ফ্রিল্যান্স অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: জেনে নিন কিভাবে পিচ করবেন

English

একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক কোনো গণমাধ্যমের কাছে একটি সাধারণ রিপোর্ট যেভাবে প্রস্তাব করেন, একই পদ্ধতিতে অনুসন্ধানী রিপোর্টও প্রস্তাব করতে হয়। কিন্তু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বেলায় প্রস্তাব বিক্রি করা একটু কঠিন। কারণ, এধরণের ওয়াচডগ সাংবাদিকতায় আগ্রহী হবার মতো গণমাধ্যমের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

অনিশ্চিত ও বিতর্কিত ফলাফল আসতে পারে, এমন অনুসন্ধান পিচ বা প্রস্তাব করার বিষয়টি আরো চ্যালেঞ্জিং। এক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের দরকার হয়।

সমস্যা আরো আছে। যে টাকা পাওয়া যায়, তাতে দীর্ঘ সময় ধরে চলা অনুসন্ধানের বাড়তি খরচ মেটানোও অনেক সময় দায় হয়ে পড়ে। অনুসন্ধানটিতে আপনার ঠিক কতটা সময় ও শ্রম দিতে হবে, তা অনুমান করাও খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে লাভ-খরচের খসড়া হিসেব করতে গেলেও সেটি আন্দাজে ঢিল ছোঁড়া ছাড়া, আর কিছু হয় না।

সবশেষে, এই কাজে ব্যক্তিগত ঝুঁকি থাকে। বিতর্কিত ইস্যুতে কাজ করতে গিয়ে ফ্রিল্যান্সাররা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারেন; পড়তে পারেন আইনি ও শারিরীক ঝুঁকির মুখে; যা হয়তো সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারণার বাইরে।

অনুসন্ধানটিতে আপনার ঠিক কতটা সময় ও শ্রম দিতে হবে, তা অনুমান করাও খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে লাভ-খরচের খসড়া হিসেব করতে গেলেও সেটি আন্দাজে ঢিল ছোঁড়া ছাড়া, আর কিছু হয় না।এতো কিছুর পরেও, অনেকেই কাজ করছেন ফ্রিল্যান্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে। কারণ এই কাজে স্বাধীনতা আছে। কোন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করবেন, কোন বিষয় নিয়ে কাজ করবেন – সবকিছুই তিনি নিজেই বেছে নিতে পারেন। কেউ কেউ সম্পাদক ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কেউ কেউ বাড়তি আয়ের জন্য এর পাশাপাশি অন্যান্য আরো নানা কাজও করেন। নিজেদের পরিচিতি ও আয় বাড়িয়ে নেন লেখক, শিক্ষক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে এই লেখায় জিআইজেএন তুলে ধরেছে: একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমের কাছে কিভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রস্তাব জমা দেবেন এবং কাজ পাওয়ার পথে মূল বাধাগুলো কিভাবে মোকাবিলা করবেন।

আমরা এখানে যে বিষয়গুলোতে নজর দিয়েছি:

সম্ভাব্য সংবাদমাধ্যম খুঁজে বের করা
কার্যকরীভাবে প্রতিবেদন পিচ করা
চিন্তা ও আইডিয়ার সুরক্ষা
বাজেট তৈরি করা

এই গাইডের বাইরে কোভিড-১৯ মহামারির সময় ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ পরামর্শ ও কৌশল শিরোনামে আরেকটি লেখা তৈরি করেছে জিআইজেএন।
সম্ভাব্য সংবাদমাধ্যম খুঁজে বের করা
কোনো সংবাদমাধ্যম একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের ওপর তখনই বাজি ধরে, যখন তাদের গভীর বিশ্বাস ও আস্থা থাকে; যে কারণে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়।

শুরু করুন – অনুসন্ধানী নয়, এমন প্রতিবেদন দিয়ে। এটি সম্পর্ক গড়ে তোলার ভালো উপায়। হুট করে একটি সংবেদনশীল প্রতিবেদন নিয়ে গিয়ে সেটি বিক্রির চেষ্টা করা কঠিন হতে পারে।

এক্ষেত্রে সাধারণ পরামর্শ হলো: বিভিন্ন সেমিনার বা সম্মেলনে গিয়ে সমমনা সম্পাদকদের সঙ্গে আলাপ করা।

গবেষণা করে নিন

আপনি যাদের কাছে আপনার প্রতিবেদন প্রস্তাব করতে পারেন, এমন সম্ভাব্য সংবাদমাধ্যমের ওপর গবেষণা করুন। সাধারণত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, শুধু এমন সংবাদমাধ্যমই নয়, বরং আপনার অনুসন্ধানের বিষয় নিয়ে আগ্রহ আছে, এমন প্রতিষ্ঠানেরও খোঁজ করুন।

সম্ভাবনা আছে, এমন মনে হলে এসব বিষয়ে আরো খোঁজখবর করুন:

দেখুন, আপনার বিষয়টি নিয়ে আগে কী কী প্রকাশিত হয়েছে।
তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানুন।
তাদের মিশন সম্পর্কে আরো খুঁটিয়ে দেখুন।
শীর্ষ সম্পাদকদের ব্যাপারে খোঁজখবর করুন।
খোঁজ নিন, পরিচিত এমন কেউ আছে কিনা, যার সাথে তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ আছে, এবং যিনি আপনাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারেন।

২০১৯ সালের জিআইজেএন সম্মেলনে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে একাধিক সেশন ছিল। সেই আলোচনা নিয়ে একটি প্রবন্ধে রোয়ান ফিলিপ লিখেছিলেন, “সংবাদ সংগ্রহ প্রক্রিয়ার প্রতিটি অংশের যথাযথ মূল্য” বের করে আনার জন্য আপনাকে বিষয়টি একাধিক মাধ্যমে বিক্রি করার কথা চিন্তা করতে হবে।

অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রোয়ান লিখেছেন, “বিকশিত হতে গেলে বা এমনকি টিকে থাকতে গেলেও, প্রতিটি রিপোর্টিং কর্মকাণ্ড একাধিক জায়গায় বিক্রি করাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলতে হবে ফ্রিল্যান্স অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের।”

এই সেশনের আলোচকরা বলেছিলেন, কিভাবে আয় বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য সাংবাদিকরা একই অনুসন্ধানকে প্রিন্ট, ভিজ্যুয়াল ও অডিওসহ নানারকম ভিন্ন ভিন্ন ফরম্যাটে উপস্থাপনের কথা চিন্তা করতে পারেন।
এবার প্রস্তাব তৈরি করুন

প্রতিবেদন কোন জায়গায় পাঠাবেন, তা ঠিক করে ফেলার পর আপনাকে প্রস্তাব তৈরি করতে হবে।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের সাধারণ পরামর্শগুলো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিক্রির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। প্রতিবেদনের প্রস্তাব হওয়া উচিৎ যথাযথ, বলিষ্ঠ ও আকর্ষণীয়।

“সম্পাদককে আপনার বোঝাতে হবে যে, কাজটির জন্য আপনিই সঠিক ব্যক্তি। আসলে তাকে বোঝাতে হবে: এই প্রতিবেদনটি একমাত্র আপনিই করতে পারেন।” — সাংবাদিক কাতালিনা লোবো গেরেরো“সম্পাদককে আপনার বোঝাতে হবে যে, কাজটির জন্য আপনিই সঠিক ব্যক্তি। আসলে তাকে বোঝাতে হবে: এই প্রতিবেদনটি একমাত্র আপনিই করতে পারেন। কারণ বিষয়টির ইতিহাস, প্রেক্ষাপট, সোর্স, অভিজ্ঞতা, ইত্যাদি সম্পর্কে আপনার ভালো ধারণা আছে। বা আপনার কাছে ফাঁস হওয়া এমন কিছু নথি আছে, যা অন্য কারো কাছে নেই,” বলেছেন কলম্বিয়ার ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও জিআইজেএন-এর সাবেক সম্পাদক কাতালিনা লোবো গেরেরো।

সম্পাদকদের পরামর্শ

২০১৭ সালের এক সাক্ষাৎকারে এই পরামর্শগুলো দিয়েছিলেন আটলান্টিকের জাতীয় সংবাদ বিভাগের সম্পাদক স্কট স্টোসেল:

কিছু প্রি-রিপোর্টিং করুন। আপনার প্রতিবেদনের পিচ বা প্রস্তাবটি যেন সুবিবেচনাপ্রসূত হয়, তা নিশ্চিত করুন।
বিস্তারিত বর্ণনা দিন। এখানে কোন কোন চরিত্র সম্পৃক্ত, পরিণাম কী হতে পারে এবং পাঠকের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা তুলে ধরুন।
আপনার লেখনীর দক্ষতা দেখান। আপনার এই প্রস্তাবটিই যেন একটি গল্প বলে দেয় এবং এখানেই যেন প্রতিবেদনের দৃষ্টিভঙ্গিটি ফুটে ওঠে।
কিছুটা নাটকীয় ভাব রাখুন। প্রস্তাবটিতেও সেই নাটকীয়তার কেন্দ্রে চলে যান।
সংবাদের গুরুত্ব বুঝুন। সমসাময়িক সংবাদের সঙ্গে এটির সংযোগ যত স্পষ্ট হবে, তত ভালো।
সময়োপযোগী করে তুলুন।

কনরাড অ্যাডেনাওয়ার স্টিফটুং-এর গ্লোবাল মিডিয়া প্রোগ্রাম প্রণীত, ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম ম্যানুয়াল অনুযায়ী, একটি প্রস্তাবের মধ্যে থাকা উচিৎ:

প্রতিবেদনের ধারণা
প্রতিবেদনটি কেন এই নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যম বা তাদের পাঠকদের জন্য যথার্থ
কাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
সময় পরিকল্পনা
বাজেট

প্রতিবেদন প্রস্তাব লেখা নিয়ে একটি টিপশিট তৈরি করেছিলেন টাইপ ইনভেস্টিগেশনের (পূর্বের ইনভেস্টিগেটিভ ফান্ড) নির্বাহী সম্পাদক, সারাহ ব্লুস্টেইন। সেখানে তিনি জোর দেন, প্রস্তাবটিকে “ছোট রাখা”, “সুনির্দিষ্ট হওয়া”, এবং “প্রতিবেদনটি সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্পাদকদের যা যা প্রয়োজন, তা সরবরাহ করার” দিকে। তিনি সাধারণত চার অনুচ্ছেদের একটি প্রতিবেদন প্রস্তাব তৈরির পরামর্শ দেন, যেখানে এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস থাকতে হবে:

প্রতিবেদনটি কী নিয়ে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন এটি এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি কী কী খুঁজে পেয়েছেন।
কেন একমাত্র আপনারই এই বিষয়টি নিয়ে লেখা উচিৎ।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি ম্যাগাজিন, মাদার জোনসও তাদের ফ্রিল্যান্স লেখক গাইডলাইনে এই বিষয়গুলোর দিকে জোর দিয়েছে:

“অল্প কয়েকটি অনুচ্ছদের মধ্যে আমাদের বলুন: আপনি কোন বিষয়টি কাভার করার পরিকল্পনা করছেন, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় এবং কিভাবে আপনি এটি রিপোর্ট করবেন। এখানে আপনার কাজের দৃষ্টিভঙ্গি, পদ্ধতি, প্রকাশভঙ্গি ইত্যাদি উঠে আসবে। এবং আপনাকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে: এই বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য আপনার কী কী নির্দিষ্ট যোগ্যতা আছে? সোর্সের সঙ্গে আপনার  বোঝাপড়া কেমন? এই বিষয়ে যদি অন্যান্য আরো অনেক বড় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তাহলে আপনারটি কিভাবে সবার চেয়ে আলাদা ও ভালো হবে?”

“আপনার পূর্ব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে দুই-এক লাইন ও প্রাসঙ্গিক দুই বা তিনটি কাজের কথা যোগ করবেন।”

“অল্প কয়েকটি অনুচ্ছদের মধ্যে আমাদের বলুন: আপনি কোন বিষয়টি কাভার করার পরিকল্পনা করছেন, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় এবং কিভাবে আপনি এটি রিপোর্ট করবেন” – মাদার জোনস দ্য পিচ: অ্যাট দ্য গার্ডিয়ানস লং রিড, নো রিজিড ফর্মুলা অর জিওগ্রাফিক্যাল লিমিটস – ২০১৮ সালের নিম্যান স্টোরিবোর্ডে প্রকাশিত এই প্রবন্ধ, ঠিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে নয়। কিন্তু এখানে প্রতিবেদনের প্রস্তাব তৈরি নিয়ে অনেক খোলামেলা আলাপ করা হয়েছে। “সম্পাদকের পরামর্শ: আগে কী প্রকাশিত হয়েছে, সে বিষয়ে গবেষণা করুন। নির্ভরযোগ্য, নতুন ও ‘মনোযোগ আটকে রাখার মতো’ কিছু করুন। সাহস করে, একটা দারুন পিচ পাঠিয়ে দিন।”

অনুদানের কথা মাথায় রেখে লেখা হলেও, এরিক কারস্টেন্সের এই লেখায় (হাও নট টু উইন এ জার্নালিজম গ্রান্ট) কোনো বিষয় উপস্থাপন করা নিয়ে ভালো কিছু ধারণা দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে এটি জিআইজেএন-এ পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদন প্রস্তাব পাঠানো নিয়ে সলিউশন জার্নালিজম নেটওয়ার্কের তিন পর্বের সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব ছিল: হোয়াট এডিটরস আর লুকিং ফর ইন সলিউশন পিচেস। এখানে আটটি বিষয় তুলে ধরেছিলেন জুলিয়া হটজ:

১. “পাঠকদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? ”- এই প্রশ্নের স্পষ্ট, বিস্তারিত ও সময়োপযোগী উত্তর দিতে হবে।

২.

কোভিড-১৯: যখন আতশী কাঁচের নিচে সরকারি কেনাকাটা

English

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলার জন্য বিশ্বের দেশগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খুব দ্রুত খরচ করছে। কোন ধরণের সরকারি চুক্তির মাধ্যমে এসব অর্থ খরচ করা হচ্ছে, তা তলিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়ছে।

এই সংকট কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। দেশে দেশে সরকারি কর্মকর্তারা এসব কেনাকাটা করছেন জরুরি ভিত্তিতে। জনসাধারণের কাছে সেসব তথ্য ‍উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে তৈরি করছেন প্রতিবন্ধকতা, এবং তথ্য অধিকার আইনে করা আবেদনগুলোর জবাব দিচ্ছেন দেরিতে।

এমন নতুন ও পুরোনো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, রিপোর্টাররা প্রতিনিয়ত প্রকাশ করে যাচ্ছেন সরকারি কেনাকাটা সংক্রান্ত প্রতিবেদন।

কিভাবে এসব প্রতিবেদন তৈরি করা যায়, তার কিছু পরামর্শ থাকছে জিআইজেএন-এর এই রিসোর্স গাইডে। সঙ্গে থাকছে নানা উদাহরণ। এখান থেকে জানা যাবে: দুর্নীতির আভাস-ইঙ্গিত কিভাবে পাবেন এবং কেনাকাটা সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য কোথায় মিলবে? জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায় তে বটেই, আমরা এখানে তুলে ধরেছি বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে আসা অর্থের হিসেব চিহ্নিত করার উপায়ও।

সরকারি চুক্তি ও কেনাকাটা নিয়ে কাজ করার মৌলিক পরামর্শগুলো সংক্ষেপে সংকলন করা হয়েছে এই এক পৃষ্ঠার টিপশিটে।
সূচিপত্র
তথ্য কোথায় খুঁজবেন

আগেই সতর্ক হবেন যেসব চিহ্ন দেখে

কাজ কে পেলো ঘোষণা হলে কী খুঁজবেন

ঠিকাদার ও সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে অনুসন্ধান

কাজের মান যাচাই

প্রকিউরমেন্ট ডেটা ব্যবহার

আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থসাহায্য অনুসন্ধান

আরো তথ্যসূত্র

পরামর্শ কোথায় পাবেন

এই গাইডের জন্য জিআইজেএন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে ওপেন কন্ট্রাক্টিং পার্টনারশিপের কর্মীদের কাছে। তাদের সাপ্তাহিক নিউজলেটারে এসব চুক্তি নিয়ে অনুসন্ধানের নানা উপকরণ থাকে।
মৌলিক, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ
প্রথমেই আপনাকে নিজ দেশের সরকারি ক্রয় কাঠামো বুঝে নিতে হবে এবং জানতে হবে দুর্নীতি, দরপত্র জালিয়াতি, গোপনীয়তা ও প্রতারণার বিষয়গুলো খুঁজে পেতে কোন জায়গাগুলোতে নজর দিতে হবে।

এখানে থাকছে একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

সাধারণত একটি ক্রয়‍চুক্তির প্রক্রিয়ায় পাঁচটি পর্যায় থাকে:

পরিকল্পনা – যখন কী কী জিনিস কিনতে হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আলোচনা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পরিকল্পনার পর্যায়টি খুব তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা হচ্ছে। কখনো কখনো এসব সিদ্ধান্তের কথা জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করা হচ্ছে না এবং কোনো নথিপত্রও থাকছে না।
টেন্ডারিং – এই পর্যায়ে সরকার কোট, বিড বা প্রস্তাব আহ্বান করে। (কখনো কখনো এটিকে অন্য নামেও ডাকা হয়। যেমন রিকোয়েস্ট ফর প্রোপোজাল, অ্যাপ্রোচ টু মার্কেট ও সলিসিটেশন)
কাজ দেওয়া – এই পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, চুক্তিটি কার সঙ্গে করা হবে। এটা নির্ধারিত হয় হাই বিডার দেখে বা অন্য কোনো উপায়ে।
চুক্তি – এই পর্যায়ে চুক্তির নানা শর্ত বিস্তারিত লেখা হয়। এটি আইনি সমঝোতার বিষয়। কখনো কখনো, এসব চুক্তিপত্রের সংশোধন ও সংযোজনের জায়গাগুলোতে পাওয়া যায় সবচে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য।
বাস্তবায়ন – কাজটি কি শেষ হয়েছে? পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে, সরবরাহকারীর অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে? আমার দেশের কী অবস্থা? মূল বিষয়গুলো এক হলেও, সরকারি ক্রয়ের প্রক্রিয়া একেকখানে একেক রকম। খুব অল্প কিছু দেশে এটি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাপারটি তেমন নয়।

সরকারি ক্রয়ের পরিভাষা, আইনি কাঠামো ও আমলাতন্ত্র সম্পর্কে জানা থাকলে রিপোর্টিং সহজ হয়। এগুলো জানতে জনস্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংগঠন, এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ বেসরকারি পেশাজীবী এবং এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন।

কোভিড-১৯ মহামারি,  বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অনেক সরকারই আগেকার স্বাভাবিক ধাপ বাদ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নানা ধরণের পণ্য ও সেবা কিনছে। ফলে স্বচ্ছতা বজায় থাকছে না।কোভিড-১৯ মহামারি,  বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অনেক সরকারই আগেকার স্বাভাবিক ধাপ বাদ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নানা ধরণের পণ্য ও সেবা কিনছে। “জরুরি অধ্যাদেশ” জারির মাধ্যমে, সাধারণ নিয়মনীতি পাশ কাটিয়ে কেনাকাটা করা হচ্ছে। ফলে স্বচ্ছতা বজায় থাকছে না।

এই নতুন নিয়মনীতি হয়তো উসকে দিচ্ছে নানা দুর্নীতি। যেমন, তথাকথিত “সোল সোর্স” বা “নো-বিড” চুক্তি। প্রতিযোগিতাবিহীন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করা হয় বলে, এখানে দুর্নীতি-অনিয়মের অনেক সুযোগ থাকে। ইউরোপিয় ইউনিয়নে, সরকারগুলো কোনো বিজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেও আলোচনার ভিত্তিতে কেনাকাটার চুক্তি করতে পারে। পরিণতিতে এখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি থেকে যায়। (ইউরোপিয় ইউনিয়নের পরিস্থিতি এবং সংস্কারের সুপারিশ সংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারেন এখানে: অ্যাকসেস ইনফো ইউরোপ রিপোর্ট।)

ক্রয় চুক্তি সংক্রান্ত তথ্য উন্মুক্ত করার নীতিমালা ও চর্চার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিছু দেশে সেগুলো উন্মুক্ত অবস্থায় থাকে। এমনকি চুক্তি সইয়ের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সেগুলো যে কেউ ডাউনলোড করতে পারে। আবার অনেক জায়গায় কম তথ্য জানানো হয় বা চুক্তি সাক্ষরের কয়েক সপ্তাহ পরে সেটি জানানো হয়।

এ কারণে নিজ নিজ দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। আইন ও কেনাকাটা সংক্রান্ত সংস্থার দেশভিত্তিক তথ্য জানতে পারবেন বিশ্বব্যাংকের এই ডেটাবেজ থেকে। দেখতে পারেন ওসিপির সংক্ষিপ্ত তালিকাও।

সংবাদ সংগ্রহের প্রক্রিয়া

সরকারের কোনো চুক্তি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক  ঘোষণা পাওয়া যেতে পারে সরকারি প্রকাশনা বা ওয়েবসাইটে। কোথায়, কিভাবে এগুলো প্রকাশিত হয়, তা খুঁজে বের করার জন্য স্থানীয় জ্ঞান খুব জরুরি।

মাথায় রাখুন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের মতোই রাজ্য, আঞ্চলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও (যেমন হাসপাতাল) কেনাকাটা হচ্ছে।

তথ্য পাওয়ার সম্ভাব্য সূত্রগুলো নিয়মিত নজরে রাখুন। এগুলোর মধ্যে থাকতে পারে ক্রয়-কমিটির সভার সারাংশ, প্রেস রিলিজ, ই-প্রকিউরমেন্ট পোর্টাল, সংবাদপত্রে দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি। এগুলোতে কোনো ক্রয় কর্মকর্তার নাম আছে কিনা, এ জাতীয় বিষয়গুলো খেয়াল করুন।

বাজার ব্যবস্থা ভালো বোঝেন, এমন কোনো সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করুন। স্বাস্থ্য বিষয়ক রিপোর্টাররা, অর্থবাণিজ্য বিষয়ক রিপোর্টারদের সঙ্গে একজোট হয়ে কাজ করতে পারেন।

কেনাকাটার এই পদ্ধতির প্রতিটি পর্যায়ে কোন ডেটা ও তথ্যগুলো প্রাসঙ্গিক, তা জানা থাকলে আপনি সব কিছু এক জায়গায় জুড়তে পারবেন এবং কোন জায়গায় অব্যবস্থাপনা, প্রতারণা ও দুর্নীতির ঝুঁকি রয়েছে, তা চিহ্নিত করতে পারবেন।

(ডেটা স্ক্রাপিং নিয়ে আরো আলোচনা আছে নিচে)

সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো তথ্য অবশ্যই ‍গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভেতরকার খবরও জানতে হবে।

এধরনের তথ্যের জন্য সম্ভাব্য আদর্শ জায়গা হতে পারে বাণিজ্যিক প্রতিযোগীরা। কাজের জন্য আবেদন করে হেরে যাওয়া কোম্পানি হয়তো তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়া ও নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ জানাতে পারে। প্রকিউরমেন্ট এজেন্সিগুলো সাধারণত বিডারদের কাছ থেকে আসা, এমন অভিযোগের রেকর্ড রাখে। আপনি যদি খুব ভাগ্যবান হন, তাহলে এসব নথিপত্র তাদের ওয়েবসাইটের কোথাও পেয়ে যেতে পারেন।

যাদের ওপর এই এই কেনাকাটা প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়বে, তাদের সঙ্গে কথা বলুন। যেমন হাসপাতালের ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক, ও নার্স।

কোনো কোনো তথ্য পাওয়ার জন্য হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করার প্রয়োজনও হতে পারে। কোভিড-১৯ বিষয়ে কিভাবে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করবেন তা নিয়ে দেখতে পারেন জিআইজেএন-এর এই পরামর্শগুলো।

চিহ্ন দেখে দুর্নীতি চেনা
কেনাকাটায় প্রতারণা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতির কিছু লক্ষণ সনাক্ত করেছেন। এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে সাহায্য করবে। এই লক্ষণগুলো দেখা গেলে বুঝতে হবে দুর্নীতি-অনিয়মের শংকা আছে।

করোনাভাইরাস সংক্রান্ত কেনাকাটার ক্ষেত্রে আমরা এমন কিছু চিহ্নের দিকে খেয়াল রাখব।

এ বিষয়ে ওসিপির পরামর্শ: “ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে আলাদা আলাদা কিছু লক্ষণ দেখা যায়। ক্রমাগত তথ্য যাচাই করা এবং কোথাও পর্যাপ্ত ডেটা না থাকলে সেটি স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার মাধ্যমে রিপোর্টিংয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে পারেন। শুধু একটিমাত্র লক্ষণের ওপর ভরসা করবেন না। যতটা সম্ভব বেশি আঙ্গিক থেকে বিবেচনা করুন। স্বার্থের সংঘাত নিয়ে চট করে কোনো সিদ্ধান্তে চলে আসবেন না। প্রায়ই দেখা যায়, কোনো বিষয় বাস্তবের চেয়ে বেশি সন্দেহজনক মনে হয়। এবং সেখানে প্রেক্ষাপটের ঘাটতি থাকে বা ডেটায় ভ্রান্তি থাকে।

দুর্নীতি-অনিয়ম চেনার চিহ্ন সম্পর্কে আরো তথ্যের হদিস আছে নিচে।

পরিকল্পনা পর্যায়ে সতর্ক চিহ্ন

বর্তমান পরিস্থিতিতে, ক্রয়-পরিকল্পনা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হচ্ছে খুব দ্রুত এ সংক্ষেপে। তারপরও এই পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: যে পণ্য বা সেবা কেনা হচ্ছে, সেগুলোর আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা এবং এখানে কোন কোন সংস্থা জড়িত।

এই পর্যায়ে আপনি সহায়তা পেতে পারেন সরকারি বিভিন্ন নথিপত্র থেকে। কিন্তু তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগ করে সেগুলো পেতে গেলে সময়ের প্রয়োজন। এখন অনেক সরকারই তথ্য অধিকার আইনে করা আবেদনের উত্তর দিতে অনেক সময় নিচ্ছে।

কী দেখবেন এসব নথিপত্রে?