ছবি: শাটারস্টক
হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ শরণার্থী ব্যবস্থা, তবে কি চুপ থাকা মানেই নিরাপদে থাকা?
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
সম্পাদকের মন্তব্য: মানবপাচার চক্রের সম্ভাব্য আক্রমণের আশঙ্কায় লেখক নিজের পরিচয় গোপন রেখে এই নিবন্ধটি লিখছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর স্বীকার করেছে যে তিনি ও তার পরিবার ঝুঁকির মুখে আছেন, তবে সংস্থাটির পক্ষ থেকে তারা আর তাকে সহায়তা করার মতো অবস্থায় নেই। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে তিনি সামান্য সহায়তা পাচ্ছেন, কিন্তু বর্তমানে তার এই পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী সমাধান নেই।
নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে (সেফ হাউস) থাকতে এসে আমি উপলব্ধি করেছি নির্মম এক সত্য। যা কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। তা হচ্ছে, নিরাপত্তা মানেই আপনি সুরক্ষিত নন, আর অনেক সময়ই নীরব থাকাটাই বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।
১. আমি একজন শরণার্থী। একটি শরণার্থী শিবিরের মধ্যে পরিচালিত একটি মানবপাচার চক্রের তথ্য উন্মোচনে সহায়তার কারণে এখন আমাকে একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাতে হচ্ছে। সেই সিদ্ধান্ত আমার জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। হুমকিগুলো বাস্তব, ভয়ের অনুভূতি স্থায়ী, আর তার পরিণতি এখনো আমি ভোগ করছি। আমি সেই কাজই করেছি, যা শরণার্থীদের করতে বলা হয়: অপরাধ বিষয়ক খবর সরবরাহ, কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা, আর অন্যদের সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু যার ফলাফল প্রত্যাখিত হওয়া, বিচ্ছিন্নতা এবং নাই হয়ে যাওয়ার চাপ—ন্যায়বিচার বা সুরক্ষা প্রাপ্তি নয়।
সরকার এবং জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর—এদের দায়িত্ব শরণার্থীদের সুরক্ষা দেওয়া। যারা এরই মধ্যে সবকিছু হারিয়েছেন, তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বজুড়ে সরকার ও দাতাদের অর্থায়নে এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়। কাগজে-কলমে এই ব্যবস্থাটি সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষার জন্যই গড়ে তোলা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে আমি শিখেছি, যখন কোনো শরণার্থী তার ভোগান্তির জন্য দায়ী অস্বস্তিকর সত্যগুলোকে উন্মোচন করে, তখন এই বন্দোবস্তগুলো পিছিয়ে যেতে শুরু করে।
একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এটি কোনো সমাধানও নয়। কারও জীবনের প্রতি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি তৈরি হলে এটি জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কেউ দুর্ঘটনাবশত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে যায় না। এর অর্থ হলো আপনি প্রকাশ্যে বসবাস করতে পারবেন না, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবেন না, এবং যে সম্প্রদায়ে একসময় ছিলেন সেখানে আর ফিরে যেতে পারবেন না। প্রয়োজনের তাগিদেই আপনার জীবন সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আমার মতো একজন সাংবাদিক—যারা শরণার্থী হয়েও অপরাধী চক্র, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং শরণার্থী শিবিরের ভেতরে ঘটে যাওয়া বড় বড় অনিয়মগুলো তুলে ধরে—তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ই তখন হয়ে যায় চিরস্থায়ী ঠিকানা। সেখানে থাকার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই, নেই কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা স্থায়ী সমাধানের পথ।
আপনি বেঁচে আছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার জীবনটা যেন থমকে আছে।
সেফ হাউজে থাকার এই সময়ে আমি অনেক কিছু ভাবার সুযোগ পেয়েছি। আর যা বুঝতে পেরেছি তা খুবই অস্বস্তিকর: আমাদের মতো শরণার্থীদের সাহায্য করার মানে হলো ইউএনএইচসিআর এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের এটা মেনে নেওয়া যে—শরণার্থী শিবিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
মানবপাচার এমনি এমনি ঘটে না। এটি টিকে থাকে ব্যবস্থার ফাঁকফোকরের মধ্যে—সুরক্ষা, নজরদারি আর জবাবদিহিতার অভাবে। এই ধরণের চক্রগুলোকে যখন আমরা সামনে নিয়ে আসি, তখন কিছু কঠিন প্রশ্ন ওঠে: এটি কীভাবে ঘটল? কারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল? কেন শরণার্থীরা অরক্ষিত অবস্থায় ছিল?”
প্রতিষ্ঠানের জন্য এই প্রশ্নগুলো বিপজ্জনক।
সার্বিক কাঠামোটি যে ত্রুটিপূর্ণ, তা মেনে নেওয়া
হুইসেলব্লোয়ার (যারা গোপন তথ্য ফাঁস করেন) বা সাংবাদিকদের এ ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন হওয়া মানে—সার্বিক কাঠামোটি যে ত্রুটিপূর্ণ, তা স্বীকার করা। এর মানে প্রভাবশালী ব্যক্তি, অপরাধী চক্র এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর সীমান্ত সম্পর্কিত সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেওয়া। এটি কেবল সাময়িকভাবে কাউকে আটকে রাখার চেয়েও বড় কিছু—এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদী দায়বদ্ধতা।
কিন্তু এর পরিবর্তে, গোটা ব্যবস্থা প্রায়ই চুপ থাকাকেই বেছে নেয়।
আমার মতে আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য হলো: ইউএনএইচসিআর যদি সেফ হাউজে থাকা কোনো তথ্য ফাঁসকারী বা সাংবাদিককে পুরোপুরি সাহায্য করে, তবে আরও অনেকেই সাহস করে সামনে এগিয়ে আসবে। এতে সুরক্ষার দাবি বাড়তে থাকবে এবং একটি স্থায়ী সমাধান তৈরি হবে।
আমার বাস্তবতা হলো, তহবিলের অভাবের কারণে ইউএনএইচসিআরের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে আমি একটি স্থানীয় অলাভজনক সংস্থার দেওয়া নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আছি এবং সরকার থেকে সামান্য, অনিয়মিত খাদ্য সহায়তা পাচ্ছি।
মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাগুলো মূলত বিপুল সংখ্যক মানুষকে মানসম্মত উপায়ে সহায়তা করার জন্য তৈরি—যেমন খাদ্য বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং আশ্রয় কর্মসূচি। এগুলো দৃশ্যমান, গণনা করা যায়, এবং তহবিল পাওয়া সহজ। আমার মতো জটিল সুরক্ষার ঘটনাগুলো মূলত প্রতিবেদনের ধরন বা দাতারা যে বিষয়গুলো বিবেচনা করেন, তার সঙ্গে খাপ খায় না।
আমাদের ভোগান্তিগুলো সুর্নিদিষ্ট। ভীষণ জটিল। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
যে প্রতিষ্ঠানগুলোর আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা, তারা নিঃশব্দে সরে যায়। যেন সময় নিজেই সমস্যার সমাধান করবে।
এটি আর সুরক্ষার মতো মনে হয় না, বরং আমাদের যেন ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
বার্তাটি এক পর্যায়ে নির্মমভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে: তোমার দেশে ফিরে যাও।
যে ঝুঁকিগুলো আমাকে প্রথমে পালাতে বাধ্য করেছিল এবং আমার সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়ার কারণে নতুন যে বিপদ সৃষ্টি হয়েছে, এসব সত্ত্বেও চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে আমাকে ফিরে যাওয়ার কথাই বলা হলো। কোনো জায়গা বদল নেই। কোনো পুনর্বাসন নেই। কোনো বিকল্প সুরক্ষা নেই।
শুধু ফিরে যাও।
একজন শরণার্থীর জন্য এটি কোনো সমাধান নয়। এটি প্রত্যাখ্যান।
যেখানে আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত নয় এমন স্থানে ফিরে যাওয়ার জন্য বলা—যেখানে অপরাধমূলক কার্যক্রম উন্মোচনের জন্য আপনার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছেন—এটি একটি ভীতিকর বার্তা দেয়: আর তা হচ্ছে প্রকাশ্যে কথা বলাটা ভুল ছিল।
আমি কি সঠিক কাজ করেছি?
নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে ভীষণ মানসিক চাপ তৈরি হতে থাকে। ধীরে ধীরে জমতে থাকে একাকিত্ব, ভয়, এবং অনিশ্চয়তা। কোনো পরামর্শদাতা নেই, ট্রমায় আক্রান্ত হলে কোনো সহায়তা নেই, এমনকি ধারাবাহিক হুমকির মধ্যে থাকাটা যে ভীষণ ক্ষতিকারক, সে স্বীকৃতিও নেই।
তখন আপনি নিজের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করতে থাকেন। বারবার সেই মুহূর্তটি মনে করেন যখন আপনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিলেন। এই পর্যায়ে আপনি ভাবতে থাকেন, চুপ থাকলেই কি আরও নিরাপদ থাকতাম।
এভাবেই প্রচলিত কাঠামো সত্যকে নিরুৎসাহিত করে — প্রকাশ্য শাস্তির মাধ্যমে নয়, বরং অবহেলার মাধ্যমে।
আর এই কারণেই অনেক শরণার্থী মানবপাচার এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ জানাতে ভয় পান। তারা যে এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন না তা নয়, বরং যারা অভিযোগ জানিয়েছে তাদের কী ভয়াবহ পরিণতি হয়েছে, তা তারা দেখেছেন।
রিপোর্ট করলেই যে সবসময় সুরক্ষা পাওয়া যায়, তা নয়। কখনও কখনও এটি প্রতিশোধ, বিচ্ছিন্নতা এবং পরিত্যক্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে আসে। এমনও হয়, আপনি যাদের অপরাধ প্রকাশ করেছেন, তাদের চেয়েও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান।
উপেক্ষার মাধ্যমে যখন হুইসেলব্লোয়ার এবং সাংবাদিকদের প্রত্যাখান করা হয়, অপরাধী চক্রগুলো তখন এই বার্তা পায় যে—খোদ শাসনব্যবস্থা বা কাঠামোর মধ্যেই ভয় দেখিয়েই চুপ করিয়ে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
আমি বলতে চাই যে, মানবপাচার নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে আমি গর্বিত বোধ করি। নৈতিকভাবে আমি জানি, এটি করা সঠিক ছিল। কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে থেকে যদি বলি আমার কোনো আফসোস নেই, তবে সেটা মিথ্যা হবে।
কিছু দিন আসে, যখন মনে হয়— কিছু প্রকাশ না করলেই বোধহয় ভালো হতো। তার মানে এই নয় যে অপরাধের ঘটনা ঘটেনি; বা ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের যোগ্য ছিলেন না; বরং সত্য বলার জন্য চরম মূল্য দিতে হয়। আর সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা কখনও পূরণ হয়না।
এটি সারা বিশ্বের শরণার্থীদের জন্য একটি বিপজ্জনক বার্তা।
একটি সেফ হাউস হওয়া উচিত জরুরি পদক্ষেপের শুরু, দায়বদ্ধতার শেষ নয়। এটি আরও শক্ত সুরক্ষা, দ্রুত সমাধান এবং অর্থবহ সহায়তার সূচনা করবে—যার মধ্যে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সহায়তাও থাকবে।
যে সুরক্ষা স্রেফ কারো জীবন বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু তার মর্যাদা, আশা ও ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয়—সেটি প্রকৃত সুরক্ষা নয়।
মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাগুলো যদি হুইসেলব্লোয়ার ও সাংবাদিকদের সহযোগী হিসেবে না দেখে বোঝা হিসেবে দেখতে থাকে, তাহলে মানবপাচারের মতো অপরাধ আড়ালেই বাড়তে থাকবে। নীরবতাই জয়ী হবে —শরণার্থীরা ন্যায়বিচার চায় না বলে নয়, বরং মুখ খোলার মূল্য এত বেশি যে তা বহন করা কঠিন।
এই লেখাটি রাগ থেকে নয়, প্রয়োজন থেকে লেখা। সেফ হাউসে থাকা শরণার্থীরা সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে থাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের মধ্যে পড়ে। তাদের পরিস্থিতি জটিল, অস্বস্তিকর এবং জরুরি।
তাদের এড়িয়ে চললে ব্যবস্থাটা শক্তিশালী হয় না, বরং এর দুর্বলতাটাই বেরিয়ে আসে।
সুরক্ষা যদি দিতেই হয়, তবে তাদের আগে দেওয়া উচিত যারা জীবন বাজি রাখে—বিশেষ করে যারা চুপ থাকা সহজ হওয়া সত্ত্বেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলে।
নাহলে এই সেফ হাউসগুলো আমাদের কাছে স্রেফ এমন এক জায়গা হয়ে থাকবে, যেখানে সত্যিটা ধামাচাপা পড়ে যায়, জীবন থমকে থাকে আর সুরক্ষা বলতে আসলে তেমন কিছু নয়।
সম্পাদকের নোট: এই প্রবন্ধটি মূলত দ্য নিউ হিউম্যানিটারিয়ান-এ প্রকাশিত হয় এবং ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের মাধ্যমে এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে।
দ্য নিউ হিউম্যানিটারিয়ান বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকটে আক্রান্ত লাখো মানুষের পক্ষে মানসম্মত ও স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রকাশ করে। তাদের কাজ ও উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন www.thenewhumanitarian.org।