ছবি: জিআইজেএন/ইলাস্ট্রেশন: শাটারস্টক
কেউ কূটনীতিক, কেউ বহুরূপী, কেউ বা শিকারি মানসিকতার : বার্তাকক্ষে থাকা অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের ব্যক্তিত্ব বুঝবেন যেভাবে
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা একটু অদ্ভুত প্রকৃতির হন। একদিকে নিজেকে নায়ক ভাবার প্রবণতা, অন্যদিকে অযোগ্য মনে করার অদ্ভুত এক দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকেন। এক মুহূর্তে মনে হয়, আমরা বুঝি পৃথিবীটাই বদলে দিতে যাচ্ছি। পরক্ষণেই ভালো একটি প্রতিবেদন লিখতে পারছি না বলে যন্ত্রণায় ভুগতে থাকি।
“আবারও একটা ফাঁস হওয়া ফালতু তথ্য নিয়ে কাজ করতে হবে না তো!”—এক বছর আগে আমরা যে অনুসন্ধানটি করেছিলাম, তারই মতো একটি নতুন প্রকল্পের কথা বলতেই এক সহকর্মী চিৎকার করে উঠলেন। “আমরা নিজেদের সঙ্গে এমনটা কেন করছি?”—আরেকজন জানতে চাইলেন। তবে প্রশ্নটি করার আগেই তিনি কাজ শুরুর সময়সীমা ঠিক করে ফেলেছিলেন। ছোট্ট একটি দল, অথচ ব্যক্তিত্বের ধরন কতটা ভিন্ন!
কিছু সাধারণ প্রবণতা থাকলেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের শক্তি ও দুর্বলতা একেক রকম। কেউ একা কাজ করতে পছন্দ করেন, আবার কেউ দলবদ্ধভাবে কাজ করলেই সবচেয়ে ভালো ফল বের করে আনতে পারেন। কেউ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দক্ষ, আবার কেউ মানুষের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে বেশি পারদর্শী। তবে কঠিন প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত এই ধরনের সাংবাদিকদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা যাদের কাজ, এমন মানুষে ভরা একটি বার্তাকক্ষ কীভাবে পরিচালনা করবেন? প্রচলিত নিয়মকানুনকে চ্যালেঞ্জ করতেই যারা ভালোবাসেন, তাদের কীভাবে একটি নির্দিষ্ট কর্মপ্রক্রিয়া মেনে চলতে রাজি করাবেন?
প্রতিবেদক ও সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলার পর আমি বার্তাকক্ষের ছয় ধরনের চরিত্র চিহ্নিত করেছি। তবে স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি মনোবিজ্ঞানী নই। তাই এগুলো কোনো পেশাদার সিদ্ধান্তও নয়। আর এই ধরনগুলো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, এমনটাও নয়। তবে আমাদের মধ্যকার পার্থক্য, শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে ভাবলে ভিন্নতাগুলো হয়তো সম্পাদকদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে যে একেকজন প্রতিবেদক একটি অনুসন্ধানে কী ধরনের ভূমিকা রাখেন, কোন বিষয়গুলো তাদের কাজের গতি বা ধারাকে ব্যাহত করতে পারে এবং তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।
তাহলে আপনার নিজের বার্তাকক্ষে কিংবা নিজের মধ্যে, এই ধরনগুলোর কোনগুলো আপনি খুঁজে পান? এমন আরও কোনো ধরন কি আছে, যা আমরা বাদ দিয়েছি?

ছবি: জিআইজেএন/অলঙ্করণ: শাটারস্টক
গিরগিটি বা বহুরূপী: যারা পরিস্থিতি, পরিবেশ ও মানুষের ধরন অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম
“আমি মনে করতাম, প্রত্যেক সাংবাদিককেই গিরগিটির মতো পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে জানতে হয়,” বলেন আফ্রিকা আনসেন্সর্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা জন-অ্যালান নামু। “আপনাকে নানা ধরনের অ্যাসাইনমেন্টে যেতে হয়। প্রতিবেদন করতে গিয়ে গল্প আপনাকে যে পথ দেখায়, তা অনুসরণ করতে হয়।”
পুলিৎজার সেন্টারের নির্বাহী সম্পাদক এবং এর আগে ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মারিনা ওয়াকার গুয়েভারা। সাংবাদিকদের সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন জগতের মধ্যে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে দেখেছেন। তিনি বলেন, “আজ আপনি তাদের ক্ষমতাধর একদল সম্পাদকের সামনে কথা বলতে দেখবেন। আর পরদিনই হয়তো তাদের রেইনফরেস্টে বসে চা খেতে এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ভীষণ সহজভাবে মিশতে দেখবেন।”
এখানে গুরুত্বপূর্ণ গুণটি অভিনয় বা নিজেকে উপস্থাপনের দক্ষতা নয়। বরং এটি হলো বিনয়। গিরগিটির মতো রঙবদলে সক্ষম একজন সত্যিকারের সাংবাদিক প্রতিটি পরিবেশে প্রবেশের সময় চারপাশকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চান না। তিনি বরং মানিয়ে নেন। অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু এবং গল্পের মানুষগুলোর জন্যই তিনি তা করেন। নিজেকে নির্ভীক দেখানোর জন্য নয়।
এরমধ্যে ছদ্মবেশে বা গোপনে সাংবাদিকতা করাটা শেষ ধাপ বলতে পারেন। আর এর মাধ্যমে এমন অনিয়ম বা অপরাধ উন্মোচিত হতে পারে, যা অন্যথায় গোপনই থেকে যেত। তবে এর সঙ্গে প্রতারণা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং ফাঁদে আটকে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। আর সব গিরগিটির পক্ষে এসব পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব নয়।

ছবি: জিআইজেএন/অলঙ্করণ: শাটারস্টক
শিকারি: যারা সূত্র বা তথ্যের পেছনে লেগে থেকে সত্য উদ্ঘাটন না করা পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যায়
“এটাই হলো অতিমাত্রায় মনোযোগী মানুষের চিরাচরিত ধরন,” বলেন আন্তঃদেশীয় নারীবাদী বার্তাকক্ষ আনবায়াস দ্য নিউজের প্রধান সম্পাদক টিনা লি।
“যেকোনো দলের জন্যই তারা খুব মূল্যবান সদস্য। কাগজপত্র সামলানো, তথ্য জানার অধিকার বা ফোয়া অনুরোধ পাঠানোর স্বাভাবিক তাগিদ কারও না কারও মধ্যে থাকতেই হবে। সাংবাদিকতায় নথিপত্রের সূত্র ধরে এগিয়ে যাওয়াটাও এক ধরনের নেশার মতো। মনে হয়, একটা সুতো টানছেন আর সেখান থেকে ক্রমেই আরও তথ্য বেরিয়ে আসছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে অন্য কাউকে তাদের সেই খুঁটিনাটি অনুসন্ধান থেকে বের করে এনে বলতে হবে: ‘আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য আছে, এবার চলুন মানুষের সঙ্গে কথা বলি।’”
অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্টের (ওসিসিআরপি) পরিবেশবিষয়ক অনুসন্ধান সমন্বয়কারী এলি মস্কোভিটজ বলেন, “যারা নথিপত্রের সূত্র ধরে অনুসন্ধান করতে ভীষণ আগ্রহী, তাদের সঙ্গে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে তারা যখন সব তথ্য একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেন।”
তবে আশঙ্কা আছে, নথিপত্রের সূত্র ধরে অনুসন্ধানকারীদের কেউ কেউ তাদের পাওয়া তথ্য নিজেদের মধ্যেই রেখে দিতে পারেন। তিনি আরও বলেন, “কেউ কোনো সহযোগিতামূলক কাজে যোগ দেওয়ার আগেই যদি নিজেকে একাকী নেকড়ে বলে পরিচয় দেন, তাহলে আমি একটু অস্বস্তি বোধ করি।”

ছবি: জিআইজেএন/ অলঙ্করণ: শাটারস্টক
ধর্মযোদ্ধা
এই ধরনের সাংবাদিক প্রায়ই বছরের পর বছর শুধু একটি বিষয় নিয়েই কাজ করেন। তারা যে গল্পটি নিয়ে কাজ করছেন, সেটির প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই তীক্ষ্ণ।
“তাদের প্রেরণাই তাদের শক্তি,” বলেন লি। “যে মানুষ খুব অনুপ্রাণিত, তিনি একের পর এক নথি ঘেঁটে দেখতে, আর্কাইভে খোঁজ করতে, মানুষের দরজায় কড়া নাড়তে কিংবা আরও বেশি সূত্র তৈরি করতেও আগ্রহী থাকবেন।”
দ্য ব্ল্যাক সি-এর সম্পাদক ও পরিচালক ক্রেইগ শ বলেন, এই ধরনের সাংবাদিকরা প্রায়ই খুব আবেগপ্রবণ হন। “তাদের কাছে সবকিছুই নাটকীয়, আর সবকিছুই ঠিক এখনই ঘটতে হবে। যেন এটা না ঘটলে পৃথিবীটাই শেষ হয়ে যাবে।”
এই তাড়না একটি অনুসন্ধানকে সচল রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে, পরস্পরবিরোধী প্রমাণকেও বাধা হিসেবে মনে হতে পারে।
সাধারণত মনে করা হয়, বার্তাকক্ষে এই ধরনের ব্যক্তিত্বের সাংবাদিকদের অ্যাক্টিভিস্ট সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার প্রবণতা বেশি। তবে এরও ভালো-মন্দ দুই দিক আছে। লি বলেন, “এই ধারণার কারণে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের মানুষ আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইবেন না, [তবে] এর প্রতিফলন আপনার লেখাতেও ফুটে উঠবে।”

ছবি: জিআইজেএন/অলঙ্করণ: শাটারস্টক
আর্কষনীয় ব্যক্তিত্ব: সহজে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে সক্ষম
এই ধরনের সাংবাদিক যেন কোনো না কোনোভাবে সবাইকে চেনেন: বিচারক, সমাজকর্মী, কৌঁসুলি, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা, মাদক ব্যবসায়ী…
লি বলেন, “তাদের সবার মধ্যে অন্তত একটি বিষয় সাধারণ। তারা এমন একটা ভাব তৈরি করতে পারেন যে, তারা কাউকে বিচার করেন না। কাউকে নিয়ে আপনি প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন, আর এরপরও তার আস্থা ধরে রাখা কঠিন।”
নামু এই সক্ষমতাকে সাংবাদিকতার একটি মৌলিক বিষয় মনে করেন। তিনি বলেন, “আমাদের মানুষের সঙ্গে মিশতে পারতে হবে, কারণ সাংবাদিকতা আসলে মানুষকে নিয়েই। তা না হলে আপনি কীভাবে সঠিক সোর্স খুঁজে পাবেন?”
ওসিসিআরপির মস্কোভিটজ একবার এমন এক সহকর্মীর কথাই উল্লেখ করেন। যিনি ছিলেন “মানুষকে আকর্ষণ করার চুম্বক” । তিনি ধোঁয়ায় ভরা বারে বসে ল্যাপটপের মাধ্যমে অপর প্রান্তের লোকের সঙ্গে কথা বলতেন।
“আপনি ভাবছেন, ‘এই ব্যক্তি বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন না,’” তিনি বলেন। “তারপর দেখবেন, পরমুহূর্তেই তিনি আমাদের অনুসন্ধানের মূল ব্যক্তিকে খুঁজে বের করেছেন এবং বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটিয়েছেন।”
মানুষকে সহজেই আপন করে নিতে পারার সক্ষমতা সাংবাদিকদের হয়তো অন্যদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে খুব কাজে দেয়, কিন্তু লি বলেন, “আপনি যদি সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চান, সাংবাদিকতায় সেটা সবসময়ই একটি দুর্বলতা। আপনার কাছে যদি তিনজন সোর্স থাকে এবং আপনি সবসময় তাদের সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু অন্য পক্ষের সোর্সরা যদি আপনার সঙ্গে কথা বলতে না চান, তাহলে এর ফলে প্রতিবেদনে পক্ষপাত তৈরি হতে পারে।”

ছবি: জিআইজেএন/অলঙ্করণ: শাটারস্টক
ডেটা পাগল
তথ্য-উপাত্তে আচ্ছন্ন এই সাংবাদিকেরা বিভিন্ন ডেটাসেট, কোড, স্যাটেলাইট ছবি এবং অন্যান্য ডিজিটাল সূত্রে গল্প খুঁজে বের করেন।
নামু বলেন, “তাদের একটি শক্তি হলো, বার্তাকক্ষে সাধারণত তারাই তথ্য যাচাই করে দেখেন।” অন্য সাংবাদিকেরা যখন কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে উপমার আশ্রয় নেন, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ সাংবাদিক তখন বলতে পারেন, “না, আসলে ঘটনা এভাবেই ঘটেছে।”
তিনি আরও বলেন, “যে বিষয়গুলো স্পষ্ট ও দৃশ্যমান, তার বাইরেও দেখতে তারা আমাদের সাহায্য করেন। খবরের গন্ধ তারা ঠিকই পান, তবে একটু ভিন্নভাবে।”
তবে প্রযুক্তিগত জ্ঞান সহযোগিতামূলক কাজের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষণটি যদি শুধু একজনই বুঝতে পারেন, তাহলে কী গণনা করা হয়েছে, কী বাদ দেওয়া হয়েছে বা কোন বিষয় ধরে নেওয়া হয়েছে—এসব নিয়ে দলের অন্য সদস্যরা যথাযথভাবে প্রশ্ন তুলতে পারেন না।
আনবায়াস দ্য নিউজের লি বলেন, “তথ্য-উপাত্তে দক্ষ সবচেয়ে ভালো সাংবাদিক হলেন তিনি, যিনি একই সঙ্গে বুঝতে পারেন, এসব তথ্য কীভাবে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং বাস্তব জীবনে এর কী প্রভাব পড়ে।”
ওয়াকার গুয়েভারাও এমন তথ্য-উপাত্ত বিশেষজ্ঞদের দেখেছেন, যারা নিজেদের তৈরি সূত্র ও সরঞ্জামের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “তারা এমনভাবে বলেন: আমার তৈরি ‘অ্যাফ্রোডাইট’ নামের দারুণ টুলটি কেউ ব্যবহার করছে না কেন? কারণ, আপনি তো নিজের প্রয়োজনের জন্য ‘অ্যাফ্রোডাইট’ তৈরি করেছেন। আপনার ‘অ্যাফ্রোডাইট’ তৈরির আগে জানতে হবে, আপনার পাঠক কারা।”

ছবি: জিআইজেএন/অলঙ্করণ: শাটারস্টক
কূটনৈতিক
হয়তো এই ধরনটির মধ্যে সবচেয়ে কম বীরত্বের ছাপ আছে, কিন্তু আন্তঃদেশীয় অনেক অনুসন্ধানই তাদের ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। অন্য সব ধরনের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে দক্ষভাবে কাজ করতে পারার কারণে তারা প্রায়ই সহযোগিতামূলক কাজের সমন্বয়ের দায়িত্বও নিয়ে নেন।
দ্য ব্ল্যাক সি-এর জেইনেপ শেনতেক বলেন, “মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে তারা সত্যিই খুব ভালো। আমি এমন কয়েকজন কূটনীতিতে দক্ষ ব্যক্তিকে চিনি, যারা চাপের মধ্যে এবং অন্য মানুষের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষ।”
নামু আরও বলেন, “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজে, বিশেষ করে সহযোগিতামূলক অনুসন্ধানে, তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সাংবাদিকেরা খুঁটিনাটি বিষয়ে এতটাই ডুবে যান যে মূল বিষয়টি হারিয়ে ফেলেন। আবার কখনো আপনি একটি গল্পের মাঝপথে এসে ভাবতে থাকেন, শেষ পর্যন্ত এটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তখন এমন কেউ থাকেন, যিনি নিয়মিত আপনাকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন, তথ্য সামনে তুলে ধরছেন এবং আরও ভালোভাবে একসঙ্গে কাজ করতে সাহায্য করছেন।”
নামু নিজেও আংশিকভাবে এই ধরনের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারেন এবং এর কিছু নেতিবাচক দিকও বোঝেন। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি সবসময় সবার মধ্যে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করেন, তার সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে একটি বিষয় হারিয়ে যায়—তা হলো গতি।”
তবে সমন্বয়ের দায়িত্ব যখন আনুষ্ঠানিকভাবে না দিয়ে অদৃশ্য প্রত্যাশা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা ক্ষমতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। লি বলেন, নারীদের প্রায়ই এই ভূমিকার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, কারণ ধরে নেওয়া হয় যে তারা অন্যদের সঙ্গে বেশি মানিয়ে চলবেন।
তিনি বলেন, “একটা ধারণা আছে যে নারীরা বেশি ভালো বা নমনীয়। মানে, এই ধারণাটাই তো বাজে, তাই না? কিন্তু এটা অনেকটা আবেগ বুঝে কাজ করার মতো—মানুষকে ফোনে পাওয়া, আবার একই সঙ্গে দ্বন্দ্বও মীমাংসা করা।”
ওয়াকার গুয়েভারাও একমত হয়ে বলেন, “যে বিষয়টি আমাকে একটু ক্ষুব্ধ করে, তা হলো এই ভূমিকাটি এখনো মূলত নারীরাই পালন করেন।”
দলের কাজ যখন জটিল হয়ে পড়তে শুরু করে, তখন আরেকটি ঝুঁকি দেখা দেয়। এই ব্যক্তি অসমাপ্ত কাজ নিজের হাতে তুলে নেন, প্রতিটি মতবিরোধ মিটিয়ে দেন এবং পুরো প্রকল্পকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যান। গল্পটি প্রকাশিত হয় ঠিকই, কিন্তু দলটির উন্নতি হয় না, কারণ একজনই সবার হয়ে মূল কাজের ভার বহন করে চলেছেন।
তবে এই চরিত্রকে সবার মন জুগিয়ে চলা ধরনের মানুষের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। ওয়াকার গুয়েভারা বলেন, “প্রকৃত কূটনীতিক হলেন তিনি, যিনি সবাইকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে চান, কিন্তু কোন বিষয়গুলোতে কোনোভাবেই আপস করা যাবে না, সে সম্পর্কে তার খুব পরিষ্কার ধারণা থাকে।”
তাদের কাজ প্রায়ই চোখে পড়ে না। উত্তেজনা কমানো, দ্বন্দ্ব মেটানো এবং সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখতে সময় লাগে। আর এই কাজে দেওয়া সময়ের কারণে কূটনীতিবিদের নিজের প্রতিবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ও অনেক সময় কমে যায়।
কাদের ‘একরোখা’ বলা হয়?
একই ধরনের আচরণ কে করছেন, তার ওপর নির্ভর করে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। কোনো প্রতিবেদককে স্বাধীনচেতা বলা হয়, আবার অন্য কাউকে বলা হয় সহযোগিতায় অনাগ্রহী। একজন আপসহীন, অন্যজনকে বলা হয় আক্রমণাত্মক। একজন স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্ব দেন, আর অন্যজনকে বলা হয় নিয়ন্ত্রণপ্রবণ। কোন পরিচয়টি শেষ পর্যন্ত একজনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হবে, তা অনেক সময় লিঙ্গ, জাতীয়তা এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
নামু বলেন, “অনেক নারী সাংবাদিককে আমি দেখেছি, তারা নিজেদের করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরলে নানা সমস্যার মুখে পড়েন। তাদের অহংকারী বা মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। অথচ বাস্তবে তারা কেবল নিজেদের কাজের প্রতি অবিচল থেকে সেই কাজের পক্ষেই দাঁড়াচ্ছেন।
একজন সাংবাদিক কোন ধরনের কাজের ক্ষেত্রে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সম্পাদক বা দলের নেতাদের কেবল তা বিবেচনা করলেই চলবে না; বার্তাকক্ষের ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে সেই কাজের ধরনকে মূল্যায়ন, পুরস্কৃত বা শাস্তিযোগ্য করে তোলে, সেটাও দেখা উচিত।
দ্য এক্সামিনেশনের উইল ফিটজগিবন বলেন, “আমাদের অবশ্যই ‘দ্য কনফারেন্স গুরু’কে এই তালিকায় যুক্ত করা উচিত। এই সাংবাদিকরা বছরের পর বছর নতুন ও আগ্রহ জাগানো কোনো অনুসন্ধান করেননি। তবুও ১০ বছর পরও তারা নিজেদের সেই পুরোনো অনুসন্ধান নিয়ে কথা বলেন।”

ছবি: জিআইজেএন/অলঙ্করণ: শাটারস্টক
যে ধরনের মানুষকে কোনো দলেরই প্রয়োজন নেই: ‘দ্য ব্রিলিয়ান্ট জার্ক’
ওয়াকার গুয়েভারা তার পরামর্শদাতা এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন এস. নাইট জার্নালিজম ফেলোশিপসের পরিচালক ডন গার্সিয়ার কাছ থেকে পাওয়া একটি বিশেষণ ব্যবহার করেন: “দ্য ব্রিলিয়ান্ট জার্ক”। অর্থাৎ অসাধারণ কিন্তু অসহ্য ব্যক্তি।
গুয়েভারা বলেন, “এই ব্যক্তি দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং কখনো কখনো আকর্ষণীয়ও। তার এমন কোনো বিরল দক্ষতা থাকতে পারে, কিংবা প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে তার অসাধারণ সাফল্যের রেকর্ড থাকতে পারে। কিন্তু তিনি দলের জন্য নয়, নিজের জন্য কাজ করেন। তিনি তথ্য নিজের কাছে জমিয়ে রাখেন, সহকর্মীদের হেয় করেন এবং কোনো সিদ্ধান্ত সমাধানের পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য না করেই তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।” একজন সম্পাদকের জন্য কঠিন প্রশ্নটি হলো, ওই ব্যক্তির অসাধারণ মেধা কি সেই ক্ষতিকে যৌক্তিকতা দেয়?
ওয়াকার গুয়েভারার উত্তর একেবারেই স্পষ্ট: না। তিনি বলেন, “পৃথিবীতে এবং সাংবাদিকতা জগতে যথেষ্টসংখ্যক মেধাবী, সহায়ক ও সহযোগিতাপূর্ণ মানুষ আছেন। ওই ‘ব্রিলিয়ান্ট জার্ক’রা নিজেদের মধ্যেই কাজ করতে পারেন। তাদের জন্য শুভকামনা।”
বাস্তবে, বেশিরভাগ অনুসন্ধানী সাংবাদিক সম্ভবত এক অগোছালো সংমিশ্রণ: কেউ কিছুটা শিকারি কুকুর স্বভাবের, কেউ ধর্মযোদ্ধা, কেউ আবার কফি আর সন্দেহের ওপর ভর করে চলা ক্লান্ত ডেটা-পাগল; তবে আমার প্রত্যাশা, ওই ‘গুরু’দের মতো তারা নন।
আর যেসব দল ভালোভাবে কাজ করে, সেসব দলে সাধারণত এমন মানুষদের সমন্বয় থাকে, যারা নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতা ও শক্তি নিয়ে আসে। ওয়াকার গুয়েভারা বিষয়টিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেন, তাতে একটি দলের গঠনও আসলে একটি সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, “ব্যবস্থাপনার শুরুটা হয় নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকেই। আর এই প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে পরবর্তী পুরো অভিজ্ঞতাটি কতটা দুঃস্বপ্নের মতো হবে, আর কতটাই বা আনন্দময় হবে।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “দলের সদস্যদের চরিত্র বুঝে বিচার করার দায়িত্ব আপনার। এই দলটি যেন ভালোভাবে কাজ করতে পারে এবং সবাই যেন নিজেদের সেরাটা দিতে পারেন, সে জন্য তাদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন—সেটা আপনাকে জানতে হবে।”
অথবা লির ভাষায়, “সবচেয়ে ভালো ধরনের অনুসন্ধানে এদের সবারই কিছু না কিছু অংশগ্রহণ থাকে।”
সেরডার ভার্ডার বার্লিনভিত্তিক একজন ফ্রিল্যান্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তিনি মূলত ডয়চে ভেলের জন্য প্রতিবেদন করেন। তার কাজের মূল লক্ষ্য অর্থের গতিপথ অনুসরণ এবং পরিবেশের ক্ষতির নেপথ্যে থাকা ক্ষমতা ও রাজনৈতিক স্বার্থগুলো অনুসন্ধান করা। তিনি গ্রিনওয়াশিং, অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে আসার স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিষাক্ত খনন কার্যক্রম, রাজনৈতিক প্রভাবের নেটওয়ার্ক এবং গভীর সমুদ্রে খননকাজের অর্থায়ন নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। প্যান্ডোরা পেপার্স, শ্যাডো ডিপ্লোম্যাটস এবং ডিফরেস্টেশন ইনকরপোরেটেডের মতো বড় বৈশ্বিক অনুসন্ধানেও তিনি কাজ করেছেন। তার প্রতিবেদন আল জাজিরা, আইসিআইজে এবং ওসিসিআরপিতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিজেকে ২০ শতাংশ ‘হিউম্যান ম্যাগনেট’, ৩০ শতাংশ ‘ক্যামেলিয়ন’ এবং ৫০ শতাংশ ‘ব্লাডহাউন্ড’ মনে করেন।
