ছবি: শাটারস্টক
কেউ যখন কোনো কিশোরের সঙ্গে কথা বলেন, বা নিজের কিশোর বয়সের কথা মনে করেন, তারা জানেন বয়ঃসন্ধির এই সময়টা কতটা চ্যালেঞ্জিং। এটি পরিবর্তন ও বিকাশের একটি সময়। যখন আমরা নিজেদের আবিষ্কার করতে শুরু করি—আসলে আমি কে। সেই যাত্রা অনেক সময় যন্ত্রণাদায়ক ও কঠিন হতে পারে।
অলাভজনক সংস্থার ক্ষেত্রে রূপান্তর প্রক্রিয়াটা অনেকটা তেমনই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তখন সংগঠনটি আসলে কীসের পক্ষে দাঁড়াবে, তার লক্ষ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা কী, এবং একটি নবীন স্টার্টআপ থেকে কীভাবে শক্ত ভিত তৈরি ও সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া যায়—এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলতে থাকে।
এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা যাই কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে অবস্থিত একটি ছোট অলাভজনক সংস্থা গ্লোবাল রিপোর্টিং সেন্টারে। যেভাবে বৈশ্বিক সাংবাদিকতা চর্চা করা হয়, তা বদলানোর আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম এই সংগঠনের।
দুজনই মূলধারার মিডিয়ায় দশকের পর দশক কাজ করেছি, এবং ভিন্ন পটভূমি থেকে এসেছি—ক্লেইন শরণার্থী পরিবারের সন্তান, আর ক্রসান বড় হয়েছেন তাঁর আদিবাসী দাদির কাছে।
ক্লেইন কয়েক দশক ধরে মূলধারার গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। তার রয়েছে বৈচিত্র্যময় অতীত। তিনি শরণার্থী দম্পতির সন্তান। আর ক্রসান বড় হয়েছেন তার কানাডিয় আদিবাসী (ফার্স্ট নেশনস) দাদীর কাছে। আমরা দেখেছি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এমন অনেক রীতি ও চর্চা বিদ্যমান, যেগুলো সমস্যা তৈরি করে। তাই তা পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
দূরবর্তী জায়গায় অল্প সময়ের জন্য গিয়ে কাজ করার বদলে আমরা প্রান্তিক সম্প্রদায়কে নিজের গল্প নিজে বলার এবং নিজের করে তোলার সক্ষমতা প্রদান করি। স্থানীয় সাংবাদিকদের ‘ফিক্সার’ হিসেবে প্রতিবেদন তৈরিতে ছোট আকারে যুক্ত করার বদলে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে প্রতিবেদকদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলে। কেবল মন্তব্যের জন্য বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়ার বদলে, শুরু থেকেই তাদের বার্তাকক্ষের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল দুইজন খন্ডকালীন কর্মীর হাত ধরে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার দায়িত্বের পাশাপাশি ক্লেইন তখন পার্শ্বপ্রকল্প হিসেবে এটি শুরু করেছিলেন। প্রায় এক দশক পরে, এখন আমাদের তিন জন পূর্ণকালীন এবং দুই জন খন্ডকালীন কর্মী রয়েছে। পুরস্কারজয়ী বেশকিছু প্রতিবেদন তৈরি আর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতেও সক্ষম হয়েছি আমরা। আমাদের দলটা ছোট। তাই এমন ছোট একটি দলের নিজের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি কিছু করার সীমাহীন চেষ্টাও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। একটি ছোট সংস্থার পক্ষে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গল্প উপস্থাপনের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পটভূমি ও দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করাও কঠিন। গ্লোবাল রিপোর্টিং সেন্টার (জিআরসি সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক আকার পেয়েছে। তবে আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, এর টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা যদি থেকে থাকে—অর্থাৎ “কৈশোর” থেকে “যৌবনে” পদার্পণ করতে হয়—তবে আমাদের আরও বিকশিত হওয়া বা বড় হওয়া প্রয়োজন।
সাংবাদিকতা বিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। বড় বড় সংস্থাগুলো সাংবাদিকতায় অর্থায়ন কমিয়ে দিচ্ছে। বছরের পর বছর সংকটকালীন তহবিল সংগ্রহের ফলে দাতাদের মধ্যেও এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়েছে। নতুন চাপের সৃষ্টি করছে জনহিতকর কাজের রাজনীতিকরণ। এর সঙ্গে, স্বতন্ত্র ও উদ্ভাবনী সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যে কোনো সময়ে চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আমরা এমন সব প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি, অনেক অলাভজনক সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠানও এ সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে: একটি প্রতিষ্ঠানের আদর্শ আকার বা পরিধি কতটা হওয়া উচিত, আর আমরাই বা কীভাবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাব?
সফল মডেলের সন্ধানে
লাভজনক ব্যবসায়িক স্টার্টআপ জগতে দেখা যায়, নতুন গড়ে ওঠা অনেক প্রতিষ্ঠান শুরুতেই বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সহায়তা পায়। সেই সহায়তার ওপর ভর করে কিছু প্রতিষ্ঠান সফলভাবে এগিয়ে যায়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না। অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে ভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা ও সাফল্যের মানদণ্ডে। তবু স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—কীভাবে কোনো সংগঠন ধীরে ধীরে বড় করা যায় এবং শুরুর দিকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।
“আমি সবসময় বিশ্বাস করি জনহিতকর বা দাতব্য কাজেও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা প্রয়োজন,” বলেন ফ্রাঙ্ক জিউস্ট্রা। তিনি লায়ন্সগেট এন্টারটেইনমেন্টের মতো লাভজনক উদ্যোগের পাশাপাশি সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ পার্টনারশিপের মতো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানেরও প্রতিষ্ঠাতা। সম্প্রতি জিআরসির দাতা হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “আপনাকে অবশ্যই কাজের ফলাফল দেখাতে হবে এবং সেই ফলাফল মূল্যায়নের পথ খুঁজে বের করতে হবে।”
কিন্তু অলাভজনক পরিবেশে কাজের উদ্দেশ্য ও তার ফলাফল প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা হয়ে থাকে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিষয়ক অধ্যাপক পল কুবনস। তিনি বলেন “লাভজনক প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক মুনাফা। আর অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিষ্ঠানটি তার লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করছে কি না এবং সেই কাজের বাস্তব প্রভাব কী।”
অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে “বিনিয়োগকারী শব্দটি ব্যবহার করাটা আসলে ঠিক নয়,” ব্যাখ্যা করেন আইন ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক অলিভার হ্যামিল্টন। তিনি যোগ করেন, “বিনিয়োগ বলতে এমন কিছু বোঝায়, যার বিপরীতে আপনি সরাসরি কোনো আর্থিক বা দৃশ্যমান প্রতিদান পাবেন। অনুদানের ধারণা এর ঠিক বিপরীত।”
এ কারণেই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়—কীভাবে সাফল্য দেখানো যাবে এবং সমর্থকদের আস্থা ও সহায়তা অর্জন করা যাবে। এ বিষয়ে আমাদের বারবার বলা হয়েছে, আসল পার্থক্য গড়ে দেন যারা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন, সেই মানুষগুলোই।
“প্রতিষ্ঠানটি কে পরিচালনা করছেন এবং তিনি বা তারা বাস্তবে কিছু করে দেখাতে কতটা সক্ষম— আমি সব সময় এখান থেকেই শুরু করি” বলেন জিউস্ত্রা।
কুবনসও এতে একমত হন। তিনি বলেন, “ফান্ডরেইজিং সম্পর্কে আমি যা কিছু শিখেছি—তা অলাভজনক হোক বা লাভজনক—সবকিছুর ভিত্তিই হলো সম্পর্ক গড়ে তোলা।”
ছোট কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় শুরু করার সুযোগ পাওয়া। অনেক ক্ষেত্রেই দাতারা সেই বড় ও প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোতেই অর্থ দেন, যাদের সঙ্গে তাদের আগে থেকেই দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বাড়তে থাকা রাজনৈতিক বিভাজনের এই সময়ে হাতেগোনা কিছু সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠানের হাতেই অনুদান আসছে। বিশেষ করে যাদের রয়েছে পর্যাপ্ত কর্মী এবং দেয়ালে ঝুলানো অসংখ্য পুরস্কার। মূলত তারাই প্রথাগত দাতাদের সিংহভাগ সহায়তা বা অনুদানগুলো পাচ্ছে।
“দাতব্য বা জনহিতকর কাজ নিয়ে আমার হতাশার একটি কারণ হলো ‘আপনার কাজের গুরুত্ব প্রমাণ করুন, আপনার যোগ্যতা প্রমাণ করুন’—এভাবে শর্ত জুড়ে দেওয়া। আপনি পরবর্তী পর্যায়ের অর্থায়নের জন্য প্রস্তুত কি না, তা যাচাই করতে আমরা এই প্রতিবন্ধকতা বা লিটমাস টেস্টের (গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা) মুখোমুখি দাঁড় করাই,” বলেন টেক্সাসভিত্তিক ছোট পারিবারিক ফাউন্ডেশন স্টারডাস্ট ফান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লাওয়ানা কিমব্রো, যারা অতীতে জিআরসিকে সহায়তা করেছে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর, প্যারিস থেকে রিপোর্ট করছেন জিআরসির নির্বাহী পরিচালক আন্দ্রিয়া ক্রসান। ছবি: গ্লোবাল রিপোর্টিং সেন্টারের সৌজন্যে
তিনি যুক্তি দেন যে, এটি কেবল বিদ্যমান অচলাবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে। এর ফলে যারা নতুন কিছু করার চেষ্টা করছেন অথবা ঐতিহ্যগতভাবে অবহেলিত, প্রান্তিক কিংবা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে যে সংস্থাগুলো পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে সহায়তার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
“আরেকটি সমস্যার বিষয় হলো—অর্থ থেকে অর্থ তৈরি হয়। লোকেদের কাছে বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, কোনো প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মকর্তা বা অনুদান লেখক রাখার সামর্থ্য আছে কি না। কাজটির কার্যকারিতা আদতে কতটুকু সেটি তারা সেভাবে দেখে না। আমরা মানুষকে পর্যাপ্ত পুঁজি দিই না, উল্টো তাদের তহবিলের ক্ষুদ্র আকারকে অর্থ না দেওয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করি।” উল্লেখ করেন তিনি।
আমাদের প্রতিষ্ঠানে তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সফলতা এসেছে ছোট পরিবারভিত্তিক ফাউন্ডেশন এবং ব্যক্তিগত দাতাদের মাধ্যমে। যারা প্রায়ই ঝুঁকি নিতে সদা প্রস্তুত এবং সক্ষম।
একাডেমিক সংস্থার মতো অপ্রচলিত সমর্থকদের মাধ্যমে আমরা আমাদের অর্থায়নকে আরো বৈচিত্র্যপূর্ণ করেছি। যেমন ২০১৮ সালে সোশ্যাল সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ রিসার্চ কাউন্সিল (এসএসএইচআরসি) থেকে প্রাপ্ত ২৫ লাখ মার্কিন ডলারের একটি অনুদান আমাদের সাপ্লাই চেইন রিপোর্টিং উদ্যোগটি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। আমরা এই অর্থায়নকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ফাউন্ডেশন থেকে সমপরিমাণ বা পরিপূরক সহায়তা নিশ্চিত করেছি।
ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশনের সাংবাদিকতা প্রোগ্রামের প্রধান ক্যাথি ইম সংস্থাগুলোকে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় এবং সুযোগ দেওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করেন। আমেরিকান প্রেস ইনস্টিটিউটের জন্য যৌথভাবে লেখা একটি প্রবন্ধে তিনি সাংবাদিকতা বিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ করে যারা নতুন শুরু করছে, তাদের জন্য কোনো শর্ত ছাড়াই অর্থায়নের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
তিনি ইউসি বার্কলে ভিত্তিক ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং প্রোগ্রামের উদাহরণ তুলে ধরেন। যাদের কাছে কৃষি শ্রমিকদের ওপর চালানো যৌন নির্যাতনের একটি গোপন তথ্য ছিল। কিন্তু এই অনুসন্ধানটিকে চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না। ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশন যখন এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য শর্তহীনভাবে ২৫ লক্ষ মার্কিন ডলার অনুদান দেয়, তখন ওই অর্থের একটি ছোট অংশ অনুসন্ধানের কাজে ব্যবহার করা হয়। এভাবে নির্মিত হয় ফ্রন্টলাইনের তথ্যচিত্রটি— যা পুরস্কার জয়ের পাশাপাশি নীতি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। ক্যাথি ইম লিখেছিলেন, “এই তহবিল ছাড়া, তারা এই গল্পটি অনুসরণ করতে সক্ষম হতেন না। কয়েক দশকের কৃষি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো আজও পর্দার আড়ালে অধরাই থেকে যেতো।”
শর্তহীন অর্থায়নের শক্তি সবচেয়ে জোরালো হয় তখনই, যখন তা সত্যিকারের নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। মুনাফা এবং প্রচারসংখ্যার চাপ ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতা করার একটি বড় সুবিধা হলো নতুন বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ। এর একটি উদাহরণ হলো সাংবাদিকতার এমন একটি পদ্ধতি যাকে আমরা বলছি “এমপাওয়ারমেন্ট জার্নালিজম” বা সাংবাদিকতার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন। যেখানে আমরা গল্পের মূল চরিত্রের হাতেই গল্পটি বলার ক্ষমতা তুলে দিই।
এটি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার যে প্রচলিত সংবাদিকতা কাঠামো, তা থেকে আলাদা। তবে ওই প্রচলিত নিয়মগুলোর কারণেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রায়ই ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়, অথবা পুরোপুরি উপেক্ষিত থেকে যায়।
আমরা এই নতুন মডেলটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ক্রাউডফান্ডিং এবং একাডেমিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি। এর মাধ্যমে আমরা পিবিএস নিউজআওয়ার-এর জন্য আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোতে অ্যালকোহলের ব্যবহার, আসক্তি এবং তা থেকে মুক্তি নিয়ে ‘টার্নিং পয়েন্টস’ নামে আট পর্বের ধারাবাহিক তৈরি করেছি। এই সিরিজে আদিবাসী গল্পকাররা নিজেরাই তাদের সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্রগুলো পরিচালনা করেছেন। সিরিজটি বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি ক্ষেত্রে উৎকর্ষতার জন্য জাতীয় স্বীকৃতি হিসেবে ‘এডওয়ার্ড আর. মারো অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে।

ছবি: জিআরসির পুরস্কারপ্রাপ্ত আট পর্বের সিরিজ টার্নিং পয়েন্টস-এর জন্য কানাডার ইয়েলোনাইফে মাঠপর্যায়ে রিপোর্ট করছেন একাডেমিক ডিরেক্টর পিটার ক্লেইন। ছবি: গ্লোবাল রিপোর্টিং সেন্টারের সৌজন্য।
এই ধরনের উদ্ভাবনের জন্য সংস্থানের (রিসোর্স) প্রয়োজন— শুধুমাত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্যই নয়, বরং ঝুঁকি নেওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরির জন্যও এটি জরুরি। আমাদের কাছে প্রবৃদ্ধি মানে কোনো সাম্রাজ্য বিস্তার নয়; বরং এর অর্থ হলো গুণমান বজায় রেখে বড় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত কর্মী থাকা এবং বিশ্বজনীন গল্পগুলো তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট বৈচিত্র্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ধারন করা।
নতুন নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি, তা শেষ পর্যন্ত অর্থদাতাদের কাছে আমাদের বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিতে এবং আমাদের লক্ষ্য আরও সুনির্দিষ্ট করতে সাহায্য করেছে। শুরুর দিকে (স্টার্টআপ অবস্থায়) সংস্থাগুলো সাধারণত হাতে আসা যেকোনো প্রকল্প বা তহবিল গ্রহণ করার প্রবণতা দেখায়। এর ফলে এরই মধ্যেই চাপে থাকা কর্মীদের ওপর কাজের বোঝা আরও বেড়ে যেতে পারে এবং সংস্থার মূল লক্ষ্য আরো অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। আমাদের শুরুর বছরগুলোতে আমরাও নিশ্চিতভাবে এই ভুলটি করেছি। তবে অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে এখন আমরা অনেক প্রকল্পকে না বলতে শুরু করেছি। এমনকি দীর্ঘ শর্তযুক্ত ছোট অনুদানগুলোও আমরা ফিরিয়ে দিচ্ছি— যদি সেগুলো আমাদের মূল উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়।
কৈশোর পেরিয়ে বেড়ে ওঠার ধাপগুলো আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। প্রথমত, টেকসই প্রবৃদ্ধি মানে ভিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া নয়—বরং নিজের লক্ষ্য পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ থাকা। দ্বিতীয়ত, ভেঞ্চার ফিলানথ্রোপিস্ট ( এমন দাতা বা দাতা প্রতিষ্ঠান, যারা দান করার সময় ব্যবসায়িক বা স্টার্টআপের মতো চিন্তা করেন), পরিবারভিত্তিক ফাউন্ডেশন এবং একাডেমিক অনুদানের মতো অপ্রচলিত উৎস থেকে বৈচিত্র্যপূর্ণ অর্থায়ন এমন নমনীয়তা দেয়, যা ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক বড় ফাউন্ডেশনগুলো দিতে পারে না। আর তৃতীয়ত, সঠিক সুযোগকে হ্যাঁ বলা যেমন জরুরি, তেমন লক্ষ্য ও মূল্যবোধের সঙ্গে না মেলা সুযোগগুলোকে না বলাটা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের সাংবাদিকতাভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কঠিন এক পরিবেশে একই ধরনের বেড়ে ওঠার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তবে যারা নতুন কিছু পরীক্ষা করতে প্রস্তুত, বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে অর্থায়নের সম্পর্ক গড়ে তোলে, এবং বড় হতে গিয়েও নিজেদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে যায় না—যেসব প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে ও এগিয়ে যাবে।
বয়ঃসন্ধির সময় কিছুটা অস্বস্তিকর—কিন্তু এই সময়টাতেই আমরা আমাদের প্রকৃত সক্ষমতাগুলো আবিষ্কার করি।
পিটার ক্লেইন গ্লোবাল রিপোর্টিং সেন্টার (জিআরসি)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও একাডেমিক পরিচালক। তিনি আগে ৬০ মিনিটস–এর প্রযোজক এবং এনবিসি নিউজের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন।
আন্দ্রিয়া ক্রসান জিআরসি–রনির্বাহীপরিচালক। তিনি আগে পাবলিক রেডিও অনুষ্ঠান দ্য ওয়ার্ল্ড–এর নির্বাহী প্রযোজক ছিলেন।