নিখোঁজের খোঁজে: গুম, অপহরণ ও হারিয়ে যাওয়া মানুষ নিয়ে অনুসন্ধানের গাইড

English

নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্মরণ করার জন্য কোনো সমাধিস্থলেও যেতে পারেন না তার পরিবার-বন্ধুবান্ধব। তাই ফিলিপাইনে এমন নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্মরণ করা হয়েছে অল সোল’স ডে পালনের মধ্য দিয়ে। ছবি: মারিয়া তান / র‌্যাপলার

এই বিশ্বে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান। ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন মিসিং পিপল বলছে, এসব ঘটনার বেশিরভাগের সাথেই জড়িয়ে আছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। বিশেষ করে, মাদক পাচার।  এছাড়াও বন্যপ্রাণী চোরাচালান, মানব পাচার, প্রাকৃতিক সম্পদ চুরি – এমন আরো অনেক অপরাধী চক্র, মানুষের এভাবে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।

সবচেয়ে ডাকসাইটে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকান্ড, সাধারণত হয় বিশ্বজোড়া। তারা খুবই সুসংগঠিত, আর তাদের কারবারও বেশ নিয়মতান্ত্রিক। তাদের চোখে পড়বে আমাদের চারপাশে, নিত্যদিনের জীবনে; কখনো কখনো তারা ঢুকে পড়ে সিস্টেমের একেবারে গভীরে; তাদের দেখা যায় গুরুত্বপূর্ণ সব সামাজিক সংগঠনে।

যখন সব জায়গায় দুর্নীতি প্রবলভাবে জেঁকে বসে, তখন সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর কারণে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এসব মানুষ নিয়ে কোনো অনুসন্ধান হয় না। জাতীয় বা আঞ্চলিক – কর্তৃপক্ষকে তারা প্রায়ই চুপ করিয়ে রাখে অর্থের বিনিময়ে। আবার কখনো অপরাধী গোষ্ঠীর ক্ষমতা ও ব্যাপ্তি এতো-ই বড় হয়ে ওঠে যে, কোথাও অপরাধের কোনো তথ্যই পাওয়া যায় না। যেসব গুমের সাথে কোনোভাবে রাষ্ট্র জড়িত –  যেখানে একজন মানুষকে তুলে নিয়ে গেছে কেউ, গোপনে আটকে রেখেছে অথবা মেরে ফেলেছে, এবং লাশটাকে লুকিয়ে ফেলেছে কোথাও – তাদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

এই অপরাধের ধরন অনেক রকম হতে পারে; তা সে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হোক, একসাথে অনেক মানুষকে গুম হয়ে যাওয়া, অথবা নির্দিষ্ট সময়ে পরস্পর সংযুক্ত একাধিক ঘটনা। অনেকে আবার নিখোঁজ হন, নিজের ইচ্ছাতেও।

এমন অপরাধ ঠেকাতে সাংবাদিকদের বড় ভূমিকা আছে; বিশেষ করে যেসব জায়গায় রাষ্ট্র ও আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে। সেটি হতে পারে লেখালেখির মাধ্যমে নিরুৎসাহিত করে, অথবা ঘটনার গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে। কিন্তু এই কাজে ঝুঁকিও অনেক। নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে সাংবাদিক নিজেও এ ধরনের অপরাধের শিকার হতে পারেন। তারা কোনোভাবেই এই ঝুঁকির বাইরে নন।

এসব কারণে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিয়ে অনুসন্ধান করার কাজটি হয়ে ওঠে জটিল ও সূক্ষ। এই বিষয় নিয়ে কাজ করতে গেলে একজন সাংবাদিককে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়, এবং ও চিন্তা করে এগুতে হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই হারিয়ে যাওয়া মানুষ নিয়ে বড় বড় অনুসন্ধান হয়েছে। তেমন কিছু উদাহরণ, কেইস স্টাডি, গবেষণাসূত্র, প্রাসঙ্গিক সংগঠনের পরিচিতি এবং মাঠপর্যায়ে রিপোর্টিংয়ের পরামর্শ – আমরা এই গাইডে তুলে ধরেছি।

এই গাইডটি প্রকাশিত হয়েছে জিআইজেএন ও রেজিলিয়েন্স ফান্ড আয়োজিত “ডিগিং ইনটু ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স” ওয়েবিনার সিরিজের অংশ হিসেবে। এর প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ৮ সেপ্টেম্বর, এবং শেষ পর্ব ১৭ সেপ্টেম্বরে।

সূচিপত্র

কেইস স্টাডি

নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষদের নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বাছাই করা হয়েছে এখানে।

দরকারি গাইড ও সংগঠন

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন মিসিং পিপল (আইসিএমপি) বিশেষভাবে নজর দেয় নিখোঁজ ব্যক্তিদের মামলাগুলোর দিকে। এই বিষয় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনকানুন সম্পর্কে তাদের ভালো দখল আছে।

রিপোর্টিং টিপস

এলাকাটি সম্পর্কে জানুন

কোনো নির্দিষ্ট কেস নিয়ে কাজ করার সময়, সেই এলাকাটি সম্পর্কে ভালোমতো জেনে নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে আপনি আপনার কাজের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন। একই সঙ্গে বুঝতে পারবেন: সেখানে কী ধরনের সংগঠিত অপরাধী চক্র সক্রিয় আছে এবং কারা জড়িত থাকতে পারে। একই ধরনের ঘটনা আগেও ঘটলে, সেই মামলাগুলো থেকে আপনার অনুসন্ধান শুরু করতে পারেন।  সেই এলাকায় আগে কাজ করেছে, এমন বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলুন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খোঁজাখুঁজি করুন এবং সেখানকার অপরাধ জগতের কর্মকাণ্ড বোঝার চেষ্টা করুন।

বিশ্বস্ত কোনো সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ না করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যাবেন না। এবং প্রয়োজন হলে কিভাবে দ্রুত সেই এলাকা ছেড়ে যাবেন, তার একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি রাখুন।

মেক্সিকোতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চেয়ে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচি। ছবি: মার্সেলা তুরাতি

নিরাপদ থাকা ও রাখা

সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র নিয়ে অনুসন্ধান শুরুর সময়, আপনার নিজের ও সূত্রদের নিরাপত্তার দিকে সবচে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। এজন্য আপনার প্রয়োজন হবে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা পরিকল্পনা। প্রথমত, আপনাকে ঠিক করতে হবে: আপনি কী ধরনের অনুসন্ধান করতে চান, এবং আপনিই এই নির্দিষ্ট অনুসন্ধানটি করার জন্য সঠিক সাংবাদিক কিনা।

এরপর, আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে: আপনি কিভাবে নিরাপদে তথ্য সংরক্ষণ করবেন এবং আপনার দল ও সাক্ষাৎকারদাতাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। আপনার কম্পিউটার বা ফোনে সংবেদনশীল কোনো তথ্য নিয়ে চলাচল করবেন না। কোথাও যাওয়ার সময় অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে: আপনি কোথায় যাচ্ছেন, তা যেন আপনার দলের অন্য সদস্যরা জানে। কোনো বিপদের মুখে পড়লে কিভাবে তাদের সতর্ক সংকেত দেবেন, তাও আগে থেকে ঠিক করে রাখুন।

অনুসন্ধান প্রকাশিত হওয়ার পর সোর্সদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা হয়তো আপনার এই কাজের জন্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাদেরকে হামলার লক্ষ্য বানানো হতে পারে। এই বিষয় নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর (যেমন: কোনো এনজিও) সাথে জোট বেঁধে কাজ করলে আপনার সূত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হতে পারে। তখন আপনিও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, কখন প্রতিবেদনটি প্রকাশ করলে ভালো হয়। সাধারণভাবে, আপনার প্রতিবেদনে সূত্রের এমন কোনো ব্যক্তিগত তথ্য রাখবেন না, যাতে করে তিনি বা তাঁর স্বজনেরা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। বিশেষভাবে, এমন ছবি ও ভিডিও-র ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, যেখান থেকে বোঝা যেতে পারে: কারা আপনার সূত্র এবং তারা কোথায় আছে। সাক্ষাৎকারদাতা কী পোশাক পরে ছিলেন, সেখান থেকেও তার পরিচয় সম্পর্কে ধারণা মিলতে পারে। অথবা আরো তথ্য লুকিয়ে থাকতে পারে আপনার ছবির মেটাডেটায়।

তথ্য দেবে কারা

অন্য যে কোনো অনুসন্ধানের মতো, এখানেও আপনাকে শুরু করতে হবে সূত্র চিহ্নিত করা ও গড়ে তোলা দিয়ে। কী ঘটেছিল, তা এক জায়গায় করার মধ্য দিয়ে আপনার কাজ শুরু করুন। বেশ কয়েকটি জায়গা থেকে আপনি পেতে পারেন প্রাথমিক সব তথ্য:

  • সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন
  • আদালতের নথিপত্র
  • তথ্য অধিকার আইনের আবেদন
  • প্রত্যক্ষদর্শী
  • এনজিও
  • আইনজীবী
  • পুলিশ
  • নিখোঁজ ব্যক্তির বন্ধুবান্ধব ও পরিবার

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কাছে স্থানীয় অপরাধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য থাকে। হয়তো দেখবেন, সেই এলাকায় অপরাধী চক্রগুলো কিভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কেও তাদের জানাশোনা আছে। আবার কখনো কখনো নিখোঁজ ব্যক্তিকে রক্ষা করার জন্য তার প্রিয়জনেরা অনেক তথ্য বাদ দেয় বা গোপন করে। তবে এ সব খুঁটিনাটিই সাংবাদিকদের বিবেচনা করতে হবে গুরুত্বের সাথে। গুম বা অপহরণের শিকার হওয়া ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ট বন্ধুরা অবশ্যই আপনার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করবে। তবে তাদের দেওয়া সেই তথ্যগুলো আপনাকে যাচাই করে নিতে হবে বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিয়ে।

  • অন্যান্য স্থানীয় সূত্র

আপনার অনুসন্ধানের এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেছে, এমন মানুষরা হয়তো আরো বেশি খোলামেলা কথা বলতে আগ্রহী হবে। কারণ তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। এমন সূত্র ও যোগাযোগের একটি ম্যাপ তৈরি করে নিলে আপনার সুবিধা হতে পারে। কারাগারের বন্দীরাও আপনার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। কারণ, অপরাধী চক্রের সাথে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাদের আছে। তবে তাদের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিটি তথ্য সবসময় ক্রসচেক করে নেওয়া উচিৎ।

  • সোশ্যাল মিডিয়া

ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত (নিখোঁজ বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি) মানুষদের কর্মকাণ্ড নজরে রাখার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে প্রায়ই অনেক সহায়তা পেতে পারেন। এখান থেকে আপনি সেই অঞ্চলের অপরাধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও অনেক প্রাসঙ্গিক তথ্য পেতে পারেন। মাঠপর্যায়ের সূত্রদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য যাচাই করে নেওয়ারও একটি ভালো মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়া।

আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষ্যে এই গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে কলম্বিয়ার একটি গ্রামীন এলাকায়। ফটো: লরা ডিক্সন

সূত্র খুঁজবেন কোথায়

কিছু ক্ষেত্রে, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা তাদের সোশ্যাল নেটওয়ার্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বা ক্লূ রেখে যায়। পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে তারা শেষ কার সঙ্গে কথা বলেছে, তা খুঁজে বের করার মাধ্যমে আপনি আপনার কাজ শুরু করতে পারেন। বিশেষভাবে আধুনিক দাসপ্রথা ও মানবপাচারের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে।

আপনি যদি নিখোঁজ ব্যক্তির সেলফোন বা অন্য কোনো মোবাইল ডিভাইস ট্র্যাক করতে পারেন, তাহলে তার অবস্থান সম্পর্কে অনেক মূল্যবান তথ্য পাবেন। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের তথ্য থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে যে: নিখোঁজ ব্যক্তিটি কোথায় আছেন বা তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে।

আরো তথ্য পাওয়ার জন্য এবং নতুন সূত্রদের আকৃষ্ট করার জন্য আপনি প্রাথমিক কিছু তথ্য দিয়েও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু এও মাথায় রাখবেন: এমন একটি প্রতিবেদন বাড়তি ঝুঁকিও তৈরি করবে।

সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ

কখনো কখনো আপনার অনুসন্ধান চলার সময়ই কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো গ্রুপ একটি মৃতদেহ খুঁজে পেতে পারে। আপনি যে নিখোঁজ ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান করছেন, মৃতদেহটি তারই কিনা; তা যাচাই করে দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি মৃতের গায়ে থাকা জামাকাপড় বা ট্যাটুর বর্ণনা মিলে যায়; বা তার সাথে সঠিক সনাক্তকরণ কাগজপত্র পাওয়া যায়; তারপরও আপনার সেটি ভালোমতো যাচাই করা উচিৎ। কারণ দুজন মানুষের মধ্যে একই রকম শারিরীক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে বা তাদের জামাকাপড় ও সনাক্তকরণ কাগজপত্র বদলে দেওয়া হতে পারে। আদর্শ পদ্ধতি হলো: প্রতিবেদন প্রকাশের আগে আপনি ফরেনসিক ভেরিফিকেশন করিয়ে নেবেন।

অনেক দেশেই, পুলিশ খুব বিস্তারিতভাবে তদন্ত করে না এবং তাদের বাজেট, সক্ষমতা বা ইচ্ছার ঘাটতি থাকে। তাদের কাছে প্রায়শই কোনো ডিএনএ ল্যাব বা জটিল মামলা নিয়ে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ থাকে না। এমন জায়গায় তদন্তের ফলাফল বাইরের কোনো বিশেষজ্ঞকে দিয়ে যাচাই করে নেয়ার চেষ্টা করুন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বা সরকারি তদন্তকারীদের কাছ থেকে যেসব ফরেনসিক প্রমাণ ও বিশ্লেষণ পাবেন, সেগুলোর ব্যাপারে সংশয়ী থাকুন। এখানে কোনো স্বার্থের সংঘাত বা দুর্নীতির সংযোগ থাকতে পারে, যা হয়তো ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে।

কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ

কিছু ক্ষেত্রে, সাংবাদিকদের সতর্ক থাকতে হবে কর্তৃপক্ষের ব্যাপারেও। এটি মাথায় রাখতে হবে যে, তাদেরও অপরাধীদের সঙ্গে সংযোগ থাকতে পারে। ঘটনা আসলেও এমন কিনা, তা জানার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন, এবং অন্য যে কোনো সূত্রের মতো তাদের কথাগুলোও যাচাই করে নিন। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও আপনি সহায়ক নথিপত্র পেতে পারেন।

তবে, কিছু ক্ষেত্রে, কর্তৃপক্ষকে সহায়ক ভূমিকাতেও দেখা যায়। সেসব ক্ষেত্রে, এমন কোনো তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, যার কারণে তাদের অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত হতে পারে বা নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।

ছবি: আইসিএমপি

মানসিকভাবে বিপর্যস্তদের নিয়ে কাজ

এ ধরনের অনেক প্রতিবেদনের কেন্দ্রে থাকে স্বজন হারানোর কষ্ট। তাই আপনাকে অবশ্যই সংবেদনশীল হতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার বা প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার সময় ভাষার ব্যবহার নিয়ে সতর্ক থাকুন। যদি কোনো পরিবার বিশ্বাস করে, হারানো ব্যক্তিটি এখনো জীবিত – তাহলে তাদের সাথে “অতীতকাল সূচক ভাষায়” তা কথা বলবেন না।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সততা ও স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। কথা বলার আগেই পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে দেওয়া উচিত, সাংবাদিক হিসেবে আপনি একই বিষয় নিয়ে অন্য কোনো সোর্স – যেমন অপরাধী চক্রের সদস্য বা এমন কারো সঙ্গে কথা বলেছেন কিনা। এতে সেই পরিবারটি বুঝতে পারবে, আগামীতে কী হতে পারে। তবে যাচাই করা হয়নি, এমন কোনো তথ্য তাদের সঙ্গে শেয়ার করবেন না। তাদের কোনো মিথ্যা আশা দেবেন না।

আগে সংঘবদ্ধ অপরাধের শিকার হয়েছেন, এমন কোনো মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সময় খুবই স্পষ্টভাবে বলুন: আপনি কে এবং কী করছেন। আপনার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সেই ব্যক্তির নতুনভাবে ট্রমার শিকার হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এবং সবচে খারাপ পরিস্থিতিতে, তারা হয়তো ভয় পেয়ে আবার লুকিয়ে যেতে পারেন। ফলে, সোর্সরা যেন বিপদে না পড়েন, সেজন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।

সাংবাদিক হিসেবে আপনার সীমাবদ্ধতার কথা খেয়াল রাখুন। এবং রাখতে পারবেন না, এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেবেন না। কিভাবে কোনো ভিকটিমের সাক্ষাৎকার নেবেন, তা আগে থেকেই ভেবে নেওয়াটা জরুরি। কিভাবে এমন ভিকটিম ও সারভাইভারদের সঙ্গে কাজ করতে হয়, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ পাবেন ডার্ট সেন্টারের এই টিপশিটে।

নিজের যত্ন

নিখোঁজ মানুষদের নিয়ে কাজ করা হয়ে উঠতে পারে – ক্লান্তিকর, হতাশাজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে, গণকবরে গিয়েও খোঁজাখুঁজি করতে হতে পারে সাংবাদিকদের; দেখতে হতে পারে বিভৎস সব দৃশ্য। অথবা এমন কোনো ভিকটিমের সঙ্গে কাজ করতে হতে পারে, যার ওপর চালানো হয়েছে ভয়াবহ শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন।

এই ঘটনাগুলো খুবই বড় আকারের মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। এমনকি খুব শক্ত মনের সাংবাদিকেরও এসব সামলানোর জন্য প্রয়োজন হতে পারে বাইরের কোনো সহায়তা। সহকর্মী, বন্ধু ও একজন ভালো থেরাপিস্টের সাপোর্ট নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে, আপনি এমন কাজের জন্য নিজেকে আগেভাগেই তৈরি রাখতে পারেন।


গাইডটি তৈরি করেছেন জিআইজেএন-এর সম্পাদনা সহযোগী হানা কুগানস। তিনি সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। হংকংয়ে, গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন বন্যপ্রাণী পাচার সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে। কাজ করেছেন যুক্তরাজ্যের চ্যানেল ফোর-এর বিভিন্ন প্রোগ্রামের জন্যও। বর্তমানে তিনি আছেন লন্ডনে।