প্রবেশগম্যতা সেটিংস

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে 'ফ্রি ইরান' বিক্ষোভের সময় একজন বিক্ষোভকারী প্ল্যাকার্ড ধরে আছেন। ছবি: শাটারস্টক

লেখাপত্র

বিষয়

ইন্টারনেট বন্ধ : তারপরও কীভাবে ইরানের বিক্ষোভ দমনে শত শত নিহতের তথ্য নিশ্চিত করলেন বিবিসির বিশেষজ্ঞরা

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

৮ জানুয়ারি, তেহরানের রাজপথের ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা হাজার হাজার অ্যাকাউন্ট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। টানা ১২ দিন ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ বাড়তে থাকার পর কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। ফলে ইরানের মানুষ একে অপরের কাছ থেকে এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

এই লেখাটি যখন লেখা হচ্ছিল সেই সময় পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ বা ব্ল্যাকআউট অবস্থায় ছিল।

তবু কিছু কিছু খবর বাইরে পৌঁছে। রাজপথে গুলিবর্ষণ এবং সরকারপন্থী নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিক্ষোভকারীদের গণহত্যার খবর পাওয়া যায়। তবে এখনো অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে, বিশেষ করে নিহতের সঠিক সংখ্যা। জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার মাই সাতোর মতে, নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৫ হাজার, তবে তা ২০ হাজার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।

এই তথ্যশূন্য পরিস্থিতিতে ওপেন সোর্স কৌশল ব্যবহারকারী সাংবাদিকদের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অল্প কিছু ছবির মধ্য থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য বের করে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ। বিবিসি ভেরিফাইয়ের নেতৃত্বে করা বিবিসি নিউজের এক অনুসন্ধানে তেহরানের একটি  মর্গ (শবাগার) থেকে ফাঁস হওয়া ছবির ভিত্তিতে সরকারের বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তির নিহত হওয়ার সম্ভাব্য তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই অনুসন্ধানের লেখকদের একজন ছিলেন বিবিসি ভেরিফাইয়ের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শায়ান সারদারিজাদেহ। মর্গ সংক্রান্ত এই অনুসন্ধান কীভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকার মধ্যেও তারা কীভাবে ইরান নিয়ে প্রতিবেদন করছেন, এবং ২০২৩ সালের পর থেকে তাদের কাজের প্রক্রিয়া কীভাবে বদলেছে—এসব বিষয়ে জানতে আমি সারদারিজাদেহর সঙ্গে কথা বলেছি। সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপনের জন্য আমাদের আলোচনা সম্পাদনা করা হয়েছে।

প্রশ্ন: আপনারা কীভাবে এই অনুসন্ধানটি শুরু করেছিলেন?

উত্তর: প্রতিবেদনটি প্রকাশের কয়েক দিন আগে দক্ষিণ তেহরানের একটি মর্গের ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। আমাদের ধারণা, বিক্ষোভে নিহত অধিকাংশ মানুষকে সেখানেই নেওয়া হয়েছিল। ওই ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, মর্গের আঙিনায় খোলা জায়গায় মরদেহ রাখা আছে, পাশাপাশি কয়েকটি গুদামের ভেতরেও মরদেহ রাখা হয়েছে।

এগুলো দেখে নিহতের সংখ্যা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। তবে এগুলো ছিল শুধু তেহরান ও এর আশপাশের এলাকায় নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ। একটি ভিডিওতে আমরা আনুমানিক ১৮৬টি মরদেহ এবং আরেকটিতে প্রায় ১৭৮টি মরদেহ গণনা করেছি। এরপর আরও কিছু ভিডিও সামনে আসে। আমরা ওই ভিডিওগুলো এবং যেসব মরদেহ নিশ্চিত করতে পেরেছি, সেগুলোর সংখ্যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করি। পরে একজন আমাদের বার্তা পাঠান। তিনি জানান, ওই মর্গে তোলা কিছু ছবি আমাদের দেখাতে পারবেন। এর বেশি কিছু আমি বলতে পারছি না, কারণ এতে অন্য কারো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রশ্ন: এরপর কী ঘটেছিল?

উত্তর: ছবিগুলো হাতে পাওয়ার পর আমরা সেগুলো খতিয়ে দেখতে শুরু করি। আগে যা দেখেছি, সেগুলোর সঙ্গে মিল আছে কি না, তা যাচাই করার চেষ্টা করি। সব মরদেহেই গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। এগুলো আমাদের যাচাই করা অন্যান্য ভিডিওতে দেখা তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেখানে দেখা গেছে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালানো হচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, অনেক মরদেহের ওপর একটি কাগজে তারিখ লেখা ছিল—৯ জানুয়ারি। এটি আমাদের জানা তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়। কারণ ৮ ও ৯ জানুয়ারি ছিল এই বিক্ষোভের সবচেয়ে উত্তপ্ত দুই রাত। ওই সময়েই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অধিকাংশ বিক্ষোভকারী নিহত হন। তাই যুক্তিযুক্তভাবে বলা যায়, এরা সম্ভবত আগের রাতে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন এবং সেখানেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন।

অধিকাংশ মরদেহের সঙ্গেই নাম লেখা ছিল। তবে সেগুলো সব স্পষ্টভাবে পড়া যাচ্ছিল না। এর মধ্যে প্রায় ২৮টির নাম আমরা পড়তে পেরেছি। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েক দিনে প্রকাশ পাওয়া নিহত বা দাফন সম্পন্ন হওয়া ব্যক্তিদের নামের সঙ্গে আমরা সেগুলো মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত আমরা পাঁচটি নামের মিল খুঁজে পেয়েছিলাম, আর এখন সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে।

শেষ পর্যন্ত, মরদেহগুলো এবং এর আশপাশের যা দেখা যাচ্ছিল, সেগুলো আগে যাচাই করা আরেকটি ভিডিওর সঙ্গে মিলিয়ে দেখি—যেটি মর্গের ভেতরে ধারন করা হয়েছিল। সব তথ্য একত্র করে আমরা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে ছবিগুলো আসল, এবং সেগুলো দক্ষিণ তেহরানের ওই মর্গে থাকা এমন ব্যক্তিদের মরদেহ দেখাচ্ছে, যারা সম্ভবত বিক্ষোভ চলাকালে নিহত হয়েছেন।

আমরা মোট ৩৯২টি ছবি পেয়েছিলাম। তবে যেসব ব্যক্তিকে আলাদাভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, তাদের সংখ্যা ছিল ৩২৬। কারণ কিছু মরদেহ এতটাই গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিকৃত ছিল যে তাদের শনাক্ত করা আর সম্ভব হয়নি।

স্বজনরা যখন মর্গে এসে মরদেহ শনাক্ত করার চেষ্টা করতেন, তখন তারা একাধিক ছবি তুলতেন—বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে আঘাতের তীব্রতার কারণে শনাক্ত করা খুব কঠিন ছিল। বিভিন্ন কোণ থেকে ছবি নেওয়া হতো। ফলে কয়েকজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে দুই বা তিনটি আলাদা ছবি আমাদের হাতে এসেছে।

প্রশ্ন: এইসব ক্ষতবিক্ষত ছবি দেখা ও এগুলো নিয়ে কাজ করার সময় নিজেকে কীভাবে সামলেছেন?

উত্তর: ছবিগুলো ভীষণ জীবন্ত— যা দেখা মানসিকভাবে কষ্টদায়ক।  আমাদের দলের প্রত্যেক সদস্যকেই তা দেখতে হয়েছে। এটি সহজ নয়। তবে আমাদের এই বিশেষ দলটি এই ধরনের বিষয় সামলে অভ্যস্ত। কীভাবে কাজ করতে হবে, তার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিও রয়েছে।

আমরা যে ভিডিও ও ছবি নিয়ে কাজ করি, তার অনেকগুলোই সংঘর্ষ অঞ্চল থেকে আসে—যেমন গাজা বা ইউক্রেন। যেখানে গণগোলাগুলি এবং সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দলের সদস্যদের সেগুলো যাচাই করতে হয়। তাই আমরা এই ধরনের কাজের সঙ্গে অভ্যস্ত। তবে এটি এমন একটি গল্প যা বলা প্রয়োজন। আমরা এই ছবিগুলো দেখি যাতে সাধারণ মানুষ এগুলো না দেখেই গল্পটি জানতে পারে এবং আমরা তাদের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারি।

প্রশ্ন: আপনার দলের সদস্যরা যখন এই ধরনের মানসিক পীড়াদায়ক অসংখ্য বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করেন, তখন তাদের সহায়তা করার জন্য আপনি কী ধরনের পন্থা অনুসরণ করেন?

উত্তর: প্রথমেই আমরা নিশ্চিত করি যে প্রত্যেকে এই বিষয়বস্তুর (কনটেন্ট) সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। যেমনটি আমি বলেছি, আমাদের দলের অধিকাংশ সদস্যই এই ধরনের বিষয় নিয়ে নিয়মিত কাজ করেন। আমরা নিশ্চিত করি যে একজনই সবগুলো মরদেহ নিয়ে কাজ করছেন না। এরপর আমরা বিশেষ ছবিগুলো দেখার সময়সীমা সীমিত করার চেষ্টা করি।

প্রতিবেদনের কাজ শেষ হওয়ার পরে আমরা নিজেদের জন্য কিছু সময় বের করি, মাথা হালকা করি এবং পুনরায় কাজে মন দিই। কারণ আমরা তো গল্প নই। এটি আমাদের পেশা। আমরা এই ধরনের গল্প নিয়ে কাজ করতে চাই, যতক্ষণ এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষকে তা জানানো প্রয়োজন।

ছবি: স্ক্রিনশট, বিবিসি নিউজ

প্রশ্ন: ওই নির্দিষ্ট গল্পটি বাদে, বর্তমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার সময়ে আপনি ইরানের ভেতর থেকে কীভাবে তথ্য পাচ্ছেন?

উত্তর: ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আমরা এই আন্দোলন এবং কর্তৃপক্ষ সেগুলোর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে, সে বিষয়ে প্রচুর ভিডিও প্রমাণ পাচ্ছিলাম। এরপর থেকে ভিডিও আসার সংখ্যা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

মাঝে মাঝে খুব অল্প সময়ের জন্য—আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মতো—ইরানের কিছু মানুষ ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পারেন। আপনি অনুমান করেন যে, মানুষের ফোনে এখনো এমন অনেক ফুটেজ রয়ে গেছে যা তারা পোস্ট করতে পারেননি। তাই তারা যখনই সুযোগ পান বা ইন্টারনেটের সংযোগ পান, সেই সময়টুকুকে কাজে লাগিয়ে যতটা সম্ভব ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং তথ্য আমাদের কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেন।

এছাড়া খুব অল্পসংখ্যক মানুষ স্টারলিংক ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা ইলন মাস্কের স্পেসএক্স পরিচালিত একটি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা। তবে এ ধরনের ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুবই কম। কারণ স্টারলিংক টার্মিনাল সংগ্রহ করা এবং তার খরচ বহন করা সহজ নয়। যদিও জানা গেছে যে ইরানের ব্যবহারকারীদের জন্য মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি এখন মওকুফ করা হয়েছে। তবে এতে বড় ঝুঁকি রয়েছে। ইরানে স্টারলিংক সংযোগ রাখা আইনত অপরাধ। এর জন্য প্রায় দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

ইন্টারনেট বন্ধ অবস্থা তুলে নেওয়া হলে বিপুল পরিমাণ ভিডিও সামনে আসবে বলে আমরা ধারণা করছি। এখনো অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে। ৮ থেকে ১০ জানুয়ারির ওই দুই বা তিনটি প্রাণঘাতী রাতে আসলে কী ঘটেছিল? অল্প অল্প করে কিছু ভিডিও সামনে আসছে। সেগুলো হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তা নিয়ে কাজ শুরু করি এবং যাচাই করি।

তবে এখন এসব ভিডিওর নির্দিষ্ট তারিখ জানা সত্যিই খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন যে নতুন ভিডিওগুলো আসছিল, আমরা সেগুলোর হিসাব রাখছিলাম। কিন্তু এরপর থেকে বিষয়টি অনেক জটিল হয়ে গেছে। কখনও কখনও যারা আমাদের কাছে ভিডিও পাঠান, তারা অতিরিক্ত কিছু তথ্য দেন, যা যাচাইয়ে সহায়তা করে। তবুও আমরা বুঝতে পারি, এগুলো সাম্প্রতিক ভিডিও—আগের দফার বিক্ষোভের ভিডিওগুলোর মতো নয়।

প্রশ্ন: এই মুহূর্তে আপনারা প্রধানত কোন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য বা গুজবগুলো শনাক্ত করছেন?

উত্তর: সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হচ্ছে পুরোনো বা প্রসঙ্গবহির্ভূত ভিডিও। বিক্ষোভের চূড়ান্ত সময়ে আমরা দেখেছি, ইরানের আগের দফার বিক্ষোভের ভিডিও বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কহীন ফুটেজ নতুন ঘটনার নামে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এসব যারা ছড়াচ্ছেন তাদের আমি সাধারণত ‘এনগেজমেন্ট ফার্মার’ বলি। বড় কোনো ঘটনায় মানুষের আগ্রহ দেখলে তারা সেই সুযোগে যাচাই না করা তথ্য শেয়ার করেন—শুধু ক্লিক আর পরিচিতি পাওয়ার জন্য।

আরেকটি বিষয় হলো, কিছু মানুষ ভিডিওকে আরও নাটকীয় করে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন। এগুলো সবসময় বিভ্রান্তিকর নয়, কারণ ঘটনাগুলো সত্যিই ঘটেছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সেগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চান—এটি আমি বুঝতে পারি। তবে কখনও কখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছবির প্রকৃতি বদলে দিতে পারে এবং সেটিকে বাস্তবতার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন করে তুলতে পারে।

ইরানে যা ঘটছে, তার বাস্তবতাই যথেষ্ট ভয়াবহ। তাই নিম্নমানের রেজল্যুশনের হলেও আসল ফুটেজ ও ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে, সেটিতেই থাকা ভালো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সেগুলোকে আরও উচ্চ রেজল্যুশনের বা বেশি শেয়ারযোগ্য করে তুলতে গেলে ভিডিও বা ছবির কিছু তথ্য বিকৃত বা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তেহরানে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জনতার ভিডিওচিত্র। ছবি: স্ক্রিনশট, বিবিসি নিউজ

প্রশ্ন: আপনি মূলত ইরানের মানুষ, তাই না? এটি কি আপনার কাজের ধরনকে প্রভাবিত করেছে? ঘটনাগুলো কি আরও ব্যক্তিগতভাবে অনুভূত হয়?

উত্তর: আমি ইরানে জন্মেছি এবং বড় হয়েছি, তবে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছি। তাই আমি ইরানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ। এটি কিছুটা ব্যক্তিগতভাবেই অনুভূত হয়। তবে একই সঙ্গে আপনাকে পেশাদার হতে হয়, এবং আপনার অনুভূতিকে পেশাদার সাংবাদিকতা করার বা গল্প বলার পথে বাঁধা হতে দেওয়া যায় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গল্প এবং যারা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে বা নিহত হয়েছেন তারা। আপনাকে চেষ্টা করতে হবে আবেগপ্রবণ না হয়ে সেই গল্পগুলো বলার। অবশ্যই বিবিসির সম্পাদকীয় নীতিমালা মেনে, নিরপেক্ষ এবং সঠিকভাবে। আমি সেটাই করার চেষ্টা করেছি। যেমন আমি বলেছি, গল্পটির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে, তবে ২০০৯ সাল থেকে আমি ইরানের বিক্ষোভ কভার করছি, এবং বছরের পর বছর ধরে আমি পেশাদারভাবে কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।

প্রশ্ন: অক্টোবর ২০২৩ সালে আমাদের সঙ্গে শেষবার কথা বলার পর থেকে ফ্যাক্ট-চেকিং যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?

উত্তর: বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন কোনও ব্রেকিং নিউজের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি প্রধান উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালে যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলো ছিল, সেগুলো এত উন্নত ছিল না এবং সবার জন্য এত সহজলভ্যও ছিল না, যতটা এখন।

এই মডেলগুলো এখন অনেক বেশি উন্নত হয়েছে। যেগুলো খুব বাস্তবসম্মত, বিশ্বাসযোগ্য ভিডিও, ছবি ও অডিও তৈরি করতে পারে। এছাড়া এগুলো সবার জন্য অনেক সহজলভ্য হয়ে গেছে, প্রায়ই বিনামূল্যে বা খুব বেশি খরচ ছাড়াই এগুলো ব্যবহার করা যায়। পুরোনো ভিডিও, প্রসঙ্গবহির্ভূত বা যাচাইহীন দাবি—এসব এখনও আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, অনলাইনে ভুয়া তথ্য ও ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও একটি বড় মাত্রা যোগ করছে। এবং এর প্রভাব কেবল বাড়তেই থাকবে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এই মডেলগুলো আরও উন্নত হচ্ছে এবং বিশ্বের মানুষের জন্য আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন: এর একটি উদাহরণ কী হতে পারে?

উত্তর: একটি ভালো উদাহরণ হলো ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ। এটি ছিল প্রথম বড় আন্তর্জাতিক সংঘর্ষ, যেখানে আমরা দেখেছি প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বেশি ভুল তথ্য তৈরি করা হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি আমরা যে ভিডিও ও ছবি দেখছিলাম, তা খুবই বাস্তবসম্মত মনে হতো। যেগুলো লাখ লাখ বার দেখা হয়েছিল— টিকটক, ফেসবুক, এক্স বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে মানুষকে বিভ্রান্ত করছিল। যা একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিল—যেখানে বড় কোনো ব্রেকিং নিউজের পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে তখন, যখন সংবাদসংস্থা, বিশেষ করে পশ্চিমা সংবাদসংস্থা, ইরানের মতো দেশে তৎক্ষণাৎ বা সহজে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না।

যেহেতু এই মডেলগুলো বাস্তবের মতো করে কনটেন্ট বানাতে সক্ষম, আমি মনে করি সত্যিকার কনটেন্ট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি কনটেন্ট আলাদা করা আরও কঠিন হয়ে যাবে। এবং এটি সব ধরনের সাংবাদিকতার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

প্রশ্ন: বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে কাজ করার ধরনেও কি পরিবর্তন এসেছে?

উত্তর: ২০২৩ সালে আমি টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স ও ফেসবুকের মতো প্রধান প্ল্যাটফর্মগুলো দেখতাম, এখনো দেখি। অবশ্য গল্পভেদে বিষয়টি ভিন্ন হয়। উদাহরণ হিসেবে ইরানের কথা বলা যায়—সেখানে ইনস্টাগ্রাম সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। আপনি যদি ইরান থেকে তথ্য পেতে চান, তাহলে ইনস্টাগ্রামে থাকতে হবে। পশ্চিমা দর্শকদের মতো ইরানিরা স্ন্যাপচ্যাট ততটা ব্যবহার করেন না।

তাই বিষয়টি নির্ভর করে দর্শকের বড় অংশ কোন দেশ বা অঞ্চলের এবং তারা কোন প্ল্যাটফর্ম বেশি ব্যবহার করে তার ওপর। তবে সাধারণভাবে এই কাজটি ভালোভাবে করতে হলে এমন সব প্রধান প্ল্যাটফর্মে নজরে রাখতে হয়, যেগুলোতে কোটি বা শতকোটি ভিউ হয়। এগুলোর প্রত্যেকটিই প্রভাবশালী এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছায়। আমি যেমনটি ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধের চূড়ান্ত অবস্থার সময়ে বলেছিলাম—আমাদের সময়ের সঠিক ব্যবহার হলো সেইসব কনটেন্টের ওপর মনোযোগ দেওয়া যা ভাইরাল হচ্ছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

যদি টিকটকের কোনো ভিডিওতে মাত্র ২ হাজার ভিউ থাকে, তবে আমার মনে হয় না ৫ বা ১০ লাখ ভিউ হওয়া ভিডিও বাদ দিয়ে সেটির ওপর মনোযোগ দেওয়া আমাদের সময়ের সঠিক ব্যবহার হবে। ব্রেকিং নিউজের সময় এসব প্ল্যাটফর্মে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অনেক কনটেন্ট দেখা যায়।

প্রশ্ন: যুক্তরাজ্যে বসে ইরান নিয়ে কাজ করছেন এমন কয়েকজন সাংবাদিককে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছেএটি কি আপনার এবং আপনার টিমের জন্য উদ্বেগের বিষয়?

উত্তর: হ্যাঁ। বিবিসিতে কাজ করা সব ইরানি সাংবাদিকই এই ধরনের হুমকির মুখে পড়েছেন, এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এটি দুর্ভাগ্যজনক এবং কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু যারা ইরানি বা ইরানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে বিবিসিতে কাজ করেন এবং ইরান নিয়ে সংবাদ প্রচার করেন, তাদের জন্য এই বাস্তবতার মধ্যেই কাজ করতে হয়েছে।


মারিনা আদামি রয়টার্স ইনস্টিটিউটের সম্পাদকীয় দলে কাজ করেন। তিনি ইনস্টিটিউটের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য লেখা সম্পাদনা রচনা করেন। অক্সফোর্ডে থাকা অবস্থায় তিনি ইউক্রেন, গাজা, কাতার এবং অ্যামাজন রেইনফরেস্টসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন।

 

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

বছরে অর্থপাচার হয় প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, সাংবাদিকরা যেভাবে প্রতিরোধ গড়তে পারে

অর্থপাচারের একদিকে আইনজীবী, প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর অন্যদিকে অর্থপাচারকারী। এদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা রয়েছে। অর্থ পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে যেকোনো চেষ্টা করা হলে, সঙ্গে সঙ্গেই তারা নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

ইরানের স্কুলে বোমা হামলা, যুক্তরাষ্ট্র কেন স্যাটেলাইট ছবিতে গণমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত করেছিল

মার্কিন সরকারের অনুরোধে প্ল্যানেট ল্যাবস মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত স্যাটেলাইট চিত্র গোপন রাখছে।  অন্যদিকে একাধিক সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে টমাহক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী।]

সংবাদ ও বিশ্লেষণ

কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্য বলা: কার্লোস দাদার সাক্ষাৎকার

আমরা অর্থ-সম্পদ ছাড়াই সাংবাদিকতা করছি, কারণ স্বৈরাচারী শাসক সব আর্থিক পথ বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ আমাদের কাছে চাওয়া হচ্ছে বিশাল প্রভাব সৃষ্টিকারী কাজ। যেহেতু পারছি না, তাই আমাদের বদলে এমন কাউকে আনতে চাওয়া হচ্ছে, যাদের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডাকা হয়।

অনুসন্ধান পদ্ধতি সংবাদ ও বিশ্লেষণ

‘মিস্টার নোবডি এগেইনস্ট পুতিন’: অস্কারজয়ী এই তথ্যচিত্র দেখে শিখতে পারেন  ছদ্মবেশী সাংবাদিকতা ও গোপনে তথ্য সংগ্রহের কৌশল

এটা আমি—পাশা তালানকিন। এই মুহূর্তে আমি একদমই জানি না, নিজের জন্য কত বড় ঝামেলা ডেকে আনতে যাচ্ছি।
এভাবেই শুরু হয় অসাধারণ গল্পটি। তিনি রাশিয়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাধারণ একজন শিক্ষক। যিনি পরে হয়ে ওঠেন একজন হুইসেলব্লোয়ার। তিনি ঝুঁকি নিয়ে রুশ স্কুলগুলোর সামরিকীকরণের চিত্র, ক্যামেরাবন্দি করে গোপনে বাইরে পাঠান।