ইন্দোনেশিয়ার প্রকাশনা জারিংডটআইডি–এর সাংবাদিক আবদুস সোমাদ সমুদ্র পথে মানব পাচার অনুসন্ধান বিষয়ক সেশনে কথা বলছেন। জিআইজেএনের জন্য ছবিটি তুলেছেন লিসা মেরি ডেভিড
সমুদ্র পথে জোরপূর্বক শ্রম এবং মানবপাচারের ঘটনা অনুসন্ধান করবেন যেভাবে
সমুদ্র পথে বিশ্ব বাণিজ্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি পণ্য পরিবহন করা হয়। এই শিল্পটির পরিসর যেমন বিশাল, তেমন কার দায়িত্ব কোথায়—সে বিষয়গুলো খুব একটা পরিষ্কার নয়। কারণ, অনেক জাহাজই ‘ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স’ (সুবিধা অনুযায়ী অন্য রাষ্ট্রের পতাকা বহন) পদ্ধতির অধীনে নিবন্ধিত থাকে। (এই পদ্ধতিতে মালিকরা তাদের জাহাজ এমন একটি দেশে নিবন্ধন করে যেখানে নিয়মের শিথিলতা, কম কর, সস্তা শ্রম এবং অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যায়।) এতে জাহাজের প্রকৃত মালিকানা ও দায়বদ্ধতা আড়াল করা সম্ভব হয়। শ্রমিকরা এর মাধ্যমে নিপীড়ন, জোরপূর্বক শ্রম শোষণ ও মানব পাচারের শিকার হয়। তবে, এসব অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন। কারণ প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে সমুদ্রের বিভিন্ন অঞ্চলে, করপোরেট রেজিস্ট্রি আর স্যাটেলাইট ডেটার মধ্যে।
এই অদৃশ্যমানতার সুযোগ নিয়েই সমুদ্র পথে মানব পাচার বিস্তার লাভ করে। অনেক জাহাজ দূরবর্তী জলসীমায় ‘ডার্ক ফ্লিট’ (অবৈধ নৌ-চলাচল কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বা কালো তালিকাভুক্ত জাহাজ) হিসেবে চলাচল করে। এইসব জাহাজে শ্রমিকরা মাসের পর মাস আটকে থাকে। নথিপত্র অস্পষ্ট থাকে বা ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা হয়।
নভেম্বরে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্স (জিআইজেসি২৫)-এ “আনকভারিং হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যাট সি” শিরোনামের একটি প্যানেলে সাংবাদিকরা এই সুপরিকল্পিত অস্বচ্ছতার স্তর ভেদ করার বাস্তব ও কার্যকর পদ্ধতি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তারা ব্যাখ্যা করেন, সমুদ্র পথে মানব পাচার অনুসন্ধান করা কেন এত কঠিন এবং এক্ষেত্রে সাংবাদিকরা কী করতে পারেন।
সমুদ্র নিজেই আড়াল তৈরি করে
পুলিৎজার সেন্টারের সহায়তায় ইন্দোনেশিয়ার প্রকাশনা জারিংডটআইডি–এর সাংবাদিক আবদুস সোমাদ নিউজ আউটলেট টেম্পোর সঙ্গে মিলে যৌথ অনুসন্ধান চালান। তিনি দেশটির আরাফুরা ও নাতুনা সাগরে ব্যাপক অবৈধ মাছ ধরার কর্মকাণ্ড অনুসন্ধান করেন। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, বড় বড় কোম্পানি ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট জাহাজসহ বহু নৌযান কোনো ধরনের লাইসেন্স ছাড়াই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। অথবা মৎস্য আহরণের নির্ধারিত কোটার বাইরে সমুদ্র থেকে অনেক বেশি মাছ ধরছে।
এসব জাহাজে যেসব কর্মীরা কাজ করেন, তারা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মজুরি আটকে রাখার মতো শোষণমূলক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। কেউ কেউ এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন যে কুল-কিনারাহীন সমুদ্রে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন।
জাহাজের চলাচল অনুসরণ করতে সাংবাদিক সোমাদ বিভিন্ন ধরনের ডেটা ব্যবহার করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তুলনা ও যাচাইয়ের জন্য এসব প্ল্যাটফর্ম একসঙ্গে ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে—
- গ্লোবাল ফিশিং ওয়াচ—মাছ ধরার নৌযানের গতিবিধি অনুসরণ করার জন্য। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সাইটটি সব সময় মাছ খালাসের তথ্য বা রিয়েল-টাইমের গতিবিধি ধরতে পারে না।
- মেরিন ট্রাফিক—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি জাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘ সময় এক জায়গায় ঘোরাফেরা, নির্ধারিত পথ থেকে সরে যাওয়া, বা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বন্দরে যাত্রার মতো সন্দেহজনক গতিবিধি চিহ্নিত করতে ব্যবহার করা হয়।
- কোপার্নিকাস, প্ল্যানেট ল্যাবস এবং অন্যান্য স্যাটেলাইট চিত্রভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলো মূলত কোনো জাহাজ নির্দিষ্ট বন্দরে নোঙর করেছে কি না বা সেখানে অবস্থান করছে কি না নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হয়।
জাহাজগুলো যখন অদৃশ্য হয়ে যায়
মানব পাচার অনুসন্ধানের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি হলো জাহাজের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) ডেটার মাধ্যমে তাদের গতিবিধি অনুসরণ করা। ভিএইচএফ রেডিওর মাধ্যমে সম্প্রচারিত এই রিয়েল-টাইম তথ্যে জাহাজের অবস্থান, গন্তব্যের দিক ও গতি সংক্রান্ত তথ্য থাকে। সামুদ্রিক যান চলাচল ব্যবস্থাপনার জন্য ল্যান্ড এবং স্যাটেলাইট রিসিভারের মাধ্যমে জাহাজের অবস্থান, গতিপথ এবং গতির মতো তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়।
কিন্তু অবৈধ মাছ ধরা বা মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক কাজে জড়িত জাহাজগুলো শনাক্তকরণ এড়াতে প্রায়ই তাদের এআইএস ডেটা বন্ধ করে দেয়। পাচারের অনেক ঘটনার সঙ্গেই ‘ডার্ক ফ্লিট’ এর সম্পৃক্ততা থাকে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলের ট্যাঙ্কার কিংবা অস্ত্র বা বন্যপ্রাণী পাচারে ব্যবহৃত জাহাজগুলোর মধ্যেও সিগন্যাল বা সংকেত বন্ধ করে রাখার এই প্রবণতা দেখা যায়।
এআইএস সংকেত বন্ধ হয়ে গেলে কী করবেন? সাংবাদিক সোমাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক কেটি ম্যাককিউ পরামর্শ দিয়েছেন ওপেন সোর্স স্যাটেলাইট ও জাহাজ ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করতে, যাতে—
- অদৃশ্য হওয়ার ধারাবাহিক ধরনগুলো খুঁজে দেখা যায়। কেননা জাহাজগুলো প্রায়ই সীমান্ত বা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের কাছাকাছি এসে এআইএস বন্ধ করে দেয়।
- সর্বশেষ জানা সামুদ্রিক পথগুলো পরীক্ষা করে সম্ভাব্য গন্তব্য সম্পর্কে অনুমান করা। বন্দরের লগের তথ্য বারবার যাচাই করা: কিছু বন্দরে জাহাজ আসার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়, কিন্তু তারা তা প্রকাশ্যে তুলে ধরে না।
- শেষে, তারা বলেন সাংবাদিকদের জাহাজ স্পটার, বন্দরের আলোকচিত্রী এবং শৌখিন যানবাহন পর্যবেক্ষকদের উপেক্ষা করা উচিত নয়। কেননা তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারিখ ও সময়সহ ছবি আপলোড করেন। যখন এআইএস ডেটা অসম্পূর্ণ থাকে, তখন নির্দিষ্ট বন্দরে নির্দিষ্ট দিনে জাহাজের উপস্থিতি যাচাই করতে এই ছবিগুলো সাহায্য করে।
আরেকটি অপ্রচলিত কিন্তু সমৃদ্ধ তথ্যের উৎস হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। যা তথ্য প্রমাণ এবং সূত্র উভয় কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। নাবিকরা প্রায়ই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমুদ্র জীবনের তথ্য ও ছবি দেন। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং ইউটিউবে থাকা তাদের এই পোস্টগুলোতে ডেকের ছবি, মাছ ধরার পরিমান, জাহাজের ভেতরের দৃশ্য, জীবনযাত্রা, এমনকি এজেন্ট ও অফিসারদের সঙ্গে সংঘাতের দৃশ্যসহ নানা তথ্য থাকে।
কেটি ম্যাককিউ পরামর্শ দেন, নাবিকদের জাতীয়তা অনুসারে তাদের ফেসবুক গ্রুপ, শিপিং কোম্পানির সোশ্যাল মিডিয়া পেজ এবং জাহাজ কর্মীদের ইউটিউব চ্যানেলগুলো খুঁজে দেখা উচিৎ। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের নিচে মন্তব্যের ঘরেও জাহাজ মালিকদের অসদাচরণ কিংবা কোনো বিষয়ে অভিযোগ করেছেন এমন কোনো ক্রুর নাম বা সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
অস্পষ্ট মালিকানা অনুসন্ধান

কুয়ালালামপুরে প্যানেল আলোচনায় কথা বলছেন কেটি ম্যাককিউ (ডানে)। জিআইজেএনের জন্য ছবিটি তুলেছেন লিসা মেরি ডেভিড
জাহাজ মালিকরা প্রায়ই জাহাজের কর্মচারীদের শোষণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তারা দাবি করতে পারেন যে জাহাজটি “বেয়ারবোট চার্টারড,” (যেখানে মালিক কেবল জাহাজটি ভাড়া দেন, কোনো নাবিক বা কর্মচারী নিয়োগ দেন না), “তৃতীয় পক্ষ দ্বারা পরিচালিত,” বা “আমাদের মালিকানাধীন নয়।”
ডার্ক ফ্লিট বা কালো তালিকাভুক্ত জাহাজে কাজ করা নাবিকদের পরিত্যাগ করা অর্থাৎ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত বা বিপদে সহযোগিতা না করা নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন কেটি ম্যাককিউ। তিনি বলেন, নাবিকদের নথিতে এমন প্রমাণ থাকে যা নিয়োগকর্তা এবং জাহাজের মালিকানা নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে—
• নাবিকদের চাকরির চুক্তি ও নথি, যেমন ক্রুর তালিকা, যা জাহাজে কাজ করা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
• কার্গো ম্যানিফেস্ট, যা পাচারের সূত্র দিতে পারে।
• বিমা সনদপত্র।
• জাহাজ নিবন্ধনের কাগজপত্র।
• হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম চ্যাট, যা নিয়োগকর্তার বলপ্রয়োগ বা হুমকি প্রমাণ করতে পারে।
• নিরাপত্তা রিপোর্ট ও লগবুক।
• জাহাজের নাম, মাস্তুল বা কাঠামো এবং আইএমও শিপ আইডেন্টিফিকেশন নম্বরের ছবি। যা দারুণ একটি তথ্য। সাত সংখ্যার নম্বর, যা “IMO” লেখা দিয়ে শুরু হয়। নাম বা পতাকা পরিবর্তন হলেও এই নম্বর কখনও পরিবর্তিত হয় না।
সহমর্মিতা নিয়ে (ট্রমা-সেন্টার্ড অ্যাপ্রোচ) ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলুন
কেটি ম্যাককিউ তার সূত্রদের একটি ডেটাবেস তৈরি করেছেন। যেখানে নাবিক ও মৎসজীবীরাও রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তিনি তাদের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ করেন। “যেহেতু আমি তাদের সঙ্গে ফেসবুক ডিএম [সরাসরি বার্তা দেওয়া]-এর মতো অপ্রচলিত মাধ্যমে যোগাযোগ করেছি, তাই নিজেকে সবসময় একজন সাংবাদিক হিসেবেই পরিচয় দিয়েছি,” বলেন তিনি।
ম্যাককিউ এমন সব কর্মীদের সঙ্গেও দেখা করেছেন যারা আটকা পড়েছেন, জাহাজ থেকে যাদের পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে বা যারা আহত হয়েছেন। তাদের অনেককে হুমকিও দিয়েছে নিয়োগকর্তা বা এজেন্টরা। কর্মীদের পাসপোর্ট আটকে রেখেছে, যেন প্রয়োজনে তারা কর্মীদের পরিবারকে ভয় দেখাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য সতর্ক নৈতিক প্রস্তুতি এবং সচেতনতা প্রয়োজন।
“এই নাবিকদের অনেকেই গভীর ট্রমায় ভুগছেন। আবার কেউ কেউ ভীষণ বিব্রত বোধ করেন এই ভেবে যে, পরিবারের লোকেরা যদি তাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন, তাহলে কী হবে,” বলেন ম্যাককিউ।
তবে, অসহায় এই মানুষগুলো যেন তার ওপর কোনো বাড়তি প্রত্যাশা স্থাপন না করে, তাই সাক্ষাৎকার শুরু হওয়ার আগে ম্যাককিউ তাদের জানিয়ে দেন, তিনি কাউকে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে পারবেন না। এর পরিবর্তে, তিনি আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন (আইটিএফ)-এর সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য দেন। যারা মূলত এই কর্মীদের সহায়তা দেয়। “ আলাপের শুরুতেই আমি এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করে নিই, যেন আমার সঙ্গে কথা বলার পুরস্কার হিসেবে তাদের মধ্যে কোনো প্রত্যাশা তৈরি না হয়,” বলেন তিনি।
ম্যাককিউ নাম প্রকাশ না করার বিষয়টিও আলোচনা করেন এবং কিছু ক্ষেত্রে সংবেদনশীল অনুচ্ছেদগুলো তাদের পড়ে শোনান যাতে কর্মীরা নিশ্চিত হতে পারেন, তথ্যগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করবে না।
জটিল প্রতিবেদনের চারপাশে ব্যাখ্যা ও বর্ণনামূলক বিন্যাস তৈরি
বহুমুখী জটিলতার কারণে সমুদ্র পথে মানবপাচারের ঘটনা সংবাদমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বিশেষ ধরনের রিপোর্টিংয়ের বিষয়। থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের কনটেক্সট নিউজ বিভাগের এশিয়া এডিটর অমৃতা ব্যাটনালের মতে, সংবাদমাধ্যম সমুদ্রের এই পাচার সংক্রান্ত অনুসন্ধানকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। এর জন্য গভীর ও বর্ণনামূলক রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি সহজবোধ্য ফরম্যাট এবং সৃজনশীল গল্প বলার ভঙ্গি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
“আমাদের মানুষের সঙ্গে তাদের অবস্থান অনুযায়ী মিশতে হবে। যদি তারা সংক্ষিপ্ত গল্প পড়তে চায়, তারা তা পড়তে পারে। যদি তারা গভীরভাবে জানতে চায়, পরে তা করতে পারবে,” ব্যাটনাল ব্যাখ্যা করেন।
পাঠকের পড়ার প্রবণতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কনটেক্সট নিউজরুম দলের সদস্যরা জানতে পারেন, পাঠকরা সাধারণত ১ হাজার ২০০ শব্দের বেশি লেখা কোনো প্রতিবেদন খুব একটা পড়েন না। তাই সাংবাদিক ম্যাককিউয়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সিরিজ ডার্ক ওয়াটার্স: শিপস দ্যাট হাইড ক্রাইমস অন দ্য হাই সিস (অন্ধকার জলরাশি: গভীর সমুদ্রে অপরাধ লুকিয়ে রাখা জাহাজগুলো)—এর ক্ষেত্রে তারা বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন। সমুদ্র পথে পাচার বিষয়ক তথ্যগুলো সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় বেশ কঠিন বা টেকনিক্যাল মনে হয়। তাই পাঠকদের ধরে রাখতে নিউজ টিম এই বিষয়টিকে সহজভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তারা পুরো ঘটনাটি এমনভাবে সাজায় যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই তা বুঝতে পারে এবং বিষয়ের গভীরে প্রবেশের জন্য পাঠকের সামনে বিভিন্ন বিকল্প আকর্ষণীয় উপায় থাকে। ২০২৪ সালে ২৩০টি জাহাজে ৩ হাজারেরও বেশি নাবিক আটকা পড়েছিলেন। জাহাজগুলো ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা অবৈধ নৌ-চলাচল কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল— এই অনুসন্ধানের একটি মূল অংশ ছিল তা উন্মোচন করা।

গল্পটিকে জীবন্ত করে তুলেছে কারিফ ওয়াটের অলংকরণ। স্ক্রিনশট: কনটেক্সট / থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন
শক্তিশালী অলঙ্করণ গল্পটিকে মানবিক রূপ দিতে এবং পাঠকদের আকর্ষণ করতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে, ফ্ল্যাগস অব কনভিনিয়েন্স এবং ডার্ক শিপিং এর মতো কঠিন ও বিমূর্ত ধারণাগুলোকে সহজ ব্যাখ্যার মাধ্যমে বুঝিয়ে বলা হয়েছে।
ভিন্ন ভিন্ন আকারে উপস্থাপনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে প্রতিবেদনটি যেন সব ধরণের পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে। যারা বিস্তারিত জানতে চান তাদের জন্য ছিল দীর্ঘ নিবন্ধ (লং ফরমেট ফিচার)। যারা সাধারণত ছোট লেখা পছন্দ করেন তাদের জন্য ছিল সংক্ষিপ্ত আকারে লেখা প্রতিবেদন। আর সাংবাদিকদের কাজের পদ্ধতি তুলে ধরতে এবং অনুসন্ধানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ করে উপস্থাপনের জন্য যুক্ত করা হয়েছে প্রশ্নোত্তর ও ভিডিও ফুটেজ।
পুরো সিরিজটি একবারে প্রকাশ না করে বেশ কয়েক মাস ধরে ধাপে ধাপে প্রকাশ করার ফলে পাঠকদের আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। এবং প্রতিটি কিস্তি নিজস্ব পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। প্রকাশনার পর, প্রতিবেদনগুলো রয়টার্স নিউজ ওয়্যারেরমাধ্যমে পুনঃপ্রচারের ফলে এক নতুন জীবন পায়। যেখান থেকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সাময়িকী এবং ছোট সংবাদমাধ্যমগুলো এগুলো সংগ্রহ করে প্রচার করে। এই দীর্ঘমেয়াদী বণ্টন ব্যবস্থা প্রতিবেদনের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং নিশ্চিত করে যে অনুসন্ধানটি বৃহৎ সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছেছে।