প্রবেশগম্যতা সেটিংস

ছবি: শাটারস্টক

লেখাপত্র

বিষয়

প্রতিবেদনের প্রভাব গণমাধ্যমের ওপর পাঠকের আস্থা বাড়িয়ে দেয়: প্রভাব তৈরির সেই কৌশল বলেছেন ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম গাইডের’ দুই লেখক 

সাংবাদিকতা, এনজিও খাত এবং এর বাইরেও ‘ইমপ্যাক্ট’ বা ‘প্রভাব’ শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমই এখন ‘ইমপ্যাক্ট স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘প্রভাব তৈরির কৌশল’ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। কিন্তু তারা কীভাবে আরও ভালো করতে পারে, এর লক্ষ্য কী হওয়া উচিত এবং কোন ধরনের পদ্ধতিগত চর্চার ওপর তাদের নির্ভর করা উচিত?

নিজেদের প্রয়োজনেই এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ডিসক্লোজ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম রেমবোবিন গত শরতে ‘দ্য গাইড টু ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম’ প্রকাশ করে। ডিসক্লোজ জিআইজেএনের সদস্য। অনলাইনে বিনামূল্যের এই গাইডে রয়েছে ফ্রান্স ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইমপ্যাক্ট জার্নালিজমের সেরা কিছু অনুশীলন।

গাইডটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের অপেক্ষায়। বিস্তারিত জানতে এই গাইডের দুই লেখক ডিসক্লোজের জলবায়ু ও দূষণবিষয়ক উপপ্রধান সম্পাদক এবং ইমপ্যাক্ট স্ট্র্যাটেজির সহসমন্বয়ক পিয়ের ল্যেবোভিসি এবং রেমবোবিনের সম্পাদক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা তিমোথে ভিনশঁ-এর সঙ্গে কথা বলেছে জিআইজেএন।

Disclose Guide to Impact Journalism

ডিসক্লোজ ও রেমবোবিনের ‘গাইড টু ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম’। ছবি: স্ক্রিনশট

জিআইজেএন: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে “ইমপ্যাক্ট” বা প্রভাব কেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়?

পিয়ের ল্যেবোভিসি: প্রভাবের প্রশ্নটি আসলে একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন সামনে আনে: “আমার পেশার উদ্দেশ্য কী? অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য কী?” ভুল তথ্য, বিনোদনমূলক কনটেন্ট ইত্যাদি যখন এতটা প্রাধান্য পাচ্ছে, তখন আমার মনে হয়, নিজেদের এই প্রশ্নটি করা জরুরি। আর সাংবাদিকতার প্রভাব মূল্যায়নের ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যারোমিটার হিসেবে নয়, বরং নিজেদের কাজ নিয়ে আত্মবিশ্লেষণের একটি উপায় হিসেবে। সর্বোপরি, পাঠক ও দর্শকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের রাস্তা হিসেবে।

গণতন্ত্র এবং গণমাধ্যমের ওপর আস্থার সংকট রয়েছে। যা আমরা গ্লোবাল নর্থ ও গ্লোবাল সাউথ, উভয় অঞ্চলের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেই দেখছি। তাই আমাদের এমন সব উপায় বা কৌশল আয়ত্ত করা জরুরি যা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভূমিকাকে কেবল তথ্য প্রকাশের গণ্ডিতে আটকে না রেখে, বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে জোর দেওয়ার দিকে নিয়ে যাবে। অনিয়ম বা অপকর্ম উন্মোচনকারী প্রতিবেদনের বাইরে গিয়ে আমাদের ভিন্ন এক কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। যা নিশ্চিত করবে যারা পরিবর্তন সাধনে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, তাদের নজরে যেন এসব বিষয় পৌঁছায়। অর্থাৎ, মাঠপর্যায়ে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এবং জনপরিসরে যেন এই বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়… গণমাধ্যমের ওপর আস্থাহীন বা সন্দিহান সাধারণ মানুষকে আমরা এর চেয়ে ভালো আর কী-ই বা উপহার দিতে পারি? এটি হতে পারে পারস্পরিক পূর্ণ আস্থার এক অনন্য অঙ্গীকার।

তিমোথে ভিনশঁ: আজকাল অসংখ্য খবরের আড়ালে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তা যতই উচ্চমানের হোক না কেন, খুব দ্রুতই অন্য খবরের ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে। তাই এসব অনুসন্ধানের প্রভাব যতটা সম্ভব বাড়ানোর চেষ্টা করা জরুরি।

আরেকটি সুবিধাও রয়েছে। আমরা দেখেছি, এই ধরনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ, যেমনটা রেমবোবিনে আমরা স্বাধীন গণমাধ্যমের কাজের ক্ষেত্রে করি, সাংবাদিকদের এমন কিছু ফলাফল বা প্রভাব দেখতে সাহায্য করে, যেগুলো তারা আগে বিবেচনাই করেননি। কখনো কখনো এভাবে আরও অনুসন্ধানের পথও তৈরি হয়।

জিআইজেএন: যে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের অনেক আগেই ইমপ্যাক্ট স্ট্র্যাটেজি’ বা প্রভাব তৈরির ওপর গাইডে জোর দেওয়া হয়েছে। কেন?

পিএল: সাংবাদিকতার প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা তাদের প্রতিবেদন তৈরি করেন। নির্ধারিত দিনে সেটি প্রকাশ করেন। আর আশা করেন, সমাজে এর প্রভাব পড়বে। এরপর তারা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু আপনি যখন ইমপ্যাক্ট জার্নালিজমের চর্চা করছেন এবং অনুসন্ধান প্রকাশের পর পরিবর্তনের পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে চাইছেন, তখন এর জন্য আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। এর মানে, প্রয়োজন অনুসারে সুশীল সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংগঠনের সঙ্গে আগেই বিষয়টি ভাগ করে নেওয়া। যাতে প্রকাশের দিন এসব অধিকারকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসন্ধানটি শেয়ারের পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক মহলের পরিচিতদের কাছেও সেটি পাঠাতে পারেন। এমনকি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতিও নিতে পারেন। ডিসক্লোজে একবার আমরা একটি অনুসন্ধান প্রকাশের দুই সপ্তাহ আগে একটি এনজিওকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য সরবরাহ করি। এতে ওই এনজিওর আইনজীবীরা অভিযোগ প্রস্তুত করার সময় পেয়েছিলেন। আমাদের অনুসন্ধান প্রকাশের কয়েক দিন পরই অভিযোগটি দাখিল করা হয়। আমি বুঝতে পারি, প্রচলিত ধারার কোনো বার্তাকক্ষের কাছে এটিকে অ্যাক্টিভিজম বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে এটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতারই একটি সম্প্রসারিত রূপ।

জিআইজেএন: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারিসে আপনারা প্রথম ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করেছিলেন। আপনাদের প্রাপ্তিগুলো কী?

পিএল: আমরা অনেক অনুসন্ধানী সাংবাদিককে নিয়ে এসেছিলাম, যারা তাদের অনুসন্ধানের প্রভাব সম্পর্কে বলেন। এরপর আমরা কর্মশালার আয়োজন করি। যেখানে একটি কাল্পনিক বিষয়কে কেন্দ্র করে ইমপ্যাক্ট স্ট্র্যাটেজি তৈরির কাজ করা হয়। এটি নিয়ে বেশ কিছু নৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়। তবে এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, সাংবাদিকদের কাজের অংশ হিসেবে প্রভাব তৈরির দিকে মনোযোগ দেওয়ার ধারণার প্রতি একধরনের অনিহা রয়েছে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও সমাজের অন্যান্য অংশের মধ্যে আরও বেশি সংযোগ তৈরি প্রয়োজন: এ বিষয়ে সবাই একমত হয়েছিলেন। তবে এর মাধ্যমে আমরা যেন নিজেদের একটি বদ্ধ গণ্ডির মধ্যে আটকে না রাখি, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এই আয়োজনের অন্যতম প্রাপ্তি এটাই।

GIJN Academy masterclass video on impact, Pierre Leibovici

জিআইজেএন: একটি অনুসন্ধানের কোন পর্যায় থেকে বার্তাকক্ষের উচিৎ প্রভাব তৈরির প্রস্তুতি শুরু করা?

পিএল: ডিসক্লোজে আমরা কোনো একটি বিষয় নিয়ে কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই সেটির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভাবতে শুরু করি। আমরা মার্ক লি হান্টারের ‘হ্যান্ডবুক অব দ্য ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট’ বইয়ে বর্ণিত ‘হাইপোথিসিস-ড্রিভেন ইনভেস্টিগেশন’ বা ‘অনুমাননির্ভর অনুসন্ধান’ মডেল অনুসরণ করি। অনুসন্ধানের মাধ্যমে আমরা যেসব অনুমান প্রমাণের চেষ্টা করব, সেগুলো তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি আমাদের অনুসন্ধানের ফলে কী ধরনের সম্ভাব্য প্রভাব তৈরি হতে পারে, তারও একটি তালিকা তৈরি করি। তাই কোনো প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং কাজ শুরু হওয়ার পরই সম্পাদকেরা সুশীল সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদের প্রতিক্রিয়াগুলো যাচাই করা শুরু করেন।

অনুসন্ধান প্রকাশের অন্তত এক মাস আগে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে নিয়ে বড় আকারে “ইমপ্যাক্ট মিটিং“ করি। আমাদের লক্ষ্য অনুসারে কীভাবে পাঠকের পরিধি বাড়ানো যায় এবং আরও কাদের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব, তা নিয়ে সেখানে আলোচনা করা হয়। এরপর প্রতিবেদনটি প্রকাশের সাত দিন আগে আমরা আরেকটি ইমপ্যাক্ট মিটিং করি। প্রকাশের এক বা দুই দিন আগে সাধারণত আমরা অনুসন্ধানটি সাংবাদিকদের এবং এএফপিকে পাঠাই। যেন তা বিভিন্ন গণমাধ্যমে কভারেজ পায়। এছাড়া বিশেষায়িত বা নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করে এমন কিছু গণমাধ্যমের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করি। যেন বিশেষ বা নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি আগ্রহ রয়েছে, এমন শ্রোতা বা পাঠকের কাছে আমরা পৌঁছাতে পারি।

জিআইজেএন: আপনাদের গাইডে প্রভাবের কিছু মানদণ্ড নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো কী কী?

পিএল: আসলে, প্রতিটি সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি সংগঠনেরই নিজস্ব প্রভাবের মানদণ্ড নির্ধারণ করা উচিত। এমন সংগঠনের উদাহরণ হিসেবে আমি জিআইজেএনের কথা বলতে পারি। আমি ডিসক্লোজে যোগ দেই ২০২২ সালের শেষ দিকে। তখনও আমাদের সম্ভাব্য প্রভাবগুলো কী হতে পারে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করিনি। আমার প্রথম দিকের কাজগুলোর একটি ছিল আমাদের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাবের মানদণ্ড নির্ধারণ করা।

প্রভাব তৈরিতে এগ্রিয়ে রয়েছে, এমন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও এনজিওর কাছ থেকে ধারণা নিয়ে আমি তখন প্রায় এক ডজন মানদণ্ডের একটি তালিকা তৈরি করি। বর্তমানে আমাদের ২০টি মানদণ্ড রয়েছে, যা একান্তই আমাদের নিজস্ব। এই মানদণ্ডগুলো চারটি বড় শ্রেণিতে বিভক্ত: গণমাধ্যমে প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব, আইনি প্রভাব এবং সামাজিক প্রভাব।

ইমপ্যাক্ট স্ট্র্যাটেজি নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করা প্রায় সব সংবাদ মাধ্যমেই এই ধরনের মানদণ্ড দেখা যায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু সংখ্যা নয়, বরং আপনার প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মানদণ্ডগুলো কতটা প্রাসঙ্গিক, তা দেখা।

The 20 criteria across four categories that Disclose uses to assess their impact.

ডিসক্লোজ তাদের প্রভাব মূল্যায়নে এই চারটি বিভাগে ২০টি মানদণ্ড ব্যবহার করে। ছবি: ডিসক্লোজের সৌজন্যে

জিআইজেএন: কার্যকর প্রভাব পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বার্তাকক্ষ কী ধরনের টুল ব্যবহার করতে পারে?

পিএল: টুলটি কী, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মূল বিষয় হলো, একটি ডেটাবেস থাকা এবং সম্পাদকীয় দলের মধ্যে একজনকে এর দায়িত্ব দেওয়া। ওই ব্যক্তিকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রভাবের বিভিন্ন সূচক নিয়মিতভাবে ডেটাবেসে যুক্ত করা হচ্ছে। ডিসক্লোজে আমরা প্রভাবের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করি। আর তা করার মতো সামর্থ্যও আমাদের আছে। কারণ আমরা বছরে খুব কমসংখ্যক অনুসন্ধান প্রকাশ করি। ২০ থেকে ২৫টির মতো। আমরা ব্যবহার করি নোশন টুল। এর মাধ্যমে সহজে ফিল্টার করা যায় এমন দৃশ্যমান ডেটাবেস তৈরি করা সম্ভব। যা আমাদের জন্য বেশ সুবিধাজনক। বিশেষ করে যখন আমরা বার্ষিক ইমপ্যাক্ট রিপোর্ট তৈরি করি। কারণ তখন এক নজরেই সব তথ্য দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে, প্রতিটি ইমপ্যাক্ট রিপোর্টে আমাদের এই ইমপ্যাক্ট ডেটাবেসের লিংকও সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।

জিআইজেএন: একটি অনুসন্ধানের প্রভাব বাড়ানোর আরও কিছু উপায় বলুন…

টিভি: যেসব বার্তাকক্ষ প্রভাবের বিষয়কে ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিবেদন প্রকাশের প্রসঙ্গটি প্রায়ই আলোচনায় আসে। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে: “এই প্রকল্পের লক্ষ্য কি দেশের সীমানা পেরিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো?” অথবা এর বিপরীতে, অনেক ছোট ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা উচিত কি না। কারণ স্থানীয় প্রাসঙ্গিকতার দিক থেকে এটি যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। এতে এমন পাঠকদের কাছে প্রতিবেদনটি পৌঁছাবে, যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পিএল: প্রতিটি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেই আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি, লিখিত প্রতিবেদনের বাইরে গল্পটিকে আরও জীবন্ত করে তুলতে এটির কোনো অডিওভিজ্যুয়াল রূপ দেওয়া সম্ভব কি না। এ ছাড়া, আমরা কনটেন্ট নির্মাতাদের সঙ্গে আরও বেশি অংশীদারত্ব গড়ে তুলছি। ফ্রান্সে মিডিয়াপার্টও এই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। আর তাতে দারুণ ফলাফলও এসেছে। যেমন, গত ফেব্রুয়ারিতে পিএফএএস নিয়ে করা একটি অনুসন্ধানে আমরা একজন ফরাসি কনটেন্ট নির্মাতার সঙ্গে অংশীদারত্ব করি। তিনি দুই মিনিটের একটি ভিডিও তৈরি করেন, যা প্রায় ২০ লাখ বার দেখা হয়। এর ফলে কারিগরি ও জটিল একটি বিষয় নিয়ে আমাদের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যগুলো আরও ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

টিভি: মানুষ যে ধরনের মাধ্যম ও উপস্থাপনা পছন্দ করে, সেই পদ্ধতি দিয়েই তাদের কাছে পৌঁছানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও আমি যোগ করতে চাই। উদাহরণ হিসেবে ‘বন্ডি ব্লগ’ এর কথাই বলা যাক; শ্রমজীবী ​​এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে জনপ্রিয় খেলা নিয়ে বাজি ধরার (স্পোর্টস বেটিং) বিষয়টি ঘিরে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং এর দ্বারা প্রভাবিত তরুণ, উভয় পক্ষকেই একত্রিত করে। ডিসক্লোজও সম্প্রতি  পিএফএএস দূষণ নিয়ে আরদেন অঞ্চলে করা একটি অনুসন্ধানে একই ধরনের উদ্যোগ নেয়। এই ধরনের উদ্যোগ আমাদের সংশ্লিষ্ট শ্রোতাদের কাছাকাছি যতটা সম্ভব পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়।

জিআইজেএন: এমন কোনো পরিস্থিতি কি আছে, যেখানে একটি অনুসন্ধানের প্রভাব তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে?

টিভি: রেমবোবিনে আমরা ফরাসি ভাষার স্বাধীন গণমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরবর্তী প্রভাব নথিবদ্ধ করি। আর আমরা যা দেখেছি, তা হলো স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতির কিছু ঘটনা কখনো কখনো প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি করতে পারে না।

গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে বড় ফরাসি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর অনিয়ম ও অপকর্ম নিয়ে করা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও কখনো কখনো একই ঘটনা ঘটে। ইমপ্যাক্ট স্ট্র্যাটেজি বা প্রভাব তৈরির কৌশল নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কাজ না করা হলে এসব বিষয় খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে আড়ালে পড়ে যায়। যদিও এগুলোর সঙ্গে বড় ধরনের সমস্যা জড়িত থাকে।

পিএল: আমাদের কাজের ধরনে কখনো কখনো ফ্রান্স বা ইউরোপের দিকে ঝোঁকার একটা প্রবণতা দেখা যায়। এমনকি ডিসক্লোজের ক্ষেত্রেও যা আমরা এখন সংশোধনের চেষ্টা করছি।

মোজাম্বিক থেকে কয়লা সংগ্রহ করে এমন একটি ইস্পাত উৎপাদনকারী বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এপ্রিলে আমরা একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলাম। এবার আমরা সত্যিকার অর্থেই দেশটির সুশীল সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এরপর ওই প্রতিষ্ঠানকে কয়লা সরবরাহ করে এমন একটি কয়লাখনির আশপাশে বসবাসকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনার অনুরোধ জানাই। একটি অলাভজনক সংস্থা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই অনুসন্ধানটি পর্তুগিজ ভাষায় অনুবাদ করে দেয়, যাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে এটি পৌঁছানো যায়। এমন সংবাদমাধ্যমের চমৎকার উদাহরণ লাইটহাউস রিপোর্টস এবং দ্য এক্সামিনেশন। যারা বহুজাতিক কোম্পানির নানা অনিয়ম ও নিপীড়নের শিকার হওয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্য সফলভাবে নিজেদের অনুসন্ধানের প্রভাব কাজে লাগিয়েছে।

জিআইজেএন: প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য গাইডটিতে আলাদা জায়গা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কেন?

পিএল: সেইসব অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যারা অনেক বেশি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। একইভাবে, যেসব প্রচলিত গণমাধ্যম অনুসন্ধানী প্রতিবেদনসহ অন্যান্য ধরনের কনটেন্টও প্রকাশ করে, তাদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানের প্রভাব নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো অন্য সব প্রতিবেদনের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়াটা ভীষণ দুঃখজনক। বার্তাকক্ষটি আসলে কোন বিষয় বা পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে, তখন তা বোঝাটা কঠিন হয়ে পড়ে। গাইডটিতে প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে আলাদা করে চেনা যায়—এমন ভিজ্যুয়াল সংকেত এবং নির্দিষ্ট সম্পাদকীয় জায়গা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরও এক ধাপ এগিয়ে বছরে একবার অথবা তার চেয়েও বেশি ইমপ্যাক্ট বা প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। এগুলো খুব সংক্ষিপ্তও হতে পারে। গাইডটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য মার্শাল প্রজেক্টের উদাহরণ টানা হয়েছে। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমটি বিচারব্যবস্থা ও কারাগার ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে। তারা প্রতি তিন মাসে একটি করে ইমপ্যাক্ট রিপোর্ট প্রকাশ করে। তবে প্রতিবেদনগুলো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। পুরোনো দিনের গেজেটের মতো মাত্র দুই পৃষ্ঠার। এগুলো বেশ ভালোভাবে তৈরি করা হয়। আগের তিন মাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন প্রভাবের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনগুলো সাধারণ পাঠক এবং তাদের অর্থদাতাদের কাছে পাঠানো হয়।

প্রতিটি দিক থেকে এর প্রভাব তুলে ধরার জন্য একটি সৃজনশীল ক্ষেত্র তৈরি করা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে দারুণ একটি মাধ্যম। ডিসক্লোজে আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টের অর্ধেকজুড়ে থাকে আমাদের অনুসন্ধানের প্রভাব বিষয়ক বিষয়বস্তু, আর বাকি অর্ধেকজুড়ে থাকে আমাদের করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। আমার মনে হয়, বিষয়টি জোর দিয়ে বলা জরুরি যে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এটিই আমাদের আগ্রহের জায়গা। একটি অনুসন্ধানের কী প্রভাব পড়ল, তা দেখা। কোনো চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ করা নয়, একদিন পরই যা মানুষ ভুলে যাবে।


 আলসিওনে ওয়েমেয়ার জিআইজেএনের ফরাসি সম্পাদক এবং প্যারিসভিত্তিক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি এর আগে প্যারিসে ইউরোপ১ ও ফ্রান্স২৪-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন। তার লেখা লে মন্ডেস্লেটইনফোমাইগ্রান্টসলা ক্রনিক, এল’অবস এবং লে তঁপ-এ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সায়েন্স পো লিওনে সহযোগী অধ্যাপক। সেখানে তিনি যৌথভাবে ডেটা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর মাস্টার্স ডিগ্রির দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি সেলসা থেকে স্নাতক করেছেন এবং ফ্রাঁসোয়া চালেই প্রাইজ বিজয়ী।

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

বণ্টন ও প্রচার

মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত স্ক্রল করা পাঠকদের জন্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন উপস্থাপন কৌশল

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সময়সাপেক্ষ। প্রকাশের জন্য একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে মাসের পর মাস নথিপত্র পর্যালোচনা, সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং তথ্য যাচাই করতে হয়। কিন্তু মানুষ যেভাবে সংবাদ খুঁজে পায় এবং পড়ে, তা অধিকাংশ সংবাদকক্ষের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুত বদলে গেছে। এখন সংবাদ মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডে, মোবাইল ফোনে, খণ্ড খণ্ডভাবে এবং অন্যান্য ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকেই পড়া হয়।

পরামর্শ ও টুল

ব্যর্থতা অনুসন্ধানে ‘পজিটিভ ডেভিয়েন্ট’ কী, ব্যবহার কীভাবে করবেন, সংবাদের প্রভাব বাড়াতে এর ভূমিকা কতটা

এসব পক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে স্পষ্ট পার্থক্য দেখানো বা জোরালোভাবে বিপরীত চিত্রগুলো (পজিটিভ ডেভিয়েন্ট) বা ওই সম্পর্কিত ইতিবাচক ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলো সংবাদে তুলে ধরা। অর্থাৎ, একই ধরনের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অন্য যে সব প্রতিষ্ঠান এসব সমস্যা এড়াতে সক্ষম হয়েছে, তাদের নীতি ও ফলাফলগুলো পাশাপাশি তুলে ধরা।

ডেটাবেস পরামর্শ ও টুল

আলেফ প্রো টিউটোরিয়াল: ওসিসিআরপির নাম তো শুনেছেন, এবার জানুন এর অনুসন্ধানী ডেটা প্লাটফর্ম থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার উপায়

বিপুল ডেটার মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজারো গল্প। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি খুঁজে বের করতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ ডেটা এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা। এসব তথ্য এমনভাবে সহজলভ্য করে তোলা দরকার যেন ডেটা বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ না হলেও সাংবাদিক ও অনুসন্ধানকারীরা তা ব্যবহার করতে পারেন। আলেফ প্রো ঠিক এই কাজটি করে। 

সাক্ষাৎকার সাংবাদিককে ১০ প্রশ্ন

পুরস্কারজয়ী মিগেল মনে করেন প্রভাবশালী প্রতিবেদনের জন্য দরকার সাংবাদিকের স্বাধীনতা, তাই চাকরি ছেড়ে শুরু করেন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা

মিগেল কারভালহো যে টুলগুলোকে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান মনে করেন, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত নয়। বরং সেগুলো হচ্ছে কাগজের নথিতে সাজানো তাক, বহু ব্যবহারে জীর্ণ নোটবুক, হাজারো ঘণ্টার পড়াশোনা, আর মুখোমুখি বসে করা আলোচনা। বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতাকে যখন ক্রমেই গতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তখন এই পুরস্কারজয়ী পর্তুগিজ অনুসন্ধানী সাংবাদিক এখনো আস্থা রাখেন ধৈর্যের ওপরই।