এআইজেসির জন্য ছবিটি তুলেছেন লিওন সাদিকি
এখন এমন এক সময়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যেখানে সমাজ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো সম্পাদনা করতে গিয়ে একজন সম্পাদক সংবাদের প্রভাব তৈরি বা নষ্ট—দু’টোর যেকোনো একটি করতে পারেন। জটিল বিষয়কে সহজ করা থেকে শুরু করে তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত, ভালো সম্পাদনা শক্তিশালী রিপোর্টিংকে প্রভাবশালী সাংবাদিকতায় রূপ দেয়।
নভেম্বরে অনুষ্ঠিত আফ্রিকান ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্স (এআইজেসি)-এর ২১তম আসরে, আফ্রিকা আনসেন্সর্ড-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এরিক মুগেন্দির সঞ্চালনায় আয়োজিত সেশনে এই বিষয়ে কথা বলেন তিনজন শীর্ষস্থানীয় অনুসন্ধানী সম্পাদক। একে একে তারা তুলে ধরেন কীভাবে সাংবাদিক ও সম্পাদকরা একসঙ্গে কাজ করে এমন প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেন, যা শুধু অনিয়ম উন্মোচনই করে না, বাস্তব পরিবর্তনও ঘটায়।
অনুসন্ধানী প্রস্তাবনাকে জোরালো করা
প্রতিবেদন পরিকল্পনা বা প্রস্তাবনার (পিচ) ধাপেই সম্পাদকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। যেমন, অস্পষ্ট ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঘিরে প্রশ্ন করে এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ব্যবহার নিশ্চিতে জোর দিয়ে। শুরুতেই এমন আলোচনা সাধারণ বিষয়কে সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানী পরিকল্পনায় রূপান্তর করতে সাহায্য করে। যা পরে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের ধাপে এসেও ঠিকঠাকভাবে উতরে যায়।
অনুসন্ধানী সম্পাদক ড্যানিল ক্নোয়েটজে একাধারে সাংবাদিকতায় জবাবদিহি সংক্রান্ত প্রজেক্ট ভিউফাইন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। তিনি মনে করেন, প্রতিবেদন প্রস্তাবনার (পিচ) ধাপে সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হলো সাংবাদিকরা বিস্তারিত পটভূমি ও প্রসঙ্গ তুলে ধরেন, কিন্তু স্পষ্টভাবে বলতে পারেন না যে তারা ঠিক কোন অভিযোগ প্রমাণ করতে চাইছেন বা কোন লক্ষ্য (ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে) ঘিরে অনুসন্ধান চালাবেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, অনেক পিচ বর্ণনামূলকভাবে সমৃদ্ধ হলেও অনিয়ম প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সূত্র বা তথ্যের ঘাটতি থাকে।
তার মতে, সম্পাদকরা সাংবাদিকদের উৎসাহিত করতে পারেন প্রতিটি পিচকে এমনভাবে সাজাতে যেন তা একটি ফৌজদারি মামলার ঘটনার মতো মনে হয়। যেখানে সম্ভাব্য অপরাধ, সন্দেহভাজন এবং তথ্য হাতে রয়েছে বা সংগ্রহ করা সম্ভব বলে প্রতীয়মান হবে। প্রস্তাবনা যত স্পষ্ট হয়, তা পরীক্ষা ও পরিমার্জন করা তত সহজ হয়।
তিনি বলেন, “অবৈধ খনি থেকে কারা উপকৃত হচ্ছে—এ ধরনের অনুমানমূলক ধারণা নিয়ে আসবেন না। ব্যক্তি নিজে ওই ঘটনা দেখেছে— এমন সবচেয়ে কাছের প্রমাণ আনুন। সামান্য হলেও পরে যার আরো গভীরে যাওয়া সম্ভব হবে। সম্পাদকদের কাজ হলো সাংবাদিকদের একটি বিস্তারিত ধারণার সূত্র ধরে নির্দিষ্ট ও শনাক্তযোগ্য প্রস্তাবনায় রূপান্তর করতে সাহায্য করা, যে ঘটনার প্রয়োজনীয় সূত্র এরই মধ্যে হাতে রয়েছে।”
ক্নোয়েটজে উল্লেখ করেন, প্রয়োজনীয় সূত্রের তথ্য প্রায়ই পিচের মধ্যে লুকানো থাকে বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে। সম্পাদকদের কাজ হলো ওই প্রমাণগুলো যাচাই করা এবং দেখা যে, ঠিক কি পরিমাণ ন্যূনতম তথ্য প্রমাণ আছে যা অনুসন্ধান চালানোর জন্য যথেষ্ট। কেবল তখনই একটি বার্তাকক্ষের দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানের জন্য সময় ও সম্পদ ব্যয় করা উচিৎ।

এআইজেসির জন্য ছবিটি তুলেছেন লিওন সাদিকি
ঘটনা তৈরি করা
একবার পিচ অনুমোদিত হলে, শুরু হয় সত্যিকারের অনুসন্ধানী কাজ। কিন্তু ক্নোয়েটজে জানিয়েছেন, অনেক সাংবাদিক ঠিক এই সময়ে মনোযোগ হারান। তিনি বলেন, বিভিন্ন গবেষণা, একাডেমিক পাঠের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের চিন্তাধারা ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে—যা গল্পের মূল অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। সাংবাদিকদের তিনি তাই একাডেমিক বিষয় থেকে দূরে থাকা, বিপরীতে বাস্তব-জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, “মানুষ মনে করে তাদের হাতে সীমাহীন সময় আছে। তাই তারা অনেক আনুষাঙ্গিক গবেষণা ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শুরু করে। কিন্তু তারা আসল সূত্রের মূল্য বোঝে না, যারা আপনাকে প্রকৃত ঘটনা আর সত্যিকারের তথ্যসমৃদ্ধ পরিণতির কাছাকাছি নিয়ে যায়।”
সাংবাদিকরা যেন সংগৃহীত তথ্যের ভিড়ে হারিয়ে না যায় সেজন্য ক্নোয়েটজে বলেন, সম্পাদকদের নিয়মিত যোগাযোগ করে তাদের আবার মূল বিষয়বস্তুর দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সুস্পষ্ট অভিযোগ কী? কী নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে? হাতে থাকা প্রমাণের ভিত্তিতে গল্পটি এখন ঠিক কী পর্যায়ে আছে?
প্রতিবেদনটি এই সপ্তাহে প্রধান পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে—তিনি সাংবাদিকদের এমনটা কল্পনা করতে পরামর্শ দেন। সেক্ষেত্রে বর্তমানে হাতে থাকা তথ্য দিয়ে এটি কেমনভাবে উপস্থাপিত হবে? আর যদি রিপোর্টিং দলের হাতে আরও কয়েক সপ্তাহের সময় থাকে, তাহলে প্রতিবেদনটির চূড়ান্ত সংস্করণ কেমন হতে পারে? এবং এই সময়সীমার মধ্যে সূত্রের মাধ্যমে বাস্তবে কতটা তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে?
অন্ধ বিন্দুগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা
সাংবাদিকদের অন্ধ বিন্দুগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বড় পরিসরে চিন্তার প্রেরণা যোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন একজন সম্পাদক। যেমন কঠিন প্রশ্ন করা, তথ্য যাচাই করা, এবং ভারসাম্য ও ন্যায্যতা নিয়ে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনাতে উৎসাহিত করা। লক্ষ্য হলো গল্পটিকে আরও পূর্ণাঙ্গ, সঠিক ও প্রভাবশালী করা।
ডারবান, জোহানেসবার্গ এবং নাইরোবির বার্তাকক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান সাংবাদিক ইডা জোস্টে। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, গল্প লেখার সময় ধরে নিতে হবে যেন কেউই আপনার কথা বিশ্বাস করছে না। এমন ভাবতে হবে যে, আপনি যা বের করেছেন, সেটা সত্য বলে শুধু আপনার মা, দাদি আর সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিই বিশ্বাস করছে।
তিনি বলেন, সম্পাদকদের কাজ হলো সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহে সাহায্য করা। আর গল্পটি এমনভাবে লিখতে হবে, এমন প্রমাণ ও তথ্য দিতে হবে, যেন সবচেয়ে সন্দেহপ্রবণ মানুষও পড়ার পর বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়।
বড় প্রেক্ষাপট ও প্রভাব মাথায় রেখে সম্পাদনা করা

এআইজেসির জন্য ছবিটি তুলেছেন লিওন সাদিকি
প্রতিবেদনটি লেখার পর্যায়ে আসতে আসতে সাংবাদিকরা অনেক সময় তাদের সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে এতটাই মিশে যান যে, কোনটি আসলেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তা চোখ এড়িয়ে যায়। ভিউফাইন্ডারের পরিচালক ক্নোয়েটজে বলেন, এই অতিরিক্ত সম্পৃক্ততার ফলে সাংবাদিকরা প্রায়ই মূল বিষয়টি আড়ালে ফেলে দেন। কারণ তারা দীর্ঘ সময় ধরে গল্পটির সঙ্গে বসবাস করেছেন।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, “সাংবাদিকরা গল্পটির খুব কাছাকাছি , এক ধরনের বুদ্বুদের ভেতরে থাকেন।” ফলে তারা সংগ্রহ করা নানা তথ্য-প্রমাণের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে পড়েন যে “গাছের ভিড়ে আসল বনটাই আর দেখতে পান না।”
ক্নোয়েটজে যোগ করেন, এই ধাপে সম্পাদকদের কাজ হলো রিপোর্টিংয়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো তুলে ধরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য সূত্র, নতুন আবিষ্কার এবং সবচেয়ে গুরুতর তথ্যগুলোকে সামনে আনা। যাতে পাঠক সেগুলো সহজেই বুঝতে পারে।
উয়েস্তাফ নিউজের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান সম্পাদক এবং ফ্রান্সফোন আফ্রিকার একজন শীর্ষস্থানীয় অনুসন্ধানী সাংবাদিক হামাদু তিদিয়ানে সাই। দুই বছর ছয় মাস ধরে তিনি যে অনুসন্ধানটি নিয়ে কাজ করেছিলেন সে সম্পর্কে বলেন, তার প্রথম খসড়াটি ছিল ৪ হাজার ৫০০ শব্দের। সম্পাদকরা এটি অর্ধেকের বেশি কমানোর পরামর্শ দেন, যা তিনি প্রথমে মেনে নেননি। পরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ২ হাজার শব্দের সংক্ষিপ্ত সংস্করণটি অনেক বেশি পাঠযোগ্য এবং অনুসন্ধানের মানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এতে প্রতিবেদনটি আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, “প্রতিটি বাক্য ও শব্দকে প্রভাবশালী হতে হবে। যদি না হয়, তবে সংক্ষিপ্ত করে মূল প্রভাব বাড়ানোই ভালো।”
ক্নোয়েটজে যোগ করেন, পাঠককের কথা মনে রেখে গল্প বলাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠকের কিন্তু প্রেক্ষাপট, পূর্বজ্ঞান বা তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ার সঙ্গে আবেগগত কোনো সংযোগ নেই। তাই সম্পাদকদের দায়িত্ব হচ্ছে প্রতিবেদনকে সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে সাজানো। যাতে পাঠক প্রতিটি অনুচ্ছেদ সহজে বুঝতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত পড়া বা দেখার আগ্রহ ধরে রাখতে পারে।
তার মতে, কার্যকর কাঠামোর জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন। গল্পের উদ্দেশ্য শুরু থেকেই স্পষ্ট করা উচিত। আর তা এমনভাবে হওয়া উচিত যা দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে। যেমন হতে পারে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে প্ররোচিত করা,আইনজীবিদের মামলা গ্রহণে সহায়তা করা, বা নাগরিক সমাজের সামনে এমন সব তথ্য-প্রমাণ হাজির করা যা তাদের কাজ ও প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করে।
সম্পাদনা অনুসন্ধানকে শক্তিশালী করে
একজন সম্পাদক হিসেবে সাই বছরের পর বছর সাংবাদিকদের দিকনির্দেশনা দান, গল্পের কাঠামো নির্মাণ এবং নির্ভুল ও বর্ণনার ভারসাম্য বজায় রাখতে কাজ করেছেন। পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের নেটওয়ার্ক সেনোজো-তে কাজের সময় থেকে শুরু করে নিজের বার্তাকক্ষ পর্যন্ত, সাই সম্পাদনার জটিলতাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সাংবাদিকতা বিষয়ক অসংখ্য পুরস্কারের বিচারক হিসেবেও কাজ করেছেন।
সেনেগাল থেকে আগত সাই বলেন, “কোনো সাংবাদিক যখন প্রথমবার প্রতিবেদন তৈরি করে, বেশিরভাগ সময় সে তখন নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করতে থাকে। সম্পাদকের কাছে জমা দেওয়াটাও একটি আনন্দময় মুহূর্ত। সাংবাদিকরা মনে করে তারা সবকিছু ঠিকঠাকভাবে শেষ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন, সংশোধনী এবং পুনঃলিখনের অনুরোধসহ লেখাটি প্রায়ই তাদের কাছে ফিরে আসে।”
তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রক্রিয়া কঠোর হলেও এটি সম্পাদকীয় কাজের একটি অপরিহার্য অংশ। “আপনাকে যখন বলা হয় আপনি গল্পের সম্পাদক, তখন আপনি দায়িত্ব বোধ করেন।” এ কথার সঙ্গে সাই যোগ করেন, “তাই গল্পে যদি ত্রুটি থাকে, অস্পষ্ট লাগে বা বিভ্রান্তিকর মনে হয়, তার দায় আমি বহন করি।”
তিনি উল্লেখ করেন, পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেক গল্পই এই অদৃশ্য পরিশ্রমের ফল। সম্পাদকরা গল্পের কাঠামো গড়ে তোলেন, লেখা পরিমার্জন করেন এবং প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করেন, যদিও স্বীকৃতি অন্যত্র চলে যায়। আর তাই সম্পাদনা হলো একদিকে দক্ষতা, অন্যদিকে দায়বদ্ধতা।
এ পর্যায়ে তিনি বলেন, “সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো বর্ণনা ও শৈলী। একজন সম্পাদককে সবকিছু দেখতেই হয়। এটি শুধু পড়া আর কয়েকটি টাইপো ঠিক করার কাজ নয়।”
এমন ভাবে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করুন যেন আপনার গল্প প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারে

এআইজেসিতে একটি সেশনে ড্যানিল ক্নোয়েটজে (দাঁড়িয়ে)। তিনি অনুসন্ধানী সম্পাদক এবং অ্যাকাউন্টেবিলিটি জার্নালিজম প্রজেক্ট ভিউফাইন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। ছবি: লিওন সাদিকি, এআইজেসি।
একদম শেষ লাইন পর্যন্ত প্রতিটি বাক্য ধরে ধরে সম্পাদনা ও তথ্য যাচাইয়ের ওপর জোর দেন ক্নোয়েটজে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, তাই কোনো অনুমানই প্রশ্নহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রতিবেদনের প্রতিটি বাক্যই প্রমাণভিত্তিক হতে হবে—বিশেষ করে যখন সেই প্রতিবেদন তীব্র প্রতিক্রিয়া বা আইনি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এই চূড়ান্ত ধাপই নিশ্চিত করে যে প্রতিবেদনটি সংশয়, বিরোধিতা এবং জনসমালোচনার মুখেও দৃঢ়ভাবে টিকে থাকতে পারবে।
গল্পটি কেউ বিশ্বাস করবে না—এই ভাবনা থেকে কাজ শুরু করে সব ধরনের সন্দেহ মোকাবিলা করতে হবে। যেকোনো অনুমান ভুল হতে পারে—এই মানসিকতা ধরে রেখে সম্পাদনা করলে রিপোর্টার ও সম্পাদকরা অনুসন্ধানকে আরও শক্তিশালী করতে পারেন। ন্যায্যতা বজায় রাখতে পারেন। পাশাপাশি এমন প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেন যা দৃঢ়তার সঙ্গে টিকে থেকে বাস্তবে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।
মাঠপর্যায়ের চাপ
অন্যান্য ধরনের প্রতিবেদনের তুলনায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বেশি সময়, মনোযোগ এবং নিবিড় সম্পাদনার প্রয়োজন হয়। ফলে প্রয়োজনীয় সমর্থনের যোগান দেওয়াটা প্রায়ই একটি স্থায়ী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ছোট আকারের বার্তাকক্ষগুলোতে প্রতিটি প্রতিবেদনের জন্য পর্যাপ্ত সম্পাদনা সহায়তা নিশ্চিত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এর কারণে প্রতিবেদনটি প্রকাশে দেরি হতে পারে। কারণ সম্পাদনা প্রক্রিয়াটি যতটা সম্ভব গভীর ও সতর্ক হওয়া জরুরি।
“আপনি হয় প্রতিটি গল্পে অনেক সময় ও শক্তি ব্যয় করবেন, যার মানে মোট গল্পের সংখ্যা কমবে, অথবা আরও মানুষ নিয়োগ করবেন, কিন্তু তখন তহবিল কোথা থেকে আসবে?”—বলেন সাই।
এই সমস্যা কাটানোর একটি উপায় হলো সহযোগিতামূলক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। তাই গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বার্তাকক্ষ একসঙ্গে কাজ করছে। যদিও এক্ষেত্রে সম্পাদনার নিজস্ব চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড ও শৈলী থাকে, যা প্রকাশনার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। সাই এমন একটি ঘটনার জের টেনে বলেন, একবার তিনি এই ধরনের একটি প্রতিবেদন দেখেছিলেন। অংশীদার সম্পাদক যেটি অনুমোদন করেছেন, কিন্তু প্রকাশের যোগ্য ছিল না। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, এই ভিন্নতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হওয়া, বিচার, সমঝোতা এবং সুবিধার চেয়ে মানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাহস থাকা প্রয়োজন।
“অসামঞ্জস্যপূর্ণ মান, বিশেষ করে সহযোগিতামূলক প্রকল্পে, সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। একটি দল তাদের মানদণ্ড নিয়ে আসে, অন্য দলটি নিজেদের। চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে দুটিকে কীভাবে মেলাবেন যাতে একটি শক্তিশালী, প্রকাশযোগ্য গল্প তৈরি করা যায়?”— বলেন তিনি।
সম্পাদনা গুণগত মানের পরিমাপক
সাইয়ের মতে, কোনো প্রতিবেদনের গুণগত মানের প্রকৃত পরীক্ষা হলো—শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তা পাঠককে ধরে রাখতে পারে কি না। সাংবাদিকতা পুরস্কারের জন্য লেখা মূল্যায়নের সময় তিনি সহকর্মীদের জিজ্ঞেস করেন, বিচারক হিসেবে নয়, সাধারণ পাঠক হিসেবে হলে তারা কি প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত পড়তেন। অনেক প্রতিবেদন তথ্যগতভাবে সঠিক ও কারিগরি দিক থেকে শক্তিশালী হলেও পাঠককে আকৃষ্ট করতে না পারায় জন্য ব্যর্থ হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে একই সঙ্গে নির্ভুল ও আকর্ষণীয় হতে হবে। ডেটা, তথ্য ও প্রমাণ অপরিহার্য, কিন্তু গল্প বলার দক্ষতাই প্রতিবেদনকে প্রাণ দেয় এবং তার প্রভাব ও পরিধি বাড়িয়ে তোলে।
তিনি স্বীকার করেন, এই স্টোরিটেলিংকে মাথায় রেখে সম্পাদনা করাটা মূলত একইসঙ্গে শিল্প ও বিজ্ঞান। এতে ধৈর্য, অন্তর্দৃষ্টি এবং পাঠকের প্রতি ধারাবাহিক মনোযোগ প্রয়োজন। এর লক্ষ্য হলো এমন এক বয়ান তৈরি করা, যা সত্যনিষ্ঠ ও মানবিক, নির্ভুল ও পাঠযোগ্য। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘস্থায়ী।
“আমি যখন কোনো পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন পাই, আগে প্রথম দুইটি অনুচ্ছেদ পড়ি, তারপর ঠিক করি পড়া চালিয়ে যাব কি না,” তিনি বলেন। “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা মূলত তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর অনেক সময় সেই তথ্যগুলো নীরস হতে পারে। কিন্তু সেগুলোকে কীভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়? কীভাবে এটিকে এমন একটি গল্প বানানো যায়, যা সবাই পড়তে চায়? সংখ্যা আছে, তথ্য আছে, ডেটা আছে—সবই নির্ভুল, সবই চমৎকার। কিন্তু পড়তে ভালো না হলে কেউই শেষ পর্যন্ত পড়বে না।”
আবদুলরশিদ হাম্মাদ একজন নাইজেরিয়াভিত্তিক আইনজীবী এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি বিজ্ঞান, জলবায়ু পরিবর্তন, জবাবদিহি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ডেটা–ভিত্তিক শাসন নিয়ে প্রতিবেদন করেন। তার কাজ প্রকাশিত হয়েছে দ্য ক্যাবল, হিউমঅ্যাঙ্গেল, মাইনরিটি আফ্রিকা, এল পাইস, দ্য কনটিনেন্ট এবং ডেটাপাইটে। তিনি আফ্রিকা সায়েন্স জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড জয়ী। ২০২৫ সালের ডায়মন্ড অ্যাওয়ার্ডস ফর মিডিয়া এক্সেলেন্সে সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। একই বছর থমসন ফাউন্ডেশন ইয়াং জার্নালিস্ট অ্যাওয়ার্ডের চূড়ান্ত তালিকায় ছিলেন।