অলংকরণ: লুইজা
বাল্টিকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং সিরিয়ার অপহৃত শিশু: ২০২৬ সালের সিগমা পুরস্কার জিতেছে যে ১০ ডেটা সাংবাদিকতা প্রকল্প
আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:
সিগমা অ্যাওয়ার্ডের স্থায়ী আয়োজক হিসেবে গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক (জিআইজেএন) ২০২৬ সালের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে। এই পুরস্কারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সেরা ডেটা সাংবাদিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর আগে গত বছরও বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছিল জিআইজেএন।
১৭ সদস্যের বিচারক দল ৩১টি প্রকল্পের চূড়ান্ত তালিকা থেকে ১০টি অসাধারণ ডেটাভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রকল্পকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। চূড়ান্ত তালিকায় ছিল ২৬টি স্বতন্ত্র প্রকল্প এবং পাঁচটি পোর্টফোলিও। যেগুলো এসেছে ভিন্ন ভিন্ন সব দেশ থেকে। এবারের প্রতিযোগিতায় ৮৪টি দেশ থেকে মোট ৫৪৩টি প্রতিবেদন জমা পড়ে। প্রথম ধাপের বিচারকরা এটিকে বিভিন্ন মাধ্যমের দারুণ সব কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ছিল পডকাস্টভিত্তিক অনুসন্ধান, ধারাবাহিক দীর্ঘ প্রতিবেদন, ইন্টারঅ্যাকটিভ ডেটাবেস, ব্যাখ্যামূলক প্রকল্প এবং ভিজ্যুয়ালনির্ভর অনুসন্ধানী কাজ। এর অন্যতম কারণ প্রতিযোগিতাটিতে বিষয়ভিত্তিক কোনো বিভাগ রাখা হয়নি। ইচ্ছুক অংশগ্রহণকারীদের সীমাবদ্ধতা দূর এবং যেকোনো মাধ্যমে নতুন নতুন ডেটানির্ভর প্রকল্প জমা দিতে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের উৎসাহিত করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই বছরের বিজয়ী প্রকল্পগুলোতে উঠে এসেছে ইউরোপের পরিবেশগত অবক্ষয়, বাল্টিক সাগরে রাষ্ট্রীয় মদদে নাশকতামূলক কার্যক্রম, পেরুতে অ্যালগরিদমিক ব্যর্থতা, মেক্সিকোর শেল কোম্পানি এবং নাইজেরিয়ার সরবরাহ শৃঙ্খলজনিত ক্ষতির মতো নানা বিষয়।
“এ বছরের জমা পড়া কাজগুলোর মান আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। যা তুলে ধরে ডেটা সাংবাদিকতার চর্চা বিশ্বজুড়ে কতটা বিস্তৃত হয়েছে, এবং সেই চর্চা কত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী প্রতিবেদন তৈরিতে ভূমিকা রাখছে,” বলেন পুরস্কার কমিটির আহ্বায়ক জিনা চুয়া।
জমা পড়া প্রকল্পগুলোর তথ্য সিগমা অ্যাওয়ার্ডের গিটহাব রিপোজিটরিতে পাওয়া যাবে। সেখানে ২০২০ সাল থেকে জমা পড়া প্রকল্পগুলোর তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দেখে আসি ২০২৬ সালের সিগমা অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী কারা:
গ্রিন টু গ্রে: হাউ ইউরোপ ইজ স্কোয়ান্ডারিং দ্য লিটল নেচার ইট হ্যাজ লেফট— এরিনা ফর জার্নালিজম ইন ইউরোপ (নেদারল্যান্ডস) এবং এনআরকে (নরওয়ে), সহযোগিতায় ডি স্টান্ডার্ড (বেলজিয়াম), ল্য মঁন্দে (ফ্রান্স), লং প্লে (ফিনল্যান্ড), ডি সাইট (জার্মানি), রিপোর্টার্স ইউনাইটেড (গ্রিস), ফ্যাক্টা (ইতালি), গাজেতা উইবোর্চা (পোল্যান্ড), ডেটাডিস্তা (স্পেন), দ্য ব্ল্যাক সি (তুরস্ক) এবং দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)।

ছবি: স্ক্রিনশট, রিপোর্টার্স ইউনাইটেড
এই যৌথ ডেটা প্রকল্পে দেখা গেছে, নির্মাণ কাজের কারণে ইউরোপে প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি ফুটবল মাঠের সমান প্রাকৃতিক ও উর্বর জমি হারিয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষতির পরিমাণ আগের হিসাবের তুলনায় দেড় গুণ বেশি। ১১টি দেশের ৪১ জন সাংবাদিক ও বিজ্ঞানীর দলটি আরও দেখিয়েছে, প্রাকৃতিক জমির এই উদ্বেগজনক বিলুপ্তি খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলছে।
সিগমা বিচারকমন্ডলীর সদস্যরা তাদের মন্তব্যে লিখেছে: “এটি একটি উচ্চাভিলাষী ও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ অনুসন্ধানী প্রকল্প, যেখানে স্যাটেলাইট ছবি, বৃহৎ পরিসরের ভূ-তাত্ত্বিক ডেটাসেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বিশ্লেষণ একত্র করে ইউরোপজুড়ে পরিবেশগত অবক্ষয়ের ধরন উন্মোচন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, উপস্থাপনাটি সহজবোধ্য এবং শক্তিশালী গল্প বলার কৌশল ও মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের সঙ্গে চমৎকারভাবে সমন্বিত। সময়ের সঙ্গে পরিবেশগত প্রভাব বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এই প্রকল্প সেটিকে সহজ করে তুলেছে।”
ইনসাইড রাশিয়ার শ্যাডো ওয়ার ইন দ্য বাল্টিকস — দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস (যুক্তরাজ্য)

ইমেজ: স্ক্রিনশট, ফিনান্সিয়াল টাইমস
এই ডেটা প্রকল্পটি বেশ চমৎকারভাবে বাল্টিক সাগরে ইউরোপের সামুদ্রিক অবকাঠামোর বড় ধরনের দুর্বলতাগুলো সামনে এনেছে। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর কার্যক্রমের কারণে গ্যাস পাইপলাইন, বিদ্যুৎ লাইন এবং ডেটা ক্যাবল ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রতিবেদনকারী দলটি জাহাজের ট্রান্সপন্ডার এবং অবকাঠামো–সংক্রান্ত ডেটার বিশ্লেষণ ব্যবহার করে ১১টি ঘটনা এবং তিনটি জাহাজকে চিহ্নিত করে। এই জাহাজ থেকে নোঙর টেনে নিয়ে যাওয়ার কারণে অবকাঠামোগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়। তারা আরও দেখিয়েছে বাল্টিক সাগরের অগভীর ও ব্যস্ত সামুদ্রিক করিডরে রাশিয়ার “শ্যাডো ফ্লিট” বা পুরনো ট্যাঙ্কার বহরের সন্দেহজনক আচরণের ধরন। একই সঙ্গে প্রতিবেদনটি আশপাশের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর জন্য তৈরি হওয়া চরম নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তুলে ধরেছে।
বিচারকরা লিখেছেন: “বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলটি অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক ট্রাফিক ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে দারুণ কাজ করেছে। বর্ণনা ও ভিজ্যুয়ালাইজেশনগুলো স্পষ্টভাবে দেখায়, বাল্টিক সাগরে ইউরোপীয় অবকাঠামোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার গোপন নাশকতা কীভাবে কাজ করছে।”
ইনভিজিবলস: হাউ সিস্টেম ফেইলিয়ার্স অ্যান্ড অ্যান অ্যালগরিদম লেফট থাউজ্যান্ডস অব ওল্ডার অ্যাডাল্টস উইদাউট আ পেনশন— সালুদ কন লুপা (পেরু)

ইমেজ: স্ক্রিনশট, সালুদ কন লুপা
একাধিক মাধ্যমে প্রকাশিত এই অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে, পেরুতে দারিদ্র্য পরিস্থিতি নির্ধারণের জন্য তৈরি একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি কীভাবে ত্রুটিপূর্ণ অ্যালগরিদমিক মডেলের কারণে ভুলভাবে হাজার হাজার প্রবীণ মানুষকে দেশের প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থেকে বাদ দিচ্ছিল।
এই সিরিজে আরও ছিল ভিডিও সাক্ষ্য, ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন, ইনফোগ্রাফিক এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহায়ক নির্দেশিকা।
বিচারকরা লিখেছেন: “‘ইনভিজিবলস’ প্রকল্পটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি একটি জটিল ব্যবস্থাকে বাস্তব প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছে। সতর্ক ডেটা বিশ্লেষণ, তথ্য অধিকার (ফ্রিডম অব ইনফরমেশন) অনুরোধ এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের মাধ্যমে দলটি প্রমাণ করেছে যে এগুলো বিচ্ছিন্ন ভুল নয়, বরং গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতা।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিবেদনটি কখনোই সংখ্যার আড়ালে থাকা মানুষের কথা ভুলে যায়নি। এই কাজটি সরকারকে এমন একটি সংস্কারের দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে, যেখানে পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। যা দেখিয়ে দেয়, শক্তিশালী ও ধারাবাহিক ডেটা সাংবাদিকতা যখন জবাবদিহি নিশ্চিত করে, তখন তা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।”
দ্য হিউম্যান ট্র্যাপ: সুদানি রিফিউজিস ফলিং প্রে টু অর্গানাইজড ক্রিমিনাল গ্যাংস অন দ্য বর্ডার উইথ ইজিপ্ট—অ্যারাব রিপোর্টার্স ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (এআরআইজে) অ্যান্ড আল–মুহাজির (সুদান)

ছবি: স্ক্রিনশট, এআরআইজে
ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে তৈরি সাহসী প্রতিবেদনের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ এটি। যা সুদান-মিসর সীমান্তে সুদানি শরণার্থীদের লক্ষ্য করে সংঘটিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে উন্মোচিত করে। প্রতিবেদনটিতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে অপরাধী চক্রগুলো অভিবাসীদের অসহায় অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে আসওয়ান শহরে যাওয়ার পথে তাদের শিকারে পরিণত করে। যেখানে চুরি, অপহরণ থেকে শুরু করে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়। এছাড়া, এই কাজটি জরিপভিত্তিক ডেটা এবং অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে নেওয়া যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া সাতজন ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
বিচারকরা উল্লেখ করেছেন: “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ‘ডেটা ভয়েড’ বা তথ্য-শূন্যতা এড়িয়ে সাংবাদিকরা গোপন সাক্ষাৎকার এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের মাধ্যমে একটি প্রাথমিক ডেটাসেট তৈরি করেছেন। এই পদ্ধতি ব্যক্তিগত সাক্ষ্য এবং কাঠামোগত ধরনগুলোর মধ্যকার ব্যবধান কমিয়েছে, এবং বিমূর্ত সীমান্তকে বাস্তব, বিপজ্জনক সংকীর্ণ পথ হিসেবে তুলে ধরেছে—যা মানবপাচারের প্রকৃত মাত্রা প্রকাশ করে।”
“এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের শক্তি মূলত “অর্থনৈতিক দুর্দশা“কে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করার মধ্যে নিহিত। এতে যাতায়াতের পথ থেকে শুরু করে অর্থ লেনদেনের তথ্য পর্যন্ত নানা ধরনের বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু ঝুঁকিতে থাকা সূত্রগুলোর নিরাপত্তা কখনোই বিঘ্নিত হয়নি। সাহসী ও নৈতিক ডেটা সাংবাদিকতার দারুণ উদাহরণ হিসেবে অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি দেখিয়েছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করার সময় কীভাবে তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা বজায় রেখেও সূত্রের পরিচয় গোপন রাখা যায়।”
ফ্যান্টাসমাস দেল এরারিও: কুয়াত্রো সেক্সেনিওস দে দেস্তিনার রেকুরসোস পাবলিকোস আ এমপ্রেসাস ইনএক্সিস্তেন্তেস (ঘোস্টস অব দ্য ট্রেজারি: ফোর সিক্স–ইয়ার টার্মস অব অ্যালোকেটিং পাবলিক রিসোর্সেস টু ননএক্সিস্টেন্ট কোম্পানিজ) — কুইন্তো এলেমেন্তো ল্যাব (মেক্সিকো)

ছবি: স্ক্রিনশট, কুইন্তো এলেমেন্তো ল্যাব
১২ পর্বের এই সিরিজে দেখানো হয়েছে, মেক্সিকোর ৪৮৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠান—যা প্রায় পুরো সরকারি নেটওয়ার্কজুড়ে বিস্তৃত—মোট ৮৩৪টি শেল কোম্পানির কাছে সরকারি অর্থ সরিয়েছে।
ডেটা বিশ্লেষণ, সরকারি চুক্তি, অডিট, আর্থিক নথি এবং মাঠপর্যায়ের কাজের মাধ্যমে প্রতিবেদক দলটি দুই দশক ধরে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৫৭ কোটি ডলার) অনিয়মিতভাবে সরিয়ে নেওয়ার তথ্য অনুসন্ধান করে, যা সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে।
পুরস্কার কমিটি উল্লেখ করেছে: “এই সিরিজের ডেটার কাজগুলো অত্যন্ত নিখুঁত। এতে হাজার হাজার ফোয়া অনুরোধ, ফেডারেল চুক্তির নিবন্ধন এবং শেল কোম্পানির সরকারি তালিকা একত্রিত করে একটি মৌলিক ডেটাবেস তৈরি করা হয়। যা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ও হাতে-কলমে উভয়ভাবে যাচাই করা হয়েছে। এর ফলাফল হিসেবে উঠে এসেছে একটি গভীর, বহু-প্রজন্মজুড়ে বিস্তৃত দুর্নীতির ব্যবস্থা নিয়ে কঠোর অনুসন্ধান—যা শুধু এই চক্রকে উন্মোচনই করে না, বরং অন্য সাংবাদিকদেরও বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করে।”
সিরিয়া’স স্টোলেন চিলড্রেন — লাইটহাউস রিপোর্টস (গ্রিস), উইমেন হু ওন দ্য ওয়ার, আল–জুমহুরিয়া (সিরিয়া), বিবিসি আই (যুক্তরাজ্য), দ্য অবজারভার (যুক্তরাজ্য), ট্রাউ (নেদারল্যান্ডস), ডের শ্পিগেল (জার্মানি), সাউত এবং সিরাজ (সিরিয়া)

ছবি: স্ক্রিনশট, লাইটহাউজ রিপোর্টস
এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সিরিয়ার সাবেক শাসক বাশার আল-আসাদের শাসনামলে হওয়া একটি ভয়াবহ নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার কথা। দেখানো হয়েছে, কীভাবে সিরীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গোপনে শত শত আটক ব্যক্তির সন্তানদের অনাথ আশ্রমে লুকিয়ে রাখত, যাতে তাদের পরিবারের ওপর চাপ প্রয়োগ ও ভয় দেখানো যায়। নয় মাসব্যাপী এই প্রকল্পে সিরীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা একটি ডেটাবেস তৈরি করেন, যেখানে ৩০০টিরও বেশি নাম নিশ্চিত করা হয়েছে—যা সম্ভবত আরও বড় একটি তালিকার অংশ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এখনো পরিবারগুলো অন্তত ৩ হাজার ৭০০ নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে ফিরছে। সিরিজটিতে বহু ভাষায় শক্তিশালী মানবিক গল্পও অন্তর্ভুক্ত ছিল—যেমন আরবি পডকাস্ট, ডকুমেন্টারি ফিল্ম এবং ইংরেজি, ডাচ ও জার্মান ভাষার দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। দলটি ডিজিটাল ডেটাসেটের পাশাপাশি “অরক্ষিত কাগজপত্র আর্কাইভ” বিশ্লেষণ করেছে অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (ওসিআর) প্রযুক্তির সাহায্যে, যা দেখিয়েছে শিশু কল্যাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা এবং দমননীতির হাতিয়ার হিসেবে শিশুদের আলাদা করে রাখা হয়েছিল।
বিচারকরা লিখেছেন: “যেটি সবচেয়ে দুর্দান্ত তা হচ্ছে, প্রতিবেদনটি বিচ্ছিন্ন নথি ও ব্যক্তিগত গল্পগুলোকে একত্রিত করে পরিস্কারভাবে তুলে ধরেছে। বিচ্ছিন্ন প্রমাণগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যা জোরালো ও সুসংগঠিত। ফলে গোপন কর্মকাণ্ডগুলো সামনে এসেছে। পরিবারগুলো যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, তা বাস্তব ও গভীরভাবে উপলব্ধি করাটা সম্ভব হয়েছে।”
সেরাদো — ও এলু সাগ্রাদো দাস আগুয়াস দো ব্রাজিল (সেরাদো — ব্রাজিল’স স্যাক্রেড ওয়াটার লিংক) — আম্বিয়েন্তাল মিডিয়া (ব্রাজিল)

ছবি: স্ক্রিনশট, আম্বিয়েন্তাল মিডিয়া
শক্তিশালী ডেটা সাংবাদিকতা এই প্রকল্পটি সহজবোধ্য বিজ্ঞান ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে দেখিয়েছে কীভাবে সম্প্রসারিত কৃষি ব্যবসা এবং মনোকালচার ব্রাজিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চলের পানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। দীর্ঘ সময় ধরে জলবৈজ্ঞানিক, জলবায়ু এবং ভূমি ব্যবহার সংক্রান্ত ডেটার পদ্ধতিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অনুসন্ধানটি দেখায়, প্রাকৃতিক পরিবেশ হারানোর সঙ্গে নদীর প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে প্রতি মিনিটে ৩১টি অলিম্পিক আকারের সমান সুইমিং পুলের সমপরিমাণ পানির অপচয় হচ্ছে। এই অনুসন্ধানের ফলাফল ৭০টি জাতীয় এবং বহু আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রকল্পটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিবেদন, মানচিত্র এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ ড্যাশবোর্ড একত্র করে প্রায় ২০ লাখ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই অঞ্চলের সংকটকে বিভিন্ন স্তরে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
বিচারকরা লিখেছেন: “এই অনুসন্ধানটি নদীর প্রবাহ ও ভূমি ব্যবহার সম্পর্কিত জটিল ডেটাকে প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপনের অনন্য উদাহরণ। এটি এমন একটি অঞ্চলের ওপর প্রয়োজনীয় আলো ফেলেছে, যা বৈশ্বিক পানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর শক্তি হলো বৈজ্ঞানিক তথ্যের অসাধারণ উপস্থাপন, যেখানে উচ্চমানের ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহের মতো বিমূর্ত বিষয়কে সাধারণ পাঠকের জন্য স্পষ্ট ও আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে।
শুধু শিক্ষামূলক মূল্যই নয়, প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন পাঠকদের ইন্টারঅ্যাকটিভ ড্যাশবোর্ড ও কঠোর সহসম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সক্রিয় অনুসন্ধানকারী হিসেবে অংশ নিতে সক্ষম করেছে। শেষ পর্যন্ত, এই কাজটি নান্দনিক উৎকর্ষতা ও গভীর অনুসন্ধানের মধ্যে একটি বিরল ভারসাম্য তৈরি করেছে, যা প্রমাণ করে দক্ষ ডেটা প্রয়োগ উপেক্ষিত ঘটনাকে আবেগপ্রবণ ও উপেক্ষার অযোগ্য করে তুলতে পারে।”
দ্য সাইলেন্ট ভিকটিমস অব ওয়ার: হাউ রাশিয়া ইজ রবারিং ইউক্রেনিয়ান চিলড্রেন অব দেয়ার আইডেন্টিটি — নয়ে জ্যুর্খার জাইটুং (সুইজারল্যান্ড) এবং টেক্সটি ডট অর্গ ডট ইউএ (ইউক্রেন)।

ইমেজ: স্ক্রিনশট, নয়ে জ্যুর্খার জাইটুং
উন্নত প্রযুক্তি ও নৈতিক মানদণ্ড একত্র করে করা এই সাহসী অনুসন্ধানটি দেখিয়েছে কীভাবে ইউক্রেনীয় শিশুরা রাশিয়ার তথাকথিত “স্বেচ্ছা পুনর্বাসন” কর্মসূচির মধ্যে পড়ে জোরপূর্বক দত্তক গ্রহণের ব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে যায়। যৌথ এই প্রকল্পটি একটি শিশুর যাত্রাপথকে কেন্দ্র করে অনুসন্ধান চালায়। যা শুরু হয় একটি মাত্র ছবি দিয়ে—ইউক্রেনীয় পতাকার রঙের সূচিকর্মযুক্ত শার্ট পরা এক ইউক্রেনীয় বালক, যার নাম নিখোঁজ শিশুদের একটি ডেটাবেসে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। নয়ে জ্যুর্খার জাইটুং এবং টেক্সটিডটঅর্গডটইউএ কয়েক মাস পর তাকে রাশিয়ার একটি দত্তক নেওয়ার প্ল্যাটফর্মে খুঁজে পায়।
রাশিয়ায় সরাসরি মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং সম্ভব না হওয়ায়, দলটি রিমোট অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করে—ফেসিয়াল রিকগনিশন, নথিপত্র, স্যাটেলাইট ইমেজারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায়।
এখানে বিশেষভাবে নৈতিক দিকগুলোও গুরুত্ব পেয়েছে—শিশুটির পরিচয় শনাক্ত করতে পারে এমন তথ্য সীমিত রাখা, মূল ছবির চিত্রায়ণে সংযত পরিবর্তন আনা এবং পুরো অনুসন্ধান পদ্ধতি পাঠকদের জন্য স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা।
বিচারকরা লিখেছেন: “এটি ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স (ওএসআইএনটি) সঠিকভাবে ব্যবহারের একটি চমৎকার উদাহরণ। সীমান্ত পেরিয়ে শিশুদের অনুসরণ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ফেসিয়াল রিকগনিশন পদ্ধতি ব্যবহারের জটিল নৈতিক প্রশ্নগুলো সাংবাদিকদের ওপর অত্যন্ত উচ্চমানের দায়িত্ব আরোপ করেছিল, এবং তারা সফলভাবে তা সম্পন্ন করতে পেরেছে। নয়ে জ্যুর্খার জাইটুং (সুইজারল্যান্ড) এবং টেক্সটিডটঅর্গডটইউএ (ইউক্রেন)-এর দলটি যে পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহার করেছে, তা পুনরায় প্রয়োগযোগ্য এবং এটি তাদের অনুসন্ধানকে একটি অসাধারণ ডেটা সাংবাদিকতার কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।”
দ্য পয়জনাস লিড ট্রেড — দ্য এক্সামিনেশন অ্যান্ড দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (ইউনাইটেড স্টেটস)

ছবি: স্ক্রিনশট, দ্য এক্সামিনেশন
দারুণ প্রভাবশালী এই ডেটা প্রকল্পটি অন্য দেশেও পুনরায় প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রকল্পটি দেখিয়েছে পশ্চিমা অটোমোবাইল সরবরাহ শৃঙ্খলের চাহিদা কীভাবে নাইজেরিয়ার ওগিজোতে প্রাণঘাতী সিসা বিষক্রিয়ার মাত্রা বাড়িয়েছে। আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিসা পুনর্ব্যবহার কারখানার কেন্দ্রস্থল হিসেবে ওগিজো পরিচিত। প্রতিবেদন তৈরিতে শক্তিশালী বর্ণনামূলক গল্প বলার কৌশল, গ্রাফিক্স এবং আলোকচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা অনুসন্ধানটিকে আরও প্রভাববিস্তার করতে সক্ষম করেছে।
অনুসন্ধানী দলটি আর্থিক লেনদেনের নথি ব্যবহার করে নাইজেরিয়ার অনিরাপদ ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কারখানা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহৎ ব্যাটারি প্রস্তুতকারকের কাছে সিসা সরবরাহের গতিবিধি অনুসরণ করে। যেটি আবার গাড়ি নির্মাতাদের জন্য পণ্য সরবরাহ করে। এছাড়া তারা নাইজেরিয়ায় একটি অলাভজনক গবেষণা সংস্থাকে দিয়ে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ সিসা বিষক্রিয়া ও দূষণবিষয়ক গবেষণা পরিচালনা করিয়েছে। এতে ৭০ জন মানুষ এবং প্রায় ৫০টি মাটির নমুনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলাফলে দেখা যায়, কিছু এলাকায় সিসা দূষণের মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে ১৮৬ গুণ বেশি, পাশাপাশি কারখানা শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিষক্রিয়ার উদ্বেগজনক প্রমাণ পাওয়া যায়। এই অনুসন্ধানটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। সাতটি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, স্থানীয় পর্যায়ে একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা উদ্যোগ চালু করা হয় এবং পাশের একটি শহরে বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
বিচারকরা লিখেছেন: “গভীরভাবে অনুসন্ধান করা এই প্রতিবেদনটি লাগোসের কাছে একটি সম্প্রদায়ের ওপর অনিরাপদ সিসা পুনর্ব্যবহারের বিষাক্ত প্রভাব তুলে ধরেছে। ডেটা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় তথ্যভিত্তিক সম্মতি নিশ্চিত করতে সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরামর্শ করার ক্ষেত্রে নেওয়া সর্তকতা বিচারকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। সিসার উৎস অনুসরণ করে দেখা গেছে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাটারি নির্মাতাদের সঙ্গে যুক্ত, যারা নাইজেরিয়া থেকে ক্রমবর্ধমান পরিমাণে পুনর্ব্যবহৃত সিসা আমদানি করছে।”
হাউ ইরান মুভস স্যাংশনড অয়েল অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড — রয়টার্স (সিঙ্গাপুর)

ছবি: স্ক্রিনশট, রয়টার্স (সিঙ্গাপুর)
এই অনুসন্ধানী প্রকল্পটি দৃশ্যগতভাবে ভীষণ শক্তিশালী। যা দেখিয়েছে, কীভাবে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর কিছু নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আগ্রহী ক্রেতাদের সঙ্গে বড় পরিসরে তেল বাণিজ্য চালিয়ে গেছে। ফাঁস হওয়া ইমেইল, স্যাটেলাইট চিত্র, লেনদেনের তথ্য এবং ওপেন-সোর্স টুল ব্যবহার করে দলটি উন্মোচন করেছে ইরানের কর্তৃপক্ষ কীভাবে একটি “শ্যাডো ফ্লিট” বা গোপন ট্যাঙ্কার বহর ব্যবহার করে, শিপিং রেকর্ড জাল করে এবং নানা ধরনের জটিল কৌশলের মাধ্যমে অবৈধ তেল বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে, যার ভূরাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।
সিগমা বিচারকরা প্রতিবেদনের গভীরতা, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সূত্রের ব্যবহার এবং এর উচ্চমানের ইন্টারঅ্যাকটিভ গ্রাফিক্সের প্রশংসা করেছেন।
বিচারকরা লিখেছেন: “সময়োপযোগী এই প্রকল্পটি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে ফাঁস হওয়া শিপিং নথি থেকে, এরপর স্যাটেলাইট চিত্র, কর্পোরেট রেকর্ড এবং শিপিং ডেটা ব্যবহার করে দেখানো হয়েছে কীভাবে ইরান তেল নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যায়। বিচারকরা বিশেষভাবে ইন্টারঅ্যাকটিভ ভিজ্যুয়ালাইজেশনগুলোর দেখে মুগ্ধ হয়েছেন।”

রোয়ান ফিলিপ জিআইজেএনের গ্লোবাল রিপোর্টার এবং ইমপ্যাক্ট এডিটর। তিনি আগে দক্ষিণ আফ্রিকার সানডে টাইমসের প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন। বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে তিনি বিশ্বের দুই ডজনেরও বেশি দেশ থেকে সংবাদ, রাজনীতি, দুর্নীতি এবং সংঘাত নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন।