প্রবেশগম্যতা সেটিংস

Photo: AP/Pablo Martinez Monsivais

লেখাপত্র

গোপনে আলাপ, আড়ালে নথি বিনিময় এবং সহজে তথ্য সাজাতে যেসব টুল পছন্দ করেন রন নিক্সন 

English

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জগতে রন নিক্সন বেশ পরিচিত নাম। তিনি ২০১৯ সালের শুরুর দিকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসে (এপি) যোগ দেন গ্লোবাল ইনভেস্টিগেশনস এডিটর হিসেবে। তাঁর দায়িত্ব হলো, গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ছয় জন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের একটি দলকে নেতৃত্ব দেয়া। এই অল্প সময়ে ফিলিপাইনের ক্যাথলিক চার্চে যৌন নির্যাতন, ইয়েমেনে কলেরা টিকার জরুরি চালান বাতিল, এবং আফিমে তৈরি ওষুধ বিক্রির জন্য চীনা কোম্পানির কৌশলসহ বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বের হয় তার সম্পাদনায়। আমার প্রিয় টুল সিরিজের এই পর্বে আমরা কথা বলেছি সেই রন নিক্সনের সঙ্গে।

কোভিড-১৯ সংকট শুরুর পর থেকে, বৈশ্বিক এই মহামারি নিয়ে অনুসন্ধানে মনোযোগ দিয়েছে তাঁর দল। গত মাসেও তারা চীনের উহান শহর নিয়ে একটি ডেটা বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। দেখিয়েছেন, কিভাবে লকডাউন ঘোষণার আগে শহরটি থেকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে গেছে লাখো মানুষ

অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপি) গ্লোবাল ইনভেস্টিগেশনস এডিটর রন নিক্সন। ছবি: এপি/পাবলো মার্টিনেজ মোনসিভই

এপিতে যোগ দেওয়ার আগে, রন নিক্সন ১৩ বছর কাজ করেছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসে। সেখানে তিনি শুরু করেছিলেন ডেটা রিপোর্টার হিসেবে। তারপর কাভার করেছেন ব্যবসা-বাণিজ্য, হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মত বিষয়। কাজ করেছেন আফ্রিকার কয়েকটি দেশসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে। এই সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুসন্ধানও করেছেন। আরব বসন্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, মার্কিন ডাকবিভাগে নজরদারির ব্যবস্থা এবং রুয়ান্ডায় এইচআইভি ও এইডস মোকাবিলায় প্রচার অভিযান – তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শেষের প্রতিবেদনটির জন্য তাঁকে নিজ হাতে লেখা শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান আইরিশ রক তারকা বোনো। নিউ ইয়র্ক টাইমসে থাকার সময়, তিনি বর্ণবাদের যুগে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রোপাগান্ডার ওপর একটি বইও লিখেছিলেন, “বর্ণবাদের বেচাকেনা” নামে।

রন নিক্সন, সাংবাদিকতা শুরু করেন আশির দশকের শেষ দিকে। তাঁর প্রথম কর্মস্থল সাপ্তাহিক পত্রিকা সাউথ ক্যারোলাইনা ব্ল্যাক মিডিয়া; আর প্রথম অনুসন্ধান ছিল কৃষ্ণাঙ্গ এক ব্যক্তির ওপর পুলিশের নৃশংসতা নিয়ে। এই প্রতিবেদনের কারণে অনেকগুলো মামলার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে, যার জের ধরে শুরুতেই থমকে যেতে বসেছিল অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্যারিয়ার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পাদক বলেছিলেন কাজ চালিয়ে যেতে।

পরে তিনি রিপোর্টার ও এডিটর হিসেবে কাজ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন এক্সপোজার ম্যাগাজিনে। অনুসন্ধান করেন শিশুশ্রম, আফ্রিকান-আমেরিকান কমিউনিটির চার্চে আগুন, পরিবেশ নীতিতে বৈষম্য – এমন সব বিষয় নিয়ে। এরপর ভার্জিনিয়ায় রোয়োনোক টাইমসে গিয়ে তিনি অনুসন্ধান করেন, খনিতে কাজ করা শ্রমিকদের ব্ল্যাক-লাং (দূষণে শ্বাস নিয়ে কালো হয়ে যাওয়া ফুসফুস) রোগে ভোগার তথ্য জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখার সরকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে। ২০০০-এর শুরুতে মিনিয়াপোলিস স্টার ট্রিবিউনে কাজ করার সময়, নিক্সন হয়ে ওঠেন ডেটাভিত্তিক রিপোর্টিংয়ের অগ্রদূত। তখন বিষয়টি পরিচিত ছিল “কম্পিউটার অ্যাসিসটেড রিপোর্টিং” হিসেবে।

ওয়াশিংটন ডিসির হাওয়ার্ড এবং জোহানেসবার্গের উইটওয়াটারস্ট্রান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন নিক্সন। ১৯৮০-র দশকের শেষে ও ৯০-এর দশকের শুরুতে কিছু সময়ের জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীতেও কাজ করেছেন তিনি। এমনকি অংশ নিয়েছিলেন উপসাগরীয় যুদ্ধেও।

এখানে থাকছে তাঁর কিছু প্রিয় টুলের কথা:

অনিয়নশেয়ার

“অ্যানোনিমাস ওয়েব ব্রাউজার, টরের মাধ্যমে ফাইল আদানপ্রদানের নিরাপদ টুল, অনিয়নশেয়ার। এডওয়ার্ড স্নোডেন যেভাবে তথ্য ফাঁস করেছিলেন, সেরকম পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট, কম্পিউটার-টু-কম্পিউটার পদ্ধতিতে এটি তথ্য আদানপ্রদান করে। ঠিকমত তথ্য পাঠানোর জন্য প্রেরক ও গ্রাহক; দুই পক্ষকেই একই সময় তাদের কম্পিউটারের সামনে থাকতে হয়। কারো কম্পিউটার স্ক্রিন কালো হয়ে গেলে তথ্য পাঠানোও বন্ধ হয়ে যাবে।

 

“চীন বা নজরদারি হতে পারে এমন কোনো জায়গায় থাকা রিপোর্টারের সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদানের সময় আমি এটি ব্যবহার করি। এর মাধ্যমে ভিডিও, ডকুমেন্ট বা অন্য যেকোনো ফাইল পাঠানো যায়। চীনে আফিমের বিস্তার নিয়ে অনুসন্ধানের সময় আমরা অনিয়নশেয়ার ব্যবহার করে অনেক তথ্য আদানপ্রদান করেছি।

“ফোটনমেইল বা কোনো এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ কোম্পানিকেই আমি শতভাগ বিশ্বাস করি না। অনিয়নশেয়ারে, কোনো তৃতীয় পক্ষ জড়িত থাকে না। এখানে কেউ কোনো ফাইল পাঠানো শেষ হওয়া মাত্রই লিংকটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অনলাইনে কিছুই জমা হয় না। এছাড়াও এই যোগাযোগের পুরোটিই থাকে এনক্রিপ্টেড অবস্থায়। ফলে কেউ যদি নজরও রাখে, বুঝতে পারবে না, কী ধরনের ফাইল আদানপ্রদান হচ্ছে।

“চীনে আছেন, এমন কারো সঙ্গে সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে যোগাযোগের সময় আপনাকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। আমি এক্ষেত্রে কোনো সুযোগই নিতে চাই না। এমনকি ‘হাই, কেমন আছো?’ ধরনের ইমেইলও আমরা এনক্রিপ্ট করি। সব মিলিয়ে এসব ক্ষেত্রে অনিয়নশেয়ার আমাদের দারুন কাজে লাগে।

হাশড

“হাশড এমন এক অ্যাপ্লিকেশন যার মাধ্যমে আপনি নতুন নতুন ফোন নম্বর ব্যবহার করে কল করতে পারবেন। এই নম্বর দিয়ে কথা বলা ও ম্যাসেজ পাঠানো; দুই-ই করা যায়। এটি এনক্রিপ্টেডও বটে।

“যে কোনো সময় আপনি একটি ফোন নম্বর ফেলে দিতে পারেন এবং নতুন একটি নম্বর নিতে পারেন। কোনো সোর্সের যদি আমার সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হয়, তাহলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে অস্থায়ী একটি নম্বর চালু করি। নম্বরটি ফোনে খুঁজেও পেলেও, সেটি দিয়ে এপির একজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তা কারো পক্ষেই সনাক্ত করা সম্ভব হবে না। কখনো কখনো আমি একটি নম্বর একবারই ব্যবহার করি। কখনো কয়েকবার। কিন্তু কখনোই এক সপ্তাহের বেশি একটি নম্বর ব্যবহার করি না। কারণ তেমনটি করলে নম্বরটি সনাক্ত করে ফেলার শঙ্কা থাকে।

ফেলে দেওয়া যায় এমন নম্বর ব্যবহার করে কল করার সুবিধা দেয় হাশড।

“আমার রিপোর্টাররা কোথায় আছে, তার ওপর নির্ভর করে আমি এটি ব্যবহার করি। যেমন গত বছর আমাদের এক রিপোর্টার ছিল ইউক্রেনে। তার সঙ্গে কথা বলার সময় আমরা এটি ব্যবহার করেছি। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম না, আমাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে কিনা। প্রত্যেকবার কথা বলার সময় একটি নতুন নম্বর ব্যবহার করার অর্থ হলো: কেউ যদি এই ব্যক্তির কর্মকাণ্ড অনুসরণও করে, তারপরও জানতে পারবে না যে, তিনি ওয়াশিংটনে একজন সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেছেন। ফোনে এই ধরনের যোগাযোগে আড়ি পাতাটাও অনেক কঠিন হয়ে যায়।

“এই ধরনের এনক্রিপ্টেড কলের ক্ষেত্রে, আপনি নম্বরটি দেখতে পারবেন। সেটি লুকানোর কোনো ‍উপায় নেই। এই অ্যাপটি যা করে, তা হলো: একটি নম্বর তৈরি করে যেটি কোনো কিছুর সঙ্গেই সম্পর্কিত নয়। এবং ব্যবহারের পর এটির আর কোনো কার্যকরিতা থাকে না। এটি ব্যবহার করাও খুব সহজ। অ্যাপ স্টোর থেকে ডাউনলোড করতে হবে এবং যে নম্বর যখন ব্যবহার করবেন তার জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হবে। আপনি এখান থেকে যত ইচ্ছে তত নম্বর ব্যবহার করতে পারেন।

“সোর্সের সঙ্গে এরকম ব্যবস্থায় যোগাযোগ করলে সেটি এই সম্পর্কে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করে। পরিচয় গোপন রাখার জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে দেখার পর মানুষ আপনার সঙ্গে আরো বেশি করে কথা বলতে চাইবে। কখনো কখনো সোর্সকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে হবে আপনাকেই। কখনো আবার সোর্সের কাছ থেকেই আপনি অনেক কিছু শিখতে পারবেন।”

এয়ার-গ্যাপড কম্পিউটার ও প্রিন্টার

“এয়ার-গ্যাপড কম্পিউটার হচ্ছে এমন একটি কম্পিউটার যেটি কোনোভাবেই ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। কোনো ফাইল কোথা থেকে এসেছে তা নিশ্চিত হতে না পারলে, আমরাই সেসব ফাইল খোলার জন্য এমন কম্পিউটার ব্যবহার করি। আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না, এমন কোনো ফাইল দিয়ে গোটা নিউজরুমের কম্পিউটার ব্যবস্থা আক্রান্ত হোক।

“আমাদের কিছু কম্পিউটার আছে যেগুলো কোনোভাবেই ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। অপরিচিত জায়গা থেকে আসা তথ্য দেখার জন্য আমরা এগুলো ব্যবহার করি। ধরুন একটা ফ্ল্যাশ ড্রাইভ পেলাম, কিন্তু আমরা কখনোই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কোনো কম্পিউটারে এটি ব্যবহার করব না। আমরা এটি ওপেন করব এয়ার গ্যাপড কম্পিউটারে। যদি ফ্ল্যাশ ড্রাইভটি কম্পিউটারকে ভাইরাস আক্রান্ত করে, তাহলে সেখানে সব কিছু মুছে দিয়ে আবার নতুন করে ইন্সটল করা হবে। কিন্তু এতে পুরো নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ফলে শুরুতেই আমরা এমন এয়ার গ্যাপড কম্পিউটারে সেটি ভালোমতো পরীক্ষা করে দেখি, যে তাতে ক্ষতিকর কোনো উপাদান আছে কিনা। যদি না থাকে তাহলেই কেবল সেটি নেটওয়ার্কে সংযুক্ত কম্পিউটারে ব্যবহার করা হয়।

“পরিচয় গোপন রাখার জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে দেখার পর মানুষ আপনার সঙ্গে আরো বেশি করে কথা বলতে চাইবে। কখনো কখনো সোর্সকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে হবে আপনাকেই। কখনো আবার সোর্সের কাছ থেকেই আপনি অনেক কিছু শিখতে পারবেন।”

“আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীগুলো এরকমই করে। মার্কিন বাহিনীতে কাজ করার সময় আমি এয়ার গ্যাপড কম্পিউটারের ব্যবহার দেখেছি। খুবই সংবেদনশীল জিনিসপত্রের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হতো। আমি এপিতে আসার আগে থেকেই এমন চর্চা জারি ছিল, কিন্তু একটি বা দুটি খুবই পুরোনো কম্পিউটারে। আমি এসে, আধুনিকায়ন করেছি, কম্পিউটার বাড়িয়েছি এবং আমার অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করেছি।

“আমাদের একটি এয়ার-গ্যাপড প্রিন্টারও আছে। এটিও ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। আমরা যখন কোনো তথ্য বা নথিপত্র ইলেকট্রনিক মাধ্যমে পাই, তখন সাধারণত সেগুলো প্রিন্ট করা হয় এই প্রিন্টার থেকে। তারপর আমরা সেগুলো বিশ্লেষণ করি। আমরা এমন কোনো মেটাডেটা রাখি না যার মাধ্যমে বোঝা যেতে পারে যে, এটি কোথা থেকে পাঠানো হয়েছে। সেগুলো আমরা প্রিন্ট করে ফেলি। রিয়েলিটি উইনার [গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ]-এর ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছিল, তেমনটি যেন আর না হয় তা নিশ্চিত করতেই আমরা এসব ব্যবস্থা নিয়েছি। রিয়েলিটি উইনার, ইন্টারসেপ্টের কাছে কিছু তথ্য ফাঁস করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। পরবর্তীতে মেটাডেটার সন্ধান করে এফবিআই একটি নির্দিষ্ট প্রিন্টারের সন্ধান পেয়েছিল এবং শেষপর্যন্ত তাঁকেও খুঁজে পেয়েছিল।”

পান্ডাস

“পান্ডাস, পাইথন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের একটি অংশ। বেশ কয়েকটি কারণে এটি আমার খুব প্রিয়। কারণ এখানে আপনি ডেটা বিশ্লেষণ, ওয়েব স্ক্র্যাপিং, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ ও গ্রাফিক্স; সব কিছু এক জায়গায় করতে পারবেন। পান্ডাস না থাকলে আপনাকে কয়েকটি ধাপে কাজগুলো করতে হবে। যেমন ডেটা বিশ্লেষণের জন্য প্রথমে ডেটাবেজ ব্যবহার করতে হবে, তারপর সেই ডেটা স্প্রেডশিটে এনে করতে হবে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ, তারপর সেগুলো নিয়ে যেতে হবে কোনো ভিজ্যুয়াল প্রোগ্রামে। কিন্তু পান্ডা দিয়ে এই সবকিছু আমি এক জায়গাতেই করতে পারি। আমার যদি ওয়েবসাইট থেকে ডেটা তুলে আনা (স্ক্রাপিং) দরকার হয়, তাহলে শুধু পান্ডাসে একটি স্ক্রিপ্ট লিখতে হবে। এরপর আমি পান্ডাস লাইব্রেরিতে জমা হওয়া সেসব ডেটা তুলে আনব পাইথনে, এবং সেটি একই জায়গায় বিশ্লেষণ করতে পারব। অন্য কোথাও যেতে হবে না।

 

“এখানে কোনো ডেটা সীমাবদ্ধতাও নেই। নির্দিষ্ট পরিমাণ ডেটা জমা হওয়ার পর কিছু কিছু সফটওয়্যারের গতি কমতে শুরু করে। কিন্তু পান্ডাস তৈরি করা হয়েছে একটি প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে। ফলে সবকিছু এখানেই পাওয়া যায়। উইন্ডোজ বা ম্যাক; যে কোনো অপারেটিং সিস্টেমেই আমি এটি চালাতে পারি।

“পান্ডাস, প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে থাকা একটি ফাংশন মাত্র। পাইথনে এমন আরো অনেক ফাংশন আছে, যেগুলো দিয়ে আপনি বিভিন্ন কাজ করতে পারবেন। এটি অনেকটা আর-এর মতোই। তবে আমার কাছে আরকে অনেক বেশি ক্রিপটিক মনে হয়। যদিও এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত। কারণ আমি নিজে অনেক বছর পাইথন নিয়েই কাজ করেছি।

“দক্ষ-কর্মীদের জন্য ভিসা কর্মসূচি বন্ধ করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইচ্ছা নিয়ে তিন বছর আগে একটি রিপোর্ট করেছিলাম। তখন মার্কিন শ্রম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে পাইথনের মাধ্যমে অনেক ডেটা ডাউনলোড করি। তারপর সেগুলো বিশ্লেষণ করি পান্ডার সাহায্যে। এই ডেটাগুলো অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু প্রতি বছর ফরম্যাট বদল হওয়ার কারণে সব ডেটা “ক্লিন” করে নিতে হচ্ছিল। এই ধরনের সব কাজ, পাইথন দিয়ে একই জায়গায় করতে পারাটা দারুন ব্যাপার। আমি ডেটা নিব, পরিস্কার ও বিশ্লেষণ করব এবং প্রয়োজনীয় ডেটাগুলো আলাদা করে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির কাজে হাত দিব। এই প্রক্রিয়ায় সব কাজই খুব দ্রুত সেরে ফেলা যায়।”

ফটো ইনভেস্টিগেটর

“কোনো ছবির পেছনে থাকা মেটাডেটা খুঁজে পাওয়ার জন্য আমরা ফটো ইনভেস্টিগেটর ব্যবহার করি। বছরখানেক আগে, আমরা ভেনেজুয়েলার এক সোর্সের কাছ থেকে কিছু নথিপত্রের ছবি পাই এবং তার সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করি। কারণ সত্যিকারের নথি পাঠানোর বদলে তিনি পাঠিয়েছিলেন সেগুলোর ছবি। ছবিগুলো কোথায় তোলা হয়েছে, তিনি আমাদের যে সময়ে বলেছিলেন সেই সময়েই ছবিগুলো তোলা হয়েছিল কিনা, কোন ফোন দিয়ে সেগুলো তোলা হয়েছিল – এমন নানা মেটাডেটা আমরা দেখতে পেয়েছিলাম এই অ্যাপের সাহায্যে। মেটাডেটা থেকে এরকম অনেক কিছু বিস্তারিত জানা যায়। কোন ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়েছে, শাটার স্পিড, জিওলোকেশন, এমন সব কিছু। সোর্সের দাবির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এটি খুবই উপকারী একটি টুল।

ফটো ইনভেস্টিগেটর ব্যবহার করে খুঁজে পাওয়া যায় কোনো ছবির পেছনে থাকা মেটাডেটা।

“শেষপর্যন্ত আমরা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করিনি। নথিগুলো সঠিক ছিল। কিন্তু আমরা সেটি পেয়েছিলাম শুধু একটি সূত্র থেকে। একক সূত্রের ওপর ভিত্তি করে এত সংবেদনশীল প্রতিবেদন প্রকাশ করা যায় না। এখান থেকে এই উপলব্ধি জরুরি: শুধু মেটাডেটা থেকে আপনি সবকিছু পাবেন না। এটি আপনাকে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পথে এক ধাপ এগিয়ে দিতে পারে মাত্র। এমনকি অন্য কোনো সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার আগপর্যন্ত শুধু মেটাডেটায় দেখা তথ্যে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করব না। এরকম অনেক সম্পাদকীয় মানদণ্ড আপনাকে অনুসরণ করতে হবে।

“এই টুল দিয়ে যে কাজটি আপনি খুব ভালোমতো করতে পারবেন, তা হলো: ছবিতে কোনো রকমের বিকৃতি বা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে কিনা, তা সনাক্ত করা। দেখা গেল, কেউ আমাকে একটি নথি দিয়ে বলল এটি ১৪ বছরের পুরোনো। কিন্তু আমি মেটাডেটা ঘেঁটে দেখলাম এটি আসলে গত সপ্তাহে তৈরি করা হয়েছে। তাহলে বুঝতে হবে কোনো গোলমাল আছে। একইভাবে, যদি দেখি কোনো ফাইল ২০১৪ সালে তৈরি করা হলেও গতকাল মোডিফাই করা হয়েছে, তাহলে আমার সন্দেহ জাগবে। আমি নিজেকেই জিজ্ঞাসা করব: ‘হয়েছেটা কী এখানে?’ আমি সব ধরণের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি এবং এই ফটো ইনভেস্টিগেটর দিয়ে প্রকৃত ঘটনা সনাক্ত করতে পেরেছি।”

তথ্য অধিকার, ন্যাশনাল আর্কাইভ ও লবিং তথ্য

“আমরা সবসময়ই তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করি; শুধু রক্ষণাত্মকভাবে নয়, আক্রমণাত্মকভাবেও। সংবাদে আসার আগেই বিভিন্ন জিনিসের খোঁজ শুরু করি। যেমন, যদি কোনো বোয়িং বিমান দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে আমরা ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টেশন বা ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বরাবর তথ্যের জন্য আবেদন করতে শুরু করি। এমন নথির জন্যও আবেদন পাঠাতে থাকি, যা ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে (যেমন, নীতিমালা বা বাজেট)।

“শুধু মেটাডেটা থেকে আপনি সবকিছু পাবেন না। এটি আপনাকে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পথে এক ধাপ এগিয়ে দিতে পারে মাত্র। এমনকি অন্য কোনো সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার আগপর্যন্ত শুধু মেটাডেটায় দেখা তথ্যে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করব না।”

“আমরা প্রথমে সনাক্ত করি, কোন কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করতে হবে। কারণ আমরা জানি, আমাদের যা দরকার তা পেতে লম্বা সময় লাগবে। উত্তর পেতে কত দিন লাগবে, তা নির্ভর করে আবেদন কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে করা হচ্ছে, তার ওপর। কিছু কিছু সরকারী প্রতিষ্ঠানে খুব দ্রুত হয়ে যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য পেতে দেরি হয়। তবে সময় লাগবে, ধরে নিয়েই আপনাকে পরিকল্পনা করতে হবে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যেসব কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান; দুই জায়গাতেই ব্যবসা করছে, তাদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন করতে গিয়ে আমি কিছু তথ্যের আবেদন করেছিলাম। সেটা পেতে আমার তিন বছর সময় লেগেছে। আমরা প্রতিবেদনে যেসব তথ্য ব্যবহার করেছি তা অনেকগুলো সূত্র থেকে এসেছিল। এর মধ্যে অনেক কিছুই পাওয়া গিয়েছিল এই তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের মাধ্যমে। ইরানে কাজ করার অনুমতি দিয়ে কোন কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, তা জানার জন্য আমরা আবেদন করেছিলাম অফিস অব ফরেন অ্যাসেট কন্ট্রোলে। কিন্তু তারা দেয়নি। পরে আমরা মামলা করি এবং শেষপর্যন্ত নথিগুলো পেয়ে যাই।

“তথ্যের জন্য আবেদন শুরুর আগে আমি রিপোর্টিংয়ের অনেক কাজ সেরে রাখি। এবং যখন আবেদন জমা দেওয়ার সময় আসে তখন বলতে পারি, ‘আমি এই নির্দিষ্ট কাঠামোতে সাজানো অবস্থায়, এই এই তথ্য চাই।’ ফলে আমি কী চাইছি, সে ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতা থাকে না। কর্তৃপক্ষ যেন কোনো অজুহাত দেখিয়ে সরে পড়তে না পারে, সেজন্য আপনার উচিৎ আগে থেকেই যতটা সম্ভব রিপোর্টিং সেরে ফেলা।

আমি একবার মার্কিন কংগ্রেস থেকে কিছু তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কংগ্রেস তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পড়ে না। কিন্তু তারা বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং এই যোগাযোগগুলোর নথি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে শুধু একের পর এক আবেদন না পাঠিয়ে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক কৌশল ঠিক করে নেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।

 

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ফ্রান্সেও আমি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য চেয়ে আবেদন করেছি। দক্ষিণ আফ্রিকার তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগ করা তুলনামূলক সহজ এবং এটি কিছু দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক ভালো। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকায় আপনি এমন বেসরকারী কোম্পানির তথ্যের জন্যও আবেদন করতে পারবেন, যাদের কর্মকাণ্ড জনপরিসরে প্রভাব ফেলে। যেমন কোনো কোম্পানি যদি পানি দূষণ করে তাহলে আপনি সেই কোম্পানির তথ্য চেয়ে আবেদন করতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রে আপনি এটি করতে পারবেন না।

“আমার বইয়ের (“বর্ণবাদের বেচাকেনা”) কাজ করতে গিয়ে আমি অনেক ন্যাশনাল আর্কাইভ ও তদবির সংক্রান্ত কাগজপত্রও ঘেঁটেছি। গবেষণা শুরুর সময় আমার মাথায় নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না। যুক্তরাজ্যের আর্কাইভের ক্ষেত্রে, আমি জানতে চাচ্ছিলাম, বর্ণবৈষম্যের বছরগুলোতে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক কেমন ছিল। এজন্য আমি দেখছিলাম সরকারের দক্ষিণ আফ্রিকা সংক্রান্ত নীতিমালা নিয়ে নানা নথিপত্র, যেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত; সব জায়গার নথিপত্রই আমি দেখেছি।

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, উন্মুক্ত করে দেওয়া নথিপত্র পাওয়ার একটি দারুন সোর্স ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ। এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয় বিভিন্ন নথিপত্র উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য এবং যেগুলো ইতিমধ্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোও তারা সংগ্রহ করে রাখে। দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকারের মধ্যে যেসব কূটনৈতিক বার্তা চালাচালি হয়েছে, সেগুলো আমি পেয়েছিলাম এই ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের মাধ্যমে।

“লবিং সংক্রান্ত নানা নথিপত্রও হতে পারে তথ্যের ভাণ্ডার। আর এগুলো প্রায়ই সবার জন্য উন্মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ তদবিরগুলোর রেকর্ড রাখে অফিস অব কংগ্রেসের আর্কাইভ আর বিদেশী সরকারের কাছে করা তদবিরগুলোর রেকর্ড রাখে ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস। এগুলো শুধু ইতিহাসবিদদেরই আগ্রহের বিষয় নয়। নানাবিধ অনুসন্ধানের জন্য সাংবাদিকদেরও অনেক কাজে আসতে পারে।”

অলিভিয়ের হোমি একজন ফরাসী-ব্রিটিশ সাংবাদিক ও অনুবাদক। থাকেন লন্ডনে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় বিনিয়োগ নিয়ে তার অনুসন্ধান ছাপা হয়েছে ইউরোমানি ম্যাগাজিনে। আর দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার জন্য লিখেছেন অবিচুয়ারি।

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

স্বাস্থ্য নিয়ে ভুয়া তথ্য – অপতথ্য, অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা কীভাবে লড়তে পারেন

প্রতি বছর বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী কেবল চারটি শিল্প প্রতিষ্ঠান। অথচ তাদের ব্যাপারে প্রতিবেদন নেই বললেই চলে। আপনি যদি কিছু খুঁজে পান, আর তা ভুক্তভোগী সম্প্রদায়, নীতিনির্ধারক, কর্মকর্তা কিংবা মন্ত্রীদের সামনে তুলে না ধরেন, তাহলে কাজটি আপনি কেন করছেন?

Recorder panel at IJF24

তহবিল সংগ্রহ পদ্ধতি পরামর্শ ও টুল

স্বাধীন নিউজরুমের আয়ের মডেল কী হতে পারে? 

অল্প বয়সী দর্শকদের কাছে যেন গ্রহণযোগ্য হয়— রেকর্ডারের তরুণ কর্মীরা ঠিক তেমনভাবে তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে। পাঠকের পয়সা দিয়েই আয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তারা।

IJF24 Reframing Visual Journalism AI Deepfake

পদ্ধতি পরামর্শ ও টুল

ডিপফেকের যুগে ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতা: সত্য যাচাই ও আস্থা অর্জন

ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতা এখন তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এগুলো হলো সিন্থেটিক কনটেন্টের “উত্তাল সমুদ্রে” মৌলিক বিষয়বস্তু শনাক্ত; জনগণের আস্থা ধরে রাখা; এবং “প্রকৃত ছবি” দিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

environmental spill ocean liquid natural gas terminal

পরামর্শ ও টুল সংবাদ ও বিশ্লেষণ

কীভাবে খুঁজবেন, পরিবেশের ক্ষতির পেছনে কে বা কারা জড়িত?

পরিবেশ সম্পর্কিত যে কোন অবৈধ কাজের সঙ্গে অনেক বেশি আর্থিক সংশ্লেষ থাকে। আর তা উন্মোচনের জন্য নিবিড়ভাবে জানতে হয় বিভিন্ন অঞ্চল, আর সেখানকার আইন কানুন, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরিতে কিছু কৌশল সাংবাদিকদের সাহায্য করতে পারে।