ছবি: জিআইজেএন
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কী কেবল সংখ্যার হিসাব-নিকাশ, না আরও কিছু: অভিজ্ঞতা থেকে যা বলেছেন এই নারী সাংবাদিক
কোট দিভোয়ারের (আইভরি কোস্ট) সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম রেডিওডিফিউশন টেলিভিশন আইভোরিয়েনের (আরটিআই) পরিচিত কণ্ঠ মার্থে আকিসি ক্রা। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটিতে তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করেন।
তিনি তার সময়ের বড় একটি অংশ কোট দিভোয়ারে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সেখানকার মানুষের ওপর এর প্রভাব নিয়ে সরেজমিনে প্রতিবেদন তৈরির কাজে ব্যয় করেন। তার কাজের মধ্যে রয়েছে সংরক্ষিত এলাকাগুলোর ওপর বাড়তে থাকা চাপ, যেমন স্বর্ণ উত্তোলন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, রেইনফরেস্ট ধ্বংস, অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী শিকার, পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখসারিতে থাকা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব।
ক্রা তার কাজের জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন। বিজ্ঞান সাংবাদিকতার জন্য পেয়েছেন মিডিয়া ফর সায়েন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড-এর সুপার প্রাইজ (কোট দিভোয়ার), রেডিও বিভাগে দ্বিতীয় নরবার্ট জোঙ্গো আফ্রিকান ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম প্রাইজ (পাজি-এনজেড) এবং ২০২২ সালের প্রি ইকোরিপোতাজ দু ক্লাব দে লা প্রেস দ্রোম-আরদেশ (ফ্রান্স)। সম্প্রতি তিনি নেটওয়ার্ক অব সায়েন্স জার্নালিস্টস ফর ফ্রাঙ্কোফোন আফ্রিকার (আরএসএএফ-কোট দিভোয়ার) দেশীয় সমন্বয়ক হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছেন।
তিনি বলেন, তার প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জটিল বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত তথ্যকে সহজ গল্পে রূপ দেওয়া। যা বৈশ্বিক পরিবেশগত বিষয়গুলোকে স্থানীয় শ্রোতাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে। এ প্রসঙ্গে তিনি জিআইজেএনকে বলেন, “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা শুধু সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরকারি নীতিকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে।”
এছাড়া, ক্রা তার দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, কীভাবে তিনি “কৌতূহলী, ধৈর্যশীল এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান” থাকেন তা জানিয়েছেন। কথা বলেছেন নাচের গুরুত্ব নিয়েও।
জিআইজেএন: আপনি এখন পর্যন্ত যতগুলো অনুসন্ধান করেছেন, তার মধ্যে কোনটি আপনার সবচেয়ে প্রিয় এবং কেন?
মার্থে আকিসি ক্রা: আমার অনুসন্ধান “অর ট্রুবল: লে দেসু দ্য লেক্সত্রাকসিওঁ আঁ কোট দিভোয়ার” (বিপাকে স্বর্ণ: কোট দিভোয়ারে স্বর্ণ উত্তোলনের নেপথ্যের চিত্র) আমার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। দুই বছর ধরে আমি তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করেছি, সরকারি নথি পরীক্ষা করেছি এবং সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছি। যাতে বুঝতে পারি স্বর্ণ উত্তোলনের মাধ্যমে অর্জিত আয় কীভাবে বন্টন করা হয়। এই অনুসন্ধান আমাকে শিখিয়েছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কেবল সংখ্যার হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরকারি নীতিমালার সঙ্গে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতার যোগসূত্র স্থাপন করে। এটি মূলত আমার কাজের ধরনকেই প্রতিফলিত করে: ধৈর্য, নিষ্ঠা, তথ্য যাচাই এবং জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার।

মার্থে আকিসি ক্রার অনুসন্ধান: বিপাকে স্বর্ণ: কোট দিভোয়ারে স্বর্ণ উত্তোলনের নেপথ্যের চিত্র। ছবি: স্ক্রিনশট, সেনোজো
জিআইজেএন: আপনার দেশ বা অঞ্চলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?
এমএকে: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারি তথ্য পাওয়া। যদিও কোট দিভোয়ারে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবুও সাংবাদিকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ নথি পেতে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় অনুরোধের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না, তথ্য অসম্পূর্ণ থাকে এবং সংবাদকক্ষগুলোর সম্পদও সীমিত। আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো নারী অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা। দুর্নীতি, খনিজ সম্পদ উত্তোলনকারী শিল্প এবং সুশাসন নিয়ে অনুসন্ধান করাকে এখনো “পুরুষের কাজ” হিসেবে দেখা হয়। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে আরও দৃঢ় করেছে। আমি জানি নিষ্ঠা, সাহস ও অধ্যবসায় কোনো লিঙ্গের পরিচয়ে নির্ধারিত হয় না।
জিআইজেএন: একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
এমএকে: অসংখ্য বাধা সত্ত্বেও অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়াটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। খনি খাত নিয়ে আমার অনুসন্ধানের সময়, আমি যখন সরকারি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছিলাম, তখন সেগুলো পরিবর্তন করা হয়। আমাকে আমার বিশ্লেষণের একটি অংশ নতুন করে করতে হয় এবং সব তথ্য আবার যাচাই করতে হয়। প্রকাশের পর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আমার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের ওয়েবসাইট থেকে অনুসন্ধানটি সরিয়ে দেওয়া হয়। এই অভিজ্ঞতা আমার এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে যে, একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হলো প্রমাণের শক্তি।
জিআইজেএন: সাক্ষাৎকার নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার সেরা পরামর্শ কী?
এমএকে: ভালোভাবে প্রস্তুতি নিন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে শিখুন। অনেক সময় আগে থেকে তৈরি করা প্রশ্নগুলোর বাইরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরগুলো পাওয়া যায়। কোনো সোর্স যখন মনে করেন যে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা হচ্ছে এবং তাকে সম্মান করা হচ্ছে, তখন তিনি কখনো কখনো এমন তথ্যও প্রকাশ করে ফেলেন যা শুরুতে তিনি জানানোর কথা ভাবেননি।
জিআইজেএন: প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে পছন্দের টুল, ডেটাবেস বা অ্যাপ কোনটি?
এমএকে: তথ্য-উপাত্ত সাজানো ও বিশ্লেষণের জন্য আমি মাইক্রোসফট এক্সেলের ওপর অনেকটাই নির্ভর করি। এছাড়া আমি এক্সট্রাকটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ ট্রান্সপারেন্সি ইনিশিয়েটিভ (ইআইটিআই)-এর প্রতিবেদন, বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিবেদন, সরকারি নথি এবং উন্মুক্ত ডেটাবেসও ব্যবহার করি। তবে সোর্সকে পদ্ধতিগতভাবে যাচাই-বাছাইয়ের কোনো বিকল্প নেই। কোনো টুলই এ জায়গাটি পূরণ করতে পারবে না।
জিআইজেএন: আপনার পাওয়া সেরা পরামর্শটি কী এবং একজন তরুণ সাংবাদিককে আপনি কী পরামর্শ দেবেন?
এমএকে: আমার পাওয়া সেরা পরামর্শটি হচ্ছে, অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সবসময় তথ্য-উপাত্তকেই পথপ্রদর্শক হিসেবে মানতে হবে, ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে নয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় আগ্রহী যে কাউকে আমি বলব কৌতূহলী, ধৈর্যশীল এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান হতে। মেনে নিন, কিছু অনুসন্ধান শেষ করতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন কোনো তথ্য কখনো প্রকাশ করবেন না, যা আপনি প্রমাণ করতে পারবেন না। একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে তার তথ্য যাচাইয়ের মানের ওপর।
জিআইজেএন: আপনি কোন সাংবাদিককে শ্রদ্ধা করেন এবং কেন?
এমএকে: আমি মার্ক হান্টারকে শ্রদ্ধা করি। তার সঙ্গে আমার দুইবার দেখা করার সুযোগ হয়েছে। প্রথমবার গোথেনবার্গে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (জিআইজেসি) এবং পরে লন্ডনের সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (সিআইজে)-এ। পদ্ধতি, নিষ্ঠা ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার যে ধারণা তিনি তুলে ধরেছেন, তা আমার খুবই ভালো লাগে। তার সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা আমার এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে, একটি শক্তিশালী অনুসন্ধান সবার আগে গড়ে ওঠে নির্ভুল ও সুনির্দিষ্ট একটি পদ্ধতির ওপর।
জিআইজেএন: আপনার করা সবচেয়ে বড় ভুল কী ছিল এবং তা থেকে কী শিখেছেন?
এমএকে: আমার পেশাজীবনের শুরুর দিকে কয়েকজন সহকর্মী আমাকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, একজন তরুণীর জন্য এই কাজটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে আমি তখন সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ বিষয়ক যে ফেলোশিপটি পেয়েছিলাম, তা ছেড়ে দেই। তবে পেছনে ফিরে তাকালে দেখি, সেই অভিজ্ঞতাই পরে আমার জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে আমি যেসব অনুসন্ধান করেছি এবং যেসব পুরস্কার পেয়েছি, সেগুলো আমার এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে যে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিচয় নির্ধারিত হয় সততা, সাহস ও নিষ্ঠা সহকারে প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে; লিঙ্গ দিয়ে নয়।
জিআইজেএন: এতটা চাপের পেশায় আপনি কীভাবে বার্নআউট এড়িয়ে চলেন?
এমএকে: আমি আমার পরিবার, নাচ এবং সেই মানুষদের সঙ্গেই সময় কাটাই, যারা আমাকে মনে করিয়ে দেন কেন আমি এই কাজ করি। কোনো কঠিন অনুসন্ধানের পর আমি বিশ্রামের জন্য সময় বের করে নিই। এতে নতুন উদ্যম ও স্বচ্ছতা নিয়ে আবার মাঠে ফিরতে পারি।
জিআইজেএন: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করে এবং আপনি কী পরিবর্তন দেখতে চান?
এমএকে: যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করে, তা হলো আফ্রিকার সাংবাদিকদের করা চমৎকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের পরও বাস্তবে খুব কম প্রভাব ফেলতে দেখা। অনেক সময় এসব অনুসন্ধান কোনো সংস্কার, সরকারি তদন্ত বা অর্থবহ জনআলোচনার জন্ম দেয় না। আমি আশা করি, গণমাধ্যম, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকেরা এসব অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যের প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দেবেন। যাতে এগুলো আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখে।

আইসাতু ফোফানা কোট দিভোয়ারভিত্তিক আইভোরিয়ান সাংবাদিক ও গণমাধ্যম উদ্যোক্তা। একাধারে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্লগ লেখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি কাজ করেছেন পরিবেশ সাংবাদিকতা নিয়ে। অনেক বেশি মানুষের কাছে পরিবেশবিষয়ক তথ্য পৌঁছে দিতে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন অনলাইন গণমাধ্যম লেকোলজিস্ট। তিনি আফ্রিকান ইউনিয়ন মিডিয়া ফেলোশিপের একজন ফেলো।