দক্ষিণ গাজা উপত্যকার রাফাহতে, গাজা-ইসরায়েল সীমান্তের কাছে বিক্ষোভ চলাকালে ইসরায়েলি বাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক। ছবি: শাটারস্টক, আবেদ রহিম খাতিব
সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত বা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অনুসন্ধান করবেন কীভাবে, কী বলছেন মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকরা
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
২০২১ সালের অক্টোবরে সাংবাদিক শহীদ জেহরি পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের হাব শহর দিয়ে করাচিতে নিজের বাড়ির দিকে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তার গাড়ির আসনের নিচে পেতে রাখা বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। কয়েক ঘণ্টা আহত অবস্থায় থাকার পর তিনি মারা যান।
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) নামের যে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে পাকিস্তান সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে, তারা এই হামলার দায় স্বীকার করে। গোষ্ঠীটি কোনো প্রমাণ ছাড়াই জেহরির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তোলে। “বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীরা কোনো ধরনের জবাবদিহি ছাড়াই সম্পূর্ণ খেয়ালখুশিমতো সাংবাদিকদের হত্যা করছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না,” জেহরি হত্যার প্রতিক্রিয়ায় এক বিবৃতিতে বলেন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) মুখপাত্র পলিন আদেস-মেভেল।
জেহরির ঘটনাটি সংঘাত বিট নিয়ে কাজ করার চিরন্তন বৈপরীত্য তুলে ধরে: যে সব সাংবাদিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে প্রতিবেদন করেন, প্রায় সব পক্ষই তাদের সন্দেহের চোখে দেখে। যেকোনো একটি পক্ষের ‘এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়াটা তাদের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিবেদন করেন, এমন ছয়জন সাংবাদিক ও বিশ্লেষকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই নিবন্ধে অনুসন্ধান করা হয়েছে, কীভাবে এসব পরস্পরবিরোধী চাপ সামলানো যায়। আর তা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত, পেশাগত ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে কী ধরনের মূল্য দিতে হয়।
প্রবেশাধিকার নির্ভর করে আস্থার ওপর, পরিচয়পত্রের ওপর নয়
সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কেবল আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির (অ্যাক্রেডিটেশন) মাধ্যমেই প্রবেশাধিকার পাওয়া যায় না। বরং স্থানীয়দের আস্থা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং জনগোষ্ঠীর মনোভাব ও গতিবিধি সম্পর্কে বোঝাপড়ার মাধ্যমেই তা নিশ্চিত করতে হয়। সংবাদমাধ্যমের পরিচয়পত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের চেয়েও অনেক সময় এই বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০০১ সাল থেকে তালেবান ও আল-কায়েদা নিয়ে প্রতিবেদন করেন সাংবাদিক সামি ইউসাফজাই। তার মতে, এই বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির মাধ্যমে। তিনি বলেন, “অনুসন্ধানী সাংবাদিকের জন্য কোনো এলাকার পরিস্থিতি, নিরাপত্তা, স্থানীয় পরিবেশ, ঝুঁকি ও সম্ভাব্য সুযোগ সম্পর্কে বোঝাপড়া তৈরিতে স্থানীয় ফিক্সার বা কোনো গোত্রের প্রবীণ ব্যক্তি প্রায় ক্ষেত্রে প্রথম সোর্স হিসেবে কাজ করেন।” তার ভাষায়, বাইরের কোনো সাংবাদিকের পক্ষে কার্যকরভাবে কাজ করা “সম্ভব নাও হতে পারে”। ইউসাফজাইয়ের মতে, একজন ভালো ফিক্সার প্রায়ই নিরাপত্তা পরামর্শক, সাংস্কৃতিক দোভাষী, স্থানীয় বিশ্লেষক, মধ্যস্থতাকারী এবং একজন বিশ্বস্ত সহযোগীর ভূমিকা পালন করেন।

ইসলামাবাদে একটি প্রতিবেদনের কাজ করছেন সামি ইউসাফজাই। ছবি: লেখকদের সৌজন্যে
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের একসময়ের উপজাতীয় জেলা সোয়াত এবং আফগানিস্তান। উভয় অঞ্চল নিয়েই ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে সামরিক বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে অনুসন্ধান করছেন পাকিস্তানি সাংবাদিক সুমেরা খান। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “পাকিস্তান ও আফগানিস্তান—দুই দেশেই তারা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। এসব দুর্গম ও কঠিন এলাকায় যোগাযোগ ও চলাচলের জন্য তারা আমাকে থাকার ব্যবস্থা এবং পরিবহন সুবিধা দিয়েছে।”
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুর্গম এলাকায় গিয়ে কাজের ক্ষেত্রে শারীরিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রভাব ফেলে। আফগানিস্তানে যখন প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থা ছিল, সেসময় তিনি দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে যাতায়াত করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান তালেবান কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের আগে থেকেই কোথায় যাবেন এবং কার কার সাক্ষাৎকার নেবেন, তা জানাতে বাধ্য করে। পাশাপাশি, তারা সাংবাদিকদের কোনো এলাকায় প্রবেশের অনুমতি সীমিত বা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতাও রাখে।
ইসলামাবাদভিত্তিক সাংবাদিক ইমতিয়াজ বেলুচ মূলত বেলুচিস্তানের বাসিন্দা। তিনি প্রদেশটির দুর্গম ও সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলো থেকে প্রতিবেদন করার জন্য পরিচিত। তার মতে, স্থানীয় শিকড় সাংবাদিকতার কাজে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এনে দেয়। অঞ্চল, সেখানকার মানুষ এবং বিভিন্ন যোগাযোগের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে পরিচিতি থাকায় তিনি এমন কিছু জায়গায় যেতে এবং এমন কিছু সূত্রের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন, যেখানে বাইরের সাংবাদিকদের জন্য পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। তিনি বলেন, “বেলুচিস্তানের মানুষ হওয়ায় ইসলামাবাদ বা অন্যান্য কেন্দ্রিয় শহরে অবস্থান করা সাংবাদিকদের তুলনায় প্রত্যন্ত এলাকাগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করা আমার জন্য সহজ।”
সব সময়ই দুই পক্ষের নজরদারির মধ্যে থাকতে হয়
তাই যুদ্ধ বা সংঘাত বিটের সাংবাদিকেরা ক্রমশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক তথ্যপরিবেশে কাজ করছেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রবহির্ভূত উভয় পক্ষই স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত, নজরদারি বা সীমিত করার চেষ্টা করে।
এ প্রসঙ্গে খান বলেন, এই দ্বিমুখী নজরদারি সাংবাদিকতার কাজেরই একটি অংশ। তিনি বলেন, “আমি যদি বলি যে রাষ্ট্র আপনার ওপর নজর রাখছে না, তাহলে সেটা ভুল হবে। রাষ্ট্রের নিজস্ব কারণ আছে, আর বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোরও নিজস্ব কারণ আছে।” তিনি আরও বলেন, সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে প্রতিবেদন করার সময় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ব্যাপারে সাংবাদিকদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়, কারণ তারা অত্যন্ত নির্মম।
তবে কারা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তা সংঘাতের ধরন ও পরিস্থিতির সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর অঞ্চলে আট বছর ধরে সাংবাদিকতা করছেন স্বাধীন সাংবাদিক কুরাতুলাইন রেহবার। তিনি উল্লেখ করেন, নব্বইয়ের দশকে সাংবাদিকরা যেমন একদিকে উগ্রবাদী গোষ্ঠী এবং অন্যদিকে রাষ্ট্র, উভয় পক্ষের কাছ থেকেই হুমকির মুখে পড়তেন। বর্তমানে পরিস্থিতি আর তেমনটি নেই। কারণ “এখন উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও সংবাদপত্রের মধ্যে আগের মতো সরাসরি যোগাযোগ আর নেই,” বলেন তিনি।
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের আরেকজন সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১৯ সালের পর সেখানকার গণমাধ্যম পরিবেশ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ওই বছর ভারত অঞ্চলটির আধাস্বায়ত্তশাসিত সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে এবং কাশ্মীরকে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। তিনি বলেন, “এরপর থেকে চাপটা মূলত রাষ্ট্রের দিক থেকেই আসছে। কর্তৃপক্ষ একটি প্রতিবেদনের প্রতিটি শব্দ খুঁটিয়ে দেখে এবং সাংবাদিকদের তাদের প্রতিবেদন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।”
মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সংঘাত নিয়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবেদন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা জেসন বার্কের। তিনি সন্ত্রাসবাদ ও সংঘাত নিয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। বইগুলো বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে “আল-কায়েদা: দ্য ট্রু স্টোরি অব র্যাডিক্যাল ইসলাম” এবং “দ্য ৯/১১ ওয়ার্স” । তিনি মনে করেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো গণমাধ্যমের সঙ্গে যেভাবে যোগাযোগ করে, এই পরিবর্তনগুলো তাতে ঘটে যাওয়া বৃহত্তর পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
“১৯৯০-এর দশক থেকে অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠীই, সবাই নয়, সাংবাদিকদের ক্রমশ বেশি করে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছে,” বলেন বার্ক। তার মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে আংশিকভাবে উগ্রবাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা দায়ী। আরেকটি কারণ হলো, “আগের মতো এখন আর তাদের সাংবাদিকদের প্রয়োজন হয় না, কারণ তারা নিজেরাই অনলাইনের মাধ্যমে সরাসরি দর্শক বা শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে পারে।” এর ফলে সংঘাত নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকেরা এমন এক তথ্যপরিবেশে কাজ করছেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রবহির্ভূত উভয় পক্ষই স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত, নজরদারি বা সীমিত করার চেষ্টা করে।
যাচাইকরণ একটি প্রক্রিয়া, কেবল কোনো ঘরে টিক চিহ্ন দেওয়া নয়
সরকার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী, উভয় পক্ষই সংঘাত বিষয়ক বয়ান বা আখ্যান নিজেদের মতো করে গড়ে তুলতে চায়। তাই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা কোনো সাধারণ বিষয় নয়; বরং এটি হওয়া প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল ও একাধিক সূত্র নির্ভর প্রক্রিয়া। পাকিস্তানভিত্তিক দ্য খোরাসান ডায়েরির সহপ্রতিষ্ঠাতা ইহসানুল্লাহ টিপু মাসিদ। তিনি বলেন, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর থেকে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর প্রচারণায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিশীলিত ভাব এসেছে। কারণ তারা এখন নিজেদের চালানো হামলার পেশাদার মানের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করছে।
যদিও এ ধরনের তথ্য কোনো ঘটনা ঘটার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। তবুও মাসিদ সতর্ক করে বলেন যে, এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য দাবি, বিশেষ করে হতাহতের সংখ্যা ও অভিযানের সাফল্যের বিবরণ প্রায়ই অতিরঞ্জিত করা হয়। তাই তিনি স্থানীয় সাংবাদিক, বাসিন্দা, হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে প্রতিটি ঘটনা যাচাই করার নীতি অনুসরণ করেন। পাশাপাশি সরকারি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিগুলোর ক্ষেত্রেও সমান সতর্কতা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রয়োগ করেন। তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকদের উচিত তথ্যগুলোকে নিছক ধ্রুব সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে সেগুলোর সোর্স স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা।”
বেলুচিস্তানে একই ধরনের ধাপে ধাপে তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার কথা বলেন বেলুচ। তিনি বলেন, “আমরা স্থানীয় সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করি, এরপর স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তা যাচাই করে নিই।” তার ভাষায়, এই পদ্ধতিটি মূলত “একটি ত্রিভুজের মতো”। তার কাছে তথ্য যাচাই শুধু ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ঘটনাকে বর্ণনা করতে কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও এর অংশ। তিনি সতর্ক করে বলেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পছন্দ করে এমন তকমা ব্যবহার করা “সব সময় আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এতে একজন প্রতিবেদক বা সংবাদমাধ্যমের পক্ষপাত প্রকাশ পেতে পারে।” এতে স্পষ্ট হয়, তথ্যের মতো শব্দচয়নও কীভাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ানের বার্ক প্রতিবেদনের আরেকটি ভিন্ন, তবে সমানভাবে প্রচলিত ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। সেটি হলো, যেসব সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রায়ই বিচ্ছিন্নভাবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করে, তাদের একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে দেখার চেষ্টা করা। তিনি বলেন, বাস্তবে এসব সংগঠন “আমরা যতটা মনে করি, তার চেয়ে অনেক বেশি বিশৃঙ্খল। আর তারা সাংগঠনিক সম্পর্কের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপরই বেশি নির্ভরশীল।” তার এই পর্যবেক্ষণ মনে করিয়ে দেয়, কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তথ্য যাচাই কেবল তা নিশ্চিত করার বিষয় নয়। সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে অতিরিক্ত সরল করে দেখাতে পারে—এমন অনুমান থেকেও সাংবাদিকদের দূরে থাকতে হবে।
সংঘাতময় পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে লিঙ্গ পরিচয় কীভাবে প্রভাব ফেলে
সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত নারীদের ক্ষেত্রে বিপদ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সাধারণ কিছু কাজের জন্যও তাদের এমন সব সামাজিক ও পেশাগত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যা পুরুষ সহকর্মীদের সচরাচর পোহাতে হয় না। খান সতর্ক করে বলেন, কোনো পুরুষ সোর্স বা সূত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার মতো সাধারণ একটি কাজকেও সহকর্মীরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে না দেখে বরং কেলেঙ্কারি বা অনৈতিক কিছু হিসেবে গণ্য করতে পারেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “একই সূত্রের সঙ্গে যদি আমি দেখা করি, তবে আমাকে ‘খারাপ মানুষ’ হিসেবে দেখা হয়; অথচ কোনো পুরুষ সাংবাদিক যদি সেই একই সূত্রের সঙ্গে দেখা করেন, তবে তাকে ‘খুব ভালো সাংবাদিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।”
কুরাতুলাইন রেহবার বলেন, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে প্রতিবেদন করার কারণে তার জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। তিনি বলেন, “কাশ্মীরি সাংবাদিকদের ওপর দ্বিগুণ চাপ রয়েছে।” তার ব্যাখ্যা, সাংবাদিকতার কাজের পাশাপাশি কাশ্মীরি মুসলিম নারী হিসেবে তার পরিচয়ের কারণেও তাকে সুপরিকল্পিত অনলাইন হেনস্তার শিকার হতে হয়। তিনি জানান, একবার একজন সম্পাদক তাকে এর পরিবর্তে “ইতিবাচক গল্প” নিয়ে কাজ করতে বলেছিলেন। আবার কিছু সহকর্মীকেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লেখালেখি করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল।
নিউজরুমের এসব চাপ সত্ত্বেও রেহবার স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করার ব্যাপারে অবিচল ও অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি বলেন, তার দায়িত্ব হলো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা। তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকতার অর্থ হলো তথ্য তুলে ধরা এবং সত্য বলা। আমি যদি তা করতে না পারি, তাহলে সাংবাদিকতা করার কোনো অর্থই হয় না।”
এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, সংঘাত নিয়ে সাংবাদিকতা করা অনেক নারীর জন্য সবচেয়ে বড় বাধা শুধু যুদ্ধের শারীরিক ঝুঁকি নয়; এর সঙ্গে রয়েছে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক রীতিনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক চাপ এবং পেশাগত নানা প্রতিবন্ধকতা—যেগুলো নির্ধারণ করে কারা প্রতিবেদন করার সুযোগ পাবেন এবং কী ধরনের পরিস্থিতিতে তারা তা করতে পারবেন।

পাকিস্তানি সাংবাদিক সুমেরা খান ২০০০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে সংঘাত, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে প্রতিবেদন করে আসছেন। ছবি: লেখকদের সৌজন্যে
সংঘাত নিয়ে সাংবাদিকতার দীর্ঘস্থায়ী মূল্য
সংঘাতময় পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহের মাশুল কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো কোনো সাংবাদিকের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি শারীরিক। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে তা আইনি বা সুনাম-সংক্রান্ত হতে পারে। কিংবা এর ভার তাদের সহকর্মী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপরও যৌথভাবে পড়তে পারে। সাক্ষাৎকার প্রদানকারী একাধিক সাংবাদিক বলেন, দায়িত্ব যত বাড়ে, এসব চাপ ও বোঝা তত গভীর হয়।
মাসুদ বলেন, নিজের সংবাদকক্ষ প্রতিষ্ঠার পর ঝুঁকির সঙ্গে তার সম্পর্কটাই মৌলিকভাবে বদলে গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “একবার আপনি একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে, দায়িত্ব শুধু আপনার নিজের নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পুরো একটি দলের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্যও আপনাকে দায়বদ্ধ হতে হয়।”
ইউসাফজাইয়ের ক্ষেত্রে এই মূল্য দিতে হয়েছে ব্যক্তিগতভাবেই। তাকে ৪৫ দিন আটক রাখা হয়েছিল। দুইবার অপহরণের শিকার হয়েছেন। আর ২০০৮ সালে তাকে গুলি করা হয়। সেই গুলির একটি তার হাতের ভেতরেই রয়ে গেছে। তিনি স্বীকার করেন, “সত্যি বলতে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আমি সত্যিকার অর্থেই সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু নিজেকে এর থেকে দূরে রাখতে পারিনি। সাংবাদিকতা এক ধরনের নেশা; একবার এটি আপনার সত্তার অংশ হয়ে গেলে, তা ছেড়ে যাওয়া খুব কঠিন।”
এই সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে সংবাদ সংগ্রহের বিষয়ে একটি বৃহত্তর বাস্তব সত্যকে তুলে ধরে: সেখানে প্রবেশের সুযোগ পাওয়াটা কেবল শুরুর ধাপ মাত্র। আসল বড় চ্যালেঞ্জটি হলো—সরকার, সশস্ত্র গোষ্ঠী, সম্পাদক এবং সংঘাতের মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে আসা নানামুখী ও পরস্পরবিরোধী চাপ সামলে স্বাধীনভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া।
তবে ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তারা যে ধরনের সংঘাত নিয়ে প্রতিবেদন করেন, সেসব ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলেও সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া সাংবাদিকেরা বারবার একই নীতিগুলোর কথা বলেছেন: স্থানীয় সম্পর্কের মাধ্যমে আস্থা অর্জন, প্রতিটি দাবি কঠোরভাবে যাচাই এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা।
সংঘাত নিয়ে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু পেশাগত গুণই নয়; এটি জনআস্থার ভিত্তি এবং একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে মূল্যবান সুরক্ষা কবচ। অথচ বৈপরিত্যের বিষয় হলো, ঠিক এই গুণটিই তাদের চরম ঝুঁকির মুখেও ঠেলে দিতে পারে।
নাতাশা মাতলুব অক্সফোর্ড গ্লোবাল সোসাইটির একজন গবেষণা সহকারী। তিনি ইসলামাবাদের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটিতে স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে এমফিল করছেন। দ্য ডিপ্লোম্যাট, স্টিমসন সেন্টার এবং দ্য ফ্রাইডে টাইমসসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি রাজনীতি, মানবাধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে লেখেন।

ইয়ুম্মনা হিনা খান পাকিস্তানভিত্তিক একজন সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি সংঘাত, নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে লেখেন। দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গিবাদ, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। দ্য ফ্রাইডে টাইমস ও স্টিমসন সেন্টারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে তিনি সমসাময়িক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখছেন।