"একজন ব্যবস্থাপক হিসেবে এমনটা ধরে নেবেন না যে আপনার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে কিংবা আপনার অধীনে যারা কাজ করছেন, তাদের জন্য কোনটি সর্বোত্তম তা আপনিই জানেন," পরামর্শ দিয়েছেন গ্রিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম 'সলোমন'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়ানা পাপানজেলি। ছবি: শাটারস্টক।
কর্মীর প্রশংসা করুন, দায়িত্ব দিন, ভুলকে স্বাভাবিক ভাবে নিন: অনুসন্ধানী সংবাদ ব্যবস্থাপকের জন্য ১৫ পরামর্শ
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা যাক: দল পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। আপনি আপনার নিজের কাজটি খুব ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারেন, কিন্তু অন্যকে দিক নির্দেশনা দেওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। এর জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের কিছু দক্ষতা।
আমি সৌভাগ্যবান। কারণ আমার পেশাজীবনে দারুণ কয়েকজন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তাদের কেউ ছিলেন সাংবাদিক। আবার কেউ সাংবাদিকতার বাইরের ক্ষেত্র থেকে এসেছেন, যেমন নাগরিক প্রযুক্তি (সিভিক টেক)। অন্যদের কীভাবে কৌশলগতভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়, তারা সবাই আমাকে তা শিখিয়েছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা শিখিয়েছেন কীভাবে সহমর্মিতা ও সম্মানের সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে হয়। তাদের কেউই জন্মগতভাবে ব্যবস্থাপক বা নেতা ছিলেন না; বরং তারা সবাই সময়ের সঙ্গে শিখেছেন কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে হয়।
সম্প্রতি নেতৃত্ব নিয়ে আমি অনেক চিন্তা করেছি। বিশেষ করে ‘দ্য এগজামিনেশন’-এ আমাদের প্রতিদিনের সাংবাদিকতার কাজের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। এখানে আমি আছি ডেটা দলের দায়িত্বে।
কেউ কেউ মনে করতে পারেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একজন ব্যবস্থাপকের কাজ অন্য যেকোনো ক্ষেত্রের ব্যবস্থাপকের কাজ থেকে আলাদা হওয়ার কথা নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় দায়িত্বটিকে আলাদা করে তোলে। যেমন, জটিল সব প্রতিবেদন নিয়ে কাজের পাশাপাশি তাকে একদিকে চাপ সামলাতে হয়। আবার দলের সদস্যদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দিতে হয়।
মিডিয়া পরামর্শক এবং অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্টের (ওসিসিআরপি) সাবেক প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা এমা প্রেস্ট। তিনি বলেন, এই ক্ষেত্রে একজন ব্যবস্থাপক হিসেবে “চাপ সামলে মানসম্মত কাজ করতে হবে, শান্ত থাকতে হবে এবং কখন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে (এবং কখন নিতে হবে না), তা জানতে হবে। … সবাই ধরে নেন, তার নিজের করা প্রতিবেদনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অনেক সময় পরিকল্পনার ঘাটতির সঙ্গে তাড়াহুড়োর একটা চাপও তৈরি হয়। তাই আপনার দায়িত্ব হলো, দলকে আগেভাগে ভাবতে ও পরিকল্পনা করতে, গুছিয়ে কাজ করতে এবং সহকর্মীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি না করতে সহায়তা করা।”
ব্যবস্থাপকদের জন্য ১৫টি পরামর্শ নিয়ে তৈরি এই লেখার শুরুটা হয়েছিল একটি সাংবাদিকতা সম্মেলনের ফাঁকে হওয়া কয়েকটি আলাপ থেকে। পরে আমি বার্তাকক্ষের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে যাদের সবচেয়ে ভালো মনে করি, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ থেকে পাওয়া পরামর্শ ও আমার এই পর্যন্ত অর্জিত অভিজ্ঞতা, সবকিছু মিলিয়েই এই লেখায় ১৫টি পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে।
১. খোলামেলা ও স্বচ্ছ থাকুন। আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলবো, প্রতিষ্ঠানে কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিবর্তন হলে তা দলের সদস্যদের খোলামেলাভাবে জানানোটা গুরুত্বপূর্ণ। এরপর তাদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে এবং তারা কী ভাবছেন, তা মন দিয়ে শুনতে হবে। কর্মীদের বৈঠকে বড় কোনো ঘোষণা দিয়ে আমার দলকে হঠাৎ চমকে দেওয়ার বদলে, আসন্ন প্রতিবেদন, আমাদের কৌশল নিয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিবর্তন, কিংবা যেসব সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে জানাতে আমি নিয়মিত যোগাযোগ আর মিটিংগুলোকে কাজে লাগাই।
সাংবাদিক হিসেবে আমার কর্মজীবনে শেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, মানুষ খোলামেলা ও অকপট আলাপকে গুরুত্ব দেয়। তবে এর জন্য এমন একটি নিরাপদ পরিবেশও তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নিজেদের চিন্তা, মতামত ও ধারণা স্বচ্ছন্দে প্রকাশ করতে পারে। সংক্ষেপে বললে, এমন একটি পরিবেশ দরকার, যেখানে তারা মনে করবে না যে তারা যা বলছে, পরে তার জন্য তাদের শাস্তি পেতে হতে পারে বা তাদের কথাই কোনোভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।
আর এটাও মনে রাখা জরুরি যে, খোলামেলা আলাপের জন্য বিনয়ী ব্যবস্থাপক প্রয়োজন। গ্রিসের অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম সলোমনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়ানা পাপানগেলি পরামর্শ দেন, “আপনি ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন বলে এমনটা ধরে নেবেন না, সব প্রশ্নের উত্তর আপনার জানা আছে। কিংবা মনে করবেন না আপনি যাদের পরিচালনা করছেন, তাদের জন্য কোনটি সবচেয়ে ভালো, তা আপনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। কেননা, আসলে তা নয়। আর সবকিছু জানা আপনার জন্য জরুরিও নয়। নিজের কাছে এবং আপনার দলের কাছেও এই বিষয়ে সৎ থাকুন। সহকর্মীদের জিজ্ঞাসা করুন, তাদের কী প্রয়োজন, তাদের ভাবনা কী, কী ধরনের সমাধান আছে বলে তারা মনে করছেন, তাদের আকাঙ্ক্ষা কী এবং তারা কী নিয়ে ভয় পান। তারা আপনার কাছে কী চান, তা জিজ্ঞাসা করুন। আপনি আগে থেকেই তা জানেন, এটা ধরে নেবেন না” যোগ করেন তিনি।
২. কাজ নিয়ে দলের সদস্যদের কাছ থেকে আপনি কী প্রত্যাশা করেন স্পষ্টভাবে জানান, বিশেষ করে আপনি যদি দূর থেকে কাজ করেন। দ্য এগজামিনেশন একটি অলাভজনক বার্তাকক্ষ, যেখানে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যসংকট নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়। ডেটা সাংবাদিকেরা দূর থেকে কাজ করেন। তাই আমি আমার দলের সদস্যদের বলি, তারা যেন তাদের কাজের সময়, ছুটি, কোনো নির্দিষ্ট কাজ করার সময় এবং কখন তারা কাজে থাকবেন না—সবকিছু ক্যালেন্ডারে উল্লেখ করেন। আমরা বিভিন্ন সময়ে কাজ করি এবং ভিন্ন ভিন্ন দেশে থাকি। তাই সপ্তাহের অগ্রাধিকারগুলো যেখানে আমরা লিখে রাখি, এমন একটি ‘চেক-ইন’ নথি চালু করেছি। নথির শেষে আমাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বৈঠকে আনুমানিক কতটা সময় ব্যয় হবে, সেটিও উল্লেখ করি। কারও ক্যালেন্ডারে যদি অনেক বেশি বৈঠক থাকে, তাহলে বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়। যাতে তিনি শুধু তার নির্ধারিত কাজগুলো করার জন্যই নয়, সৃজনশীলভাবে ভাবার জন্যও কিছুটা সময় বের করতে পারেন।
জার্মানভিত্তিক পেপার ট্রায়াল মিডিয়ার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ফ্রেডেরিক ওবারমাইয়া। তিনি আমাকে বলেছেন, সফলভাবে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দলের সদস্যদের মধ্যে কাজের প্রক্রিয়া নিয়ে ভালো যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, “পরবর্তী পদক্ষেপ ও কাজের সময়সীমা (ডেডলাইন) সবার কাছে স্পষ্ট করে তুলুন এবং কেন সেগুলো প্রয়োজন, তা ব্যাখ্যা করুন। যে সময়সীমা আপনার কাছে পুরোপুরি যৌক্তিক মনে হচ্ছে, অন্য কারও কাছে সেটি একেবারেই অকাজের মনে হতে পারে।”
“আমি শিখেছি সহকর্মীকে কেবল এটা বলাই যথেষ্ট নয় যে কী করতে হবে এবং কখন করতে হবে। কেন করতে হবে, সেটাও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। পরবর্তী পদক্ষেপ কী? আগামী মঙ্গলবারের বদলে শুক্রবারের মধ্যেই কেন কাজটি শেষ করতে হবে? এর ওপর আর কী কী কাজ নির্ভর করছে? এসব বিষয় পরিষ্কার করে বললে কেবল একধরনের চাপ তৈরি হয় না; বরং মানুষ নিজের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ অনুভব করে এবং কাজটির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত মনে করে।”
৩. দলের জন্য কার্যকর একটি অগ্রাধিকার নির্ধারণের পদ্ধতি ঠিক করুন। আমার দলের কাজগুলো কীভাবে এগোবে, তা ঠিক করতে আমরা প্রথমে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার প্ল্যাটফর্ম ‘আসানা’ ব্যবহার করি। এরপর ‘অগ্রাধিকার নির্ধারণের বৈঠক’ করি। সেখানে সপ্তাহের কাজগুলো নিয়ে আলোচনা করে কোন কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ আর কোনগুলো জরুরি, তা ঠিক করি। পরে নিয়মিত পর্যালোচনা বৈঠকে আমরা কী কী কাজ করেছি, সেগুলো পর্যালোচনা করি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করি।
কাজের প্রক্রিয়া ঠিক করা এবং সবকিছু গুছিয়ে রাখতে সহায়ক—এমন অনেক ধরনের কাঠামো বা পদ্ধতি রয়েছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কাঠামো বা টুল ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ধাপ যুক্ত করা এবং নমনীয়তার অভাব নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৪. দলের সব সদস্যের সঙ্গে সমান আচরণ করুন এবং তাদের বুঝতে দিন যে তারা গুরুত্বপূর্ণ। দলকে একটি সমষ্টি হিসেবে দেখুন। তবে প্রত্যেক সদস্যের স্বকীয়তাকে সম্মান করুন। আমি এমন অনেক দলে কাজ করেছি, যেখানে স্বভাবগতভাবে লাজুক সদস্যরা দারুণ কাজ করেছেন। কিন্তু কখনো কখনো যারা নিজেদের কাজ ও সাফল্য নিয়ে খোলামেলাভাবে বেশি কথা বলতেন, তাদের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হতো। এতে অনেক সময় দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতি এড়ানোর একটি উপায় হলো, দলের সদস্যদের অন্যদের সামনে নিজেদের কাজ তুলে ধরতে উৎসাহিত করা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দলের সাফল্যের কৃতিত্বকে আপনি যেন নিজের বলে দাবি না করেন। দলের হয়ে কৃতিত্ব নেওয়া শুধু অনুচিতই নয়, আপনার সঙ্গে কাজ করাটা রীতিমতো হতাশাজনকও।
৫. সহকর্মীরা ভালো কাজ করলে তাদের প্রশংসা করুন। ব্যবস্থাপকেরা অনেক সময় দলের সদস্যদের কাজকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে ধরে নেন। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডেস্কে বসে প্রতিবেদন তৈরি করি, তথ্যের ছক নিয়ে কাজ করি কিংবা আমাদের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো কী হতে পারে, তা নিয়ে ভাবি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাপক যখন আপনার নিষ্ঠা বা এমন কোনো কাজের স্বীকৃতি দেন, যা অন্যদের চোখে হয়তো ‘অদৃশ্য’ ছিল, তখন সেটি সত্যিই অনেক বেশি আনন্দ ও তৃপ্তি দিতে পারে।
দলের সদস্যরা ভালো কাজ করলে তাদের তা জানান। ব্যক্তিগতভাবে যেমন প্রশংসা করবেন, তেমনি কর্মীদের যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে সবার সামনে তাদের কাজের স্বীকৃতি দিন।

“দলের সদস্যরা ভালো কাজ করলে তাদের তা জানান। ব্যক্তিগতভাবে যেমন প্রশংসা করবেন, তেমনি কর্মীদের যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে সবার সামনে তাদের কাজের স্বীকৃতি দিন।” ছবি: শাটারস্টক
৬. সহকর্মীদের বোঝান, ভুল করা মানেই যে সবকিছু শেষ হয়ে গেল, এমনটা নয়। আমার এক ব্যবস্থাপক প্রায়ই বলতেন, “তুমি যদি ভুল করো, তার মানে তুমি কাজ করছ।” আমি যে দলগুলোতে কাজ করেছি, সেখানেও এই কথাটিকে নীতি হিসেবে অনুসরণ করেছি।
মানুষ হিসেবে আমরা ভুল করি। কোনো কোনো দল বড় ধরনের অনুসন্ধান নিয়ে মাসের পর মাস কাজ করে। দীর্ঘদিন কোনো একটি বিষয় নিয়ে কাজ করতে করতে তারা সে বিষয়ে একসময় বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠে এবং তখন অনেক সময় চোখের সামনে থাকা ‘সহজ’ বা ‘স্পষ্ট’ বিষয়গুলোও আর দেখতে পায় না।
আপনার দলের সদস্যদের জন্য আপনাকে এমন একজন নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাপক হয়ে উঠতে হবে এবং আস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো সমস্যায় পড়লে তারা আপনার কাছে আসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাদের বুঝতে হবে, আপনি তাদের কথা খোলামনে শুনবেন এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করবেন। একই সঙ্গে, তারা সম্ভাব্য যে সমাধানগুলোর কথা ভাবছে, তা নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতেও উৎসাহিত করাটা গুরুত্বপূর্ণ।
৭. সব কাজে সবাইকে যুক্ত করবেন না। আমরা সবাই জানি, সময় ও শক্তি সীমিত। কিছু বৈঠকে আপনার পুরো দলের উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে, আবার কিছু বৈঠকে একজন থাকলেই যথেষ্ট। তাই দলের সদস্যদের সময়কে দক্ষতা ও কৌশলের সঙ্গে ব্যবহার করুন। তবে একই সঙ্গে খেয়াল রাখুন, যাতে তথ্য শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে না যায়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দলের সঙ্গে কাজ করা ওবারমাইয়ার পরামর্শ দেন, “নিজেই কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না কিংবা তথ্যের একমাত্র রক্ষক হয়ে উঠবেন না।”
তিনি বলেন, “অতিরিক্ত ব্যক্তিগত বা দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই কোনো দলনেতা বার্তাকক্ষের তথ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারেন। তখন অন্য তথ্য জানতে হলেও সবাইকে তার কাছেই আসতে হয়। এতে সময় নষ্ট হয় এবং অপ্রয়োজনীয় স্তরবিন্যাস বা ‘হায়ারার্কি’ তৈরি হতে পারে।” এর বদলে তার পরামর্শ, “সবার সঙ্গে খোলামেলাভাবে তথ্য ভাগ করে নিন। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিবেদকদের পুরো দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করুন এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করুন, যেখানে সবাই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে পারে। আবার সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নটিও নির্দ্বিধায় করতে পারে।”
৮. দলের প্রত্যেক সদস্যকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করুন। ভালো ব্যবস্থাপকেরা সবসময় দায়িত্ব ভাগ করে দেন এবং যাদের নিয়োগ দিয়েছেন, তাদের দক্ষতার ওপর আস্থা রাখেন। ছোট একটি দল পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও কারও কারও জন্য এই অভ্যাস গড়ে তোলা কঠিন হতে পারে। দলের সদস্যদের সিদ্ধান্ত নিতে এবং নেতৃত্ব দানে উৎসাহিত করার মাধ্যমে আপনি তাদের ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করেন। একই সঙ্গে, এটি তাদের পেশাগত বিকাশেও সহায়তা করে। দ্য এগজামিনেশনের সম্পাদকীয় পরিচালক আসরা মুস্তুফার মতে, ব্যবস্থাপকের কাজেরই একটি অংশ হওয়া উচিত দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া। তিনি বলেন, “আপনার ভালো বিচারবুদ্ধির কারণেই সম্ভবত আপনি ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পেয়েছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় সবকিছু নিয়ে চিন্তা করার দায়িত্বও আপনাকেই এককভাবে নিতে হবে। আপনার দলের সদস্যদের নিজেদের মতো করে চিন্তা করতে শেখান। তাহলে একজন নেতা হিসেবে আপনার প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।”
৯. কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে কাজের বাইরে রাখার জন্য কিছু নিয়ম ঠিক করুন। দ্য এগজামিনেশনে আমি আমার দলের সদস্যদের ব্যক্তিগত ফোনে স্ল্যাক বা ইমেইল না রাখার পরামর্শ দিয়েছি। জরুরি কোনো পরিস্থিতি না হলে ছুটির দিন বা তাদের কাজের সময়ের বাইরে আমি বার্তা পাঠাই না বা যোগাযোগ করি না। অফিস সময়ের বাইরে আপনার দলের সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করার প্রয়োজন হলে ইমেল শিডিউল করে রাখুন।
অনেক সময় সবচেয়ে ভালো ধারণাগুলো তখনই মাথায় আসে, যখন আমরা সেগুলো নিয়ে ভাবা বন্ধ করে দেই। আর ভালোভাবে কাজ করতে হলে দলের সদস্যদের কিছুটা অবসর সময়ও দরকার। পুলিৎজার সেন্টারের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক পরামর্শক ইগ্নাসিয়া ভেলাসকো বলেন, তার কাজের ক্ষেত্রে “নিজের জন্য সময় বের করা” খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “কাজ ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিলে এবং সবকিছু সামলাতে না পারলে কখন ‘না’ বলতে হবে, তা শিখলে আপনি আসলে নিজের কাজ আরও ভালোভাবে করতে পারবেন।”
একইভাবে, সপ্তাহে একটি দিন ‘কোনো মিটিং নয়’—এমন নিয়ম চালু করে দলের সদস্যদের কাজ করার সময় করে দেওয়া খুবই কার্যকর হতে পারে। সপ্তাহে একটি দিন কোনো মিটিং না থাকলে মানুষ সেই কাজগুলো শেষ করার সুযোগ পায়, যেগুলো বিভিন্ন ডেডলাইনের মধ্যে কাজ শেষ করার তাড়া বা একের পর এক মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার কারণে করা হয়ে ওঠে না। এটি কার্যকর করতে আমি যেমন শুক্রবারে কোনো বৈঠক না রাখার চেষ্টা করি। এতে সপ্তাহে একটি স্বস্তির সময় পাই, যখন প্রয়োজনীয় কাজগুলো গুছিয়ে নিতে পারি। আরা সপ্তাহের শেষের দিকে তুলনামূলকভাবে হালকা মনে হয়।
১০. দলের সদস্যদের পেশাগত উন্নয়নে উৎসাহিত করুন। দলের সদস্যরা যেন নতুন কিছু শিখতে পারেন, পেশাজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে পারেন এবং ফেলোশিপ বা বৃত্তির জন্য আবেদন করতে পারেন—সেজন্য তাদের কিছুটা সময় ও সুযোগ করে দিন। সহযোগিতামূলকভাবে কাজ করার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। আর নতুন দক্ষতা অর্জন আপনার নিউজরুমের জন্য সবসময়ই বাড়তি সুবিধা। ভেলাসকো যেমন আমাকে বলেছেন, “শেখার জন্য সময় দেওয়া কখনোই সময় নষ্ট নয়; এটি এমন একটি বিনিয়োগ, যার সুফল শেষ পর্যন্ত আপনার নিজের এবং আপনার কাজ, উভয় ক্ষেত্রেই কাজে আসবে। ।”
তবে আপনার দলকে কখনোই স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় কিছু হিসেবে ভাববেন না। সাংবাদিক হিসেবে আমাদের অনেকেই কর্মজীবনে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। নানা কারণে কেউ একসময় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যান, আবার কেউ তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকেন। তাই একজন ব্যবস্থাপক হিসেবে দলের সদস্যরা চিরকাল আপনার সঙ্গে থাকবেন, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রেস্ট বলেন, “যারা সামনে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত, তাদের ধরে রাখার চেষ্টা করবেন না। বরং আপনার দলের সদস্যদের তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও নিজেদের পেশা নিয়ে ভাবতে সাহায্য করুন। আপনার প্রতিষ্ঠান যদি তাদের উপযুক্ত সুযোগ বা নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ দেওয়ার সুযোগ না পায়, তাহলে অন্য কোথাও তাদের জন্য উপযুক্ত কাজ খুঁজে নিতে সহায়তা করুন।”
১১. মানুষকে পরিচালনা করা মানে শুধু কাজের দায়িত্ব বণ্টন করা নয়। আপনার কাজ শুধু দলের সদস্যদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া নয়। আপনাকে এমন একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সাংবাদিকেরা নিজেদের কাজ উপভোগ করবেন এবং আপনার সঙ্গে ও দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবেন। প্রেস্ট আরও বলেন, “উদ্দীপনা ও কর্মশক্তি গুরুত্বপূর্ণ। আপনার আচরণ ও কাজের ধরনই দলের পরিবেশের ছন্দ ঠিক করে দেয়। আপনি যদি নিজের কাজকে ভালোবাসেন, তাহলে তাদেরও কাজটি ভালোবাসার সম্ভাবনা বেশি। কারণ উদ্দীপনা সংক্রামক।”
১২. কোনো মতামতকে ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না: আমার কর্মজীবনে আমি এমন অনেক ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কাজ করেছি যারা মতামত বা প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করতে অস্বস্তি বোধ করতেন; অথচ কাজের মান উন্নয়নের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমার দলের সদস্যরা জানেন, ভালো হোক বা খারাপ: যেকোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া শুনতে আমি প্রস্তুত। কোনো বিষয় ঠিকঠাক কাজ করছে না, কিন্তু সেদিকে আপনি নজর দিচ্ছেন না। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যাটি বিশাল আকার ধারণ করতে পারে। সামাজিক ও সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানী আনা সোফিয়া রুইজ একবার কিছু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বোঝাতে আমাকে ‘ফ্র্যাক্টাল’ (fractal)-এর ধারণাটি ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেন, “বিশ্লেষণের ক্ষুদ্রতম এককগুলোতে যা ঘটে, তা সামগ্রিক কাঠামোগত পর্যায়েও হুবহু প্রতিফলিত হয়… সহজ কথায় বলতে গেলে: প্রতিষ্ঠানকে একটি ব্রোকলির সাথে তুলনা করে দেখুন। এর ছোট কোনো অংশের সঙ্গে যাই ঘটুক না কেন (ভালো বা মন্দ), তা পুরো ব্রোকলিটির ওপরই প্রভাব ফেলবে।”
১৩. আপনার অধীনে কর্মরত কর্মীদের জন্য কাজের স্পষ্ট বিবরণ তৈরি করুন: আমি এমন সব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি যেখানে বছরের পর বছর ধরে আমার কাজের দায়িত্বের বিবরণ একই ছিল। দায়িত্বের ক্ষেত্রেও একে অপরের কাজের সঙ্গে অনেক মিল বা অস্পষ্টতা ছিল। এমনও হয়েছে যে, কর্মীরা জানতেন না কার দায়িত্ব কী। কারণ পদের নামের বাইরে কেউ বিষয়টি নিয়ে ভাবেননি। দলের প্রত্যেক সদস্যের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা শুধু দলের মধ্যে কাজের সমন্বয় ভালো রাখার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বেতন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রেও এটি একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
১৪. ‘আমি জানি না’ বলতে দ্বিধা করবেন না, নিজের সংশয় ও সমস্যার কথাও দলের সঙ্গে ভাগ করে নিন। পাপানগেলির মতে, “ব্যবস্থাপক হওয়া মানে নিঃসঙ্গ জগতে বাস করা নয়, যেখানে আপনাকেই সবকিছুর ভার নিতে হবে। প্রতিটি সমস্যার বোঝা নিজের মধ্যে চেপে রাখতে হবে এবং দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে নীরবে সবকিছু সহ্য করে যেতে হবে। দলের সদস্যদের সঙ্গে বিষয়গুলো ভাগ করে নিন। কোনো কিছু কঠিন মনে হলে, কোনো বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলে, কোনো ভুল করে ফেললে কিংবা কী করতে হবে তা না জানলে—সেসব বিষয়ে তাদের সঙ্গে সৎ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কথা বলুন।”
১৫. নিজের ভাবনা যাচাই করতে এবং ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জানতে পরামর্শদাতা বা নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলুন: কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন মনে হলে বা বুঝতে পারি যে এ বিষয়ে আরও অভিজ্ঞ কারও সঙ্গে কথা বলা দরকার, তখন আমি নিয়মিত নিউজরুম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নারী সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করে তাদের পরামর্শ নিই। আমার ব্যবস্থাপক আসরা মুস্তুফার সঙ্গেও আমি একইভাবে কথা বলি। আমাদের আলোচনায় প্রায়ই আমি তাঁকে এ ধরনের প্রশ্ন করি: “আপনার কী মনে হয়? আপনি কি একইভাবে করতেন? এ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?”
ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করাকে কখনো কখনো এমন এক দায়িত্ব বলে মনে হতে পারে, যার জন্য যথাযথ স্বীকৃতি বা প্রতিদান পাওয়া যায় না। অনেক সময় আপনার কাজের বিষয়টি হয়তো কারো নজরেই আসে না। আপনার দায়িত্বের একটি অংশ হলো নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত কাজগুলো করা। পাশাপাশি, এমন কাজের প্রক্রিয়া, সীমারেখা ও কর্মপরিবেশ তৈরি করাও আপনার দায়িত্ব, যা দলের সবার জন্য কার্যকর। আমি যেসব শক্তিশালী অনুসন্ধানে কাজ করেছি, সেগুলোর কিছু পরিচালনা করেছেন এমন মানুষ, যারা শুধু সাংবাদিকতার গণ্ডির মধ্যে নিজেদের আটকে রাখেননি। তারা অন্য মানুষের প্রতি গভীরভাবে যত্নশীল ছিলেন এবং তাদের প্রয়োজনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।
ব্যবস্থাপক হিসেবে আমরা সবাই ভুল করি। এটা এড়ানো সম্ভব নয়। ভবিষ্যতেও আমরা ভুল করব। তবে আমি সবসময় ভাবি, নিজের ভুল থেকে কী শিখেছি এবং সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে কীভাবে আমার দলের জন্য আরও ভালো একজন ব্যবস্থাপক হতে পারি।
মূল বিষয় হলো, বুঝতে হবে—সাংবাদিকতা কখনোই শুধু সাংবাদিকতাকে ঘিরে নয়। আমি অনেকবার শুনেছি, আপনি যদি ভালো মানুষ না হন, তাহলে কখনোই ভালো সাংবাদিক হতে পারবেন না। কথাটি সত্যি। একইভাবে আমি বলব, আপনি যদি আপনার দলের একজন ভালো ব্যবস্থাপক হতে না পারেন, তাহলে টেকসই সাংবাদিকতাও সম্ভব নয়।
রোমিনা কলম্যান দ্য এগজামিনেশনের ডেটা সম্পাদক। এর আগে তিনি ওসিসিআরপিতে লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের ডেটা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। সেখানে তিনি ওই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পে ডেটাভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি ও কৌশল নির্ধারণের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর আগে তিনি আর্জেন্টিনার লা নাসিওনের ডেটা দলে কাজ করেছেন। সেখানে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও বার্তাকক্ষের মধ্যে জটিল ডেটাভিত্তিক উদ্যোগগুলোর সমন্বয় করতেন।