুন, অন্য একটি ঘটনায় ওই সূত্রের কী হয়েছিল… আবার মানুষ অনেক সময় বিপদের কথা না বুঝেই তথ্য দিয়ে দেন। তখন কখনো কখনো আমাকে বলতে হয়, “আমি এই তথ্য প্রকাশ করব না। কারণ এতে আপনি ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন।” এতে কেউ কেউ আমার ওপর রেগে যান। এমনকি তারা আমাকে খুব খারাপ সাংবাদিকও ভাবতে পারেন। কিন্তু সবার আগে আমাকে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হয়।

আরেকটি বিষয়ও আমাকে কিছু কৌশল শিখতে সাহায্য করেছে। সেটি হলো পুলিশের খবর কভার করা। কোনো অভিযান কীভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল, তা জানতে আমি মামলার নথি পড়তাম। তদন্তকারীরাও কখনো কখনো গোপনে আমাকে বলতেন, কীভাবে তারা কোনো মাদক পাচারকারীকে তাদের পিছু নেওয়া থেকে বিভ্রান্ত করেছেন। পরে এসব কৌশল নিজের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে শুরু করি। যেমন, নিয়মিত চলাফেরার ধরন বদলে ফেলা। মহাসড়কে ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালানো। অথবা কেউ অনুসরণ করছে বলে সন্দেহ হলে পরপর চারবার ইউ-টার্ন নেওয়া। কারণ অন্য কেউ এমনটা করে না।

এসবই ছিল করতে করতে শেখার প্রক্রিয়া। সাংবাদিকদের জন্য বর্তমানে যেসব নিরাপত্তা নির্দেশিকা রয়েছে, তখন সেগুলো ছিল না।

জিআইজেএন: শুধু আপনার সূত্রদের জন্য নয়, আপনার নিজের জন্যও কোন প্রতিবেদনটি সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল?

আরসি: ডিএএসের ঘটনা। কারণ এই অনুসন্ধানটি সাত বছর ধরে চলেছিল এবং দুই ধাপে বিভক্ত ছিল। অন্য যেকোনো গোয়েন্দা সংস্থার মতো ডিএএসের কাজও ছিল বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। শুরুতে বিষয়টি বুঝতে আমার কিছুটা সময় লেগেছিল। পরে অবশ্য এটি আমার জন্য সুবিধা হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে একটি সূত্র আমাকে যা বলেছে, তা অন্য একটি সূত্রের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারতাম। একই সঙ্গে তারা একে অপরের পরিচয়ও জানতে পারত না।

এই অনুসন্ধানের কারণে তারা আমার অফিসে আড়ি পাতার যন্ত্র বসিয়েছিল। এরপর হুমকিও আসতে শুরু করে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ফুলের মালা ও শোকবার্তার সঙ্গে এই ধরনের প্রায় ১০টি হুমকি পেয়েছিলাম। এমনকি একবার আমার কাছে একটি সমাধিফলকও পাঠানো হয়েছিল। তবে সেটি এসেছিল যখন আমি সামরিক বাহিনী নিয়ে আরেকটি অনুসন্ধানে কাজ করছিলাম।

জিআইজেএন: এসব হুমকি পাওয়ার পর আপনি কী কী বিকল্পের কথা ভেবেছিলেনঅনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়া, বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো, নাকি প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা?

আরসি: এসব নিয়ে আমাকে বেশি ভাবতে হয়নি। ডিএএস নিয়ে আমার অনুসন্ধান তখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমার সোর্সরাও প্রতিবেদনটি তৈরিতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছিলেন।

অনুসন্ধান বন্ধ করে দিলে তাদের বিপদে ফেলে রাখা হতো। যারা আপনাকে তথ্য দিতে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেন, তাদের প্রতি আপনার একটি দায়িত্ব রয়েছে। সেই অঙ্গীকার হলো বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। আর অনেক সময় তথ্য প্রকাশ করাই নীরব থাকার চেয়ে ওই সূত্রদের বেশি সুরক্ষা দেয়। এর মানে অবশ্য এই নয় যে আমি কোনো সতর্কতা নিইনি। কয়েকবার আমার সঙ্গে দেহরক্ষী ছিল। একবার ১০ দিনের জন্য লন্ডনেও গিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরে এসে আবার কাজ শুরু করি।

কারণ আমি একাই কাজ করতাম, অনেকটা একাকী যোদ্ধার মতো। দল নিয়ে কাজ না করার এটিই একটি অসুবিধা। আমার কিছু হলে আমার জায়গায় কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো কেউ ছিল না। আবার নির্বাসনে থেকেও আমার পক্ষে অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

জিআইজেএন: সরকার যখন আপনার অনুসন্ধানকে খণ্ডন বা বিকৃত করতে কোনো বয়ান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং একজন সাংবাদিক হিসেবে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে চায়, তখন আপনি কীভাবে এর জবাব দেন?

আরসি: বলতে পারেন, বিষয়টি আমি বেশ কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখেছি। রক্ত, ঘাম আর চোখের জলের বিনিময়ে। আলভারো উরিবের সরকারের সময় এই অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। একসময় কলম্বিয়ার ৮০ শতাংশ মানুষের কাছে উরিবে ছিলেন পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরের মতো। উরিবে একটি মিথ্যা বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি যা কিছু প্রকাশ করেছি, সবই ভুয়া। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি, সবচেয়ে ভালো প্রতিরক্ষা হলো হাতে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রাখা। যদিও এখানে হয়তো সামরিক উপমা ব্যবহার করা ঠিক হচ্ছে না। তবে প্রথম প্রতিবেদনেই আপনার হাতে থাকা সব তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়। এর অর্থ হলো, এমন কিছু তথ্য নিজের কাছে রেখে দেওয়া, যেগুলো হয়তো তখন প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। পরে প্রয়োজন হতে পারে। আর তথ্য সবসময় ধীরে ধীরে প্রকাশ করতে হবে। এর পাশাপাশি আমি একসঙ্গে একাধিক অনুসন্ধান চালানোর চেষ্টা করি। বিভিন্ন দিক থেকে কাজ করি। যাতে তারা এমন সব দিক থেকে আমার জবাবের মুখোমুখি হয়, যা তারা আশা করেনি। এছাড়া প্রকাশের আগে আমি সব সময় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির কথা ভাবি। তারা কীভাবে আমাকে আক্রমণ করতে পারে?

সাম্প্রতিক সময়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি দাবি করেছিলেন, একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য সিআইএ থেকে পাওয়া। দাবিটি একেবারেই যুক্তিসংগত ছিল না। তারপরও এর জবাব দিতে আমাদের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়েছিল। সমস্যা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ কী বলছে, তা নয়। সমস্যা হলো, এসব বক্তব্য এমন সূত্রের কানে পৌঁছায়, যারা শেষ পর্যন্ত তা বিশ্বাস করে ফেলতে পারেন। প্রতিজনের কাছে আবার ফিরে গিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হয়। এটি অত্যন্ত ক্লান্তিকর কাজ। আর নিজেকে সাফাই দেওয়ার জন্য আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করি না। তাই শেষ পর্যন্ত অনেক সময় আমার সহকর্মীরাই আমার হয়ে সেই দায়িত্ব নেন।

জিআইজেএন: পেত্রো সরকারের সমালোচনার মুখে পড়া সাম্প্রতিক সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বলি। সাধারণ মানুষও প্রশ্ন তুলেছিল, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে না করে প্রতিবেদনটি পরে কেন প্রকাশ করা হলো। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কখন প্রকাশ করা উচিত?

আরসি: যখন সেটি শতভাগ প্রস্তুত হয়। পেত্রো সরকার ও ক্লান দেল গোফোর মধ্যে ‘টোটাল পিস’ বা পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনা নিয়ে ওই অনুসন্ধানে আমাদের হাতে কিছু অডিও রেকর্ডিং ছিল। সেগুলো প্রাথমিক অবস্থাতেই প্রকাশ করা সহজ ছিল। কিন্তু ফাঁস হওয়া কোনো তথ্য মানেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নয়। তবে এটি অনুসন্ধানের শুরু হতে পারে। তাই আমরা অডিওগুলো ধরে ধরে যাচাই করেছি। তথ্য অধিকার আইনে করা আবেদনের মাধ্যমে তথ্য যাচাই ও তুলনা করেছি। পাশাপাশি ১৫ জনের বেশি সোর্সের সঙ্গে কথা বলেছি এবং নথির সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখেছি। কেবল দুটি অডিও রেকর্ডিংয়ের জন্য আমাদের ছয় মাস সময় লেগেছে। এসব সূত্রের অনেকের কথাই প্রতিবেদনে সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। কারণ তাদের দিয়ে গল্পটি বলা হয়নি, বরং পাওয়া তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে।

জিআইজেএন: আপনি ২০ বছরেরও বেশি সময় মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন। এখন টেলিভিশনে কাজ করছেন। এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

আরসি: বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমে শব্দের মাধ্যমে সোর্সদের পরিচয় গোপন রাখা সহজ। কিন্তু টেলিভিশনে ছবি বা কণ্ঠ বিকৃত করলেও ঝুঁকি থেকেই যায়। ছবি না থাকলে অনেক সময় প্রতিবেদনই করা সম্ভব হয় না। এ কারণে অনেক গল্প কখনো আলোর মুখও দেখে না। আমি আমার পরিচয় গোপন রাখার সুযোগও হারিয়েছি। পাঁচ বছর আগেও আমার কোনো ছবি ছিল না। এখন সূত্রদের সঙ্গে কোনো রেস্তোরাঁয় দেখা করতে গেলে সহজে নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এতে আমার কাজের ওপরও প্রভাব পড়েছে। তবে আমার কিছু প্রাপ্তিও আছে। টেলিভিশনের প্রভাব অনেক বেশি।

জিআইজেএন: পাঠকদর্শক এবং প্রভাবের কথা যখন উঠল, আপনার কি মনে হয় মানুষ এখনো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল্য বোঝে?

আরসি: গণমাধ্যম এখন বিশ্বাসযোগ্যতার চরম সংকটের সম্মুখীন। তবে এমন একটি নির্দিষ্ট পাঠক-দর্শক গোষ্ঠী আছে, যারা এখনো এর মূল্য বোঝে। ভালোভাবে তৈরি করা হলে মানুষ দীর্ঘ প্রতিবেদন পড়তে বা দেখতে আগ্রহী। আমার মনে হয়, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ হয়েই থাকবে। হয়তো ব্যাপক পরিসরে নয়, তবে যারা সঠিকভাবে অবহিত থাকতে চান, তাদের কাছে এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। আমি এটাও মনে করি না যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জায়গা দখল করতে পারবে। কারণ এটি কারও মুখ দেখে বুঝতে পারে না যে সে মিথ্যা বলছে কি না। আবার পরবর্তী প্রশ্নও করতে পারে না।

জিআইজেএন: এই পেশাটি ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং স্বাস্থ্যের ওপরও বড় ধরনের চাপ ফেলতে পারে। আপনি কি কখনো অন্য কিছু করার কথা ভেবেছেন, কিংবা অবসর নেওয়ার কথা?

আরসি: আমার একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো বয়স। এমন কিছু কাজ আছে, যা এখন আর করতে চাই না। যেমন, ব্রেকিং নিউজ কভার করা। এটা তরুণদের কাজ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষও সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তবে অভিজ্ঞতারও কিছু সুবিধা আছে। শেষ পর্যন্ত আপনি আফ্রিকার সেই বৃদ্ধ জ্ঞানী সিংহের মতো হয়ে যান, যে জানে আশপাশে কতগুলো হরিণ আছে। কিন্তু সে আর সবগুলো শিকার করতে যায় না। বরং যেটা ধরতে পারবে, সেটাকেই লক্ষ্য করে।


কাতালিনা লোবোগেরেরো  কলম্বিয়াভিত্তিক একজন স্বাধীন সাংবাদিক সম্পাদক। তিনি নিয়মিত লা সিয়া ভাসিয়া, ওহো পুবলিকো, সিএলআইপি, এল পাইস এবং আরমান্দোডটইনফোতে লেখেন। তিনিলস রেসতোস দে লা রেভোলুসিওন’ (‘দ্য রেমন্যান্টস অব দ্য রেভোলিউশন’) বইটির লেখক। এটি ননফিকশনধর্মী বর্ণনামূলক একটি বই। ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কারাকাসে বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার সময় ভেনেজুয়েলার ভেঙে পড়ার যে চিত্র তিনি দেখেছেন, বইটিতে তা তুলে ধরেছেন। এর আগে তিনি জিআইজেএনের স্প্যানিশ সম্পাদক এবং সেমানা সাময়িকীর অনুসন্ধানী রাজনৈতিক প্রতিবেদক ছিলেন।

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

কর্মীর প্রশংসা করুন, দায়িত্ব দিন, ভুলকে স্বাভাবিক ভাবে নিন: অনুসন্ধানী সংবাদ ব্যবস্থাপকের জন্য ১৫ পরামর্শ

সপ্তাহে একটি দিন ‘কোনো মিটিং নয়’—এমন নিয়ম চালু করে দলের সদস্যদের কাজ করার সময় করে দেওয়া খুবই কার্যকর হতে পারে। সপ্তাহে একটি দিন কোনো মিটিং না থাকলে মানুষ সেই কাজগুলো শেষ করার সুযোগ পায়, যেগুলো বিভিন্ন ডেডলাইনের মধ্যে কাজ শেষ করার তাড়া বা একের পর এক মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার কারণে করা হয়ে ওঠে না।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত বা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অনুসন্ধান করবেন কীভাবে, কী বলছেন মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকরা 

সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কেবল আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির (অ্যাক্রেডিটেশন) মাধ্যমেই প্রবেশাধিকার পাওয়া যায় না। বরং স্থানীয়দের আস্থা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং জনগোষ্ঠীর মনোভাব ও গতিবিধি সম্পর্কে বোঝাপড়ার মাধ্যমেই তা নিশ্চিত করতে হয়। সংবাদমাধ্যমের পরিচয়পত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের চেয়েও অনেক সময় এই বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

সংবাদ লেখা হয়, কিন্তু ক্ষত রয়ে যায়: সংঘাত-সহিংসতা নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকরা নীরবে ভোগেন মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে

২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের শুরুর দিনগুলোতে, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রেদওয়ান আহমেদ একদল শরণার্থীর জানাজায় অংশ নেন। যারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় বঙ্গোপসাগরে ডুবে মারা যায়। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী ও শিশু। দাফনের সময় তিনি এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন, মিয়ানমারের সহিংসতায় এক ছেলেকে হারানোর পর যার পরিবারের বাকি সদস্যরাও গভীর সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছেন।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ সাক্ষাৎকার

গুপ্তচরবৃত্তি, মিথ্যা ও ‘ডার্টি ওয়াটার’: অস্ট্রিয়ার নতুন অনুসন্ধানী দলের সঙ্গে আলাপচারিতা

অস্ট্রিয়ার রেডিও সম্প্রচার খাতের উদ্যোক্তা ফ্লোরিয়ান নোভাক “গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার” লক্ষ্য নিয়ে ইয়েৎস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এর শুরুর লক্ষ্য ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট, কিন্তু স্থানীয় বাজারের তুলনায় উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। প্রতি মাসে ১৭ দশমিক ৫০ ইউরো (২০ মার্কিন ডলার) করে দিবেন এমন ৫ হাজার সদস্য সংগ্রহ করা।