ছবি: শাটারস্টক
দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হোক কিংবা সন্দেহজনক শেল কোম্পানির প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করার চেষ্টা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধানের শুরুটা হয় হাতে থাকা মাত্র কয়েকটি সূত্র থেকে।
আপনার কাছে হয়তো কারও পুরোনো ফোন নম্বর, একটি নাম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো পোস্টের পেছনে থাকা একটি মুখের ছবি আছে। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন সূত্র একত্র করে কোনো ব্যক্তির বিস্তারিত তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হলে একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। ওসিসিআরপির অনুসন্ধানী গবেষকেরা তাদের নেটওয়ার্কের বিভিন্ন সাংবাদিককে সহায়তা করতে প্রতিদিনই এই ধরনের কাজ করেন।
যারা চান না যে তাদের খুঁজে পাওয়া যাক—এই প্লেবুকে এমন মানুষদের খুঁজে বের করার জন্য আমাদের দল যেসব মৌলিক পদ্ধতি, ডেটাবেস ও ডিজিটাল কৌশল ব্যবহার করে, সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে। আপনি যে ধরনের ঘটনা বা বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করুন না কেন, এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে একটি প্রোফাইল তৈরি করতে পারবেন।
শুরু করার আগে: প্রাথমিক নিরাপত্তা
ডিজিটাল মাধ্যমে কারও সম্পর্কে খোঁজখবর শুরু করার আগে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে কিছু মৌলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
যাকে নিয়ে অনুসন্ধান করছেন, তিনি যেন বুঝতে না পারেন যে কেউ তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছে, সে জন্য কখনোই নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালাবেন না। বরং কাজের জন্য আলাদা ও বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। একই সঙ্গে, আপনার ইন্টারনেট সংযোগ সবসময় ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন)-এর মাধ্যমে ব্যবহার করুন। এতে আপনার অনলাইন কার্যক্রম এনক্রিপ্ট থাকবে এবং আপনার প্রকৃত অবস্থান গোপন থাকবে।
এখন বেশিরভাগ বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মই স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে ও সরিয়ে দেয়। লিংকডইনের মতো প্ল্যাটফর্মে বিষয়টি আরও কঠিন। তাই আপনার তৈরি করা ভুয়া অ্যাকাউন্টটির একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিচয় থাকতে হবে এবং সেটি প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়ও রাখতে হবে।
ধরুন, আপনার তৈরি করা পরিচয়ের নাম “স্যাম উড” । তাহলে একই নামে একটি ইমেইল অ্যাকাউন্টও তৈরি করুন। একটি পেশা বা কিছু শখ ঠিক করুন এবং সময় সময় সেগুলো নিয়ে পোস্ট করুন।
আপনি যদি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কারও প্রোফাইল দেখেন, তাহলেও অ্যালগরিদম আপনাকে সেই ব্যক্তির কাছে পরিচিত বা সংযোগের পরামর্শ হিসেবে দেখাতে পারে। যেমন, আপনি যদি হান্না স্মিথ নামের কারও বিষয়ে অনুসন্ধান করেন এবং তার প্রোফাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটান, তাহলে ফেসবুক বা লিংকডইন হান্না স্মিথকে আপনার অ্যাকাউন্টটি পরিচিত হিসেবে যুক্ত করার পরামর্শ দিতে পারে। এটি ধারণা করতে পারে, আপনারা সম্ভবত বন্ধু।
নিজের সাবেক সঙ্গীর ফেসবুক পেজে গিয়ে ভুল করে ১০ বছর আগের কোনো ছবিতে লাইক দিয়ে ফেলাটা হয়তো বিব্রতকর হতে পারে। কিন্তু একই ভুল যদি কোনো অপরাধীর প্রোফাইলে গিয়ে আপনি করে বসেন, সেটি কিন্তু বেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
আর্কাইভ করা
কোনো অসাধু ব্যক্তি যখন বুঝতে পারেন যে তাকে নিয়ে অনুসন্ধান চলছে, তখন তার প্রথম কাজ হয় অনলাইনে থাকা সবকিছু সরিয়ে ফেলা এবং নিজের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট মুছে ফেলা। তাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত মুছে ফেলার আগে আপনি যা যা খুঁজে পাচ্ছেন, তা নিয়ম মেনে আর্কাইভ করুন।
আমাদের পরামর্শ হচ্ছে, আপনার ব্রাউজারে এমন একটি এক্সটেনশন যুক্ত করুন, যেটির মাধ্যমে পুরো ওয়েবপেজের স্ক্রিনশট নেওয়ার সুবিধা আছে। এতে আপনি যে ওয়েবপেজগুলো দেখছেন, দ্রুত ও সহজে সেগুলোর স্ক্রিনশট নিতে পারবেন।
স্ক্রিনশট নেওয়ার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন, যেন সেখানে তারিখটি দেখা যায়। পাশাপাশি ইউআরএল লিংকটিও সংরক্ষণ করুন। যেন পরে সেটি আবার দেখা যায়, বিশেষ করে যদি তখনও লিংকটি সক্রিয় থাকে। আপনি ওয়েবপেজের একটি কপি তৈরি করতে ওয়েব্যাক মেশিন ব্যবহার করতে পারেন। মূল লিংকটি পরে সরিয়ে ফেলা হলেও ওয়েবপেজটির কপিটি তখনও দেখা যাবে। তবে মনে রাখবেন, ওয়েবপেজটির সেই কপিতে অন্যরাও প্রবেশ করতে পারবেন।

ওয়েবসাইট আর্কাইভ করতে ওয়েব্যাক মেশিন ব্যবহার করা যায়। ছবি: স্ক্রিনশট, ইন্টারনেট আর্কাইভ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট সংরক্ষণের টুলগুলো নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। তাই এই বিষয়ে সবসময় হালনাগাদ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে ফেসবুকের ভিডিও ডাউনলোড করতে এফডাউনডটনেট এবং পাবলিক ইনস্টাগ্রাম স্টোরি, হাইলাইট ও ভিডিও ডাউনলোড করতে স্টোরি সেভার ব্যবহার করা যায়।
আমাদের এক সহকর্মী একবার প্রিন্স গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ীর স্ত্রীর বিষয়ে অনুসন্ধান করেছিলেন। প্রিন্স গ্রুপ কম্বোডিয়ার অনেক বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। শিল্পকারখানা সংশ্লিষ্ট সাইবার বিষয়ক প্রতারণা পরিচালনার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র যাদেরকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। তিন বছর পর দেখা গেল, ওই নারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবকিছু মুছে ফেলা হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে, আমাদের এক সহকর্মী আগে থেকেই সবকিছুর স্ক্রিনশট নিয়ে রাখার কারণে সহজেই তা খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ তিনি তথ্য-প্রমাণ হিসেবে তা নির্দিষ্ট জায়গায় সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। ফলে প্রমাণগুলো অক্ষত ছিল।
বিস্তারিতভাবে শুরু করুন
প্রথমেই একটি সাধারণ কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজ হলো খুঁটিনাটি সবকিছুর খোঁজখবর নেওয়া। কোনো বিষয় নিয়ে কয়েক সপ্তাহ অনুসন্ধান চালানোর পর আপনাকে যেন জানতে না হয়, অন্য কোনো সাংবাদিক এরই মধ্যে উত্তরটি খুঁজে বের করে সে বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন—আপনি নিশ্চয়ই এটা চাইবেন না।
সাধারণত আমরা গুগলে ওই ব্যক্তির নাম বা জানা অন্য কোনো পরিচয়বিষয়ক তথ্য দিয়ে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান শুরু করি। অ্যাডভান্সড সার্চ অপারেটর ব্যবহার করলে এই কাজ আরও কার্যকরভাবে করা যায়। যেমন, নির্দিষ্ট নাম খুঁজতে উদ্ধৃতি চিহ্ন (“মার্ক ডো”) ব্যবহার করা যায়। আবার অপ্রাসঙ্গিক তথ্য বাদ দিতে মাইনাস চিহ্ন ব্যবহার করা যায়।
বর্তমানে কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে এআই কী জানে, তা দেখতেও আমরা সতর্কতার সঙ্গে এআই ব্যবহার করি। তবে এক্ষেত্রে উৎসগুলোর দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া জরুরি। এমনভাবে প্রম্পট তৈরি করুন, যেন উত্তরের সঙ্গে সূত্রের লিংক দেওয়ার নির্দেশনা থাকে। আর এআইতে কখনোই সংবেদনশীল তথ্য আপলোড করবেন না এবং মূল উৎসের সঙ্গে যাচাই না করে এআইয়ের সারসংক্ষেপকে বিশ্বাস করবেন না।
আমরা কয়েক দশকের পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিংয়ের আর্কাইভ থাকা ডেটাবেসও ব্যবহার করি—যেমন লেক্সিসনেক্সিস এবং ডাও জোন্স ফ্যাক্টিভা। যাতে গণমাধ্যমে ওই ব্যক্তির গ্রেপ্তার বা আদালতে হাজির হওয়ার কোনো পুরোনো উল্লেখ আছে কি না, তা খুঁজে দেখা যায়। এসব ডেটাবেস ব্যবহার করার সুযোগ না থাকলেও, আপনি যে ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান করছেন, তার সম্পর্কে কোথাও কোনো উল্লেখ আছে কি না, তা জানতে সংবাদ আর্কাইভ বা সংবাদপত্রের কাটিংয়ে খোঁজ নেওয়ার অভ্যাস করা ভালো।
এরইমধ্যে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে কী কী তথ্য প্রকাশ্যে রয়েছে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকলে পরবর্তী ধাপে আরও আকর্ষণীয় বা আড়ালে থাকা তথ্য খোঁজার আগে আপনার অনুসন্ধানের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে।
সঠিক প্রশ্নটি করুন
অনলাইনে অনুসন্ধান শুরু করলে সহজেই তথ্যের গোলকধাঁধায় আটকে যেতে পারেন। তাই কোথায় আটকে যাচ্ছেন, সেটি সঠিক জায়গা কি না, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিকভাবে বিস্তৃত পর্যালোচনা করার পর সঠিক প্রশ্ন করে আপনার অনুসন্ধানের পরিধি ছোট করুন।
শুধু ‘ভ্লাদিমির পপভ সম্পর্কে সবকিছু খুঁজে বের করতে হবে’—এমন একটি বিস্তৃত লক্ষ্য নির্ধারণ করলে বিপুল পরিমাণ তথ্যের চাপে আপনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন। এর চেয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে অনুসন্ধান করা অনেক বেশি কার্যকর। যেমন, ‘ভ্লাদিমির পপভের সঙ্গে ‘ক’ নামের কোনো কর্মকর্তার কোনো সম্পর্ক আছে কি?’ অথবা ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘খ’ নামের কোনো কর্মীর সঙ্গে তার আর্থিক সম্পর্ক কী?’। এই ধরনের নির্দিষ্ট প্রশ্ন অনুসন্ধানকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধরে রাখে, আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করে এবং একটি প্রতিবেদনের ভিত্তি হিসেবে প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট প্রমাণ খুঁজে পেতে সহায়তা করে।
নাম ও নম্বর
নাম ও নম্বর
ব্যক্তিগত শনাক্তকারী—অর্থাৎ, ব্যক্তিকে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে সাহায্য করে এমন স্বতন্ত্র তথ্য—একই নামের লাখো মানুষের মধ্য থেকেও নির্দিষ্ট একজনকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে।
পাসপোর্ট নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর বা বায়োমেট্রিক তথ্যের মতো সরাসরি শনাক্তকারী তথ্য নিশ্চিত প্রমাণ দিতে পারে। তবে এসব তথ্য আইনগতভাবে সুরক্ষিত, তাই পাওয়াটা বেশ কঠিন। এর পরিবর্তে, ওপেন সোর্স সাংবাদিকতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শনাক্তকারী তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে জন্মতারিখ, ইমেইল ঠিকানা, ফোন নম্বর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইউজারনেম। এসব তথ্যের সঙ্গে চাকরির ইতিহাস বা পারিবারিক সম্পর্ক মিলিয়ে দেখলে, আপনি যে ব্যক্তিকে খুঁজছেন, তিনিই ওই সঠিক ব্যক্তিটি কি না, তা নিশ্চিত করা সহজ হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, নাম নিজেই ডিজিটাল অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি জটিল বিষয় হতে পারে। বিশেষ করে ট্রান্সলিটারেশন বা এক বর্ণমালা থেকে অন্য বর্ণমালায় নামের রূপান্তরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আরবি বা সিরিলিক বর্ণমালা থেকে লাতিন বর্ণমালায় নাম রূপান্তর করার সময় বানানের নানাবিধ ভিন্নতা দ্রুত বাড়তে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, আরবি নাম ‘মোহাম্মদ’ বিভিন্ন অঞ্চল ও যিনি নামটি লিখছেন, তার ওপর নির্ভর করে সহজেই ‘মুহাম্মদ’, ‘মহামাদ’ বা আরও এক ডজন ভিন্নভাবে লেখা হতে পারে।
বানানের পাশাপাশি, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নামের কাঠামো কীভাবে গঠিত হয়, সেটি বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত আরবি নাম সাধারণত তিনটি অংশের হয়: ব্যক্তির নাম, বাবার নাম এবং পারিবারিক নাম। অন্যদিকে, হিস্পানিক নামের ক্ষেত্রে সাধারণত বাবার ও মায়ের পারিবারিক নাম পরপর যুক্ত থাকে। নামের এই কাঠামোগত পার্থক্যগুলোর দিকে গভীরভাবে নজর দিলে শুধু সঠিকভাবে অনুসন্ধান করাই নিশ্চিত হয় না, একই সঙ্গে তা এমন গুরুত্বপূর্ণ সূত্রও দিতে পারে, যা কোনো ব্যক্তির বংশপরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি সম্পর্কে তথ্যের দ্বার খুলে দিতে পারে।
সরকারি নথি খুঁজে বের করা
অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য সরকারি নথি অত্যন্ত মূল্যবান তথ্যের উৎস। শুরুতেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম দিয়ে তার দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি, উড়োজাহাজ ও জাহাজের নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি বা রেজিস্ট্রি খুঁজে দেখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ওই ব্যক্তির নামে কোনো সম্পদ নিবন্ধিত আছে কি না, তা জানা সম্ভব।
তবে যেসব দেশে এসব নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় না, সেসব দেশের ক্ষেত্রে আপনাকে একটু কৌশলী হতে হবে। এর অর্থ হতে পারে, ওই ব্যক্তির বিদেশে কোনো সম্পদ বা ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতার চিহ্ন আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। পাশাপাশি, তথ্যগত স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে এমন দেশ বা বিচারব্যবস্থায় তার নাম পাওয়া যায় কি না, কিংবা আদালতের প্রকাশ্য নথির মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা সম্পর্কে তথ্য জানা যায় কি না, সেটিও খুঁজে দেখা যেতে পারে।
ধরুন, আপনি ভেনেজুয়েলার হোসে ফার্নান্দেজ নামের কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। সেখানে কোম্পানির রেজিস্ট্রি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত নয়। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আদালতের মামলায় তাকে খুঁজে পেতে পারেন। সেখানে থাকা প্রকাশ্য নথিতে হোসের ভেনেজুয়েলাভিত্তিক কোম্পানিগুলোর উল্লেখ থাকতে পারে।
সরকারি নথির মধ্যে আরও রয়েছে সরকারি আর্কাইভ ও বিভিন্ন সরকারি লাইসেন্স। যেমন, কিছু দেশের সরকারি গেজেটে কোম্পানিবিষয়ক তথ্য প্রকাশ করা হয়। যার মধ্যে শেয়ারহোল্ডারদের তথ্যও থাকতে পারে। হোসে যে ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছেন বলে আপনি ধারণা করছেন, ডোমেইনটুলসে খুঁজেও সে সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন।

ওসিসিআরপির গবেষণা ও ডেটা দল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ডেটাবেসের লিংকসহ গবেষণার বিভিন্ন উৎসের একটি তালিকা সংরক্ষণ করে। ছবি: স্ক্রিনশট, ওসিসিআরপি
শুরু করার জন্য ওসিসিআরপির গবেষণা ও ডেটা দল একটি গবেষণা-উৎসের ক্যাটালগ তৈরি করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ডেটাবেসের গুরুত্বপূর্ণ লিংকগুলো এতে রয়েছে এবং আমরা তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ রাখার চেষ্টা করি। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর কোম্পানি নিবন্ধনভান্ডারের একটি তালিকাও আমাদের পছন্দের একটি উৎস।
তৃতীয় পক্ষের ডেটাবেস
সরকারি নথি কোথায় পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত না হলে, অথবা সরকারি নথি পাওয়া না গেলে তৃতীয় পক্ষের ডেটাবেস গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। আপনার অনুসন্ধানের সময়ও কমিয়ে আনতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের তথ্য খুঁজতে ওপেনকরপোরেটস, জাহাজের মালিকদের তথ্য জানতে ইকুয়াসিস এবং ব্যক্তিগত জেট রয়েছে এমন মালিকদের তথ্য খুঁজতে ফ্লাইটরাডার২৪। তবে মনে রাখবেন, এসব ডেটাবেসেও ভুল থাকতে পারে। তাই সরকারি উৎস ব্যবহার করে তথ্যগুলো আবার যাচাই করা জরুরি।

ওপেনকরপোরেটস একটি তৃতীয় পক্ষের ডেটাবেস, যা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের তথ্য খুঁজে বের করতে ব্যবহার করা যায়। ছবি: স্ক্রিনশট, ওপেনকরপোরেটস
আমাদের দলটি সায়ারি, মুডিস অরবিস এবং অফশোর অ্যালার্টসের মতো বেশ কিছু শক্তিশালী তৃতীয় পক্ষের ডেটাবেসও ব্যবহার করে। কোন টুল ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে এসব প্ল্যাটফর্মে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোম্পানির মালিকানার কাঠামো, আন্তর্জাতিক মামলার নথি বা আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য একত্র করা থাকে। আমরা আইসিআইজের লিকস ডেটাবেস বা ওসিসিআরপির আলেফপ্রোতে পাওয়া বিভিন্ন ফাঁস হওয়া তথ্যভান্ডারেও ব্যক্তির নাম বা তাদের কোম্পানির নাম দিয়ে অনুসন্ধান করি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ‘দুর্বলতম সংযোগ’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো ঘেঁটে দেখাও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার আরেকটি উপায়। তবে এর জন্য শত শত ছবি, পোস্ট ও মন্তব্য ধৈর্য ধরে খুঁজে দেখার মানসিকতা থাকতে হবে। এসব প্ল্যাটফর্মে ওই ব্যক্তির ‘বন্ধুদের’ তালিকাও খতিয়ে দেখলে তার বৃহত্তর যোগাযোগের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
জনমিতিক প্রবণতা আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে, আপনি যাকে নিয়ে অনুসন্ধান করছেন তার কোন প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করার সম্ভাবনা বেশি। যেমন, পশ্চিমা দেশগুলোর বেবি বুমার প্রজন্মের মানুষদের অনেকেই ফেসবুকে সক্রিয়। অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপের মিলেনিয়াল প্রজন্মের মানুষদের মধ্যে ভিকে ব্যবহারের প্রবণতা বেশি।
সবচেয়ে কঠোর গোপনীয়তা সেটিংস থাকলেও ‘দুর্বলতম সংযোগ’ খুঁজে তথ্য বের করা সম্ভব। যেমন, আপনি যে ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান করছেন, তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি হয়তো প্রাইভেট করা। কিন্তু তার মা হয়তো প্রতিদিন পাবলিক ছবি পোস্ট করেন। যেগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
একটি ঘটনায়, আমাদের আফ্রিকাভিত্তিক এক গবেষক কয়েক সপ্তাহ ধরে ইনস্টাগ্রাম ঘেঁটে এমন এক প্রতারককে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন, যে নিজেকে দুবাইয়ের এক রাজপুত্র পরিচয় দিয়ে এক নারীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ওই প্রতারকের স্ত্রীই তাদের ভিলার একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন, যা থেকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়।
সবশেষে, আপনি যে ছবিগুলো সংগ্রহ করেছেন, সেগুলো থেকে সর্বোচ্চ তথ্য বের করতে পিমআইজেসের মতো রিভার্স ইমেজ সার্চ টুলে (এমন একটি অনলাইন টুল, যেটির সাহায্যে কোনো ছবি ব্যবহার করে ইন্টারনেটে সেই ছবি বা ছবিটির অনুরূপ অন্য ছবি খুঁজে বের করা যায়) ছবিগুলো দিয়ে অনুসন্ধান করুন। এতে ওয়েবে অন্য কোথায় ছবিগুলো পাওয়া যায়, তা শনাক্ত করা সম্ভব। আপনি অবাক হবেন, কতবার আলোকচিত্রীরা পুরো বিয়ের অ্যালবাম অনলাইনে প্রকাশ করেন। ফলে সেখান থেকে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সহজেই শনাক্ত করা যায়।
‘পিপল সার্চ’ টুলের খুঁটিনাটি
ইন্টারনেটে প্রকাশ্যে থাকা বা ফাঁস হওয়া তথ্য সংগ্রহ ও সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে রাখে এমন ওএসআইএনটি ডেটাবেসের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এসব ডেটাবেসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সরকারি নথি এবং যোগাযোগের তালিকার মতো বিভিন্ন উৎসের তথ্য পাওয়া যায়।
এর মধ্যে শেষের টুলটি দেখায়, মানুষ তাদের ফোনে একটি নির্দিষ্ট নম্বর কী নামে সেভ করে রেখেছে, সেই তথ্য। বিস্ময়করভাবে যা আপনার কাজে লাগতে পারে।
কেউ যদি খুব সাধারণ একটি নাম ব্যবহার করেন, তখন এটি বিশেষভাবে কার্যকর। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ব্যক্তির ফোনে হয়তো একই নামে কয়েক ডজন ‘আহমেদ’ সেভ করা থাকতে পারে। তাই তারা স্বাভাবিকভাবেই নামের সঙ্গে আরও কিছু তথ্য যোগ করেন। যেমন ‘এবিসি কোম্পানির আহমেদ’। আপনি যদি এবিসি নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত কোনো আহমেদকে নিয়ে অনুসন্ধান করেন, তাহলে এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে এই নম্বরটি সম্ভবত আপনি যে আহমেদকে খুঁজছেন, তারই। আমরা এমন অনেক উদাহরণ দেখেছি। যেমন ‘ইলেকট্রিশিয়ান জো’, ‘সার্বিয়ান মিলোস’ কিংবা ‘বোর্ডের সদস্য আলী’, যেগুলো সবই অনুসন্ধানের জন্য কার্যকর সূত্র হতে পারে।
মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, এসব টুল কোনো ফোন নম্বর বা ইমেইল ঠিকানার মালিকানা যাচাই করে না। বরং অনলাইনে ওই তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত বা প্রকাশিত হয়েছে এবং কোন কোন নাম বা অবস্থানের সঙ্গে তা যুক্ত ছিল, তা দেখিয়ে সম্ভাব্য সংযোগ তুলে ধরে। তাই এসব অনুসন্ধান থেকে পাওয়া তথ্যকে পরিচয় নিশ্চিত করার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

ওএসআইএনটিডটইন্ডাস্ট্রিজ এমন কয়েকটি ডেটাবেসের একটি, যেগুলো ইন্টারনেটে প্রকাশ্যে থাকা বা ফাঁস হওয়া তথ্য সংগ্রহ ও সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে রাখে। ছবি: স্ক্রিনশট, ওএসআইএনটিডটইন্ডাস্ট্রিজ
এই ধরনের সূত্র সংগ্রহের জন্য ওসিসিআরপির গবেষণা ও ডেটা দলটি ওএসআইএনটিডটইন্ডাস্ট্রিজ এবং ডিস্ট্রিক্ট৪ল্যাবসের ডার্কসাইডের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। প্রথমটি শত শত ওয়েবসাইটে বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে কোনো ব্যক্তির প্রকাশ্য ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের একটি মানচিত্র দ্রুততার সঙ্গে তৈরি করে। আর দ্বিতীয়টি ওই তথ্যকে ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়া কোটি কোটি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। এই দুটি টুল একসঙ্গে ব্যবহার করে একটি ইমেইল বা ফোন নম্বরের মতো মাত্র একটি তথ্য থেকে কারও গোপন ছদ্মনাম বা সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট খুঁজে বের করা যায়। তাই এগুলো অনুসন্ধানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ডেটাবেসগুলোর কোনো একটিতে শুধু একটি ইমেইল ঠিকানা দিলেই আপনি জানতে পারেন, গুগল ম্যাপসে পরিচিত একজন রিভিউয়ার কোন কোন রেস্তোরাঁ পছন্দ করেন, গুডরিডসে কোনো ব্যবহারকারী কী ধরনের বই পড়েন, কিংবা ডুওলিঙ্গোতে কোনো শিক্ষার্থী কোন ভাষা শিখছেন। তবে এসব টুলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সংবেদনশীল ও অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য সামনে চলে আসে। তাই সাংবাদিক হিসেবে প্রতিবেদন তৈরির কাজে এসব তথ্য কখন এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক ও বিচক্ষণ হতে হবে।
অনুসন্ধান করাটাও এক ধরনের শিল্প
ডিজিটাল অনুসন্ধান যেমন বিজ্ঞান, তেমনি শিল্পও। এই নির্দেশিকায় প্রয়োজনীয় ডেটাবেস, ওয়েবসাইটে তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং নিরাপত্তা প্রোটোকল সম্পর্কে জানানো হয়েছে। তবে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে মূল্যবান হাতিয়ার হলো কৌতূহল ও সহজাত বোধ।
কোনো ধাঁধার অনুপস্থিত সূত্রটি খুঁজে বের করতে প্রায়ই সৃজনশীলভাবে চিন্তা করতে হয়। কখন কোনো নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার থেকে আর এগোনো সম্ভব নয় বুঝে অনুসন্ধানের পথ বদলাতে হবে, কিংবা ফাঁস হওয়া যোগাযোগের তালিকার আড়ালে থাকা তথ্য কীভাবে পড়তে হবে, তা জানতে হয়। কোনো সূত্রকে সম্ভাবনাময় মনে হলে নিজের সহজাত বোধকে গুরুত্ব দিন, তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখুন এবং ডিজিটাল সূত্রগুলো যেদিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই অনুসন্ধান চালিয়ে যান। শুভ অনুসন্ধান!
সম্পাদকের নোট: এই লেখাটি মূলত ওসিসিআরপি প্রকাশ করেছিল। তাদের অনুমতি নিয়ে এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে।
শায়া লাফলিন ওসিসিআরপির গবেষণা বিষয়ক পরিচালক এবং গবেষণা ও ডেটা দলেল অন্যতম প্রধান। ২০২৩ সালে তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের গবেষক হিসেবে সংস্থাটিতে যোগ দেন। এর আগে তিনি সংঘাতপূর্ণ ও যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তাসংক্রান্ত গবেষণা প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০১৩ সালে নিউজ কর্প অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেদক হিসেবে শায়া সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন। তিনি ইংরেজি, ফরাসি ও আরবি ভাষায় পারদর্শী।