ছবি: শাটারস্টক
এই নিবন্ধটি ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন: গাইড ফর জার্নালিস্টস অ্যান্ড নিউজরুমস থেকে নেওয়া। গাইডটি প্রকাশ করেছে ইনস্টিটিউট তালানোয়া—ব্রাজিলভিত্তিক একটি থিংক ট্যাঙ্ক, যারা জলবায়ু রাজনীতি নিয়ে কাজ করে।
১. অভিযোজন শুধু তাদের জন্য, যারা প্রশমনের প্রচেষ্টা ছেড়ে দিয়েছে।
অভিযোজন কখনোই প্রশমনের বিকল্প নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ঠেকাতে কার্বন নিঃসরণ কমানো অপরিহার্য। আমরা যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে সফলও হই, তারপরও আমাদের আরো বেশি মাত্রায় বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
এই কারণেই একসঙ্গে দুটি কৌশলই প্রয়োজন: সমস্যার লাগাম টেনে ধরার জন্য প্রয়োজন প্রশমন। আর এরইমধ্যে অনিবার্য হয়ে পড়া প্রভাব মোকাবিলার জন্য অভিযোজন। তাছাড়া, প্রশমন নিজেই অভিযোজনের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহের কারণে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের চাহিদা এত বেড়ে যায় যে তা বৈশ্বিক বিদ্যুৎ খাতে নির্গমন বৃদ্ধির প্রায় ৫০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল (আইইএ)। চরম গরমের জন্য প্রস্তুত নয় এমন বিদ্যুৎ গ্রিড এবং দক্ষ কুলিং ব্যবস্থা ছাড়া প্রশমনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্জনগুলোও নষ্ট হয়ে যায়। একই বিষয় সড়ক, বন্দর এবং আবাসনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এগুলো যদি সহনশীল না হয়, তাহলে জ্বালানি রূপান্তর দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়ে। টেকসই হতে পারে না। আমাদের পৃথিবী এরইমধ্যে উষ্ণ হয়ে উঠেছে, সেখানে অভিযোজন কোনো আত্মসমর্পণ, পরাজয় বা হতাশ হওয়ার বিষয় নয়, বরং প্রশমন সফলতার পূর্বশর্ত।
২. আমরা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারি।
অভিযোজনের নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। বর্তমান উষ্ণতা যখন প্রায় ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি, তখন অনেক জায়গায় সে মাত্রা অতিক্রম হতে শুরু হয়েছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সামুদ্রিক প্রবাল প্রাচীরগুলো টিকে থাকতে পারছে না, দীর্ঘ খরায় ফসল নষ্ট হচ্ছে, আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ভূমি হারাচ্ছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকারী প্যানেলের (আইপিসিসি) মতে, তাপমাত্রা যত সামান্যই বৃদ্ধি পাক না কেন, তা অভিযোজন ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে ততটাই কমিয়ে দেয়। কিছু পরিস্থিতিতে অভিযোজন বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার বিপরীতে দ্রুত ও ব্যাপক আকারে পদক্ষেপ নিলে ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব। ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। আর কিছু সীমা অতিক্রম করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরপরের পর্যায়ে অভিযোজনের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসে—৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার বিশ্বে কোনো অবকাঠামো, প্রযুক্তি বা আর্থিক সক্ষমতাই বড় ধরনের মানবিক সংকট এবং অপরিবর্তনীয় ক্ষতি ঠেকাতে পারে না।
অভিযোজনের মাত্রা তাই অনন্ত বা সীমাহীন নয়। ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আমরা কিছু প্রভাব মোকাবিলা করতে পারি। ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এর বাইরে গেলে ক্ষতির পরিমাণ কেবল বাড়তেই থাকে।
৩. অভিযোজন মানেই কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত রাখা আর জ্বালানি রূপান্তর বিলম্বিত করার ছাড়পত্র নয়।
অভিযোজনের নির্দিষ্ট সীমা আছে এবং এটিকে কখনোই তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা দীর্ঘায়িত করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। আইপিসিসি দেখিয়েছে, ৩ ডিগ্রি বা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার বিশ্বে কোনো মাত্রার অভিযোজনই যথেষ্ট নয়।
অভিযোজনকে “জীবাশ্ম জ্বালানির লাইসেন্স” হিসেবে ব্যবহার করা বাস্তবতাকে খাটো করে দেখা। নির্গমন কমাতে যত বেশি দেরি করা হয়, অভিযোজন তত বেশি ব্যয়বহুল, কঠিন এবং এক পর্যায়ে অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিজ্ঞান তাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, দ্রুত ও গভীর প্রশমনই অভিযোজনকে কার্যকর রাখার একমাত্র পথ। জ্বালানি রূপান্তর তখনই সফল হবে, যখন তা একই সঙ্গে সহনশীলও।
অভিযোজন ছাড়া কার্বন নির্গমন কমানোর পুরো প্রক্রিয়াটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের কথা বলা যায়। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ঘিরে একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। খরার সময় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে থার্মোইলেকট্রিক প্ল্যান্টের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বেশি কার্বন নির্গমন ঘটায় এবং জ্বালানি রূপান্তরের বিপরীত দিকে কাজ করে। চরম তাপপ্রবাহের জন্য যদি বিদ্যুৎ খাতকে অভিযোজিত না করা যায়—যেমন কার্যকর কুলিং ব্যবস্থা ও শক্তিশালী গ্রিড তৈরি—তাহলে প্রশমনের অর্জনগুলোও হারিয়ে যাবে। অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। জলবায়ু-সহনশীল মহাসড়ক নির্মাণে ব্রাজিলের ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ফলে ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে (বিশ্বব্যাংক)। এই ধরনের অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিবেশবান্ধব বা পরিচ্ছন্ন-জ্বালানি খাতের বিনিয়োগগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। কারণ দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির সময় বাজারে পণ্য ও সেবা পৌঁছানোর জন্য একটি স্থিতিস্থাপক বা সহনশীল অবকাঠামো প্রয়োজন।
অভিযোজন আর্থিক ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করে। হ্যারিকেন ঝড়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে দুর্যোগ-সহনশীল নিয়ম মেনে তৈরি করা বাড়িগুলোতে বন্ধকী ঋণখেলাপির হার ৫০ শতাংশ কম দেখা গেছে (কোরলজিক)। এটি ব্যাংক এবং বিনিয়োগকারীদের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে— যা দীর্ঘমেয়াদে এই রূপান্তরকে টিকিয়ে রাখার একটি প্রধান শর্ত। রূপান্তরকে বিলম্বিত করা তো দূরের কথা, অভিযোজন বরং এটিকে সম্ভবপর করে তোলে: এটি পদ্ধতিগত ঝুঁকি কমায়, সম্পদ রক্ষা করে এবং জীবাশ্ম-জ্বালানিমুক্ত ভবিষ্যতের পথকে আরও দৃঢ় করে।
৪. আমাদের এখনই অভিযোজনের প্রয়োজন নেই। অভিযোজন তো ভবিষ্যতের বিষয়।
ক্লাইমেট সেন্ট্রালের মতে, পৃথিবীর প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন এরমধ্যেই প্রতিদিন জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাব অনুভব করছেন। ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে, জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগগুলো গড়ে ৩০০ কোটি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে প্রায় ২.৯৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে (ইউএনডিআরআর)। ২০২৪ সালে দুর্যোগের কারণে ৩২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে—যা একসময়ের “স্বাভাবিক” হিসাবের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। কেবল ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিক বা কোয়ার্টারেই ক্ষতির পরিমাণ ১৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যার মধ্যে লস অ্যাঞ্জেলেসের পালিসাডেস দাবানলের কারণেই ক্ষতি হয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলার। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দাবানলের ঘটনা। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে, অভিযোজন এমন কোনো বিষয় নয় যা ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা যায়। যারা আজ খরা, বন্যা এবং ভূমিধসের মুখোমুখি হচ্ছেন, তাদের জন্য অভিযোজনের অভাব জীবনযাত্রার মান ও কল্যাণকে ব্যাহত করছে।
৫. অভিযোজন প্রক্রিয়াটা অদৃশ্য।
জলবায়ু বিপর্যয়গুলো দৃশ্যমান কারণ সেগুলো এক নিমেষেই ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে, অভিযোজনমূলক ব্যবস্থাগুলো প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। আর ঠিক এ কারণেই সেগুলো কাজ করে। আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা নীরবে হাজার হাজার জীবন বাঁচায়। পুনরুদ্ধার করা ম্যানগ্রোভ বন ঝড়কে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে বাধা দেয়। ভবন নির্মাণ বিধিমালা হ্যারিকেনের সময় ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি কমায়। সংবাদপত্রের শিরোনাম না হওয়ার মানে এই নয় যে এর কোনো প্রভাব নেই। চ্যালেঞ্জটি হলো, অভিযোজন কোনো দুর্যোগের মতো অতটা “চোখে পড়ার মতো চাঞ্চল্যকর” নয়, তবে এর প্রভাব সুনির্দিষ্ট এবং পরিমাপযোগ্য। অভিযোজন প্রতিদিন জীবন বাঁচাচ্ছে এবং ক্ষতি কমাচ্ছে— এটি দেখিয়ে সাংবাদিকরা এই অদৃশ্য বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করতে সাহায্য করতে পারেন।

ম্যানগ্রোভ হলো উপকূলীয় লবণাক্ত পানিতে জন্মানো ঝোপঝাড় বা গাছ। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আবার নতুন করে গাছ লাগিয়ে বা প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা ম্যানগ্রোভ মূলত ঝড়কে প্রতিরোধ করে এবং মাটি শক্তভাবে ধরে রাখার মাধ্যমে ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। ছবি: শাটারস্টক
৬. শুধু কী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীরই অভিযোজন প্রয়োজন।
এটি সত্য যে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সম্প্রদায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, উপকূলীয় বাসিন্দা এবং প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন—তবে কেবল তাদেরই অভিযোজন প্রয়োজন বলে মনে করাটা বিভ্রান্তিকর এবং এমনকি বিপজ্জনক।
প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন এরমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং পুরো অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। আমরা যদি শহর ও জ্বালানি ব্যবস্থাকে অভিযোজিত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে জ্বালানি রূপান্তর নিজেই আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।
দ্বিতীয়ত, যাদের “কম ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে ধরা হয়, তাদেরকেও এর খেসারত দিতে হচ্ছে। এমনকি ধনী দেশগুলোতেও অভিযোজনের অভাব বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল আমাদের সবাইকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে। ভারতের খরা বা ব্রাজিলের বন্যা বিশ্বের খাদ্য, উৎপাদন উপকরণ এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে।
অর্থাৎ ঝুঁকির মাত্রা অসম, কিন্তু প্রভাব সবার ওপরই পড়ে। অভিযোজনকে শুধু “ঝুঁকিপূর্ণদের সমস্যা” হিসেবে দেখা একটি মিথ, যা বাস্তবের কাঠামোগত ঝুঁকিকে আড়াল করে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে কারও কাছে নিজেকে রক্ষা করার বেশি সম্পদ আছে, আর কেউ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (সেফটি নেট) ছাড়া সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা বৈষম্যকে আরও গভীর করে এবং জলবায়ু প্রভাব যে শেষ পর্যন্ত একটি সামগ্রিক ও কাঠামোগত সমস্যা—সেটা অস্বীকার করে।
৭. অভিযোজন অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
আইপিসিসি অনুসারে, অনেক অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা হলো “নো-রিগ্রেট” বা এমন বিকল্প যা বেছে নিলে আফসোসের কোনো সুযোগ থাকে না। কারণ এগুলো তাৎক্ষণিক সুফল বয়ে আনে—যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাস করা, ব্যপক সহনশীলতা তৈরি এবং সামাজিক ও পরিবেশগত সহ-সুবিধা নিশ্চিত করা—এমনকি জলবায়ুর প্রভাব যদি ধারণার চেয়ে কম মারাত্মক হয়, তবুও। ভবন নির্মাণ বিধিমালা উন্নত করা, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, উপকূলীয় ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা অথবা কৃষি অবকাঠামো আধুনিকায়ন দারুণ কিছু উদাহরণ। এমনকি ভবিষ্যতের প্রভাবগুলো অনুমিত হিসাবের চেয়ে কম হলেও, উন্নত নিরাপত্তা, কম ক্ষয়ক্ষতি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে এই পদক্ষেপগুলো লাভজনকই প্রমাণিত হবে। বাস্তব ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, অভিযোজন কখনই জলে অর্থ ঢালা কা অপচয় করা নয়—এটি এমন একটি বিনিয়োগ যা সর্বদা সুফল বয়ে আনে।
উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনামে যে সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের ম্যানগ্রোভ বনকে পুনরুদ্ধার করেছে, তারা ঝড়ের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার পাশাপাশি প্রতি বছর বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ৭৩ লাখ (৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার কমিয়ে এনেছে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপ্টেশনের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু-সহনশীলতায় বিনিয়োগ করলে ২:১ থেকে ১০:১ অনুপাত পর্যন্ত সুফল (রিটার্ন) পাওয়া যেতে পারে। অন্য কথায়, বিনিয়োগ করা প্রতিটি ডলার একাধিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা তৈরি করে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অভিযোজনের খরচ বাড়লেও, সবচেয়ে বড় ক্ষতি বা ব্যয়টি অভিযোজন থেকে আসে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমন বা তা নিয়ন্ত্রণে দেরি করার কারণে আসে।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে যায়, তবে অভিযোজনের অনেক সীমাবদ্ধতা বা সীমা অতিক্রম হয়ে যাবে। এর সমাধানগুলো আরও ব্যয়বহুল, কম কার্যকর অথবা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। আইপিসিসি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে: কেবল দ্রুত ও গভীর প্রশমনই (কার্বন নির্গমন হ্রাস) অভিযোজনকে সম্ভব এবং আর্থিকভাবে টেকসই রাখতে পারে। “অত্যন্ত ব্যয়বহুল” হওয়া তো দূরের কথা, অভিযোজন হলো একটি বুদ্ধিদীপ্ত এবং জরুরি বিনিয়োগ। আসল ঝুঁকিটি অপেক্ষা করার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে—কারণ আমরা কার্বন নির্গমন কমাতে যত বেশি সময় নেব, অভিযোজন তত বেশি ব্যয়বহুল এবং কঠিন হয়ে উঠবে।
৮. অভিযোজন একটি স্থানীয় বিষয়।
জলবায়ুর প্রভাবগুলো যে নির্দিষ্ট স্থানগুলোতেই দেখা যায়—যেমন কোনো শহরে বন্যা, কোনো কৃষি অঞ্চলে খরা কিংবা সমুদ্রতীরবর্তী কোনো এলাকায় উপকূলীয় ভাঙন—তা সত্য। কিন্তু অভিযোজন কেবলই একটি স্থানীয় বিষয় বলাটা একটি সংকীর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর ধারণা:
ক. স্থানীয় প্রভাবের বৈশ্বিক পরিণতি রয়েছে। ভারতে খরা দেখা দিলে চাল রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে, যা বিভিন্ন মহাদেশে খাদ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। ব্রাজিলে বন্যা হলে সয়াবিন, খনিজ ও জ্বালানির বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে যেতে পারে। অন্যভাবে বললে, কোনো একটি স্থানে অভিযোজনের ঘাটতি সারা বিশ্বে আলোড়ন ফেলতে পারে।
খ. পারস্পরিক নির্ভরশীলতার জন্য প্রয়োজন সমন্বয়। জ্বালানি, পরিবহন, বাণিজ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা বন্দরকে অভিযোজনের উপযোগী করে তোলা হতে পারে স্থানীয় উদ্যোগ, কিন্তু অর্থায়ন, বীমা, বাণিজ্য ও সহযোগিতার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ছাড়া স্থিতিস্থাপকতা ধরে রাখা সম্ভব নয়।
গ. জলবায়ু কূটনীতি এই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। আইপিসিসিও জোর দিয়ে বলেছে, অভিযোজনের স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক—তিনটি মাত্রাই রয়েছে। এ কারণেই দেশগুলো আন্তর্জাতিক অভিযোজন তহবিলে প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করে। কারণ কোনো একটি দেশের স্থানীয় পর্যায়ের ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত অন্য দেশগুলোর ওপরও অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করে।
অভিযোজনের শুরু হয় স্থানীয় পর্যায়ে, কিন্তু এটি সেখানেই শেষ হয় না। এর কার্যক্রম স্থানীয় হলেও এর প্রভাব বৈশ্বিক। অভিযোজনকে শুধু “স্থানীয় সমস্যা” হিসেবে দেখা আরেকটি ভ্রান্ত ধারণা—যা বৈশ্বিক অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সংহতির প্রয়োজনীয়তাকে আড়াল করে।
৯. বৈরি আবহাওয়ার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস পাওয়া প্রমাণ করে যে মানবজাতি সফলভাবে মানিয়ে নিচ্ছে বা অভিযোজন করছে।
বাস্তবে ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে। এমনকি ধনী দেশগুলোতেও। যেখানে অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী বলে ধরে নেওয়া হয়। ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ (এনবিইআর)-এর একটি গবেষণায় ৫০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জলবায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত ২১ ধরনের প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, চার ভাগের তিন ভাগ ক্ষেত্রেই প্রকৃত অর্থে কোনো অভিযোজন ঘটেনি।
আজকের দিনে একটি হারিকেন বা তাপপ্রবাহ কয়েক দশক আগের মতোই প্রায় একই মাত্রার ক্ষতি করে, যদিও এখন প্রযুক্তি, সম্পদ এবং সুরক্ষাব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত। কিছু ব্যতিক্রম আছে, তবে সেগুলো খুবই সীমিত—যুক্তরাষ্ট্রে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধি, ইউরোপে গম উৎপাদনে উন্নতি এবং কিছু ইউরোপীয় দেশে তাপজনিত মৃত্যুহার কমে আসা। যুক্তরাষ্ট্রে দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের সঙ্গে আয়ের সম্পর্ক আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে এবং তাপপ্রবাহের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ও সহিংস অপরাধের ঘটনাও তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। কিন্তু এসব মিলিয়ে দেখা যায়, গবেষণায় বিশ্লেষিত ২১টি ক্ষেত্রের মধ্যে মাত্র ৬টিতে এমন উন্নতি হয়েছে—অর্থাৎ স্থবিরতা সত্ত্বেও ছোটখাটো কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য দেখা গেছে।
১০. বেসরকারি খাত অভিযোজনে আগ্রহী নয়।
বেসরকারি খাতের অভিযোজনে কোনো আগ্রহ নেই—এই ধারণাটি বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে টিকবে না। বিশেষ করে আপনি যখন খাতটি থেকে আসা প্রণোদনাগুলোকে আমলে নিবেন। কোম্পানি, ব্যাংক এবং বীমাকারীরা এরমধ্যেই বুঝতে পেরেছে যে স্থিতিস্থাপকতায় বিনিয়োগ তাদের সম্পদ রক্ষা করে, ঝুঁকি কমায় এবং বাস্তবসম্মত সুফল (রিটার্ন) দেয়। এর প্রধান চালিকাশক্তি হলো সম্পদ রক্ষা করা। কারখানা, গুদামঘর, রাস্তাঘাট এবং পাওয়ার গ্রিড—সবই চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে। অভিযোজনের দিকে যদি মনোযোগী না হওয়া হয় তবে এই চরম আবহাওয়া পুরো কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে পারে।
বিশ্বব্যাংক খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে : চরম আবহাওয়া বা দুর্যোগের সময়েও টিকে থাকতে পারে এমন স্থিতিস্থাপক সড়ক অবকাঠামোতে ব্রাজিলের ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ ভবিষ্যতে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি রোধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আরেকটি চালিকাশক্তি হলো ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষা। প্লাবিত শহর, অবরুদ্ধ বন্দর এবং অস্থিতিশীল পাওয়ার গ্রিড বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত করে। এই কারণেই বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বন্দর, রটারডাম বন্দর, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিপরীতে উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় এরমধ্যেই বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ বিনিয়োগ করেছে, যাতে তীব্র ঝড়ের সময়ও বাণিজ্য অব্যাহত থাকে। আরেকটি বিষয় হলো আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা।
উন্নত অভিযোজন মানে ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য কম ঝুঁকি, বীমার প্রিমিয়াম কম হওয়া এবং আর্থিক বাজারে বেশি স্থিতিশীলতা। ব্যক্তিখাতকে এখানে প্রতিযোগিতা ও বাজারের সুযোগও চালিত করে। নেসলে ও ওলামের মতো বহুজাতিক কোম্পানি কোকো ও কফির খরা-সহনশীল জাত উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। একইভাবে উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে আসছে প্রযুক্তি কোম্পানি এবং স্টার্টআপও। যেমন ক্যামেরুনে বন্যার ঝুঁকি কমাতে ড্রোন ব্যবহার—যা ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট পুঁজিকে (এমন প্রকল্প বা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা, যেগুলো আর্থিক লাভের সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য বা উন্নয়ন সমস্যার সমাধানেও কাজ করে) আকর্ষণ করছে।
সবশেষে রয়েছে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম-কানুন মানা এবং কোম্পানির নিজের ভাবমূর্তি বা সুনাম রক্ষার চাপ। যেসব কোম্পানি অভিযোজনকে তাদের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করে না, তারা বাজারে ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ে। কারণ বিনিয়োগকারী ও সরকার এখন ক্রমশই পরিচ্ছন্ন জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা দাবি করছে।
যেসব প্রতিষ্ঠান আগেভাগে পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাদেরকে বেশি নিরাপদ, বেশি স্থিতিস্থাপক এবং কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি আকর্ষণ করতে সক্ষম হিসেবে দেখা হয়। তাই অভিযোজনে বিনিয়োগের লাভ স্পষ্ট। গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপ্টেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে প্রায় ৭ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার নিট লাভ হতে পারেল। যার মধ্যে রয়েছে কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে মৃত্যু ও রোগের হার কমে আসা পর্যন্ত বিভিন্ন সুবিধা। তাই সংক্ষেপে বলা যায়, বেসরকারি খাত অভিযোজনে বিনিয়োগ করে কারণ এটি একই সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর এবং ব্যবসার জন্য লাভজনক।