প্রবেশগম্যতা সেটিংস

কার্লোস দাদা গাবো ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠানে কথা বলছেন। ছবি: ডেভিড এস্ট্রাদা।

লেখাপত্র

বিষয়

কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্য বলা: কার্লোস দাদার সাক্ষাৎকার

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

কার্লোস দাদা, বিশ্বজুড়ে সম্মানীয় লাতিন আমেরিকান সাংবাদিক। কিন্তু তিনি নিজের দেশেই সাংবাদিকতা করতে পারেন না।

সালভাদরের সংবাদপত্র এল ফারোর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক দাদা এখন নির্বাসনে। প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের হয়রানির কারণে এল ফারো তাদের প্রধান কার্যালয় কোস্টারিকায় সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। দাদা ও তার সহকর্মীদেরও দেশ ছাড়তে হয়।

একজন প্রতিবেদক হিসেবে দাদা এই দীর্ঘ প্রতিবেদনের মতো অসাধারণ ফিচার লিখেছেন, যেখানে আর্চবিশপ অস্কার রোমেরোর হত্যাকাণ্ডের ওপর নজর দেওয়া হয়েছে। যে হত্যাকাণ্ড ১৯৮০ সালের মার্চে এল সালভাদরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যা দেশটির গৃহযুদ্ধের (১৯৮০–১৯৯২) সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এল ফারোর নেতৃত্বে দাদা অসংখ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার সরকারের দুর্নীতি উন্মোচন করেছে এবং সন্ত্রাসী নেতাদের সঙ্গে তাদের গোপন সমঝোতার বিষয়টি তুলে ধরেছে। যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো গৃহযুদ্ধের পর থেকে সালভাদরের হাজার হাজার নাগরিককে হত্যা করেছে।

এই সাহসী ও কঠোর অনুসন্ধানী কাজ দাদাকে এনে দিয়েছে অসংখ্য স্বীকৃতি। ২০১১ সালে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে মারিয়া মুর্স ক্যাবট পুরস্কার থেকে শুরু করে ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউটের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম হিরো পুরস্কার পর্যন্ত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই কাজের ফলেই তাকে নিজের সরকারের নজরদারির শিকার হতে হয়েছে এবং মৃত্যুর হুমকিও পেতে হয়েছে—যার প্রভাব তার বার্তাকক্ষের অধিকাংশ সদস্যের ওপর পড়েছিল।

কয়েক বছর আগের কথা। একদিন দাদা দেখেন একটি নজরদারি ড্রোন কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে আবার বেরিয়ে যায়। তিনি জানালা খোলা রেখে, সান সালভাদর আগ্নেয়গিরির দিকে তাকিয়ে লিখতে পছন্দ করতেন। প্রায় তিন দশক পর, সেই জানালা থেকে হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে তিনি এখন তার পেশাজীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একদল প্রতিবেদককে নেতৃত্ব দেওয়া, যারা দূর থেকে নিজেদের দেশকে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করছেন।

কার্লোস দাদা, এল ফারোর পরিচালক। ছবি: ভিক্টর পেনা, সৌজন্যে এল ফারো

২০২৬ সালের ৯ মার্চ সোমবার রয়টার্স মেমোরিয়াল লেকচার দিতে অক্সফোর্ডে যান তিনি। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান এটি। অনুষ্ঠানের কয়েক সপ্তাহ আগে আমি তার সঙ্গে কথা বলি এল ফারোর ইতিহাস, এর  প্রতিবেদকদের বিরুদ্ধে হুমকি, এবং অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তারা কীভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন—এসব বিষয় নিয়ে। (সংক্ষিপ্ততা ও স্পষ্টতার জন্য আমাদের এই কথোপকথনটি সংক্ষেপ করা হয়েছে।)

প্রশ্ন: এল ফারো ১৯৯৮ সালে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল সংবাদপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কেন?

কার্লোস দাদা: অনেকে বলেন, এটি ছিল দূরদর্শী ও যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত… কিন্তু আসলে তা নয়। আমার সহকর্মী হোর্হে সিমান এবং আমি নির্বাসন থেকে দেশে ফিরছিলাম। এল সালভাদর তখন গৃহযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসছিল, এবং আমরা মনে করেছিলাম, এই নতুন গণতান্ত্রিক সময়ে ভিন্ন ধরনের সাংবাদিকতা দরকার—যেটা হবে সেই ধরনের, যা হোর্হে এবং আমি অন্য দেশে দেখেছি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রগুলোর প্রতিনিধিরাই আমাদের বলছিলেন, এল সালভাদরে মূলত কী ঘটছে।

কিন্তু কেন আমরা সত্যিকার অর্থে দূরদর্শী ছিলাম না, সেটাই বলি। আমাদের জানা মতে, এল ফারো বিশ্বের মধ্যে ষষ্ঠতম ডিজিটাল সংবাদপত্র এবং লাতিন আমেরিকায় প্রথম। কিন্তু আমরা অনলাইন সংবাদপত্র শুরু করেছিলাম শুধু এই কারণে যে, আমাদের ছাপা সংস্করণ বের করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। বাস্তবে আমরা এতটাই ‘ইচ্ছুক’ ছিলাম যে, আমাদের প্রথম সম্পাদকীয়তেই পাঠকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম—যত দ্রুত সম্ভব আমরা একটি প্রিন্ট সংস্করণ প্রকাশ করব।

প্রশ্ন: এল ফারো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এল সালভাদরের সাংবাদিকতা কেমন ছিল?

কার্লোস দাদা: সাংবাদিকতা তখনও গৃহযুদ্ধের সময়কার পুরোনো অভ্যাসগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল—যেখানে সামরিক রিপোর্ট বা রাজনৈতিক প্রেস রিলিজগুলো হুবহু ছেপে দেওয়া হতো। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বা নতুন কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মতো কোনো সুযোগ ছিল না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বা নতুন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো জায়গা ছিল না। এল ফারো যেসব দীর্ঘ ফিচারের জন্য খ্যাতি লাভ করেছিল, সেই ধরনের কোনো লেখা তখন প্রকাশ পেত না।

তবে অনেক সাংবাদিকই বুঝতে পারছিলেন যে, এখন নতুন ধাঁচের সাংবাদিকতার সময় এসেছে। আমার প্রজন্মের সাংবাদিকরা তখন ধীরে ধীরে অন্যান্য নিউজরুমগুলোকে নেতৃত্ব নেওয়া শুরু করল।

প্রশ্ন: স্পেনও কয়েক বছর আগে একনায়কতন্ত্রের অবসানের পর ঠিক একই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল।

কার্লোস দাদা: এই তুলনাটি বেশ নিখুঁত। সেই সময়ের সেই উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা শুধু সাংবাদিকতায় নয়, পুরো সমাজেই ছড়িয়ে পড়েছিল। এল সালভাদরের অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন—সংস্কৃতি, শিল্পকলা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্যও সেটি ছিল দারুণ একটি সময়…। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা এখন সেই সময়টিকে কেবল একটি স্বল্পকালের অধ্যায় হিসেবে দেখি। আমরা জানি না আগামী কয়েক বছরে বিষয়গুলো কীভাবে বদলাবে। কিন্তু আমরা জানি, আমরা কী রেখে এসেছি: গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সেই বছরগুলোয়।

প্রশ্ন: ওই সময়ে প্রথম বছরে আপনাদের কোন বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে হয়েছিল?

কার্লোস দাদা: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমরা যে ধরনের সাংবাদিকতা করতে চেয়েছিলাম, তা আসলে কীভাবে করতে হয় সেটা শেখা। এল সালভাদরের প্রতিটি প্রজন্মের বিকাশই অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের কারণে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, আর এর ফলেই সেখানে সাংবাদিকতার ধারাবাহিক কোনো দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি। আমাদের কোনো মেন্টর বা দিকনির্দেশক ছিল না, তাই আমাদের ঠেকে ঠেকে শিখতে হয়েছে। তবে আমাদের একটা বড় সুবিধা ছিল: শুরুর দিকে আমাদের লেখা কেউ পড়ত না, তাই ভুল করার মাসুল আমাদের খুব একটা দিতে হয়নি। কিন্তু আমরা সবসময় আমাদের কাজগুলোকে খুব কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতাম—যেন পুরো পৃথিবী আমাদের লেখা পড়ছে।

প্রশ্ন: আপনারা কি এখনও একইভাবে আপনাদের কাজের মূল্যায়ন করেন?

কার্লোস দাদা: অবশ্যই। আমরা একটি সাপ্তাহিক সভার মাধ্যমে এটি করি যা আজ অবধি বজায় রেখেছি। আমরা সবাই মিলে আমাদের ভুলগুলো এবং কোথায় আরও উন্নতির সুযোগ ছিল তা নিয়ে আলোচনা করি; এটি একটি সাংবাদিকতাসুলভ সংলাপে পরিণত হয়, যা আমাদের বিকশিত হতে সাহায্য করেছে।

প্রশ্ন: আমি শুনেছি যে [প্রেসিডেন্ট] নায়িব বুকেলেও রাজনীতিতে আসার আগে এল ফারো কেনার চেষ্টা করেছিলেন

কার্লোস দাদা: কথাটা ঠিক। আমি তাকে এবং তার ব্যবসায়িক অংশীদার পিটার ডুমাসকে চিনতাম। একদিন তারা আমাকে কফি খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। বুকেলা তখন থেকেই রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা করছিলেন, কিন্তু আমি সেটা জানতাম না। তারা আমাকে বলেছিলেন যে, তারা এল ফারোকে ভীষণ পছন্দ করেন এবং এটি কিনে নিতে চান। আমি তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলাম যে, এল ফারো বিক্রির জন্য নয়।

তারা দুজনেই আমাকে খুব উদারভাবে বলেছিলেন যে, পত্রিকার নিউজরুম বা সম্পাদকীয় পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই এবং আমি সম্পাদক হিসেবেই থাকতে পারব। তারা কেবল কোম্পানির ৫১% শেয়ার কিনতে চেয়েছিলেন। আমি তাদের এই উদারতার জন্য ধন্যবাদ জানাই এবং স্রেফ প্রসঙ্গ বদলে ফেলি। সেই ডুমাস এখন দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান এবং এল ফারোর ডজন ডজন সাংবাদিকের ওপর নজরদারি চালানোর জন্য তিনিই দায়ী।

প্রশ্ন: আমি ধারণা করি গত দশকে আপনি নিশ্চয়ই সেই কথোপকথনটি নিয়ে অনেক ভেবেছেন। আপনার কেন মনে হয় বুকেলে এল ফারো কিনতে চেয়েছিলেন?

কার্লোস দাদা: ক্ষমতার ব্যাপারে বুকেলের ধারণা হলো মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা। এল ফারোর তখন থেকেই একটি নির্দিষ্ট মর্যাদা বা সুনাম ছিল। বুকেলে নিজেই বলেছিলেন যে এল সালভাদরে এল ফারোই একমাত্র সংবাদপত্র যা পড়ার যোগ্য। যখন আমি তার কাছে এটি বিক্রি করতে রাজি হলাম না, তখন বুকেলে একটি টেলিভিশন চ্যানেল শুরু করেন। আমি সেই কথোপকথনটি নিয়ে অনেক ভেবেছি। আমার ধারণা হলো, তখনও বুকেলে বুঝতে পেরেছিলেন যে তার রাজনৈতিক প্রচারের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন।

প্রশ্ন: বুকেলে ছিলেন সেই প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে একজন, যিনি টুইটারকে নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি ট্রাম্পের আগেও তিনি এটি শুরু করেন। এই ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থানকে আপনি কীভাবে দেখেছিলেন?

কার্লোস দাদা: বুকেলে যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, মানুষ তাকে এক ঝাপটা সতেজ হাওয়ার মতো মনে করেছিল। দেশটি তখনও সেই পুরোনো রাজনৈতিক অভিজাতদের কবজায় ছিল যারা গৃহযুদ্ধে জড়িত ছিলেন। বুকেলে এমন এক প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন যারা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায় কথা বলত।

২০১৯ সালের বুকেলের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী প্রচারে, তিনি মাত্র দুটি জনসভা করেছেন; বাকি পুরো প্রচারাভিযান তিনি সামাজিক মাধ্যমে চালিয়েছিলেন। দেশের প্রথমসারির একজন বুদ্ধিজীবী বলেছিলেন, “ট্রোলরা ভোট দেয় না,” এবং যুক্তি দিয়েছিলেন যে এই মানুষটি নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারবেন না। আমরা আর কখনও সেই বুদ্ধিজীবীর কথা শুনিনি।

বুকেলে সালভাদরের মানুষদের সম্পর্কে এমন বিষয় জানতেন যা পুরোনো প্রজন্মের রাজনীতিবিদরা জানতেন না। তিনি ২০১৯ সালের নির্বাচনে প্রথম ধাপেই জয়ী হন। তিনি অন্যান্য সব প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন।

প্রশ্ন: যে রাজনীতিবিদের সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে, তার ওপর আপনারা কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ বা প্রতিবেদন তৈরি করেন?

কার্লোস দাদা: দৈনিক সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনে কর্মরত আমাদের সহকর্মীদের তুলনায় আমাদের একটি বাড়তি সুবিধা ছিল। আমরা কখনোই প্রতিদিনকার গতানুগতিক সংবাদের ওপর খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। আমরা কাজ করি দীর্ঘ এবং বিস্তারিত প্রতিবেদন নিয়ে, যে বিষয়গুলো আমরা নিজেরাই অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নিই।

বুকেলের আগমনের পর এটি আমাদের জন্য এক ধরনের আশীর্বাদে পরিণত হয়। কারণ, তার অন্যতম প্রধান কৌশল হলো সংবাদ এজেন্ডা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। যখনই তিনি ছোটখাটো কোনো সমস্যায় পড়েন, তখন তিনি সবার মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে দিতে আরেকটি রাজনৈতিক ঘটনা তৈরি করেন। আমরা খুব দ্রুতই তার এই কৌশলটি ধরে ফেলেছিলাম। বুকেলে যখনই আপনার দৃষ্টি কোনো নির্দিষ্ট দিকে ফেরাতে চান, বুঝতে হবে তিনি আসলে অন্য কোথাও কিছু লুকাচ্ছেন।

প্রশ্ন: এল ফারো বুকেলের অপরাধী গ্যাংগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি অনুসন্ধান করেছে। এই অঞ্চলের অনেক নেতা এটি উপেক্ষা করে বুকেলের ভাষণ নীতি অনুকরণ করেন। এল ফারো বুকেলের সম্পর্কে যা উন্মোচন করেছে এবং জনগণের কাছে তার ভাবমূর্তিএই দুইয়ের মধ্যকার বৈপরীত্যে আপনারা কীভাবে মোকাবিলা করেন?

কার্লোস দাদা: এটি খুবই হতাশাজনক, তবে এটি কাজের অংশ। আমি প্রায়ই বলি যে, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ছিল সাংবাদিকতার জন্য ঘটে যাওয়া সবচেয়ে খারাপ ঘটনা।

প্রশ্ন: কেন?

কার্লোস দাদা: কারণ এটি সবাইকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে, যদি কেউ ভালোভাবে নিজের কাজটুকু করে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু বদলে যাবে—আসলে এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, সাধারণ নিয়ম নয়। সাংবাদিকতা সবসময়ই হতাশাজনক, কিন্তু এল সালভাদরের মতো দেশে এবং বুকেলের মতো ব্যতিক্রমী স্বৈরশাসনের অধীনে এটি আরও বেশি হতাশাজনক।

এল সালভাদরে এখন আর কোনো রাজনৈতিক বিরোধী দল নেই। কারাবরণ, হুমকি বা জবরদস্তির মাধ্যমে সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরগুলোকে একে একে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা একেবারে একা নই, তবে সংখ্যায় আমরা খুব বেশিও নই। আর এই কারণেই অনেক সময় বিষয়গুলো আমাদের অনুকূলে কাজ করে না।

যখন কেউ গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকাশ করে, তখন সেটি জনসমক্ষে বিতর্কের বিষয় হওয়া উচিত এবং জনগণের উচিত সেই তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষমতাশীলদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা। কিন্তু আপনি যখন একটি সুস্থ সমাজে বাস করেন না, যেখানে নাগরিকরা একনায়কতন্ত্র দ্বারা নিপীড়িত, তখন সাংবাদিকতার প্রভাব ঠিক যতটা হওয়া উচিত, ততটা হয় না।

তবে এ কথাও স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ যে, বুকেলে দেশের অনেক এলাকা থেকে অপরাধী চক্র বা গ্যাংদের নির্মূল করেছেন। এটি সত্য এবং সম্ভবত ওইসব এলাকার মানুষের জন্য এটি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। তবে এর জন্য আমরা যে চড়া মূল্য দিচ্ছি এবং যেটিকে একটি অবিসংবাদিত বিজয় হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে তার পেছনের মিথ্যাগুলোকে আড়াল করা উচিত নয়। কিন্তু সত্যি হলো: অনেকগুলো এলাকা আগে অপরাধী গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখন আর তা নেই। আপনি যদি জরিপগুলো দেখেন, তবে এটিই বুকেলের একমাত্র সাফল্য যা এল সালভাদরে তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

ছবি: স্ক্রিনশট, এল ফারো

প্রশ্নআপনারা সাংবাদিকতা দিয়ে যতটা প্রভাব ফেলতে চেয়েছিলেন, ততটা হয়তো হয়নি। কিন্তু এরপরেও কি ছোটখাটো কোনো পরিবর্তন বা প্রভাব আপনার চোখে পড়েছে?

 কার্লোস দাদা: অবশ্যই। ২০২৫ সালের মে মাসে আমরা এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাবটি দেখতে পেয়েছি। আমরা একটি ম্যাগাজিন চালু করার সিদ্ধান্ত নিই। আর সেটার প্রথম সংখ্যাতেই আমরা এল সালভাদরের অন্যতম ভয়ংকর গ্যাং ‘ব্যারিও ১৮’-এর দুজন নেতার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করি। আমরা সচরাচর ভিডিও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি না, কিন্তু এবার সেটা ভিডিওতেই প্রচার করি। সেই দুজন গ্যাং সদস্য ব্যাখ্যা করেন কীভাবে সরকারের সহায়তায় তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।  এবং সমঝোতা চুক্তির খুঁটিনাটিও তারা তুলে ধরেন।

উদাহরণস্বরূপ তারা বলেন, বুকেলের সরকারের কর্মকর্তারা তাদেরকে বলেছিলেন: “যা খুশি করো, কিন্তু আমরা কোনো মৃতদেহ দেখতে চাই না। কোনো মরদেহ নেই, কোনো অপরাধও নেই।”

এই উক্তিটি ভাইরাল হয়ে যায় এবং ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এল সালভাদরের মোট জনসংখ্যা ৬০ লাখ, আর সেই ভিডিওটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ দেখেছিল। এটা ছিল অভাবনীয়! এই প্রথমবার বুকেলে এবং তার দল পুরোপুরি অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়ে। ঘটনাটি এতই বড় এবং এর প্রভাব ক্রমশ এতটাই বিশাল হয়ে ওঠে যে তারা আসলে বুঝতেই পারছিল না পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবে।

প্রশ্ন: তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে?

কার্লোস দাদা: এর আগ পর্যন্ত, অপরাধী গ্যাংগুলোর সঙ্গে তাদের গোপন আঁতাত নিয়ে আমরা যখনই কোনো খবর ছাপাতাম, তারা বলত যে আমরা এসব বানিয়ে বলছি। কিন্তু সেই ভিডিওটির একটা বিষয় কেউ অস্বীকার করতে পারছিল না: আমরা এমন দুজন গ্যাং সদস্যের সঙ্গে কথা বলছিলাম যারা তখন মুক্ত অবস্থায় ঘুরছিল, অথচ তাদের জেলে থাকার কথা ছিল। এই একটি সত্যই তাদের চিরাচরিত অস্বীকার করার কৌশলকে অকেজো করে দিয়েছিল।

প্রশ্ন: এরপর কী ঘটেছিল?

কার্লোস দাদা: দমন-পীড়ন আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে এবং অনেককে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। শুধু এল ফারোর সাংবাদিকরাই নন, আরও অনেক স্বাধীন প্রতিবেদক এবং মানবাধিকার কর্মী দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

তবে আমাদের এই অনুসন্ধানগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বিশাল প্রভাব ফেলে। বুকেলে এবং গ্যাংগুলোর মধ্যকার গোপন চুক্তির একটি অংশ ছিল তাদের শীর্ষ নেতাদের অবৈধভাবে এবং গোপনে মুক্তি দেওয়া। আমরা এল ফারোতে এই মুক্তির বিষয়গুলো তথ্যপ্রমাণসহ তুলে ধরেছিলাম। এরা এমন সব নেতা ছিলেন যাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়ে বিচার করতে চাইছিল। শেষ পর্যন্ত, তাদের মেক্সিকোতে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করা হয়, যেখানে তারা এখনও বিচারের অপেক্ষায় আছেন।

এই গল্পটি এখনও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বুকেলের বন্ধুত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এখন এই মামলাগুলো খারিজ করার অনুরোধ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সংবাদমাধ্যমগুলো এখনও এই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে যাচ্ছে

প্রশ্ন: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বুকেলের কাছ থেকে এল ফারো কঠোর দমনপীড়নের শিকার হয়েছে। ২০১৯ সালের পর থেকে এই দমন কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?

কার্লোস দাদা: ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বুকেলে আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। সেদিন তিনি সৈন্যদের দিয়ে সংসদ ভবন ঘেরাও করে তা দখল করে নিয়েছিলেন। আমরা তার এই কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করি, যার শিরোনাম ছিল— ম্যানেরাস ডি ডিক্টেটর (স্বৈরাচারী আচরণ)।

এরপর থেকে বুকেলে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে আমাদের কাজ তিনি পছন্দ করছেন না। প্রথমত, তারা আমাদের সংবাদ সম্মেলনে আসা নিষিদ্ধ করে এবং একটি যৌন নিপীড়নের মিথ্যা নাটক সাজায় [যা এল ফারো এবং তথাকথিত ভুক্তভোগী উভয়ই জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন]।  এরপর, মহামারীর মধ্যেই বুকেলে জাতীয় টেলিভিশনে আমার ছবি দেখিয়ে আমাকে অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।

এরপর শুরু হলো কর সংক্রান্ত তল্লাশি। আমাদের ভয় ছিল যে সরকার হয়তো

এল ফারো দখল করে নেবে এবং এটিকে ভুয়া খবর ছড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবে। এই কারণেই আমরা কোম্পানিটিকে কোস্টারিকায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এল সালভাদরে আমাদের এখনও সেই কর ফাঁকির মামলাগুলোর মোকাবিলা করতে হচ্ছে, কিন্তু বুকেলে আর এল ফারোকে স্পর্শ করতে পারবেন না, কারণ আমরা এটিকে তার নাগালের বাইরে নিয়ে গেছি।

এরপর একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে: পুলিশ আমাদের বাড়িতে আসে, আমরা দেখি বাইরে লোকজন অপেক্ষা করছে, যেসব ক্যাফেতে আমরা আমাদের সোর্সদের সঙ্গে দেখা করতাম সেখানে অচেনা লোকজন বসে থাকত। ড্রোন উড়ে এসে আমাদের জানালার ভেতরে ঢুকত, এবং পেগাসাস স্পাইওয়্যার দিয়ে আমাদের ওপর নজরদারি চালানো হতো। এল ফারোর ৩০ জন সাংবাদিকের মধ্যে অন্তত ২২ জনের মোবাইল ফোনে দেড় বছর ধরে পেগাসাস স্পাইওয়্যার বসানো ছিল। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটিজেন ল্যাব এই নজরদারিকে ‘পাগলামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই কাজে তারা যে পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে, তা ব্যাখ্যা করা কঠিন।

প্রশ্ন: আপনারা পেগাসাস প্রস্তুতকারী ইসরায়েলি কোম্পানি এনএসও বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন, এবং সেই মামলাটি এখনও আদালতে চলছে, তাই না?

কার্লোস দাদা: হ্যাঁ। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির নাইট ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ইনস্টিটিউটের সহায়তায় আমরা ক্যালিফোর্নিয়ায় এনএসওর বিরুদ্ধে মামলাটি করেছি। পূর্ববর্তী শুনানিতে কোম্পানিটি দাবি করেছে যে তারা কেবল সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যই তাদের সফটওয়্যার বিক্রি করে।

একজন বিচারক মামলাটি খারিজ করে দেন। যুক্তি দিয়ে বলেন যে আমাদের অভিযোগটি ইসরায়েল বা এল সালভাদরে দায়ের করা উচিত। কিন্তু আমাদের আইনজীবীরা একটি আপিল করেছেন, যা এখনও বিচারাধীন। আমাদের জন্য, এই মামলাটি নিজেই একটি বড় বিজয়, কারণ এটি যারা আমাদের আক্রমণ করেছে তাদের রক্ষণাত্মক অবস্থানে নিয়ে গেছে এবং দেখিয়েছে যে আমরা ভয় পেয়ে চুপ করে নেই, বরং প্রতিরোধ করছি। এটি আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: নিকারাগুয়া ভেনেজুয়েলার সাংবাদিকরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের কাছ থেকে কি কিছু শেখার আছে?

কার্লোস দাদা: আমরা নিকারাগুয়া ও ভেনেজুয়েলার সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। তারা নির্বাসনে থেকেও নিজেদের দেশ নিয়ে কীভাবে রিপোর্ট করতে হয়, তা শিখেছেন। আমাদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই আমরা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে চাই এবং সেই শেখার ওপর ভিত্তি করে কাজ করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ একই পরিস্থিতিতে পড়লে আমরা তাদের সঙ্গেও এই অভিজ্ঞতাগুলো ভাগ করে নিতে পারি।

প্রশ্ন: এই মুহূর্তে আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখা?

কার্লোস দাদা: একদমই তাই। আমাদের প্রধান ঝুঁকি হলো—আমরা যেন নির্বাসিতদের জন্যই একটি সংবাদপত্র হয়ে না যাই। এই ঝুঁকি এড়ানোর প্রথম ধাপ হলো এটা স্বীকার করা যে আমাদের দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। যারা সেখানে বসবাস করছেন তাদের জন্য আমাদের কার্যকর ভূমিকা পালন করে যেতে হবে। অন্যথায়, এল ফারোর আর কোনো উদ্দেশ্য থাকে না।

একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাংবাদিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করতে পারে তা হলো সত্য বলা। সত্য একটি ভারী শব্দ। তবে সাংবাদিকতায় সত্য বলতে গেলে এমন একটি পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয় যা আমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনার বাইরের ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারে। যারা নির্বাসিত, তাদের সমস্যা হলো তারা এমন এক দেশে বাস করতে থাকেন যার অস্তিত্ব আসলে আর নেই—অর্থাৎ সেই দেশ, যা তারা পেছনে ফেলে এসেছেন।

প্রশ্ন: এত বেশি পক্ষপাতদুষ্ট এবং কায়েমি স্বার্থান্বেষী কণ্ঠস্বরের মাঝে আপনি এই মানদণ্ডগুলোকে কীভাবে ধরে রাখেন?

কার্লোস দাদা: আমি জানি না এর উত্তর কীভাবে দেব। আমি আত্মতুষ্টিতে ভুগতে চাই না, তবে আমরা এই শাসনব্যবস্থাগুলোর বিরুদ্ধে কোনো জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায়ও নামিনি। আমি বুঝি আমাদের কাজের একটি প্রভাব থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব জায়গায় এটা শুনতে শুনতে আমি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে, কাজের চেয়ে তার প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এমনকি সাংবাদিকতার প্রচলিত সহযোগীরাও এখন এমনটা বলছেন। এমনকি তারাও এখন যুক্তি দিচ্ছেন যে, কাজের চেয়ে তার প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো তারা আমাদের কাজের প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করতে আগ্রহী নন, বরং তারা আমাদের এমন সব ব্যক্তিদের দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চান যারা সাংবাদিকতার নিয়ম কঠোরভাবে মানে না, কিন্তু দ্রুত ও চোখে পড়ার মতো কথা বলতে পারে।

এল ফারোওতে আমরা এখন কোনো অর্থ-সম্পদ ছাড়াই সাংবাদিকতা করছি, কারণ স্বৈরাচারী শাসন আমাদের সব আর্থিক পথ বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা নির্বাসন থেকে সাংবাদিকতা করছি, আর আমাদের কাছে দাবি করা হচ্ছে আমরা যে লড়াই করে কাজগুলো করছি, তার যেন এক বিশাল প্রভাব থাকে। আর যেহেতু আমাদের কাজ সেই প্রভাব ফেলতে পারছে না যা আমাদের কিছু প্রথাগত মিত্ররা দেখতে চান, তাই এখন তারা আমাদের বদলে এমন কাউকে নিয়ে আসতে চান যাদের তারা কনটেন্ট ক্রিয়েটর বলে ডাকেন।

আমি যেমনটা বলেছি, আমি আত্মতুষ্টিতে ভুগতে চাই না। এল ফারোতে আমরা কখনোই নতুন কিছু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পিছপা হইনি। উদাহরণস্বরূপ, টিকটকে ঢুকতে আমরা সময় নিয়েছি। কিন্তু আমি একদল তরুণকে বলেছিলাম: “টিকটকে আমাদের মূল আদর্শ বজায় থাকে এমন একটি প্রকল্প আমাকে দেখাও, তাহলেই আমরা সেখানে অ্যাকাউন্ট খুলব।” আর এই মেধাবী তরুণরা এমন একটি প্রকল্প উপস্থাপন করে, আমার বিশ্বাস তা আমাদের সেই লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করছে।

প্রশ্নগত দুই বছরে লাতিন আমেরিকার সাংবাদিকতা এক বিশাল অর্থ সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। এল ফারোর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে?

কার্লোস দাদা: ইউএসএআইডির তহবিল সংকোচন লাতিন আমেরিকান সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। এল ফারোতে আমাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্রই আমাদের মার্কিন সরকারের কাছ থেকে কোনো অর্থ গ্রহণে নিষেধ করে। কিন্তু এই কাটছাঁট আমাদের পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের অনেক সহকর্মী যারা ইউএসএআইডির অর্থায়ন হারিয়েছেন, তারা অবশিষ্ট কয়েকটি সুযোগের জন্য চেষ্টা করেছেন। এর ফলে হঠাৎ করেই দেখা গেছে যে সম্পদের পরিমাণ কমে গেছে কিন্তু মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।

প্রশ্ন: আপনি প্রায়ই বলেন, আপনার কাজের মধ্যে ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থাকেবর্তমান সময়ের ঘটনার রেকর্ড রাখা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কার্লোস দাদা: সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পৃথিবী যেভাবে চলছে, তাতে মানবজাতি যে কতটা অদূরদর্শী— তা নিয়ে খুব একটা কোনো সন্দেহ নেই। আমরা ভুলে গেছি, এই ফ্যাসিস্ট পপুলিস্ট আন্দোলনগুলো কোথায় পৌঁছায়। আর আমরা এটি ভালোভাবেই জানি, কারণ এগুলো ইতিহাসের বইয়ে স্পষ্ট করে লেখা আছে।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রতিটি যুগ শেষ হয়। এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই যুগ শেষ হওয়ার পরও আমি চাই আমাদের সাংবাদিকতা টিকে থাকুক। এজন্য আমাদের কঠোরভাবে মান বজায় রাখতে হবে এবং প্রতিদিন যে ধরনের অশ্লীল বা তুচ্ছ আলোচনায় আমন্ত্রণ আসে, তাতে না জড়ানো। আমাদের কাজের মান ও মর্যাদা ধরে রাখার এটাই একমাত্র পথ।

প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকরা এখন একটি অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি। তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী হবে?

কার্লোস দাদা: মনে আছে আমাদের শুরুর দিনগুলো, অনুপ্রেরণা খুঁজতে আমরা ক্রমাগত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সাংবাদিকতার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এখন, আমার মনে হয় আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে কাজ করছি।

যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকতা এখন আমাদের অনেকের কাছেই আর অনুপ্রেরণা উৎস হিসেবে থাকছে না। শুধু গাজায় যা ঘটেছে তার জন্য নয়, বরং ট্রাম্পবাদের হুমকির মুখে অনেক সংবাদমাধ্যম যেভাবে আত্মসমর্পণের পথকে বেছে নিয়েছে, তার কারণেও।

এখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকদের কী বলব? আমি তাদের দু’টি জিনিস বলব: প্রথমে, হাল ছাড়বেন না, কারণ আপনাদের প্রয়োজন আছে; তারপর, কোনো ছাড় দেবেন না, কারণ ছাড় দেওয়া হাল ছাড়ার চেয়েও খারাপ।

আমি তাদের আরও বলব: টুইটগুলো লক্ষ্য করুন, তবে অতিরিক্ত নয়, কারণ ট্রাম্পের টুইটগুলো (বুকেলের মতো) প্রায়ই মনোযোগ বিভ্রান্তির জন্য ব্যবহৃত হয়। শেষ পর্যন্ত, আমি তাদের বলব—যা স্বাভাবিক হওয়া উচিত নয়, তা স্বাভাবিক হিসেবে দেখাতে দেবেন না, কারণ এটি এই নেতাদের আরেকটি মূল কৌশল: যা কয়েক বছর আগে আমাদের কাছে কেলেঙ্কারি মনে হতো, তা এখন স্বাভাবিক বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

প্রশ্ন: ইন্টারনেট সাংবাদিকদের যতটুকু দিয়েছে, তার চেয়ে কি বেশি কেড়ে নিয়েছে?

কার্লোস দাদা:  আমি বিশ্বাস করি না যে প্রযুক্তির নিজস্ব কোনো নৈতিকতা আছে। নৈতিকতা নির্ভর করে আমরা কীভাবে এটি ব্যবহার করি এবং কীভাবে একে নিয়ন্ত্রণ করি তার ওপর। ইন্টারনেট মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লবগুলোর একটি। ইন্টারনেট ছাড়া এল ফারো কখনোই জন্ম নিত না। ইন্টারনেট আস্ত গ্রন্থাগারকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে এবং অনেকভাবে আমাদের জীবনকে সহজ করে তুলেছে। সংবাদমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গাজায় কী ঘটছে, তা আমরা এই ইন্টারনেটের কারণেই জানতে পারছি। সমস্যাটা অন্য জায়গায়।

সমস্যা কেবল আমরা কীভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করছি তা নিয়ে নয়, বরং আমরা একে কীভাবে ব্যবহার করতে দিচ্ছি তা নিয়ে। আসল দায় তাদের, যারা এর সব সুযোগ করে দিচ্ছে: একদল হলো যাদের হাতে টাকা আছে—অর্থাৎ বড় বড় টেক কোম্পানির মালিকেরা। আর অন্যদল হলো যাদের হাতে ক্ষমতা আছে—অর্থাৎ সেই সব রাজনীতিবিদ। যারা এই কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেন অথবা ইচ্ছা করেই নিয়ন্ত্রণ করতে চান না।

সমস্যা কেবল আমরা কিভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করি তা নয়, বরং আমরা কিভাবে এটিকে ব্যবহারের সুযোগ দেই, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এটি নির্ভর করে কারা ক্ষমতা রাখে। অর্থনৈতিক ক্ষমতা রাখেন যারা, অর্থাৎ এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মালিকরা। এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা রাখেন যারা, যারা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে বা নিয়ন্ত্রণ করতে অস্বীকার করে। এই কারণগুলোই ইন্টারনেটকে একটি বিষাক্ত বা ক্ষতিকর জায়গায় পরিণত করেছে, যা আমাদের এক ভয়াবহ বৈশ্বিক হাহাকার, বা আক্ষরিক অর্থে শূন্যতাবাদের (নিহিলিজম) দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা একেকজন বিচ্ছিন্ন মানুষে পরিণত হচ্ছি। আর এভাবে বিচ্ছিন্ন থেকে কখনোই একটি উন্নত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।”

সম্পাদকীয় মন্তব্য: মূল সাক্ষাৎকারটি রয়টার্স ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়। তাদের অনুমতি নিয়ে পুনঃপ্রকাশ করা হলো। লেখাটি স্প্যানিশেও পড়তে পারেন।


এডুয়ার্দো সুয়ারেজ রয়টার্স ইনস্টিটিউটের সম্পাদকীয় পরিচালক। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, নিউজলেটার এবং অন্যান্য ডিজিটাল চ্যানেলের দায়িত্বে আছেন।

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

বছরে অর্থপাচার হয় প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, সাংবাদিকরা যেভাবে প্রতিরোধ গড়তে পারে

অর্থপাচারের একদিকে আইনজীবী, প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর অন্যদিকে অর্থপাচারকারী। এদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা রয়েছে। অর্থ পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে যেকোনো চেষ্টা করা হলে, সঙ্গে সঙ্গেই তারা নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

ইরানের স্কুলে বোমা হামলা, যুক্তরাষ্ট্র কেন স্যাটেলাইট ছবিতে গণমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত করেছিল

মার্কিন সরকারের অনুরোধে প্ল্যানেট ল্যাবস মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত স্যাটেলাইট চিত্র গোপন রাখছে।  অন্যদিকে একাধিক সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে টমাহক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী।]

অনুসন্ধান পদ্ধতি সংবাদ ও বিশ্লেষণ

‘মিস্টার নোবডি এগেইনস্ট পুতিন’: অস্কারজয়ী এই তথ্যচিত্র দেখে শিখতে পারেন  ছদ্মবেশী সাংবাদিকতা ও গোপনে তথ্য সংগ্রহের কৌশল

এটা আমি—পাশা তালানকিন। এই মুহূর্তে আমি একদমই জানি না, নিজের জন্য কত বড় ঝামেলা ডেকে আনতে যাচ্ছি।
এভাবেই শুরু হয় অসাধারণ গল্পটি। তিনি রাশিয়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাধারণ একজন শিক্ষক। যিনি পরে হয়ে ওঠেন একজন হুইসেলব্লোয়ার। তিনি ঝুঁকি নিয়ে রুশ স্কুলগুলোর সামরিকীকরণের চিত্র, ক্যামেরাবন্দি করে গোপনে বাইরে পাঠান।

জেন্ডার সংবাদ ও বিশ্লেষণ

পুরুষতান্ত্রিক ধারণা প্রচার কিংবা ইচ্ছাকৃত নারী হত্যা: নারীবিদ্বেষ ও নারী নিপীড়নের ঘটনা অনুসন্ধানে বাধা যেখানে

ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত একজনের মাধ্যমেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদক গ্যাব্রিয়েলা কেলার প্রথম সূত্রের সন্ধান পান। পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর সেই নারী জানান, তার সাবেক সঙ্গী একজন শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলার। যার কাছ থেকে তিনি চরম নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন। ওই নারীর বর্ণনা অনুসারে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও ওই ফুটবলার তাকে অনুসরণ করে বিরক্ত করতো।