প্রবেশগম্যতা সেটিংস

অলংকরণ: জিআইজেএন

লেখাপত্র

বিষয়

২০২৫ সালের সেরা ডেটা সাংবাদিকতা

২০২৫ সালে সংবাদমাধ্যমে প্রাধান্য পেয়েছিল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ডেটা সাংবাদিকতা বিষয়ক নিউজরুমগুলো যা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে—যেমন মার্কিন বাণিজ্যের আধিপত্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব, এবং চলমান সংঘাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী ব্যাপক হারে শুল্ক আরোপ এবং ব্যয় কাটছাঁট বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।

এদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ব্যাপকহারে ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণের ঘটনা ছিল বিশ্বব্যাপী মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে, যা প্রযুক্তি বিষয়ক অর্থনীতি ও সমাজের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব তুলে ধরে। বছর জুড়ে প্রতিবেদনের কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে সংঘাত ও যুদ্ধ। আমাদের তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিবেদনে এই বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজায় সংঘটিত যুদ্ধের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে ছিল নতুন পোপ নির্বাচনের ঘটনা, দাবানলের বিস্তার, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভুল তথ্য ছড়ানোর ঘটনা।

২০২৫ সালে জিআইজেএনের ডেটা জার্নালিজম টপ টেন কলাম নামে ২২টি সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে। যেগুলো ২০০টিরও বেশি প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে লেখা। সেরা ডেটা সাংবাদিকতা প্রতিবেদন নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা প্রধান প্রধান খবরের বিষয় অনুযায়ী শ্রেণিবদ্ধ করেছি, পদ্ধতি এবং সম্পাদনার মান বিবেচনা করেছি, পাশাপাশি প্রতিবেদনের গভীরতা ও সৃজনশীলতাকেও গুরুত্ব দিয়েছি।

সংঘাত
আমাদের কলামের প্রায় ১৪ শতাংশ প্রতিবেদনই সংঘাত নিয়ে তৈরি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা ও সুদান নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো এই বছরের সবচেয়ে গভীর কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মধ্যে ছিল। এই প্রতিবেদনে ওপেন সোর্স ইনটেলিজেন্স, মানচিত্র ব্যবহার, সোশ্যাল মিডিয়া বিশ্লেষণ এবং মাঠ পর্যায়ের রিপোর্টিং একত্রিত করা হয়েছে—যা যুদ্ধের মানবিক ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে।

রাশিয়াইউক্রেন

Texty, ranking AI bias in information on Ukraine-Russia war

ছবি: স্ক্রিনশট, টেক্সটি

ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে বলা যায় যে ধীরে ধীরে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি, ড্রোন ও দূরপাল্লার হামলার বিস্তার এবং একাধিক যুদ্ধবিরতির চেষ্টা, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৫ সালে অন্তত ১৯টি প্রতিবেদনে এই যুদ্ধের বিভিন্ন দিক আমরা তুলে ধরেছি। তবে অনলাইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কীভাবে এই সংঘাতের ওপর প্রভাব ফেলছে—সে বিষয়ক বিশ্লেষণগুলো বিশেষভাবে নজর কাড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন এবং কানাডার তৈরি বড় ভাষা মডেলগুলো (এলএলএম) যুদ্ধকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছে—তা বিশ্লেষণ করেছে ইউক্রেনের মিডিয়া প্রতিষ্ঠান টেক্সটি। এর জন্য ভূরাজনীতি, ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়সহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর হাজার হাজার ইংরেজি প্রশ্ন করা হয়। উত্তরে কোথাও ইউক্রেনপন্থী, কোথাও রাশিয়াপন্থী অবস্থান দেখা যায়। এতে এআই মডেলগুলোর মধ্যে স্পষ্ট পক্ষপাত ধরা পড়ে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কানাডার এলএলএমগুলো সবচেয়ে বেশি ইউক্রেনপন্থী, আর চীনের মডেলগুলোতে রাশিয়াপন্থী পক্ষপাত জোরালোভাবে ফুটে ওঠে।

গাজা যুদ্ধ

Forensic Architecture investigation attacks on aid deliveries in Gaza

ছবি: স্ক্রিনশট, ফরেনসিক আর্কিটেকচার

অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি একটি দূর্বল চুক্তি হলেও, যুদ্ধের কারণে গাজায় ৭০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। বসন্তে যুদ্ধ বিরতি শেষ হওয়ার পর, দফায় দফায় ইসরায়েলি আক্রমণ এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের ওপর অবরোধ আরোপের মাধ্যমে গাজায় পুনরায় সংঘাত শুরু হয়। এই  যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রভাবগুলোর একটি হলো—ক্ষুধা। ফরেনসিক আর্কিটেকচার এবং ওয়ার্ল্ড পিস ফাউন্ডেশনের একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইসরায়েলি বাহিনী সরাসরি একে কৌশল আকারে ব্যবহার করেছে। গবেষকরা ওপেন সোর্স ডেটা ও স্থানিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে ত্রাণ নিতে আসা নাগরিকদের ওপর হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য অবকাঠামোর ধ্বংসের ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। ১৮ মার্চ থেকে ১ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা ভূ-অবস্থান ও সময়সহ ভিডিও ও স্যাটেলাইট ইমেজ দিয়ে যাচাই করা হয়েছে, যা ইসরায়েল পরিচালিত ত্রাণ কেন্দ্রগুলোর ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলার একটি পদ্ধতিগত ধারা প্রদর্শন করে।

এল মুন্ডোও একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা মানবিক সংকটের গুরুতর চিত্র তুলে ধরে। প্রতিবেদনে একজন পিতার খাদ্য সংগ্রহের সংগ্রাম তুলে ধরা হয়। ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে ত্রাণের আশায় দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষারত মানুষের অবস্থা ছবি ও মানচিত্র আকারে দেখানো হয়েছে।

সুদান

ছবি: স্ক্রিনশর্ট, এআরআইজে

সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) এবং প্যারামিলিটারি র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ)-এর মধ্যকার গৃহযুদ্ধ রূপ নিয়েছে একটি ভয়াবহ মানবিক সংকটে। সংঘটিত হয়েছে গণহত্যা। ১৮ মাস ধরে এল-ফাশার শহরের অবরোধ থাকার কারণে অনাহার, জাতিগত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থা মনে করছে—“হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্র” হিসেবে রিপোর্টকৃত এলাকাগুলোতে হয়তো গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আরব অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংস্থা (এআরআইজে) এবং আল মোহাজেরের যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের কীভাবে পাচারকারী ও অপরাধী চক্রগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। প্রতিবেদনটিতে প্রতিবেশী দেশ মিশরে পালানো শরণার্থীদের ওপর আলোকপাত করে পাচারকারীদের সহিংসতার শিকার হওয়া এক ডজন জীবিত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার এবং ৩২৪ জন শরণার্থীর মধ্যে জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, বহু নারী ও পুরুষ ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সাংবাদিকেরা চারটি প্রধান পাচার পথ চিহ্নিত করেন এবং একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ ভিজ্যুয়ালাইজেশনে তা তুলে ধরেন। যেখানে দক্ষিণ মিসরের শহর আসওয়ানের কাছে একটি পাথর খনির এলাকার দিকে এগিয়ে যাওয়া সীমান্তবর্তী থামার স্থানগুলো দেখানো হয়েছে। একইভাবে, স্কাই নিউজ, সুদান ওয়ার মনিটর ও লাইটহাউস রিপোর্টসের যৌথ অনুসন্ধানে ওপেন সোর্স প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, আধাসামরিক বাহিনী কীভাবে এল-ফাশার থেকে পালিয়ে আসা বেসামরিক মানুষদের খুঁজে বের করে আশপাশের তথাকথিত “কিলিং ফিল্ড”-এ হত্যা করেছে।

আসাদের পর সিরিয়া

New York Times Sednaya prison Syria

ছবি: স্ক্রিনশট, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সিরিয়া ছেড়ে পালানোর পর সাংবাদিকসহ হাজার হাজার প্রবাসী কয়েক দশকের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো দেশে ফিরতে সক্ষম হন। পরবর্তী বছরের মধ্যে, স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা যুদ্ধাপরাধের সম্ভাব্য প্রমাণ সংগ্রহ, নিখোঁজদের খোঁজা এবং সিরিয়ার কুখ্যাত কারাগারগুলো অনুসন্ধানের চ্যালেঞ্জিং কাজ শুরু করেন। বিশেষ করে যেসব কারাগারে শাসকগোষ্ঠী হাজার হাজার ভিন্নমতাবলম্বীকে আটক রেখে নির্যাতন করেছিল। বিস্তারিত ভিডিও ফুটেজ, ছবি ও নথির ভিত্তিতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস দামেস্কের উপকণ্ঠে অবস্থিত সেদনায়া কারাগারের একটি থ্রিডি মডেল তৈরি করে। এতে কারাগারের অভ্যন্তর, প্রতিটি অংশের বিস্তারিত গাইড ও তার ব্যবহার, এবং সেখানে আটক কয়েকজন বন্দীর ব্যক্তিগত গল্প ‘ইন্টারেক্টিভ পদ্ধতিতে’ উপস্থাপন করা হয়েছে।

জলবায়ু

২০২৫ সালে চরম আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বিস্তৃত প্রভাবের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জ্যামাইকায় হারিকেন মেলিসার আঘাত হানা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঝড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একই সময়ে হংকংয়ে আঘাত হানে টাইফুন। এপ্রিলের শেষ দিকে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির পর পাকিস্তান ও ভারতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।

ক্যালিফোর্নিয়ার অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব

High Country News California power outages

ছবি: স্ক্রিনশট, হাই কান্ট্রি নিউজ

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে দাবানলের ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন করেছে। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার অগ্নিকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। যেখানে ঘরবাড়ির সেইসব কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয় যেগুলো আগুন থেকে বেঁচে গেছে এবং সেইসব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যাচাই-বাছাই করে দেখা হয় যা আগুন থেকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছে। হাই কান্ট্রি নিউজ ও টাইপ ইনভেস্টিগেশনের সাংবাদিকরা ক্ষতিগ্রস্ত একটি ট্রান্সমিশন টাওয়ার থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ দাবানল নিয়ে প্রথমবারের মতো বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। এই দাবানলের ঘটনার পর ক্যালিফোর্নিয়ার রাজ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নতুন দাবানল প্রতিরোধের নিয়ম চালু করে। রাজ্যের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পিজি অ্যান্ড ই-এর নেওয়া সমাধানগুলোর একটি ছিল ‘ফাস্ট-ট্রিপ’ সেটিংসে পরিবর্তন আনা। এই ব্যবস্থায় যন্ত্রপাতি যদি এমন কোনো ঝুঁকি শনাক্ত করে, যেখান থেকে আগুন লাগতে পারে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ক্যাল ফায়ার ও পিজি অ্যান্ড ই-এর তথ্য ব্যবহার করে কোন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, কোন সার্কিট লাইনে সমস্যা হয়েছে এবং কোথায় দাবানল ঘটেছে—এসব মিলিয়ে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকায়—যা প্রায়ই বনাঞ্চলের সঙ্গে সংলগ্ন এবং উচ্চ আগুন ঝুঁকির মুখে থাকে—শহুরে এলাকার তুলনায় ৬০০ শতাংশ বেশি ফাস্ট-ট্রিপ বিভ্রাটের সম্মুখীন হয়েছে।

এই সম্পর্কিত আরো জানতে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের ভিজ্যুয়াল এক্সপ্লেইনারটি দেখতে পারেন। এখানে তুলে ধরা হয় লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানলের মধ্যেও কেন কিছু বাড়ি টিকে গিয়েছিল। অবস্থান অনুযায়ী আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর মানচিত্র তৈরি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িগুলোর কত পুরানো তা বিশ্লেষণ এবং ছবি দেখে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পরিমাপ করা হয়েছে।

আমাজনে খরা

ছবি: স্ক্রিনশট, ইনফোআমাজোনিয়া, ম্যাপবক্স

২০২৫-এর শুরুতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে, ডেটা প্রতিষ্ঠান ইনফোআমাজোনিয়া দেখিয়েছে কীভাবে ব্রাজিলের আমাজনের অর্ধেকের বেশি পৌরসভা গত বছর খরার সম্মুখীন হয়েছিল। ব্রাজিলের জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতা কেন্দ্র (সিমাডেন) বিশ্লেষিত ডেটা ব্যবহার করে তৈরি করা প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালে অঞ্চলটির ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ পৌরসভা খরার সম্মুখীন হয়েছে। ইনফোআমাজোনিয়া দলের সাংবাদিকরা বিষয়টি মাঠ পর্যায়েও যাচাই করেছেন। আমাজোনাস রাজ্যের সলিমোয়েস নদী পাড়ি দিয়ে সেখানে গিয়েছেন, অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন, নদীর তীরে বসবাসরত গোষ্ঠীর লোকেদের সঙ্গে কথা বলেছেন—যারা খরার কারণে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিবেদনে গ্রাফ ব্যবহার করে বছরের প্রতিটি মাসের পরিস্থিতির পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

২০২৫ সালে খবরের শিরোনাম ‍জুড়ে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। ডেটা সাংবাদিকতা দলগুলো কর্মসংস্থানে এর প্রভাব, ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তার এবং অর্থনীতি থেকে সৃজনশীল খাত পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পে এআইয়ের প্রসার পর্যবেক্ষণ করেছে। এসব পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়তা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সমাজে এর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ডেটা সেন্টার

ছবি: স্ক্রিনশট, ব্লুমবার্গ

বিপুল বিদ্যুৎখরচ করা এআই ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে অনুসন্ধান চালায় একাধিক সংবাদমাধ্যম। তবে ব্লুমবার্গের করা বিশ্লেষণটি দারুণভাবে তুলে ধরে যে, এআই ব্যবহারের খরচ কীভাবে আমেরিকার সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। এআই ডেটা সেন্টারের বৃদ্ধি বিদ্যুৎ গ্রিডে কী প্রভাব ফেলছে, তা বোঝার জন্য পাইকারি বিদ্যুতের দাম পর্যালোচনা করা হয় এবং ২০২০ সালের দামের সঙ্গে ২০২৫ সালের দামের তুলনা করা হয়।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে উঠে আসে, যেসব এলাকায় বড় ধরনের ডেটা সেন্টারের কার্যক্রম রয়েছে, সেখানে এক মাসের মধ্যেই পাইকারি বিদ্যুতের দাম বেড়েছে সর্ব্বোচ্চ ২৬৭ শতাংশ পর্যন্ত । ২৫ হাজার ‘গ্রিড নোড’ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যে সব এলাকায় দামের বৃদ্ধি হয়েছে, তার ৭০ শতাংশেরও বেশি এলাকা ডেটা সেন্টারের ৫০ মাইলের মধ্যে অবস্থিত।

পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে ২০৩৫ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৯ শতাংশ আসবে ডেটা সেন্টার থেকে। সাংবাদিকরা বলেন, তাদের ডেটার ‘অভূতপূর্ব সূক্ষ্মতা’ দেখিয়ে দেয়—এই ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর আশপাশে বসবাসকারীদের জন্য কী ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একইভাবে, ডেটা সেন্টার নিয়ে ফিনান্সিয়াল টাইমসের একটি প্রতিবেদনেও দারুণভাবে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এতে একটি ভিজ্যুয়াল ও ইন্টারঅ্যাকটিভ উপস্থাপনার মাধ্যমে ডেটা সেন্টারের ভেতরের চিত্র দেখানো হয়েছে—যন্ত্রপাতি, বিন্যাস, কার্যপ্রক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত প্রচলিত ডেটা সেন্টারের তুলনায় এআই ডেটা সেন্টার চালাতে কত বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কর্মসংস্থান

ছবি: স্ক্রিনশট, আফ্রিকা আনসেন্সরড

পুলিৎজার সেন্টারের এআই অ্যাকাউন্টেবিলিটি নেটওয়ার্কের সহায়তায় আফ্রিকা আনসেন্সর্ড অনুসন্ধান করেছে কীভাবে বিভিন্ন কোম্পানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য হাজার হাজার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই ‘টিউটর’ নিয়োগ করে। এসব টিউটরের কাজ ছিল বড় ভাষা মডেল (এলএলএম)-এর উত্তরে সংশোধন যোগ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। প্রথম দৃষ্টিতে এই ব্যাপক নিয়োগকে বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ বলে মনে হলেও বাস্তবে তা স্থায়ী কাজের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং এর পেছনে ছিল ভিন্ন উদ্দেশ্য। বিশেষজ্ঞরা যেটিকে ‘লেবার হেজিং’ বলে উল্লেখ করেন। এটি মূলত একটি কৌশল। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও বিগ টেক ক্লায়েন্টদের কাছে তুলে ধরা হয় যে বড় পরিসরে কর্মীবাহিনী প্রস্তুত আছে এবং সহজে কাজের পরিসর বাড়ানো যাবে। এমন ধারণা দেখিয়ে তাদের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করা হয়।

এই বিষয়টি যাচাই করতে সাংবাদিকেরা মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত মাইক্রো-টাস্কিং প্ল্যাটফর্ম মাইন্ডরিফট-এ প্রকাশিত চাকরির বিজ্ঞাপনগুলো পর্যালোচনা করেন। সাবেক রুশ মালিকানাধীন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টোলোকা-এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাইন্ডরিফট। অনুসন্ধানে ৬২টি দেশে প্রকাশিত ৫ হাজার ৭৭০টি চাকরির বিজ্ঞাপন ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এতে দেখানো হয়েছে, আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্সের প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে কীভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণের শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানো স্বার্থসিদ্ধি করা হচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়া অপতথ্য

২০২৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে  রাজনৈতিক চরমপন্থার উত্থান ও ব্যাপক ভুয়া তথ্যের বিস্তার চোখে পড়ে। বিভিন্ন অনুসন্ধানে অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত, সমন্বিত ভ্রান্ত তথ্য প্রচারণা এবং জনমত প্রভাবিত করতে প্ল্যাটফর্মগুলোর অপব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে।

এক্স (টুইটার) কিভাবে চরমপন্থা  ডানপন্থা মত প্রচার করে

Sky News X's algorithmic bias for extreme and right-wing content

ছবি: স্ক্রিনশর্ট, স্কাই নিউজ

এক্স-এর অ্যালগরিদম ডানপন্থী রাজনৈতিক কনটেন্টকে বেশি প্রাধান্য দেয় কি না— তা পরীক্ষা করতে স্কাই নিউজের ডেটা ও ফরেনসিকস দল একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা চালায়। এ জন্য যুক্তরাজ্যের ব্যবহারকারীদের মতো আচরণ করে—এমন নতুন পরীক্ষামূলক অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। এসব অ্যাকাউন্টকে বামপন্থী, ডানপন্থী এবং নিরপেক্ষ—এমন ব্যবহারকারী হিসেবে আলাদা করে সাজানো হয়। এরপর দুই সপ্তাহ ধরে এসব নতুন অ্যাকাউন্টের “ফর ইউ” ফিড থেকে পোস্ট সংগ্রহ করে ৯০ হাজার পোস্টের একটি ডেটাসেট তৈরি করা হয়। একাডেমিকদের সহায়তায় সাংবাদিকেরা নিজেরা প্রশিক্ষণ দেওয়া একটি বৃহৎ ভাষা মডেল ব্যবহার করে ডেটাসেটে সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া অ্যাকাউন্টগুলো কোন রাজনৈতিক ধারার, তা চিহ্নিত করেন। এরপর রঙ দিয়ে আলাদা করা চার্টের মাধ্যমে ফলাফল দেখানো হয়। এতে দেখা যায়, নতুন ব্যবহারকারীদের সামনে আসা রাজনৈতিক কনটেন্টের ৬০ শতাংশেরও বেশি ডানপন্থী অ্যাকাউন্ট থেকে এসেছে। নিরপেক্ষ ব্যবহারকারীরা বামপন্থী কনটেন্টের তুলনায় দ্বিগুণ ডানপন্থী কনটেন্ট দেখেছেন। পাশাপাশি, নতুন ব্যবহারকারীদের দেখানো রাজনৈতিক পোস্টগুলোর অর্ধেকেরও বেশি এসেছে এমন অ্যাকাউন্ট থেকে, যেগুলোকে চরমপন্থী বলা হয়েছে—কারণ সেগুলোতে ঘৃণামূলক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, বা সহিংসতা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের পক্ষে কথা বলা হয়েছে।

অনলাইনে অপতথ্য

ARIJ climate change online misinformation campaign

ছবি: স্ক্রিনশট, এআরআইজে

আরেকটি উল্লেখযোগ্য অনুসন্ধান ছিল আরব রিপোর্টার্স ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (এআরআইজে) ও কোড ফর আফ্রিকার যৌথ কাজ। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু হ্যাশট্যাগ বিশ্লেষণ করা হয়, যেগুলো ভ্রান্ত তথ্য ছড়াচ্ছিল এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করছিল। অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানী তেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা স্বার্থ রয়েছে—এমন অ্যাকাউন্টগুলো থেকে এসব হ্যাশট্যাগ ছড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় ও আধা-স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্টের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জলবায়ু বিষয়ক ষড়যন্ত্রমূলক বয়ান ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার বিষয়টিও উঠে আসে।

অন্যান্য বিষয় 

বাণিজ্য শুল্ক

ছবি: স্ক্রিনশট, ফিনান্সিয়াল টাইমস

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি—বিশেষ করে উচ্চ শুল্ক আরোপ ও বড় আকারের ব্যয় সংকোচন—দেশীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ছিল কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। এই সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে শুরু করে গাড়ি ও ইস্পাত পর্যন্ত নানা পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করতে আলাদা আলাদা ট্যারিফ ট্র্যাকার তৈরি করে। এসব শুল্কের পরিমাণ ও আকার  সপ্তাহভেদে, এমনকি কখনো কখনো দিনভেদেও বদলেছে। কোন ট্র্যাকারটি সবচেয়ে ভালো—তা নির্ধারণ করা কঠিন হলেও, ফিনান্সিয়াল টাইমস (এফটি) যেভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে, তা বিশেষভাবে নজরকাড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীন—যাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সম্প্রতি ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। চীনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এফটি ব্যাখ্যা করেছে ট্রাম্প এত কেন আগ্রাসী শুল্কনীতির পথে হেঁটেছেন। এতে চীনের ওপর চাপ তৈরির জন্য তার দীর্ঘদিনের শুল্ক আরোপের কৌশলের ধারাবাহিকতাই তুলে ধরা হয়েছে। চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বাণিজ্যসংক্রান্ত সরকারি তথ্য ব্যবহার করে এফটি প্রতিবেদকেরা বেইজিং ও অন্যান্য দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক এবং যেসব পণ্যের মাধ্যমে ২০২৪ সালের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে একাধিক চার্ট উপস্থাপন করেন। যেমন, ডেটাতে উল্লেখ করা হয়েছে—চীন বিশ্বের মোট উৎপাদিত পণ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তৈরি করে এবং কৌশলগত বাণিজ্য অংশীদারদের মাধ্যমে দেশটি তার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আরও বাড়াচ্ছে।

নতুন পোপ

New Pope Leo XIV

ছবি: স্ক্রিনশট, অ্যাটলো

৮ মে, কার্ডিনাল রবার্ট ফ্রান্সিস প্রেভোস্টকে পোপ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়—যিনি পোপ লিও চতুর্দশ নামে পরিচিত হন। তার মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী একজন নাগরিক পোপ নির্বাচিত হলেন। হাঙ্গেরির অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম অ্যাটলাতসো-এর ডেটা দল একটি বিশদ চিত্রিত (ইলাস্ট্রেটেড) প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে কনক্লাভে (পোপ নির্বাচনের জন্য কার্ডিনালদের গোপন সভা)  সম্পন্ন হওয়া বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার একটি গাইডও ছিল, যেখানে ইতিহাসে সর্বাধিক সংখ্যক কার্ডিনাল  (ক্যাথলিক চার্চের উচ্চপদস্থ ধর্মগুরুদের একটি গ্রুপ, যারা পোপ নির্বাচনে ভোট দেয়ার অধিকার রাখে) ভোট দিয়েছেন। প্রতিবেদনটিতে রোম ও ইউরোপে এ পর্যন্ত সব পোপের সমাধিস্থলের মানচিত্র, কিছু ভ্যাটিকান ভবন ও সিস্টিন চ্যাপেলের থ্রিডি মডেলও ছিল, যেখানে ১৮৭৮ সাল থেকে কনক্লাভ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। রিপোর্টে নির্বাচকদের বৈচিত্র্যময় উৎস, ভোটাভুটি প্রক্রিয়া এবং মূল পোপ প্রার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অবস্থানের তথ্য গ্রাফিক আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ইরানের নিষিদ্ধ তেলের জাহাজ বহর

Reuters Iran's ghost fleet of oil tankers evading sanctions

ছবি: স্ক্রিনশট, রয়টার্স

২০২৫ সাল জুড়ে রয়টার্সের ডেটা দল একাধিক উল্লেখযোগ্য ডেটাভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছে। যেমন প্রচণ্ড গরমে একটি কারাগারের সেলে বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা কেমন, তা তুলে ধরা কিংবা অভিবাসীরা কীভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়—তা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা। তবে আমাদের কাছে এই বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল একটি বিশেষ প্রতিবেদন। সেখানে মানচিত্র ও স্যাটেলাইট চিত্রের পাশাপাশি স্ক্যান করা নথি ও ইমেইলের অংশবিশেষ ব্যবহার করে দেখানো হয়েছে—পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইরান কীভাবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য গড়ে তুলেছে। অনুসন্ধানটি শুরু হয় একটি ফাঁস হওয়া ইমেইল থেকে। যেখানে ইরানের একটি কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য ছিল। অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, মার্চ ২০২২ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ওই কোম্পানি ইরান থেকে ভেনেজুয়েলা, উত্তর রাশিয়া ও চীনের বিভিন্ন বন্দরে ১৮টি নিষিদ্ধ চালান পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। যেগুলো পরিবহন হয়েছে ৩৪টি ‘ঘোস্ট ফ্লিট’ (জাহাজের নাম, চিহ্ন বা ট্র্যাকিং সিগন্যাল জালিয়াতি করে পরিচয় লুকানো হয়, যাতে কোন সংস্থা বা সরকার তাদের খুঁজে না পায়) জাহাজের মাধ্যমে। মোট প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাণিজ্যে এভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১৭ শত কোটি মার্কিন ডলার। এই কাজ সফল করতে কোম্পানি ও তার অংশীদাররা সমুদ্রে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল সরাতে, নথিপত্র জাল করতে, জাহাজ নতুন নামকরণ ও রঙ পরিবর্তন ও ট্র্যাকিং সিগন্যাল ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে—যাতে তাদের ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ধরা না পড়ে।

পেরুতে আদিবাসীদের যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম

El Comercio Condorcanqui sexual violence and teen pregnancy

ছবি: স্ক্রিনশট, এল কমার্সিও

পেরুর আমাজনের কন্ডর্কানকি প্রদেশে সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে প্রতিবেদন করেছে এল কমার্সিও, যেমন নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং কিশোরীদের গর্ভধারণ। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে কিভাবে আওয়াজুন আদিবাসী নারীদের একটি দল সাধারণ সদস্য ও নেতাদের সমর্থনে মেয়েদের সুরক্ষা এবং সম্প্রদায়ের শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দশকে এই অঞ্চলে কিশোরীদের গর্ভধারণের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে নারী সহায়তা কেন্দ্রগুলোতে (সিইএম) করা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদকরা যৌন সহিংসতার অভিযোগের তথ্য উপস্থাপন করেন। বিশেষ করে ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোরীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত  যৌন নিপীড়নের ঘটনা, আওয়াজুন মহিলা কাউন্সিলের কাছে প্রাপ্ত অভিযোগের সংখ্যা এবং ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের গর্ভধারণের জাতীয় পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে।

মিয়ানমারের প্রতারণা কেন্দ্র

Nikkei SE Asia scam compounds

ছবি: স্ক্রিনশট, নিক্কেই

রাশিয়ায় নিহত হওয়ার সময় উত্তর কোরিয়ার সেনারা মৃত্যুর আগে শেষ কী বলেছিল, টোকিও সাবওয়েতে সন্ত্রাসবাদ, ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এবং পিয়ংইয়ংয়ে কিম জং উনের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীসহ নানা বিষয় নিয়ে ২০২৫ সালে অনুসন্ধান চালায় নিক্কেইয়ের ডেটা দলের সদস্যরা। তাদের করা মিয়ানমারের প্রতারণা কেন্দ্র নিয়ে এই ভিজ্যুয়াল অনুসন্ধানে খুঁজে বের করা হয়েছে সেই সব গোপন স্থাপনাগুলো, যেখানে পাচারের শিকার হওয়া শ্রমিকদের  বলপূর্বক  “পিগ বুচারিং” বা অন্যদের সঙ্গে অনলাইনে সম্পর্ক গড়ে তাদের জাল বিনিয়োগ স্কিমে ফাঁদে ফেলার জন্য বাধ্য করা হয়। এই অনলাইন প্রতারণায় প্রথমে ভিকটিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়, এরপর তাদেরকে জাল বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক সুযোগ দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়। নিক্কেইয়ের ভি-ডেটা দল স্যাটেলাইট চিত্র, রাতের আলো বিশ্লেষণ, সরকারি নথি, বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকার এবং এনজিও রিপোর্ট একত্র করে সন্দেহভাজন প্রতারণা কেন্দ্রগুলো শনাক্ত ও যাচাই করে। এই কেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগই থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী এলাকায় নির্মিত, যেখান থেকে অনেক শ্রমিক আসে। দলটি মিয়ানমারের সীমান্তে এই হাবগুলোর সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করেছে এবং দেখিয়েছে কিভাবে এগুলো “কারাগারের মতো” হয়ে উঠেছে। চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন—এমনটা ভেবে লোকেরা এখানে আসেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর্থিক শোষণের ফাঁদে আটকে পড়েন।


হানা ডুগল জিআইজেএনের পাক্ষিক টপ টেন ইন ডেটা জার্নালিজম কলামের লেখক। পাশাপাশি আল জাজিরার ডেটা, ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং এবং এক্সপেরিমেন্ট টিম—এজে ল্যাবসএর ডেটা সাংবাদিক। তিনি পুলিশি তদারকি, নজরদারি, এবং প্রতিবাদ-প্রতিরোধসহ বিভিন্ন বিষয় ডেটার মাধ্যমে অনুসন্ধান করেছেন। এছাড়া জিআইজেএনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ডেটা সাংবাদিকতার প্রতিবেদন,  টিকটক অ্যালগরিদম অনুসন্ধান, এবং ডেটা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে উপজাতি ভূমি সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছেন

 

 

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

পরামর্শ ও টুল

‘গল্পটি যখন আপনার’: ব্যক্তিগত ঘটনা অনুসন্ধানের চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলার উপায়

প্রায়ই ধরে নেওয়া হয়, কোনো সাংবাদিক যখন প্রতিবেদন তৈরির সময় ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকেন, তখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেই সম্পর্ক পক্ষপাত তৈরি করতে পারে এবং নিরপেক্ষতাকে বিকৃত বা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

সংবাদ ও বিশ্লেষণ সম্পাদকের বাছাই

বিক্ষোভে প্রাণঘাতী গুলির নির্দেশ, অবরুদ্ধ বম জনগোষ্ঠী, বিপদে দ্বীপটির আবাসস্থল: ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সেরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরকার ও ক্ষমতাশালীদের জবাবদিহির উদ্দেশে বেশ কিছু ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের প্রচেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা পতিত সরকারের সময়ের পাশাপাশি বর্তমান সময়ে বিভিন্ন খাতের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন।

পরিকল্পনা থেকে লেখা, সম্পাদনা থেকে প্রকাশনা: অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে সম্পাদকরা যেভাবে সহায়তা করতে পারেন

সম্পাদকদের কাজ হলো সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহে সাহায্য করা। আর গল্পটি এমনভাবে লিখতে হবে, এমন প্রমাণ ও তথ্য দিতে হবে, যেন সবচেয়ে সন্দেহপ্রবণ মানুষও পড়ার পর বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়।

সম্পাদকের বাছাই

২০২৫ সালে জিআইজেএন প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে যে ১০টি অবশ্যই পড়া উচিত

২০২৫ সালে জিআইজেএন প্রকাশিত বেশিরভাগ প্রতিবেদনেই নিত্য-নতুন চিন্তা-ভাবনা আর উদ্ভাবনী বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে বলা হয়েছে। তাতে উঠে এসেছে, অর্থ-সম্পদের ক্রমাগত সংকোচন আর স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর বাড়তে থাকা হুমকি ও চাপের বিপরীতে দাঁড়িয়েও সাংবাদিকরা কীভাবে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন।