প্রবেশগম্যতা সেটিংস

The BBC investigated the online market in sexual harassment and assault videos. Image: Screenshot / BBC Eye

লেখাপত্র

বিষয়

পূর্ব এশিয়াতে যৌন নিপীড়নের ভিডিওর অনলাইন বাণিজ্য নিয়ে অনুসন্ধান

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

২০২৩ সালে চীনের সেরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তালিকায় জায়গা করে নেয় বিবিসি আই-এর “ক্যাচিং এ পারভার্ট: সেক্সচুয়াল অ্যাসাল্ট ফর সেল”

২০২৩ সালের জুনে প্রকাশিত অনুসন্ধানী এ তথ্যচিত্রটি মাত্র সাত মাসের মধ্যে ইউটিউবের চীন ও ইংরেজি ভাষার চ্যানেলগুলোতে প্রায় ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন বার দেখা হয়। পাশাপাশি তথ্যচিত্রটি চীনের মূল ভূখণ্ডে— যেখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।

তথ্যচিত্রটি চীনের জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম উইবোতে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সেটি চীনের অফিসিয়াল মিডিয়া ও পুলিশ অ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যমে শেয়ার করা হলে অনলাইন যৌন নির্যাতন কার্যক্রমের প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। (এটি অনলাইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবে উইবো আলোচনার বিষয়বস্তুকে কাটছাঁট এবং প্রতিবেদনের দৃশ্যমানতা সীমিত করেছে।) 

এক বছর ধরে তৈরি করা এ প্রতিবেদনে বিবিসি আই টিম তুলে আনতে চেষ্টা করেছে, কীভাবে পূর্ব এশিয়ার ট্রেনে, বাসে এবং বিভিন্ন জনপরিসরে নারীর ওপর পুরুষদের চালানো যৌন হয়রানি ও লাঞ্ছিত করার হাজার হাজার ভিডিও ধারণ করে তা অনলাইনে বিক্রি করা হচ্ছে। ওপেন সোর্স গবেষণা এবং আন্ডারকভার কৌশলের মাধ্যমে অনুসন্ধানী দলটি “আঙ্কেল চি” এর আসল পরিচয় উন্মোচন করে। জাপানে অবস্থানকারী মাত্র ২৭ বছর বয়সী এ চীনা লোকটি কারো কারো কাছে রীতিমতো অনলাইন ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। এ অনুসন্ধানে তাকে যৌন শিকারীদের নেটওয়ার্কের নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ড হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যৌন শিকারীরা বিভিন্ন জনপরিসরে নারীর ওপর যৌন নির্যাতন চালায় ও তা ভিডিও ধারণ করে এবং ওয়েবসাইটগুলোতে বিক্রি করে— যেখানে কয়েক হাজার সদস্য রয়েছে, যারা টাকা দিয়ে ওই ভিডিওগুলো কিনে থাকে।

পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ হাতে পাওয়ার পর,  সাংবাদিক দলটি আঙ্কেল চি-এর বাসভবনের বাইরে তার মুখোমুখি হয়। তাকে প্রশ্ন করা হয়, তার উদ্দেশ্য কী এবং নারীদের ওপর তার কাজের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো তিনি বুঝতে পারেন কিনা? অভিযোগের বিপরীতে তিনি কোনো জবাব দেননি। পরের দিন জাপান থেকে পালিয়ে যান। তার অবস্থান এখনো অজানা রয়ে গেছে। (যদিও চীনা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে বলেছে জাপান ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি চীনে প্রবেশ করেননি।)

গোপন চিত্রগ্রহণের শিকার হয়েছেন এমন নারীদের পাশাপাশি, পুলিশ কর্মকর্তা, সেক্স ক্লাব অপারেটর এবং পূর্ব এশিয়ায় এ ধরনের চিত্রগ্রহণের সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণাকারী অ্যান্টি-গ্রোপিং সংস্থার প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তথ্যচিত্র নির্মাণকারী অনুসন্ধানী দলটি।

তথ্যচিত্রটির পরিচালক-প্রযোজকদের মধ্যে দুজন, আলিয়াউম লেরয়, শেনশেন সেন এবং রিপোর্টার-প্রযোজক ঝাওইন ফেং-এর সঙ্গে কথা বলে জিআইজেএন।

জিআইজেএন: আপনারা কিভাবে এ বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারেন?

শেনশেন সেন: ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আমি প্রথম অনলাইনে যৌন নির্যাতনের ভিডিও বিক্রির ব্যবসা সম্পর্কে জানতে পারি। টুইটারে, অনেক ব্যবহারকারী গণপরিবহনে যৌন নির্যাতনের গোপন রেকর্ডিংয়ের ভিডিও দেখতে আগ্রহী বলে মনে হয়েছিল — এবং তাদের মধ্যে অনেকেই আঙ্কেল চি নামের একটি অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করছে। এ অ্যাকাউন্টটি ট্রেন থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে নারীদের ওপর যৌন নিপীড়নের সংক্ষিপ্ত ভিডিও পোস্ট করে দাবি করেছে যে বিভিন্ন “চিত্রনাট্যকার” সেগুলো শুট করেছে। আমরা পরবর্তীতে অনুসন্ধান করে দেখি যৌন নিপীড়নের ভিডিও কেনা-বেচার ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে একটির নাম সেই প্রোফাইলে দেওয়া রয়েছে৷ [এমনকি] সেই সময়েও বিষয়টি খুব স্পষ্ট ছিল যে এই লোকগুলো গুরুতর অপরাধ করছে।

জিআইজেএন: বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করার পরে, আপনারা কীভাবে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করেছেন?

শেনশেন সেন: তথ্যচিত্রটি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় খরচের বন্দোবস্ত করার প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ কঠিন। সবার আগে আমাদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ জোগাড়ের প্রয়োজন ছিল। আমাদের সম্পাদক মোস্তফা খলিলি, প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে ছিলেন। এছাড়াও আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগ ও আইনি দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সহযোগিতা ও পরামর্শ পেয়েছি।

ঝাওইন ফেং: ওয়েবসাইটগুলো সম্পর্কে যতটা সম্ভব আমরা তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করি। ওয়েবসাইট থেকে যে যে অ্যাকাউন্টগুলোতে অর্থ পাঠানো হয়েছে আমরা ওগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা শুরু করি। বিশেষ করে টেলিগ্রাম গ্রুপের সঙ্গে সংযুক্ত অ্যাকাউন্টগুলো, ব্যবহারকারীরা যেখানে হ্যাং আউট করে, বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারণকৃত ভিডিওগুলো শেয়ার করে, এবং গ্রুপের অ্যাডমিন  আঙ্কেল চির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করে,  যিনি কিনা বিকারগ্রস্ত সম্প্রদায়ের গুরু হিসাবে সমাদৃত। আমরা দেখতে পাই, নেপথ্যের এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা লোকেরা তাদের আসল পরিচয় লুকানোর জন্য ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঠিক তখনই আমরা অনুভব করতে শুরু করি যে, অনুসন্ধানটির কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনলাইনে যথেষ্ট তথ্য থাকবে। অনলাইনে কোথায় কীভাবে টাকার হাতবদল হয়েছে সেটি অনুসরণ করার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসু হয়।

ছবি: স্ক্রিনশট/ বিবিসি আই

জিআইজেএন: আপনারা একজন ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছেন যিনি একটি পেপ্যাল ​​অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অ্যাঙ্কেল চির পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইটের প্রশাসক হিসাবে কাজ করতেন। অনুসন্ধান এগিয়ে নেওয়ার  জন্য এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শোনা যায় যে তাদের নাম — জ্যাং শিনিউ — স্বাভাবিকভাবেই এটি একটি চীনা নাম, কাজটি আপনারা কীভাবে করলেন?

আলিয়াউম লেরয়: পেপ্যাল অ্যাকাউন্ট থেকে আমরা “জ্যাং শিনিউ” নামটি খুঁজে পাই, প্রোফাইলে স্বর্ণে মোড়ানো একটি মাথার খুলি দেওয়া ছিল। অ্যাকাউন্টটি যে মুদ্রায় অর্থ গ্রহণ করছে তা হচ্ছে জাপানি ইয়েন। তাছাড়া তথ্যের শেষ অংশটি জাপানের লোকেশনকে ইঙ্গিত করেছিল, তবে আমাদের আরও সুনির্দিষ্ট তথ্যের প্রয়োজন ছিল।

পরিচালক-প্রযোজক শেনশেন সেন। ছবি: স্ক্রিনশট

প্রায় একই সময়ে, আমরা একটি পেপ্যাল ​​অ্যাকাউন্টের সঙ্গে লিঙ্কযুক্ত ওয়েবসাইটগুলোর একটিতে থেকে একটি জিমেইল ঠিকানা পাই। পেপ্যালে, আপনি ইমেল ঠিকানার মাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট খুঁজতে পারেন। আমরা ওই জিমেইল ঠিকানায় যাই, ফলাফল আসে “জ্যাং শিনিউ” নামের সঙ্গে স্বর্ণমোড়ানো মাথার খুলির একটি ছবি।

এই জিমেইলটি মূলত পেপ্যাল ​​অ্যাকাউন্টের নেপথ্যের আসল মালিককে খুঁজে পাওয়ার আরেকটি যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। আমরা যখন এটিকে গুগল কনট্যাক্টে রাখি, তখন আমাদের সামনে বিন্যস্ত চুলের থিয়েট্রিকাল মেকআপসহ এক যুবকের প্রোফাইল ছবি আসে। এরপর রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে আমরা ছবিটির উৎস খুঁজে পাই। রক মেটাল ব্যান্ড নিয়ে লেখা একটি টুইটে ছবিটি এমবেড করা হয়েছিল। ‍টুইটটি পোস্ট করা হয় টোকিওতে বসবাসকারী ৩০ বছর বয়সী চীনা বংশোদ্ভূত গায়ক “নকটিস জ্যাং” এর অ্যাকাউন্ট থেকে। একটি মেটাল ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যান ছিলেন নকটিস।

বিষয়টির আরো গভীরে পৌঁছাতে আমরা চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলোতে অনুসন্ধান চালাই। আমাদের প্রথম আন্ডারকভার বৈঠকে, নকটিস আমাদের জানিয়েছিলেন যে তার আসল নাম জ্যাং শিনিউ।

বিবিসির এই অনুসন্ধানী তথ্যচিত্রে আন্ডারকভার রিপোর্টার “ইয়ান” নকটিস জ্যাংয়ের সঙ্গে দেখা করেন, যিনি আঙ্কেল চি বা মাওমি নামেও পরিচিত।

জিআইজেএন: তাকে সফলভাবে খুঁজে বের করার আগে আপনারা কি ওয়েবসাইট অপারেটরের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য অন্য কোনো অনুসন্ধানী পদ্ধতি ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলেন?

আলিয়াউম লেরয়: হ্যাঁ, আমরা সবগুলো আলাদা আলাদা পেমেন্ট অ্যাকাউন্ট খুঁজে দেখি — যেগুলো আলি পে, ইউচ্যাট পে, পেপ্যাল এবং অ্যামাজনে নিবন্ধিত। ওয়েবসাইটে পাওয়া নামগুলো অনলাইনে খোঁজার মাধ্যমে তাদের পরিচয় উন্মোচনের চেষ্টা করেছি। আমরা কয়েকটি নামও খুঁজে পাই, কিন্তু নকটিস জ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারিনি। মূলত এটাই আমাদের তার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। আমাদের কাছে শক্তিশালী প্রাথমিক প্রমাণ ছিল যে, ভয়াবহ এসব ওয়েবসাইটগুলোর সঙ্গে তার কোনো না কোনো সম্পর্ক রয়েছে।

ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে আমরা আবিষ্কার করি যে, ২৭ বছর-বয়সী উইচ্যাট পে অ্যাকাউন্টির এ চীনা মালিক অনলাইন যৌন নিপীড়ন ব্যবসার নেপথ্যের কারিগর। কিন্তু তখনও আমরা জানতাম না অ্যাকাউন্টের পিছনে থাকা ব্যক্তিটি আসলে কে। পরবর্তীতে আন্ডারকাভার বৈঠকের সময় তার পরিচয় বের হয়ে আসে।

একভাবে, অনুসন্ধানটি ওসিন্ট [ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স] এর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা— দুটোরই নিখুঁত উদাহরণ।

জিআইজেএন: এই অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আপনারা কি কোনো অনুসন্ধানী সরঞ্জাম বা ডেটাবেসের কথা সুপারিশ করবেন?

আলিয়াউম লেরয়: কখনও কখনও সবচেয়ে সহজ কৌশলগুলো আপনাকে আপনার সাফল্য এনে দেবে। এই অনুসন্ধানের জন্য আমরা বিভিন্ন গুগল সার্চ অপারেটর ব্যবহার করেছি, ছবি খোঁজার বিভিন্ন বিকল্প কৌশল প্রয়োগ করেছি, এবং ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করেছি।

আমরা আরও কিছু উন্নত টুল ব্যবহার করেছি, যেমন আমাদের ওয়ার্কস্টেশন থেকে টার্মিনাল কমান্ড লাইনের (অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাক্ট করতে ব্যবহৃত টেক্সট-ভিত্তিক ইন্টারফেসকে বোঝায়) মাধ্যমে নিদের্শনা দিয়েছি, যেমন এপিওস (Epieos) হোলেহে (Holehe) এবং ইন্সটলোডার (Instaloader)।  ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স টুলগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলো হারিয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যখন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের অ্যালগরিদম আপডেট করে। আপনি তাদের ওপর নির্ভর করতে পারবেন না।

তাই, অনুসন্ধানী পরিকল্পনাটি ঠিক করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে কোথায় যেতে হবে এবং আপনার কোন ধরনের টুলের প্রয়োজন হতে পারে, এটিই তা নির্ধারণ করতে সহায়তা করবে। আমাদের ক্ষেত্রে, আমরা জানতে চেয়েছিলাম ওয়েবসাইটটি কে পরিচালনা করে। ব্যবসার শীর্ষে কারা আছেন, যাদের কাছে অর্থ প্রবাহিত হয়। এই কারণেই আমরা অর্থ অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং ওয়েবসাইট থেকে অর্থ যায়, এমন অ্যাকাউন্টগুলো খুঁজে বের করেছি। আমাদের পরিকল্পনা ছিল যারা অর্থ পাচ্ছেন তাদের চিহ্নিত করা এবং এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারীর কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, পরবর্তীতে আমরা তা করতে সফল হই।

জিআইজেএন: এই তদন্তে আপনারা “ইয়ান” নামে একটি কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করেছেন। অল্প কথায় কী বলবেন যে কাজটি কীভাবে করেছেন?

ঝাওইন ফেং: প্রাথমিক প্রমাণগুলো আমাদের টোকিওতে অবস্থানকারী চীনা বংশোদ্ভূত গায়ক নকটিস জ্যাংয়ের কাছে নিয়ে যায়। আমাদের সুযোগ্য গবেষক দলটি জ্যাং ও তার মেটাল ঘরানার গানের ওপর ব্যাপক গবেষণা করে এবং আমাদের গোপন সহকর্মী ইয়ানকে উপস্থাপনের জন্য বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে।

জ্যাং যখন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হন, তখনো চিন্তায় ছিলাম যে তার সঙ্গে আলোচনাটি সঙ্গীত থেকে টেনে কীভাবে যৌনতা এবং শেষ পর্যন্ত যৌন নির্যাতনের ওয়েবসাইটে নিয়ে যাব। এ পর্যায়ে আমাদের দলটি ইয়ানের প্রোফাইলে একটি অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করে—  যে তার বিনোদন কোম্পানি পর্ণ ফিল্ম তৈরি করতো এবং তার বস পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইটে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এটি ইয়ানকে টোকিওর বিনোদন শিল্প এবং যৌন নির্যাতনের ভিডিও বিক্রি করে এমন ওয়েবসাইট সম্পর্কে প্রশ্ন করার একটি ভাল যোগসূত্র তৈরি করে দেয়। [বিবিসি টিম যখন পরে যোগাযোগ করেছিল, জ্যাং অভিযোগের কোনো জবাব দেয়নি]।

জিআইজেএন: গোপন অনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কিত নৈতিক বিষয়গুলোকে আপনারা কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আলিয়াউম লেরয়: বিবিসিতে আমাদের গোপনে চিত্রধারণ ও তা ব্যবহার সম্পর্কিত কঠোর সম্পাদকীয় নির্দেশিকা রয়েছে। আমাদের কাছে অন্যায় সংক্রান্ত প্রাথমিক প্রমাণের পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ থাকতে হবে। একমাত্র জনস্বার্থেই তা প্রকাশ করা যাবে। অনুসন্ধানের বিষয়গুলো প্রমাণ করার আর কোনো উপায় যদি অবশিষ্ট না থাকে, একমাত্র সেক্ষেত্রে আমরা গোপন রেকর্ডিং ব্যবহার করতে পারি। সংগঠনের একাধিক স্তর বিষয়টি যাচাই করে তারপরই অনুমোদন দেওয়া হয়।

আমরা একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হই, এটি নিশ্চিত করতে যে ব্যক্তির অন্যায় বা প্রতারণার ঘটনা উপস্থাপনে যেন কোনো অতিরঞ্জন না হয়, বরং তার কাজের সঙ্গে সমানুপাতিক বা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। আর এ প্রক্রিয়ায় বিবিসির জ্যেষ্ঠ সম্পাদকীয় সদস্যদের পাশাপাশি আইনী দিকগুলো তদারকি করেন এমন কর্মীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে বসা হয়। যেখানে নৈতিকতা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো উঠে আসে, আর এগুলো আমরা খুব সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা করি।

জিআইজেএন: গোপনীভাবে অনুসন্ধান চালানো এবং আঙ্কেল চি, যিনি কিনা মাওমি নামেও পরিচিত, তার সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ে মুখোমুখি হওয়ার সময় আপনারা কীভাবে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন?

ঝাওইন ফেং: আমাদের দলটি একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার মাধ্যমে অগ্রসর হয়, যেখানে নিরাপত্তার বিষয়টিকে আমরা সর্বাগ্রাধিকার দিয়েছি। মাওমি একজন ভয়ংকর ব্যক্তি— এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত যদিও আমরা পাইনি তারপরও আমাদের দলটি  বিষয়গুলো নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করেছে। কোনো সম্ভাব্য সহিংস পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে তা মোকাবেলায় কী করণীয় তা নিয়ে কয়েক দফা অনুশীলনও করা হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদক ঝাওইন ফেং। ছবি: ফেং

প্রয়োজনীয় সমর্থন লাভ ও আত্মবিশ্বাস বোধ করার পরই আমরা আঙ্কেল চির বাড়ির সামনে তার মুখোমুখি [সাক্ষাৎকার] হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। কারণ দলের প্রত্যেক সদস্য তাদের ভূমিকা এবং আমরা কী করতে যাচ্ছি তা সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেছিল, আর তা ছিল নারী ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মাওমিকে প্রশ্ন করা, পাশাপাশি পুরো দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

তার বাড়ির সামনে আমাদের অবস্থানকারী দলটির মেজাজ শান্ত রাখার পাশাপাশি পেশাদার মনোভাব ধরে রেখেছিল। মাওমি হঠাৎ ক্যামেরায় আঘাত করলে, আমরা দ্রুত তার কাছ থেকে আমাদের ক্যামেরা পরিচালনাকারী সহকর্মীকে আলাদা করে ফেলি এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করি। আমরা তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকি এবং বারবার করে তাকে বলতে থাকি যে আমরা চলে যাচ্ছি। যদিও তিনি বারবার আমাদের ওপর চড়াও হচ্ছিলেন। তথ্যচিত্রে আপনি দেখতে পাচ্ছেন, আমাদের দলটি একে অপরকে আগলে রাখতে চেষ্টা করছে, আলিয়াউমের নেতৃত্ব অনুসরণ করে আগে থেকে কাছাকাছি পার্ক করা গাড়িতে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করা হয়, আগে থেকেই আমরা এ ধরনের একটি প্রস্থান পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়েছি। সৌভাগ্যক্রমে, আমাদের দলের কোনো সদস্য আঘাত পাননি বা ক্যামেরাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে রিপোর্টিং দলটি আঙ্কেল চিয়ের (মাওমি) মুখোমুখি হয়ে যৌন নিপীড়নের ভিডিও ধারণে তার জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করছে, এবং অভিযোগের জবাবে তিনি ক্যামেরায় আঘাত এবং দলটিকে তাড়া করছেন।

জিআইজেএন: অনুসন্ধানের সময় আপনারা কী ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন এবং কীভাবে তা কাটিয়ে ওঠেন?

আলিয়াউম লেরয়: ওয়েবসাইটগুলোর মূল হোতা মাওমি। তিনি প্রথমে আমাদের আন্ডারকভার সাংবাদিক ইয়ানের সঙ্গে দেখা করতে চাননি। কেননা তিনি তাকে সন্দেহ করতেন… গোপনে ধারণকৃত কোনো অনুসন্ধানী গল্প বলার পরিস্থিতি সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। আপনি অপেক্ষা করতে পারেন, কিন্তু এর জন্য আপনি অনন্তকাল সময় পাবেন না। আপনি জোরে টোকা দিতে পারেন, কিন্তু তা আবার দ্বিগুণ গতিতে আপনার কাছে ফিরে আসতে পারে। অভিযুক্ত পক্ষ যদি কোনোভাবে বিষয়টি আঁচ করতে পারে সেক্ষেত্রে সব দরজা বন্ধ করে হয়ে যায়, আপনি কখনোই আর ওই দরজা খুলতে পারবেন না।

এই ধরনের পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের দিকে অগ্রসর হওয়ার পদক্ষেপটি খুঁজে পেতে দলগত অনেক আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন পড়ে। যা নির্ভর করে দলের সদস্যদের মেধা ও দক্ষতার ওপর, সঙ্গে একটি চিমটি ভাগ্য। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে আমরা মাওমির সহকারীর কাছ থেকে একটি ফোনকল পেলাম। চাইনিজ নববর্ষের ঠিক আগের দিন!

বিবিসির তৈরি করা একটি কোলাজ: অনলাইনে শেয়ার ও পোস্ট করা যৌন হয়রানির ভিডিও থেকে ছবি নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ছবি: স্ক্রিনশট

জিআইজেএন: এ অনুসন্ধানটিতে দুটি দেশ, চীন ও জাপান এবং বেশ কয়েকজন সাংবাদিক জড়িত— যেমন রিপোর্টার, সম্পাদক, অনুবাদক, তদন্তকারী, পরিচালক, প্রযোজক ইত্যাদি। আপনারা কীভাবে কাজগুলো বণ্টন করেছেন? দলীয় সমন্বয় ঘিরে আপনাদের কোনো অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চান?

আলিয়াউম লেরয়: অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র নির্মাণ সবসময়ই বড় ধরনের দলীয় প্রচেষ্টার অংশ। আমাদের একটি দক্ষ বিশেষায়িত দল ছিল— শেনশেন, ঝাওইন, আমি এবং আমাদের নির্বাহী প্রযোজক, মুস্তাফা। লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি কাজের চাপ গ্রহণ, কাজ বণ্টন এবং অন্যান্য সদস্যদেরকে পরিচালিত করার জন্য মূল দলটি ছোট হওয়া প্রয়োজন। যদিও আমরা চারজন অনুসন্ধানের প্রতিটি পর্যায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। কেউ অনুসন্ধানে, কেউ তথ্যচিত্র নির্মাণে বেশি মনোযোগ দিয়েছি। যা আমাদের আরও উৎপাদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করেছে। একটি অর্কেস্ট্রা দলে মূল কন্ডাক্টর হিসেবে আপনি কয়েকজন সদস্যকে দেখতে পাবেন। তবে শেষ পর্যন্ত, একটি সফল অনুষ্ঠানের জন্য আপনার অবশ্যই সব ধরনের অভিনয়শিল্পীর প্রয়োজন পড়বে।

জিআইজেএন: এই অনুসন্ধানের উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকা সত্ত্বেও, মনে হচ্ছে জড়িত মূল সন্দেহভাজনদের এখনও পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। উল্লিখিত তিনটি ওয়েবসাইট বন্ধ করা হয়েছে, তবে একই ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়টি কী হতাশ করে?

ঝাওইন ফেং: বর্তমান ফলাফলে আমি মোটেও হতাশ নই। অনুসন্ধানটি বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে সমর্থ হয়েছে। আপসক্রিটিং (বিভিন্ন কৌশলে পোশাকের নীচ থেকে নারীর ছবি ধারণ), ছবি ধারণ সংক্রান্ত নিপীড়ন ও জনসম্মুখে যৌন নিপীড়নের বিষয়গুলো নিয়ে চীন, জাপান ছাড়িয়েও বিভিন্ন অঞ্চলের জনসাধারণের মাঝে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এটি এমন অপরাধ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের সমাজ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার উসকে দেয়। আমাদের এ অনুসন্ধানটি প্রকাশ্যে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও মতামত প্রকাশের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে।


জোয়ি চি জিআইজেএনের চীনা সম্পাদক ও হংকংভিত্তিক সাংবাদিক। তিনি হংকংয়ের একাধিক নিউজ আউটলেটের জন্য কাজ করেছেন, তার কাজের পরিধি রিপোর্টার, সম্পাদক থেকে ব্যবস্থাপনার ভূমিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। তার কাজগুলো চীনের রাজনীতি, সামাজিক সমস্যা এবং শ্রম অধিকারের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। তিনি সামাজিক কাজ-সম্পর্কিত বিষয়ের ওপর একটি পডকাস্টের সহ-উপস্থাপক ছিলেন।

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

পদ্ধতি

পাইলোস জাহাজডুবি নিয়ে অনুসন্ধানটি যেভাবে হল

২০২৩ সালের ১৪ জুন ভোরে গ্রিসের পাইলোস উপকূলে কয়েকশ অভিবাসীকে বহনকারী একটি ছোট মাছ ধরার ট্রলার ডুবে প্রায় ৬০০ জনের মৃত্যু হয়। কোস্ট গার্ড, ঘটনার পর দায়সারা উদ্ধার অভিযান পরিচালনার অভিযোগে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে। তারা দাবি করে যে জাহাজে থাকা অভিবাসীদের সহায়তার প্রস্তাব দিলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গবেষকদের অনুসন্ধানে সত্যটা বেরিয়ে আসে।

পদ্ধতি

ভেনেজুয়েলার শত শত সরকারি কর্মকর্তার ফ্লোরিডায় থাকা গোপন সম্পদের তথ্য যেভাবে উন্মোচন করেছে আরমান্ডোডটইনফো

যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও বসবাসের অনুমতি পাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সরকারের যোগসূত্র খুঁজতে গিয়ে সাংবাদিকদের হাতে আসে বিস্ময়কর সব তথ্যপ্রমাণ। এমন শত শত কোম্পানি এবং সম্পদের মালিকদের নাম পাওয়া যায়, যারা দেশটির সমাজতান্ত্রিক সরকারের আমলে সাবেক কর্মকর্তা বা সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। পড়ুন, কীভাবে হয়েছে আরমান্ডোডটইনফোর এই অনুসন্ধান।

টেকসইতা পদ্ধতি

সাংবাদিকতার প্রভাব পরিমাপ — আমরা নতুন যা জানি

সব সংবাদমাধ্যমই চেষ্টা করে তাদের রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে সমাজে প্রভাব তৈরির জন্য। কিন্তু এই প্রভাব পরিমাপ করার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলো ব্যবহার করে একেক ধরনের সূচক। পড়ুন, এ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার মাধ্যমে নতুন কী জানা গেছে।

BBC Newsnight NHS investigations lessons learned

কেস স্টাডি

যেভাবে ব্রিটিশ স্বাস্থ্যসেবা কেলেঙ্কারির স্বরূপ উন্মোচন করেছে বিবিসি নিউজনাইট

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিয়ে ছোট একটি অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করেছিল বিবিসি নিউজনাইট। কিন্তু পরবর্তীতে এক বছরব্যাপী অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে নানাবিধ অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিস্তারিত চিত্র। পড়ুন, পুরস্কারজয়ী অনুসন্ধানটির নেপথ্যের গল্প ও অভিজ্ঞতা-পরামর্শ।