সাইমন অ্যালিসন ও ক্রিস্টিন মুঙ্গাই (ডানে)। ছবি: এআইজেসি
‘গল্পটি যখন আপনার’: ব্যক্তিগত ঘটনা অনুসন্ধানের চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলার উপায়
সত্যের সন্ধানে নেমে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত সরকার, বড় প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতাধর অভিজাত গোষ্ঠী, নেপথ্যের নেটওয়ার্ক, দুর্নীতিবাজ ও প্রতারকদের মুখোমুখি হন। কিন্তু নিজের বন্ধু বা সহকর্মীদের নিয়ে যখন কোনো অনুসন্ধানে হাত দেন, তখন কিন্তু সব সময় তারা ততটা নির্ভীক থাকতে পারেন না—এমনটাই মনে করেন প্যান-আফ্রিকার সংবাদপত্র দ্য কন্টিনেন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইমন অ্যালিসন।
অ্যালিসন ব্যাখ্যা করেছেন, অনেক সাংবাদিক কেন নিজেদের খুব কাছের জায়গা বা মানুষ নিয়ে রিপোর্ট বা অনুসন্ধান করতে ভেতরে ভেতরে শঙ্কিত থাকেন বা ভয় পান। তিনি বলেন, “এ ধরনের গল্প কঠিন ও জটিল, কষ্টকর, তালগোল পাকানো, ভীষণ ব্যক্তিগত, আর এর জন্য অন্য ধরনের সাহস প্রয়োজন।”
নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ২১তম আফ্রিকান ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (এআইজেসি) অ্যালিসন এই বিষয়ে বক্তব্য দেন। সেশনের শিরোনাম ছিল, “‘অনুসন্ধান ক্ষেত্রটি যখন পরিচিত বৃত্তের ভেতরে। নিজের একান্ত বা খুব কাছের কাউকে নিয়ে রিপোর্ট করা।” আলোচনায় তার সঙ্গে ছিলেন দ্য কন্টিনেন্টের বার্তা সম্পাদক ক্রিস্টিন মুঙ্গাই।
এই সেশনের উদ্দেশ্য ছিল সেই সব সাংবাদিকদের সাহায্য করা, যারা কোনো ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে অনুসন্ধান করতে দ্বিধা বোধ করেন। কিংবা যাদের নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে সন্দেহ থাকে, তারা গল্পটি নিয়ে কাজ করার জন্য উপযুক্ত কি না।
এমন বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করার সময় যে সব মানসিক, নৈতিক ও পেশাদার চ্যালেঞ্জ আসে, তা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাাশি মুঙ্গাই এবং অ্যালিসন তাদের সম্পাদনা, সহযোগিতা ও রিপোর্ট করার অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেন। এমনকি বাদ পড়া অনুসন্ধানের কথাও উল্লেখ ধরেন।
নিজেই নিজেকে নিয়োগ দিন
২০২৫ সালের জুলাইয়ে আফ্রিকা আনসেন্সরড-এর সঙ্গে একটি দুই-পর্বের অনুসন্ধানী সিরিজ প্রকাশ করেন মুঙ্গাই। ঘটনাটি ছিল তার সাবেক এক শিক্ষককে কেন্দ্র করে।
দ্য টিচার অ্যান্ড দ্য সিস্টেম শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে মুঙ্গাই বর্ণনা করেছেন, একটা সময় এই শিক্ষককে তিনি তার জীবনের আধ্যাত্মিক গুরুর মর্যাদা দিয়েছিলেন। ওই শিক্ষক তাদের স্কুলে বাইবেল পাঠ করতেন। খ্রিস্টান ইউনিয়নের সভা পরিচালনা করতেন। মুঙ্গাইয়ের ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম অ্যালায়েন্স গার্লস হাই স্কুল। এটি কেনিয়ার শীর্ষ মানের মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর একটি।

ক্রিস্টিন মুঙ্গাই, দ্য কন্টিনেন্টের বার্তা সম্পাদক। ছবি: স্ক্রিনশট, লিঙ্কডইন
মুঙ্গাই স্কুলটি ছাড়ার পরও তার সাবেক শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। সেই সময়ে ১৯ বছর বয়সে ৩১ বছর বয়সী ওই শিক্ষকের সঙ্গে তার বাড়িতে “যৌন সম্পর্ক” স্থাপনে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। এই ঘটনায় একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে মুঙ্গাই তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, “ আমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা বোঝা ও বর্ণনার জন্য সেই সময়ে আমি ঠিক কোনো শব্দ বা ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।”
১২ বছর ধরে এ ঘটনাটিকে তিনি নিজের মধ্যে পুষে রাখেন। ২০১৮ সালে এসে যতদিন না টের পান যে তিনি একা নন—ঠিক ততদিন পর্যন্ত। তিনি লেখেন, “ওই সময়টা সবকিছু বদলে দিল। যখন আমি অন্যদের গল্পগুলো শুনলাম, তখন আমার গল্পটিও প্রকাশের জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম।” এই উপলব্ধির মুহূর্তটি তাকে তার সাবেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করতে অনুপ্রাণিত করে।
প্রায়ই ধরে নেওয়া হয়, কোনো সাংবাদিক যখন প্রতিবেদন তৈরির সময় ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকেন, তখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেই সম্পর্ক পক্ষপাত তৈরি করতে পারে এবং নিরপেক্ষতাকে বিকৃত বা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তবে, মুঙ্গাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ছিল। সম্পাদকরা সাধারণত সাংবাদিকদের ওপর প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেন। তবে মুঙ্গাই নিজেই নিজেকে এ কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন। যদিও গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। এ সম্পর্কে মুঙ্গাই ব্যাখ্যা করেন, তিনি বিষয়টিকে একজন সাংবাদিকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, যিনি নীরবতা ভাঙার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন।
আর গল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাকে এমন কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকারও দিয়েছিল, বাইরের কারো পক্ষে যা অনেক বেশি কঠিন হতো।
বছরের পর বছর সাবেক শিক্ষার্থীদের সম্মিলনের সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতো, আর সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রুপ প্লাটফর্মে যৌন অপকর্মের গুজবগুলো বাড়ছিল। কিন্তু কে দায়ী—তা জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল না, ব্যাখ্যা করেন মুঙ্গাই।
এআইজেসি সম্মেলনে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আমি শুধু সত্য উন্মোচন করতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম ঘটনাটিকে গুজব ও অনুমানের জগৎ থেকে বের করে আনতে এবং ইতিহাসের জন্য লিখে রাখতে।”
কষ্টকর প্রক্রিয়া
আলোচনার একটা পর্যায়ে অ্যালিসন তাকে জিজ্ঞেস করেন, নিজের অতীতের অংশ হওয়া একটি ঘটনা ঘিরে কাজ করতে গিয়ে মানসিকভাবে কেমন অনুভব করেছেন। মুঙ্গাই উত্তর দেন, “এটি ছিল এক ধরনের আধ্যাত্মিক যন্ত্রণার মতো। যেন এক ধরনের শাস্তি।”
চার বছর ধরে মুঙ্গাই এই কাজটি করেন। তিনি তার বন্ধু, সহকর্মী এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, সাক্ষ্য সংগ্রহ করেন এবং অনুসন্ধানের জন্য তথ্য-প্রমাণ সাজাতে থাকেন।
স্কুলের সঙ্গে অতীত সম্পৃক্ততা থাকার কারণে মানসিকভাবে তিনি অনেক বেশি আবেগতাড়িত হয়ে পড়ছিলেন। এই প্রসঙ্গে মুঙ্গাই বলেন: “আমি তখন এখানে ছিলাম, এখনো এখানে আছি, সেই কমিউনিটির অংশ হয়ে। এই স্কুলে পড়ার জন্য আমি গর্বিত ছিলাম। আমি সেই সব গর্বিত সাবেক শিক্ষার্থীদের একজন।” তিনি পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সক্রিয় ছিলেন, এবং পুরো স্কুলের ভাবমূর্তি নিজের মধ্যে ধারন করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার সম্পূর্ণ ভিন্ন উপলব্ধি হয়। “আমার মনে হয় আমাদের অনেকেরই বড় হওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। একই সঙ্গে ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে নিতে হয়েছিল, যাতে আমরা যা দেখেছি সে সব ঘটনা কথায় প্রকাশ করতে পারি,” বলেন তিনি।
যখন জোরালো প্রমাণ মিলবে না, তখন কী করবেন
মুঙ্গাইয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল সেই সব সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হওয়া ঘটনাগুলো যাচাই করা, যারা বলেছিলেন যে তারা অনুপযুক্ত আচরণের শিকার হয়েছেন। প্রথম দিকে তার কাছে কোনো দালিলিক তথ্য-উপাত্ত, দৃশ্যমান বা ডিজিটাল প্রমাণ ছিল না। তার কাছে ছিল কেবল কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীর জমানো স্মৃতি, যারা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে প্রস্তুত ছিলেন।
দুই সাবেক শিক্ষার্থী তাকে বলেছিলেন যে তারা স্কুলে থাকাকালীন একই ব্যক্তির সঙ্গে অনিচ্ছাকৃত শারীরিক সংস্পর্শের শিকার হয়েছেন। আরেকজন জানিয়েছিলেন ওই শিক্ষক তাদের গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর অনিচ্ছাকৃত চুম্বন করেছিলেন। আরও দুইজন বর্ণনা করেছিলেন যে সাবেক শিক্ষকের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পরবর্তীতে শারীরিক বা যৌন সম্পর্কে রূপ নিয়েছিল।
মুঙ্গাই তার একজন পরামর্শদাতার কাছে কৃতজ্ঞ, যিনি তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রতিটি ঘটনার তথ্য অন্য কারও সাক্ষ্যের সঙ্গে যাচাই করে নিতে। গল্পের দ্বিতীয় পর্বের জন্য মুঙ্গাই এমন এক উৎসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, যিনি বিস্তারিত রেকর্ড রেখেছিলেন।
তীব্র প্রতিক্রিয়া আসার প্রস্তুতি রাখুন
আইনি হুমকি এবং সেন্সরশিপ হলো সেই ঝুঁকি যা অ্যালিসন এবং মুঙ্গাই উভয়ই তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির সময় মোকাবিলা করেছেন। প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে মুঙ্গাইকে স্ল্যাপ (স্ট্র্যাটেজিক ল’স্যুটস অ্যাগেইনস্ট পাবলিক পার্টিসিপেশন) মামলার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। স্ল্যাপ কখনো কখনো সাংবাদিকদের নীরব করতে প্রয়োগ করা হয়। মুঙ্গাই সেই সময়ের কথা মনে করে বলেন, “আমার মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো পাগল হয়ে যাব।”
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে ওই শিক্ষকের কাছে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে রাইট-অব-রিপ্লাই অনুরোধ পাঠিয়েছিলেন মুঙ্গাই। কিন্তু শিক্ষক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি আদালতে যান। মুঙ্গাইয়ের নামে স্ল্যাপ মামলা দায়ের করেন। প্রতিবেদন প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন। তবে, কয়েক মাস পর প্রতিবেদনটি প্রকাশের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। আদালতের এক রায়ে বিচারক প্রতিবেদনটিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন এবং জনস্বার্থে প্রকাশের পক্ষে সমর্থন জানান। অবশেষে প্রকাশের জন্য প্রস্তুত হয় সেই গল্পটি—যেখানে শিক্ষককে যৌন অনাচার, প্রলুব্ধকরণ এবং ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মুঙ্গাই বলেন, তিনি ভাবছিলেন প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি সাবেক শিক্ষার্থী মহল আর সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন দেখে অভিভূত হন। তিনি এটিকে তার ব্যাপক ও দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরিণতি বলে মনে করেন। গল্পের প্রথম পর্বটি ছিল ১৭ হাজার শব্দের, আর পরবর্তী অংশটি ৮ হাজারের।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ওই শিক্ষক সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, ইঙ্গিতপূর্ণ বা আবেগীয় আচরণ করেছেন, বা সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শারীরিক বা যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন—এমন সব অভিযোগ তিনি নাকচ করে দেন। এদিকে, স্কুল বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযোগগুলো তাদের ভাবমূর্তির প্রতি প্রচণ্ড আঘাত বলে উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয় এবং “কঠিন, দৃষ্টান্তমূলক এবং তাৎক্ষণিক” পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর জনসমর্থনের চাপের কারণে শিক্ষক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, কিন্তু অভিযোগগুলোকে “মিথ্যা” ও সাইবারবুলিং হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বিশ্বাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কখনো কখনো এমন হয়। সাংবাদিক হিসেবে আমরা যাকে নিয়ে অনুসন্ধানে নামি, তিনি হয়তো আমাদেরই খুব কাছের কেউ। অ্যালিসন এমনই এক জটিল ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। যেখানে একজন সাংবাদিক এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজেকে ক্যানসার রোগী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। মাথা কামিয়ে, নিজের নিয়োগকর্তা ও সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আদায় করেছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ। এআইজেসি সম্মেলনে সেই সাংবাদিকের বক্তব্য রাখার কথা ছিল। বিষয়—অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নৈতিকতা।
“আমি এই প্রতিবেদনটি নিয়ে কাজ করতে চাইনি। গল্পটি ভীষণ ব্যক্তিগত মনে হচ্ছিল। এতে এমন সাংবাদিকরা জড়িত ছিলেন, যাদের আমি চিনতাম ও সম্মান করতাম, এবং যারা কোনো না কোনোভাবে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন,” এআইজেসি দর্শকদের বলেন অ্যালিসন।
তার তখনকার সম্পাদক ছিলেন বিউরেগার্ড ট্রম্প—যিনি এখন এআইজেসির সমন্বয়ক। অ্যালিসনকে তিনি ডেকে বসিয়ে বলেছিলেন, “এই ধরনের গল্প নিয়ে কীভাবে কাজ করতে হয়, তা তোমাকে শিখতে হবে। কারণ অনেক সময় ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনার মানে হলো নিজের জীবনে যাদের ক্ষমতা তুমি চোখের সামনে দেখছ, তাদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানো।’”
অ্যালিসন বলেন, তাই—এ গল্পটি বলা খুব জরুরি ছিল।
অ্যালিসন আরো জানান, ওই সাংবাদিকের বাবা তাকে ফোনে ভয় দেখান, যিনি নিজেও একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক। তবে তার সম্পাদক ও বার্তাকক্ষের নিঃশর্ত সমর্থন পান অ্যালিসন। শেষ পর্যন্ত ওই সাংবাদিক স্বীকার করেন যে তিনি অসুস্থতার ভান করেছিলেন। এরপর এআইজেসি তাকে বক্তার তালিকা থেকে বাদ দেয়।

এআইজেসি সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন সাইমন অ্যালিসন, দ্য কন্টিনেন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা। ছবি: এআইজেসির সৌজন্য
উভয় আলোচকই একমত ছিলেন যে এই ধরনের গল্প কেউ একা বহন করতে পারে না। তারা জোর দিয়ে বলেন, সমর্থনই টিকে থাকার একটি উপায়। অ্যালিসন বিশেষভাবে তুলে ধরেন—সাংবাদিকদের এমন সহকর্মী ও সম্পাদক দরকার, যারা তাদের সঙ্গে আবেগ ও মানসিক চাপ ভাগাভাগি করে নিতে পারেন।
দর্শকদের মধ্যে যারা বলেছিলেন যে তারা তাদের বার্তাকক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন পাননি বা অবহেলিত বোধ করেছেন, তাদের উদ্দেশে লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী নানজালা নিয়াবোলা একটি বিশেষ সতর্কবার্তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সাংবাদিকদের জন্য সংহতিই হলো নিরাপত্তা।” বিশেষ করে ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করার সময় মানসিক সুস্থতার বিষয়টি মোটেও বিলাসিতা নয়। এটি বরং প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়ারই একটি অপরিহার্য অংশ।
এরপর অ্যালিসন সাংবাদিকতার সবচেয়ে মূল্যবান মূলধন ‘বিশ্বাস’ প্রসঙ্গে সবাইকে ফিরিয়ে আনেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সাংবাদিকতায় বিশ্বাস অপরিহার্য। মানুষ যদি আপনাকে বিশ্বাস না করে, আপনি এই কাজ করতে পারবেন না।”
আর কখনো কখনো সেই বিশ্বাস রক্ষা করতে গিয়ে এমন কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়, যেগুলো আপনি এড়িয়ে যেতে চাইতেন।
নাইপানোই লেপাপা কেনিয়ার নায়রোবি ভিত্তিক একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত ফ্রিল্যান্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক। ওপেন সোর্স ইনটেলিজেন্স এবং সহযোগিতামূলক আন্তসীমান্ত অনুসন্ধানের বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি মূলত মানবাধিকার, লিঙ্গ, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গল্প বলার প্রতি জোর দেন। ২০২২ সালে তাকে কেনিয়ার মিডিয়া কাউন্সিলের বার্ষিক সাংবাদিকতা উৎকর্ষতা পুরস্কারে (এজেইএ) “কেনিয়ার বছর সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিক” নির্বাচিত করা হয়। তিনি ২০২৩ সালে পুলিৎজার সেন্টারের এআই অ্যাকাউন্টিবিলিটি ফেলো ছিলেন।