কোভিড-১৯: যখন আতশী কাঁচের নিচে সরকারি কেনাকাটা

English

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলার জন্য বিশ্বের দেশগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খুব দ্রুত খরচ করছে। কোন ধরণের সরকারি চুক্তির মাধ্যমে এসব অর্থ খরচ করা হচ্ছে, তা তলিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়ছে।

এই সংকট কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। দেশে দেশে সরকারি কর্মকর্তারা এসব কেনাকাটা করছেন জরুরি ভিত্তিতে। জনসাধারণের কাছে সেসব তথ্য ‍উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে তৈরি করছেন প্রতিবন্ধকতা, এবং তথ্য অধিকার আইনে করা আবেদনগুলোর জবাব দিচ্ছেন দেরিতে।

এমন নতুন ও পুরোনো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, রিপোর্টাররা প্রতিনিয়ত প্রকাশ করে যাচ্ছেন সরকারি কেনাকাটা সংক্রান্ত প্রতিবেদন।

কিভাবে এসব প্রতিবেদন তৈরি করা যায়, তার কিছু পরামর্শ থাকছে জিআইজেএন-এর এই রিসোর্স গাইডে। সঙ্গে থাকছে নানা উদাহরণ। এখান থেকে জানা যাবে: দুর্নীতির আভাস-ইঙ্গিত কিভাবে পাবেন এবং কেনাকাটা সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য কোথায় মিলবে? জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায় তে বটেই, আমরা এখানে তুলে ধরেছি বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে আসা অর্থের হিসেব চিহ্নিত করার উপায়ও।

সরকারি চুক্তি ও কেনাকাটা নিয়ে কাজ করার মৌলিক পরামর্শগুলো সংক্ষেপে সংকলন করা হয়েছে এই এক পৃষ্ঠার টিপশিটে।
সূচিপত্র
তথ্য কোথায় খুঁজবেন

আগেই সতর্ক হবেন যেসব চিহ্ন দেখে

কাজ কে পেলো ঘোষণা হলে কী খুঁজবেন

ঠিকাদার ও সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে অনুসন্ধান

কাজের মান যাচাই

প্রকিউরমেন্ট ডেটা ব্যবহার

আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থসাহায্য অনুসন্ধান

আরো তথ্যসূত্র

পরামর্শ কোথায় পাবেন

এই গাইডের জন্য জিআইজেএন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে ওপেন কন্ট্রাক্টিং পার্টনারশিপের কর্মীদের কাছে। তাদের সাপ্তাহিক নিউজলেটারে এসব চুক্তি নিয়ে অনুসন্ধানের নানা উপকরণ থাকে।
মৌলিক, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ
প্রথমেই আপনাকে নিজ দেশের সরকারি ক্রয় কাঠামো বুঝে নিতে হবে এবং জানতে হবে দুর্নীতি, দরপত্র জালিয়াতি, গোপনীয়তা ও প্রতারণার বিষয়গুলো খুঁজে পেতে কোন জায়গাগুলোতে নজর দিতে হবে।

এখানে থাকছে একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

সাধারণত একটি ক্রয়‍চুক্তির প্রক্রিয়ায় পাঁচটি পর্যায় থাকে:

পরিকল্পনা – যখন কী কী জিনিস কিনতে হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আলোচনা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পরিকল্পনার পর্যায়টি খুব তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা হচ্ছে। কখনো কখনো এসব সিদ্ধান্তের কথা জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করা হচ্ছে না এবং কোনো নথিপত্রও থাকছে না।
টেন্ডারিং – এই পর্যায়ে সরকার কোট, বিড বা প্রস্তাব আহ্বান করে। (কখনো কখনো এটিকে অন্য নামেও ডাকা হয়। যেমন রিকোয়েস্ট ফর প্রোপোজাল, অ্যাপ্রোচ টু মার্কেট ও সলিসিটেশন)
কাজ দেওয়া – এই পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, চুক্তিটি কার সঙ্গে করা হবে। এটা নির্ধারিত হয় হাই বিডার দেখে বা অন্য কোনো উপায়ে।
চুক্তি – এই পর্যায়ে চুক্তির নানা শর্ত বিস্তারিত লেখা হয়। এটি আইনি সমঝোতার বিষয়। কখনো কখনো, এসব চুক্তিপত্রের সংশোধন ও সংযোজনের জায়গাগুলোতে পাওয়া যায় সবচে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য।
বাস্তবায়ন – কাজটি কি শেষ হয়েছে? পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে, সরবরাহকারীর অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে? আমার দেশের কী অবস্থা? মূল বিষয়গুলো এক হলেও, সরকারি ক্রয়ের প্রক্রিয়া একেকখানে একেক রকম। খুব অল্প কিছু দেশে এটি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাপারটি তেমন নয়।

সরকারি ক্রয়ের পরিভাষা, আইনি কাঠামো ও আমলাতন্ত্র সম্পর্কে জানা থাকলে রিপোর্টিং সহজ হয়। এগুলো জানতে জনস্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংগঠন, এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ বেসরকারি পেশাজীবী এবং এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন।

কোভিড-১৯ মহামারি,  বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অনেক সরকারই আগেকার স্বাভাবিক ধাপ বাদ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নানা ধরণের পণ্য ও সেবা কিনছে। ফলে স্বচ্ছতা বজায় থাকছে না।কোভিড-১৯ মহামারি,  বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অনেক সরকারই আগেকার স্বাভাবিক ধাপ বাদ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নানা ধরণের পণ্য ও সেবা কিনছে। “জরুরি অধ্যাদেশ” জারির মাধ্যমে, সাধারণ নিয়মনীতি পাশ কাটিয়ে কেনাকাটা করা হচ্ছে। ফলে স্বচ্ছতা বজায় থাকছে না।

এই নতুন নিয়মনীতি হয়তো উসকে দিচ্ছে নানা দুর্নীতি। যেমন, তথাকথিত “সোল সোর্স” বা “নো-বিড” চুক্তি। প্রতিযোগিতাবিহীন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করা হয় বলে, এখানে দুর্নীতি-অনিয়মের অনেক সুযোগ থাকে। ইউরোপিয় ইউনিয়নে, সরকারগুলো কোনো বিজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেও আলোচনার ভিত্তিতে কেনাকাটার চুক্তি করতে পারে। পরিণতিতে এখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি থেকে যায়। (ইউরোপিয় ইউনিয়নের পরিস্থিতি এবং সংস্কারের সুপারিশ সংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারেন এখানে: অ্যাকসেস ইনফো ইউরোপ রিপোর্ট।)

ক্রয় চুক্তি সংক্রান্ত তথ্য উন্মুক্ত করার নীতিমালা ও চর্চার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিছু দেশে সেগুলো উন্মুক্ত অবস্থায় থাকে। এমনকি চুক্তি সইয়ের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সেগুলো যে কেউ ডাউনলোড করতে পারে। আবার অনেক জায়গায় কম তথ্য জানানো হয় বা চুক্তি সাক্ষরের কয়েক সপ্তাহ পরে সেটি জানানো হয়।

এ কারণে নিজ নিজ দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। আইন ও কেনাকাটা সংক্রান্ত সংস্থার দেশভিত্তিক তথ্য জানতে পারবেন বিশ্বব্যাংকের এই ডেটাবেজ থেকে। দেখতে পারেন ওসিপির সংক্ষিপ্ত তালিকাও।

সংবাদ সংগ্রহের প্রক্রিয়া

সরকারের কোনো চুক্তি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক  ঘোষণা পাওয়া যেতে পারে সরকারি প্রকাশনা বা ওয়েবসাইটে। কোথায়, কিভাবে এগুলো প্রকাশিত হয়, তা খুঁজে বের করার জন্য স্থানীয় জ্ঞান খুব জরুরি।

মাথায় রাখুন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের মতোই রাজ্য, আঞ্চলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও (যেমন হাসপাতাল) কেনাকাটা হচ্ছে।

তথ্য পাওয়ার সম্ভাব্য সূত্রগুলো নিয়মিত নজরে রাখুন। এগুলোর মধ্যে থাকতে পারে ক্রয়-কমিটির সভার সারাংশ, প্রেস রিলিজ, ই-প্রকিউরমেন্ট পোর্টাল, সংবাদপত্রে দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি। এগুলোতে কোনো ক্রয় কর্মকর্তার নাম আছে কিনা, এ জাতীয় বিষয়গুলো খেয়াল করুন।

বাজার ব্যবস্থা ভালো বোঝেন, এমন কোনো সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করুন। স্বাস্থ্য বিষয়ক রিপোর্টাররা, অর্থবাণিজ্য বিষয়ক রিপোর্টারদের সঙ্গে একজোট হয়ে কাজ করতে পারেন।

কেনাকাটার এই পদ্ধতির প্রতিটি পর্যায়ে কোন ডেটা ও তথ্যগুলো প্রাসঙ্গিক, তা জানা থাকলে আপনি সব কিছু এক জায়গায় জুড়তে পারবেন এবং কোন জায়গায় অব্যবস্থাপনা, প্রতারণা ও দুর্নীতির ঝুঁকি রয়েছে, তা চিহ্নিত করতে পারবেন।

(ডেটা স্ক্রাপিং নিয়ে আরো আলোচনা আছে নিচে)

সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো তথ্য অবশ্যই ‍গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভেতরকার খবরও জানতে হবে।

এধরনের তথ্যের জন্য সম্ভাব্য আদর্শ জায়গা হতে পারে বাণিজ্যিক প্রতিযোগীরা। কাজের জন্য আবেদন করে হেরে যাওয়া কোম্পানি হয়তো তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়া ও নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ জানাতে পারে। প্রকিউরমেন্ট এজেন্সিগুলো সাধারণত বিডারদের কাছ থেকে আসা, এমন অভিযোগের রেকর্ড রাখে। আপনি যদি খুব ভাগ্যবান হন, তাহলে এসব নথিপত্র তাদের ওয়েবসাইটের কোথাও পেয়ে যেতে পারেন।

যাদের ওপর এই এই কেনাকাটা প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়বে, তাদের সঙ্গে কথা বলুন। যেমন হাসপাতালের ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক, ও নার্স।

কোনো কোনো তথ্য পাওয়ার জন্য হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করার প্রয়োজনও হতে পারে। কোভিড-১৯ বিষয়ে কিভাবে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করবেন তা নিয়ে দেখতে পারেন জিআইজেএন-এর এই পরামর্শগুলো।

চিহ্ন দেখে দুর্নীতি চেনা
কেনাকাটায় প্রতারণা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতির কিছু লক্ষণ সনাক্ত করেছেন। এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে সাহায্য করবে। এই লক্ষণগুলো দেখা গেলে বুঝতে হবে দুর্নীতি-অনিয়মের শংকা আছে।

করোনাভাইরাস সংক্রান্ত কেনাকাটার ক্ষেত্রে আমরা এমন কিছু চিহ্নের দিকে খেয়াল রাখব।

এ বিষয়ে ওসিপির পরামর্শ: “ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে আলাদা আলাদা কিছু লক্ষণ দেখা যায়। ক্রমাগত তথ্য যাচাই করা এবং কোথাও পর্যাপ্ত ডেটা না থাকলে সেটি স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার মাধ্যমে রিপোর্টিংয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে পারেন। শুধু একটিমাত্র লক্ষণের ওপর ভরসা করবেন না। যতটা সম্ভব বেশি আঙ্গিক থেকে বিবেচনা করুন। স্বার্থের সংঘাত নিয়ে চট করে কোনো সিদ্ধান্তে চলে আসবেন না। প্রায়ই দেখা যায়, কোনো বিষয় বাস্তবের চেয়ে বেশি সন্দেহজনক মনে হয়। এবং সেখানে প্রেক্ষাপটের ঘাটতি থাকে বা ডেটায় ভ্রান্তি থাকে।

দুর্নীতি-অনিয়ম চেনার চিহ্ন সম্পর্কে আরো তথ্যের হদিস আছে নিচে।

পরিকল্পনা পর্যায়ে সতর্ক চিহ্ন

বর্তমান পরিস্থিতিতে, ক্রয়-পরিকল্পনা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হচ্ছে খুব দ্রুত এ সংক্ষেপে। তারপরও এই পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: যে পণ্য বা সেবা কেনা হচ্ছে, সেগুলোর আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা এবং এখানে কোন কোন সংস্থা জড়িত।

এই পর্যায়ে আপনি সহায়তা পেতে পারেন সরকারি বিভিন্ন নথিপত্র থেকে। কিন্তু তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগ করে সেগুলো পেতে গেলে সময়ের প্রয়োজন। এখন অনেক সরকারই তথ্য অধিকার আইনে করা আবেদনের উত্তর দিতে অনেক সময় নিচ্ছে।

কী দেখবেন এসব নথিপত্রে?

সরবরাহ চেইন অনুসন্ধানের যতরকম কৌশল

English

সাপ্লাই চেইন, যার বাংলা করলে দাঁড়ায় সরবরাহ শেকল। এটি হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদন, বিতরণ ও বিপননের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলোর একটি নেটওয়ার্ক। এই শেকলে থাকতে পারে কাঁচামাল সরবরাহকারী থেকে শুরু করে, সেই কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদনকারী, উৎপাদিত পণ্য গুদামে সংরক্ষণকারী, বাজারে বিতরণকারী এবং শেষপর্যন্ত পণ্যটি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া খুচরা বিক্রয়কারী পর্যন্ত, সব ধরণের প্রতিষ্ঠান। পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, যানবাহন, খাদ্য, বা ওষুধ – পণ্য যেমন হতে পারে বৈচিত্র্যময়, সরবরাহ চেইনও ঠিক তেমনই। 

পণ্য – তা সে কৃষিজাত হোক বা শিল্প –  কোথা থেকে আসে বা কোথায় যায়, তার অনুসন্ধান হতে পারে রিপোর্টারদের জন্য কাজের দারুন ক্ষেত্র। এ ধরণের অনুসন্ধান থেকে বেরিয়ে আসে জোরপূর্বক শ্রম, পরিবেশগত অপরাধ, দুর্নীতি, এমনকি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও। 

তবে গুরুতর চ্যালেঞ্জ হলো, এত কিছুর মধ্যে সংযোগ খুঁজে বের করাটা।

কোনো ভোগ্যপণ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট কৃষিজমি, প্রাকৃতিক সম্পদের খনি, বা শিল্প কারখানায় কাজের পরিবেশ কেমন এবং তাদের সঙ্গে সরবরাহ চেইনের সম্পর্ক কী – তা উন্মোচন করতে গেলে আপনার দরকার হবে অনেক ধরণের অনুসন্ধানী টুল। 

আপনার হাতে সেইসব টুল, গবেষণার উপকরণ, রিপোর্ট এবং নানা রকম তথ্যের উৎসের খবর তুলে দিতেই জিআইজেএন তৈরি করেছে সাপ্লাই চেইন রিসোর্স পেইজ। এর বাইরেও যদি জানতে চান, পড়ে নিন জিআইজেএনের  প্রাসঙ্গিক এই রিসোর্সগুলো:  

সাগরে থাকা জাহাজ অনুসরণ

মানব পাচার ও দাসত্ব 

খনিজ উত্তোলন শিল্প

দুর্নীতি বিষয়ক তথ্যভাণ্ডার

বিষয়টি সম্পর্কে আরো বিশদভাবে জানতে চাইলে, পড়তে পারেন: লার্নিং কাস্টম ল্যাঙ্গুয়েজ টু ট্র্যাক শিপমেন্ট। অষ্টম এশিয়ান ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে এটি উপস্থাপন করেছিলেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষক জিয়ানিনা সেনিনি। তিনি এখানে তুলে ধরেছেন – কাস্টমস কোডের ব্যবহার, বিল অব লেডিং, জাহাজ অনুসরণ, এবং কিভাবে পণ্যবাহী কন্টেইনার ট্র্যাক করতে হয়। 

এছাড়াও, দেখতে পারেন জিআইজেনের এই ভিডিও, যেখানে এপির সাংবাদিক মার্থা মেনডোজা বলেছেন, তারা মৎস্য শিল্পে দাসপ্রথার চল নিয়ে কিভাবে অনুসন্ধান করেছেন। 

অনুসন্ধান হতে পারে বহুমুখী 
সরবরাহ চেইন নিয়ে রিপোর্টিং করাটা নানা কারণেই চ্যালেঞ্জিং। কারণ, এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে প্রতারণা ও গোপনীয়তা। নিজেদের আড়াল করতে চাওয়া সরবরাহ নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ড উন্মোচন করতে গেলে দরকার হয়, উদ্ভাবনী দক্ষতা ও লেগে থাকার মানসিকতা। সরবরাহ চেইন অনেক সময় হতে পারে জটিল এবং একাধিক দেশে বিস্তৃত। ফলে সামগ্রিক চিত্র তুলে আনতে গিয়ে আপনার দরকার হতে পারে অন্য দেশের সাংবাদিকদের সহযোগিতা। এসব কারণে এ ধরণের অনুসন্ধানী প্রকল্পগুলো হয়ে উঠতে পারে ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ। 

পণ্য সরবরাহের শেকলটিকে বুঝতে হলে আপনাকে তার প্রতিটি সংযোগ চিহ্নিত করতে হবে। অনুসন্ধানে এই কাজটিই সবচেয়ে কঠিন। শেকলের জোড়াগুলোকে খুঁজে বের করতে যেসব তথ্য দরকার হয়, তা পাওয়া যায় বেশকিছু আন্তর্জাতিক সোর্স বা উৎস থেকে। পানজিভা, পিয়ার্স বা ইনিগমার মতো বাণিজ্য-তথ্যের দরকারি সেই উৎসগুলোর ঠিকানা মিলবে জিআইজেএনের এই টুলকিটে।

সরবরাহ চেইনে ছোট-বড় নানা ধরণের প্রতিষ্ঠান থাকে। একেবারে নিচের দিকের ছোট কোম্পানিগুলোর মালিক কারা, তা খুঁজে বের করাও আপনার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ অনেক দেশেই কর্পোরেট মালিকানার তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত আইনগুলো দুর্বল। মালিকানার তথ্য খোঁজার জন্য সাংবাদিকরা ওপেন কর্পোরেটস, ইনভেস্টিগেটিভ ড্যাশবোর্ড এবং বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টার-এর মত কিছু প্লাটফর্ম ব্যবহার করেন। আমাদের রিসোর্স তালিকায় তাদের পরিচিতিও তুলে ধরা হয়েছে।
সমসাময়িক উন্মোচন
জটিলতা যতই থাকুক, তার গভীরে গিয়ে সমস্যাকে তুলে আনাই সাংবাদিকদের কাজ। সরবরাহ চেইন নিয়েও এমন অনেক অনুসন্ধান হয়েছে এবং হচ্ছে। এখানে তেমনই কিছু উদাহরণ।

২০১৯ সালে গার্ডিয়ান ও দ্য ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ নিউজ-এর সঙ্গে জোট বেঁধে পরিবেশ বিধ্বংসী মাংস ব্যবসার খবর প্রকাশ করেছিল রিপোর্টার ব্রাজিল। মারফ্রিগ একটি ব্রাজিলিয় মাংস উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠান। তারা ফাস্ট ফুডের দোকানে মাংস সরবরাহ করে। সাংবাদিকরা অনুসন্ধান করে বের করেন, প্রতিষ্ঠানটি যে খামার থেকে গবাদিপশু কেনে, তারা গরু পালনের নামে অবৈধভাবে বনভূমি ধ্বংস করছে। (দেখুন সেই প্রতিবেদন)

২০১৯ সালে ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ নিউজের সংগ্রহ করা তথ্যের সঙ্গে নিজেদের তথ্য মিলিয়ে দেখেছিল জার্মানির সংবাদপত্র ওয়েল্ট এম জোনট্যাগ। তারা হিসেব করে দেখায়, জার্মানির রেস্তোরাঁ ও রিটেইল চেইনশপগুলোতে বছরে গড়ে ৪০ হাজার টন গরুর মাংস লাগে। আর এই মাংস তারা আমদানি করেছে ব্রাজিলিয় প্রতিষ্ঠান জেবিএস, মারফ্রিগ ও মিনার্ভার কাছ থেকে।

২০১৬ সালে অ্যাসোসিয়েট প্রেসের সাংবাদিকরা উন্মোচন করেন দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মৎস্য শিল্পে দাসপ্রথার করুণ চিত্র। এই রিপোর্টের কারণে মুক্তি পেয়েছিল দুই হাজারেরও বেশি আধুনিক ক্রীতদাস, যারা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একটি কোম্পানির হয়ে সাগরে মাছ ধরতেন। এপির সাংবাদিকরা খুঁজে বের করেন, এই সামুদ্রিক মাছগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন সুপারমার্কেটে যায়, এবং কারা সেই মাছ দিয়ে পোষাপ্রাণীর খাদ্য তৈরি করে। এই অনুসন্ধানী সিরিজের জন্য, ২০১৬ সালে পাবলিক সার্ভিস ক্যাটাগরিতে পুলিৎজার পুরস্কার জেতে এপি।২০১৮ সালের জুনে সাড়া জাগানো আরেকটি অনুসন্ধান প্রকাশ করে এপি। এবার তারা দেখায়, কিভাবে বিদেশী জলসীমা থেকে ধরে আনা ইয়েলোফিন টুনা বিক্রি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে, যদিও মার্কিনী সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানের দাবি ছিল, মাছগুলো নেহাতই সাধারণ ও সামুদ্রিক। এই অনুসন্ধানে এপির সাংবাদিকরা আমেরিকার সবচে বড় মাছের বাজারে নজরদারি করেছেন, মাছবাহী  ট্রাক অনুসরণ করেছেন, স্বাদ বুঝতে একজন বাবুর্চিকে সঙ্গে নিয়েছেন, মাছের ডিএনএ টেস্ট করিয়েছেন এবং তিনটি মহাদেশের জেলেদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। মার্কিন এই কোম্পানির সরবরাহ চেইন খুঁজতে গিয়ে সাংবাদিকরা পেয়েছেন বিদেশী জলসীমায় কাজ করা অভিবাসী জেলেদের। তাদের মুখ থেকেই উঠে আসে, “শ্রম আইন লঙ্ঘন, চোরাচালান এবং হাঙর, তিমি ও ডলফিন হত্যার গুরুতর অভিযোগ ।”

এবার নজর দেয়া যাক পোশাক শিল্পের দিকে। এই খাতের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা অনেক, বিভিন্ন দেশে তদন্তও হয়েছে।

২০১৬ সালে বিবিসি একটি অনুসন্ধান করে। তারা দেখায়, তুরস্কে শরণার্থী হয়ে আসা সিরিয় শিশুদের দিয়ে পোশাক তৈরি হচ্ছে মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার এবং অনলাইন রিটেইলার আসোসের জন্য। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের রিপোর্টার নাটালি কিট্রোয়েফ ও ভিক্টোরিয়া কিম, ২০১৭ সালে লিখেছিলেন এই প্রতিবেদন: ১৩ ডলারের একটি শার্টের নেপথ্যে ঘন্টায় ৬ ডলার পাওয়া শ্রমিক। লেখার উপ-শিরোনাম ছিল, “কম মজুরিতে পোশাক বানিয়ে দায় এড়াচ্ছে ফরেভার ২১ এবং অন্য রিটেইলাররা।”

কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের চিপ তৈরিতে ব্যবহার হয় কোবাল্ট। এটি উত্তোলন করা হয় খনি থেকে। কঙ্গোর কোবাল্ট খনিতে কিভাবে শিশুশ্রম ব্যবহার হচ্ছে, তা নিয়ে ২০১৮ সালে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিবিএস নিউজ। এজন্য কঙ্গোর সেই খনিতে যান তাদের রিপোর্টার ডেবোরা পাট্টা। সিবিএস-এর সেই রিপোর্টে বলা হয়, “কঙ্গোর কোবাল্ট খনিতে কাজের পরিবেশ নিয়ে এতই স্পর্শকাতরতা ছিল যে, প্রতি একশ ফুট পরপর সিবিএস নিউজের দলকে থামানো হয়েছে; নিরাপত্তারক্ষীরা বারবার কাগজপত্র দেখতে চেয়েছে; যদিও আগেই অনুমতি নেওয়া ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।”

কঙ্গোতে যারা কোবাল্ট কেনাবেচা করে, তারা কখনো প্রশ্ন করেনি – এই কাজে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা। গোপন একটি ক্যামেরা ব্যবহার করে ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছিল সিবিএস। বড় বড় কোম্পানিগুলো দাবি করে, তারা এজাতীয় কোবাল্ট ব্যবহারই করে না।

ওয়ালমার্টের চীনা কারখানাগুলো কিভাবে পরিবেশ দূষণ করছে, তা তুলে এনেছিলেন অ্যান্ডি ক্রোল। ২০১৩ সালে মাদার জোনসের একটি আর্টিকেলে তিনি উপসংহার টানেন, কোম্পানির অডিটররা যেন কিছুই দেখছেন না। 
মূল্যবান হতে পারে এনজিও যোগাযোগ
সরবরাহ চেইন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা প্রায়ই স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক এনজিওদের সাহায্য নেন। তাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। একেকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে একেক খাতের তথ্য পাওয়া যায়। যেমন সিফুড, তৈরি পোশাক, খনিজ দ্রব্য, ইলেকট্রনিক পণ্য ইত্যাদি। অনুসন্ধানের জন্য প্রাথমিক তথ্য আসতে পারে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট, ইউনিয়ন, কমিউনিটি গ্রুপ এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকেও।

সরবরাহ চেইন নিয়ে এনজিওরাও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান করেছে। ২০১৮ সালের মে মাসে গ্রীনপিসের একটি রিপোর্ট ছিল সমুদ্রে মাছ ধরার পরিস্থিতি নিয়ে। সমুদ্রে দুর্দশা নামের এই রিপোর্টে দেখানো হয় করুণ কর্মপরিবেশ এবং তাইওয়ানে দূর থেকে বসে মাছ ধরার ক্ষতিকর পদ্ধতি। ২০১৮ সালের জুনে, ট্রেড ইউনিয়নগুলোর বৈশ্বিক জোট এবং শ্রম ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো প্রকাশ করে আরেকটি রিপোর্ট। সেখানে দেখানো হয় এইচএন্ডএম এর পোশাক সরবরাহ চেইনে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার চিত্র। 

কখনো কখনো, সাংবাদিকরা সরাসরি কাজ করেন অ্যাক্টিভিস্টদের সঙ্গেও।

দক্ষিণ আফ্রিকার সংবাদমাধ্যম, কার্তে ব্লস কাজ করেছিল অস্ত্র চোরাচালান বিশেষজ্ঞ ক্যাথি লিন অস্টিনের সঙ্গে জোট বেঁধে। তাঁরা গণ্ডার শিকারের ঘটনাস্থলগুলো ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছিলেন ব্যবহৃত বুলেট-গোলাবারুদ, যা তৈরি হয়েছে চেক রিপাবলিকে। চার-পর্বের এই সিরিজ প্রযোজনা করেন জাশা সোয়েনডেনওয়াইন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অনুসন্ধানী প্রকল্পে রিপোর্টিং করা হয় মোজাম্বিক, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। নজরদারি এবং সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের। খুঁজে বের করা হয় সরকারি নথিপত্র এবং ব্যবহার করা হয় গোপন ক্যামেরা।
কর্পোরেট আইনের সুবিধা নিন
সরবরাহ চেইন নিয়ে গবেষণার জন্য আপনাকে কর্পোরেট আইন বুঝতে হবে। এসব আইনের কারণেই প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শীর্ষ নির্বাহীরা নিয়ন্ত্রণে বা চাপে থাকেন। 

কর্পোরেট আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও আইন ক্রমেই বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের সরকার এবং এনজিওদের উদ্যোগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার নানা পদ্ধতিও তৈরি হচ্ছে। তেমনই কয়েকটি এনজিও – নো দ্য চেইন, টার্নিং পয়েন্ট এবং কর্পোরেট হিউম্যান রাইটস বেঞ্চমার্ক।

কর্পোরেশনগুলো যেন তাদের সরবরাহ চেইনে থাকা সমস্যা খুঁজে বের করে এবং তা সমাধান করে, সেজন্য তাদের ওপর চাপ অব্যাহত আছে। আর এই কাজে তাদের সহায়তার জন্য গড়ে উঠছে অনেক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। রিপরিস্ক, তাদের অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য: “স্বতন্ত্র তথ্যপ্রযুক্তি টুল ব্যবহারের মাধ্যমে, রিপরিস্ক প্রতিদিন ৮০ হাজারেরও বেশি সংবাদমাধ্যম ও স্টেকহোল্ডারদের থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই ও মূল্যায়ন করে। কোনো সমস্যা বা ঝুঁকি দ্রুত চিহ্নিত করার জন্য, ১৫টি ভাষায় চালানো হয় এই যাচাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া।”

কিন্তু তাদের কাছ থেকে খুব বেশি স্বচ্ছতা আশা করবেন না। এই পরামর্শকরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়বদ্ধ। সরবরাহ চেইন নিয়ে এসব কর্পোরেট রেকর্ড সংবাদমাধ্যমের কাছে পৌঁছায় না বললেই চলে। তবে সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের তথ্য দিয়ে সাহায্য করে। 

সরবরাহ চেইন অনেক সময় হতে পারে জটিল এবং একাধিক দেশে বিস্তৃত। ফলে সামগ্রিক চিত্র তুলে আনতে গিয়ে আপনার দরকার হতে পারে অন্য দেশের সাংবাদিকদের সহযোগিতা।২০১০ ক্যালিফোর্নিয়া ট্রান্সপারেন্সি ইন সাপ্লাই চেইন অ্যাক্ট এবং যুক্তরাজ্যের ২০১৫ মডার্ন স্লেভারি বিলের মত কিছু আইনের কারণে এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের চেয়ে বেশি তথ্য প্রকাশ করে।

এভাবে, সামনের দিনগুলোতে হয়তো স্বচ্ছতা আরো বাড়বে, এবং তার প্রতিফলন দেখা যাবে দোকানে রাখা পণ্যের তাকে। 

প্রযুক্তির কল্যানে বিশ্বের কিছু অংশে এমন দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে যেখানে ক্রেতারা তাদের ফোন দিয়ে মোড়ক স্ক্যান করে দেখে নিতে পারছেন – পণ্যটি কোথায়, কারা, কোন পরিস্থিতিতে তৈরি করেছে। কিন্তু এ ধরণের প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত আকারে বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূরের ব্যাপার।
খবরের প্রতিক্রিয়া 
সংবাদমাধ্যমের কাভারেজ এই ইস্যুতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। 

২০১৭ সালে স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণার শেষটা করা হয়েছিল এভাবে: “এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্নেন্স (ইএসজি)-কে ঘিরে সংবাদমাধ্যমের নেতিবাচক প্রতিবেদন একটি প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রিস্ক বাড়ায়।” 

কখনো কখনো সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা শ্রমিকদের জীবনও বাঁচায়। এপির সাংবাদিক মার্থা মেনডোজা ও তাঁর সহকর্মীরা মিলে ১৮ মাস ধরে একটি অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন। যার ফলে ইন্দোনেশিয়ার জেলে নৌকায় ক্রীতদাসের মতো কাজ করা দুই হাজার মানুষ মুক্তি পেয়েছিলেন।

এমন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ক্রমাগত ঘটতে থাকে। তাই ফলোআপ করাটা জরুরি। সাংবাদিক ও গবেষক নিকোলাস পোপ বলেন, “কখনো কখনো বিষয়টি আমাদের চোখের আড়ালেই রয়ে যায়।” তিনি আরো ব্যাখ্যা করেন এভাবে: “সাধারণত দেখা যায়, বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে পণ্য সরবরাহ করে, এমন কোনো কারখানায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশ পেলে (ধরা যাক শিশুশ্রম নিয়ে), সত্যিকারের কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং সেখান থেকে সরে পড়ে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি। তারা বড় বড় ঘোষণা দেয়। বলে, এসব তারা জানতো না এবং অবিলম্বে সেই সরবরাহকারী কারখানার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করবে। তাদের আশা থাকে, কেলেঙ্কারিটা যেন এভাবে সবার অগোচরে চলে যায়।”

কিন্তু কাহিনী এখানেই শেষ হয় না। এমন ছোট ছোট কারখানার সঙ্গে বড় একটি ব্র্যান্ড চুক্তি বাতিল করলে, হাজারো শ্রমিক তাদের জীবিকা হারায়। এদের সহায়তায় কেউই কিছু করে না। যে সাংবাদিকরা এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো উন্মোচন করছেন, তাদের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, নিপীড়নের শিকার শ্রমিকদের এই দুরাবস্থার অবসান ঘটানোর জন্য বড় ব্র্যান্ডগুলোই যেন পদক্ষেপ নেয়। কারণ দাম ও পণ্য হস্তান্তরের সময় নিয়ে ব্র্যান্ডগুলো যে চাপ তৈরি করে, তা-ই সমস্যার প্রধান কারণ, বিশেষত তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে।

সরবরাহ চেইন নিয়ে রিপোর্টিং বিপজ্জনকও হতে পারে। যেমন: ইন্দোনেশিয়ার দুর্গম অঞ্চলে পাম তেল উৎপাদন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে হুমকি ও শারিরীক নিপীড়নের মুখে পড়েছেন সাংবাদিকরা। তুর্কমেনিস্তানের তুলা শিল্পে জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে কারাগারে বন্দী হয়েছেন গ্যাসপার মাতালেভ। ইন্টারন্যাশনাল লেবার রাইট ফোরাম ও দ্য ইনডিপেনডেন্ট সূত্রে জানা গেছে, তিনি শারিরীকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

এই গাইডটি সম্পাদনা করেছেন জিআইজেএন রিসোর্স সেন্টারের পরিচালক টবি ম্যাকিনটশ। তিনি ছিলেন ওয়াশিংটন–ভিত্তিক রিপোর্টার এবং ৩৯ বছর ধরে ব্লুমবার্গ বিএনএ-এর সম্পাদক হিসাবে কাজ করেছেন। অলাভজনক ওয়েবসাইট ফ্রিডমইনফো ডট ওআরজি-এর সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। এখানে তিনি কাজ লেখালেখি করেছেন বিশ্বজুড়ে তথ্য অধিকারের ব্যবহার নিয়ে। তথ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, এফওআইএনেট-এর পরিচালনা পর্ষদেও ছিলেন তিনি।

জলবায়ু সংকট: অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য আইডিয়া

English

জলবায়ু পরিবর্তন গোটা বিশ্বের জন্যই বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কথা মাথায় রেখেই এই রিসোর্স পেইজ তৈরি করেছে জিআইজেএন। এর উদ্দেশ্য হলো, বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নতুন নতুন ধারণা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা, যেন তারা বেশি করে রিপোর্ট করতে পারেন।  

এই রিসোর্স পেইজে তিনটি ভাগ। 

প্রথম ভাগে, আমরা তুলে ধরেছি গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রবন্ধ। তাতে পাওয়া যাবে, কিভাবে অনুসন্ধান করতে হয়, সম্ভাব্য বিষয় কী হতে পারে এবং রিপোর্ট করতে গেলে কী মাথায় রাখতে হবে।

দ্বিতীয় ভাগে, আমরা জড়ো করেছি কিছু মন্তব্য প্রতিবেদন। এতে প্রাধান্য পেয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সমসাময়িক সাংবাদিকতার সমালোচনা। পরামর্শ রয়েছে, কিভাবে রিপোর্টিং আরো উন্নত করা যাবে।

তৃতীয় ভাগে, পাওয়া যাবে জলবায়ু নিয়ে সাংবাদিকদের জন্য দরকারী তথ্য ও রিসোর্সের লিংক।
প্রথম ভাগ: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও জলবায়ু পরিবর্তন
জলবায়ু পরিবর্তন: যেভাবে অনুসন্ধান করবেন এই শতাব্দীর সবচেয়ে জরুরি স্টোরি; লিখেছেন আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক জেমস ফান। এখানে তিনি তুলে ধরেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কতরকমের অনুসন্ধানী রিপোর্ট করা যায়।

এখানে তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পরামর্শ:

গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের প্রধান উৎস হিসেবে কয়লা, তেল ও খনিজ গ্যাস উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো হতে পারে আপনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রধান বিষয়বস্তু।
আরো অনেক ধরণের শিল্প-প্রতিষ্ঠান নিয়ে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। তাদের নিয়ে গভীর ও বিশ্লেষণী প্রতিবেদন করুন।
নজর রাখুন – গোষ্ঠীস্বার্থ কিভাবে প্রভাব ফেলছে বিভিন্ন দেশের সরকারি নীতিমালায়। রিপোর্ট করুন, সেই নীতিগুলো নিয়ে। প্রশ্ন তুলুন, “সরকার কী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার চেষ্টা করছে, নাকি পরিস্থিতি আরো খারাপ দিকে নিয়ে যাচ্ছে?”
“শুধু নিজ দেশে কী ঘটছে, সেদিকে নজর রাখাই যথেষ্ট নয়। খতিয়ে দেখুন, আপনার সরকার অন্য দেশের পরিবেশের ওপর কী ধরণের প্রভাব ফেলছে।”
সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করুন – আইনকানুনের প্রয়োগ ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা। 
গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন মোকাবিলায় কী ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে – নজরে রাখুন।
জলবায়ু পরিবর্তনের নিয়ে প্রভাব আরো বেশি বেশি রিপোর্ট করুন।
অনুসন্ধান করুন – জলবায়ু নিয়ে অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপগুলো কী করছে, তাদের লক্ষ্য কী, এবং তারা কোথা থেকে টাকা পাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ ও অভিযোজনের ক্ষেত্রে সমাধানের উদ্যোগগুলোকেও অনুসন্ধানের আওতায় আনুন।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ বা অভিযোজনের জন্য সামনে কী কী করা দরকার, তা-ও খতিয়ে দেখুন।

দ্য মিডিয়া আর কমপ্লেসেন্ট হোয়াইল দ্য ওয়ার্ল্ড বার্নস। লেখাটির উপ-শিরোনাম ছিল: “১.৫ ডিগ্রীর পৃথিবীর পক্ষে লড়াই করা সাংবাদিকদের জন্য নতুন একটি গাইড।” ২০১৯ সালে প্রবন্ধটি লিখেন দ্য নেশনের পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিক মার্ক হার্টসগার্ড এবং কলাম্বিয়া জার্নালিজম রিভিউর প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক কাইল পোপ। তাঁরা বলেন, “এখন পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যত রিপোর্ট হয়েছে, সেগুলো দেখে মনে হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমই এই ইস্যুর গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। ব্রেকবিহীন একটি ট্রেন আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। এর নাম জলবায়ু পরিবর্তন। এটি কোনো আতঙ্ক ছড়ানোর বিষয় নয়; এটি বৈজ্ঞানিক তথ্য।”

তাঁদের পরামর্শ:

পাঠকদের দোষ দেবেন না। আর শিশুদের কথা শুনুন।
জলবায়ু নিয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ ডেস্ক গড়ে তুলুন, কিন্তু রিপোর্ট যাতে একঘেঁয়ে না হয়।
বিজ্ঞান সম্পর্কে জানুন।
কোনো এক পক্ষের কথায় ভজে যাবেন না। 

ক্ষমতাকেন্দ্রিক মনোভাব পরিহার করুন।
দুর্দশাগ্রস্তদের সাহায্য করুন।
সমাধান নিয়ে কথা বলুন।
কারো দিকে আঙুল তুলতে ভয় করবেন না।

২০১৯ সালে শীর্ষ সাংবাদিক, বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের এক জায়গায় করেছিল কলাম্বিয়া জার্নালিজম রিভিউ ও দ্য নেশন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল “বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রীর নিচে ধরে রাখার যে লক্ষ্য নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সাংবাদিকতার একটি গাইড বানানো।” এখানে দেখুন পাঁচ ঘন্টার সেই টাউন হল মিটিং-এর ভিডিও। লন্ডন-ভিত্তিক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হুয়ান মেয়রগা টুইটারে, তার স্প্যানিশ অনুবাদও প্রকাশ করেছিলেন। এই সম্মেলন থেকেই শুরু হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প, যার নাম: কভারিং ক্লাইমেট নাও।

এখানে দেখুন সেই সম্মেলন নিয়ে সিজেআর-এর সারমর্ম। লিখেছেন জন ওসোপ। এই সম্মেলন নিয়ে অন্যদের মতামত ছিল এরকম:

বলিভিয়ার আম্বিয়েদাল ডে ইনফরমেসিয়ন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক এদুয়ার্দো ফ্রাঙ্কো বার্টন বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন জিআইজেসি১৯-এ। এবং নিজের বক্তব্যের সারমর্ম টেনেছিলেন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে। দেখুন সেই টিপশিট। 
লিটারারি হাব-এর কোরিন সেগাল লিখেছেন, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড দ্য জার্নালিস্টস হু আর ট্রায়িং টু সেভ ইউ;
ডেপল বিশ্ববিদ্যালয়ে কলেজ অব কমিউনিকেশনের সহযোগী অধ্যাপক জিল হপকে লিখেছেন: এক্সপার্টিজ অব ক্লাইমেট চেঞ্জ কমিউনিকেশন রিসার্চার্স নিডেড ইন #কাভারিংক্লাইমেটনাও;
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে কমিউনিকেশন, পাবলিক পলিসি অ্যান্ড আরবান অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক এবং এনভায়রনমেন্টাল কমিউনিকেশন জার্নালের প্রধান সম্পাদক ম্যাথিউ সি. নিসবেট লিখেছেন: সায়েন্স, পাবলিকস, পলিটিকস: দ্য ট্রাবল উইথ ক্লাইমেট ইমার্জেন্সি জার্নালিজম।

দ্য মিডিয়া ইজ ফেইলিং অন ক্লাইমেট চেঞ্জ – হিয়ার ইজ হাও দে ক্যান ডু বেটার অ্যাহেড অব ২০২০; গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এই লেখায় কিছু পরামর্শ দিয়েছেন এমিলি হোল্ডেন: 

সংখ্যায় কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভাবে, এমন কনজারভেটিভদের দিকে দৃষ্টি দিন।
নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীরা সামনে না আনলেও, আপনারা সামনে আনুন জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে আসুন স্থানীয় নিউজ স্টোরি হিসেবে।
সমাধানের দিকে মনোযোগ দিন।
লিখুন বা বলুন খুব সাবধানতার সঙ্গে।

কলাম্বিয়া জার্নালিজম স্কুলের ডক্টোরাল ক্যান্ডিডেট রোসলিন্ড ডোনাল্ড তাঁর দ্য ক্লাইমেট ক্রাইসিস ইজ এ স্টোরি ফর এভরি বিট প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন কিভাবে জলবায়ু পরিবর্তনকে নিউজরুমের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্তর্ভূক্ত করা যায়। তাঁর তালিকায় আছে: স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, রাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিবাসনের সম্পর্ক, জাতীয় নিরাপত্তা, খেলাধুলা, খাদ্য ও কৃষি। লেখাটি ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কলাম্বিয়া জার্নালিজম রিভিউয়ে। একই বিষয়ে ২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া একটি বক্তৃতা নিয়ে লেখা এই প্রবন্ধও দেখতে পারেন: এইট নিউজরুম বিটস ইউ ডিডন্ট নো কভারড ক্লাইমেট চেঞ্জ।

১০টি “বেস্ট প্র্যাকটিসের” তালিকা তৈরি করেছে কভারিং ক্লাইমেট নাও। সহযোগিতামূলক এই প্রকল্পের অংশীদার হিসেবে আছে ৪০০টি সংবাদমাধ্যম। 

১. বিজ্ঞানকে হ্যাঁ বলুন

২. জলবায়ু সংকট প্রতিটি বিটেরই আলোচ্য বিষয়।

৩. “তিনি বলেছেন, তিনি বলেন” এ জাতীয় বাক্য পরিহার করুন।

৪.