প্রবেশগম্যতা সেটিংস

Karachi Sewerage and Water Board corruption investigation, Dawn newspaper
Karachi Sewerage and Water Board corruption investigation, Dawn newspaper

Image Shutterstock

লেখাপত্র

বিষয়

করাচির ‘ট্যাঙ্কার মাফিয়া’ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধান

আর্টিকেলটি পড়ুন এই ভাষায়:

পাকিস্তানে সাংবাদিকতার একজন শিক্ষক হিসেবে আমাকে যদি কোনো একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সম্পর্কে বলতে বলা হয় – কিংবা শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য গঠনমূলক কোনো প্রতিবেদনের কথা জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে আমি করাচির পানি বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী ট্যাঙ্ক মাফিয়াদের ওপর করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটির কথা উল্লেখ করবো। প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজি ভাষার সংবাদপত্র ডন-এ।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হিসেবে এটি দুর্দান্ত– এই লেখাটি পড়ার আগে আপনার অবশ্যই এটি পড়া উচিৎ। এখানে তিনজন দক্ষ সাংবাদিক তাদের কাজের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, করাচির মতো একটি শহরে কীভাবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা চালিয়ে যেতে হয়।

বাইলাইন এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নাজিহা সৈয়দ আলী এবং আসলাম শাহ। সৈয়দ আলী একজন অভিজ্ঞ রিপোর্টার যিনি পাকিস্তানের অন্যতম বড় রিয়েল এস্টেট টাইকুনকে অপসারণের জন্য পরিচিত; শাহ শহরের পানি পরিস্থিতির ওপর প্রতিবেদন তৈরি করেন, যিনি চটজলদি জানতে পারেন করাচির পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বোর্ডে (কেডব্লিউএসবি) কখন কোন নথিটি নিয়ে কানাঘুষা তৈরি হচ্ছে।

অনুসন্ধানের কাজে তাদের সহযোগীতা করেছেন ডক্টর সৈয়দ নওয়াজ-উল-হুদা, যিনি ভূগোল ও আঞ্চলিক পরিকল্পনার ওপর পিএইচডি করেছেন এবং ডন পত্রিকার ম্যাপিং সেল ডনজিআইএসের প্রধান মানচিত্রকর।

সেলিং লিকুইড গোল্ড – করাচি’স ট্যাঙ্কার মাফিয়াস, নামে লেখা তাদের ৫ হাজার শব্দের প্রতিবেদনটি লন্ডনের ‍তুলনায় দ্বিগুণ জনসংখ্যার শহরটির পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্নীতি ও পদ্ধতিগত কারসাজির গভীরে নিয়ে যায় ।

অনুসন্ধানে রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, পানি বোর্ডের কর্মী, সামরিক কর্মী, পানির ঠিকাদার, পানি ট্যাঙ্কারের মালিক, আধাসামরিক বাহিনী, বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্ষমতাধর ব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যকার নেটওয়ার্কের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এরা সবাই মিলে প্রতিদিন ৬০ মিলিয়ন রুপি (২ লাখ মার্কিন ডলার) আয় করে, যা কিনা রীতিমতো লাভজনক কারবার। যদিও এ প্রাক্কলনটি কম করে ধরা হয়েছে, কেননা অনুসন্ধানটি করা হয়েছে শুধুমাত্র ছয়টি সরকারি জলাধার থেকে বিক্রি করা পানির পরিমানের হিসাবের ভিত্তিতে– যেখানে কয়েক ডজন অবৈধ জলাধারের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

রিপোর্টিং দলটি পানি পাম্পিং স্টেশন (অথবা হাইড্র্যান্ট, স্থানীয় ভাষায়); ভূ-বৈজ্ঞানিক তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র; প্রাপ্ত নথি ও মানচিত্র খতিয়ে দেখেছে; এবং জল সরবরাহ ব্যবস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায় যতটা ধারণা করা হয়েছিল করাচিতে পানি চুরির মাত্রা তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ, পাশাপাশি সমাজের একটি গোষ্ঠী পানির মতো নিত্য প্রয়োজনীয় উপাদানটি লুট করতে কীভাবে তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করছে তার ওপর আলোকপাত করেছে অনুসন্ধানটি।

ভেঙে পড়া অবকাঠামো

করাচির পাইপলাইন নির্মিত হয়েছিল রাজা ষষ্ঠ জর্জের আমলে, তাই প্রায় ১০০ বছরের পুরনো এ সরবরাহ ব্যবস্থার অবস্থা রীতিমতো জীর্ণশীর্ণ। শহরটির আকার সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে নগর জুড়ে পানি পরিবহনের জন্য ব্যক্তিগত ট্যাঙ্কার পরিষেবাকে উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লক্ষ্য, কম খরচে পানি সরবরাহ বৃৃদ্ধির একটি সমাধান হিসেবে প্রধান পানির লাইনের সঙ্গে যুক্ত হাইড্রেন্ট (শহরের বিভিন্ন স্থানে বসানো পানির কল, যেগুলো সরাসরি কেডব্লিউএসবির প্রধান পানির লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত) থেকে পানি ট্যাঙ্কারে করে শহর জুড়ে পরিবহন করা। এরপর ছয়টি সরকারি হাইড্রেন্টের ব্যবস্থাপনাকে প্রতিটি শহর জুড়ে পাড়ার নামে নামকরণ করা হয়। ট্যাঙ্কারের বহরের মালিক প্রাইভেট অপারেটরদের কাছে তা দুই বছরের চুক্তির জন্য নিলাম করা হয়। এই প্রাইভেট অপারেটররা হাইড্রেন্টগুলোর তত্ত্বাবধানের জন্য দায়বদ্ধ, যার মধ্যে রয়েছে হাইড্র্যান্ট থেকে ট্যাঙ্কার ভর্তি করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বণ্টন করা।

Karachi, Pakistan water supply network

ছবি: স্ক্রিনশট, ডন

এই রকমের একটি ব্যবস্থার ফলে করাচির বাসিন্দারা তাদের বাড়িতে সরাসরি কেডব্লিউবির ভূগর্ভস্থ লাইন থেকে পানি নিতে পারেন না। পানির জন্য তাদের ব্যক্তিগত কোনো ট্যাঙ্কার পরিষেবাতে ফোন করতে হয় এবং তাদের বাড়িতে পানি পৌঁছে দেওয়ার জন্য অর্থ প্রদান করতে হয়। ফলসরূপ, করাচির বাসিন্দারা নিয়মিত পানি সঙ্কটের সম্মুখীন হতে থাকেন।

সবাই জানে যে করাচিতে পানির দাম ও বণ্টনে অসামঞ্জস্য রয়েছে: কাজে নামার প্রথম দিকে ডনের রিপোর্টার সৈয়দ আলী ভাবছিলেন যে, রিপোর্ট হিসেবে এটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কিনা। “এরপর আমার মনে হয়েছিল, পানি প্রাপ্তির বিষয়টি শহরের প্রত্যেকের জন্য রীতিমতো সংগ্রামের, কারণ আপনি পানি পাবেন কিনা তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনি এর বিনিময়ে অর্থ দিতে পারবেন কিনা তার ওপর,” তিনি বলেন।

সরকার অনুমোদিত ছয়টি হাইড্রেন্টের ফ্লো মিটারেই কারচুপি করা হচ্ছে, তাই ব্যক্তিগত ট্যাঙ্কার পরিষেবাগুলো কাগজে কলমে যা দেখাচ্ছে তার তুলনায় অনেক বেশি পানি উত্তোলন ও বিক্রি করতে সক্ষম। এদিকে অন্য দুটি সরকারি হাইড্রেন্ট আবার কোনো বেসরকারি কোম্পানির কাছে নিলাম করা হয়নি, তাই তাদের জবাবদিহিতাও কম। এই আটটি স্থানের বাইরে, শহরের অন্যত্র অবৈধ হাইড্রেন্ট রয়েছে, যার অপারেটরেরাও কেডব্লিউএসবি প্রধান লাইন থেকে পানি সরবরাহ করে থাকে। করাচিতে অনানুষ্ঠানিক, নথিপত্রবিহীন অবৈধ পানি বিক্রির ব্যবসার পরিধি এতটাই প্রসারিত যে, এই ধরনের অনুসন্ধান শুধু উপরিতলের চিত্রটিই তুলে ধরতে পারে।

“মৌলিক সমস্যাটি হচ্ছে পাকিস্তানে জনগণের ‘পানির ওপর কোনো অধিকার নেই,” বলেন হিসার ফাউন্ডেশনের চেয়ার সিমি কামাল। এটি করাচিভিত্তিক একটি অলাভজনক সংস্থা, যারা খাদ্য, জল এবং জীবিকার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে। “কেডব্লিউএসবি কেন তার ভূমিকা পালন করতে পারছে না এবং কঠোর সমালোচনার শিকার হচ্ছে– তা বুঝতে শুরু করার জন্য আমাদের অবশ্যই করাচির সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈষম্য ও দারিদ্র্যের চিত্র তুলে ধরতে হবে।”

উৎস অনুসন্ধান

পানি বণ্টন নিয়ে কাজ করাটা ছিল সৈয়দ আলীর জন্য একটি নতুন বিষয়, তাই তিনি প্রাথমিক গবেষণা এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণ থেকে শুরু করেছিলেন। পানি বোর্ডের কর্মী, কর্মকর্তা, হাইড্রেন্ট ঠিকাদার, লাইনম্যান, বাসিন্দা এবং মাছ খামার মালিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ফিল্ড রিপোর্টিং করেছিলেন। অন্যদিকে শাহ আগে থেকেই এই খাতটি নিয়ে কাজ করতেন। পানি বোর্ডের ছোট ছোট উন্নয়নমূলক কাজগুলোর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত — যেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে অর্থ ব্যয়, দুর্নীতিমূলক আচরণ, অবহেলা এবং এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারী বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা যারা বিষয়গুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন অথবা দেখেও না দেখার ভান করেন, এ ধরনের সব বিষয় তিনি কাভার করতেন।

“আপনি ইউনিয়নের প্রতিনিধি, কর্মী সবার সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা আপনাকে বলেছে, কী ঘটছে।” এর শাহ বলেন, “তারপর আমি সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করি।” সৈয়দ আলী যোগ করে বলেন যে, এ ধরনের রিপোর্টিংয়ের জন্য মাঠ থেকে অনুসন্ধানের কোনো বিকল্প নেই।

অনুসন্ধানী দলটি কেডব্লিউএসবির নিলাম করা সরকারি হাইড্রেন্টগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে এবং কর্মীদের জিজ্ঞাসা করে যে, গোটা ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করে, খুঁটিনাটি বিবরণসহ। সৈয়দ আলী তখন স্টাফ, ট্যাঙ্কার মালিক এবং ঠিকাদারদের মিটারিং ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, ট্যাঙ্কারগুলো কোথায় পাঠানো হয়েছিল, কীভাবে পানির দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং কারা রাজস্ব আদায় করেছিল সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শাহের সংগৃহিত অভ্যন্তরীণ তথ্যের সঙ্গে মিলানোর পর, পানি চুরির সঙ্গে কারা জড়িত তাদের পারস্পারিক সংযুক্ত নেটওয়ার্ককে উন্মোচন করেন।

সৈয়দ আলি ও নওয়াজ দুইজনই মনে করেছিলেন যে অনুসন্ধান শুরুর জন্য ভাল জায়গা করাচির জলের উৎস, যেখানে শহরের জলের পরিকাঠামো শুরু: শহর থেকে প্রায় ৭৫ মাইল পূর্বে অবস্থিত কিনঝার হ্রদ, এবং গুজ্জো খাল– যেখান থেকে পানির মূল সরবরাহ আসে। নওয়াজ পানির নমুনা নিয়েছিলেন কারণ তিনি মাছের খামারগুলোর পানির মান পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। তারা সেখানে পানি বোর্ডের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে, গোটা পদ্ধতিটি কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে জানতে চান। সৈয়দ আলী সরকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে বরং এটিকে বেশি সহায়ক বলে মনে করেন।

Kheenjhar Lake, Karachi's water source

কিনঝার হ্রদ, করাচির পানির প্রধান উৎস। ছবি: শাটারস্টক

“আমি ধারণা করি, আপনি তালিকার নীচের দিকের মানুষদের কাছ থেকে সেরা মন্তব্য ও তথ্য পাবেন,” সৈয়দ আলী বলেন। তারা তথ্যের খনি: পানি বোর্ডের নিম্ন শ্রেণীর কর্মীরা সরকারি সংস্করণ উপস্থাপন কিংবা ধামাচাপা দিতে আগ্রহী ছিলেন না। যদি তারা কথা বলতে খুব ভয় পায়, অন্যরা ভয় পাবে। “আমাদের দেখলেই সরকারি কর্মীরা পালিয়ে যেত, কিন্তু স্থানীয়রা অনেক সাহায্য করতো,” নওয়াজ যোগ করেন। এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটতো খাল ও হাইড্রেন্টেগুলো যেখানে বসানো হয়েছে সেখানে।

কতটা পানি উত্তোলন করা হয় তা বোঝার জন্য, এক পর্যায়ে সৈয়দ আলী এবং নওয়াজ একটি সরকারি হাইড্রেন্টের সমানে গিয়ে বসেন এবং এক ঘন্টা ধরে কতগুলো ট্যাঙ্কার ভর্তি করা হলো তা গণনা করেন– পরবর্তীতে যা তাদের কাজে লেগেছিল। শেরপাও হাইড্রেন্ট করাচির একচেটিয়া বড়লোক পাড়া প্রতিরক্ষা আবাসন কর্তৃপক্ষের পানির প্রধান উৎস বলে মনে করা হয়, যেটি পাইপলাইনের নেটওয়ার্কের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এবং যে কারণে সেখানে প্রায়ই পানির ঘাটতি দেখা যায়।

গল্পের শুরুটা খোঁজা

সৈয়দ আলীর কাছে অনুসন্ধানটি নতুন দিকে মোড় নেয়, যখন তিনি জানতে পারেন যে ফুরকান আখতার নামে ৩৬ বছর বয়সী পানি বোর্ডের সুপারভাইজারকে — যার কাজ ছিল অবৈধ হাইড্রেন্টগুলোকে খুঁজে বের করা এবং কেএসডব্লিউবির পানি চুরির সেলে সে বিষয়ক রিপোর্ট করা — ২০২২ সালের নভেম্বরে খুন করা হয়। এক ব্যক্তি তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং তার মোটরবাইকটি নিয়ে পালিয়ে যায়। ( তাকে হত্যার সঠিক কারণটি কখনও নির্ণয় করা হয় না; বরং এটিকে গাড়ি চুরির সাধারণ ঘটনায় আখ্যায়িত করা হয়। ভুক্তভোগীর পরিবার নিরাপত্তার কারণে ডন রিপোর্টিং টিমের সঙ্গে কথা বলেনি।)

Map showing portion of Karachi's network of illegal hydrants.

মানচিত্রে করাচির ৮৬টি অবৈধ হাইড্রেন্টের নেটওয়ার্কের একটি অংশ দেখনো হচ্ছে। ছবি: স্ক্রিনশট, ডন

“কেডব্লিউএসবি অফিসে আমি যখন ফুরকান সম্পর্কে জানতে পারি, তখন আমার মনে হয়েছিল যে, আমি আমার শুরুটা পেয়ে গেছি,” লোকব বলেন তিনি। সৈয়দ আলি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে ফুরকানের মৃত্যু পাঠকদের আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলবে কারণ তিনি ছিলেন একজন নিরপরাধ ব্যক্তি, যিনি ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন, যার পরিণতি হিসেবে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। “অবৈধ হাইড্রেন্টগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে এমন একজন লোককে খুন করা হয়েছে। পাঠকেরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।”

হত্যাকাণ্ডটি এ প্রতিবেদনের সঙ্গে জড়িতদের জীবনের সম্ভাব্য বিপদকেও তুলে ধরে। তাই এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে কিছু লোক মুখ খুলতে রাজি ছিলেন না। এছাড়াও, অবৈধ হাইড্রেন্ট রয়েছে– এমন স্থান পরিদর্শন করাটাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। নওয়াজ এখানে একটি কৌশল অবলম্বন করেন, তিনি নিজেকে একজন পিএইচডি গবেষক হিসেবে পরিচয় দেন, যদিও তা অসত্য ছিল না। তবে অনুসন্ধানী দলটির পক্ষ থেকে তাদের গাড়ির চালককে বলা হয়েছিল যে, প্রয়োজন হলে তিনি যেন নিজেকে একজন উবার চালক হিসেবে পরিচয় দেন।

অনুসন্ধানী দলটি যখন শেরপাও হাইড্রেন্টে যায়, তখন একজন সশস্ত্র প্রহরী তাদের চলে যেতে বলেন। সৈয়দ আলী বলেন, “আমি এ ধরনের ঘটনাগুলোকে ভালোবাসি এবং তা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করি। গল্পটিকে আকর্ষণীয় করার জন্য আপনি ছোট ছোট যে বিষয়গুলোকে কাজে লাগান এগুলো ঠিক তাই – এবং যা সত্য।”

সৈয়দ আলি এবং ড. নওয়াজের মতো মাঠে গিয়ে কাজ করেননি শাহ। কারণ তার কাজ ছিল বিভিন্ন নথি ও তথ্য প্রমাণ খুঁজে বের করা, যেগুলো তারা কখনই সরকারিভাবে হাতে পাবেন না। যেমন হাইড্রেন্ট বিষয়ক হিসাব। যেহেতু পানি বোর্ডে তার সোর্স ছিল, তাই তিনি সৈয়দ আলীকেও এ সম্পর্কে জানাতে পেরেছিলেন যে, কে কার সঙ্গে যুক্ত এবং কেডব্লিউএসবির কারা কারা জড়িত।

তিনি রিপোর্ট করার সময় “উদ্বেগ” অনুভব এবং মাঝে মাঝে ভয় পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। যেমন: অবৈধ হাইড্রেন্ট নেটওয়ার্ক চালাচ্ছেন এমন কিছু লোকের পক্ষে থেকে তাকে অর্থ প্রদানের প্রস্তাব দেয়া হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শাহ তার নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি কোনোভাবেই বিক্রি হবেন না।

স্পষ্ট নৈতিক অবস্থান ধরে রাখা গভীর অনুসন্ধানের পূর্বশর্ত। যে কারণে অবসরপ্রাপ্ত এবং সক্রিয় আমলারা সৈয়দ আলীর সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন। “পানি বোর্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকে স্বাগত জানান। সম্ভবত প্রতিবেদনটির প্রভাব সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না,”। এ সম্পর্কে শাহ বলেন “আমি মনে করি তিনি আসলে ভালো কিছু করতে চেয়েছিলেন।”

তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ

ট্যাঙ্কার মাফিয়ারা কতটা গভীরে শেকড় ছড়িয়েছেন তা বিবেচনায় নিয়ে, এই প্রতিবেদনের জন্য দুটি মানদণ্ড নির্ধারণ করাটা ছিল অপরিহার্য: পর্যাপ্ত জোরালো তথ্য-প্রমাণ হাতে পাওয়া এবং ঠিক কখন অনুসন্ধান কার্যক্রমগুলো বন্ধ করতে হবে, তা জানা।

শাহ মূল নথি পেতে সক্ষম হন, যেমন হাইড্রেন্টস ও সরকারি সংস্থা থেকে প্রাপ্ত মোট অর্ডারের তালিকা, ট্যাঙ্কারের বিল এবং অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা অর্থের রসিদ।

তাদের অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঘটনাটিকে জোরালোভাবে উপস্থাপন– পরিসংখ্যানের মাধ্যমে তুলে ধরা যে, হাইড্রেন্টস থেকে পানি বোর্ড যে অর্থ পায় তা কোনোভাবেই পানি উত্তোলনের প্রকৃত পরিমাণকে প্রতিফলিত করে না। শাহের প্রাপ্ত তালিকাগুলো স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিল যে, কারা অবৈধ অর্থ উপার্জনের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং এর সঙ্গে করাচির ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা কীভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ওয়াটার বোর্ডের হয়ে প্রকৃত হাইড্রেন্টের সংখ্যা গণনা করেছিল যে কোম্পানিটি, তাদের সঙ্গেও কথা বলেন শাহ।

কিন্তু একদিনে কী পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে আগে থেকে সে হিসেব করাটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তাই পরিসংখ্যানে যেন কোনো ভুল না হয়, সে জন্য দলটি শাহের আনা নথিগুলোর ভিত্তিতে একটি আনুমানিক হিসাব করে, যেন তাদের নিজস্ব অনুমান সম্ভাব্য সীমার মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।

অবসরপ্রাপ্ত একজন আমলা করাচির জল সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং পাম্পিং স্টেশনগুলোর চমৎকার একটি মানচিত্র সরবরাহ করেছিলেন, যা তারা ড্রাম-স্ক্যান করেন (বড় অ্যানালগ চিত্রকে সুনির্দিষ্ট, ডিজিটাল ফাইলে রূপান্তর করার একটি স্ক্যানিং পদ্ধতি)। নওয়াজ স্যাটেলাইট ইমেজের সঙ্গে মানচিত্রটিকে ডিজিটালভাবে মেলান এবং ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক ভূ-বিজ্ঞান ডাটাবেস জিওরেফে নিবন্ধিত করেন।

Archival KWSB map showing Karachi's water infrastructure

কেডব্লিউএসবি মানচিত্রে করাচির জল পরিকাঠামো এবং হাইড্রেন্ট নেটওয়ার্ক। ছবি: স্ক্রিনশট, ডন

“সুবিধাজনক বিষয়টি হচ্ছে আপনার মানচিত্রটি যদি নিবন্ধিত হয়, আপনি টোপোশিট এবং স্যাটেলাইট চিত্র থেকে ভৌগলিক ডেটা বের করতে পারেন,” তিনি ব্যাখ্যা করেন। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো পরিদর্শন করার পর নওয়াজ করাচির সবগুলো পানি সরবরাহ অবকাঠামোর একটি মানচিত্র তৈরি করেন। পাশাপাশি সরকারি কেডব্লিউএসবি লাইন থেকে পানি চুরির গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল স্যাটেলাইট প্রমাণও সরবরাহ করেন।

“স্যাটেলাইট চিত্রগুলো অপরাধীদের শত্রু এবং সাংবাদিকদের বন্ধু,” বলেন নওয়াজ। “এভাবেই আমরা [শেরপাও] হাইড্র্যান্ট খুঁজে পাই, আদালতের আদেশ সত্ত্বেও, যা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।”

দুর্নীতি প্রকল্পের সর্বোচ্চ স্তরের ব্যক্তিদের মুখোমুখি হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক কিংবা প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর অনুসন্ধানী দলটি তাদের কাজ গুটিয়ে নেয়। “ওই পর্যায় পর্যন্ত যেতে আমি সত্যিই ভয় পাবো। আমি এমন কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ে যেতে চাই না যেখানে গিয়ে আমার মনে হবে, আমার জীবন ঝুঁকির মধ্যে।”

পিন পতন নিরবতা’

এই ধরনের গভীর অনুসন্ধানের জন্য প্রচুর ধৈর্যের প্রয়োজন, তাছাড়া আপনার নিউজরুমেরও আপনাকে এতোটা সময় দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। এ সম্পর্কে সৈয়দ আলী বলেন, তাদের দলটি ভাগ্যবান, কারণ ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস তাদের অনুসন্ধান কাজ পরিচালনার প্রায় তিন মাস সময় দিয়েছেন।

অবশ্য খানিকটা হতাশার সঙ্গে শাহ স্বীকার করেছেন যে, পানি প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত কিছু নাম মুদ্রণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, পানি চুরির ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করা এবং সবাই মিলে কীভাবে দুর্নীতি করেছিল তা ছিল অনেক বড় উন্মোচন। “নাম বাদ দেওয়া আমার সমস্যা নয়,” তিনি বলেছেন। “এই শহরে, প্রায় সবাই জানে যে, কারা মূল কলকাঠি নাড়ছে।”

এখান থেকে বোঝা যায় যে, কেন প্রতিবেদনটি নিয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। “এটি প্রকাশের পর ছিল পিন পতন নীরবতা,” সৈয়দ আলী ব্যাখ্যা করেন। কোনো ফোন কল নেই। “কার্যকর ও দায়বদ্ধ কোনো শাসন ব্যবস্থায়, পানি বণ্টন সংক্রান্ত এ ধরনের বৃহৎ মাপের কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হলে অনেকেরই চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যেত।”

তবে ডনের পাঠকেরা নীরব ছিলেন না, অনুসন্ধানী দলটিকে তারা কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে দেন।

কয়েক মাস পরে, করাচির প্রাদেশিক সরকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য একটি আইন প্রবর্তন করে, যেটিতে অন্যান্য সংস্কারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল পানি চুরি রোধ করার জন্য নিবেদিত পুলিশ স্টেশন স্থাপন করা এবং পানি বোর্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বরখাস্ত করার নিয়মকে সহজ করা।


মাহিম মাহের করাচিভিত্তিক একজন সাংবাদিক। তিনি শহুরে অবকাঠামো নিয়ে রিপোর্ট করেন এবং জাতীয় সংবাদপত্র ডেইলি টাইমস এবং দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের করাচি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা নগর সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। করাচির আইবিএর সেন্টার অব জার্নালিজম এক্সিলেন্সে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ান এবং নিয়মিত লেখালিখি বিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা করেন।

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইন বা প্রিন্টে প্রকাশযোগ্য

লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করুন


Material from GIJN’s website is generally available for republication under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International license. Images usually are published under a different license, so we advise you to use alternatives or contact us regarding permission. Here are our full terms for republication. You must credit the author, link to the original story, and name GIJN as the first publisher. For any queries or to send us a courtesy republication note, write to hello@gijn.org.

পরবর্তী

Ranchland South Dakota stolen Indigenous land

গবেষণা পরামর্শ ও টুল

‘বিনামূল্যের জমির প্রকৃত মূল্য’: আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়ার ব্যক্তিগত ও জাতীয় ইতিহাস

ক্লারেন দুটো মূল প্রশ্নকে সামনে রেখে এগিয়েছেন: “পরিবারের মধ্যে, বা জাতির কাছে আমরা যে গল্পগুলো বলি সেগুলো আসলে কোনগুলো? কোন গল্পগুলো চেপে চাই আমরা? আর কেন আমরা কিছু গল্প কিছুতেই বলতে চাইনা?”

স্বাস্থ্য নিয়ে ভুয়া তথ্য – অপতথ্য, অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা কীভাবে লড়তে পারেন

প্রতি বছর বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী কেবল চারটি শিল্প প্রতিষ্ঠান। অথচ তাদের ব্যাপারে প্রতিবেদন নেই বললেই চলে। আপনি যদি কিছু খুঁজে পান, আর তা ভুক্তভোগী সম্প্রদায়, নীতিনির্ধারক, কর্মকর্তা কিংবা মন্ত্রীদের সামনে তুলে না ধরেন, তাহলে কাজটি আপনি কেন করছেন?

Recorder panel at IJF24

তহবিল সংগ্রহ পদ্ধতি পরামর্শ ও টুল

স্বাধীন নিউজরুমের আয়ের মডেল কী হতে পারে? 

অল্প বয়সী দর্শকদের কাছে যেন গ্রহণযোগ্য হয়— রেকর্ডারের তরুণ কর্মীরা ঠিক তেমনভাবে তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে। পাঠকের পয়সা দিয়েই আয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তারা।

IJF24 Reframing Visual Journalism AI Deepfake

পদ্ধতি পরামর্শ ও টুল

ডিপফেকের যুগে ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতা: সত্য যাচাই ও আস্থা অর্জন

ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতা এখন তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এগুলো হলো সিন্থেটিক কনটেন্টের “উত্তাল সমুদ্রে” মৌলিক বিষয়বস্তু শনাক্ত; জনগণের আস্থা ধরে রাখা; এবং “প্রকৃত ছবি” দিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।