প্রবেশগম্যতা সেটিংস

ছবি: শাটারস্টক

লেখাপত্র

•

বিষয়

মেটার ক্রাউডট্যাঙ্গেল বন্ধ দুই বছর: বিকল্প হিসেবে এআই কি পারবে সেই শূন্য জায়গা পূরণ করতে?

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

২০২৪ সালে ক্রাউডট্যাঙ্গল বন্ধ করে দেয় মেটা। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বিভিন্ন কনটেন্ট কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা পর্যবেক্ষণের জন্য টুলটি ব্যবহার করা হতো। সাংবাদিক, ফ্যাক্টচেকার এবং গবেষকদের জন্য এই প্ল্যাটফর্মটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রাউডট্যাঙ্গল ব্যবহার করে তারা ভাইরাল কনটেন্ট আর ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার মতো বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন।

ক্রাউডট্যাঙ্গলের অবসান ঘটে ধীরে ধীরে। কয়েক বছর ধরে মেটা টুলটিতে বিনিয়োগ কমাতে থাকে, সংশ্লিষ্ট দলগুলো ভেঙে দেয় এবং ব্যবহারকারীদের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে। অবশেষে ২০২৪ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা করে, আগস্টে ক্রাউডট্যাঙ্গলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। তখন ১০০টিরও বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্বাক্ষর করা একটি আবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, এমন পদক্ষেপের ফলে “রাজনৈতিক অপতথ্য, সহিংসতায় উসকানি এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর অনলাইন হয়রানি শনাক্ত ও প্রতিরোধে অন্যান্য প্রায় সব উদ্যোগই থমকে যাবে।”

বর্তমানে নতুন প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কিছু টুল সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে। যার মধ্যে অন্যতম আরবিটার। প্ল্যাটফর্মটি বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম)। এআই এজেন্ট ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট সংগ্রহ করে ও অসংখ্য পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে। আরবিটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এপিআই, একাডেমিক তথ্যভান্ডার আর তৃতীয় পক্ষের ডেটা স্ক্র্যাপিং প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। বর্তমানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার (এক্স), ইউটিউব, টিকটক, রেডিট, ব্লুস্কাই এবং ফোরচ্যানসহ বেশ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে কাজ করে টুলটি।

চলতি বছরের শুরুতে আরবিটার প্রথমবারের মতো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে তাদের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে শুরু করে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জার্মানির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলে (ডিডব্লিউ), আর্জেন্টিনার ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান চেকেয়াদো এবং ফিলিপাইনের সংবাদসাইট র‌্যাপলার। ১০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবহারকারীরা এতে নিবন্ধন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ে প্রতিবেদন করতে আগ্রহী সাংবাদিকদের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী টুলে প্রবেশাধিকার থাকাটা ভীষণ জরুরি।

“আমাদের স্বাধীন ব্যবস্থার প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের কাঠামোর মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, যার ফলে ভালো কাজও শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে,” বলেন সিমপিপিএলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি স্বপ্নীল মেহতা। এই টুলটি তৈরি করেছে সিমপিপিএল। তিনি বলেন, “আমি এমন একটি টেকসই ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই, যা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ করবে। কারণ আমরা যেসব ফ্যাক্টচেকার ও সাংবাদিককে সহায়তা করি, তাদের কাজ এমনিতেই নানা ধরনের বাইরের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তাই তাদের কাজ হুমকির মুখে পড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একটি বিষয় নিয়ে আরবিটারকে সাধারণ ভাষায় প্রশ্ন করলেই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কীওয়ার্ড শনাক্ত করতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো বয়ান ছড়ানো পোস্টগুলোকে চিহ্নিত ও শ্রেণিবদ্ধ করে আলাদাভাব সাজাতে পারে। বিভিন্ন দাবিকে আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একই বার্তা ছড়ানো অ্যাকাউন্টগুলো শনাক্ত করতে পারে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে একটি সারসংক্ষেপ প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি একাধিক প্ল্যাটফর্ম নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে এবং ইন্টারনেটজুড়ে বিভিন্ন বয়ান কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা চিহ্নিত করতে পারে।

আরবিটারের অন্যতম অভিনব বৈশিষ্ট্য হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো বয়ান কীভাবে ছড়াচ্ছে, সে প্রবণতা তুলে ধরতে সক্ষম। এর মধ্যে রয়েছে বয়ানটি প্রথম কখন সামনে এসেছে এবং নির্দিষ্ট কোনো প্ল্যাটফর্মে কখন তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, এসব তথ্যও। এই বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সাংবাদিকেরা ভবিষ্যতে কোন মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বয়ান সামনে আসতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। মেহতার মতে, বাজারে থাকা অন্যান্য “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ” টুলের তুলনায় উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যই আরবিটারকে আলাদা করে। এসব টুলের অনেকগুলোই জনসংযোগ ও বিপণন খাতের জন্য তৈরি।

“সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আপনাকে জানায়, কোনো আলোচনা যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি কোথায় ঘটছে। এটি আপনাকে সতর্কবার্তা পাঠায়,” বলেন মেহতা। এ পর্যায়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন, তবে “সমস্যা হলো, সাংবাদিক হিসেবে আপনি সেই সতর্কবার্তাটি আসার আগেই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চান। আপনি স্রেফ ওই সতর্কবার্তা পাওয়া ব্যক্তিটি হতে চান না; বরং নিজেই সতর্কবার্তাটি চান।” তার ভাষায়, ততক্ষণে “যা হবার হয়ে যায়।”

আরবিটার কীভাবে আগাম প্রবণতা শনাক্ত করে

আরবিটার হলো সিমপিপিএলের প্রধান পণ্য। সিমপিপিএল একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যারা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক ও গবেষকদের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কয়েক বছর ধরে কাজ করছে। মেহতা ২০২১ সালে ধারা মুঙ্গরার সঙ্গে মিলে এই এআই গবেষণাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। ধারা মুঙ্গরাও একজন তথ্যবিজ্ঞানী এবং বর্তমানে সিমপিপিএলের পণ্য দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

মেহতা এর আগে টুইটারে নাগরিক ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অপতথ্য শনাক্ত করার পর্যায়ক্রমিক একটি ব্যবস্থা তৈরির কাজ করেছেন। তিনি অ্যাডোবি ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণা করেছেন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংবাদকক্ষে এআইভিত্তিক প্রকল্পে সহায়তা করে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের কর্মসূচি জার্নালিজমএআই। তিনি এই কর্মসূচীর অনুদানপ্রাপ্তদের পরামর্শদাতা হিসেবেও কাজ করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিক ও ফ্যাক্টচেকাররা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হন, তার কয়েকটি সমাধানের চেষ্টা করছে আরবিটার। এর মধ্যে একটি হলো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের দুর্বল মানের সার্চ ফলাফল। মেহতা আমাকে বলেন, “আপনি আসলে চাইবেন আপনার সার্চের বিপরীতে একটি প্রাসঙ্গিক ফলাফল [উদাহরণস্বরূপ,] আমি যদি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ‘সংশয়বাদ’ সংক্রান্ত কিছু খুঁজি, তবে এটি আক্ষরিক অর্থে সব পোস্টে কেবল সংশয়বাদী (skeptic) শব্দটিই খুঁজবে না,” মেহতা আমাকে জানান।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো সাংবাদিকেরা যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য হাতে পান, সেগুলো থেকে অর্থপূর্ণ তথ্য বের করা। এসব তথ্য সরাসরি বাণিজ্যিক বৃহৎ ভাষা মডেলে (এলএলএম) প্রবেশ করালে অনেক সময় কার্যকর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। “যে কেউ এক লাখের বেশি তথ্য নিয়ে কাজ করেছেন, তিনি জানেন যে সেগুলো সরাসরি কোনো এলএলএমে ঢাললে প্রথমে আপনার ক্রেডিট কার্ডের বিলের বোঝা বাড়বে, আর এরপর এমন সব বাজে ফলাফল দেবে, যেগুলো আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না,” বলেন তিনি।

তথ্য থেকে অর্থপূর্ণ বিষয় বের করার জন্য আরবিটারকে তাই একক কোনো ভিত্তি মডেলের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়নি। বরং এর প্রযুক্তি কাঠামোর মধ্যে ৮ থেকে ১০টি ভিন্ন এআই মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। “আপনার প্রশ্নকে এনকোড করা থেকে শুরু করে কোন পোস্টগুলো সংগ্রহ করা উচিত তা নির্ধারণ, এসব পোস্টের মধ্যে সমন্বিত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, অর্থগত সাদৃশ্য খুঁজে বের করা এবং নেটওয়ার্কের মানচিত্র তৈরি, প্রতিটি কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন [মডেল] ব্যবহার করা হয়,” মেহতা বলেন। এর কিছু কিছু স্তর কোনো নির্দিষ্ট মডেলের ওপর নির্ভরশীল নয়। বার্তাকক্ষগুলোকে তাদের পছন্দের এলএলএম সরবরাহকারী বেছে নেওয়ার সুযোগও দেয় আরবিটার।

পরীক্ষামূলকভাবে আরবিটার ব্যবহার করা প্রথম দিকের বার্তাকক্ষগুলোর একটি নেস্ট সেন্টার। এটি মঙ্গোলিয়ার উলানবাতারে অবস্থিত গণমাধ্যমবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা। তাদের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ফ্যাক্ট-চেকিং সাইট ও ফেসবুক পেজ মঙ্গোলিয়ান ফ্যাক্ট-চেকিং সেন্টার (এমএফসিসি)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেস্টের ফ্যাক্টচেকাররা মঙ্গোলিয়ার উত্তর ও দক্ষিণের প্রতিবেশী দেশ রাশিয়া ও চীন থেকে পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য ছড়ানোর বিভিন্ন প্রচারণা নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন।

“আমরা ক্রাউডট্যাঙ্গলের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এরপর মেটা আমাদের মেটা কনটেন্ট লাইব্রেরি দিয়েছে,” বলেন নেস্ট সেন্টারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি দুয়া বাতার। তিনি ক্রাউডট্যাঙ্গলের বিকল্প হিসেবে মেটার তৈরি নিজস্ব টুলটির কথা উল্লেখ করেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া মেটা কনটেন্ট লাইব্রেরি (এমসিএল) সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং ক্রাউডট্যাঙ্গলে থাকা স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ ও উন্নত সার্চ সুবিধা বাদ দেওয়ার কারণে সমালোচিত হয়েছে। নেস্ট মেটার তৃতীয় পক্ষের ফ্যাক্টচেকিং কর্মসূচির সদস্য হিসেবে এমসিএল ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই কর্মসূচির কার্যক্রম ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

“আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট পোস্ট বা নির্দিষ্ট কোনো বয়ান দেখতে চান, তাহলে এমসিএল মোটামুটি কার্যকর। কিন্তু তথ্য পরিবেশ কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করতে চাইলে এমসিএল ক্রাউডট্যাঙ্গলের ধারেকাছেও নেই,” বলেন তিনি।

নেস্ট সেন্টারে আরবিটারের প্রাথমিক পরীক্ষায় এই প্রয়োজনটিই পূরণ হচ্ছে। বার্তাকক্ষটি আরবিটার ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ার কিছুদিন পর বাতার মঙ্গোলিয়ার সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের ওপর একটি প্রশ্ন দেন। আদালত রায় দিয়েছিল, “মিথ্যা তথ্য” প্রচারকে বেআইনি ঘোষণা করে ফৌজদারি যে আইনটি দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের হয়রানি ও ভয় দেখানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা অসাংবিধানিক। এরপর সংসদকে ওই আইনের বিকল্প একটি খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আরবিটারের মাধ্যমে ফেসবুক বিশ্লেষণ করা হলে কয়েকটি ছোট অ্যাকাউন্টের কিছু চমকপ্রদ মন্তব্য সামনে আসে। এসব অ্যাকাউন্টে বলা হচ্ছিল, সংসদ যে নতুন আইন তৈরি করতে যাচ্ছে, তাতে “মিথ্যা তথ্য”-এর বদলে “মানহানি” ও “অপবাদ” এর মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাতার বুঝতে পেরেছিলেন, এর ফলে মঙ্গোলিয়ায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দমনে সরকারের ক্ষমতা আরও বেড়ে যেতে পারে।

“আমি তখন মাত্র প্রথমবারের মতো আরবিটার ব্যবহার করেছিলাম। তাই বিষয়টি আমার কাছে বেশ অদ্ভুত লেগেছিল। আমার মনে হয়েছিল, এমনটা আবার কীভাবে হতে পারে?” বাতার আমাকে বলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরই মানহানি ও অপবাদকে ফৌজদারি আইনের আওতায় আনার বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে দল গঠন করা হয়েছে বলে ঘোষণা করে মঙ্গোলিয়ার সংসদ।

যদিও তখন আরবিটারের দেওয়া প্রাথমিক সতর্কসংকেতগুলোকে গুরুত্ব দেননি বাতার। তিনি বলেন, এই ঘটনা টুলটির ওপর তার আস্থা আরও বাড়িয়েছে। এখন নেস্ট সেন্টারের তিনজন কর্মী আরবিটার ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ পাচ্ছেন। তারা ফেসবুকে মঙ্গোলীয় ভাষায় প্রকাশিত কনটেন্ট পর্যবেক্ষণে এটি ব্যবহার করছেন। বাতারের দেওয়া প্রথম দিকের পরামর্শগুলোর একটি ছিল আরবিটারের মঙ্গোলীয় ভাষায় কাজ করার সক্ষমতা আরও উন্নত করা। তিনি আমাকে বলেন, জানুয়ারি থেকে এই সক্ষমতা অনেকটাই উন্নত হয়েছে।

“এটি আমাদের এমন কিছু বয়ান দেখতে সাহায্য করে, যেগুলো এখন জনপ্রিয় নয়, কিন্তু পরে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে,” তিনি উল্লেখ করেন।

বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে আরবিটার ব্যবহারকারী সব সংবাদকক্ষই বিনামূল্যে এই টুলটি ব্যবহার করছে। নেস্ট সেন্টারের জন্য এই সুযোগটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিষ্ঠানটি মেল্টওয়াটারের মতো বিকল্প কিংবা সাংবাদিকদের কথা বিবেচনা করে তৈরি হয়নি, এমন অন্যান্য এআই-চালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ টুল ব্যবহারের খরচ বহন করতে সক্ষম না। আরবিটার সংবাদকক্ষের সাবস্ক্রিপশনের বাইরেও আয়ের অন্যান্য পথ খুঁজে দেখছে। মেহতা বলেন, যেসব সংবাদ প্রতিষ্ঠান এই টুলটি ব্যবহার করতে পারে, তাদের বেশিরভাগেরই আর্থিক সংকটে থাকার বিষয়টি নিয়ে তিনি সচেতন রয়েছেন।

তবে এসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাতার আরবিটারকে ক্রাউডট্যাঙ্গলের পুরোপুরি বিকল্প হিসেবে দেখছেন না। “আমার দলের কাছ থেকে যে একমাত্র উদ্বেগের কথা শুনি, তা হলো—এটি বিভিন্ন উৎস থেকে আসলে কী পরিমান তথ্য সংগ্রহ করতে পারে,” বলেন বাতার। মেটার মাধ্যমে সরাসরি বিপুল পরিমাণ কনটেন্টে প্রবেশাধিকার পাওয়ায় নির্দিষ্ট পোস্টদাতা ও নির্দিষ্ট পোস্ট পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এমসিএল বেশি কার্যকর। অন্যদিকে, প্রবণতা এবং নতুন করে সামনে আসা বয়ান শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আরবিটার বেশি শক্তিশালী। “এমসিএল ও আরবিটার একসঙ্গে ব্যবহার করলে ক্রাউডট্যাঙ্গলের কাছাকাছি যাওয়া যায়।”

তথ্য সংগ্রহের বিকল্প পথ খোঁজা

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামসহ বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর এপিআই ব্যবহারের অনুমতি পেতে আরবিটারকে কয়েক মাস ধরে নানা ধরনের পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তারপরও টুলটি মেটার এপিআই ব্যবহারের ওপর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রেট-লিমিটিং বা কোনো এপিআই থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতগুলো তথ্য বা অনুরোধ নেওয়া যাবে, তার সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া। শুধু এপিআই ব্যবহার করে আরবিটার একসঙ্গে নির্দিষ্ট সংখ্যকের বেশি পোস্ট সংগ্রহ করতে পারে না।

মেহতা বলেন, তথ্যে প্রবেশাধিকার বাড়াতে তিনি তৃতীয় পক্ষের তথ্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে। সেবার শর্ত লঙ্ঘন না করে কীভাবে প্রকাশ্য তথ্য সংগ্রহ করা যায়, সে জন্য তারা কিছু বিশেষ সুযোগ খুঁজে বের করছেন। পাশাপাশি, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্যের ওপরও নির্ভর করছেন। তিনি যোগ করেন, শেষের এই পদ্ধতিটি হোয়াটসঅ্যাপে অপতথ্য নিয়ে গবেষণাকারীদের অনেকের কাজ থেকে অনুপ্রাণিত। ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপের মতো এনক্রিপ্টেড বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপের পোস্ট নিয়ে গবেষণা করেছেন এসব গবেষক।

দীর্ঘমেয়াদে মেহতা বলেন, তিনি আরবিটারকে বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন না। এসব প্রতিষ্ঠান যতদিন সহযোগিতা করতে চাইবে, ততদিন তিনি তাদের এপিআইয়ের মাধ্যমে মেটা ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে চান। তবে তিনি জানেন, এই প্রবেশাধিকার সবসময় থাকবে—এমনটা ধরে নেওয়াটা ঠিক নয়।

“অনেক সময় আপনার প্রতিষ্ঠান ছোট থাকতেই এসব প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন তারা আপনাকে অনুমোদন দেয়, কারণ ব্যবস্থাপনার কাছে আপনি তখনও কোনো ধরনের উদ্বেগের কারণ নন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বড় হতে থাকলে আপনার কাজের ধরনও বদলে যায়,” বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপতথ্য নিয়ে গবেষণা করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সেবার শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে বড় ধরনের মামলার মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালে প্ল্যাটফর্ম থেকে তথ্য “স্ক্র্যাপ” করা এবং ব্র্যান্ডওয়াচ নামের তৃতীয় পক্ষের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ টুল যথাযথভাবে ব্যবহার না করার অভিযোগে ডিজিটাল হেট মোকাবিলায় কাজ করা সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেটের (সিসিডিএইচ) বিরুদ্ধে মামলা করে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এক্স। পরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। এই কারণে আরবিটারও সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের বর্তমান এপিআই ব্যবহারের বিকল্প পদ্ধতিগুলোতে কোনো আইনি ঝুঁকি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তারা একদল আইনজীবীর সঙ্গে কাজ করছে।

“গত দুই-তিন বছর ধরে আমরা যে কাজ করছি, সেটি কীভাবে আইনসম্মতভাবে করা যায়, তা খুঁজে বের করার দিকেই আমাদের মূল মনোযোগ ছিল,” মেহতা বলেন।

ক্রাউডট্যাঙ্গলের প্রসঙ্গে মেহতা আরো জানান, আগে যেসব সংবাদকক্ষ ক্রাউডট্যাঙ্গলের ওপর নির্ভর করত, কেবল তাদের সেবা দেওয়ার মধ্যেই আরবিটারের লক্ষ্য সীমাবদ্ধ নয়। তাই মেটার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম ছাড়াও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মজুড়ে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারার সক্ষমতাই আরবিটারের অন্যতম শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য। তাছাড়া ইউটিউব, এক্স ও ফেসবুকে একই সময়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকা কোনো দাবি শনাক্ত করার সক্ষমতা ক্রাউডট্যাঙ্গলের কখনোই ছিল না।

তারপরও আমাদের আলোচনায় বারবার ক্রাউডট্যাঙ্গল বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ফিরে এসেছে। মেহতা বলেন, “ক্রাউডট্যাঙ্গেল এমন কোনো পরিষেবা ছিল না যা চালু রাখাটা বাধ্যতামূলক বা কোনো নিয়মের অধীনে ছিল। প্ল্যাটফর্মগুলো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে যে এটি সামগ্রিকভাবে লাভজনক নয়। তাই এর পরিষেবা বন্ধ করে দিতে পারে।” তবে তিনি উল্লেখ করেন, প্ল্যাটফর্মগুলো যদি এই দায়িত্ব না নেয়, তবে অন্য কারও তা করার সুযোগ থাকা উচিত। “এগুলো হলো জনপরিসরের আলাপচারিতা; আর জনস্বার্থে এই ধরনের কথোপকথন সংগ্রহ করাটা বেআইনি হওয়া উচিত নয়।”

সম্পাদকের নোট: এই প্রতিবেদনটি নিম্যান ল্যাবে প্রথমে প্রকাশিত হয়। তাদের অনুমতি নিয়ে এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে।


Andrew Deck, NiemanLab

অ্যান্ড্রু ডেক নিম্যান ল্যাবের স্টাফ রাইটার। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করেন। আপনার সংবাদকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে কোনো তথ্য বা পরামর্শ থাকলে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে ইমেইল, ব্লুস্কাই অথবা সিগন্যালের ((+1 203-841-6241) মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন।

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

কেউ একবার দরজা খুললেই আমার সামনে একটা সুযোগ আসে: ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে রিকার্দো কালদেরন

যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে আপনাকে তথ্য দেন, তাদের প্রতি আপনার একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা হলো বিষয়টি শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আর প্রায়ই দেখা যায়, নীরব থাকার চেয়ে তথ্যটি প্রকাশ করাই বরং সেই তথ্যদাতাদের অধিক সুরক্ষা দেয়।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

কর্মীর প্রশংসা করুন, দায়িত্ব দিন, ভুলকে স্বাভাবিক ভাবে নিন: অনুসন্ধানী সংবাদ ব্যবস্থাপকের জন্য ১৫ পরামর্শ

সপ্তাহে একটি দিন ‘কোনো মিটিং নয়’—এমন নিয়ম চালু করে দলের সদস্যদের কাজ করার সময় করে দেওয়া খুবই কার্যকর হতে পারে। সপ্তাহে একটি দিন কোনো মিটিং না থাকলে মানুষ সেই কাজগুলো শেষ করার সুযোগ পায়, যেগুলো বিভিন্ন ডেডলাইনের মধ্যে কাজ শেষ করার তাড়া বা একের পর এক মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার কারণে করা হয়ে ওঠে না।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত বা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অনুসন্ধান করবেন কীভাবে, কী বলছেন মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকরা 

সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কেবল আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির (অ্যাক্রেডিটেশন) মাধ্যমেই প্রবেশাধিকার পাওয়া যায় না। বরং স্থানীয়দের আস্থা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং জনগোষ্ঠীর মনোভাব ও গতিবিধি সম্পর্কে বোঝাপড়ার মাধ্যমেই তা নিশ্চিত করতে হয়। সংবাদমাধ্যমের পরিচয়পত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের চেয়েও অনেক সময় এই বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

সংবাদ লেখা হয়, কিন্তু ক্ষত রয়ে যায়: সংঘাত-সহিংসতা নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকরা নীরবে ভোগেন মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে

২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের শুরুর দিনগুলোতে, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রেদওয়ান আহমেদ একদল শরণার্থীর জানাজায় অংশ নেন। যারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় বঙ্গোপসাগরে ডুবে মারা যায়। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী ও শিশু। দাফনের সময় তিনি এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন, মিয়ানমারের সহিংসতায় এক ছেলেকে হারানোর পর যার পরিবারের বাকি সদস্যরাও গভীর সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছেন।