প্রবেশগম্যতা সেটিংস

সাংবাদিক লেয়া পলভেরিনি কিরগিজস্তানে যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছবির এই নারী। অনুমান করা হয়, গত দশকে জিনজিয়াংয়ের দশ লক্ষেরও বেশি উইঘুর, কাজাখ, কিরগিজ এবং অন্যান্যদের বিভিন্ন বন্দী শিবির এবং কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। ছবি: লেয়া পলভেরিনি

লেখাপত্র

বিষয়

একটি ‘কান্নার সীমান্ত’: চীনের শিনজিয়াং বন্দী শিবিরের ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো যেভাবে

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

পূর্ব তুর্কিস্তান—চীনা ভাষায় বলা হয় শিনজিয়াং—একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল, যেখানে জাতিগত সংখ্যালঘুরা চীনা সরকারের দমনমূলক শাসনের শিকার হচ্ছে।

ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার ও বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা, জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ থেকে শুরু করে নির্যাতন—এ ধরনের সহিংসতার মধ্যে দিয়ে এক দশকে দশ লাখের বেশি উইঘুর, কাজাখ, কিরগিজ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষকে তথাকথিত ‘রি-এডুকেশন’ বন্দী শিবির ও কারাগারে আটক রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার কার্যালয়।

চীন দাবি করে আসছে যে তারা ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তবে অন্যদের মতে, তাদের প্রকৃত লক্ষ্য হলো এমন সব সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা, যেগুলো ‘চাইনিজ ড্রিম’-এর জাতিগত বিশুদ্ধতার ধারণার পথে বাধা বলে মনে করা হয়। ( চাইনিজ ড্রিম হচ্ছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কর্তৃক প্রবর্তিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল)।

জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, এই অঞ্চলে যা ঘটছে তা “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ”-এর শামিল হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টসহ আরও কিছু পক্ষ ২০২১ সালে একে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু জন্মের সংখ্যা কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর কারণে এই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।

এই দমননীতি শুধু চীনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি আন্তঃদেশীয় রূপও রয়েছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়েও বেইজিং যাদের রাজনৈতিক বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্য এশিয়ায়, সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোতে। যেগুলো অর্থনৈতিকভাবে পূর্বের প্রতিবেশীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই হস্তক্ষেপ সর্বব্যাপী হয়ে উঠেছে এবং দমননীতিকে আরও বিস্তৃত করেছে।

China has built hundreds of detention centers along the border of its Xinjiang Uyghur Autonomous Region and the eastern frontiers of Kazakhstan, Kyrgyzstan, and Tajikistan, making those countries a common landing spot for refugees fleeing Chinese repression.

কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের পূর্ব সীমান্তঘেঁষা শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে শত শত আটক কেন্দ্র গড়ে তুলেছে চীন। ফলে চীনের দমননীতি থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের জন্য পার্শ্ববর্তী দেশগুলো একটি সাধারণ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। ছবি: স্ক্রিনশট, দ্য শিনজিয়াং ডেটা প্রজেক্ট, অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট

শীতকালীন সফর

২০২৩ সালের শীতে, আমি কাজাখস্তানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে আসা ক্যাম্পের বেঁচে ফেরা মানুষদের সঙ্গে কী ঘটছে তা নথিভুক্ত করতে চাই। আমার সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী ফটোসাংবাদিক রবিন টুটেঙ্গেস। আমাদের সহযোগিতা করেছে অনলাইন সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক ম্যাগাজিন স্লেট ফ্রান্স। বিষয়টি নিয়ে স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান চালানোর জন্য চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করা যেহেতু অসম্ভব ছিল, তাই আমরা নজর দিয়েছি সেইসব জায়গাগুলোর দিকে, যেখানে নির্বাসন নিয়ে বহু ভুক্তভোগী বসবাস করছেন।

বন্দী শিবিরগুলো ঘিরে যেসব প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে তার বড় একটি অংশই দূর থেকে করা। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ উইঘুর জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো নির্যাতন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবুও মাঠপর্যায়ে গিয়ে কাজ করা জরুরি, এবং মনে রাখা দরকার এই দমননীতি পুরো অঞ্চলের একাধিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকেই প্রভাবিত করছে।

কাজাখ জাতিগোষ্ঠী—যারা চীনা নাগরিকত—জনসংখ্যার হিসেবে দেশটির দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠী। চরমভাবে আক্রান্ত তারাও। অথচ তাদের ভোগান্তির খবর তাদের নিজ দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—সবখানেই প্রায় উপেক্ষিত থেকে গেছে।

আমরা দেখেছি, চীন ও কাজাখস্তানের মধ্যবর্তী সীমান্ত অঞ্চলটি যেন বর্ডার অব টিয়ার্স-এ (কান্নার সীমান্ত) পরিণত হয়েছে। এখানে বহু পরিবার তাদের পরিবার-পরিজনদের জন্য কেঁদে বেড়াচ্ছে, যারা চীনের ক্যাম্প থেকে আর কখনো ফিরে আসেননি। আর যারা কোনোমতে সীমান্ত পেরিয়ে বেঁচে ফিরতে পেরেছেন, তারা সেই অভিজ্ঞতার গভীর ক্ষত (ট্রমা) বয়ে বেড়াচ্ছেন।

আবারও বিতাড়িত হওয়ার হুমকির কারণে তাদের অনেকেই এখনও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে ভুগছেন। বাস্তবে, ক্যাম্প থেকে বের হওয়াটাই খুব কম ক্ষেত্রে মুক্তির স্বাদ দেয়; বরং অনেক সময় নতুন এক দুর্ভোগ হয়ে আসে। ভুক্তভোগী হিসেবে তাদের স্বীকৃতি প্রায় নেই বললেই চলে। কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের আত্মীয়রাও তাদের দূরে ঠেলে দেয়। ফলে বেঁচে ফেরা মানুষদের আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়। এমন এক প্রাত্যহিক জীবনে ফিরে যেতে হয়, যেখানে তাদের ট্রমাগুলোকে কেউ আমলে নেয় না, চিকিৎসাও হয় না। চীনের সঙ্গে কাজাখ কর্তৃপক্ষের রয়েছে শক্তিশালী বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব। ফলে তারাও নীরব থাকছে আর হাতে গোনা কয়েকজন স্থানীয় কর্মীর প্রতিবাদ দমনের চেষ্টা করছে।

এই সহিংসতার গল্প এবং সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তন অনুসরণ করাই ছিল আমাদের চ্যালেঞ্জ। এজন্য ব্যক্তিগত বর্ণনা ও সাক্ষ্যকে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরতে হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কাজ ও অনুসন্ধান ছিল অত্যন্ত জটিল। কারণ অনেক সাক্ষী এখনও কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। ফলে সরাসরি মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করাটা ছিল ভীষণ কঠিন। এই নজরদারি তাদের গুরুতর ঝুঁকির মধ্যেও ফেলছে।

ঝুঁকিপূর্ণ সোর্সদের সুরক্ষা

অনুসন্ধানমূলক এই প্রতিবেদনটি প্রথমে স্লেটডটএফআরে ক্যাপশনসহ আলোকচিত্রের সিরিজ হিসেবে প্রকাশিত হয়—লিখিত মূল প্রতিবেদনটি প্রায় প্রকাশই হয়নি। এর প্রধান কারণ ছিল সোর্সদের কাছে পৌঁছানোর জটিলতা। এখনো শিনজিয়াংয়ে দমননীতি চলমান থাকায়, একটি ভুল শব্দ চীনা বা কাজাখ গোয়েন্দা সংস্থার নজরে পড়লে সাক্ষী ও তাদের স্বজনদের বিতাড়িত হওয়া, কারাবাস কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ বেঁচে ফেরা মানুষ নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে পরিচয় দিতে ভয় পান এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী থাকেন না। তাই নিপীড়নের শিকার এসব সম্প্রদায়ের ভেতরে যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে প্রয়োজন হয় বিপুল সময়, সতর্কতা এবং পারস্পরিক আস্থা।

পূর্ব তুর্কিস্তান থেকে আসা বিভিন্ন অভিবাসীর সঙ্গে আগে থেকেই আমি ও আমার সহকর্মী ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিলাম—যা শেষ পর্যন্ত আমাদের বেঁচে ফেরা মানুষদের খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।

আমরা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষক, কর্মী, মানবাধিকার রক্ষক এবং শিল্পীদের নিয়ে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সময় নিয়েছি। সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল যোগাযোগের প্রথম দরজাটি খুলে দেওয়া, যা পরবর্তীতে আরেকটি যোগাযোগের পথ তৈরি করে—এভাবে ধাপে ধাপে আগ্রসর হয়েছি।

আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি ছিল আতাজুর্ত পার্তিয়াসি। এটি একটি সংগঠন। স্থানীয় পর্যায়ে যাদের শক্ত ভিত্তি রয়েছে। বহু পরিবারকে তারা স্বজনদের মুক্তির দাবিতে সহায়তা করেছে। এ কারণে বেঁচে ফেরা অনেক মানুষের সাক্ষ্য সংগ্রহ করা ছিল আতাজুর্তের কাছে।

তবে এ ধরনের অনুসন্ধানে নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এই প্রতিবেদন সিরিজে যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই সম্পূর্ণ নাম-পরিচয় গোপন রেখে কথা বলেছেন। কারণ তাদের অনেকের পরিবার পরিজন এখনো চীনে বসবাস করছেন, যারা সামান্য অযাচিত নজর পড়লেই আটক হতে পারেন। আবার কারও স্বজন ক্যাম্প বা কারাগারে আছেন, যাদের হয়তো আর কখনও মুক্তি দেওয়া হবে না। যাদের পরিবার এরই মধ্যে চীন ছেড়ে চলে গেছে, অথবা তারা মরিয়া হয়ে আশা করেছেন, নিজেদের গল্প প্রকাশ্যে আনলে তা হয়তো তাদের প্রিয়জনদের ফিরে পেতে সাহায্য করবে— এমন খুব অল্পসংখ্যক মানুষই প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হয়েছেন। কারণ, অবাক হলেও সত্য যে গণমাধ্যমের নজরে আসার পর কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা কখনও বন্দিদের মুক্তির পথ তৈরি করেছে।

An older uyghur man and woman walk along a street in Yarkant near Kashgar in the Xinjiang Uygur Autonomous Region of western China

চীনের শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কাশগরের কাছে ইয়ারকান্ট শহরের একটি সড়ক ধরে হাঁটছেন দুজন বৃদ্ধ উইঘুর নারী ও পুরুষ। চীনে এখনও থাকা স্বজনদের ওপর সরকারি প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় অনেক উইঘুর শরণার্থী তাদের আটকের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে বলতে অস্বীকৃতি জানান। ছবি: শাটারস্টক

তাই আমাদের দায়িত্ব ছিল—তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে কী প্রকাশ করা যাবে আর কী যাবে না, সেই সঠিক ভারসাম্য খুঁজে বের করা। একই সঙ্গে আমাদের এটাও জানা ছিল যে চীনা সরকারের খামখেয়ালিপনা কখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা কখনওই পূর্বানুমান করা সম্ভব নয়।

প্রতিটি সংবেদনশীল তথ্য সাক্ষাৎকারদাতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া হয়েছে। অনেক সময় আমরা তাঁদের প্রত্যাশার চেয়েও কম তথ্য প্রকাশ করেছি, কারণ কিছু সোর্স হয়তো পরিস্থিতি খারাপের দিকে মোড় নিলে তার পরিণতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন নাও থাকতে পারেন।

চীনা ও কাজাখ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অত্যন্ত দক্ষ হওয়ায় আমাদের প্রচলিত সব ধরনের সতর্কতা নিতে হয়েছে। সম্ভাব্য কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের কথা মাথায় রেখে আমরা সব ডিভাইস এনক্রিপ্ট করেছি এবং নিজের কাছে যতটা সম্ভব কম তথ্য রেখেছি। এর অর্থ ছিল—সাক্ষীদের অবস্থান মানচিত্রে চিহ্নিত না করা, কিংবা তাদের যোগাযোগের কোনো তথ্য সংরক্ষণ না করা। এর বদলে সংবেদনশীল তথ্য একটি এলোমেলো কাগজে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল—খুবই খারাপ হাতের লেখা, তাও আবার ফরাসির কাছাকাছি একটি ভাষায়—যেটি হ্যাক করা সম্ভব নয়। আমরা নিশ্চিত করেছি, আমাদের মোবাইল ফোনগুলো যেন সব সময় ভিপিএন বা এয়ারপ্লেন মোডে থাকে, কোনো আপত্তিকর ছবি সংরক্ষণ না করা হয়, এবং প্রয়োজন হলে দেখানোর জন্য সাধারণ ঘোরাঘুরির কিছু ভিডিও ফোনে রাখা থাকে। একই সঙ্গে, কর্তৃপক্ষের সামনে পড়লে কাজে লাগানোর জন্য আমরা আমাদের সবচেয়ে নির্বিকার পর্যটকসুলভ অভিব্যক্তি প্রকাশের প্রস্তুতিও রেখেছিলাম।

সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় আমি শুরুতেই সাক্ষীদের জানিয়ে দিতাম, যদি কোনো প্রশ্নে তারা অস্বস্তি বোধ করেন, তাহলে সেটি এড়িয়ে যেতে পারেন। তখন আমরা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলবো বা বিরতি নেব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের সাক্ষাৎকারে আমরা চেষ্টা করতাম ভুক্তভোগীদের ট্রমাকে পুনরায় উসকে না দিতে।

আমি সাধারণত উন্মুক্ত প্রশ্ন দিয়ে প্রতিটি সাক্ষাৎকার শুরু ও শেষ করি। যাতে সাক্ষীরা নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা সংবেদনশীল বিষয়গুলো বলতে পারে। এছাড়া আমি তাদের কাহিনীর সবচেয়ে খারাপ দিকগুলো আগে থেকে অনুমান করি না। নির্যাতনের দৃশ্যের ক্ষেত্রে—এ অনুসন্ধানে এমন অনেক ঘটনা ছিল—আমি সাধারণত সাক্ষীরা নিজে উল্লেখ না করা পর্যন্ত এই বিষয়ে সরাসরি প্রবেশ করতাম না। এ ধরনের বিষয়ে আমি বেশি মনোযোগ দিতাম তাঁদের অনুভূতি, ভয় ও স্মৃতির ওপর, শারীরিক নির্যাতনের বিশদ বর্ণনার ওপর নয়। এটি মূলত আহত মানুষদের নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার একটি পদ্ধতি।

স্বাভাবিকভাবে, কিছু মানুষ নিজ থেকে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে চায় না। এমন পরিস্থিতিতে আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, তারা কি কোনো নির্দিষ্ট ধরনের সহিংসতার সাক্ষী বা শুনেছেন, যা আমি নথিভুক্ত করছি। এটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি এগিয়ে নিতে সাহায্য করে এবং সাক্ষীদের জন্য পথ খোলা রাখে। স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মধ্যে যৌন সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে জটিল। আমি দৃঢ়ভাবে সন্দেহ করি, কয়েকটি ক্ষেত্রে বেঁচে ফেরা মানুষরা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন, কিন্তু নানা কারণে তা প্রকাশ করতে পারেননি। হয়তো ঘরে স্বামী উপস্থিত ছিলেন, বা লজ্জার ভার বহন করতে পারেননি, কিংবা স্মৃতি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।

তবে আমার কাজ ভুক্তভোগীদের তাদের ট্রমা নিয়ে কথা বলতে বাধ্য করা নয়। ডাক্তার, আইনজীবী বা গবেষকরা এসব তথ্য আমাকে দিতে পারেন। আমার কাজ হলো তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেগুলোকে একটি জীবন্ত গল্প আকারে অর্থপূর্ণভাবে সাজানো। আমি সবসময় মনে রাখি, কোনো ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলার পর আমি তো তার বাড়ি ছেড়ে চলে আসি, কিন্তু ওই মানুষটি তো তার নিজের বোধ আর অনুভূতি আগলে ধরে সেখানে থাকে। তাই আমাকে নিশ্চিত করতে হয় যে সেই অভিজ্ঞতা তাদের জন্য যতটা সম্ভব কম যন্ত্রণার হোক।

ফ্রিল্যান্সারদের পকেটে যখন টাকা থাকে না

অর্থের অভাবে এই অনুসন্ধানটি স্রেফ একটি ইচ্ছা হিসেবেই থেকে যেত। প্রতিবেদন তৈরির জন্য অর্থ প্রয়োজন। অর্থের অভাব প্রায়ই গল্পের মৃত্যু ঘটায়, বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রে। এই প্রকল্পটি গড়ে তুলতে আমাদের কয়েক মাস সময় লেগেছে। বেশ কিছু মিডিয়া সংস্থা বিষয়টির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে কোনো বড় ফরাসি সংবাদপত্র গল্পটি নিতে রাজি হয়নি।

শেষ পর্যন্ত, স্লেটডটএফআর অর্থায়ন এবং আমাদের অনুসন্ধান চালানোর জন্য চমৎকার একটি প্ল্যাটফর্ম দেয়। যার ফলাফল একটি নয়, আমরা আট পর্বের দীর্ঘ- ফিচার সিরিজ তৈরি করি। পর্বগুলোকে আমরা বর্ণনামূলক ধারায় সাজিয়েছি। শুরুতে চীনের ক্যাম্পগুলোর অবস্থা দেখানো হয়। তারপর কাজাখ সীমান্ত পার, এবং শেষ পর্যায়ে ইউরোপ—বিশেষ করে ফ্রান্সের ঘটনাগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অপ্রতিরোধ্য অবহেলার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।

2024 European Press Prize Distiguished Reporting Award Border of Tears

ছবি: স্ক্রিনশট, ইউরোপিয়ান প্রেস প্রাইজ

এই সিরিজটি থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের কার্ট শর্ক ফ্রিল্যান্স অ্যাওয়ার্ড, ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান প্রেস প্রাইজের ডিস্টিংগুইশড অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। এছাড়া ২০২৩ সালের বেয়ু ক্যালভাডোস-নর্ম্যান্ডি অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়ার করেসপন্ডেন্টস-এর জন্য মনোনীত হয়।

অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, পরবর্তীতে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম আগ্রহ দেখায়—অবশ্য একটু দেরিতে। পুরস্কারজয় করাটা তৃপ্তিদায়ক, যদিও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য তা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে এমন চ্যালেঞ্জিং ও ভীষণ সংবেদনশীল বিষয়ে, যেখানে আগাম ফলাফল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

গত শীতের মৌসুমে প্রতিবেশী কিরগিজস্তানে আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানের পরিস্থিতি আরো বেশি সংবেদনশীল। যতক্ষণ না পুলিৎজার সেন্টারের পক্ষ থেকে প্রকল্পটির জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত হয়েছে, তার আগে আমরা বহুবার হাল ছেড়ে দিয়েছি। তবে, এবার আমরা  আমাদের এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের পূর্ব তুর্কিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আন্তঃদেশীয় নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়  উন্মোচন করতে সক্ষম হবো।


Léa Polveriniলেয়া পলভেরিনি  ফ্রান্সের ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার, যিনি স্লেটডটএফআর, মিডল ইস্ট আই এবং লে মঁড ডিপ্লোমাটিক-এর জন্য লেখেন।

 

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

অনুসন্ধান পদ্ধতি পদ্ধতি

সাংবাদিকতা আর নৃতাত্ত্বিকতার মিশেলে মধ্য আমেরিকার পুরস্কারজয়ী অনুসন্ধান

দ্য মাস্কিসা: দ্য হন্ডুরান জঙ্গল ড্রোনিং ইন কোকেন শিরোনামে তিন পর্বের ধারাবাহিক ওর্তেগা ওয়াই গ্যাসেট পুরস্কারে ভূষিত হয়। জুরিরা বলেন, প্রতিবেদনটিতে চলমান সময়ের সামগ্রিক বিষয়গুলো উঠে এসেছে। মাদক পাচার, পরিবেশগত সমস্যা বা পরম্পরা ও সংস্কৃতির ওপর হুমকি এ সবই। প্রতিবেদকেরা বলেছেন,তাঁরা নৃতাত্ত্বিক গবেষণা পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন।

Recorder panel at IJF24

তহবিল সংগ্রহ পদ্ধতি পরামর্শ ও টুল

স্বাধীন নিউজরুমের আয়ের মডেল কী হতে পারে? 

অল্প বয়সী দর্শকদের কাছে যেন গ্রহণযোগ্য হয়— রেকর্ডারের তরুণ কর্মীরা ঠিক তেমনভাবে তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে। পাঠকের পয়সা দিয়েই আয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তারা।

IJF24 Reframing Visual Journalism AI Deepfake

পদ্ধতি পরামর্শ ও টুল সংবাদ ও বিশ্লেষণ

ডিপফেকের যুগে ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতা: সত্য যাচাই ও আস্থা অর্জন

ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতা এখন তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এগুলো হলো সিন্থেটিক কনটেন্টের “উত্তাল সমুদ্রে” মৌলিক বিষয়বস্তু শনাক্ত; জনগণের আস্থা ধরে রাখা; এবং “প্রকৃত ছবি” দিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

BBC Africa Eye undercover investigation codeine cough syrup black market

পদ্ধতি পরামর্শ ও টুল

আন্ডারকভার রিপোর্টিং? আফ্রিকার অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু পরামর্শ

আন্ডারকভার রিপোর্টিং কৌশলগুলো কীভাবে কাজে লাগাবেন তা আরও ভালভাবে তুলে ধরার জন্য জিআইজেএন কথা বলেছে আফ্রিকার অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সঙ্গে। আন্ডারকভার রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে এই সাংবাদিকেরা যুগান্তকারী সব প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।