ছবি: স্ক্রিনশট, রয়টার্স
এআই খাতে ট্রিলিয়ন ডলার: রয়টার্স যেভাবে ভিজ্যুয়াল গল্পে এতো বড় ডেটা তুলে ধরেছে
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
সাংবাদিকরা যখন এআই ঘিরে বিনিয়োগ, অবকাঠামো খাতে ব্যয় কিংবা বাজারের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মতো অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন লেখেন, তখন কিন্তু তারা ডেটার ঘাটতি নয় বরং বর্ণনার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। প্রতিবারই তাদের একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। আর তা হচ্ছে, যে মানুষটি কখনও এক ট্রিলিয়ন ডলার চোখে দেখেননি, তাকে কীভাবে বিপুল এই অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যায়? রয়টার্সের প্রতিবেদক ভিনীত খারে এবং গ্রাফিকস সাংবাদিক ময়াঙ্ক ভাট এআই বিনিয়োগ নিয়ে তাদের ডেটাভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির সময় ঠিক এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
এই সাক্ষাৎকারটি শুধু এই একটি প্রতিবেদনের বিষয়ে নয়; বরং এমন যেকোনো গল্পের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যেখানে সংখ্যাগুলো এত বড় যে সেগুলো অনুধাবন করা কঠিন হয়ে যায় এবং পরিসরটি মানুষের নাগালের বাইরে মনে হয়। তারা যে শিক্ষা ভাগ করেছেন, তা এমন সব সাংবাদিকের জন্যই প্রযোজ্য, যারা পাঠকদের এমন সংখ্যা বোঝাতে চান যেগুলো তারা কল্পনা করতে পারেন না।
সাক্ষাৎকারটি সংক্ষিপ্ত এবং বোঝার উপযোগী করতে সম্পাদনা করা হয়েছে।
স্টোরিবেঞ্চ: আপনি যখন এমন সব অর্থনৈতিক ডেটা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন, বেশিরভাগ পাঠকের কাছে যা স্বাভাবিকভাবে বোধগম্য নয়, তখন শুরুটা কোথা থেকে করেন—ডেটা দিয়ে, নাকি আপনি যে গল্প বলতে চান সেখান থেকে?
বিনীত খারে: গল্পটি কীভাবে বলতে চাই তা নিয়ে আমরা প্রথমে বেশ কিছু আইডিয়া বা ধারণা তৈরি করি। এরপর গল্পটিকে আরও ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলার মতো কোনো ডেটা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখি। পাঠকেরা খুব দ্রুত বুঝতে পারেন—এমন ডেটা পয়েন্ট খুঁজে পাওয়াও বেশ সাহায্য করে। যেমন, এআই নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে আমরা উল্লেখ করেছিলাম, বিনিয়োগের একটি বড় অংশ যাচ্ছে অবকাঠামো খাতে। পাঠকেরা সহজেই মনে মনে এই বিষয়টি ধরতে পেরেছিলেন, কারণ এই কোম্পানিগুলো প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হয়।
মায়াঙ্ক ভাট: প্রথম পদক্ষেপটি হলো বাস্তব দুনিয়ায় এই সংখ্যাগুলোর প্রকৃত অর্থ কী, তা বোঝার চেষ্টা করা। এআই বিনিয়োগের মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে মূল সংখ্যাগুলো (যেমন—ট্রিলিয়ন ডলার) সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা বা সংখ্যা পরিমাপ করা কঠিন। তাই আমরা এটিকে ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পথ খুঁজছিলাম। যেমন—এটিকে ম্যানহাটন প্রজেক্ট বা অ্যাপোলো প্রোগ্রামের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা। একবার আপনি যখন সেই কাঠামোটি খুঁজে পান, গল্পটি তখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। এরপর ভিজ্যুয়ালগুলো পাঠকদের এই বিশাল পরিসর, বিনিয়োগের বণ্টন এবং কোম্পানিগুলোর সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে। এভাবে গল্প বলা এবং ডেটা অনুসন্ধান—উভয়ই একে অপরকে সমৃদ্ধ করতে শুরু করে।
এসবি: চার্ট, ম্যাপ নাকি ইন্টারেক্টিভ উপাদান—কোনটি সঠিক মাধ্যম হবে তা আপনারা কীভাবে নির্ধারণ করেন? গল্পের ক্ষেত্রে ভিজুয়্যাল কমপ্লেক্সিটি কি কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়?
এমবি: গল্পের প্রতিটি ধাপে পাঠক কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, আমরা সেটি বোঝার চেষ্টা করি। প্রশ্নটি যদি সময়ের সঙ্গে কোনো কিছুর পরিবর্তনের পরিমাপ নিয়ে হয়, তবে সাধারণত একটি চার্ট সবচেয়ে ভালো কাজ করে। যদি এটি বিভিন্ন সম্পর্ক বা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে ডায়াগ্রাম বেশি কাজে লাগে। যেমন—কোম্পানিগুলোর মধ্যকার চক্রাকার অর্থায়নের বিষয়টি লেখার মাধ্যমে বোঝানো কঠিন ছিল। কিন্তু যখনই আপনি ওপেনএআই, এনভিডিয়া এবং ওরাকলের মধ্যকার এই অর্থের প্রবাহটি দৃশ্যমান করবেন, তখন পুরো কাঠামোটি মুহূর্তেই পরিষ্কার হয়ে যায়। পাশাপাশি, কোনো কিছুকে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত দৃষ্টিনন্দন বা জটিল করার একটি প্রলোভন সবসময়ই থাকে। একটি গ্রাফিক বোঝার জন্য যদি দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়, তবে সাধারণত ধরে নিতে হবে যে সেটি অতিরিক্ত জটিল হয়ে গেছে। আমাদের লক্ষ্য সবসময়ই পাঠকের চাপ কমানো, বাড়ানো নয়।

ছবি: স্ক্রিনশট, রয়টার্স
এসবি: ডিজিটাল স্টোরিটেলিংয়ে আপনি কীভাবে ইন্টারঅ্যাকটিভিটি এবং গল্পের স্পষ্টতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন?
এমবি: ইন্টারঅ্যাকটিভিটি তখনই সবচেয়ে ভালো কাজ করে, যখন তা এমন কিছু উন্মোচন করে যা পাঠক নিজে থেকে অনুসন্ধান করতে চায়। তবে বিষয়টি এমন না যে, মূল বার্তা বোঝার জন্য সেটি বাধ্যতামূলক। চার্টগুলো মূল প্রবণতা তাৎক্ষণিকভাবে তুলে ধরে। আর ইন্টারঅ্যাকশন পাঠকদের ডেটার সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানোর সুযোগ দেয়। যেমন স্ক্রল করে এআই বিনিয়োগের বিশাল পরিসরকে অনুভব করা। আমি ইন্টারঅ্যাকটিভিটিকে মূল গল্পের ভিত্তি নয়, বরং একটি পরিপূরক উপাদান হিসেবে দেখি।
এসবি: এআই এবং অর্থনীতির সংযোগস্থলে একটি গল্প বলা- অন্য বিষয়গুলোর তুলনায় আপনার পদ্ধতিকে কীভাবে পরিবর্তন করে?
ভিকে: এআই বিষয়ক এই গল্পে একটি নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কারণে অর্থনীতিতে কী ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়ছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। রেলপথ, ইন্টারনেট বুম বা অটোমোবাইলের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করলে জটিল বিষয়গুলো পাঠকের কাছে আরও সহজে বোধগম্য হয়ে ওঠে, যেগুলোর সঙ্গে তারা সাধারণত সরাসরি নিজেদের সংযোগ অনুভব করেন না।
এমবি: এআই সংক্রান্ত গল্পে সাধারণত একই সঙ্গে দুটি স্তরের বিমূর্ততা কাজ করে—একদিকে প্রযুক্তিটি নিজে, আর অন্যদিকে তার চারপাশের আর্থিক ব্যবস্থা। বেশিরভাগ পাঠকেরই এআইয়ের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বা খাতটির বিপুল পরিমাণ পুঁজির নিয়ে তেমন ধারণা থাকে না। তাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হলো পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি—এ কারণেই ঐতিহাসিক তুলনাগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ছবি: স্ক্রিনশট, রয়টার্স
এসবি: এই ধরনের একটি প্রকল্পে প্রতিবেদক এবং ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকের মধ্যকার সহযোগিতা কেমন হওয়া উচিত?
ভিকে: শুরুতেই ধারণা তৈরির ও ব্রেইনস্টর্মিং পর্যায়ে প্রতিবেদক এবং ভিজ্যুয়াল সাংবাদিক—দুজনকেই যুক্ত করা হলে গল্পের কাঠামো ঠিকভাবে দাঁড় করানো যায়, আর ভিজ্যুয়ালগুলো শুরু থেকেই সেই গল্পের দিকনির্দেশনার সঙ্গে মানানসই হয়। ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকরা জটিল ধারণাগুলোকে ভেঙে এমন ছোট ছোট অংশে উপস্থাপন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা পাঠকেরা সহজে বুঝতে পারেন।
এমবি: অনেক সময় গ্রাফিকস নিজেই রিপোর্টিংকে প্রভাবিত করে। যখন আপনি ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজ করতে শুরু করেন, তখন এমন কিছু প্যাটার্ন বা প্রশ্ন সামনে আসে, যা কেবল লেখার ভিত্তিতে স্পষ্ট হতো না। এখানে মূল টানাপোড়েনটা থাকে গল্পকে সহজভাবে উপস্থাপন করা এবং যথার্থতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। অর্থনৈতিক গল্প দ্রুতই জটিল হয়ে যেতে পারে, তাই সবসময়ই আলোচনা থাকে—কী রাখা হবে, কী সহজ করা হবে, আর পাঠকের বোঝার জন্য কোন বিষয়গুলো সত্যিই জরুরি।
এসবি: ডেটা-ভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরির কাজ শেষ হয়েছে— কীভাবে বুঝবেন?
ভিকে: একটি গল্প তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন সেখানে উল্লেখ করা বা ভিজ্যুয়ালি দেখানো ডেটাগুলো প্রতিবেদনের মূল প্রশ্নের উত্তর দিতে সাহায্য করে।
এমবি: আমার কাছে গল্পটি তখনই সম্পূর্ণ মনে হয়—যখন প্রতিটি ভিজ্যুয়ালই পাঠকের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। যদি প্রতিটি গ্রাফিকের সঙ্গে পাঠকের সব প্রশ্নের সরাসরি সম্পর্ক টানা যায়, তাহলে বোঝা যাবে গল্পটি প্রস্তুত।এসবি: ডেটার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে?
ভিকে: ২০১৩ সাল থেকে এই খাতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে—মোট ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার—তা সত্যিই ছিল চোখ ধাঁধানো। আমার মনে হয় না যে আমরা যারা এই খাতটিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি, তাদের মধ্যেও কেউ এই পুঞ্জীভূত অংকের বিশালত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।
এমবি: আমার কাছে অবাক করার মতো বিষয় ছিল ইকোসিস্টেমের বৃহত্তম কোম্পানিগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক আর্থিক নির্ভরশীলতার মাত্রা। চিপ নির্মাতা, ক্লাউড সেবা প্রদানকারী এবং এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে টাকার লেনদেন এমনভাবে ঘুরে ফিরে চলছে, যা অনেক বেশি পরস্পরনির্ভরশীল। সাধারণভাবে আমরা যেভাবে ভাবি—আলাদা আলাদা শিল্পখাত শুধু নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে—বাস্তবে বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও আন্তঃসংযুক্ত।
সম্পাদকের নোট: এই প্রতিবেদনটি প্রথমে স্টোরিবেঞ্চে প্রকাশিত হয়েছিল। অনুমতি নিয়ে এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হলো।
সাংবাদিকরা যখন অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন লেখেন, তখন কিন্তু তারা ডেটার ঘাটতি নয় বরং বর্ণনার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। আর তা হচ্ছে, যে মানুষটি কখনও এক ট্রিলিয়ন ডলার চোখে দেখেননি, তাকে কীভাবে বিপুল এই অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যায়?
![]()
ইনাম ভানজি বর্তমানে নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিহেভিয়োরাল নিউরোসায়েন্স বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও অ্যানালিটিক্সে ডাবল মাইনর করছেন।